সালাতের নিয়ম কানুন

সালাতের নিয়ম কানুন

সালাতের নিয়ম কানুন >> মিশকাতুল মাসাবীহ এর মুল সুচিপত্র দেখুন

পর্বঃ ৪, অধ্যায়ঃ ১০

  • অধ্যায়ঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ
  • অধ্যায়ঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
  • অধ্যায়ঃ ১০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ

অধ্যায়ঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ

৭৯০. আবু হুরাইরাহ [রাদি.] হইতে বর্ণীতঃ

তিনি বলেন, এক ব্যক্তি মাসজিদে প্রবেশ করে সলাত [সালাত/নামায/সলাত] আদায় করলো। রাসূলুল্লাহ সাঃআঃ তখন মাসজিদের এক কোণে বসা ছিলেন। এরপর লোকটি রাসূলুল্লাহ সাঃআঃ-এর নিকট এসে তাঁকে সালাম জানালো। তিনি [সাঃআঃ] তাকে বললেন, ওয়া আলায়কাস্ সালা-ম; যাও, আবার সলাত আদায় কর। তোমার সলাত হয়নি। সে আবার গেল ও সলাত আদায় করলো। আবার এসে রাসূলুল্লাহ সাঃআঃ-কে সালাম করলো। তিনি উত্তরে বললেন, ওয়া আলায়কাস্ সালা-ম; আবার যাও, পুনরায় সলাত আদায় কর। তোমার সলাত হয়নি। এরপর তৃতীয়বার কিংবা এর পরের বার লোকটি বললো, হে আল্লাহর রসূল! আমাকে শিখিয়ে দিন। তখন তিনি [সাঃআঃ] বললেন, তুমি যখন সলাত [সালাত/নামায/সলাত] আদায় করিতে ইচ্ছা করিবে [প্রথম] ভালোভাবে উযূ [ওযু/ওজু/অজু] করিবে। এরপর ক্বিবলার দিকে দাঁড়িয়ে তাকবীর তাহরীমা বলবে। তারপর কুরআন থেকে যা পড়া তোমার পক্ষে সহজ হয় তা পড়বে। তারপর রুকূ করিবে। রুকূতে প্রশান্তির সাথে থাকিবে। এরপর মাথা উঠাবে। সোজা হয়ে দাঁড়াবে। অতঃপর সাজদাহ্ [সিজদা/সেজদা] করিবে। সাজদাতে স্থির থাকিবে। তারপর মাথা উঠিয়ে স্থির হয়ে থাকিবে। এরপর দ্বিতীয় সাজদাহ্ [সিজদা/সেজদা] করিবে। সাজদায় স্থির থাকিবে। আবার মাথা উঠিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াবে। এভাবে তুমি তোমার সব সলাত আদায় করিবে। ম]{১}

{১} সহীহ : বোখারী ৬২৫১, ৬৬৬৭, মুসলিম ৩৯৭, আবু দাউদ ৮৫৬, নাসায়ী ৮৮৪, তিরমিজি ৩০৩, আহমাদ ৯৬৩৫, সহীহ ইবনি হিব্বান ১৮৯০। সালাতের নিয়ম কানুন -এই হাদিসটির তাহকীকঃ সহীহ হাদিস

৭৯১. আয়িশাহ্ [রাদি.] হইতে বর্ণীতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাঃআঃ তাকবীর ও ক্বিরাআত [কিরআত] আলহামদু লিল্লা-হি রব্বিল আ-লামীন দ্বারা সলাত [সালাত/নামায/সলাত] শুরু করিতেন। তিনি যখন রুকূ করিতেন মাথা খুব উপরেও করিতেন না, আবার বেশী নীচুও করিতেন না, মাঝামাঝি রাখতেন। রুকূ হইতে মাথা উঠিয়ে সোজা হয়ে না দাঁড়িয়ে সাজদায় যেতেন না। আবার সাজদাহ্ [সিজদা/সেজদা] হইতে মাথা উঠিয়ে সোজা হয়ে না বসে দ্বিতীয় সাজদায় যেতেন না। প্রত্যেক দু রাক্আতের পরই বসে আত্তাহিয়্যাতু পড়তেন। বসার সময় তিনি তাহাঁর বাম পা বিছিয়ে দিতেন। ডান পা খাড়া রাখতেন। শায়ত্বনের [শয়তানের] মতো কুকুর বসা বসতে নিষেধ করিতেন। সাজদায় পশুর মতো মাটিতে দু হাত বিছিয়ে দিতেও নিষেধ করিতেন। নবী সাঃআঃ সলাত [সালাত/নামায/সলাত] শেষ করিতেন সালামের মাধ্যমে। {১}

{১} সহীহ : মুসলিম ৪৯৭, আবু দাউদ ৭৮৩, ইবনি মাজাহ ৮৬৯, আহমাদ ২৪০৩০, ইরওয়া ৩১৬। সালাতের নিয়ম কানুন -এই হাদিসটির তাহকীকঃ সহীহ হাদিস

৭৯২. আবু হুমায়দ আস্ সাইদী [রাদি.] হইতে বর্ণীতঃ

তিনি রাসূলুল্লাহ সাঃআঃ-এর একদল সাহাবীর মধ্যে বললেন, রাসূলুল্লাহ সাঃআঃ-এর সলাত [সালাত/নামায/সলাত] আপনাদের চেয়ে বেশি আমি মনে রেখেছি। আমি তাঁকে দেখেছি, তিনি তাকবীরে তাহরীমা বলার সময় দু্ হাত দু কাঁধ বরাবর উঠাতেন। রুকূ করার সময় পিঠ নুইয়ে রেখে দু হাত দিয়ে দু হাঁটু শক্ত করে ধরতেন। আর মাথা উঠিয়ে ঠিক সোজা হয়ে দাঁড়াতেন। এতে প্রতিটি গ্রন্থি স্ব-স্ব স্থানে চলে যেত। তারপর তিনি সাজদাহ্ [সিজদা/সেজদা] করিতেন। এ সময় হাত দুটি মাটির সাথে বিছিয়েও রাখতেন না, আবার পাঁজরের সাথে মিশাতেনও না এবং দু পায়ের আঙ্গুলগুলোর মাথা ক্বিবলামুখী করে রাখতেন। এরপর দু রাক্আতের পরে যখন বসতেন বাম পায়ের উপরে বসতেন ডান পা খাড়া রাখতেন। সর্বশেষ রাক্আতে বাম পা বাড়িয়ে দিয়ে আর অপর পা খাড়া রেখে নিতম্বের উপর [ভর করে] বসতেন।]{১}

{১} সহীহ : বোখারী ৮২৮, ইরওয়া ৩৬৪। সালাতের নিয়ম কানুন -এই হাদিসটির তাহকীকঃ সহীহ হাদিস

৭৯৩. উমার [রাদি.] হইতে বর্ণীতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাঃআঃ সলাত [সালাত/নামায/সলাত] শুরু করার সময় দু হাত কাঁধ পর্যন্ত উঠাতেন। আবার রুকূতে যাবার তাকবীরে ও রুকূ হইতে উঠার সময় সামিআল্লা-হু লিমান হামিদাহ, রব্বানা- ওয়ালাকাল হামদু বলেও দু হাত একইভাবে উঠাতেন। কিন্তু সাজদার সময় এরূপ করিতেন না। {১}

{১} সহীহ : বোখারী ৭৩৫, নাসায়ী ১০৫৯, সহীহ ইবনি হিব্বান ১৮৬১, দারিমি ১২৮৫। সালাতের নিয়ম কানুন -এই হাদিসটির তাহকীকঃ সহীহ হাদিস

৭৯৪. নাফি [রাহিমাহুল্লাহ] হইতে বর্ণীতঃ

তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনি উমার [রাদি.] সলাত [সালাত/নামায/সলাত] আদায় শুরু করিতে তাকবীরে তাহরীমা বলিতেন এবং দু হাত উপরে উঠাতেন। রুকূ হইতে উঠার সময়

سَمِعَ اللّهُ لِمَنْ حَمِدَه

সামিআল্লা-হু লিমান হামিদাহ বলার সময়ও দুই হাত উঠাতেন। এরপর দু রাক্আত আদায় করে দাঁড়াবার সময়ও দু হাত উপরে উঠাতেন। ইবনি উমার [রাদি.] এসব কাজ রাসূলুল্লাহ সাঃআঃ করিয়াছেন বলে জানিয়েছেন।{১}

{১} সহীহ : বোখারী ৭৩৯, আবু দাউদ ৭৪১, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২৮১৪। সালাতের নিয়ম কানুন -এই হাদিসটির তাহকীকঃ সহীহ হাদিস

৭৯৫. মালিক ইবনি হুওয়াইরিস [রাদি.] হইতে বর্ণীতঃ

তিনি বলেন, নবী সাঃআঃ তাকবীরে তাহরীমা বলার সময় তাহাঁর দু হাত তাহাঁর দু কান পর্যন্ত উপরে উঠাতেন। আর রুকূ হইতে মাথা উঠাবার সময়

سَمِعَ اللّهُ لِمَنْ حَمِدَه

সামিআল্লা-হু লিমান হামিদাহ বলেও এরূপ করিতেন। আর এক বর্ণনায় আছে, এমনকি তাহাঁর দু হাত তাহাঁর দু কানের লতি পর্যন্ত উঠাতেন। {১}

{১} সহীহ : বোখারী ৭৩৭, মুসলিম ৩৯১, ইবনি মাজাহ ৮৫৯, আহমাদ ২০৫৩৫, দারিমি ১২৮৬, ইরওয়া ৩৫১। তবে দ্বিতীয় বর্ণনাটি শুধুমাত্র মুসলিমে রয়েছে বোখারীতে নেই। সালাতের নিয়ম কানুন -এই হাদিসটির তাহকীকঃ সহীহ হাদিস

৭৯৬. মালিক ইবনি হুওয়াইরিস [রাদি.] হইতে বর্ণীতঃ

তিনি নবী সাঃআঃ-কে সলাত [সালাত/নামায/সলাত] আদায় করিতে দেখেছেন। নবী সাঃআঃ বেজোড় রাক্আতে সাজদাহ্ [সিজদা/সেজদা] হইতে উঠে দাঁড়াবার আগে কিছুক্ষণ সোজা হয়ে বসতেন। {১}

{১} সহীহ : বোখারী ৮২৩, আবু দাউদ ৮৪৪, নাসায়ী ১১৫২, তিরমিজি ২৮৭, সহীহ ইবনি হিব্বান ১৯৩৪, সহীহ আল জামি ৪৭৭৩। সালাতের নিয়ম কানুন -এই হাদিসটির তাহকীকঃ সহীহ হাদিস

৭৯৭. ওয়ায়িল ইবনি হূজর [রাদি.] হইতে বর্ণীতঃ

নবী [সাঃআঃ ]-কে দেখেছেন যে, তিনি [সাঃআঃ] সলাত শুরু করার সময় দুহাত উঠিয়ে তাকবীর বললেন। এরপর হাত কাপরের ভিতর ঢেকে নিলেন এবং ডান হাত বাম হাতের উপর রাখলেন। তারপর রুকুতে যাবার সময় দুহাত বের করে উপরের দিকে উঠালেন ও তাকবীর বলে রুকুতে গেলেন। রুকু হইতে উঠার সময়

سَمِعَ اللّهُ لِمَنْ حَمِدَه

“সামিআল্লাহ-হু লিমান হামিদাহ” বলে আবার দু হাত উপরে উঠালেন। তারপর দুহাতের মাঝে মাথা রেখে সাজদাহ করিলেন। {১}

{১} সহীহ : মুসলিম ৪০১, আহমাদ ১৮৮৬৬, ইরওয়া ৩৫২, সহীহ ইবনি খুযাইমাহ্ ৯০৬। তিনি ডান হাত বাম হাতের উপর নিয়ে তা বক্ষের উপর রাখতেন মর্মে হাদিস সহীহ ইবনি খুযায়মাতে রয়েছে। সালাতের নিয়ম কানুন -এই হাদিসটির তাহকীকঃ সহীহ হাদিস

৭৯৮. সাহল ইবনি সাদ [রাদি.] হইতে বর্ণীতঃ

তিনি বলেন, মানুষদেরকে হুকুম দেয়া হতো সলাত আদায়কারী যেন সলাতে তার ডান হাত বাম যিরা-এর উপর রাখে। {১}

{১} সহীহ : বোখারী ৭৪০, আহমাদ ২২৮৪৯, সুনানুল কুবরা লি বায়হাক্বী ২৩২৬। আলবানী [রাহিমাহুল্লাহ] বলেনঃ আবু দাউদ, নাসায়ীতে বর্ণিত ওয়ায়িল ইবনি হূজর-এর হাদীসে রয়েছে তিনি [রসূল সাঃআঃ] তাহাঁর ডান হাত বাম হাতের কাফ, রুযগ ও সায়দ বা হাতের আঙ্গুল থেকে কনুই পর্যন্ত পুরো হাতের উপর রাখতেন। আর পদ্ধতির দাবী হলো হাতটি বুকের উপর বাঁধতে হবে অন্য কোথাও এভাবে বাঁধা যাবে না। আর একটি বিষয় জানা জরুরী যে, রসূল সাঃআঃ থেকে বক্ষ ব্যতীত অন্য কোথাও হাত বাঁধার কোন সহীহ প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে নাভীর নিচে হাত বাধার ব্যাপারে যে বর্ণনাটি এসেছে তা দুর্বল। সালাতের নিয়ম কানুন -এই হাদিসটির তাহকীকঃ সহীহ হাদিস

৭৯৯. আবু হুরাইরাহ [রাদি.] হইতে বর্ণীতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ [সাঃআঃ] সলাত আদায় করার সময় দাঁড়িয়ে তাকবীরে তাহরীমা বলিতেন। আবার রুকুতে যাবার সময় তাকবীর বলিতেন। রুকু হইতে তাহাঁর পিঠ উঠাবার সময়

سَمِعَ اللّهُ لِمَنْ حَمِدَه

“সামিআল্লাহ-হু লিমান হামিদাহ” এবং দাঁড়ানো অবস্থায়

رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ 

“রব্বানা –লাকাল হাম্‌দ” বলিতেন। তারপর সাজদায় যাবার সময় আবার তাকবীর বলিতেন। সাজদাহ্ হইতে মাথা উঠাবার সময় তাকবীর বলিতেন। পুনরায় দ্বিতীয় সাজদায় যেতে তাকবীর বলিতেন, আবার সাজদাহ্ থেকে মাথা তোলার সময় তাকবীর বলিতেন। সলাত শেষ হওয়া পর্যন্ত গোটা সলাতে তিনি এরূপ করিতেন। যখন দুরাক্আত আদায় করার পর বসা হইতে উঠতেন তাকবীর বলিতেন। {১}

{১} সহীহ : বোখারী ৭৮৯, মুসলিম ৩৯২, নাসায়ী ১১৫০, আহমাদ ৯৮৫১, ইরওয়া ৩৩১। সালাতের নিয়ম কানুন -এই হাদিসটির তাহকীকঃ সহীহ হাদিস

৮০০. জাবির [রাদি.] হইতে বর্ণীতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ [সাঃআঃ] বলেছেনঃ সর্বোত্তম সলাত হল দীর্ঘ ক্বিয়াম [দাঁড়ানো] সম্বলিত সলাত। {১}

{১} সহীহ : মুসলিম ৭৫৬, তিরমিজি ৩৮৭, ইবনি মাজাহ ১৪২১, ইরওয়া ৪৫৮, সহীহ আল জামি ১১৮। সালাতের নিয়ম কানুন -এই হাদিসটির তাহকীকঃ সহীহ হাদিস

অধ্যায়ঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ

৮০১. আবু হুমায়দ আস্ সাইদী [রাদি.] হইতে বর্ণীতঃ

তিনি নবী [সাঃআঃ]-এর দশজন সাহাবীর উপস্থিতিতে বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ [সাঃআঃ]-এর সলাত সম্পর্কে আপনাদের চেয়ে বেশি জানি। তারা বললেন, তা আমাদেরকে বলুন। তিনি বললেন, তিনি সলাতের জন্য দাঁড়ালে দুহাত উঠাতেন। এমনকি তা দুকাধঁ বরাবর উপরে তুলতেন। তারপর তাকবীর বলিতেন। এরপর “ক্বিরাআত” পাঠ করিতেন। এরপর রুকুতে যেতেন। দুহাতের তালু দুহাটুর উপর রাখতেন। পিঠ সোজা রাখতেন। অর্থাৎ মাথা নীচের দিকেও ঝুকাতেন না আবার উপরের দিকেও উঠাতেন না। এরপর [রুকূ থেকে] মাথা উঠিয়ে বলিতেনঃ

سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَه

“সামিআল্লা-হু লিমান হামিদাহ”। তারপর সোজা হয়ে হাত উপরে উঠাতেন। এমনকি তা কাঁধ বরাবর করিতেন এবং বলিতেন,

الله اَكْبَرُ

“আল্লাহু-আকবার”। এরপর সাজদাহ্‌ করার জন্য জমিনের দিকে ঝুঁকতেন। সাজদার মধ্যে দুই হাতকে বাহু থেকে আলাদা করে রাখতেন। দুপায়ের আঙ্গুলগুলোকে ক্বিবলার দিকে ফিরিয়ে দিতেন। তারপর মাথা উঠাতেন। বাম পা বিছিয়ে দিয়ে এর উপর বসতেন। এরপর সোজা হয়ে থাকতেন। যাতে তাহাঁর সমস্ত হাড় নিজ নিজ জায়গায় এসে যায়।তারপর তিনি দাঁড়াতেন। দ্বিতীয় রাকআতও এভাবে আদায় করিতেন। দুরাক্আত আদায় করে দাঁড়াবার পর তাকবীর বলিতেন ও কাঁধ পর্যন্ত দুহাত উঠাতেন। যেভাবে প্রথম সলাত শুরু করার সময় করিতেন। এরপর তার বাকী সলাত এভাবে আদায় করিতেন। শেষ রাক্আতে শেষ সাজদার পর, যার পরে সালাম ফিরানো হয়, নিজের বাম পা ডান দিকে বের করে দিতেন এবং এর উপর বসতেন। তারপর সালাম ফিরাতেন। তারা বলেন, আপনি সত্য বলেছেন। রাসূলুল্লাহ [সাঃআঃ] এভাবেই সলাত আদায় করিতেন। {১} আর তিরমিজি ও ইবনি মাজাহ এ বর্ণনাটিকে এই অর্থে নকল করিয়াছেন। ঈমাম তিরমিজি বলেছেন, এ হাদিসটি হাসান ও সহীহ।

আবু দাঊদের আর এক বর্ণনায় আবু হুমায়দ এর হাদীসে আছে, নবী [সাঃআঃ] রুকু করিলেন। দুহাত দিয়ে দুহাটু আঁকড়ে মজবুত করে ধরলেন। এ সময় তাহাঁর দুহাত ধনুকের মত করে দু পাঁজর হইতে পৃথক রাখলেন। আবু হুমায়দ [রাদি.] আরও বলেন, এরপর তিনি সাজদাহ্‌ করিলেন। নাক ও কপাল মাটির সাথে ঠেকালেন। দুহাতকে পাঁজর হইতে পৃথক রাখলেন। দুহাত কাঁধ সমান জমিনে রাখলেন। দুউরুকে রাখেলন পেট থেকে আলাদা করে। এভাবে তিনি সাজদাহ্‌ করিলেন। তারপর ইনি বাম পা বিছিয়ে দিয়ে এর উপর বসলেন। ডান পায়ের সম্মুখ ভাগকে ক্বিবলার দিকে ফিরিয়ে দিলেন। ডান হাতের তালু ডান উরুর উপর এবং বাম হাতের তালু বাম উরুর উপর রাখলেন এবং শাহাদাত অঙ্গুলি দিয়ে ইশারা করিলেন। আবু দাউদ-এর আর এক বর্ণনায় আছে, তিনি দুই রাক্আতের পর বাম পায়ের পেটের উপর বসতেন। ডান পা রাখতেন খাঁড়া করে। তিনি চতুর্থ রাকআতে বাম নিতম্বকে জমিনে ঠেকাতেন, আর পা দুটিকে একদিক দিয়ে বের করে দিতেন [ডান দিকে]। {2]

{১} সহীহ : আবু দাউদ ৭৩০, ৯৬৩; দারিমী ১৩৯৬। তবে উরুদ্বয়ের মাঝে ফাঁকা রাখার বিষয়ে যে কথাটি এসেছে তা দুর্বল।{2] সহীহ : আবু দাউদ ৭৩১-৭৩৫। সালাতের নিয়ম কানুন -এই হাদিসটির তাহকীকঃ সহীহ হাদিস

৮০২. ওয়ায়িল ইবনি হূজর [রাদি.] হইতে বর্ণীতঃ

তিনি নবী [সাঃআঃ]-কে সলাত আদায় করার জন্য দাঁড়াবার সময় দেখেছেন। তিনি তার দু হাত কাঁধ বরাবর উপরে উঠালেন। দুহাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি দুটি কান পর্যন্ত উঠিয়ে আল্ল-হু আকবার বললেন। {১}আবু দাঊদের আরেক বর্ননায় আছে বৃদ্ধাঙ্গুলকে কানের লতি পর্যন্ত উঠালেন।{2]

{১} জইফ : আবু দাউদ ৭৩৪। কারণ এর সানাদে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। রাবীর উক্তি ثُمَّ كَبَّرَ মুনকার। কারণ সহীহ হাদীসে তাকবীর হাত উত্তোলনের পূর্বে বা সাথে সাথে হবে মর্মে রয়েছে। আর অপর বর্ণনাটিও জইফ। কারণ তার সানাদে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে।বিঃ দ্রঃ হাত উত্তোলনের সময় বৃদ্ধাঙ্গুলি দ্বারা কর্ণদ্বয়ের লতি স্পর্শ করার ব্যাপারে কোন হাদিস রসূল সাঃআঃ থেকে প্রমাণিত নেই। অতএব এরূপ করাটা বিদ্আত। সুন্নাত হলো দু হাতের তালুদ্বয় কর্ণ বা কাঁধ বরাবর করা।{2] জইফ : আবু দাউদ ৭৩৭। কারণ হাদিসের রাবী আবদুল জাব্বার তার ছেলে থেকে শ্রবণ করেননি। নাবাবী তাকে দুর্বল বলেছেন।এই হাদিসটির তাহকীকঃ দুর্বল হাদিস

৮০৩. ক্ববীসাহ্ ইবনি হুলব [রাহিমাহুল্লাহ] হইতে বর্ণীতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ [সাঃআঃ] আমাদের ঈমামতি করিতেন। তিনি [দাঁড়ানো অবস্থায়] বাম হাতকে ডান হাত দিয়ে ধরতেন। {১}

{১} হাসান সহীহ : তিরমিজি ২৫২, ইবনি মাজাহ ৮০৯। এই হাদিসটির তাহকীকঃ হাসান সহীহ

৮০৪. রিফাআহ্ ইবনি রাফি [রাদি.] হইতে বর্ণীতঃ

তিনি বলেন, এক ব্যক্তি মাসজিদে এসে সলাত আদায় করিল। তারপর নবী [সাঃআঃ]-এর নিকট এসে তাঁকে সালাম জানালেন। নবী [সাঃআঃ] সালামের উত্তর দিয়ে বললেন, তুমি আবার সলাত আদায় কর। তোমার সলাত হয়নি। লোকটি বলিল, হে আল্লাহর রাসূল! কিভাবে সলাত আদায় করব তা আমাকে শিখিয়ে দিন। নবী [সাঃআঃ] বললেন, তুমি ক্বিবলামুখি হয়ে প্রথমে তাকবীর বলবে। তারপর সূরাহ্‌ ফাতিহা পাঠ করিবে। এর সাথে আর যা পার [ক্বুরআন থেকে] পড়ে নিবে। তারপর রুকু করিবে। [রুকুতে] তোমার দু হাতের তালু তোমার দু হাটুর উপর রাখবে। রুকুতে প্রশান্তিতে থাকিবে এবং পিঠ সটান সোজা রাখবে। রুকু হইতে উঠে পিঠ সোজা করে মাথা তুলে দাঁড়াবে যাতে হাড়গুলো নিজ নিজ যায়গায় এসে যায়। তারপর সাজদাহ্ করিবে। সাজদায় প্রশান্তির সাথে থাকিবে। {৮২০]

[হাদিসের মুল পাঠ মাসাবীহ থেকে গৃহিত। এ হাদিসটি আবু দাউদ সামান্য শাব্দিক পার্থক্যসহ বর্ননা করিয়াছেন। তিরমিজি, নাসায়িও প্রায় অনুরূপ বর্ননা করিয়াছেন],তিরমিজির বর্ননায় আছে, নবী [সাঃআঃ] বলেছেন, সলাতের জন্য দাঁড়াতে ইচ্ছা করলে আল্লাহ যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন সেভাবে উযু করিবে। এরপর কালিমা শাহাদাত পাঠ করিবে। ইক্বামাত বলবে [সলাত শুরু করিবে]। তোমার ক্বুরআন জানা থাকলে তা পড়বে, অন্যথায় আল্লাহর হামদ, তাকবীর, তাহলীল করিবে। তারপর রুকু করিবে।{১}; {১} হাসান : আবু দাউদ ৮৫৯, ৮৬০, আহমাদ ১৮৫১৬, সহীহ আল জামি ৩২৪। {2] সহীহ : তিরমিজির অপর বর্ণনাটিও সহীহ। তিরমিজি ৩০২। তবে তিরমিজির বর্ণনাটি সহীহ-এর স্তরের।সালাতের নিয়ম কানুন -এই হাদিসটির তাহকীকঃ সহীহ হাদিস

৮০৫. ফাযল ইবনি আব্বাস [রাদি.] হইতে বর্ণীতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ [সাঃআঃ] বলেছেনঃ নাফল দু রাক্আত। প্রত্যেক দু রাক্আতেই তাশাহ্হুদ ভয়ভীতী ও বিনয় এবং দীনহীনতার ভাব আছে। তারপর তুমি তোমার দু হাত উঠাবে। ফাযল বলেন, নবী [সাঃআঃ] বলেছেন, “তুমি তোমার দু হাত তোমার রবের নিকট দুআর জন্য উঠাতে হাতের বুকের দিককে তোমার মুখের দিকে ফিরাবে। আর বারবার বলবে, হে আল্লাহ! অর্থাৎ দুআ বার বার করিবে। আর যে এভাবে করিবেনা তার সলাত এরূপ এরূপ। আর এক বর্ণনায় আছে, তার সলাত অসম্পূর্ন। {১}

{১} জইফ : তিরমিজি ৩৮৫, জইফ আত তারগীব ২৮২। ঈমাম তিরমিজি-এর সানাদটি বিশৃঙ্খলাপূর্ণ আর তাতে আবদুল্লাহ ইবনি নাফি ইবনি উমাইয়্যাহ্ রয়েছে যার বিশ্বস্ততা সম্পর্কে জানা যায় না। এই হাদিসটির তাহকীকঃ দুর্বল হাদিস

অধ্যায়ঃ ১০. তৃতীয় অনুচ্ছেদ

৮০৬. সাঈদ ইবনুল হারিস ইবনুল মুআল্লা [রাহিমাহুল্লাহ] হইতে বর্ণীতঃ

আবু সাঈদ আল খুদরী [রাদি.] আমাদের সলাত আদায় করালেন। তিনি সাজদাহ্ হইতে মাথা উঠাতে, সাজদায় যেতে ও দু রাক্আতের পর মাথা উঠাবার সময় উচ্চৈঃস্বরে তাকবীর বলিতেন। তারপর তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ [সাঃআঃ]-কে এভাবে সলাত আদায় করিতে দেখেছি। {১}

{১} সহীহ : বোখারী ৮২৫। সালাতের নিয়ম কানুন -এই হাদিসটির তাহকীকঃ সহীহ হাদিস

৮০৭. ইকরিমাহ্ [রাহিমাহুল্লাহ] হইতে বর্ণীতঃ

আমি মাক্কায় এক শায়খের পিছনে [আবু হুরায়রাহ্‌] সলাত আদায় করেছি। তিনি সলাতে মোট বাইশবার তাকবীর বলেন। আমি আবদুল্লাহ ইবনি আব্বাস [রাদি.] এর কাছে বললাম, [মনে হচ্ছে] এ লোকটি নির্বোধ। এ কথা শুনে ইবনি আব্বাস [রাদি.] বললেন, তোমার মা তোমাকে হারিয়ে ফেলুক, এটা তো আবুল কা-সিম [রাদি.] এর সুন্নাত। {১}

{১} সহীহ : বোখারী ৭৮৮, আহমাদ ২৬৫৬। সালাতের নিয়ম কানুন -এই হাদিসটির তাহকীকঃ সহীহ হাদিস

৮০৮. আলী ইবনি হুসায়ন [রাহিমাহুল্লাহ] হইতে বর্ণীতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ [সাঃআঃ] সলাতে রুকু ও সাজদায় এবং মাথা ঝুঁকাতে ও উঠাতে তাকবীর বলিতেন। আর তিনি আল্লাহর সাথে মিলিত হবার আগ পর্যন্ত সব সময় এভাবে সলাত আদায় করিয়াছেন। {১}

{১} সহীহ মুরসাল : মুয়াত্ত্বা মালিক ১৬৪, নাসায়ী ১১৫৫। আবু হুরাইরাহ [রাদি.] থেকে নাসায়ীতে এর হাদিসের একটি শাহিদ রিওয়ায়াত রয়েছে। এই হাদিসটির তাহকীকঃ অন্যান্য

৮০৯.আলকামাহ [রাহিমাহুল্লাহ] হইতে বর্ণীতঃ

তিনি বলেন, ইবনি মাসউদ [রাদি.] আমাদের বলেছেন, আমি কি তোমাদেরকে রাসূলুল্লাহ [সাঃআঃ]-এর মতো সলাত আদায় করাব? এরপর তিনি সলাত আদায় করালেন। অথচ প্রথম তাকবীরে একবার হাত উঠানো ছাড়া আর কোথাও হাত উঠাননি। {১} আবু দাউদ বলেন, এ হাদিসটি এই অর্থে সহীহ নয়।

{১} সহীহ : আবু দাউদ ৭৪৮, তিরমিজি ২৫৭, নাসায়ী ১০৫৮। সালাতের নিয়ম কানুন -এই হাদিসটির তাহকীকঃ সহীহ হাদিস

৮১০. আবু হুমায়দ আস্ সাইদী [রাহিমাহুল্লাহ] হইতে বর্ণীতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ [সাঃআঃ] সলাতের জন্য ক্বিবলামুখী হয়ে দাঁড়াতেন। হাত উপরে উঠিয়ে তিনি বলিতেন, আল্লা-হ আকবার। {১}

{১} সহীহ : ইবনি মাজাহ ৮০৩। সালাতের নিয়ম কানুন -এই হাদিসটির তাহকীকঃ সহীহ হাদিস

৮১১. আবু হুরাইরাহ [রাদি.] হইতে বর্ণীতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ [সাঃআঃ] আমাদের যুহরের সলাত আদায় করালেন। এক ব্যক্তি সর্বশেষ পিছনের সারিতে ছিল। সলাত খারাপভাবে আদায় করছিল। সে সলাতের সালাম ফিরাবার পর নবী [সাঃআঃ] তাকে ডাকলেন, ও বললেন, হে অমুক! তুমি কি আল্লাহকে ভয় করছ না? তুমি কি জান না তুমি কিভাবে সলাত আদায় করছ? তোমরা মনে কর, তোমরা যা কর তা আমি দেখি না। আল্লাহ্‌র কসম! নিশ্চয় আমি দেখি আমার পিছনের দিকে, যেভাবে আমি দেখি আমার সামনের দিকে। {১}

{১} সহীহ : মুসনাদে আহমাদ ৯৫০৪। যদিও এর সানাদে মুহাম্মাদ ইবনি ইসহক মুদাল্লিস রাবী রয়েছে যে আন্আনা সূত্রে হাদিস বর্ণনা করে, কিন্তু হাদিসটির সহীহ বোখারী মুসলিমে শাহিদ বর্ণনা রয়েছে। সালাতের নিয়ম কানুন -এই হাদিসটির তাহকীকঃ সহীহ হাদিস

By মুসলিম শরীফ

এখানে কুরআন শরীফ, তাফসীর, প্রায় ৫০,০০০ হাদীস, প্রাচীন ফিকাহ কিতাব ও এর সুচিপত্র প্রচার করা হয়েছে। প্রশ্ন/পরামর্শ/ ভুল সংশোধন/বই ক্রয় করতে চাইলে আপনার পছন্দের লেখার নিচে মন্তব্য (Comments) করুন। “আমার কথা পৌঁছিয়ে দাও, তা যদি এক আয়াতও হয়” -বুখারি ৩৪৬১। তাই এই পোস্ট টি উপরের Facebook বাটনে এ ক্লিক করে শেয়ার করুন অশেষ সাওয়াব হাসিল করুন

Leave a Reply