সাক্ষ্য প্রদান বিষয়ক হাদিস । সাক্ষীগণের মধ্যে কে উত্তম ?
সাক্ষ্য প্রদান বিষয়ক হাদিস । সাক্ষীগণের মধ্যে কে উত্তম , এই অধ্যায়ে মোট ৯ টি হাদীস ( ২২৯৫ -২৩০৩) >> সুনান তিরমিজি শরীফ এর মুল সুচিপত্র দেখুন
অধ্যায়-৩৩ঃ সাক্ষ্য প্রদান, অনুচ্ছেদঃ (১-৪)=৪টি
১. অনুচ্ছেদঃ সাক্ষীগণের মধ্যে কে উত্তম ?
২. অনুচ্ছেদঃ যেসব লোকের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়
৩. অনুচ্ছেদঃ মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান প্রসঙ্গে
৪. অনুচ্ছেদঃ সাক্ষ্যদান প্রসঙ্গে
১. অনুচ্ছেদঃ সাক্ষীগণের মধ্যে কে উত্তম ?
২২৯৫. যাইদ ইবনি খালিদ আল-জুহানী [রাদি.] হইতে বর্ণীতঃ
রসুলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম] বলেছেনঃ আমি কি উত্তম সাক্ষী সম্পর্কে তোমাদেরকে অবহিত করবো না? তলব [আহবান] করার পূর্বেই যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় সাক্ষ্য দেয় সে হলো উত্তম সাক্ষী।
সহীহ, মুসলিম। সাক্ষ্য প্রদান বিষয়ক হাদিস – এই হাদীসটির তাহকিকঃ সহীহ হাদীস
২২৯৬. আহ্মাদ ইবনিল হাসান-আবদুল্লাহ ইবনি মাসলামা হইতে বর্ণীতঃ
তিনি মালিক [রঃ]-এর সূত্রে উপরোক্ত হাদীসের অনুরূপ বর্ণনা করিয়াছেন। আবদুল্লাহ ইবনি মাসলামা তার রিওয়ায়াতে আবী আমরার স্থলে মালিক ইবনি আবী আমরা বলেছেন। আবু ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান। বেশিরভাগ মুহাদ্দিস বলেছেন, আবদুর রাহমান ইবনি আবী আমরা। মালিক হইতে এ হাদীসের বর্ণনাতে মতানৈক্য এই যে, কেউ বলেন, আবু আমরা এবং কেউ বলেন, ইবনি আবী আমরা আনসারী। আমাদের মতে শেষেরটিই সহিহ। কারণ, মালিক [রঃ] ব্যতীত অন্য সনদসূত্রে আবদুর রাহমান ইবনি আবী আমরা-যাইদ ইবনি খালিদ [রাদি.] হইতে এভাবে উল্লেখ আছে। আর উক্ত হাদীস ব্যতীত ইবনি আবী আমরা হইতে যাইদ ইবনি খালিদ [রাদি.]-এর সূত্রে অন্য হাদীসও বর্ণিত আছে এবং সেটিও সহীহ্ হাদীস। আবু আমরা হলেন যাইদ ইবনি খালিদ আল-জুহানী [রাদি.]-এর মু্ক্তদাস। আবু আমরার সূত্রে গানীমাত অর্থাৎ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আত্মসাৎ সম্পর্কিত হাদীস বর্ণিত আছে। আর অধিকাংশ বর্ণনাকারীগণই তাকে আব্দুর রাহমান ইবনি আবী আমরাই বলেন।
সাক্ষ্য প্রদান বিষয়ক হাদিস – এই হাদীসটির তাহকিকঃ সহীহ হাদীস
২২৯৭. যাইদ ইবনি খালিদ আল-জুহানী [রাদি.] হইতে বর্ণীতঃ
রসুলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম]-কে তিনি বলিতে শুনেছেনঃ সাক্ষীগণের মধ্যে সেই ব্যক্তি সবচাইতে উত্তম যে তলব করার আগেই নিজ ইচ্ছায় সাক্ষ্য দেয়।
পূর্বের হাদীসের সহায়তায় এ হাদীসটি সহিহ। আবু ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান এবং উপরোক্ত সনদসূত্রে গারীব । সাক্ষ্য প্রদান বিষয়ক হাদিস – এই হাদীসটির তাহকিকঃ সহীহ হাদীস
২. অনুচ্ছেদঃ যেসব লোকের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়
২২৯৮. আইশা [রাদি.] হইতে বর্ণীতঃ
তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ [সাঃআঃ] বলেছেনঃ খিয়ানতকারী পুরুষ ও নারীর সাক্ষ্য, যেনার অপবাদ আরোপের শাস্তি ভোগকারী পুরুষ ও নারীর সাক্ষ্য, বিপক্ষের প্রতি শত্রুতা পোষণকারীর সাক্ষ্য, মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদানকারীর সাক্ষ্য, কোন পরিবারের পক্ষে তাহাদের অধীনস্থ লোকদের সাক্ষ্য এবং ওয়ালাআ ও আত্নীয়তার মিথ্যা পরিচয়দানের অপবাদে অভিযুক্ত ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। ফাযারী বলেন, “আল-কানি” শব্দের অর্থ অধীনস্থ।
যঈফ, ইরওয়া [২৬৭৫] মিশকাত, তাহকীক ছানী [৩৭৮১], আবু ঈসা বলেন, এ হাদীসটি গারীব। আমরা শুধুমাত্র ইয়াযীদ ইবনি যিয়াদ আদ-দিমাশকীর সূত্রেই এই হাদীস প্রসঙ্গে জেনেছি। ইয়াযীদ হাদীস শাস্ত্রে দুর্বল হিসাবে গণ্য। তার সূত্র ব্যতীত যুহ্রী [রঃ]-এর রিওয়ায়াত হিসাবেও আমরা এ হাদীস জানতে পারিনি।
এ অনুচ্ছেদে আবদুল্লাহ ইবনি আমর [রাদি.] হইতেও হাদীস বর্ণিত আছে। উপরোক্ত হাদীসের সুস্পষ্ট ও বিস্তারিত অর্থ সম্পর্কেও আমাদের কিছু জানা নেই এবং এর সনদসূত্রও আমাদের মতে সহীহ নয়। বিশেষজ্ঞ আলিমগণের এ হাদীস অনুযায়ী কর্মপন্থা এই যে, নিকটাত্নীয়ের পক্ষে অপর নিকটাত্নীয়ের সাক্ষ্য বৈধ হইবে। তবে সন্তানদের সাক্ষ্য পিতার পক্ষে এবং পিতার সাক্ষ্য সন্তানের পক্ষে জায়িয কি না এ ব্যাপারে তাহাদের মধ্যে মতের অমিল আছে। বেশিরভাগ আলিমের মতে পিতার পক্ষে সন্তানের সাক্ষ্য এবং সন্তানের পক্ষে পিতার সাক্ষ্য জায়িয নয়। কোন কোন আলিমের মতে আদেল অর্থাৎ ন্যায়নিষ্ঠ হলে সন্তানের সাক্ষ্য পিতার অনুকূলে এবং পিতার সাক্ষ্য সন্তানের পক্ষে জায়িয। আর ভাইয়ের পক্ষে ভাইয়ের সাক্ষ্য এবং নিকটাত্নীয়ের সাক্ষ্য অপর নিকটাত্নীয়ের পক্ষে জায়িয হওয়ার বিষয়ে কোন মতভেদ নেই। ঈমাম শাফি [রঃ] বলেন, শত্রুর বিরুদ্ধে শত্রুর সাক্ষ্য গ্রহনযোগ্য নয়, সে আদেল অর্থাৎ ন্যায়নিষ্ঠ হলেও। তিনি তার মতের সমর্থনে আবদুর রহমান ইবনিল আরাজ [রাহঃ] হইতে রসুলুল্লাহ [সাঃআঃ] হইতে মুরসাল হিসাবে বর্ণিত হাদীস পেশ করেছেনঃ “বিদ্বেষ পোষণকারীর সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়”। অনুরূপ “লা তাজূযু শাহাদাতু গিমরিন” হাদীসের মর্মও তাই। সাক্ষ্য প্রদান বিষয়ক হাদিস – এই হাদীসটির তাহকিকঃ দুর্বল হাদীস
৩. অনুচ্ছেদঃ মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান প্রসঙ্গে
২২৯৯. আইমান ইবনি খুরাইম [রঃ] হইতে বর্ণীতঃ
রসুলুল্লাহ [সাঃআঃ] এক সময় ভাষণ দিতে দাঁড়িয়ে বলেনঃ হে লোকসকল! মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদানকে আল্লাহ্ তাআলার সাথে শারীক করার সম-পর্যায়ের [অপরাধ] গণ্য করা হয়েছে। তারপর রসুলুল্লাহ [সাঃআঃ] এ আয়াত তিলাওয়াত করেনঃ
وَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الأَوْثَانِ وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِ
“তোমরা মূর্তিপূজার অপবিত্রতা বর্জন কর এবং মিথ্যা বলাও বর্জন কর”। [সূরাদি. হাজ্জ-৩০]
যঈফ, ইবনি মাজাহ হাদীস নং-[২৩৭২], আবু ঈসা বলেন, এ হাদীসটি গারীব। এ হাদীসটি আমরা শুধুমাত্র সুফিয়ান ইবনি যিয়াদের সূত্রেই জেনেছি। সুফিয়ান হইতে এ হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে রাবীগণের মতের অমিল আছে। আইমান ইবনি খুরাইম [রঃ] নাবী [সাঃআঃ]-এর নিকট হইতে কোন কিছু শুনেছেন বলে আমাদের জানা নেই। সাক্ষ্য প্রদান বিষয়ক হাদিস – এই হাদীসটির তাহকিকঃ দুর্বল হাদীস
২৩০০. খুরাইম ইবনি ফাতিক [রাদি.] হইতে বর্ণীতঃ
রসুলুল্লাহ [সাঃআঃ] ফজরের নামাজ আদায় করিলেন। নামাজ শেষে তিনি দাঁড়িয়ে বলেনঃ মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদানকে আল্লাহ্ তাআলার সাথে শারীক করার সমতুল্য গণ্য করা হয়েছে। তিনি এ কথা তিনবার বলিলেন। তারপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করলেনঃ
وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِ
“তোমরা মিথ্যা বলা পরিহার কর”। [সূরাদি. হাজ্জ-৩০]
যঈফ, যঈফা [১১১০] আবু ঈসা বলেনঃ এই বর্ণনাটি আমার মতে অধিক সহীহ। খুরাইম ইবনি ফাতিক একজন সাহাবী। তিনি নাবী [সাঃআঃ] হইতে অনেক হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি একজন প্রসিদ্ধ ব্যক্তি। সাক্ষ্য প্রদান বিষয়ক হাদিস – এই হাদীসটির তাহকিকঃ দুর্বল হাদীস
২৩০১. আবু বাকর [রাদি.] হইতে বর্ণীতঃ
তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম] বলেছেনঃ আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে মারাত্মক কাবীরা গুনাহ প্রসঙ্গে জানিয়ে দেবনা? সাহাবীগণ বলেন, অবশ্যই, ইয়া রাসূলুল্লাহ্! তিনি বললেনঃ আল্লাহ্ তাআলার সাথে শারীক করা, পিতা-মাতাকে কষ্ট দেয়া ও তাহাদের অবাধ্য হওয়া এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া বা মিথ্যা কথা বলা। রসুলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম] পুনঃপুনঃ এ কথাগুলো বলিতে থাকলেন। আমরা [মনে মনে] বলিতে লাগলাম, তিনি যদি চুপ করিতেন।
সহীহ, গাইয়াতুল মারাম [২৭৭], বুখারী, মুসলিম। আবু ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান ও সহিহ। এ অনুচ্ছেদে আব্দুল্লাহ ইবনি আমর [রাদি.] হইতেও হাদীস বর্ণিত আছে । সাক্ষ্য প্রদান বিষয়ক হাদিস – এই হাদীসটির তাহকিকঃ সহীহ হাদীস
৪. অনুচ্ছেদঃ সাক্ষ্যদান প্রসঙ্গে
২৩০২. ইমরান ইবনি হুসাইন [রাদি.] হইতে বর্ণীতঃ
তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম]-কে আমি বলিতে শুনেছিঃ আমার যুগই [যুগের মানুষই] সর্বোত্তম, তারপর তাহাদের পরবর্তী যুগ, তারপর তাহাদের পরবর্তী যুগ [তিনবার বলেছেন]। তাহাদের পরবর্তী যুগে [তিনযুগ পরে] এমন সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটবে যারা হইবে মোটা দেহ বিশিষ্ট এবং তারা মোটা দেহ বিশিষ্ট হওয়াটাই পছন্দ করিবে। তারা সাক্ষ্য তলবের পূর্বেই সাক্ষ্য দিতে যাবে।
সাক্ষ্য প্রদান বিষয়ক হাদিস-সহীহ, পূর্বে বর্ণিত হয়েছে, বুখারী, মুসলিম। আবু ঈসা বলেন, এ হাদীসটি আমাশ হইতে আলী ইবনি মুদরিক [রঃ]-এর সূত্রে বর্ণিত রিওয়ায়াত হিসাবে গারীব। এই হাদীসটি আমাশ হইতে হিলাল ইবনি ইয়াসাফের বরাতে ইমরান ইবনি হুসাইন [রাদি.]-এর সূত্রে আমাশের শিষ্যগণ বর্ণনা করিয়াছেন। উপরোক্ত হাদীসের মতো বর্ণিত হয়েছে আবু আম্মার আল-হুসাইন ইবনি হুরাইস হইতে, তিনি ওয়াকী হইতে, তিনি আমাশ হইতে, তিনি হিলাল ইবনি ইয়াসাফ হইতে, তিনি ইমরান ইবনি হুসাইন [রাদি.] হইতে, তিনি রসুলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম] হইতে এই সূত্রে । এই সূত্রে বর্ণিত হাদীসটি মুহাম্মাদ ইবনি ফুযাইলের হাদীসের চাইতে অনেক বেশি সহিহ। কোন কোন অভিজ্ঞ আলিম বলেন, “তারা সাক্ষ্য তলবের আগেই সাক্ষ্য দিবে যাবে” কথার মর্ম এই যে, তারা মিথ্যা সাক্ষ্য দিবে। অর্থাৎ সাক্ষী প্রদানের জন্য তাহাদের কাউকে আহ্বান না করলেও [অসৎ উদ্দেশ্যে] সাক্ষ্য প্রদান করিতে আসবে। উমার ইবনিল খাত্তাব [রাদি.] কর্তৃক বর্ণিত রসুলুল্লাহ [সাঃআঃ]-র হাদীসটিতে এর ব্যাখ্যা বিদ্যমান রয়েছে। সাক্ষ্য প্রদান বিষয়ক হাদিস – এই হাদীসটির তাহকিকঃ সহীহ হাদীস
২৩০৩. উমার ইবনিল খাত্তাব [রাদি.] হইতে বর্ণীতঃ
নাবী [সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম] বলেছেনঃ “আমার যুগ হচ্ছে সর্বোত্তম যুগ, তারপর তাহাদের পরবর্তী যুগ, তারপর তাহাদের পরবর্তী যুগ। তারপর এরূপভাবে মিথ্যার প্রসার ঘটবে যে, কারো নিকট সাক্ষ্য তলব না করা হলেও সে সাক্ষ্য দিবে, শপথ করিতে বলা না হলেও শপথ করিবে”।
সহীহ, মাজমাউয যাওয়াইদ [১০/১৯]। আর রসুলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম] এর হাদীসঃ “সেই লোকই সর্বোত্তম সাক্ষ্যদাতা যে সাক্ষ্য তলবের পূর্বেই সাক্ষ্য দেয়,” আমাদের মতে রসুলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম]-এর উক্ত হাদীসের মর্ম এই যে, তাকে সাক্ষ্য দিতে বলা হলে সে তার জ্ঞাত বিষয়ে সাক্ষ্য দেয়া হইতে বিরত থাকে না এবং বাস্তব ঘটনা প্রকাশ করে তার দায়িত্ব পালন করে। কোন কোন আলিমের মতে এটাই হলো উক্ত হাদীসের যথার্থ ব্যাখ্যা। সাক্ষ্য প্রদান বিষয়ক হাদিস – এই হাদীসটির তাহকিকঃ সহীহ হাদীস
Leave a Reply