হুনায়ন যুদ্ধ

হুনায়ন যুদ্ধ

হুনায়ন যুদ্ধ >> সহীহ মুসলিম শরীফ এর মুল সুচিপত্র দেখুন >> নিম্নে মুসলিম শরীফ এর একটি অধ্যায়ের হাদিস পড়ুন

২৮. অধ্যায়ঃ হুনায়ন যুদ্ধ

৪৫০৪

আব্বাস [রাদি.] হইতে বর্ণীতঃ

তিনি বলেন, আমি হুনায়নের যুদ্ধের দিন রসূলুল্লাহ [সাঃআঃ]-এর সঙ্গে ছিলাম। আমি এবং আবু সুফ্‌ইয়ান ইবনি হারিস ইবনি আবদুল মুত্তালিব রসূলুল্লাহ [সাঃআঃ] -এর একেবারে সঙ্গেই ছিলাম। আমরা কখনও তাহাঁর থেকে আলাদা হইনি। রসূলুল্লাহ [সাঃআঃ] একটি সাদা বর্ণের খচ্চরের উপর আরোহণ করেছিলেন। সে খচ্চরটি ফারওয়াহ্‌ ইবনি নুফাসাহ্‌ হুযামী তাঁকে হাদ্‌ইয়্যাহ্‌ স্বরূপ দিয়েছিলেন। [তাকে দুলদুল নামে ডাকা হতো।] যখন মুসলিম এবং কাফির পরস্পর সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হল তখন মুসলিমগণ [যুদ্ধের এক পর্যায়ে] পেছনের দিকে পলায়ন করিতে লাগলেন। আর রসূলুল্লাহ [সাঃআঃ] স্বীয় পায়ের গোড়ালি দিয়ে নিজের খচ্চরকে আঘাত করে কাফিরদের দিকে ধাবিত করছিলেন। আব্বাস [রাদি.] বলেন, আমি তাহাঁর খচ্চরের লাগাম ধরে রেখেছিলাম এবং একে থামিয়ে রাখার চেষ্টা করছিলাম যেন দ্রুত গতিতে অগ্রসর হইতে না পারে। আর আবু সুফ্‌ইয়ান [রাদি.] তাহাঁর খচ্চরের রেকাব [হাউদাজের বন্ধনের পট্টি] ধরে রেখেছিলেন। তখন রসূলুল্লাহ [সাঃআঃ] বললেনঃ হে আব্বাস! আসহাবে সামুরাকে আহবান করো। আব্বাস [রাদি.] বলেন- আর তিনি ছিলেন উচ্চ আওয়াজের অধিকারী ব্যক্তি-তখন আমি উচ্চৈঃস্বরে আওয়াজ দিয়ে বললাম, হে আসহাবে সামুরাহ্‌! তোমরা কোথায় যাচ্ছ? তিনি বলেন, আল্লাহর কসম! তা শুনামাত্র তারা এমনভাবে প্রত্যাবর্তন করিতে শুরু করিলেন যেমনভাবে গাভী তার বাচ্চার আওয়াজ শুনে দ্রুত দৌড়ে আসে। এবং তারা বলিতে লাগল, আমরা আপনার নিকট হাযির, আমরা আপনার নিকট হাযির। রাবী বলেন, এরপর তারা কাফিরদের সাথে পুনরায় যুদ্ধে লিপ্ত হন। তিনি আনসারদেরকেও এমনিভাবে আহবান করিলেন যে, হে আনসারগণ! রাবী বলেন, এরপর আহবান সমাপ্ত করা হলো বানী হারিস ইবনি খাযরাজের মাধ্যমে। [তাঁরা আহবান করিলেন, হে বানী হারিস ইবনিল খাযরাজ।] রসূলুল্লাহ [সাঃআঃ] স্বীয় খচ্চরের উপর আরোহিত অবস্থায় আপন ঘাড় উচুঁ করে তাদের যুদ্ধের অবস্থা দেখেন। তখন রসূলুল্লাহ [সাঃআঃ] বললেনঃ এটাই হল যুদ্ধের উত্তেজনাপূর্ণ চরম মুহূর্ত। রাবী বলেন, এরপর রসূলুল্লাহ [সাঃআঃ] কয়েকটি পাথরের টুকরা হাতে নিলেন এবং এগুলো তিনি বিধর্মীদের মুখের উপর ছুঁড়ে মারলেন। এরপর বলিলেন, মুহাম্মাদ [সাঃআঃ] -এর রবের কসম! তারা পরাজিত হয়েছে। আব্বাস [রাদি.] বলেন, আমি যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধের অবস্থান পরিদর্শন করিতে গিয়ে দেখলাম যে, যথারীতি যুদ্ধ চলছে। এমন সময় তিনি পাথরের টুকরাগুলো নিক্ষেপ করিলেন। আল্লাহর শপথ! তখন হঠাৎ দেখি যে, কাফিরদের শক্তি নিস্তেজ হয়ে গেল এবং তাদের যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেল। [ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৪৬১, ইসলামিক সেন্টার- ৪৪৬৩]

৪৫০৫

যুহরী [রহমাতুল্লাহি আলাইহি] হইতে বর্ণীতঃ

একই সূত্রে উল্লিখিত হাদীসের অনুরূপ বর্ণনা করিয়াছেন। তবে তিনি ফারওয়াহ্ ইবনি নুআমাহ্ জুযামী কথাটি অতিরিক্ত বর্ণনা করিয়াছেন এবং তিনি বলেছেন যে, তারা পরাজিত হয়েছে, কাবার রবের কসম! তারা পরাজিত হয়েছে কাবার রবের কসম!” তিনি তাহাঁর হাদীসে এ কথাটিও বাড়তি বর্ণনা করিয়াছেন যে, “অবশেষে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে পরাজিত করিলেন”।

রাবী বলেন, আমি যেন নবী [সাঃআঃ] -কে তাদের পিছন থেকে দেখলাম যে, তিনি স্বীয় খচ্চরের উপর থেকে নিজ পায়ের গোড়ালি দিয়ে একে প্রহার করছিলেন। [দ্রুত গতিতে চলার জন্য।] [ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৪৬২, ইসলামিক সেন্টার- ৪৪৬৪]

৪৫০৬

আব্বাস [রাদি.] হইতে বর্ণীতঃ

আমি হুনায়নের যুদ্ধের দিন নবী [সাঃআঃ] -এর সঙ্গে ছিলাম। …এরপর তিনি উল্লিখিত হাদীসটি বর্ণনা করেন। তবে ইউনুস এবং মামার [রাদি.] বর্ণিত হাদীস বর্ণনার দিক দিয়ে অধিক বিস্তারিত ও পরিপূর্ণ। [ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৪৬৩, ইসলামিক সেন্টার- ৪৪৬৫]

৪৫০৭

আবু ইসহাক [রহমাতুল্লাহি আলাইহি] হইতে বর্ণীতঃ

তিনি বলেন, এক ব্যক্তি বারা [রাদি.] –কে বলিলেন, হে আবু উমারাহ! আপনারা কি হুনায়নের যুদ্ধে পলায়ন করেছিলেন? তিনি বলিলেন, না। আল্লাহর কসম! রসূলুল্লাহ [সাঃআঃ] পলায়ন করেননি। বরং তাহাঁর কয়েকজন হালকা পাতলা, চালাক-চতুর তরুণ সাথী, অস্ত্র-শস্ত্র ও বেশী হাতিয়ার বিহীন তাঁরা সরে পড়েন। তাঁরা এমন একদল তীরন্দাযের মুকাবিলা করছিলেন, যাদের তীরের লক্ষ্যস্থল ব্যর্থ হবার নয়। তারা ছিল হাওয়াযিন ও নাযর গোত্রের লোক। তারা এমনভাবে তীর ছুঁড়ছিল যে, লক্ষ্যস্থল ব্যর্থ হওয়ার ছিল না। তখন তাঁরা রসূলুল্লাহ [সাঃআঃ] –এর দিকে এগিয়ে এলেন। রসূলুল্লাহ [সাঃআঃ] সে সময় তাহাঁর সাদা রঙ্গের খচ্চরের উপর ছিলেন। আর আবু সুফইয়ান ইবনি হারিস ইবনি আবদুল মুত্তালিব [রাদি.] একে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি নামলেন এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করিলেন। রাবী বলেন, যেন তিনি বলেছিলেনঃ “আমি অবশ্যই নবী, এ কথা মিথ্যা নয়। আমি ইবনি আবদুল মুত্তালিব”। তারপর তিনি স্বীয় সেনাদলকে শ্রেণীবদ্ধ করিলেন। [ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৪৬৪, ইসলামিক সেন্টার- ৪৪৬৬]

৪৫০৮

আবু ইসহাক [রহমাতুল্লাহি আলাইহি] হইতে বর্ণীতঃ

তিনি বলেন, এক ব্যক্তি বারা [রাদি.] –এর নিকট এসে বলিল, আপনারা কি হুনায়নের দিনে পলায়ন করেছিলেন? তখন তিনি বলিলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নবী [সাঃআঃ] পলায়ন করেননি। কিন্তু কিছু সংখ্যক চালাকচতুর হালকাপাতলা লোক হাওয়াযিন গোত্রের দিকে গিয়েছিল। আর তারা ছিল তীরন্দাজ সম্প্রদায়। তারা তাদের প্রতি তীর ছুঁড়লো, যেন সেগুলো পঙ্গপালের পায়ের মত। তখন তারা পিছন দিকে হটে গেল। আর লোকেরা রসূলুল্লাহ [সাঃআঃ] –এর কাছে এগিয়ে এলো। আবু সুফইয়ান ইবনি হারিস [রাদি.] তাহাঁর খচ্চর টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি অবতরণ করিলেন এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়ে দুআ করিলেন এবং তিনি বললেনঃ আমি অবশ্যই আল্লাহর নবী, এ কথা মিথ্যে নয়। আমি ইবনি আবদুল মুত্তালিব। “ইয়া আল্লাহ্‌! আপনার সাহায্য অবতীর্ণ করুন”।

বারা [রাদি.] বলিলেন, আল্লাহর কসম! যুদ্ধের উত্তেজনা যখন ঘোরতর হয়ে উঠত, তখন আমরা তাহাঁর মাধ্যমে আত্মরক্ষা করতাম। নিশ্চয়ই আমাদের মাঝে বীরপুরুষ তিনিই যাঁকে যুদ্ধে তাহাঁর সামনে রাখা হয়, অর্থাৎ- নবী [সাঃআঃ]। [ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৪৬৫, ইসলামিক সেন্টার- ৪৪৬৭]

৪৫০৯

আবু ইসহাক [রহমাতুল্লাহি আলাইহি] হইতে বর্ণীতঃ

তিনি বলেন, আমি বারা [রাদি.]–এর কাছে শুনেছি, বানী কায়সের এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল, আপনারা কি হুনায়নের দিন রসূলুল্লাহ [সাঃআঃ] থেকে পলায়ন করেছিলেন? তখন বারা [রাদি.] বলিলেন, রসূলুল্লাহ [সাঃআঃ] অবশ্য পলায়ন করেননি। [তবে ব্যাপার এই ছিল যে,] হাওয়াযিন গোত্রের লোকেরা দক্ষ তীরন্দাজ ছিল। আমরা যখন তাদের উপর আক্রমণ করলাম তখন তারা পলায়ন করিল। এমন সময় আমরা গনীমাতের মালের দিকে ঝুঁকে পড়লাম। তখন তারা ফিরে এসে আমাদের উপর অতর্কিতে তীর ছুঁড়তে শুরু করিল। আমি রসূলুল্লাহ [সাঃআঃ] –কে তাহাঁর সাদা বর্ণের খচ্চরের উপর দেখিতে পেলাম। আর আবু সুফইয়ান ইবনি হারিস [রাদি.] খচ্চরের লাগাম ধরে রেখেছিলেন। আর নবী [সাঃআঃ] বলেছিলেনঃ “আমি অবশ্যই নবী, এ কথা মিথ্যে নয়। আমি ইবনি আবদুল মুত্তালিব”। [ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৪৬৬, ইসলামিক সেন্টার- ৪৪৬৮]

৪৫১০

বারা [রাদি.] হইতে বর্ণীতঃ

তিনি বলেন, তাঁকে এক ব্যক্তি বলিল, হে আবু উমারাহ! …. তারপর অবশিষ্ট হাদীস বর্ণনা করেন। এ হাদীস ছিল তাঁদের বর্ণিত হাদীস থেকে সংক্ষিপ্ত। আর তাঁদের হাদীস ছিল পূর্ণ। [ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৪৬৭, ইসলামিক সেন্টার- ৪৪৬৯]

৪৫১১

সালামাহ [রাদি.] হইতে বর্ণীতঃ

তিনি বলেন, আমরা হুনায়নের দিন রসূলুল্লাহ [সাঃআঃ] –এর সঙ্গে থেকে যুদ্ধ করেছি। যখন আমরা শত্রুদের সম্মুখীন হলাম, তখন এ পর্যায়ে আমি অগ্রসর হয়ে একটি টিলার উপর উঠলাম। তখন শত্রুদের এক ব্যক্তি আমার মুকাবিলায় অগ্রসর হলো। আমি একটি তীর নিক্ষেপ করলাম, তখন সে আমার থেকে আত্মগোপন করিল। আমি তখন বুঝতে পারিনি তার ব্যাপারটি কী হয়েছে। তারপর যখন শত্রুদলের প্রতি লক্ষ্য করলাম, তখন দেখিতে পেলাম যে, তারা অপর এক টিলায় আরোহণ করেছে। তারপর তারা এবং নবী [সাঃআঃ] –এর সাথীরা সামনা-সামনি হলো। তখন নবী [সাঃআঃ] –এর সাহাবাগণ পিছনে সরে পড়ল। আমি পরাজিত অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করলাম। তখন আমার পরিধানে ছিল দুটি চাদর। তন্মধ্যে একটি চাদর ছিল বাঁধা অবস্থায় এবং অপরটি ছিল খোলা। এক পর্যায়ে আমার লুঙ্গিটি খুলে গেল। তখন আমি সে দুটি একত্র করলাম এবং পরাজিত অবস্থায় রসূলুল্লাহ [সাঃআঃ] –এর কাছ দিয়ে গমন করলাম। আর তিনি তখন তাহাঁর সাদা রং-এর খচ্চরের উপর আরোহিত অবস্থায় ছিলেন। তখন রসূলুল্লাহ [সাঃআঃ] বলিলেন, ইবনিল আকওয়া সন্ত্রস্ত অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করেছে। এরপর শত্রুরা রসূলুল্লাহ [সাঃআঃ] –কে ঘিরে ফেললো। তখন তিনি স্বীয় খচ্চর থেকে অবতরণ করিলেন। তারপর এক মুষ্টি মাটি যমীন থেকে তুলে নিলেন। এরপর তাদের মুখমণ্ডলে তা নিক্ষেপ করিলেন এবং বলিলেন, তাদের মুখমণ্ডল বিকৃত হয়ে গেছে। এরপর তাদের সকল মানুষের দুচোখ-ই সে এক মুষ্টি মাটির ধূলায় ভরে গেল। তারা পশ্চাৎ দিকে পলায়ন করলো। আল্লাহ্‌ তাআলা এ দ্বারাই তাদেরকে পরাস্ত করিলেন। এরপর রসূলুল্লাহ [সাঃআঃ] গনীমাতের সম্পদ মুসলিমদের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন। [ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৪৬৮, ইসলামিক সেন্টার- ৪৪৭০]

By মুসলিম শরীফ

এখানে কুরআন শরীফ, তাফসীর, প্রায় ৫০,০০০ হাদীস, প্রাচীন ফিকাহ কিতাব ও এর সুচিপত্র প্রচার করা হয়েছে। প্রশ্ন/পরামর্শ/ ভুল সংশোধন/বই ক্রয় করতে চাইলে আপনার পছন্দের লেখার নিচে মন্তব্য (Comments) করুন। “আমার কথা পৌঁছিয়ে দাও, তা যদি এক আয়াতও হয়” -বুখারি ৩৪৬১। তাই এই পোস্ট টি উপরের Facebook বাটনে এ ক্লিক করে শেয়ার করুন অশেষ সাওয়াব হাসিল করুন

Leave a Reply