সুন্নাত পরিত্যাগ ও বিদআত চর্চার প্রতি ভীতি প্রদর্শণ

সুন্নাত পরিত্যাগ

<< সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব হাদীস বই এর মুল সুচিপত্র 

পরিচ্ছেদঃ সুন্নাত পরিত্যাগ ও বিদআত চর্চার প্রতি ভীতি প্রদর্শণ

আত তারগীব ওয়াত তারহীব – ৪৯ – আয়েশা [রাঃআঃ] হতে বর্ণিতঃ

তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এরশাদ করেনঃ
“যে ব্যক্তি আমার এই দ্বীনের মাঝে নতুন কিছু সৃষ্টি করিবে যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে তা প্রত্যাখ্যাত বা অগ্রহণ যোগ্য।”

[হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন বুখারী, মুসলিম ও ইবনি মাজাহ]
আবু দাউদের বর্ণনায় বলা হয়েছেঃ “আমার নিদের্শ ব্যতিরেকে যে ব্যক্তি কোন কর্ম সম্পাদন করিবে, তবে উহা প্রত্যাখ্যাত।”
মুসলিমের অপর বর্ণনায় বলা হয়েছেঃ “যে ব্যক্তি এমন কোন আমল করিল, যে ব্যাপারে আমার নির্দেশ নেই, তবে উহা প্রত্যাখ্যাত।” হাদিসের তাহকিকঃসহীহ হাদীস

আত তারগীব ওয়াত তারহীবঃ ৫০ – জাবের [রাঃআঃ] হতে বর্ণিতঃ

তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] যখন খুতবা দিতেন তখন তার চক্ষুযুগল লালবর্ণ ধারণ করত। কণ্ঠস্বর উচু হত এবং ক্ৰোধ কঠিন আকার ধারণ করত। দেখে মনে হত তিনি কোন সৈন্য বাহিনীকে সতর্কবানী শুনাচ্ছেন। বলিতে নঃ সকালে বা বিকালে শত্রুর আক্রমন থেকে তোমরা সতর্ক হও। আর বলিতে নঃ এমন সময় আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে যখন আমি এবং কিয়ামত এরূপ। একথা বলে তিনি স্বীয় তর্জনী ও মধ্যমাকে একত্রিত করিতেন।
তিনি আরো বলিতে নঃ “অতঃপর, সর্বোত্তম বাণী হল আল্লাহর কিতাব। সর্বোত্তম হেদায়াত হল মুহাম্মাদের হেদায়াত। সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যাপার হল এর মাঝে নতুন কিছু সৃষ্টি করা। আর প্রত্যেক বিদআতই ভ্ৰষ্টতা। অতঃপর বলিতে নঃ প্রত্যেক মুমিনের নিজ প্রাণের চেয়ে আমি তার অধিক নিকটবর্তী বন্ধু। যে ব্যক্তি কোন সম্পদ রেখে মৃত্যু বরণ করিবে সে সম্পদ তার উত্তরাধিকারদের জন্য হইবে। আর যে ব্যক্তি কোন ঋণ বা সন্তান ছেড়ে যাবে, সে ঋণ আমিই পরিশোধ করব, সে সন্তানদের ভরণ-পোষণ আমারই দায়িত্বে।”

[মুসলিম, ইবনু মাজাহ প্রমুখ হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন] হাদিসের তাহকিকঃসহীহ হাদীস

আত তারগীব ওয়াত তারহীবঃ ৫১ – মুআবিয়া [রাঃআঃ] হতে বর্ণিতঃ

তিনি বলেনঃ একদা রাসূলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] আমাদের মাঝে দন্ডায়মান হলেন, অতঃপর বললেনঃ “জেনে রেখো! তোমাদের পূর্ব যুগের আহলে কিতাবগণ বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছিল। নিঃসন্দেহে এই উম্মত অচিরেই তেহাত্তর দলে বিভক্ত হইবে। তন্মধ্যে বাহাত্তর দলই জাহান্নামে যাবে, আর একটি মাত্র দল যাবে জান্নাতে, সে দলটি হল জামাআত। [১]

[হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন আহমাদ ও আবু দাউদ]
অন্য বর্ণনায় আবু দাউদ বৃদ্ধি করেছেনঃ
“এবং অচিরেই আমার উম্মতের মধ্যে কতিপয় দল বের হইবে। কুকুরের দংশনে কালাব [২] নামক একধরণের রোগের জীবানু যেমন রোগীর সমস্ত শরীর প্রবাহিত হয় তেমনি প্রবৃত্তি তাহাদের মধ্যে প্রবাহিত হইবে। তার কোন শিরা-উপশিরা বা কোন জোড়া অবশিষ্ট থাকিবে না।

[১] শায়খ আলবানী বলেনঃ অর্থাৎ সাহাবীদের জামা আত- যেমনটি কতিপয় বর্ণনায় পাওয়া যায়। অপর বর্ণনায় সে দলটির পরিচয় বলা হয়েছে আমি এবং আমার সাহাবীগণ যে মতাদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত আছি তার অনুসরন কারীগণ উক্ত দলের অন্তর্ভুক্ত। [তিরমিয়ী] জানা আবশ্যক যে, সাহাবায়ে কেরাম যে নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন, তাঁদের সেই নীতিকে আঁকড়ে ধরাই হচ্ছে একক নিরাপত্তা, ডানে-বামে বিভ্রান্তির পথ থেকে বাঁচার ক্ষেত্রে। বর্তমানে বিভ্রান্ত ফির্কা সমূহ তো অবশ্যই অনেক ইসলামী দলও এই নীতি থেকে উদাসীন অবস্থায় আছে।

[২] রোগটিকে ইংরেজীতে বলা হয় [Hydrophobia]। ইমাম খাত্তাবী বলেন, কালাব হচ্ছে মানুষকে পাগলা কুকুরের দংশনের ফলে সৃষ্ট এক প্রকার রোগের নাম। যার লক্ষণ হচ্ছে, কুকুরের চোখ লাল হয়ে থাকিবে, দু`পায়ের মধ্যে লেজ ঢুকিয়ে রাখবে। অতঃপর কোন মানুষ দেখলেই তাকে দংশন করার জন্য তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। হাদিসের তাহকিকঃহাসান সহীহ

আত তারগীব ওয়াত তারহীবঃ ৫২ -আবু বারযাহ [রাঃআঃ] হতে বর্ণিতঃ

তিনি নবী [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “নিশ্চয় আমি তোমাদের উপর যা আশংকা করছি তা হচ্ছে, পেটের ব্যাপারে এবং যৌনাঙ্গের বিষয়ে লোভে পড়ে পথভ্রষ্ট হওয়া এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করে বিভ্রান্ত হওয়া।”

[হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন আহমদ, ত্বাবরানী ও বাযযার] হাদিসের তাহকিকঃসহীহ হাদীস

আত তারগীব ওয়াত তারহীবঃ ৫৩ – আনাস [রাঃআঃ] হতে বর্ণিতঃ

রাসূলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বলেছেনঃ “আর ধ্বংসকারী বিষয় সমূহ হলঃ অনুগত লোভ, অনুসৃত প্রবৃত্তি এবং মানুষের নিজেকে নিয়ে অহংকার বা [আত্মগরিমা]।”

[বাযযার, বায়হাকী প্রমুখ হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন] হাদিসের তাহকিকঃহাসান লিগাইরিহি

আত তারগীব ওয়াত তারহীবঃ ৫৪ – আনাস বিন মালেক [রাঃআঃ] হতে বর্ণিতঃ

তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বলেছেনঃ “আল্লাহ তা`আলা বিদআতকারীর তওবায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রাখেন যতক্ষণ না সে তার বিদআত পরিত্যাগ না করে।”

[ত্বাবরানী হাসান সনদে হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন] হাদিসের তাহকিকঃসহীহ হাদীস

আত তারগীব ওয়াত তারহীবঃ ৫৫ – এরবায বিন সারিয়া [রাঃআঃ] হতে বর্ণিতঃ

তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বলেছেনঃ “[ধর্মের মাঝে] নতুন কিছু সৃষ্টি করা থেকে তোমরা সাবধান! কেননা প্রত্যেক নতুন সৃষ্টি পথভ্রষ্টতা।”

[আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনু মাজাহ, ইবনু হিব্বান হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন] হাদিসের তাহকিকঃসহীহ হাদীস

আত তারগীব ওয়াত তারহীবঃ ৫৬ – আবদুল্লাহ বিন আমর [রাঃআঃ] হতে বর্ণিতঃ

তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এরশাদ করেনঃ “প্রতিটি কর্মের একটি উৎসাহ-উদ্দীপনা থাকে। আর সে উদ্দীপনার মধ্যে অবসন্নতা এবং বিরতী আসে। সুতরাং সুন্নাত পর্যন্ত গিয়ে যার বিরতী ঘটে সেই সঠিক পথপ্ৰাপ্ত হয়। আর যার বিরতী হয় অন্য কিছুতে সে নিশ্চিতভাবে ধ্বংস প্রাপ্ত।”

[ইবনু আবী আছেম ও ইবনু হিব্বান হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন।] [১] [১] শায়খ আলবানী বলেন, হাদীছটি আরো বর্ণনা করিয়াছেন, ইমাম আহমাদ ও ত্বাহাভী দু`টি বিশুদ্ধ সনদে । হাদিসের তাহকিকঃসহীহ হাদীস

আত তারগীব ওয়াত তারহীবঃ ৫৭ – উক্ত হাদীছটি তিরমিযী এবং ইবনু হিব্বানও আবু হুরায়রা [রাঃআঃ] হতে বর্ণিতঃ

নবী [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বলেনঃ “প্রতিটি কর্মের একটি উৎসাহ-উদ্দীপনা থাকে। আর সে উদ্দীপনার মধ্যে আসে অবসন্নতা এবং বিরতী। উদ্দোমশীল সেই ব্যক্তি যদি মধ্যম পন্থা অবলম্বন করে এবং বাড়াবাড়ি ও শিথীলতা করে সঠিকভাবে আমল করে, তবে আমি তার সফলতার আশা করিতে পারি। আর যদি তার দিকে আঙ্গুল দিয়ে ইঙ্গিত করা হয়। [১] তবে তাকে সৎ ব্যক্তির মধ্যে গণ্য করিও না।”

[১] অর্থাৎ- ইবাদতে খুব প্রচষ্টা চালায়, আমলের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে, যাতে করে সমাজে আবেদ ও যাহেদরূপে পরিচিতি লাভ করে, ফলে লোকেরা তার দিকে আঙ্গুল দিয়ে ইঙ্গিত করে- উমুক ব্যক্তি এরূপ এরূপ। তবে তাকে সৎ লোক হিসেবে গণনা করা যায় না। কেননা তার আমল লোক দেখানো ও পরিচিতি লাভের জন্য। [দ্রঃ তোহফাতুল আহওয়াযী ২৩৭৭ নং হাদীছের ব্যাখ্যা] হাদিসের তাহকিকঃসহীহ হাদীস

আত তারগীব ওয়াত তারহীবঃ ৫৮ – আনাস [রাঃআঃ] হতে বর্ণিতঃ

তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আমার সুন্নত থেকে বিমুখ হল, সে আমার [উম্মতের] অন্তর্ভুক্ত নয়।”

[মুসলিম হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন] শায়খ আলবানী বলেন, হাদীছটি আরো বর্ণনা করিয়াছেন বুখারী ও নাসাঈ. হাদিসের তাহকিকঃসহীহ হাদীস

আত তারগীব ওয়াত তারহীবঃ ৫৯ – এরবায বিন সারিয়া [রাঃআঃ] হতে বর্ণিতঃ

তিনি রাসূলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] কে একথা বলিতে  শুনেছেনঃ “আমি তোমাদেরকে ছেড়ে যাচ্ছি [এমন দ্বীন ও সুস্পষ্ট প্রমাণের উপর] যার শুভ্রতা ও উজ্জলতা এত স্বচ্ছ, যার রাতও দিনের ন্যায় পরিস্কার।[১] ধ্বংশপ্রাপ্ত ব্যক্তি ছাড়া এ থেকে কেউ বক্রপথে চলে না।”

[ইবনু আবী আসেম কিতাবুস সুন্নাহ গ্রন্থে হাসান সনদে বর্ণনা করেন।]
[শায়খ আলবানী বলেন, হাদীছটি আরো বর্ণনা করিয়াছেন ইমাম আহমদ, ইবনু মাজাহ ও হাকেম] [১] অর্থাৎ- ধর্মের সকল বিষয় সুস্পষ্ট ও প্রমাণ ভিত্তিক, এতে কোনরূপ অস্বচ্ছতা ও সংশয় নেই। এতে সংশয় সৃষ্টি করার অবস্থা তা নিরসন ও প্রতিহত করার মতই। এদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে “যার রাতও দিনের ন্যায় পরিস্কার` বলে। হাদিসের তাহকিকঃসহীহ হাদীস

আত তারগীব ওয়াত তারহীবঃ ৬০ – আমর বিন যারারাহ হতে বর্ণিতঃ

তিনি বলেনঃ আমি কিচ্ছা কাহিনী বয়ান করছিলাম। এসময় আবদুল্লাহ বিন মাসউদ আমার সামনে দন্ডায়মান হলেন, অতঃপর বললেনঃ হে আমর! অবশ্যই তুমি পথভ্ৰষ্ট বিদআত আবিস্কার করেছ, অথবা তুমি মুহাম্মাদ [সাঃ] ও তাহাঁর সাহাবীদের থেকে অধিক হেদায়াত প্রাপ্ত হয়ে গেছ! তিনি বলেন, আমি দেখলাম [একথা শুনে] শ্রোতারা সবাই আমার সামনে থেকে সরে গেল। এমনকি একজনও রইল না।

[ত্বাবরানী কবীর গ্রন্থে এবং দারেমী এ হাদীছটির অনুরূপ আরো পূর্ণরূপে হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন।] হাদিসের তাহকিকঃসহীহ হাদীস

Leave a Reply