নাবী সাঃ এর বরকতে আল্লাহ যাদেরকে শিফা দান করেছেন

নাবী সাঃ এর বরকতে আল্লাহ যাদেরকে শিফা দান করেছেন

নাবী সাঃ এর বরকতে আল্লাহ যাদেরকে শিফা দান করেছেন  << নবুওয়তের মুজিযা হাদীসের মুল সুচিপত্র দেখুন

নবম পরিচ্ছেদ: নাবী সাঃ এর বরকতে আল্লাহ যাদেরকে শিফা দান করেছেন। বরকত মূলত আল্লাহর তরফ থেকে বা আল্লাহ তাতে বরকত দান করেছেন ও সৌন্দর্য করেছেন।

বারা ইবনু `আযিব রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুল্লাহ্ ইবনু আতীক রাদি. `আনহুকে আমীর বানিয়ে তার নেতৃত্বে আনসারদের কপিতয় সাহাবীকে ইয়াহূদী আবূ রাফির [হত্যার] উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। আবূ রাফি রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কষ্ট দিত এবং এ ব্যাপারে লোকদের সাহায্য করত। হিজায ভূমিতে তার একটি দুর্গ ছিল। [সে সেখানে বসবাস করত] তারা যখন তার দুর্গের কাছে গিয়ে পৌঁছলেন তখন সূর্য ডুবে গিয়েছে এবং লোকজন নিজেদের পশু পাল নিয়ে রওয়ানা হয়েছে [নিজ নিজ বাড়ীর দিকে] আবদুল্লাহ [ইবনু আতীক] রাদি. `আনহু তার সাথীদেরকে বলিলেন, তোমরা তোমাদের স্থানে বসে থাক। আমি চললাম ভিতরে প্রবেশ করার জন্য দ্বার রক্ষীর সাথে আমি [কিছু] কৌশল প্রদর্শন করব। এরপর তিনি সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে দরজার কাছে পৌঁছলেন এবং কাপড় দ্বারা নিজেকে এমনভাবে ঢাকলেন যেন তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজনে রত আছেন। তখন সবাই ভিতরে প্রবেশ করলে দ্বাররক্ষী তাকে ডেকে বলল, হে আবদুল্লাহ ভিতরে প্রবেশ করতে চাইলে প্রবেশ কর। আমি এখনই দরজা বন্ধ করে দেব। আমি তখন ভিতরে প্রবেশ করলাম এবং আত্মগোপন করে রইলাম। সকলে ভিতরে প্রবেশ করার পর সে দরজা বন্ধ করে দিল এবং একটি পেরেকের সাথে চাবিটা লটকিয়ে রাখল। [আবদুল্লাহ ইবনু আতীক রাদি. `আনহু বলেন] এরপর আমি চাবিটার দিকে এগিয়ে গেলাম এবং চাবিটা নিয়ে দরজা খুললাম। আবূ রাফির নিকট রাতের বেলা গল্পের আসর জমতো, এ সময় সে তার উপর তলায় কামরায় অবস্থান করছিল। গল্পের আসরে আগত লোকজন চলে গেলে, আমি সিঁড়ি বেয়ে তার কাছে গিয়ে পৌঁছলাম। এসময় আমি একটি করে দরজা খুলছিলাম এবং ভিতর থেকে তা আবার বন্ধ করে দিয়ে যাচ্ছিলাম, যাতে লোকজন আমার [আগমন] সম্বন্ধে জানতে পারলেও হত্যা না করা পর্যন্ত আমার নিকট পৌছতে না পারে। আমি তার কাছে গিয়ে পৌঁছলাম। এ সময় সে একটি অন্ধকার কক্ষে ছেলেমেয়েদের মাঝে শুয়েছিল। কক্ষের কোনো অংশে সে শুয়ে আছে আমি তা বুঝতে পারছিলাম না। তাই আবূ রাফি` বলে ডাক দিলাম। সে বলল, কে আমাকে ডাকছ? আমি তখন আওয়াজটি লক্ষ্য করে এগিয়ে গিয়ে তরবারী দ্বারা প্রচন্ড জোরে আঘাত করলাম। আমি তখন কাঁপছিলাম এ আঘাতে আমি তাকে কিছুই করতে পারলাম না। সে চীৎকার করে উঠলে আমি কিছুক্ষণের জন্য বাইরে চলে আসলাম। এরপর পুনরায় ঘরে প্রবেশ করে [কন্ঠস্বর পরিবর্তন করতঃ তার আপন লোকের ন্যায়] জিজ্ঞেস করলাম, আবূ রাফি` এ আওয়াজ হল কিসের? সে বলল, তোমার মায়ের সর্বনাশ হোক। কিছুক্ষণ পূর্বে ঘরের ভিতর কে যেন আমাকে তরবারি দ্বারা আঘাত করেছে। আবদুল্লাহ্ ইবনু `আতীক রাদি. `আনহু বলেন, তখন আমি আবার তাকে ভীষণ আঘাত করলাম এবং মারাত্মকভাবে ক্ষত বিক্ষত করে ফেললাম। কিন্তু তাকে হত্যা করতে পারিনি। তাই তরবারির ধারালো দিকটি তার পেটের উপর চেপে ধরলাম এবং পিঠ পার করে দিলাম। এবার আমি নিশ্চিতরূপে অনুভব করলাম যে, এখন আমি তাকে হত্যা করতে সক্ষম হয়েছি। এরপর আমি এক এক দরজা খুলে নিচে নামতে শুরু করলাম নামতে নামতে সিঁড়ির শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছলাম। পূর্ণিমার রাত্র ছিল। [চাঁদের আলোতে তাড়াহুড়ার মধ্যে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে না পেরে] আমি মনে করলাম, [সিঁড়ির সকল ধাপ অতিক্রম করে] আমি মাটির নিকটে এসে পড়েছি। [কিন্তু তখনও একটি ধাপ অবশিষ্ট ছিল] তাই নিচে পা রাখতেই আমি [আঁছাড় খেয়ে] পড়ে গেলাম। অমনিই আমার পায়ের গোছার হাড় ভেঙ্গে গেল। [তাড়াহুড়া করে] আমি আমার মাথার পাগড়ী দ্বারা পা খানা বেঁধে নিলাম এবং একটু হেঁটে গিয়ে দরজা সোজা বসে রইলাম মনে মনে সিদ্ধান্ত করলাম, তার মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত অবগত না হয়ে আজ রাতে আমি এখান থেকে যাব না। ভোর রাতে মোরগের ডাক আরম্ভ হলে মৃত্যু ঘোষণাকারী প্রাচীরে উপর উঠে ঘোষণা করল, হিজায অধিবাসীদের অন্যতম ব্যবসায়ী আবূ রাফীর মৃত্যু সংবাদ গ্রহণ কর। তখন আমি আমার সাথীদের নিকট গিয়ে বলিলাম, দ্রুত চল, আল্লাহ্ আবূ রাফিকে হত্যা করেছেন। এরপর নাবী সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গেলাম এবং সমস্ত ঘটনা খুলে বলিলাম। তিনি বলিলেন, তোমার পা টি লম্বা করে দাও। আমি আমার পা টি লম্বা করে দিলে তিনি উহার উপর স্বীয় হাত বুলিয়ে দিলেন। [এতে আমার পা এমন সুস্থ হয়ে গেল] যেন তাতে কোনো আঘাতই পায়নি।[1]

ইয়াযীদ ইবনু আবূ উবায়দ রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি সালমা [ইবনু আকওয়া] রাদি. `আনহুর পায়ের নলায় আঘাতের চিহ্ন দেখে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, সে আবূ মুসলিম! এ আঘাতটি কিসের? তিনি বলিলেন, এটি খাইবার যুদ্ধে প্রাপ্ত আঘাত। [যুদ্ধক্ষেত্রে আমাকে আঘাতটি মারার পর] লোকজন বলাবলি শুরু করে দিল যে, সালমা মারা যাবে। কিন্তু এরপর আমি নাবী রাঃসাঃ এর কাছে আসলাম। তিনি ক্ষতস্থানটিতে তিনবার ফুঁ দিয়ে দিলেন। ফলে আজ পর্যন্ত আমি এতে কোনো ব্যথা অনুভব করিনি।[2]

সা`দ ইবনু আবু ওয়াককাস রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত যে, মু`আবিয়া ইবনু আবু সুফিয়ান রাদি. `আনহু সা`দ রাদি. `আনহুকে আমীর বানালেন এবং বলিলেন, আপনি আলী রাদি. `আনহুকে কেন মন্দ বলেন না? সা`দ রাদি. `আনহু বলিলেন, রাঃসাঃ  তার সম্পর্কে যে তিনটি কথা বলিয়াছেন, তা মনে করে এ কারণে আমি কখনও তাকে মন্দ বলবো না। ওসব কথার মধ্য হতে যদি একটিও আমি লাভ করতে পারতাম তাহলে তা আমার জন্য নাল উটের চেয়েও বেশি ভালো হতো। রাঃসাঃ কে আলী রাদি. `আনহুর উদ্দেশ্যে বলতে শুনেছি, আলী রাদি. `আনহুকে কোনো যুদ্ধের সময় প্রতিনিধি বানিয়ে রেখে গেলে তিনি বলিলেন, মহিলা ও শিশুদের মাঝে আমাকে রেখে যাচ্ছে, ইয়া রাঃসাঃ ! তখন রাঃসাঃ  বলিলেন, তুমি কি এতে আনন্দবোধ কর না যে, আমার কাছে তোমার মর্যাদা মুসা আলাইহিস সালামের কাছে হারুন আলাইহিস সালামের মতো। এ কথা ভিন্ন যে, আমার পর আর কোনো নাবী নেই! খায়বারের যুদ্ধের দিন রাঃসাঃ  এরকে আমি বলতে শুনেছি, আমি এমন এক ব্যক্তিকে পতাকা দেবো যে আল্লাহ ও তার রাসুল রাঃসাঃকে ভালবাসে আর আল্লাহ ও তার রাসুলও তাকে ভালবাসেন। এ কথা শুনে আমরা অপেক্ষা করতে থাকলাম। তখন তিনি বলিলেন, আলীকে ডাকো। আলী রাদি. `আনহু আসলেন, তাহাঁর চোখ উঠেছিলো। রাঃসাঃ  তাহাঁর চোখে লালা দিলেন এবং তাহাঁর হাতে পতাকা অর্পণ করিলেন। পরিশেষে তার হাতেই বিজয় তুলে দিলেন আল্লাহ। আর যখন আয়াত, “আমরা আমাদের এবং তোমাদের সন্তান-সন্ততিকে ডাকি” [কোরআনের সুরা আলে ইমরান: ৬১] অবতীর্ণ হলো, তখন রাঃসাঃ  আলী, ফাতিমা, হাসান ও হুসাইন রাদি. `আনহুকে ডাকলেন। অতঃপর বলিলেন হে আল্লাহ! এরাই আমার পরিবার।[3]

জু`আইদ ইবনু আবদুর রাহমান রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, ইনি বলেন, আমি `সাইব ইবনু ইয়াযীদ রাদি. `আনহুকে চুরানব্বই বছর বয়সে সুস্থ-সবল ও সুঠাম দেহের অধিকারী দেখেছি। তিনি বলিলেন, তুমি অবশ্যই অবগত আছ যে, আমি এখনও নাবী রাঃসাঃ এর দু`আর বরকতেই চক্ষু ও কর্ণ দ্বারা উপকৃত হচ্ছি। আমার খালা একদিন আমাকে নিয়ে নাবী রাঃসাঃ এর দরবারে গেলেন এবং বলিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ্, আমার ভাগিনাটি পীড়িত ও রোগাক্রান্ত। আপনি তার জন্য আল্লাহর দরবারে দো`আ করুন। তখন নাবী রাঃসাঃ আমার জন্য দো`আ করিলেন।[4]

আবী আল-`আলা ইবনু উমাইর রহ. হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি কাতাদা ইবনু মিলহান রাদি. `আনহুর মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসলে তার কাছে উপস্থিত হলাম, তখন একলোক ঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। তিনি বলেন, তখন আমি কাতাদা রাদি. `আনহুর চেহারার দিকে তাকালাম। তিনি বলেন, আমি যখনই তার চেহারার দিকে তাকাই দেখি তার চেহারায় যেন চকচক করে। তিনি বলেন, রাঃসাঃ তার চেহারা মাসেহ করে দিয়েছিলেন। [5]

আবদুল্লাহ ইবনু `উমর রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, আবদুল্লাহ্ ইবনু উবাই [মুনাফিক সর্দার] এর মৃত্যু হলে তার পুত্র [যিনি সাহাবী ছিলেন] রাসূলুল্লাহ্‌ রাঃসাঃ এর কাছে এসে বলিলেন, আপনার জামাটি আমাকে দদান করুন। আমি তা দিয়ে আমার পিতার কাফন পরাতে ইছা করি। আর আপনি তার জানাযা পড়াবেন এবং তার জন্য মাগফিরাত কামনা করবেন। রাসূলুল্লাহ্‌ রাঃসাঃ নিজের জামাটি তাঁকে দিয়ে দিলেন এবং বলিলেন, আমাকে সংবাদ দিও, আমি তার জানাযা আদায় করব। তিনি তাঁকে সংবাদ দিলেন। যখন রাসূলুল্লাহ্‌ রাঃসাঃ তার জানাযা আদায়ের ইচ্ছা করিলেন, তখন উমর রাদি. `আনহু তাহাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলিলেন, আল্লাহ কি আপনাকে মুনাফিকদের জানাযা আদায় করতে নিষেধ করেন নি? তিনি বলিলেন, আমাকে তো দু`টির মধ্যে কোনো একটি করার ইখিত্‌য়ার দেওয়া হয়েছে। [আল্লাহ্ তা`আলা বলিয়াছেন] “আপনি তাদের [মুনাফিকদের] জন্য মাগফিরাত কামনা করুন বা মাগফিরাত কামনা না-ই করুন [একই কথা] আপনি যদি সত্তর বারও তাদের জন্য মাগফিরাত কামনা করেন; কখনো আল্লাহ তাদের ক্ষমা করবেন না”। [কোরআনের সুরা আত-তাওবা: ৮০] কাজেই তিনি তার জানাযা পড়লেন, তারপর নাযিল হল “তাদের কেউ মারা গেলে কখনও আপনি তাদের জানাযা আদায় করবেন না।” [কোরআনের সুরা আত-তাওবা: ৮৪] [6]

জাবির রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবদুল্লাহ্ ইবনু উবাইকে দাফন করার পর রাসূলুল্লাহ্‌ রাঃসাঃ তার [কবরের] কাছে এলেন এবং তাকে বের করিলেন। তারপর তার উপর থুথু দিলেন, এর নিজের জামাটি তাকে পরিয়ে দিলেন। [7]


[1] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৪০৩৯।

[2] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৪২০৬।

[3] সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর ২৪০৪।

[4] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৫৪০।

[5] মুসনাদে আহমদ, হাদিস নম্বর ২০৩১৭। হাদীসটি সহিহ, এর সনদের রিজালেরা সবাই সিকাহ।

[6] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ১২৬৯।

[7] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ১২৭০।

Leave a Reply