রমজান মাসের ফজিলত ও কর্তব্য -ইবন রজব আল হাম্বলী

রমজান মাসের ফজিলত

ইবন রজব আল-হাম্বলী রহ. এর ‘লাতায়িফুল মা‘আরিফ’ অবলম্বনে
রমযানের দায়িত্ব-কর্তব্য
শাইখ যাইনুদ্দীন আব্দুর রহমান ইবন রজব আল-হাম্বলী রহ.অনুবাদ: আব্দুল্লাহ আল মামুন আল-আযহারী
সম্পাদনা: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

 
সূচীপত্র

ক্রশিরোনাম
পরিচ্ছেদ: রমজান মাসের ফজিলত
পরিচ্ছেদ: রমযান মাসে সাওম পালনের ফযীলত
পরিচ্ছেদ: রমযানে দান-সদকা ও কুরআন তিলাওয়াতের মর্যাদা
পরিচ্ছেদ: তারাবীহ
পরিচ্ছেদ: কিয়ামু রমযান তথা রমযানে তাহাজ্জুদ
পরিচ্ছেদ: রমযানের মধ্য দশ দিন
পরিচ্ছেদ: রমযানের শেষ দশকের ফযীলত
পরিচ্ছেদ: রমযানের শেষ সাত দিন
পরিচ্ছেদ: লাইলাতুল কদরের সর্বাধিক সম্ভাবনাময় রাত
১০পরিশিষ্ট: শাওয়ালের ছয়টি সাওম

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

রমজান মাসের ফজিলত

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদেরকে সুসংবাদ দিয়ে বলেন,

«قَدْ جَاءَكُمْ شَهر رَمَضَانُ، شَهْرٌ مُبَارَكٌ، كَتَب اللهُ عَلَيْكُمْ صِيَامَهُ، فِيهِ تُفْتَحُ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ، وَتُغْلَقُ فِيهِ أَبْوَابُ الْجَحِيمِ، وَتُغَلُّ فِيهِ الشَّيَاطِينُ، فِيهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ، مَنْ حُرِمَ خَيْرَهَا فَقَدْ حُرِمَ».

“তোমাদের নিকট রমযান মাস উপস্থিত হয়েছে, যা একটি বরকতময় মাস। তোমাদের ওপর আল্লাহ তা‘আলা এ মাসের সাওম ফরয করেছেন। এ মাস আগমনের কারণে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয়, আর আল্লাহর অবাধ্য শয়তানদের গলায় লোহার বেড়ী পরানো হয়। এ মাসে একটি রাত রয়েছে যা এক হাজার মাস অপেক্ষাও উত্তম। যে ব্যক্তি সে রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত রয়ে গেল সে প্রকৃত বঞ্চিত রয়ে গেল।”[1]

কবি বলেছেন:

সাওমের মাস বরকত নিয়ে এসেছে দুয়ারে। অতএব, তোমরা অতিথিকে সম্মান করো, সে আসছে।

‘উবাদা ইবন সামিত রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু মারফু‘ সূত্রে বর্ণনা করেন,

«أَتَاكُمْ رَمَضَانُ شَهْرُ بَرَكَةٍ، فِيهِ خَيْرٌ يُغَشِّيكُمُ اللَّهُ فِيهِ، فَتَنْزِلُ الرَّحْمَةَ، وَتُحَطُّ الْخَطَايَا، وَيُسْتَجَابُ فِيهِ الدُّعَاءُ، فَيَنْظُرُ اللَّهُ إِلَى تَنَافُسِكُمْ، وَيُبَاهِي بِكُمْ مَلَائِكَتَهُ، فَأَرُوا اللَّهَ مِنْ أَنْفُسِكُمْ خَيْرًا، فَإِنَّ الشَّقِيَّ منْ حُرِمَ فِيهِ رَحْمَةَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ».

“তোমাদের কাছে রমযান মাস এসেছে, বরকতের মাস। এ মাসে রয়েছে কল্যাণ, আল্লাহ তোমাদেরকে সে কল্যাণে আবৃত করে দেন। ফলে তিনি রহমত নাযিল করেন, গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয় এবং এ মাসে দো‘আ কবুল করা হয়। আল্লাহ তোমাদের (সৎ কাজের) প্রতিযোগিতার দিকে তাকান এবং তিনি তোমাদেরকে নিয়ে ফিরিশতাদের কাছে গর্ব করেন। সুতরাং তোমরা তোমাদের নিজেদের কল্যাণ আল্লাহকে দেখাও। কেননা হতভাগা তো সে ব্যক্তি যে এ মাসে মহান আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়।”[2]

সহীহাইনে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«إِذَا دَخَلَ شَهْرُ رَمَضَانَ فُتِّحَتْ أَبْوَابُ السَّمَاءِ، وَغُلِّقَتْ أَبْوَابُ جَهَنَّمَ، وَسُلْسِلَتِ الشَّيَاطِينُ».

“রমযান মাস আসলে আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয় আর শয়তানকে শৃঙ্খলিত করে দেওয়া হয়।”[3]

সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে,

«فُتِّحَتْ أَبْوَابُ الرَّحْمَةِ».

“রহমাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়।”[4]

সহীহ মুসলিমে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে মারফু‘ সূত্রে আরও বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«إِذَا جَاءَ رَمَضَانُ فُتِّحَتْ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ، وَغُلِّقَتْ أَبْوَابُ النَّارِ، وَصُفِّدَتِ الشَّيَاطِينُ».

“যখন রমযান আসে তখন জান্নাতের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানকে শিকলে বন্দী করা হয়”।[5]

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«إِذَا كَانَ أَوَّلُ لَيْلَةٍ مِنْ شَهْرِ رَمَضَانَ صُفِّدَتِ الشَّيَاطِينُ، وَمَرَدَةُ الجِنِّ، وَغُلِّقَتْ أَبْوَابُ النَّارِ، فَلَمْ يُفْتَحْ مِنْهَا بَابٌ، وَفُتِّحَتْ أَبْوَابُ الجَنَّةِ، فَلَمْ يُغْلَقْ مِنْهَا بَابٌ، وَيُنَادِي مُنَادٍ: يَا بَاغِيَ الخَيْرِ أَقْبِلْ، وَيَا بَاغِيَ الشَّرِّ أَقْصِرْ، وَلِلَّهِ عُتَقَاءُ مِنَ النَّارِ، وَذَلكَ كُلُّ لَيْلَةٍ».

“শয়তান ও দুষ্ট জিন্নদেরকে রমযান মাসের প্রথম রাতেই শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং এর একটি দরজাও তখন আর খোলা হয় না। জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং এর একটি দরজাও তখন আর বন্ধ করা হয় না। (এ মাসে) একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দিতে থাকেন, হে কল্যাণ অন্বেষণকারী! অগ্রসর হও। হে পাপাসক্ত! বিরত হও। আর বহু লোককে আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে এ মাসে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং প্রত্যেক রাতেই এরূপ থেকে থাকে।”[6]

….

‘আমর ইবন মুররাহ আল-জুহানী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«جَاءَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَجُلٌ مِنْ قُضَاعَةَ، فَقَالَ لَهُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَرَأَيْتَ إِنْ شَهِدْتُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّكَ رَسُولُ اللَّهِ، وَصَلَّيْتُ الصَّلَوَاتِ الْخَمْسَ، وَصُمْتُ الشَّهْرَ، وَقُمْتُ رَمَضَانَ، وَآتَيْتُ الزَّكَاةَ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ مَاتَ عَلَى هَذَا كَانَ مِنَ الصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ».

“কুযা‘আ থেকে এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি যদি সাক্ষ্য দেই যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো (সত্য) ইলাহ নেই, আপনি আল্লাহর রাসূল, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করি, রমযান মাসের সাওম পালন করি ও রমযানের রাতে সালাত আদায় করি এবং যাকাত আদায় করি তাহলে আমার ব্যাপারে আপনি কী মনে করেন? রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “যে ব্যক্তি এরূপ আমল করে মারা যাবে সে সিদ্দীক ও শহীদগণের সাথে থাকবেন”।[7]

আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযান মাস পর্যন্ত পৌঁছার দো‘আ করতেন। তিনি রজব মাস আসলে বলতেন,

«اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِي رَجَبٍ وَشَعْبَانَ، وَبَلِّغْنَا رَمَضَانَ».

“হে আল্লাহ আমাদেরকে রজব ও শা‘বান মাসে বরকত দান করুন এবং রমযান মাস পর্যন্ত আমাদেরকে পৌঁছান (হায়াত দান করুন)।”[8]

‘আব্দুল ‘আযীয ইবন মারওয়ান রহ. বলেন, রমযান মাস আগমন করলে মুসলিমগণ বলত, হে আল্লাহ! রমযান মাস আমাদের উপর ছায়ার মত এসে যাচ্ছে। অতএব, তাকে আমাদের মাঝে পৌঁছে দাও এবং আমাদেরকে তার কাছে সোপর্দ করুন। আমাদেরকে রমযানের সাওম ও সালাত আদায়ের তাওফিক দান করুন। এ মাসে কঠোর পরিশ্রম ও ইজতিহাদ, শক্তি ও কর্ম তৎপরতা দান করুন এবং ফিতনা থেকে আমাদেরকে রক্ষা করুন।

মু‘আল্লা ইবন ফযল রহ. বলেন, আগেকার মুসলিমগণ রমযানের আগের ছয়মাস রমযান পাওয়ার জন্য দো‘আ করতেন। আর বাকী ছয়মাস তাদের আমল কবুল হওয়ার দো‘আ করতেন।

ইয়াহইয়া ইবন আবু কাসীর রহ. বলেন, তাদের দো‘আ ছিলো, হে আল্লাহ আমাকে রমযানের জন্য সুস্থ রাখুন, রমযানকে আমার কাছে সোপর্দ করুন এবং আমার আমল কবুল হওয়াসহ রমযানকে আপনি গ্রহণ করুন।

রমযান মাস পাওয়া ও এতে সাওম পালন করা অনেক বড় নি‘আমত। একথার দলীল হলো তিন ব্যক্তির হাদীস, যারা জিহাদে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। তাদের দু’জন শহীদ হন এবং আরেকজন তাদের পরে বিছানায় স্বাভাবিকভাবে মারা যান। আগে মারা যাওয়া দু’জনকে স্বপ্নে দেখানো হলো। তাদের ব্যাপারে শুনে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 

«أَلَيْسَ قَدْ مَكَثَ هَذَا بَعْدَهُ سَنَةً؟ ” قَالُوا: بَلَى. قال: ” وَأَدْرَكَ رَمَضَانَ فَصَامَهُ؟ ” قَالُوا: بَلَى قال: ” وَصَلَّى كَذَا وَكَذَا سَجْدَةً فِي السَّنَةِ؟ ” قَالُوا: بَلَى، قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” فَلَمَا بَيْنَهُمَا أَبْعَدُ مَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ».

“সে কি তার পরে একবছর বেঁচে ছিল না? তারা বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, সে কি রমযান পায় নি এবং এর সাওম পালন করে নি? তারা বললেন, জি হ্যাঁ। তিনি বললেন, সে কি বিগত একবছর এত এত রাকাত সালাত আদায় করে নি ও সিজদা করে নি? তারা বললেন, হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে তাদের মধ্যে আসমান ও জমিন সম পার্থক্য হবে।”[9]

‘আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! রমযান মাস এসেছে, তবে কী দো‘আ পড়বো? তিনি বলেন, তুমি বলবে,

«اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي».

“হে আল্লাহ! তুমি ক্ষমাকারী, তুমি ক্ষমা করতে ভালোবাসো। অতএব, তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও।”[10]

রমযান এসেছে। এতে রয়েছে নিরাপত্তা, জাহান্নাম থেকে মুক্তি এবং জান্নাতে ঘর পাওয়ার মহাসফলতা। যে ব্যক্তি এ মাসে লাভবান হতে পারবে না তাহলে সে আর কখন লাভবান হবে? যে ব্যক্তি এ মাসে তার মাওলার (আল্লাহর) নৈকট্য লাভ করতে পারবে না সে এরপরে তাঁর নৈকট্য লাভ করতে পারবে না। যে ব্যক্তির ওপর আল্লাহ এ মাসে রহম করবেন সে তাঁর রহমতপ্রাপ্ত হবে আর যে ব্যক্তি তাঁর রহমত থেকে বঞ্চিত হবে সে প্রকৃতপক্ষেই বঞ্চিত।

কবি বলেছেন:

لتطهير القلوب من الفسادأتى رمضـــان مزرعة العباد
وزادَك فاتخذه للمعــــــادفأدِّ حقوقــــــه قولا وفعلا
تأوه نادمًا عند الحصـــــادفمن زرع الحبوب وما سقاها

বান্দার ইবাদতের শস্যক্ষেতস্বরূপ রমযান এসেছে ফিতনা-ফ্যাসাদ থেকে তাদের অন্তরকে পবিত্র করতে। অতএব, কথা ও কাজে এর হক আদায় করো, এটি তোমার জন্য পাথেয়স্বরূপ। অতএব, কিয়ামতের দিনের পাথেয় হিসেবে একে গ্রহণ করো। যে ব্যক্তি শস্য চাষ করল অথচ সেচ দিলো না সে ফসল তোলার সময় লজ্জিত হবে।

পরিচ্ছেদ: সাওম পালনের রমজান মাসের ফজিলত

সহীহাইনে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«كُلُّ عَمَلِ ابْنِ آدَمَ يُضَاعَفُ، الْحَسَنَةُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا إِلَى سَبْعمِائَة ضِعْفٍ، قَالَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ: إِلَّا الصَّوْمَ، فَإِنَّهُ لِي وَأَنَا أَجْزِي بِهِ، يَدَعُ شَهْوَتَهُ وَطَعَامَهُ مِنْ أَجْلِي.  لِلصَّائِمِ فَرْحَتَانِ: فَرْحَةٌ عِنْدَ فِطْرِهِ، وَفَرْحَةٌ عِنْدَ لِقَاءِ رَبِّهِ، ولَخُلُوفُ فَمِ الصَّائِمِ أَطْيَبُ عِنْدَ اللَّهِ مِنْ رِيحِ المِسْكِ».

“আদম সন্তানের প্রতিটি কাজই দশগুণ থেকে সাতশত গুণ বৃদ্ধি করা হয়। মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন, কিন্তু সাওম ব্যতীত। কেননা তা আমার জন্য, তাই আমি এর প্রতিদান দেবো। সে আমার সন্তুষ্টির জন্য কামাচার ও পানাহার পরিত্যাগ করে। সাওম পালনকারীর জন্য রয়েছে দু’টি খুশী যা তাঁকে খুশী করে। যখন সে ইফতার করে, সে খুশী হয় এবং যখন সে তাঁর রবের সাথে সাক্ষাৎ করবে, তখন সাওমের বিনিময়ে আনন্দিত হবে। সাওম পালনকারীর মুখের (না খাওয়াজনিত) ঘ্রাণ আল্লাহর নিকট মিসকের ঘ্রাণের চেয়েও উত্তম”।[11]

অন্য বর্ণনায় এসেছে,

«قَالَ اللَّهُ: كُلُّ عَمَلِ ابْنِ آدَمَ لَهُ إِلَّا الصِّيَامَ، فَإِنَّهُ لِي».

“সাওম ব্যতীত আদম সন্তানের প্রতিটি কাজই তাঁর নিজের জন্য; কিন্তু সাওম আমার জন্য”।[12]

বুখারীর বর্ণনায় এসেছে,

«لِكُلِّ عَمَلٍ كَفَّارَةٌ، وَالصَّوْمُ لِي وَأَنَا أَجْزِي بِهِ».

“প্রত্যেক আমলেরই কাফফারা আছে। সাওম আমার জন্য, তাই আমি এর প্রতিদান দেবো”।[13]

মুসনাদে আহমাদের বর্ণনায় এসেছে,

«لِكُلِّ عَمَلٍ كَفَّارَةٌ، وَالصَّوْمُ لِي وَأَنَا أَجْزِي بِهِ».

“প্রত্যেক আমলেরই কাফফারা আছে। সাওম আমার জন্য, তাই আমি এর প্রতিদান দেবো”।[14]

প্রথম বর্ণনায় সাওমকে অন্যান্য আমলের বর্ধিত সাওয়াব থেকে আলাদা করা হয়েছে। অন্যান্য আমলের সাওয়াব দশ গুণ থেকে সাতশত গুণ করার কথা বলা হলেও সাওমের ব্যাপারটি আলাদা। কেননা এর সাওয়াব সীমাবদ্ধ নয়; বরং আল্লাহ সাওমের সাওয়াব বহু গুণে দান করবেন। কেননা সাওম সবর তথা ধৈর্য থেকে এসেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿إِنَّمَا يُوَفَّى ٱلصَّٰبِرُونَ أَجۡرَهُم بِغَيۡرِ حِسَابٖ ١٠﴾ [الزمر: ١٠] 

“কেবল ধৈর্যশীলদেরকেই তাদের প্রতিদান পূর্ণরূপে দেওয়া হবে কোনো হিসাব ছাড়াই”। [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ১০]

এ কারণে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«شَهْرُ رمضان شهر الصَّبْرِ».

“রমযান মাস ধৈর্যের মাস”।[15]

ধৈর্য তিন প্রকার। আল্লাহর আনুগত্যের ওপর ধৈর্যধারণ করা, আল্লাহর হারাম জিনিস থেকে বিরত থাকতে ধৈর্যধারণ করা এবং আল্লাহর ফয়সালাকৃত কষ্টের উপর ধৈর্যধারণ করা। এ তিন ধরণের ধৈর্য সাওমের মধ্যে একত্রিত হয়। সালমান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে,

«وَهُوَ شَهْرُ الصَّبْرِ، وَالصَّبْرُ ثَوَابُهُ الْجَنَّةُ».

“রমযান মাস ধৈর্যের মাস। আর ধৈর্যের প্রতিদান জান্নাত”।[16]

…..

জেনে রাখুন আমলের সাওয়াব দ্বিগুণ থেকে বহুগুণ হওয়ার বেশ কিছু কারণ আছে। সেগুলো হলো:

প্রথমত: কাজটি করার স্থানটি মর্যাদাবান হওয়ার কারণে কাজের প্রতিদান বহুগুণে বেড়ে যায়। যেমন, হারাম শরীফের মর্যাদা। এ কারণেই মসজিদুল হারাম ও মসজিদ নববীতে সালাত আদায়ের সাওয়াব অনেকগুণ। যেমনটি হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।

«صَلاَةٌ فِي مَسْجِدِي هَذَا خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ صَلاَةٍ فِيمَا سِوَاهُ، إِلَّا المَسْجِدَ الحَرَامَ»

“আমার এ মসজিদে এক রাকাত সালাত আদায় করা অন্য মসজিদে একহাজার রাকাত সালাত আদায়ের চেয়েও উত্তম; তবে মসজিদুল হারাম ব্যতীত”।[17]

মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে,

«صَلَاةٌ فِي مَسْجِدِي هَذَا أَفْضَلُ».

“আমার এ মসজিদে সালাত আদায় করা উত্তম”।[18]

দ্বিতীয়ত: সময়ের মর্যাদার কারণে আমলে সাওয়াব অনেকগুণ বৃদ্ধি পায়। যেমন, রমযান মাস, যিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন। ইবন ‘আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

« عمرة في رمضان تَعْدِلُ حَجَّةً  أو حجة مَعِي يَعْنِي عُمْرَةً فِي رَمَضَانَ».

“রমযানে উমরা পালন হজের সমতুল্য অথবা আমার সাথে হজ পালনের সওয়াবের সমতুল্য হবে”।[19]

যেহেতু সাওমের সাওয়াব অন্যান্য আমলের চেয়ে বহুগুণ, সেহেতু রমযান মাসে সময়ের মর্যাদার কারণে সাওম পালন অন্যান্য সময় সাওম পালনের চেয়ে অনেকগুণ সাওয়াব। যেহেতু রমযানের সাওম আল্লাহ তাঁর বান্দার ওপর ফরয করেছেন এবং সাওমকে ইসলামের রুকনসমূহের অন্যতম একটি রুকন করেছেন।

আরো অন্য কারণে সাওয়াব দ্বিগুণ থেকে বহুগুণ করা হয়। যেমন, আল্লাহর কাছে আমলকারীর মর্যাদা, তার কাছে নৈকট্য ও তার তাকওয়ার কারণে। যেমন এ উম্মাতের সাওয়াব পূর্ববর্তী অন্যান্য উম্মাতের চেয়ে অনেকগুণ বেশি।   

দ্বিতীয় বর্ণনায় বান্দার জন্য অন্যান্য আমলের থেকে সাওমের আলাদা সাওয়াবের কথা বলা হয়েছে। কেননা সাওমকে আল্লাহ নিজের জন্য নির্দিষ্ট করেছেন। এ ব্যাপারে সামনে আরো আলোচনা আসছে।

তৃতীয় বর্ণনায় আমলের দ্বারা কাফফারা থেকে সাওমকে আলাদা করা হয়েছে।

এখানে সুফইয়ান ইবন ‘উয়াইনাহ রহ. এর বাণীটি খুবই চমৎকার। তিনি বলেছেন: নিম্নোক্ত হাদীসটি সবচেয়ে সুন্দর ও প্রজ্ঞাময়, কিয়ামতের দিন আল্লাহ বান্দার হিসেব নিবেন। তাকে সমস্ত আমলের সাওয়াব থেকে যুলুমের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, তবে সাওম ব্যতীত। তার অবশিষ্ট যুলুমের গুনাহ আল্লাহ নিজে বহন করে সাওমের কারণে তাকে তিনি জান্নাত দান করবেন।[20]

এ হাদীস থেকে বুঝা গেল, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সাওম পালনকারীর সাওয়াব অন্য কেউ নেওয়ার সুযোগ নেই, বরং আল্লাহ তা ব্যক্তির জন্য সংরক্ষণ করে রাখেন। এ কারণেই বলা হয়, সমস্ত আমল ব্যক্তির গুনাহ কাফফারা। তখন তার আর কোন সাওয়াব অবশিষ্ট থাকবে না। যেমন বর্ণিত আছে, “কিয়ামতের দিনে ব্যক্তির ভালো ও মন্দ আমল ওজন করা হবে এবং একটির দ্বারা অন্যটির ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কিসাস তথা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পরে সৎ আমল অবশিষ্ট থাকলে ব্যক্তি জান্নাতে যাবে”। এ ব্যাপারে মারফু‘ সূত্রে বর্ণিত হাদীস রয়েছে। অতএব, সাওমের ব্যাপারে বলা যায় যে, কোন গুনাহের কাফফারাস্বরূপ বা অন্য কোন কারণে সাওমের সাওয়াব কর্তন করা হবে না; বরং সাওমের সাওয়াব ব্যক্তিকে পরিপূর্ণ দেওয়া হবে, এমনকি এ কারণে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তখন জান্নাতে তার পরিপূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে।

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী «فإنه لي» “সাওম আমার জন্য” এর ব্যাখ্যা হলো, আল্লাহ সাওমকে তাঁর নিজের দিকে সম্বন্ধযুক্ত করেছেন যা তিনি অন্যান্য ইবাদতের ক্ষেত্রে করেন নি। এর কয়েক ধরণের অর্থ হতে পারে। সবচেয়ে সুন্দর দু’টি ব্যাখ্যা নিম্নরূপ:

প্রথমত: যখন প্রবৃত্তির চাহিদা চরম আকার ধারণ করে এবং তার সে চাহিদা পূরণের শক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এমন স্থানে সে চাহিদা পূরণ করা থেকে বিরত থাকে যেখানে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ তাকে দেখে না। এটি বান্দার সঠিক ঈমানের প্রমাণ। কেননা সাওম পালনকারী জানে যে, তার রয়েছ এমন একজন রব যিনি তার নির্জনের সব অবগত আছেন। তিনি নির্জনে তার স্বভাবজাত প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণ করতে হারাম করেছেন। ফলে বান্দা তার রবের শাস্তি থেকে রেহাই পেতে ও সাওয়াবের প্রত্যাশায় তাঁর আনুগত্য করল ও তাঁর আদেশ মান্য করল এবং তারঁ নিষেধ থেকে বিরত থাকল। এভাবে সে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল। তিনি তার অন্যান্য আমলের থেকে সাওমকে নিজের জন্য খাস করলেন। এ কারণেই তিনি এর পরে বলেছেন:

«يَتْرُكُ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ وَشَهْوَتَهُ مِنْ أَجْلِي».

“সে আমার জন্য আহার, পান ও কামাচার পরিত্যাগ করে”।[21]

একজন সৎপূর্বসূরী বলেছেন: ঐ ব্যক্তির জন্য সুসংবাদ যে গায়েবী প্রতিশ্রুতি পাওয়ার জন্য বর্তমানের প্রবৃত্তি পরিহার করল। মুমিন যেহেতু জানে যে, প্রবৃত্তির চাহিদা থেকে বিরত থেকে সাওম পালনে তার প্রভুর সন্তুষ্টি রয়েছে, তাই সে নিজের প্রবৃত্তির ওপর তার মাওলা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। ফলে সে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। যেহেতু তার দৃঢ় ঈমান আছে যে, আল্লাহর দেওয়া সাওয়াব ও শাস্তি নির্জনে তার প্রবৃত্তির আনন্দের চেয়ে অধিক বেশি ও ভয়ানক। তাই সে তার প্রবৃত্তির ওপর তার রবের সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। বরং মুমিন কঠোর প্রহরের আঘাতের চেয়েও নির্জনে তার রবের অসন্তুষ্টিমূলক কাজ করতে বেশি অপছন্দ করে। এ কারণেই অনেক মুমিনকে বিনা ওযরে সাওম ভঙ্গ করতে বাধ্য করে প্রহর করলেও সে সাওম ভঙ্গ করতে রাজি হয় না। কেননা সে জানে, এ মাসে সাওম ভঙ্গ করা আল্লাহর অপছন্দ। আর এটির ঈমানের নিদর্শন। মুমিন প্রবৃত্তির চাহিদার কাজসমূহ অপছন্দ করে, যেহেতু সে জানে যে, এগুলো আল্লাহর অপছন্দ। তখন আল্লাহর সন্তুষ্টি মূলক কাজই তার আনন্দময়; যদিও তা তার প্রবৃত্তির বিপরীত। সাওমের কারণে যেহেতু নিম্নোক্ত কাজসমূহ হারাম যেমন, পানাহার, স্ত্রী সহবাস ইত্যাদি, অতএব যেসব কাজ সর্বদা ও সর্বত্রে চিরতরে হারাম সেগুলো থেকেও বিরত থাকা জরুরী যেমন, যিনা, মদপান, অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করা, অন্যায়ভাবে অন্যের মান-সম্মান হানী করা, নিষিদ্ধ রক্তপাত করা ইত্যাদি। কেননা আল্লাহ এসব কাজ সর্বাবস্থায়, সর্বত্রে ও সর্বকালেই অপছন্দ করেন।

দ্বিতীয়ত: সাওম বান্দা ও তার রবের মধ্যকার গোপন ব্যাপার যা অন্য কেউ জানে না। কেননা সাওম সংঘটিত হয় গোপন নিয়াতের দ্বারা যা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না এবং প্রবৃত্তির চাহিদা বর্জন করার মাধ্যমে যা বান্দা ইচ্ছা করলে গোপনে সেসব চাহিদা পূরণ করতে পারে। এ কারণেই বলা হয়ে থাকে, সাওমের সাওয়াব সংরক্ষণকারী ফিরিশতা লিপিবদ্ধ করেন না। আরও বলা হয়, এ ইবাদতের মধ্যে কোনো রিয়া তথা লৌকিকতা নেই। এটি প্রথম প্রকার তথা সঠিক ঈমানের প্রমাণের সাথে মিলে। কেননা যে ব্যক্তি তার নফসের কামনাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ করে, যা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানেন না এটি তার সঠিক ঈমানের প্রমাণ। আর আল্লাহ তাঁর ও বান্দার মধ্যকার গোপন আমলসমূহ পছন্দ করেন যা তিনি ব্যতীত কেউ জানে না। 

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী, «ترك شهوتهُ وطعامه من أجلي» “সে আমার জন্য কামাচার ও পানাহার পরিত্যাগ করে”। এতে ঈঙ্গিত বহন করে যে, সাওম পালনকারী নিজের প্রবৃত্তির চাহিদা যেমন, পানাহার ও কামাচার ইত্যাদি সর্বোচ্চ প্রবৃত্তির কামনা পরিহার করে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করেন।

আর সাওমের মাধ্যমে প্রবৃত্তির খাম-খেয়ালী পরিহার করে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে রয়েছে অনেক উপকারিতা। সেগুলো নিম্নরূপ:

১- প্রবৃত্তিকে বিনষ্ট করে দেওয়া। কেননা উদরপূর্তি করে পানাহার ও স্ত্রী সহবাস করলে প্রবৃত্তি ব্যক্তিকে অন্যায় কাজ, অকর্মণ্যতা ও অলসতার দিকে ঠেলে দেয়।

২- অন্তরকে চিন্তা-গবেষণা ও আল্লাহর যিকিরের জন্য খালি করা। কেননা এসব প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণ করলে অন্তর কঠিন ও অন্ধ হয়ে যায়। তখন তা অন্তর ও আল্লাহর যিকির ও তাঁর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা-গবেষণার মাঝে বাধা সৃষ্টি করে এবং অলসতায় পেয়ে বসে। আর পানাহার ত্যাগ করে উদরশূণ্য করলে অন্তর আলোকিত হয়, নরম হয়, কঠোরতা দূরীভূত হয় এবং আল্লাহর যিকির ও তাঁর সৃষ্টি নিয়ে গবেষণার জন্য খালি হয়।

৩- ধন-ঐশ্বর্যবানরা তার ওপর আল্লাহর নি‘আমতের পরিমাণ বুঝতে পারে। সে গরীবের তুলনায় তার যথেষ্ট পরিমাণ পানাহার ও বিয়ে-শাদীর সামর্থ দেখতে পায় যা আল্লাহ তাকে দান করেছেন। আর সাওমের মাধ্যমে আল্লাহ তাকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তা গ্রহণ করা থেকে বিরত রাখেন। এতে তার কষ্ট অনুভব হয় এবং যাদেরকে আল্লাহ এ নি‘আমত থেকে বঞ্চিত করেছেন তখন সে উক্ত নি‘আমতের কথা স্মরণ করে। তখন তার ধন-ঐশ্বর্যের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত নি‘আমতের শুকরিয়া আদায় করে এবং এ কাজ তাকে অভাবী দুঃখী ভাইয়ের প্রতি সহযোগিতা ও সাধ্যমত সমবেদনা প্রকাশে অত্যাবশ্যকীয় করে তোলে।

৪- সাওম রক্ত চলাচলের রাস্তা সংকুচিত করে যা আদম সন্তানের মধ্যে শয়তানের চলাচলের পথ। কেননা শয়তান বনী আদমের রক্ত চলাচলের রাস্তায় চলে। ফলে সাওমের দ্বারা শয়তানের সে ধোঁকা বন্ধ হয়, মানুষের প্রবৃত্তি ও ক্রোধ চূর্ণ বিচূর্ণ হয়। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাওমকে প্রবৃত্তির দমককারী বলেছেন। কেননা সাওম বিবাহের প্রবৃত্তিকে নি:শেষ করে দেয়।

জেনে রাখুন, সাওম পালন ছাড়া শুধু এসব বৈধ প্রবৃত্তি ত্যাগের দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জিত হয় না যতক্ষণ সে সর্বাবস্থায় হারাম কাজ পরিহার না করবে। যেমন, মিথ্যা বলা, যুলুম করা, মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের ওপর সীমালঙ্ঘন করা ইত্যাদি পরিহার করা। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالعَمَلَ بِهِ، فَلَيْسَ لِلَّهِ حَاجَةٌ فِي أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ».

“যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা ও সে অনুযায়ী আমল বর্জন করেনি, তাঁর এ পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই”।[22]

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন:

«لَيْسَ الصِّيَامُ مِنَ الطَّعَامِ وَالشَّرَابِ فَقَطْ وَلَكِنَّ الصِّيَامَ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ».

“সাওম শুধু পানাহার ত্যাগ করা নয়; বরং অনর্থক ও অশ্লীল কথা-কাজ পরিহার করাই সাওম।”[23]

সহীহাইনে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«َالصِّيَامُ جُنَّةٌ، وَإِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمِ أَحَدِكُمْ فَلاَ يَرْفُثْ وَلاَ يَصْخَبْ، فَإِنْ سَابَّهُ أَحَدٌ أَوْ قَاتَلَهُ، فَلْيَقُلْ إِنِّي امْرُؤٌ صَائِمٌ».

“সাওম ঢালস্বরূপ। তোমাদের কেউ যেন সাওম পালনের দিন অশ্লীলতায় লিপ্ত না হয় এবং ঝগড়া-বিবাদ না করে। কেউ যদি তাঁকে গালি দেয় অথবা তাঁর সঙ্গে ঝগড়া করে, তাহলে সে যেন বলে, আমি একজন সাওম পালনকারী”।[24] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী «الجُنةُ» অর্থ ঢাল, যা দ্বারা ব্যক্তি আত্মরক্ষা করে, নিজেকে আড়াল করে এবং গুনাহে পতিত হওয়া থেকে তাকে রক্ষা করে। «والرَّفثُ» অর্থ অশ্লীলতা ও মন্দ কথাবার্তা।  

মুসনাদে আহমাদ ও নাসাঈতে আবু ‘উবাইদাহ রহ. থেকে মারফু‘ সূত্রে বর্ণিত,

«الصَّوْمُ جُنَّةٌ مَا لَمْ يَخْرِقْهَا».

“সাওম ঢালস্বরুপ যতক্ষণ পর্যন্ত তা ভেঙ্গে না ফেলে।”[25]

….

কতিপয় সৎপূর্বসূরী বলেছেন: সবচেয়ে দুর্বল সাওম হলো পানাহার পরিহার করা। জাবির রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেছেন: তুমি যখন সাওম পালন করবে তখন তোমার শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও জিহ্বাকে মিথ্যা ও হারাম কাজ থেকে সাওম (বিরত) রাখিও, প্রতিবেশিকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকো, তোমার যেন গম্ভীরতা ও প্রশান্তি থাকে, তুমি সাওমের দিন ও সাওম ব্যতীত দিনকে সমান করো না।

আমার শ্রবণ যদি হিফাযতকারী না হয়, আমার দৃষ্টি যদি অবনত না হয়, আমার কথা যদি চুপ না হয় তাহলে আমার সাওম শুধু ক্ষুধা ও তৃষ্ণা ছাড়া কিছুই হবে না। যদিও তুমি বলো, আজকে আমি সাওম পালন করছি, অথচ তুমি সায়িম নও।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«رُبَّ صَائِمٍ حَظُّهُ مِنْ صِيَامِهِ الْجُوعُ وَالْعَطَشُ، وَرُبَّ قَائِمٍ حَظُّهُ مِنْ قِيَامِهِ السَّهَرُ».

“কিছু সাওম পালনকারীর সাওমের বিনিময়ে ক্ষুধা ও পিপাসা ছাড়া কিছুই পায় না, আবার রাতে জাগরণকারী কিছু সালাত আদায়কারীর রাত্রি জাগরণ ব্যতীত কিছুই পায় না”।[26]

এর রহস্য হলো, বৈধ জিনিস পরিহার করে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করার পদ্ধতি হলো, উক্ত সে বৈধ জিনিস পরিহার করে আল্লাহর নৈকট্য লাভের পরে ততক্ষণ তা পরিপূর্ণ হয় না যতক্ষণ হারাম জিনিস পরিহার করে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা না হয়। সুতরাং যে ব্যক্তি হারামে পতিত হয়ে মুবাহ জিনিস পরিহার করে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করে তার উদাহরণ এরূপ যে ফরয ত্যাগ করে নফলের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করে।

….

«لِلصَّائِمِ فَرْحَتَانِ يَفْرَحُهُمَا: إِذَا أَفْطَرَ فَرِحَ، وَإِذَا لَقِيَ رَبَّهُ فَرِحَ بِصَوْمِهِ».

“সাওম পালনকারীর জন্য রয়েছে দু’টি খুশী যা তাকে খুশী করে। যখন সে ইফতার করে, সে খুশী হয় এবং যখন সে তাঁর রবের সাথে সাক্ষাৎ করবে, তখন সাওমের বিনিময়ে আনন্দিত হবে।”[27]

ইফতারের সময় সাওম পালনকারীর আনন্দ হলো, মানুষ সর্বদা তার উপযোগী জিনিস যেমন, খাদ্য, পানীয় ও সহবাস ইত্যাদির প্রতি আকৃষ্ট থাকে। এগুলো যখন নির্দিষ্ট সময় তার জন্য নিষিদ্ধ করা হয় অতঃপর অন্য সময় তা আবার হালাল করা হয় তখন সে নিষিদ্ধ হওয়ার পরে হালাল হওয়ার কারণে আনন্দিত হয়, বিশেষ করে উক্ত জিনিসের প্রতি যখন তার তীব্র প্রয়োজন দেখা দেয়।

অতএব, মানুষের অন্তর স্বাভাবিকভাবেই তখন আনন্দিত হয়, যখন সে কাজটি আল্লাহর প্রিয় কাজ হবে এবং শরী‘আতের দৃষ্টিতেও পছন্দনীয়। সায়িমের ইফতার এমনই একটি কাজ। দিনের বেলায় আল্লাহ তার জন্য প্রবৃত্তির সেসব কাজ করা হারাম করেছেন কিন্তু তিনি রাতের বেলায় উক্ত কাজগুলো হালাল করেছেন; বরং রাতের প্রথমভাগে ও শেষভাগে সেগুলো (ইফতার) তাড়াতাড়ি গ্রহণ করা তাঁর কাছে খুবই পছন্দনীয়। এমনকি তাঁর কাছে সর্বাধিক পছন্দনীয় বান্দা সে ব্যক্তি যে দ্রুত ইফতার গ্রহণ করে। কেননা সহীহাইনে সাহল রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে মারফু‘ সূত্রে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছন,

«لاَ يَزَالُ النَّاسُ بِخَيْرٍ مَا عَجَّلُوا الفِطْرَ».

“লোকেরা যতদিন যাবৎ ওয়াক্ত হওয়া মাত্র ইফতার করবে, ততদিন তারা কল্যাণের ওপর থাকবে”।[28]

….

ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত , রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى الْمُتَسَحِّرِينَ».

“আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর ফিরিশতাগণ সাহরী গ্রহণকারীদের ওপর সালাত পেশ করেন, অর্থাৎ তাদের কথা আলোচনা করেন”।[29]

সায়িম আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও তাঁর আনুগত্য করতে দিনের বেলায় নিজের প্রবৃত্তিকে দমন করেছে এবং আবার তাঁর সন্তুষ্টি ও আনুগত্যের জন্যই রাতের বেলায় সেসব প্রবৃত্তির দিকে দ্রুত এগিয়ে যায়। সুতরাং সে যা কিছু পরিহার করে তা তার রবেরই সন্তুষ্টি ও আদেশের জন্য আবার যখন সে সেসব বৈধ প্রবৃত্তির দিকে ফিরে যায় তখনও তার রবের আদেশেই ফিরে যায়। সুতরাং সে দু’ অবস্থায়ই তার রবের অনুগত। তাই সে যখন তার রবের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পানাহার করতে দ্রুত এগিয়ে যায় এবং তাঁর প্রশংসা করে তখন তার মাগফিরাত ও সর্বোচ্চ সন্তুষ্টি আশা করা যায়।

হাদীসে এসেছে,

«إِنَّ اللهَ لَيَرْضَى عَنِ الْعَبْدِ أَنْ يَأْكُلَ الْأَكْلَةَ فَيَحْمَدَهُ عَلَيْهَا أَوْ يَشْرَبَ الشَّرْبَةَ فَيَحْمَدَهُ عَلَيْهَا».

“আল্লাহ তা‘আলা সে বান্দার প্রতি অবশ্যই সন্তুষ্ট হন যে বান্দা কোন খানা খেয়ে এর জন্য আল্লাহর প্রশংসা করে অথবা পানীয় পান করে এর জন্য আল্লাহর হামদ ও প্রশংসা করে”।[30] হয়ত তখন তার দো‘আ কবুল করা হয়। … আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«ثَلَاثَةٌ لَا تُرَدُّ دَعْوَتُهُمْ: الصَّائِمُ حَتَّى يُفْطِرَ».

“তিন ব্যক্তির দো‘আ ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। সাওম পালনকারী যতক্ষণ না ইফতার করে।”[31]

…..

ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ইফতার করতেন তখন বলতেন,

«ذَهَبَ الظَّمَأُ وَابْتَلَّتِ الْعُرُوقُ، وَثَبَتَ الْأَجْرُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ».

“তৃষ্ণা চলে গেছে, শিরাগুলো আদ্র হয়েছে আর ছাওয়াব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে”।[32]

সাওম পালনকারী যদি রাতে সালাত আদায় ও দিনের বেলায় সাওম পালনের উদ্দেশ্যে শরীরিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য পানাহার করে তাহলে তা তার জন্য সাওয়াব হিসেবে ধর্তব্য হবে যেমনিভাবে সে রাতে ও দিনে কাজের জন্য শক্তি বৃদ্ধি করতে ঘুমালে সেটি তার জন্য ইবাদত হবে। …..

আবু ‘আলিয়াহ রহ. বলেছেন: সাওম পালনকারী গীবত না করা পর্যন্ত ইবাদতে থাকে, যদিও সে বিছানায় ঘুমায়”। 

অতএব, সায়িম রাত-দিন সব সময়ই ইবাদতে থাকে এবং সাওম অবস্থায় ও ইফতারির সময় তার দো‘আ কবুল করা হয়। সে দিনের বেলায় সাওম পালনকারী ও ধৈর্যশীল এবং রাতের বেলায় আহার গ্রহণকারী ও আল্লাহর শুকরিয়া আদায়কারী।  ইমাম তিরমিযী ও অন্যান্যরা বর্ণনা করেন,

«الطَّاعِمُ الشَّاكِرُ بِمَنْزِلَةِ الصَّائِمِ الصَّابِرِ».

“আল্লাহর শুকরিয়া আদায়কারী আহারকারীর মর্যাদা হলো ধৈর্যশীল সাওম পালনকারীর মতো”।[33] সুতরাং যে ব্যক্তি উপরোক্ত অর্থ বুঝবে সে সাওম পালনকারীর ইফতারের সময়ের আনন্দের অর্থও বুঝতে পারবে। কেননা ইফতার আল-কুরআনে বর্ণিত আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও দয়ার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿قُلۡ بِفَضۡلِ ٱللَّهِ وَبِرَحۡمَتِهِۦ فَبِذَٰلِكَ فَلۡيَفۡرَحُواْ هُوَ خَيۡرٞ مِّمَّا يَجۡمَعُونَ٥٨﴾ [يونس : ٥٨] 

“বলুন ‘আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতে। সুতরাং এ নিয়েই যেন তারা খুশি হয়’। এটি যা তারা জমা করে তা থেকে উত্তম”। [সূরা ইউনুস, আয়াত: ৫৮] তবে এ আনন্দের পূর্বশর্ত হচ্ছে হালাল ইফতার। কিন্তু তার ইফতার যদি হারাম হয় তাহলে সে ঐসব লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে যারা আল্লাহর হালালকৃত বস্তু থেকে সাওম পালন করে; কিন্তু আল্লাহর হারামকৃত বস্তু দ্বারা ইফতার করে। তাদের দো‘আ কবুল করা হবে না।

আর তার রবের সাথে মিলিত হওয়ার সময় তার আনন্দ হলো, তার সাওমের গচ্ছিত সাওয়াব আল্লাহর কাছ থেকে অত্যন্ত প্রয়োজনের সময় প্রাপ্ত হবে। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿وَمَا تُقَدِّمُواْ لِأَنفُسِكُم مِّنۡ خَيۡرٖ تَجِدُوهُ عِندَ ٱللَّهِ هُوَ خَيۡرٗا وَأَعۡظَمَ أَجۡرٗا٢٠﴾ [المزمل: ٢٠] 

“আর তোমরা নিজদের জন্য মঙ্গলজনক যা কিছু অগ্রে পাঠাবে তোমরা তা আল্লাহর কাছে পাবে প্রতিদান হিসেবে উৎকৃষ্টতর ও মহত্তর রূপে”। [সূরা আল-মুয্যাম্মিল, আয়াত: ২০]

«فَإِذَا لَقِيَ رَبَّهُ فَرِحَ بِصَوْمِهِ».

“(সাওম পালনকারীর জন্য রয়েছে দু’টি খুশী যা তাঁকে খুশী করে) এবং যখন সে তাঁর রবের সাথে সাক্ষাৎ করবে, তখন সাওমের বিনিময়ে আনন্দিত হবে”।[34]

‘ঈসা ‘আলাইহিস সালাম বলেছেন: নিশ্চয় এ রাত-দিন দু’টি খাজাঞ্চি। তাই লক্ষ্য করো এ দু’টি ভাণ্ডারে তোমরা কী জমা করছ? দিনসমূহ মানুষের ভালো-মন্দ দ্বারা ভর্তি ভাণ্ডার। কিয়ামতের দিনে ব্যক্তির জন্য এ ভাণ্ডার খোলা হবে। মুত্তাকীরা তাদের ভাণ্ডারে ইজ্জত ও সম্মান পাবে আর অপরাধীরা তাতে পাবে আফসোস ও লাঞ্ছনা।

সাওম পালনকারীগণ দু’টি শ্রেণিতে বিভক্ত:

প্রথম প্রকার: যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পানাহার ও কামভাব ত্যাগ করেছে বিনিময়ে জান্নাত পাওয়ার আশায়। এ শ্রেণির লোকেরা আল্লাহর সাথে ব্যবসা করেছে। আর যারা উত্তম কাজ করেন তাদের প্রতিদান আল্লাহ নষ্ট করেন না। যারা আল্লাহর সাথে ব্যবসা করবে তারা বিফল হবে না, বরং তারা বিরাট লাভবান হবে।

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«إِنَّكَ لَنْ تَدَعَ شَيْئًا اتِّقَاءَ اللهِ إِلَّا أَعْطَاكَ اللهُ خَيْرًا مِنْه».

“আল্লাহর তাকওয়ার উদ্দেশ্যে যা কিছুই তুমি পরিহার করো, তিনি তার চেয়ে উত্তম প্রতিদান দিবেন”।[35] এসব সাওম পালনকারীকে জান্নাতে তাদের ইচ্ছামত খাদ্য, পানীয় ও নারী দান করা হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿كُلُواْ وَٱشۡرَبُواْ هَنِيٓ‍َٔۢا بِمَآ أَسۡلَفۡتُمۡ فِي ٱلۡأَيَّامِ ٱلۡخَالِيَةِ٢٤﴾ [الحاقة: ٢٤] 

“(তাদেরকে বলা হবে) বিগত দিনসমূহে তোমরা যা অগ্রে প্রেরণ করেছ তার বিনিময়ে তোমরা তৃপ্তি সহকারে খাও ও পান করো। [সূরা আল-হাক্কাহ, আয়াত: ২৪] মুজাহিদ রহ. বলেছেন: এ আয়াতটি সাওম পালনকারীদের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে।

ইয়াকূব ইবন ইউসুফ রহ. বলেন, আমার কাছে এ মর্মে সংবাদ পৌঁছেছে যে, আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিনে তার অলীদের (বন্ধুদেরকে) বলবেন, হে আমার বন্ধুগণ, আমি যখনই তোমাদের দিকে তাকাতাম তখনই তোমাদের ঠোঁট খাদ্যাভাবে শুষ্ক (কুঁচকানো) দেখতাম, তোমাদের চক্ষু বিনিদ্র দেখতাম, পেট ক্ষুধায় কাঁপত, আজকের দিনে তোমরা তোমাদের নি‘আমতে থাকো, তোমরা পরস্পরে পেয়ালা ভরা শরাব পান করো, তোমরা তোমাদের জন্য যা অগ্রে প্রেরণ করেছ তার বিনিময়ে তৃপ্তি সহকারে খাও ও পান করো।

হাসান রহ. বলেন, নারী হুর মধুর নদীতে তার সাথে হেলান দিয়ে বসা আল্লাহর বন্ধুকে বলবেন, তুমি পান পেয়ালার পানীয় গ্রহণ করো। আল্লাহ তোমার প্রতি কঠিন গরমের দিনে তাকাতেন, তুমি প্রচণ্ড তৃষ্ণা থাকা সত্ত্বেও পিপাসিত ছিলে। তখন আল্লাহ তোমাকে নিয়ে ফিরিশতাদের সাথে গর্ববোধ করতেন। তিনি বলতেন, হে ফিরিশতাগণ তোমরা আমার বান্দাকে দেখো, সে তার স্ত্রী, কামভাব, খাদ্য ও পানীয় আমার সন্তুষ্টির জন্য আমার কাছে যা কিছু আছে তার বিনিময়ে ত্যাগ করেছে। তোমরা সাক্ষ্য থাকো, আমি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। তিনি সেদিনই তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং আমাকে তোমার সাথে বিবাহ দিয়েছেন।

সহীহাইনে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«إِنَّ فِي الجَنَّةِ بَابًا يُقَالُ لَهُ الرَّيَّانُ، يَدْخُلُ مِنْهُ الصَّائِمُونَ يَوْمَ القِيَامَةِ، لاَ يَدْخُلُ مِنْهُ أَحَدٌ غَيْرُهُمْ، يُقَالُ: أَيْنَ الصَّائِمُونَ؟ فَيَقُومُونَ لاَ يَدْخُلُ مِنْهُ أَحَدٌ غَيْرُهُمْ، فَإِذَا دَخَلُوا أُغْلِقَ فَلَمْ يَدْخُلْ مِنْهُ أَحَدٌ».

“জান্নাতে রাইয়্যান নামক একটি দরজা আছে। এ দরজা দিয়ে কিয়ামতের দিন সাওম পালনকারীরাই প্রবেশ করবে। তাঁদের ছাড়া আর কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। ঘোষণা দেওয়া হবে, সাওম পালনকারীরা কোথায়? তখন তারা দাঁড়াবে। তাঁরা ছাড়া আর কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে না। তাঁদের প্রবেশের পরই দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে। যাতে এ দরজা দিয়ে আর কেউ প্রবেশ না করে”।[36]

….

কোনো এক সৎপূর্বসূরী বলেছেন: আমার কাছে এ মর্মে সংবাদ পৌঁছেছে যে, হাশরের দিনে তাদের (সায়িমদের) জন্য দস্তরখানা বিছানো হবে, তারা সেখান থেকে খাবে আর অন্যান্য লোকদের হিসেব চলবে। তখন লোকজন বলবেন, হে আমাদের রব! আপনি আমাদের হিসেব নিচ্ছেন অথচ তারা খাচ্ছে। তখন তাদেরকে বলা হবে, দুনিয়াতে তারা সাওম পালন করছিল আর তোমরা তখন খাচ্ছিলে। তারা রাতে সালাতে দণ্ডায়মান ছিল আর তোমরা ঘুমিয়েছিলে।

কোন এক আল্লাহর ওলী স্বপ্নে দেখেন, তিনি যেন জান্নাতে প্রবেশ করেছেন। তিনি একজনকে বলতে শুনলেন, তোমার কী মনে আছে তুমি অমুক দিন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সাওম পালন করছিলে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তিনি বলেন, অতঃপর তিনি (ফিরিশতা) আমাকে উপর ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে দিয়ে সংবর্ধনা দিলেন। দুনিয়াতে কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সামান্য সময় পানাহার ত্যাগ করলে আখিরাতে আল্লাহ এর বিনিময় এমন খাদ্য ও পানীয় দান করবেন যা কখনও নিঃশেষ হবে না এবং এমন সহধর্মীনী দান করবেন যারা কখনও মারা যাবে না।

….

রমযান মাসে সাওম পালনকারীদেরকে জান্নাতে বিবাহ দেওয়া হয়।

….

জান্নাতের হুরদের মহর হলো দীর্ঘ সময় ধরে তাহাজ্জুদের সালাত। আর এ সালাত রমযান মাসে অধিক হারে আদায় করা হয়।

দ্বিতীয় প্রকার: কতিপয় সাওম পালনকারী দুনিয়াতে আল্লাহ ব্যতীত সবকিছু থেকেই সাওম পালন তথা বিরত থাকে। তারা তাদের মস্তিষ্ক ও এর চিন্তাধারাকে হিফাযত করে, পেট ও পেটে যা কিছু ধরে সবকিছু সংরক্ষণ করে, মৃত্যু ও মৃত্যুপরবর্তী পরীক্ষাকে স্মরণ করে, তারা আখিরাত কামনা করে এবং দুনিয়ার সমস্ত চাকচিক্য বর্জন করে। এ ধরণের লোকদের ঈদুল ফিতর হবে তাদের রবের সাথে সাক্ষাতের দিন, তাঁকে দর্শন হবে তাদের আনন্দ-উল্লাস। হে সাওম পালনকারীগণ! আজকে তোমাদের প্রবৃত্তিকে দমন করে সাওম পালন করো যাতে আল্লাহর সাথে মিলিত হওয়ার দিবস ঈদুল ফিতর হিসেবে পাও। দীর্ঘ জীবনের কারণে বেশি দিন বাঁচার প্রত্যাশা করবে না। তোমার জীবনে অধিকাংশ সাওম পালনের দিন শেষ হয়ে গেছে। তোমার ঈদের দিন তোমার রবের সাথে মিলিত হওয়ার দিন নিকটবর্তী হয়ে গেছে।

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী:

«ولَخُلُوفُ فَمِ الصَّائِمِ أَطْيَبُ عِنْدَ اللَّهِ مِنْ رِيحِ المِسْكِ».

“সাওম পালনকারীর মুখের (না খাওয়াজনিত) ঘ্রাণ আল্লাহর নিকট মিসকের ঘ্রাণের চেয়েও উত্তম”।[37] خلُوفُ الفم  হলো সাওম অবস্থায় না খাওয়ার কারণে মুখের ঘ্রাণ। এ ঘ্রাণ দুনিয়াতে মানুষের কাছে অছন্দনীয়; কিন্তু আল্লাহর কাছে মিসকের ঘ্রাণের চেয়েও অধিক প্রিয়। যেহেতু বান্দা আল্লাহর আনুগত্য ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের কারণেই তার এ গন্ধের সৃষ্টি হয়। এখানে দু’টি অর্থ হতে পারে:

প্রথম অর্থ: দুনিয়াতে সিয়াম যেহেতু বান্দা ও তার রবের মধ্যকার গোপনীয় বিষয়, তাই তিনি আখিরাতে সিয়াম পালনকারীদের মর্যাদা সুউচ্চ করতে সৃষ্টিকুলের কাছে সিয়ামের মর্যাদা স্পষ্ট করেছেন ও দুনিয়াতে মানুষের মাঝে সিয়াম পালনকারীগণ তাদের সিয়াম গোপন রাখার প্রতিদানে আল্লাহ আখিরাতে তাদেরকে মানুষের মাঝে সুপরিচিত করবেন।

মাকহূল রহ. বলেন, জান্নাতীগণ জান্নাতে সুঘ্রাণ পাবে। তখন তারা বলবেন, হে আমাদের রব! জান্নাতে প্রবেশের পর থেকে এত সুন্দর সুঘ্রাণ আর কখনও পাইনি। তখন তাদেরকে বলা হবে: এ হলো সিয়াম পালনকারীগণের মুখের সুঘ্রাণ।

দুনিয়াতে সাওম পালনকারীর মুখের দুর্গন্ধ তীব্র হয় তাই আখিরাতে তাদের মুখ থেকে সুঘ্রাণ বের হবে। এ সুঘ্রাণ দুভাবে হতে পারে।

প্রথমত: যা বাহ্যিক অনুভুতি দ্বারা বুঝা যায়। যেমন, আব্দুল্লাহ ইবন গালিব সালাত ও সাওম পালনকারী একজন একনিষ্ঠ ইবাদতকারী ছিলেন। তিনি মারা গেলে তাকে দাফন করা হলে তার কবরের মাটি থেকে মিসকের মত সুঘ্রাণ বের হতে লাগল। একজনকে স্বপ্নে দেখানো হলো তার কবর থেকে এত সুঘ্রাণ আসার কারণ কী? তাকে বলল, এগুলো কুরআন তিলাওয়াত ও সাওমের সু-ঘ্রাণ।

দ্বিতীয়ত: রূহ ও ক্বলব থেকে যে সুঘ্রাণ বের হয়। অতএব, যারা ইখলাসের সাথে ভালোবাসা নিয়ে সাওম পালন করবে তাদের অন্তর ও রূহ থেকে সুগন্ধি বের হবে। যেমন, হারিস আল-আশ‘আরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: যাকারিয়া আলাইহিস সালাম বনী ইসরাঈলদেরকে বললেন,

«وَآمُرُكُمْ بِالصِّيَامِ، فَإِنَّ مَثَلَ ذَلِكَ كَمَثَلِ رَجُلٍ فِي عِصَابَةٍ مَعَهُ صُرَّةٌ فِيهَا مِسْكٌ، فَكُلُّهُمْ يَعْجَبُ أَوْ يُعْجِبُهُ رِيحُهَا، وَإِنَّ رِيحَ الصَّائِمِ أَطْيَبُ عِنْدَ اللَّهِ مِنْ رِيحِ المِسْكِ».

“তোমাদের আমি সিয়ামের নির্দেশ দিচ্ছি। এর উদাহরণ হল সেই ব্যক্তির মত, যে ব্যক্তি একটি দলে অবস্থান করছে। তার সঙ্গে আছে মিশক ভর্তি একটি থলে। দলের প্রত্যেকের কাছেই এ সুগন্ধি ভালো লাগে। আল্লাহ তা‘আলার কাছে মিশকের সুগন্ধি অপেক্ষা সিয়াম পালনকারীর (মুখের) গন্ধ অনেক বেশি সুগন্ধময়।”[38]

…..

দ্বিতীয় অর্থ: কেউ দুনিয়াতে আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্য করার কারণে তা থেকে অপছন্দের কিছু সৃষ্টি হয়, আল্লাহর কাছে তা অপছন্দনীয় থাকে না। বরং সেটি তার কাছে হয়ে যায় অত্যন্ত পছন্দনীয়, খুবই প্রিয় ও পবিত্রতম। কেননা তাঁর আনুগত্য ও অনুসরণের কারণেই উক্ত অপছন্দনীয় জিনিসের সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং এ ধরণের আমলকারীদেরকে দুনিয়াতে তাদের পুরষ্কারের ঘোষণা দিয়ে তাদের অন্তরে প্রশান্তি দিয়েছেন যাতে দুনিয়াতে কেউ তাদেরকে অপছন্দ না করেন।

সাওম পালনকারীর মুখের ঘ্রাণ আল্লাহর কাছে মিশকের চেয়েও অধিক সু-ঘ্রাণ। আল্লাহর ভয়ে কোনো অপরাধীর বিলাপ তাঁর তাসবীহর চেয়েও উত্তম, তাঁর মহত্ব ও বড়ত্বের ভয়ে কেউ ভেঙ্গে পড়াই হলো প্রকৃত পূর্ণতা, তাঁর ভয়ে অপমানিত হওয়াই প্রকৃত সম্মান, তাঁর সন্তুষ্টির জন্য সাওম পালন করে ক্ষুধার্ত থাকা প্রকৃত পরিতৃপ্তি, তাঁর সন্তুষ্টির অন্বেষণে পিপাসার্ত থাকা প্রকৃত তৃষ্ণা নিবারণ ও তাঁর কাজে নিজেকে নিবেদিত করে দেওয়াই হলো প্রকৃত আরাম-আয়েশ। রমযান মাসে শয়তানকে যেহেতু শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয় এবং সাওমের মাধ্যমে প্রবৃত্তিকে দমন করা হয় তখন তার প্রবৃত্তির শক্তি দূরীভূত হয়ে যায় এবং বিবেকের জন্যই সবকিছু হয়ে যায়। তাই অপরাধীর আর কোনো ওযর থাকল না। অতএব, হে ঘুমন্ত আত্মা জেগে ওঠ। হে তাকওয়া ও ঈমানের সূর্য তুমি উদিত হও, হে সৎকর্মকারীদের আমলনামাসমূহ, তোমরা উত্থিত হও, হে সৎকর্মকারীদের আত্মাগণ, তোমরা  আল্লাহর জন্য বিনয়ী হও, হে কঠোর পরিশ্রমীগণের পাসমূহ তোমরা তোমাদের রবের জন্য রুকু-সাজদাহ করো, হে তাহাজ্জুদ আদায়কারীদের চক্ষু আর ঘুমিও না, হে তাওবাকারীগণের গুনাহ তুমি আর ফিরে এসো না।

রমযানে দান-সদকা ও কুরআন তিলাওয়াতের মর্যাদা

সহীহাইনে ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَجْوَدَ النَّاسِ بِالخَيْرِ، وَكَانَ أَجْوَدُ مَا يَكُونُ فِي رَمَضَانَ حِينَ يَلْقَاهُ جِبْرِيلُ، وَكَانَ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلاَمُ يَلْقَاهُ كُلَّ لَيْلَةٍ فِي رَمَضَانَ، حَتَّى يَنْسَلِخَ، يَعْرِضُ عَلَيْهِ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ القُرْآنَ، فَإِذَا لَقِيَهُ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلاَمُ، كَانَ أَجْوَدَ بِالخَيْرِ مِنَ الرِّيحِ المُرْسَلَةِ».

“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধন-সম্পদ ব্যয় করার ব্যাপারে সকলের চেয়ে দানশীল ছিলেন। রমযানে জিবরীল আলাইহিস সালাম যখন তাঁর সাথে দেখা করতেন, তখন তিনি আরো অধিক দান করতেন। রমযানের প্রতি রাতেই জিবরীল আলাইহিস সালাম তাঁর সাথে একবার সাক্ষাৎ করতেন। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে কুরআন শোনাতেন। জিবরীল আলাইহিস সালাম যখন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন তখন তিনি রহমত প্রেরিত বায়ূর চেয়ে অধিক ধন-সম্পদ দান করতেন”।[39]

মুসনাদে আহমাদে আরও বর্ধিত আছে,

«لَا يُسْأَلُ عَنْ شَيْءٍ إِلا أَعْطَاهُ».

“তার কাছে কোনো কিছু চাওয়া হলেই তাকে তা দিয়ে দিতেন”।[40]

….

হাদীসে বর্ণিত الجودُ শব্দের অর্থ, ব্যাপক দান খয়রাত। আল্লাহ নিজেকে الجودُ গুণে গুণান্বিত করেছেন।

আল্লাহ তা‘আলা হলেন সর্বাধিক দানশীল, তাঁর দান বিশেষ সময় অনেকগুণে বৃদ্ধি পায়। যেমন, রমযান মাসে। এ মাসেই তিনি কুরআন নাযিল করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌۖ أُجِيبُ دَعۡوَةَ ٱلدَّاعِ إِذَا دَعَانِۖ فَلۡيَسۡتَجِيبُواْ لِي وَلۡيُؤۡمِنُواْ بِي لَعَلَّهُمۡ يَرۡشُدُونَ١٨٦﴾ [البقرة: ١٨٦]   

“আর যখন আমার বান্দাগণ তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে, আমি তো নিশ্চয় নিকটবর্তী। আমি আহবানকারীর ডাকে সাড়া দেই, যখন সে আমাকে ডাকে। সুতরাং তারা যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার প্রতি ঈমান আনে। আশা করা যায় তারা সঠিক পথে চলবে”। [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮৬]

আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সৃষ্টিগতভাবে সর্বাধিক পরিপূর্ণ ও সর্বোৎকৃষ্ট গুণ দিয়ে তৈরী করেছেন। যেমন, আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে,

«بعثت لأتمم مَكَارِم الْأَخْلَاق».

“আমি সচ্চরিত্রকে পরিপূর্ণ করতে প্রেরিত হয়েছি”।[41] তাই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণভাবেই সকল মানুষের চেয়ে সর্বাধিক দানশীল ব্যক্তি ছিলেন, যেমন তিনি সর্বাধিক সম্মানিত, বীর ও সমস্ত প্রশংসিত গুণাবলীতে পরিপূর্ণ ছিলেন। তার দানশীলতা সব ধরণের দানশীলতাকে অন্তর্ভুক্ত করে। আর রযমান মাসে তার দানশীলতা অন্যান্য মাসের চেয়ে অনেকগুণ বেড়ে যেত, যেমনিভাবে তার রবের দানও রমযানে অনেকগুণ বেড়ে যায়।

রমযান মাসে তিনি ও জিবরীল আলাইহিস সালাম মিলিত হতেন। আর জিবরীল আলাইহিস সালাম হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত ফিরিশতা। তারা উভয়ে মিলে নাযিলকৃত কুরআন পরস্পর পড়ে শুনাতেন। আর কুরআন হলো সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম কিতাব, যা ইহসান ও উত্তম আখলাকের প্রতি উৎসাহিত ও অনুপ্রেরিত করে। আর এ সম্মানিত কিতাবই ছিল রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরিত্র, যেহেতু তিনি এ কিতাবের সন্তুষ্টিতে সন্তুষ্ট ছিলেন, এ কিতাবের অসন্তুষ্টিতে অসন্তুষ্ট ছিলেন, এ কিতাব সেসব বিষয়ে উৎসাহিত করেছে তিনি সেসব কাজ করতে দ্রুত এগিয়ে আসতেন এবং যা কিছু থেকে বিরত থাকতে ধমক দিয়েছে তিনিও তা থেকে বিরত থাকতেন। তার হায়াত শেষ হওয়া নিকটবর্তী হওয়ার কারণে এ মাসে তার দান-খয়রাত ও দয়া বহুগুণে বৃদ্ধি পেত যখন জিবরীল আলাইহিস সালামের সাথে রমযানে সাক্ষাৎ করতেন ও পরস্পর পরস্পরকে বেশি বেশি কুরআন পড়ে শুনাতেন।

উত্তম চরিত্র ও দানশীলতার প্রতি অনুপ্রেরণা দানকারী এ কিতাব নিঃসন্দেহে জিবরীল আলাইহিস সালামের সাথে সাক্ষাতের কারণে উত্তম আখলাকের এক বিরাট প্রভাব বিস্তার করেছে।

রমযান মাসে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দানশীলতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাওয়ার মধ্যে অনেক উপকারিতা রয়েছে। তন্মধ্যে কয়েকটি হলো:

১. সময়ের মর্যাদা ও এতে আমলের সাওয়াব অনেকগুণ বৃদ্ধি পাওয়া।

….

২. সাওম পালনকারী ও আল্লাহর যিকিরকারীকে তাদের ইবাদতের কাজে সাহায্য করলে তাদের সাওয়াবের অনুরূপ সাওয়াব পাওয়া যায়, যেমনিভাবে কেউ আল্লাহর পথের মুজাহিদকে জিহাদে যাওয়ার উপকরণ প্রস্তুত করে দিলে সেও জিহাদের সাওয়াব পাবে এবং কেউ মুজাহিদের পরিবার-পরিজনের কল্যাণে বাড়ি থাকলেও সে জিহাদের সাওয়াব পাবে।

যায়েদ ইবন খালিদ আল-জুহানী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«مَنْ فَطَّرَ صَائِمًا كَانَ لَهُ مِثْلُ أَجْرِهِمْ، مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْئًا».

“কেউ যদি কোনো সাওম পালনকারীকে ইফতার করায় তবে তার জন্যও অনুরূপ (সিয়ামের) সাওয়াব হবে। কিন্তু এতে সাওম পালনকারীর সাওয়াবে কোনো ঘাটতি হবে না”।[42]

….

৩. রমযান এমন একটি মাস যাতে আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি রহমত, মাগফিরাত ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন, বিশেষ করে লাইলাতুল কদরে। আল্লাহ এ রাতে তাঁর দয়ালু বান্দার ওপর রহমত বর্ষণ করেন। যেমন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«وَإِنَّمَا يَرْحَمُ اللَّهُ مِنْ عِبَادِهِ الرُّحَمَاءَ».

“আর আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মাঝে যারা দয়ালু, তিনি তাদের প্রতি রহম করেন”।[43] সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদতে কঠোর পরিশ্রমী হবে আল্লাহও তার প্রতি দান, দয়া ও আমলের সাওয়াব সেভাবে পর্যাপ্ত পরিমাণে দান করবেন।

৪. সাওম ও সদাকা একত্রিত হলে জান্নাত পাওয়া অত্যাবশ্যকীয় হয়ে যায়।

«إِنَّ فِي الجَنَّةِ غُرَفًا تُرَى ظُهُورُهَا مِنْ بُطُونِهَا وَبُطُونُهَا مِنْ ظُهُورِهَا» ، فَقَامَ أَعْرَابِيٌّ فَقَالَ: لِمَنْ هِيَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: «لِمَنْ أَطَابَ الكَلَامَ، وَأَطْعَمَ الطَّعَامَ، وَأَدَامَ الصِّيَامَ، وَصَلَّى بِاللَّيْلِ وَالنَّاسُ نِيَامٌ».

“জান্নাতে একটি প্রাসাদ রয়েছে যার ভিতর থেকে বাহির এবং বাহির থেকে ভিতর পরিদৃষ্ট হবে। তখন এক বেদুঈন উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, হে আল্লাহর রাসূল এটি কার হবে? তিনি বললেন, এটি হবে তার যিনি ভালো কথা বলে, অন্যকে খাদ্য খাওয়ায়, সর্বদা সাওম পালন করে এবং যখন রাতে মানুষ ঘুমিয়ে থাকে তখন সে উঠে সালাত আদায় করে”।[44] 

এসব গুণাবলীর সবগুলোই রমযান মাসে পাওয়া যায়। ফলে মুমিন এ মাসে সিয়াম, সালাত, সদকা ও উত্তম কথাবার্তা বলে থাকেন। কেননা সাওম তাকে অনর্থক ও অশ্লীল কথা ও কাজ থেকে বিরত রাখে এবং সালাত ও সদকা ব্যক্তিকে আল্লাহর সাথে সম্পর্কযুক্ত করে।

কোনো এক সৎপূর্বসূরী বলেছেন: সালাত ব্যক্তিকে অর্ধেক পথ পর্যন্ত পৌঁছায়, সাওম তাকে মহান মালিকের দরজা পর্যন্ত পৌঁছায়, সদকা তার হাত ধরে মহান মালিকের কাছে প্রবেশ করায়।

সহীহ মুসলিমে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন জিজ্ঞাসা করলেন,

«مَنْ أَصْبَحَ مِنْكُمُ الْيَوْمَ صَائِمًا؟» قَالَ أَبُو بَكْرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ: أَنَا، قَالَ: «فَمَنْ تَبِعَ مِنْكُمُ الْيَوْمَ جَنَازَةً؟» قَالَ أَبُو بَكْرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ: أَنَا، قَالَ: «فَمَنْ أَطْعَمَ مِنْكُمُ الْيَوْمَ مِسْكِينًا؟» قَالَ أَبُو بَكْرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ: أَنَا، قَالَ: «فَمَنْ عَادَ مِنْكُمُ الْيَوْمَ مَرِيضًا؟» قَالَ أَبُو بَكْرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ: أَنَا، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا اجْتَمَعْنَ فِي امْرِئٍ، إِلَّا دَخَلَ الْجَنَّةَ».

“তোমাদের মধ্যে আজ কে সিয়াম পালনকারী আছে? আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন, আমি সাওম পালনকারী। তিনি বললেন, আজ তোমাদের কে জানাযার সাথে চলেছ? আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন, আমি। তিনি বললেন, আজ তোমাদের কে মিসকীনকে খাদ্য খাইয়েছ? আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন আমি। তিনি বললেন, তোমাদের কেউ রোগীর শুশ্রূষা করেছ? আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন, আমি। তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যার মধ্যে এই কাজসমূহের সমাবেশ ঘটবে সে নিশ্চয়ই জান্নাতে প্রবেশ করবে”।[45]

৫. সাওম ও সদকা একত্রিত হলে তা গুনাহের কাফফার জন্য সর্বাধিক কার্যকরী, জাহান্নাম থেকে রক্ষাকারী ও জাহান্নাম থেকে দূরে অবস্থানকারী, বিশেষ করে এর সাথে যদি কিয়ামুল লাইল যুক্ত হয়। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে,

«الصِّيَامُ جُنَّةٌ كَجُنَّةِ أَحَدِكُمْ مِنَ الْقِتَالِ».

“সাওম এমন ঢালস্বরূপ, তোমাদের যুদ্ধে ব্যবহৃত ঢালের ন্যায়”।[46]

মুসনাদে আহমাদের বর্ণনায় এসেছে,

«الصِّيَامُ جُنَّةٌ، وَحِصْنٌ حَصِينٌ مِنَ النَّارِ».

“সাওম ঢালস্বরূপ এবং জাহান্নাত থেকে মুক্তির সুদৃঢ় সুরক্ষা”।[47]

মু‘আয ইবন জাবাল রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«وَالصَّدَقَةُ تُطْفِئُ الْخَطِيئَةَ، وَصَلَاةُ الرَّجُلِ فِي جَوْفِ اللَّيْلِ».

“এবং সাদাকা (যাকাত) বা দান খায়রাত) গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেয়, যেভাবে পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়। এমনিভাবে গভীর রাতে ব্যক্তির কিয়ামুল লাইল (তাহাজ্জু্র)ও গুনাহসমূহকে মিটিয়ে দেয়।”[48]

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«اتَّقُوا النَّارَ وَلَوْ بِشِقِّ تَمْرَةٍ».

“তোমারা জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচ (নিজেকে রক্ষা কর) যদিও তা খেজুরের টুকরা দ্বারাও হয় (সামান্য বস্তু সদাকা করতে পারলেও তা কর)”।[49]

আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলতেন, ‘তোমরা রাতের অন্ধকারে দুরাক‘আত সালাত আদায় করো কবরের অন্ধকার থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য, প্রচণ্ড গরমের দিনে সাওম পালন করো হাশরের ময়দানের গরম থেকে বাঁচার জন্য, কিয়ামতের ভয়াবহ দিনের আযাব থেকে রক্ষা পেতে গোপনে সদকা দাও।’

৬. রমযান মাসে সাওম পালন করতে গিয়ে অনেক সময় কিছু ভুল-ত্রুটি ও কমতি দেখা দেয়। সাওম গুনাহের কাফফারা হওয়ার শর্ত হচ্ছে যেসব বিষয় থেকে হিফাযত থাকা অত্যাবশ্যকীয় সেসব বিষয় থেকে বিরত থাকা। যেমন, ইবন হিব্বানে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, অধিকাংশ সাওম পালনকারীই যেভাবে সাওম পালন করা দরকার সেভাবে সাওম পালনের শর্তাবলী তাদের মধ্যে একত্রিত হয় না। এ কারণেই কোনো ব্যক্তিকে এভাবে বলতে নিষেধ করা হয়েছে যে, আমি পুরো রমযান সাওম পালন করেছি বা পুরো রাত সালাত আদায় করেছি। অতএব, এসব সদকার দ্বারা সাওম পালনে সংঘটিত ভুল-ত্রুটিসমূহের কাফফারা হয়ে যায়। এ কারণেই রমযান শেষে সাওম পালনকারীকে অনর্থক ও অশ্লীল কথাবার্তা ও কাজ থেকে পবিত্র করতে যাকাতুল ফিতর ওয়াজিব করা হয়েছে।

৭. সাওম পালানকারী সাওম অবস্থায় পানাহার পরিহার করে থাকে। আর কেউ সায়িমদেরকে পানাহার সরবাহ করে তাদেরকে শক্তিশালী করলে তার অবস্থা ঐ ব্যক্তির মতোই যে নিজে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রবৃত্তিকে ত্যাগ করল এবং এর দ্বারা সে সহমর্মিতা দেখালো। এ কারণেই সায়িমের সাথে অন্য সায়িমকে ইফতার করানো শরী‘আতসম্মত হয়েছে। কেননা ইফতারের সময় খাদ্য গ্রহণ তার কাছে অনেক প্রিয়, ফলে সে সহমর্মিতা দেখিয়ে তার সাথে অন্যকে খাওয়ালো, যদিও সে খাদ্যের প্রতি তার নিজেরই ভালোবাসা ছিল। এভাবে কাজটি করার অর্থ হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলা পানাহার হারাম করার পরে তার জন্য হালাল করে তাকে যে নি‘আমত দান করেছেন সে নি‘আমতের শুকরিয়া আদায় করা। কেননা কোনো কিছু নিষেধ করার পরে উক্ত জিনিসের প্রকৃত মর্যাদা বুঝা যায়।

কোনো এক ‘আরিফ বিল্লাহকে জিজ্ঞাসা করা হলো, শরী‘আতে কেন সাওম বিধিবদ্ধ করা হয়েছে? তিনি বললেন, ধনীরা যাতে ক্ষুধার যন্ত্রণা অনুভব করতে পারে, ফলে সে ক্ষুধার্তকে কখনও ভুলবে না। এটি সাওম শরী‘আতসম্মত হওয়ার কিছু উপকারিতা। সালমান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, “রমযান মাস পরস্পর সহমর্মিতার মাস।” যে ব্যক্তি অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পর্যায়ে পৌঁছতে পারবে না সে সহমর্মিতার দলের স্তরে পৌঁছতে পারবে না। অনেক পূর্বসূরীরা ইফতারের সময় সহমর্মিতা ও অন্যকে অগ্রাধিকার দিতেন। ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা মিসকীন ব্যতীত ইফতার করতেন না। পরিবারের কেউ নিষেধ করলে তিনি সে রাতে কিছু খেতেন না। তিনি খাদ্য খাওয়ার সময় কেউ আসলে তিনি তার ভাগের খাবার নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন এবং কোনো প্রার্থনাকারীকে দিতেন। তিনি যখন ঘরে ফিরে আসতেন তখন অন্যদের খাবার খাওয়া শেষ হয়ে যেত। ফলে তিনি না খেয়েই সেদিন সাওম পালন করতেন।

এক সৎব্যক্তি সারাদিন সাওম পালন করে খাবার খাওয়ার ইচ্ছা করল। এমতাবস্থায় তার কাছে আরেকজন সাওম পালনকারী এসে বলল, কে আছ সত্যবাদী ক্ষুধার্ত এক ব্যক্তিকে খাদ্য দিবে? তখন তিনি বললেন, সাওয়াব বিহীন আল্লাহর এ বান্দা খাদ্য দিবে। তখন উক্ত ব্যক্তি খাবারের বাটি নিয়ে চলে গেল আর সৎলোকটি ক্ষুধার্ত থেকেই রাত কাটাল।

একলোক ইমাম আহমাদ রহ.-এর কাছে এসে কিছু চাইল। তিনি তার ইফতারির জন্য প্রস্তুতকৃত দু’টি রুটিই তাকে দান করে দিলেন। অতঃপর তিনি ক্ষুধার্ত অবস্থায়ই সকাল করলেন। হাসান রহ. সাওম পালন করে নিজে না খেয়ে লোকদেরকে খাবার খাওয়াতেন এবং পাশে বসে তাদেরকে খাওয়ার জন্য উৎসাহিত করত।

৮. সাওমের আরও অনেক উপকারিতা রয়েছে। ইমাম শাফে‘ঈ রহ. বলেছেন: রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণে এবং মানুষের কল্যাণ, প্রয়োজনীয়তা ও সালাত-সাওমের ব্যস্ততার কারণে জীবিকা নির্বাহে কম সময় পাওয়ার কারণে রমযান মাসে বেশি বেশি দান-সদকা করা আমি পছন্দ করি।

৯. রমযান মাসে বেশি পরিমাণে পরস্পর কুরআন পাঠ, শিক্ষা দেওয়া, এ জন্য একত্রিত হওয়া ও যিনি ভালো হাফিয তার কাছে কুরআন শুনানো ইত্যাদি হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। এ হাদীসে রমযান মাসে অধিক পরিমাণে কুরআন তিলাওয়াত মুস্তাহাব প্রমাণিত।  

ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার হাদীসে এসেছে,

«أَنَّ جِبْرَائِيلَ كَانَ يُعَارِضُهُ بِالْقُرْآنِ فِي كُلِّ عَامٍ مَرَّةً، وَأَنَّهُ عَارَضَهُ بِهِ الْعَامَ مَرَّتَيْنِ».

“জিবরীল আলাইহিস সালাম প্রতি বছর আমাকে একবার কুরআন পড়ে শুনাতেন। এ বছর তিনি তা আমাকে দু’বার পড়ে শুনিয়েছেন”।[50]

ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমার থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও জিবরীল পরস্পর রাতের বেলায় কুরআন পড়ে শুনাতেন।[51] অতএব, রমযানে রাতের বেলায় বেশি পরিমাণে কুরআন তিলাওয়াত করা মুস্তাহাব। কেননা রাতের বেলায় মানুষ ঝামেলা মুক্ত থাকে, সমস্ত হিম্মত একত্রিত হয়, অন্তর ও যবান চিন্তা-গবেষণার জন্য একনিষ্ঠ হয়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿إِنَّ نَاشِئَةَ ٱلَّيۡلِ هِيَ أَشَدُّ وَطۡ‍ٔٗا وَأَقۡوَمُ قِيلًا٦﴾ [المزمل: ٦]

“নিশ্চয় রাত জাগরণ আত্মসংযমের জন্য অধিকতর প্রবল এবং স্পষ্ট বলার জন্য অধিকতর উপযোগী”। [সূরা আল-মুয্যাম্মিল, আয়াত: ৬]

কুরআনের সাথে রয়েছে রমযান মাসের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿شَهۡرُ رَمَضَانَ ٱلَّذِيٓ أُنزِلَ فِيهِ ٱلۡقُرۡءَانُ هُدٗى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَٰتٖ مِّنَ ٱلۡهُدَىٰ وَٱلۡفُرۡقَانِ١٨٥﴾ [البقرة: ١٨٥]

“রমযান মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে মানুষের জন্য হিদায়াতস্বরূপ এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে”। [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮৫] ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন, আল-কুরআন লাওহে মাহফূয থেকে বাইতুল ইয্যতে কদরের রাত্রিতে একত্রে নাযিল হয়।[52] এ মতের পক্ষে দলীল হলো আল্লাহ তা‘আলার নিম্নোক্ত বাণী,

﴿إِنَّآ أَنزَلۡنَٰهُ فِي لَيۡلَةِ ٱلۡقَدۡرِ١﴾ [القدر: ١]

“নিশ্চয় আমরা এটি (কুরআন) নাযিল করেছি লাইলাতুল কদরে”। [সূরা আল-কাদর, আয়াত: ১]

﴿إِنَّآ أَنزَلۡنَٰهُ فِي لَيۡلَةٖ مُّبَٰرَكَةٍ٣﴾ [الدخان: ٣] 

“নিশ্চয় আমরা এটি নাযিল করেছি বরকতময় রাতে।” [সূরা আদ-দুখান, আয়াত: ৩] রমযান মাসেই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অহীপ্রাপ্ত হন, এ মাসেই তার ওপর কুরআন নাযিল হয় এবং তিনি অন্যান্য সময়ের তুলনায় রমযানে কিয়ামুল লাইলে দীর্ঘ সময় ধরে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে রমযান মাসে রাতে সালাত আদায় করেছেন। তিনি বলেন,

«ثُمَّ قَرَأَ الْبَقَرَةَ، ثُمَّ النِّسَاءَ، ثُمَّ آلَ عِمْرَانَ، لَا يَمُرُّ بِآيَةِ تَخْوِيفٍ إِلَّا وَقَفَ عِنْدَهَا… فَمَا صَلَّى إِلَّا رَكْعَتَيْنِ حَتَّى جَاءَ بِلَالٌ فَآذَنَهُ بِالصَّلَاةِ».

“অতঃপর তিনি সূরা আর-বাকারাহ পড়লেন, অতঃপর সূরা আন-নিসা, অতঃপর সূরা আলে ইমরান পড়লেন। ভয়-ভীতির আয়াত আসলেই তিনি থেমে যেতেন (সেখানে চিন্তা-ভাবনা করতেন), এভাবে মাত্র দু’রাকাত সালাত আদায় করতেই বিলাল রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু এসে ফজরের আযান দিলেন”।[53] নাসায়ীর বর্ণনায় এসেছে,

«فَمَا صَلَّى إِلَّا أَرْبَعَ رَكَعَاتٍ».

“এভাবে মাত্র চার রাকাত সালাত আদায় করতেই বিলাল রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু ফজরের আযান দিলেন”।[54]

«وكان عُمر رضي الله عنه: أمر أبيَّ بن كعب، وتميمًا الداريَّ، أن يقوما بالناسِ في شهر رمضان، فكان القارئ يقرأ بالمائتين في الركعة، حتى كانوا يعتمدون على العصي من طول القيام، وما كانوا ينصرفون إلا عند الفجر».

উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু উবাই ইবন কা‘ব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু ও তামীম আদ-দারী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে রমযান মাসে লোকদেরকে জামা‘আতে সালাত আদায় করার জন্য ইমাম নিযুক্ত করেন। তারা এক রাকাতে দু’শ পরিমাণ আয়াত তিলাওয়াত করতেন। এমনকি দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার কারণে তারা লাঠিতে ভর দিয়ে সালাত আদায় করতেন এবং ফজরের আগে তারা ফিরতেন না।[55] অন্য বর্ণনায় এসেছে, তারা মসজিদের খুঁটির সাথে রশি লাগাতেন, তাতে নিজেদেরকে আটকে রাখতেন।

বর্ণিত আছে যে,

«أن عمر جمع ثلاثة قراء، فأمر أسرعهم قراءة أن يقرأ بالناس بثلاثين، وأوسطهم بخمس وعشرين، وأبطأهم بعشرين».

“উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তিনজন কারীকে একত্রিত করে তাদেরকে নির্দেশ দিলেন, যে ব্যক্তি দ্রুততার সাথে তিলাওয়াত করবে সে এক রাকাতে ত্রিশ আয়াত পরিমাণ পড়বে, মধ্যম গতিতে তিলাওয়াতকারী পঁচিশ আয়াত ও ধীরগতির তিলাওয়াতকারী বিশ আয়াত পরিমাণ তিলাওয়াত করবে”।[56] অতঃপর তাবে‘ঈদের যুগে আট রাকাত তারাবীতে সূরা বাকারা তিলাওয়াত করা হতো। তারা বারো রাকাত তারাবীহ আদায় করলে আরেকটু হালকা তথা আরো কম পরিমাণে তিলাওয়াত করত। ইমাম আহমাদ রহ. কে উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর নির্ধারণকৃত দ্রুত ও ধীর গতির কারীর আয়াতের পরিমাণের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, এ পরিমাণ তিলাওয়াত করা মানুষের জন্য কষ্টকর, বিশেষ করে রাত্রি যখন ছোট হয়। প্রকৃতপক্ষে মানুষ যতটুকু গ্রহণ করতে পারে ততটুকুই তিলাওয়াত করা উচিৎ। ইমাম আহমদ রহ. রমযানে তারাবীর ইমামতি পালনকারী তার এক ছাত্রকে বললেন, তারা দুর্বল লোক। সুতরাং তাদেরকে নিয়ে পাঁচ বা ছয় বা সাত আয়াত পরিমাণ তিলাওয়াত করো। ফলে তিনি এভাবেই তিলাওয়াত করলেন এবং সাতাশ রমযান কুরআন খতম করলেন। হাসান রহ. বলেন, উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু যাদেরকে লোকদের ইমামতির দায়িত্ব দিয়েছেন তাদেরকে পাঁচ ছয় আয়াত পরিমাণ তিলাওয়াত করতে বলেছেন।

অতএব, ইমাম আহমাদ রহ. এর মত দ্বারা এটিই প্রমাণিত হয় যে, মুসল্লীর অবস্থা ভেদে ইমাম তিলাওয়াত করবেন যাতে তাদের কষ্ট না হয়। অনেক ফকীহ এ মতানুযায়ী তাদের মত ব্যক্ত করেছেন।

«فَقُلْنَا لَهُ: يَا رَسُولَ اللهِ، لَوْ نَفَّلْتَنَا بَقِيَّةَ لَيْلَتِنَا هَذِهِ؟ فَقَالَ: إِنَّهُ مَنْ قَامَ مَعَ الإِمَامِ حَتَّى يَنْصَرِفَ كُتِبَ لَهُ قِيَامُ لَيْلَةٍ».

 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের এক তৃতীয়াংশ পর্যন্ত সালাত আদায় করলেন, পরবর্তীতে অর্ধ রাত্রি পর্যন্ত সালাত আদায় করলেন। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের রাতের অবশিষ্ট অংশটিও যদি নফল আদায় করে অতিবাহিত করে দিতেন! তিনি বললেন, কেউ যদি ইমামের সঙ্গে সালাতে দাঁড়ায় এবং ইমামের শেষ করা পর্যন্ত তার সাথে দাঁড়িয়ে থাকে তবে তার জন্য সারারাত (নফল) সালাত আদায়ের সওয়াব লেখা হয়”।[57]

এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, রাতের এক তৃতীয়াংশ বা অর্ধরাত কিয়ামুল লাইল আদায় করলে সারারাত নফল সালাত আদায়ের সাওয়াব লিখা হয়, তবে শর্ত হচ্ছে ইমামে সাথে থাকতে হবে। ইমাম আহমাদ রহ. এ হাদীস গ্রহণ করতেন এবং ইমাম শেষ না করা পর্যন্ত তার সাথে থাকতেন। কেউ কেউ বলেছেন: যে ব্যক্তি রাতের অর্ধেক কিয়ামুল লাইল আদায় করে সে যেন সারারাতই সালাত আদায় করল। আব্দুল্লাহ ইবন ‘আমর ইবনুল ‘আস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«مَنْ قَامَ بِعَشْرِ آيَاتٍ لَمْ يُكْتَبْ مِنَ الغَافِلِينَ، وَمَنْ قَامَ بِمِائَةِ آيَةٍ كُتِبَ مِنَ القَانِتِينَ، وَمَنْ قَامَ بِأَلْفِ آيَةٍ كُتِبَ مِنَ المُقَنْطِرِينَ».

“যে ব্যক্তি রাতের বেলায় সালাতে দশ আয়াত পরিমাণ তিলাওয়াত করবে তার নাম গাফিলদের অন্তর্ভুক্ত হবে না, আর যে ব্যক্তি একশত আয়াত পরিমাণ তিলাওয়াত করবে তাকে কানেতীনদের (চির অনুগত) অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং যে ব্যক্তি একহাজার আয়াত পরিমাণ তিলাওয়াত করবে তাকে মুকানতিরীনদের (অঢেল সম্পদশালী) দলভুক্ত করা হবে।”[58] 

যে ব্যক্তি আরও বেশি তিলাওয়াত করতে চায় ও দীর্ঘ সময় ধরে সালাত আদায় করতে আগ্রহী হলে একাকী সালাত আদায় করলে যত ইচ্ছা দীর্ঘ করতে পারবে। এমনিভাবে জামা‘আতের সাথে সালাত আদায় করলেও জামা‘আতে যতটুকু তিলাওয়াত করা হয় ততটুকুর উপর সন্তুষ্ট থাকা উচিৎ। কতিপয় সৎপূর্বসূরী বলেছেন: রমযানে প্রতি তিন রাতে তারাবীহ’তে কুরআন খতম করা যায়, কেউ কেউ সাত রাতের কথা বলেছেন। আবার কেউ দশ রাতের কথাও উল্লেখ করেছেন।

পরিচ্ছেদ: তারাবীহ

তারাবীহর সালাত আদায় করা সুন্নাত। আর তা জামা‘আতে আদায় করা উত্তম। সাহাবীদের জামা‘আতের সাথে এ সালাত আদায় সর্বজনবিদিত এবং সর্বযুগের উম্মত এ মতটি গ্রহণ করেছেন।

….

শাইখ তাকীউদ্দীন রহ. বলেছেন: কেউ ইচ্ছা করলে বিশ রাকাত তারাবীহ আদায় করতে পারে, এটি হাম্বলী ও শাফে‘ঈ মাযহাবের প্রসিদ্ধ মতামত। আবার কেউ ছত্রিশ রাকাত আদায় করতে পারে, যা মালেকী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মতামত। আবার কেউ এগারো বা তেরো রাকাতও আদায় করতে পারে। সবটিই উত্তম। তবে রাকাত সংখ্যা কম বা বেশি নির্ভর করে দীর্ঘ সময় ধরে তিলাওয়াত কম বা বেশির ওপর।

উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু উবাই ইবন কা‘ব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর ইমামতিতে বিশ রাকাতের উপর একত্রিত করেছিলেন। সাহাবীদের কেউ কেউ এরচেয়ে কম বা বেশি করতেন। শরী‘আতে রাকাত সংখ্যা নির্ধারিত নেই।

অনেক ইমাম তারাবীহ সালাতে এত দ্রুত কুরআন তিলাওয়াত করেন যে তারা কি তিলাওয়াত করছেন কিছুই বুঝা যায় না, রুকু ও সিজদাও ধীরস্থিরতার সাথে আদায় করে না অথচ ধীরস্থিরতার সাথে রুকু-সাজদাহ করা সালাতের অন্যতম রুকন। সালাত এমনভাবে আদায় করা উচিৎ যাতে অন্তর আল্লাহর সামনে উপস্থিতি অনুভব করে, তিলাওয়াতকৃত আল্লাহর কালাম বুঝে উপদেশ গ্রহণ করা যায়। আর তাড়াহুড়া করলে এগুলো করা সম্ভবপর হয় না। অতএব, ধীরস্থিরতার সাথে রুকু-সাজদাহ আদায় করে ছোট কিরাত পড়া তাড়াহুড়া করে মাকরূহের সাথে দীর্ঘ কিরাত পড়ার চেয়ে উত্তম।

দীর্ঘ কিরাত ও প্রশান্তির সাথে তেরো রাকাত তারাবীহ আদায় করা মাকরূহসহ তাড়াহুড়া করে পড়ার চেয়ে উত্তম। কেননা সালাতের মূল ও আত্মা হলো আল্লাহর সামনে অন্তরসহ উপস্থিত হওয়া। অনেক সময় অল্প কাজ বেশি কাজের চেয়ে উত্তম। তাছাড়া তারতীলসহ কিরাত তিলাওয়াত বৈধ দ্রুততার সাথে কিরাত তিলাওয়াতের চেয়ে উত্তম। আর কিরাতের বৈধ সীমা হলো তিলাওয়াতের সময় কোনো হরফ বাদ পড়ে না যাওয়া। তাড়াহুড়ার কারণে কোনো হরফ বাদ পড়ে গেলে তার তিলাওয়াত জায়েয হবে না; বরং এ ধরণের তিলাওয়াত করা নিষেধ। কিন্তু স্পষ্টকরে কিরাত পড়লে ইমামের পিছনের মুসল্লীগণ যদি সে কিরাত দ্বারা উপকৃত হতে পারে তাহলে ততটুকু দ্রুত পড়া বৈধ।

যারা কুরআনের অর্থ না বুঝে কুরআন পড়ে তাদেরকে আল্লাহ নিন্দা করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿وَمِنۡهُمۡ أُمِّيُّونَ لَا يَعۡلَمُونَ ٱلۡكِتَٰبَ إِلَّآ أَمَانِيَّ٧٨﴾ [البقرة: ٧٨] 

“আর তাদের মধ্যে আছে নিরক্ষর, তারা মিথ্যা আকাঙ্খা ছাড়া কিতাবের কোনো জ্ঞান রাখে না”। [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ৭৮] অর্থাৎ অর্থ না বুঝে তিলাওয়াত করা। কুরআন নাযিলের উদ্দেশ্যই হলো কুরআন বুঝা এবং সে অনুযায়ী আমল করা। শুধু তিলাওয়াতের জন্য কুরআন নাযিল হয় নি।

সুন্দর কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত মুস্তাহাব। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَتَغَنَّ بِالقُرْآنِ».

“যে ব্যক্তি সুন্দর আওয়াজে কুরআন পড়ে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়”।[59]

ইমাম যুহুরী রহ. রমযান আগমন করলে বলতেন, এটি কুরআন তিলাওয়াত ও মানুষকে খাদ্য খাওয়ানোর মাস।

ইবন আব্দুল হাকাম রহ. বলেন, রমযান মাস আসলে ইমাম মালিক রহ. হাদীস পাঠ ও আহলে ইলমের মসলিস বন্ধ দিয়ে মুসহাফ থেকে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। আব্দুর রাযযাক রহ. বলেন, রমযান মাস আগমন করলে ইমাম সাওরী রহ. অন্যান্য সমস্ত (নফল) ইবাদত বাদ দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। সুফইয়ান রহ. বলেন, যায়েদ আল-ইয়াম্মী রহ. রমযান আসলে কুরআন তিলাওয়াত করতেন এবং তার সাথীদেরকেও কুরআন তিলাওয়াতে একত্রিত করতেন। সৎপূর্বসূরীগণ রমযান আসলে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। তাদের কেউ কেউ সাত দিনে, কেউ তিন দিনে, আবার কেউ দু’রাতে, কেউ আবার শেষ দশকের প্রতি রাতে কুরআন খতম করতেন। হাদীসে তিন দিনের কমে কুরআন খতমের যে নিষেধাজ্ঞা এসেছে তা নিয়মিতভাবে সর্বদা এভাবে খতম করা নিষেধ করা হয়েছে। অন্যদিকে সম্মানিত সময় যেমন রমযান মাসে, বিশেষ করে রমযানের রাতে কদরের রাত তালাশের উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত এবং মর্যাদাবান স্থানে উক্ত সময় ও স্থানকে কাজে লাগাতে বেশি পরিমাণ কুরআন তিলাওয়াত করা মুস্তাহাব। এটি ইমাম আহমাদ ও অন্যদের মতামত। এ মতানুযায়ীই অধিকাংশ আলেমের আমল দেখা যায়। আবু উমামা আল-বাহেলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,

: «اقْرَءُوا الْقُرْآنَ فَإِنَّهُ يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ شَفِيعًا لِأَصْحَابِهِ».

“তোমরা কুরআন তিলাওয়াত করো, কেননা কিয়ামতের দিন তা তার তিলাওয়াতকারীর জন্য শাফায়াতকারী হিসেবে আসবে”।[60]

ইবন মাস‘ঊদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللهِ فَلَهُ بِهِ حَسَنَةٌ، وَالحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا، لاَ أَقُولُ الْم حَرْفٌ، وَلَكِنْ أَلِفٌ حَرْفٌ وَلاَمٌ حَرْفٌ وَمِيمٌ حَرْفٌ».

“যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার কিতাবের একটি হরফ পাঠ করবে তার জন্য একটি নেকী, আর একটি নেকী দশ গুণ হবে। আমি এ কথা বলব না যে, আলিফ লাম মীম একটি হরফ, বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ এবং মীম একটি হরফ।”[61] তাহলে রমযান মাসে এ আমলের সাওয়াব কত বেশি গুণ বর্ধিত হবে তা সহজেই অনুমেয়।

ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«يُقَالُ لِصَاحِبِ الْقُرْآنِ اقْرَأْ وَارْتَقِ وَرَتِّلْ كَمَا كُنْتَ تُرَتِّلُ فِي الدُّنْيَا، فَإِنَّ مَنْزِلَتَكَ عِنْدَ آخِرِ آيَةٍ تَقْرَؤُهَا».

“কুরআন বহনকারীকে কিয়ামতের দিনে বলা হবে তুমি কুরআন পড়তে থাক এবং উপরে উঠতে থাক, তারলীলসহকারে পড়তে থাক, যেমনিভাবে দুনিয়াতে তারলীলসহকারে তিলাওয়াত করতে। কেননা তোমার সর্বশেষ আসন হবে সেখানে, যেখানে তোমার আয়াত তিলাওয়াত শেষ হবে”।[62]

ইমাম আহমাদ ও অন্যদের বর্ণনায় আবু সা‘ঈদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«وَيَصْعَدُ بِكُلِّ آيَةٍ دَرَجَةً حَتَّى يَقْرَأَ آخِرَ شَيْءٍ مَعَهُ».

“(অতঃপর সে পড়তে থাকবে) এবং প্রতিটি আয়াত পড়ার সাথে সাথে একটি স্তর অতিক্রম করবে। এভাবে সে তার সাথে থাকা শেষ আয়াতটি পর্যন্ত পড়বে ও স্তর অতিক্রম করবে।”[63]

জেনে রাখুন, মুমিনের জন্য রমযান মাসে দু’টি জিহাদ একত্রিত হয়। একটি দিনের বেলায় সাওম পালন করে নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ এবং অন্যটি রাতের বেলায় সালাত আদায়। যে ব্যক্তির মধ্যে এ দু’টি জিহাদ একত্রিত হবে, এ দু’টির হক আদায় করবে এবং ধৈর্যধারণ করবে সে-ই অপরিসীম পরিপূর্ণ সাওয়াব পাবে।

কা‘ব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, কিয়ামতের দিন একজন আহ্বানকারী ডেকে বলবেন, প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য রয়েছে তার কর্মের প্রতিদান ও আরও বেশি। তবে আহলে কুরআন ও সিয়াম পালনকারীগণ ব্যতীত। তাদের প্রতিদান বে-হিসাব। কুরআন ও সিয়াম আল্লাহর কাছে ব্যক্তির জন্য শাফা‘আত করবে।

…..

সাওম যে ব্যক্তিকে সমস্ত হারাম কাজ থেকে বিরত রেখেছে তার জন্য সাওম কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে শাফা‘আত করবে এবং বলবে, হে আমার রব! আমি তাকে দিনের বেলায় প্রবৃত্তির কামনা থেকে বিরত রেখেছি, সুতরাং আমার শাফা‘আত গ্রহণ করুন। কিন্তু হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার কারণে যার সাওম নষ্ট হয়ে গেছে সাওম তার বিরুদ্ধে উল্টো অভিযোগ করবে এবং বলবে, হে আল্লাহ আমাকে যেভাবে ধ্বংস করেছে তুমিও তাকে সেভাবে ধ্বংস করুন।

কোন এক সৎপূর্বসূরী বলেছেন: কিয়ামতের দিন যখন মুমিনকে উপস্থিত করা হবে তখন আল্লাহ ফিরিশতাকে বলবেন, তার মাথার ঘ্রাণ দেখ। সে বলবে, তার মাথায় কুরআনের ঘ্রাণ পাচ্ছি। অতঃপর বলা হবে, তার ক্বলবের ঘ্রাণ দেখ। ফিরিশতা বলবে, তার ক্বলবে সিয়ামের ঘ্রাণ পাচ্ছি। আবার বলা হবে, তার পায়ের ঘ্রাণ নাও। সে বলবে, তার পায়ে রাত জেগে সালাতের ঘ্রাণ পাচ্ছি। তখন আল্লাহ বলবেন, সে (আমার বান্দা) নিজেকে হিফাযত করেছে, আল্লাহও তাকে হিফাযত করেছেন। এমনিভাবে কুরআন যাকে রাতে ঘুমানো থেকে বিরত রেখেছে কিয়ামতের দিনে তার জন্য শাফা‘আত করবে। সুতরাং যে ব্যক্তি কুরআন তিলাওয়াত করেছে এবং রাতের বেলায় সালাতে দাঁড়িয়ে কুরআন পড়েছে সে-ই যথার্থভাবে কুরআনের হক আদায় করেছে। ফলে কুরআন তার জন্য শাফা‘আত করবে। একবার রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে শুরাইহ আল-হাদরামী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর আলোচনা হলো। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,

« ذلك لَا يَتَوَسَّدُ الْقُرْآنَ».

“সে কুরআনকে বালিশ বানায় না (অর্থাৎ সে কুরআনের উপর ঘুমায় না যাতে তা বালিশের মতো হয়ে যায়, বরং সে কুরআন না পড়ে ঘুমায় না এবং যত্নের সঙ্গে রাত্রে কুরআন পড়ে থাকে)।”[64]

ইমাম আহমাদ বুরাইদা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে মারফূ‘ সূত্রে বর্ণনা করেন,

«إِنَّ الْقُرْآنَ يَلْقَى صَاحِبَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حِينَ يَنْشَقُّ عَنْهُ قَبْرُهُ كَالرَّجُلِ الشَّاحِبِ. فَيَقُولُ لَهُ: هَلْ تَعْرِفُنِي؟ فَيَقُولُ: مَا أَعْرِفُكَ فَيَقُولُ: أَنَا صَاحِبُكَ الْقُرْآنُ الَّذِي أَظْمَأْتُكَ فِي الْهَوَاجِرِ وَأَسْهَرْتُ لَيْلَكَ، وَإِنَّ كُلَّ تَاجِرٍ مِنْ وَرَاءِ تِجَارَتِهِ، وَإِنَّكَ الْيَوْمَ مِنْ وَرَاءِ كُلِّ تِجَارَةٍ فَيُعْطَى الْمُلْكَ بِيَمِينِهِ، وَالْخُلْدَ بِشِمَالِهِ، وَيُوضَعُ عَلَى رَأْسِهِ تَاجُ الْوَقَارِ، وَيُكْسَى وَالِدَاهُ حُلَّتَيْنِ لَا يُقَوَّمُ لَهُمَا أَهْلُ الدُّنْيَا فَيَقُولَانِ: بِمَ كُسِينَا هَذَا؟ فَيُقَالُ: بِأَخْذِ وَلَدِكُمَا الْقُرْآنَ. ثُمَّ يُقَالُ لَهُ: اقْرَأْ وَاصْعَدْ فِي دَرَجِ الْجَنَّةِ وَغُرَفِهَا، فَهُوَ فِي صُعُودٍ مَا دَامَ يَقْرَأُ، هَذًّا كَانَ، أَوْ تَرْتِيلًا».

“কিয়ামতের দিন কুরআন ওয়ালা যখন সে কবর থেকে উত্থিত হবে তখন কুরআন তার সাথে ফ্যাকাশে রঙ্গ অবস্থায় মিলিত হয়ে বলবে, তুমি কি আমাকে চেন? সে বলবে, আমি তো আপনাকে চিনি না। তখন কুরআন বলবে, আমি তোমার সাথী কুরআন যে তোমাকে দিনের বেলায় (দ্বিপ্রহরে) তৃষ্ণার্ত রেখেছে এবং রাতের বেলায় জাগিয়ে রেখেছে। আজ প্রত্যেক ব্যক্তি তার পশ্চাতে পাঠানো ফলাফল পাবে। আজ তোমার ব্যবসার ফলাফল গ্রহণ করো। তখন তার ডানে রাজত্ব ও বামে জান্নাতুল খুলদ দেওয়া হবে। তার মাথায় সম্মানের মুকুট পরিয়ে দেওয়া হবে এবং তার পিতামাতাকে দু’টি চাদর পরিধান করানো হবে যার মূল্য দুনিয়াবাসীরা দিতে পারবে না। তারা বলবেন, আমাদেরকে কিসের বিনিময়ে এ চাদর পরিধান করা হলো? তাদেরকে বলা হবে, আপনাদের সন্তানকে কুরআন শিক্ষা দেওয়ার জন্য। অতঃপর তাকে (কুরআনধারী) বলা হবে, তুমি কুরআন পড়তে থাকো আর জান্নাতের এক একটি স্তর ও রুমে উঠতে থাকো। সে যতক্ষণ কুরআন পড়তে থাকবে ততক্ষন উপরে উঠতে থাকবে, চাই সে দ্রুত তিলাওয়াত করুক বা তারতীলের সাথে ধীরে ধীরে তিলাওয়াত করুক।”[65]

ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, কুরআনের ধারক-বাহককে যেন রাতে মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন তাকে বিশেষভাবে চেনা যায়, দিনে মানুষ যখন কর্মব্যস্ত থাকে তখন তাকে বিশেষভাবে চেনা যায়, মানুষ যখন বিভিন্ন কথাবার্তায় মগ্ন থাকে তখন তাকে চুপ থাকার কারণে চেনা যায়, মানুষ যখন খুশিতে মত্ত থাকে তখন তাকে চিন্তিত হওয়ার মাধ্যমে চেনা যায়।  

উহাইব রহ. বলেন, এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করা হলো, আপনি কেন ঘুমান না? সে বলল, কুরআনের বিস্ময় আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছে।

একলোক তার বন্ধুর সাথে দুমাস একত্রে থাকল; কিন্তু তাকে কখনও ঘুমাতে দেখেনি। তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনাকে কখনও ঘুমাতে দেখি না কেন? তিনি বললেন, কুরআনের বিস্ময় আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছে। কুরআনে এক বিস্ময় থেকে বের হলেই আরেক বিস্ময়ে পড়ে যাই (ফলে আর ঘুমাতে পারি না)।

আহমাদ ইবন আবিল-হাওয়ারী রহ. বলেন, আমি যখন কুরআন পড়ি তখন এক আয়াত এক আয়াত করে এতে গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করি। তখন আমার জ্ঞান হয়রান হয়ে যায়। আমি কুরআনের হাফিযদের ব্যাপারে আশ্চর্য হয়ে যাই কিভাবে তাদের ঘুম আসে বা তারা কিভাবে দুনিয়ার কাজ-কর্মে ব্যস্ত হয়ে যায় অথচ তারা কুরআন তিলাওয়াত করে? তারা যদি কুরআন অনুধাবন করত, কুরআনের হক যথাযথ বুঝত, এর স্বাদ পেত এবং এর দ্বারা মুনাজাত করত তাহলে আল্লাহ তাদেরকে (কুরআন বুঝার) যে নি‘আমত দিয়েছেন সে আনন্দে ঘুম চলে যেত।

অন্যদিকে যার কাছে কুরআন আছে; কিন্তু সে কুরআন ছেড়ে রাতের বেলায় শুধু ঘুমিয়েছে এবং দিনের বেলায় কুরআন অনুযায়ী আমল করে নি, কিয়ামতের দিন কুরআন তার প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াবে এবং সে তার নষ্টকৃত অধিকার চাইবে।

ইমাম আহমাদ রহ. সামুরাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বপ্নে দেখলেন,

«فَإِذَا رَجُلٌ مُسْتَلْقٍ عَلَى قَفَاهُ، وَرَجُلٌ قَائِمٌ بِيَدِهِ فِهْرٌ، أَوْ صَخْرَةٌ، فَيَشْدَخُ بِهَا رَأْسَهُ، فَيَتَدَهْدَى الْحَجَرُ، فَإِذَا ذَهَبَ لِيَأْخُذَهُ عَادَ رَأْسُهُ كَمَا كَانَ، فَيَصْنَعُ مِثْلَ ذَلِكَ، فَقُلْتُ: مَا هَذَا؟…. ، فَرَجُلٌ آتَاهُ اللهُ الْقُرْآنَ، فَنَامَ عَنْهُ بِاللَّيْلِ، وَلَمْ يَعْمَلْ بِمَا فِيهِ بِالنَّهَارِ، فَهُوَ يُفْعَلُ بِهِ مَا رَأَيْتَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ».     

“একলোক চিৎ হয়ে শুয়ে আছে আর আরেক লোক হাতুড়ি বা পাথর দ্বারা তার মাথায় সজোরে আঘাত করছে, এতে পাথর তার মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিচ্ছে। এভাবে তার মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ হলে আবার তা পূর্বের অবস্থায় ফিরে আনা হয়। এভাবে আবার আগের মতোই করা হয়। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, এ ব্যক্তি কে?  তিনি বললেন, এ ব্যক্তিকে আল্লাহ কুরআন দান করেছিলেন, কিন্তু সে কুরআন না পড়ে রাতে ঘুমিয়ে থাকত আর দিনের বেলায় সে অনুযায়ী আমল করত না। আপনি তাকে যেভাবে দেখেছেন সেভাবে কিয়ামত পর্যন্ত তাকে শাস্তি দেওয়া হবে”।[66] 

আমর ইবন শু‘আইব তার পিতা থেকে, তিনি তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«يُمَثَّلُ الْقُرْآنُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ رَجُلًا، فَيُؤْتَى بِالرَّجُلِ قَدْ حَمَلَهُ فَخَالَفَ أَمْرَهُ، فَيَتَمَثَّلُ خَصْمًا لَهُ فَيَقُولُ: يَا رَبِّ حَمَّلْتَهُ إِيَّايَ فَشَرُّ حَامِلٍ تَعَدَّى حُدُودِي، وَضَيَّعَ فَرَائِضِي، وَرَكِبَ مَعْصِيَتِي، وَتَرَكَ طَاعَتِي، فَمَا يَزَالُ يَقْذِفُ عَلَيْهِ بِالْحُجَجِ حَتَّى يُقَالَ: فَشَأْنُكَ بِهِ فَيَأْخُذُ بِيَدِهِ، فَمَا يُرْسِلُهُ حَتَّى يَكُبَّهُ عَلَى مَنْخِرِهِ فِي النَّارِ، وَيُؤْتَى بِرَجُلٍ صَالِحٍ قَدْ كَانَ حَمَلَهُ، وَحَفِظَ أَمْرَهُ، فَيَتَمَثَّلُ خَصْمًا لَهُ دُونَهُ فَيَقُولُ: يَا رَبِّ حَمَّلْتَهُ إِيَّايَ فَخَيْرُ حَامِلٍ، حَفِظَ حُدُودِي، وَعَمِلَ بِفَرَائِضِي، وَاجْتَنَبَ مَعْصِيَتِي، وَاتَّبَعَ طَاعَتِي، فَمَا يَزَالُ يَقْذِفُ لَهُ بِالْحُجَجِ حَتَّى يُقَالَ: شَأْنُكَ بِهِ، فَيَأْخُذُ بِيَدِهِ فَمَا يُرْسِلُهُ حَتَّى يُلْبِسَهُ حُلَّةَ الْإِسْتَبْرَقِ، وَيَعْقِدَ عَلَيْهِ تَاجَ الْمُلْكِ، وَيَسْقِيَهُ كَأْسَ الْخَمْر». 

“কিয়ামতের দিন কুরআনকে মানুষের আকৃতিতে ব্যক্তির সামনে উপস্থিত করা হবে। অতঃপর ঐ ব্যক্তির সামনে উপস্থিত করা হবে যে কুরআন শিক্ষা করে কুরআনের বিপরীত আমল করেছে। তখন তার প্রতিপক্ষ হয়ে কুরআন আল্লাহর কাছে বলবে, হে আমার রব! আপনি আমাকে অমুকের দ্বারা বহন করিয়েছেন; কিন্তু সে অত্যন্ত খারাপ বহনকারী ছিল। সে আমার সীমালঙ্ঘন করেছে, আমার ফরযসমূহ নষ্ট করেছে, আমার অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়েছে, আমার আনুগত্য বাদ দিয়েছে। এভাবে সে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের পর অভিযোগ দিতেই থাকবে। এমনকি তাকে (কুরআনকে) বলা হবে, তাহলে উক্ত কুরআন ধারণকারীর ফয়সালা তোমাকেই দিলাম। তখন কুরআন তার হাত ধরে টেনে নিয়ে নাকেসা খত দিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে। অন্যদিকে কুরআন ধারণকারী সৎ ব্যক্তির কাছে কুরআনকে উপস্থিত করা হবে যে কুরআনের আদেশ মান্য করেছে। তখন কুরআন তার পক্ষে সাক্ষী হয়ে বলবে, হে আমার রব! আপনি আমাকে এ ব্যক্তির মাধ্যমে ধারণ করিয়েছেন, সে উত্তম ধারণকারী ছিল। সে আমার সীমারেখা সংরক্ষণ করেছে, আমার ফরয অনুযায়ী আমল করেছে, আমার অবাধ্যতা থেকে বিরত থেকেছে, আমার অনুসরণ করেছে, এভাবে তার পক্ষে সাক্ষ্য দিতে থাকবে, এমনকি তাকে (কুরআনকে) বলা হবে, তার সমস্ত ব্যাপার তোমার ওপর ন্যস্ত। তখন সে উক্ত কুরআন ধারণকারীর হাত ধরবে, তাকে জান্নাতের রেশমী কাপড় পরিধান করাবে, তার মাথায় রাজ-মুকুট পরিধান করাবে এবং তাকে মদের কাপ থেকে শরাব পান করাবে।”[67]

পরিচ্ছেদ: কিয়ামু রমযান তথা রমযানে তাহাজ্জুদ

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  বলেছেন:

«مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ».

“যে ব্যক্তি রমযানের রাতে সওয়াবের আশায় রাত জেগে ইবাদত করে, তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।”[68]

রমযানে কিয়ামুল লাইলের (তাহাজ্জুদের) ফযীলত সম্পর্কে এখানে কুরআন ও হাদীস থেকে কতিপয় উদ্ধৃতি পেশ করব। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿تَتَجَافَىٰ جُنُوبُهُمۡ عَنِ ٱلۡمَضَاجِعِ يَدۡعُونَ رَبَّهُمۡ خَوۡفٗا وَطَمَعٗا وَمِمَّا رَزَقۡنَٰهُمۡ يُنفِقُونَ١٦﴾ [السجدة : ١٦] 

“তাদের পার্শ্বদেশ বিছানা থেকে আলাদা হয় (মুমিনরা গভীর রাতে শয্যা ত্যাগ করে)। তারা ভয় ও আশা নিয়ে তাদের রবকে ডাকে। আর আমি তাদেরকে যে রিযিক দান করেছি, তা থেকে তারা ব্যয় করে”। [সূরা আস-সাজদাহ, আয়াত: ১৬]

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: 

﴿كَانُواْ قَلِيلٗا مِّنَ ٱلَّيۡلِ مَا يَهۡجَعُونَ ١٧ وَبِٱلۡأَسۡحَارِ هُمۡ يَسۡتَغۡفِرُونَ١٨﴾ [الذاريات: ١٧،  ١٨] 

“রাতের সামান্য অংশই এরা ঘুমিয়ে কাটাতো। আর রাতের শেষ প্রহরে এরা ক্ষমা চাওয়ায় রত থাকত”। [সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ১৭-১৮]

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿وَٱلَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمۡ سُجَّدٗا وَقِيَٰمٗا٦٤﴾ [الفرقان: ٦٤]   

“আর যারা তাদের রবের জন্য সিজদারত ও দণ্ডায়মান হয়ে রাত্রি যাপন করে”। [সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৬৪]

আব্দুল্লাহ ইবন সালাম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«يَا أَيُّهَا النَّاسُ، أَفْشُوا السَّلَامَ، وَأَطْعِمُوا الطَّعَامَ، وَصَلُّوا وَالنَّاسُ نِيَامٌ تَدْخُلُونَ الجَنَّةَ بِسَلَامٍ».

“হে লোক সকল! তোমরা সালামের প্রসার ঘটাবে, লোকদের খাদ্য দিবে এবং মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকবে (শেষ রাতে) তখন (তাহাজ্জুদের) সালাত আদায় করবে। তাহল তোমরা শান্তি ও নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।”[69]

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«أَفْضَلُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الفَرِيضَةِ صَلَاةُ اللَّيْلِ».

“ফরয সালাতের পরে সবচেয়ে উত্তম সালাত হলো তাহাজ্জুদের সালাত।”[70]

বিলাল রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«عَلَيْكُمْ بِقِيَامِ اللَّيْلِ فَإِنَّهُ دَأَبُ الصَّالِحِينَ قَبْلَكُمْ، وَإِنَّ قِيَامَ اللَّيْلِ قُرْبَةٌ إِلَى اللَّهِ، وَمَنْهَاةٌ عَنْ الإِثْمِ، وَتَكْفِيرٌ لِلسَّيِّئَاتِ، وَمَطْرَدَةٌ لِلدَّاءِ عَنِ الجَسَدِ».

তোমাদের অবশ্যই তাহাজ্জুদের সালাত পড়া উচিৎ। কেননা এটি তোমাদের পূর্ববর্তী ভালো লোকদের অভ্যাস, কিয়ামুল লাইলে রয়েছে আল্লাহর নৈকট্য, গুনাহ থেকে বিরতকারী, গুনাহের কাফফারা এবং শরীরের রোগ-ব্যধির প্রতিষেধক।”[71] 

কাফফারাত ও দারাজাতের হাদীসে এসেছে,

«وَمِنَ الدَّرَجَاتِ إِطْعَامُ الطَّعَامِ، وَطَيِّبُ الْكَلَامِ، وَأَنْ تَقُومَ بِاللَّيْلِ وَالنَّاسُ نِيَامٌ».

“মর্যাদার স্তরের থেকে অন্যতম হলো, খাদ্য খাওয়ানো, উত্তম কথা বলা এবং মানুষ যখন ঘুমে থাকে তখন তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করা।”[72]

«عَجِبَ رَبُّنَا عَزَّ وَجَلَّ مِنْ رَجُلَيْنِ: رَجُلٍ ثَارَ عَنْ وِطَائِهِ وَلِحَافِهِ، مِنْ بَيْنِ أَهْلِهِ وَحَيِّهِ إِلَى صَلَاتِهِ، فَيَقُولُ رَبُّنَا: أَيَا مَلَائِكَتِي، انْظُرُوا إِلَى عَبْدِي، ثَارَ مِنْ فِرَاشِهِ وَوِطَائِهِ، وَمِنْ بَيْنِ حَيِّهِ وَأَهْلِهِ إِلَى صَلَاتِهِ، رَغْبَةً فِيمَا عِنْدِي.

“আমাদের রব দু’ ব্যক্তির কাজে অত্যন্ত আশ্চর্যান্বিত হন। একজন যিনি বিছানা ও লেপ-তোশক ছেড়ে পরিবার-পরিজনের মধ্য থেকে উঠে গিয়ে সালাতে দাঁড়ায়। তখন আমাদের রব ফিরিশতাদেরকে বলেন, হে আমার ফিরিশতাগণ! আমার বান্দাকে দেখ, সে আমার কাছে যা আছে তা পাওয়ার আশায় নিজ শয্যা ত্যাগ করে পরিবার-পরিজনের মধ্য থেকে উঠে তাহাজ্জুদের সালাতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।”[73] 

….

«رَجُلَانِ مِنْ أُمَّتِي يَقُومُ أَحَدُهُمَا مِنَ اللَّيْلَ يُعَالِجُ نَفْسَهُ إِلَى الطَّهُورِ وَعَلَيْهِ عُقَدٌ فَيَتَوَضَّأُ، فَإِذَا وَضَّأَ يَدَيْهِ انْحَلَّتْ عُقْدَةٌ، وَإِذَا وَضَّأَ وَجْهَهُ انْحَلَّتْ عُقْدَةٌ، وَإِذَا مَسَحَ بِرَأْسِهِ انْحَلَّتْ عُقْدَةٌ، وَإِذَا وَضَّأَ رِجْلَيْهِ انْحَلَّتْ عُقْدَةٌ، فَيَقُولُ اللهُ لِلَّذِينَ وَرَاءَ الْحِجَابِ: انْظُرُوا إِلَى عَبْدِي هَذَا يُعَالِجُ نَفْسَهُ يَسْأَلُنِي، مَا سَأَلَنِي عَبْدِي فَهُوَ لَهُ.

“আমার উম্মতের দুব্যক্তির মধ্যে একব্যক্তি রাতের (তাহাজ্জুদের) সালাত পড়তে উঠে নিজে নিজেই পবিত্রতা অর্জন করতে জোর চেষ্টা করল; অথচ তার উপরে ছিল শয়তানের বিছিয়ে রাখা কতগুলো গিরা বা বন্ধন। ফলে সে অযু করল। সে যখন অযু করতে দুহাত ধৌত করল তখন তার হাতের গিরা খুলে গেল। আবার যখন চেহারা ধৌত করল তখন তার চেহারার গিরা খুলে গেল। এভাবে যখন মাথা মাসেহ করল তখন তার মাথার গিরা খুলে গেল। আবার যখন দু’পা ধৌত করল তখন তার পায়ের গিরা খুলে গেল। তখন রব যারা পর্দার আঁড়ালে রয়েছেন তাদেরকে ডেকে বলেন, আমার এ বান্দাহকে দেখ। সে নিজেই নিজের অনুশীলন করছে। এ বান্দা আমার কাছে যা চাইবে আমি তাকে তাই দিব।”[74]

আল্লাহ প্রতি রাতে প্রথম আসমানে নেমে আসেন। অতঃপর তিনি বলতে থাকেন, কোন তাওবাকারী কি আছ? আমি তার তাওবা কবুল করব। কোন ক্ষমাপ্রার্থনাকারী আছ? আমি তাকে ক্ষমা করব। কোনো দো‘আকারী আছ কি? আমি তার ডাকে সাড়া দিব। এভাবে তিনি ফজর পর্যন্ত বলতে থাকেন।

কোনো এক সৎলোক রাতে তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করত। হঠাৎ একরাতে সে ঘুমিয়ে পড়ল। তখন স্বপ্নে তার কাছে একজন এসে বলল, উঠ। তুমি কি জানো না যে, জান্নাতের চাবি রাত জাগরণকারীদের কাছেই থাকে।

ইবন মাস‘ঊদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে একদল লোক বলল, আমরা রাতে তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করতে পারি না। তিনি তাদেরকে বললেন, তোমাদের গুনাহ তোমাদেরকে ঘুমিয়ে রাখে।

কোনো এক লোককে তার কতিপয় প্রিয় লোক বলল, আমরা কিয়ামুল লাইল আদায় করতে অক্ষম। তিনি তাদেরকে বললেন, তোমাদের গুনাহ-খাতা তোমাদেরকে বন্দী করে রেখেছে।

ফুদাইল রহ. বলেন, তুমি যদি তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করতে অক্ষম হও এবং দিনের বেলায় সাওম পালনে অপারগ হও তাহলে জেনে রাখ তুমি একজন বঞ্চিত মানুষ, তোমার গুনাহ তোমাকে বন্দী করে রেখেছে।

ওহে! যে আল্লাহর অনুগত্য ব্যতীত জীবন নিঃশেষ করেছ, ওহে যে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ঘুমিয়ে রাত কাটিয়েছ, ওহে যার পণ্য-সামগ্রী শুধু সময়ক্ষেপণ ও অলসতা, কতই না নিকৃষ্ট তোমার মালামাল, ওহে! যে রমযান মাস আসা সত্ত্বেও কুরআনকে তোমার প্রতিপক্ষ বানিয়েছ, কীভাবে তুমি তার শাফা‘আত কামনা করো যাকে তুমি প্রতিপক্ষ বানিয়েছ? যে সালাতে দণ্ডায়মান হওয়া ব্যক্তিকে অশ্লীলতা ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে না, সেসব তো ব্যক্তির দুর্ভাগ্যই শুধু বৃদ্ধি করে, আর এমন প্রত্যেক সিয়াম পালনকারী যার সিয়াম অশ্লীল কথা ও কাজ থেকে বিরত রাখে না, এসব সিয়াম ব্যক্তির জন্য শাস্তি ও ফেরৎ প্রদান ছাড়া কিছুই জন্ম দেয় না। হে জাতি! কোথায় সিয়ামের প্রভাব? কোথায় রাত্রি জাগরণ করে দাঁড়ানোর নূর?

হে আল্লাহর বান্দা! এটি রমযান মাস। অবশিষ্ট দিনগুলোর সুযোগ গ্রহণ করুন। এ আল্লাহর কিতাব পড়া হচ্ছে এবং শোনা হচ্ছে। এ কিতাব যদি পাহাড়-পর্বতের উপর নাযিল করা হতো তাহলে তা আল্লাহর ভয়ে প্রকম্পিত হতো। অথচ আমাদের অন্তর ভয়ে প্রকম্পিত হয় না, আমাদের চক্ষু ক্রন্দন করে না, আমাদের সাওম পাপাচার থেকে রক্ষা করে না, ফলে আমরা উপকৃতও হই না, আমাদের রাত্রি জাগরণ আমাদেরকে সরল পথে পরিচালিত করতে পারে না ফলে আমরা সালাতের দ্বারা শাফা‘আতও আশা করতে পারি না। আমাদের অন্তর তাকওয়া শুণ্য, এটি ধ্বংসপ্রাপ্ত গৃহের ন্যায়, এতে ধারাবাহিকভাবে গুনাহ আসছেই, ফলে তা সৎপথ দেখে না, ভালো কথা শোনে না। আমাদের কাছে কতবার কুরআন তিলাওয়াত করা হয় অথচ আমাদের অন্তর এখনও পাথরের মতো শক্ত বা এর চেয়েও বেশি কঠিন। কত রমযান আমাদের মাঝে আসে আবার চলে যায় অথচ আমাদের অবস্থা দুর্ভাগাদের মতোই। আমরা তাহলে সে জাতি থেকে কোথায় আছি যারা আল্লাহর ডাক শুনলেই সে ডাকের সাড়া দেয়, যখন তাদের কাছে আল্লাহর কালাম তিলাওয়াত করা হয় তখন তাদের অন্তর প্রকম্পিত হয় এবং তারা আল্লাহর দিকে এগিয়ে আসে।

পরিচ্ছেদ: রমযানের মধ্য দশদিন

আবু সা‘ঈদ খুদুরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَعْتَكِفُ الْعَشْرَ الْوُسُطَ مِنْ رَمَضَانَ.

“রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের মধ্য দশ দিন (১১-২০) ই‘তিকাফ করেছেন।”[75] এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লাইলাতুল কদরের তালাশে রমযানের মাঝের দশদিন সাওম পালন করেছেন। অন্য বর্ণনায় এসেছে,

«أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اعْتَكَفَ الْعَشْرَ الْأُوَلَ مِنْ رَمَضَانَ، ثُمَّ اعْتَكَفَ الْعَشْرَ الْوَسَط» ثم قال: «ثُمَّ أَتَيْتُ، فَقِيلَ لِي: إِنَّهَا فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ، فَمَنْ أَحَبَّ مِنْكُمْ أَنْ يَعْتَكِفَ فَلْيَعْتَكِفْ ” فَاعْتَكَفَ النَّاسُ معه».

“রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (লাইলাতুল কদরের তালাশে) রমযানের প্রথম দশদিন ই‘তিকাফ করেছেন। অতঃপর মধ্যদশ দিন ই‘তিকাফ করেছেন। অতঃপর তিনি বলেন, আমি লাইলাতুল কদরের তালাশে ই‘তিকাফ করতে এসেছি। আমাকে বলা হলো, লাইলাতুল কদর রমযানের শেষ দশকে। অতএব, কেউ (এ দশদিন) ই‘তিকাফ করতে চাইলে সে ই‘তিকাফ করতে পারে। এর ফলে লোকজন তাঁর সাথে ই‘তিকাফ করল।”[76]

রমযানের শেষ অর্ধেকে লাইলাতুল কদর তালাশ করতে নির্দেশ এসেছে। আব্দুল্লাহ ইবন উনাইস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লাইলাতুল কদর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করি। তিনি বলেন,

«إِنِّي رَأَيْتُهَا فَأُنْسِيتُهَا , فَتَحَرَّهَا فِي النِّصْفِ الْآخَرِ».

“আমি লাইলাতুল কদর দেখেছি, অতঃপর আমাকে তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। অতএব, তোমরা রমযানের শেষ অর্ধেকে তালাশ করো”।[77] দিন-রাতের সব সম্মানিত সময়ের শেষার্ধ প্রথমার্ধের চেয়ে উত্তম।

আর দ্বিতীয়ত: আবু দাউদে ইবন মাস‘ঊদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে মারফু‘ সূত্রে বর্ণিত,

«اطْلُبُوهَا لَيْلَةَ سَبْعَ عَشْرَةَ مِنْ رَمَضَانَ».

“রমযানের সতের তারিখ রাতে লাইলাতুল কদর তালাশ করো”।[78] আলিমগণ বলেছেন: লাইলাতুল কদরের দিনের সকাল বদরের দিনের সকালের মতোই। আর সীরাত ও মাগাযী বিশেষজ্ঞদের প্রসিদ্ধ মতানুসারে বদরের রাত ছিল সতেরোই রমযান এবং এ দিনটি জুমু‘আর দিন ছিল। যায়িদ ইবন সাবিত রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু সতেরোই রমযানের মত অন্য রাতে এত বেশি জেগে থাকতেন না। তিনি বলতেন, আল্লাহ বদরের দিন সকালে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য স্পষ্ট করেছেন এবং কাফির নেতাদেরকে সেদিন সকালে চরমভাবে লাঞ্ছিত করেছেন।

ইমাম আহমাদ মদীনাবাসীদের থেকে বর্ণনা করেন, লাইলাতুল কদর সতেরো রমযান তালাশ করা হয়।

সতের তারিখের সবচেয়ে বিশুদ্ধ ঘটনা হলো, এটি বদরের রাত, এ রাতের সকাল হলো ইয়াওমুল ফুরকান তথা সত্য-মিথ্যা পার্থক্যকারী দিন। এটিকে ইয়াওমুল ফুরকান এ কারণে বলা হয় যে, আল্লাহ এ দিনে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নিরূপণ করেছেন, সত্য ও হকপন্থীদেরকে স্পষ্ট করেছেন এবং তাদেরকে বাতিলের ওপর বিজয় দান করেছেন, আল্লাহর কালেমা ও তাওহীদকে বুলন্দ করেছেন এবং তাঁর শত্রু মুশরিক ও আহলে কিতাবীদেরকে অপমানিত করেছেন।

কদরের রাতে ফিরিশতাগণ জমিনে ছড়িয়ে পড়েন। ফলে শয়তানের ক্ষমতা খর্ব হয়ে যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿تَنَزَّلُ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ وَٱلرُّوحُ فِيهَا بِإِذۡنِ رَبِّهِم مِّن كُلِّ أَمۡرٖ ٤ سَلَٰمٌ هِيَ حَتَّىٰ مَطۡلَعِ ٱلۡفَجۡرِ٥﴾ [القدر: 4،  ٥]

“সে রাতে ফিরিশতারা ও রূহ (জিবরীল) তাদের রবের অনুমতিক্রমে সকল সিদ্ধান্ত নিয়ে অবতরণ করে। শান্তিময় সেই রাত, ফজরের সূচনা পর্যন্ত।” [সূরা আল-কাদর, আয়াত: ৪-৫]

মুসনাদে আহমাদে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«إِنَّ الْمَلَائِكَةَ تِلْكَ اللَّيْلَةَ فِي الْأَرْضِ أَكْثَرُ مِنْ عَدَدِ الْحَصَى».

“সে রাতে (কদরের) পৃথিবীতে নাযিলকৃত ফিরিশতার সংখ্যা জমিনে বিস্তৃত পাথর কণার চেয়েও অধিক।”[79]

জাবের রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«لَا يَخْرُجُ شَيْطَانُهَا حَتَّى يُضِيءَ فَجْرُهَا».

“কদরের রাতে ফজর উদিত না হওয়া পর্যন্ত শয়তান বের হয় না।”[80]

ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, প্রতিদিন সূর্যোদয়ের সময় শয়তানও উদিত হয়; তবে কদরের দিন ব্যতীত। আর সেদিন সূর্য উদিত হয় তবে এতে আলোকরশ্মি থাকে না। মুজাহিদ (سلامٌ هي) এর ব্যাখ্যায় বলেন, এ সময় কোন রোগ-ব্যাধি থাকবে না, শয়তান কোন কাজ করতে সক্ষম হবে না। তিনি আরও বলেন, কদরের রাত শান্তির রাত, এ রাতে কোন দুর্ঘটনা ঘটে না এবং শয়তানও প্রেরিত হয় না। তিনি আরও বলেন, এ রাত নিরাপদ, শয়তান এ রাতে খারাপ কাজ করতে পারে না এবং ক্ষতিকর কিছু সংঘটিত হয় না। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন, সে রাতে বিতাড়িত জীন শয়তানকে শিকলে আবদ্ধ করা হয়, খবিশ শয়তানদেরকে আবদ্ধ করা হয়, আসমানে দরজা খুলে দেওয়া হয়, সকল তাওবাকারীদের থেকে তাওবা কবুল করা হয়। এ কারণেই আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿سَلَٰمٌ هِيَ حَتَّىٰ مَطۡلَعِ ٱلۡفَجۡرِ٥﴾ [القدر: ٥]

“শান্তিময় সেই রাত, ফজরের সূচনা পর্যন্ত”। [সূরা আল-কাদর, আয়াত: ৪-৫]

হে মুসলিম! সুসংবাদ গ্রহণ করো। তোমাদের জন্য এ মাসে জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে। জান্নাতের হাওয়া মুমিনের অন্তরে বইছে। জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শয়তান ও তার দোসরদের পায়ে শিকল লাগানো হয়েছে। সুতরাং তাওহীদের বাণী দিয়ে শয়তানের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দাও। সে ভাঙ্গার এ ব্যথা প্রতিটি ফযিলতপূর্ণ মওসুমে ভোগ করতে থাকবে। সে এ মাসে মানুষের জন্য ধ্বংস কামনা করে। কেননা সে দেখে এ মাসে আল্লাহ রহমাত ও মাগফিরাত নাযিল করেন। এ মাসে রহমানের দল বিজয় লাভ করে আর শয়তানের দল পরাজিত হয়।

হে আল্লাহর বান্দা! রমযান মাসের প্রায় অর্ধেক শেষ হয়ে যাচ্ছে। তোমাদের মধ্যে কে নিজের আত্মার মুহাসাবা করেছ? কে এ মাসের হক আদায় করেছ? মনে রেখ, এ মাস কিন্তু শেষ হতে চলছে। অতএব, আমলের পরিমাণ বাড়িয়ে দাও। তুমি তো এ মাসে অবস্থান করছ অথচ মাস তো শেষ হয়ে যাচ্ছে। সব মাসের পরে আরেকটি মাস আসবে; কিন্তু রমযানের পরে কী আর রমযান পাওয়া যাবে?

পরিচ্ছেদ: শেষ দশকের রমজান মাসের ফজিলত

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا دَخَلَ العَشْرُ شَدَّ مِئْزَرَهُ، وَأَحْيَا لَيْلَهُ، وَأَيْقَظَ أَهْلَهُ».

“যখন রমযানের শেষ দশক আসতো তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর লুঙ্গি কষে নিতেন (বেশি বেশি ইবাদতের প্রস্তুতি নিতেন বা স্ত্রীদের থেকে দুরে থাকতেন) এবং রাত্রে জেগে থাকতেন ও পরিবার-পরিজনকে জাগিয়ে দিতেন।”[81]

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন,

«كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَجْتَهِدُ فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ، مَا لَا يَجْتَهِدُ فِي غَيْرِهِ».

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যান্য সময়ের তুলনায় রমযানের শেষ দিকে অধিক পরিমানে এমনভাবে সচেষ্ট থাকতেন যা অন্য সময়ে থাকতেন না।”[82]

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের শেষ দশকে এত পরিমাণ আমল করতেন যা তিনি অন্য কোনো মাসে করতেন না। তাঁর আমলসমূহের মধ্যে অন্যতম আমল হলো: 

রাত্রি জাগরণ: তাঁর আমলসমূহের মধ্যে অন্যতম ছিল রাত জাগরণ।

রাত্রি জাগরণের আরেক অর্থ হতে পারে রাতের অধিকাংশ সময় জেগে ইবাদত করতেন। এক বর্ণনায় এসেছে, যে ব্যক্তি অর্ধরাত জাগ্রত থেকে ইবাদত করল সে যেন পুরো রাত জেগে ইবাদত করল। সহীহ মুসলিমে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«وَمَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَامَ لَيْلَةً حَتَّى الصَّبَاحِ».

“আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সকাল পর্যন্ত জেগে ইবাদত করতে দেখি নি”।[83]

ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কেউ জামা‘আতের সাথে ইশার সালাত আদায় করে ফজরের সালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করার দৃঢ় ইচ্ছা থাকলে তার সারারাত জাগরণের সাওয়াব অর্জিত হবে।

ইমাম শাফে‘ঈ রহ. বলেন, কেউ ইশা ও ফজরের সালাতের জামা‘আতে উপস্থিত হলে সে লাইলাতুল কদরের অংশ প্রাপ্ত হবে। ইবন মুসাইয়্যেব থেকে ইমাম মালিকের থেকেও অনুরূপ বর্ণনা পাওয়া যায়।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে মারফু‘ সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি ইশার সালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করবে সে লাইলাতুল কদর প্রাপ্ত হবে।[84] 

আবু জা‘ফর মুহাম্মাদ ইবন আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে মারফু‘ সুত্রে বর্ণনা করেন,

«مَنْ أَتَى عَلَيْهِ شَهْرُ رَمَضَانَ صَحِيحًا مُسْلِمًا، صَامَ نَهَارَهُ، وَصَلَّى وِرْدًا مِنْ لَيْلِهِ، وَغَضَّ بَصَرَهُ، وَحَفِظَ فَرْجَهُ وَلِسَانَهُ وَيَدَهُ، وَحَافَظَ عَلَى صَلَاتِهِ مَجْمُوعَةً، وَبَكَّرَ إِلَى جُمَعِهِ، فَقَدْ صَامَ الشَّهْرَ، وَاسْتَكْمَلَ الْأَجْرَ، وَأَدْرَكَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ، وَفَازَ بِجَائِزَةِ الرَّبِّ».

“যে ব্যক্তি সুস্থ ও মুসলিম অবস্থায় রমযান পেয়ে দিনের বেলায় সাওম পালন করল, রাতের বেলায় সালাতে কুরআন তিলাওয়াত করল, চক্ষু অবনমিত রাখল, নিজের লজ্জাস্থান, যবান ও হাত হিফাযত করল, জামা‘আতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করল ও খুব তাড়াতাড়ি জুম‘আত সালাতে গেল, তাহলে সে যথাযথভাবে সাওম পালন করল, পুরোপুরি সাওয়াব প্রাপ্ত হবে, লাইলাতুল কদর লাভ করবে এবং তার রবের পুরস্কার প্রাপ্ত হয়ে সফলকাম হবে।[85] ইমাম আবু জা‘ফর রহ. বলেন, এ পুরষ্কার দুনিয়ার রাজা-বাদশার পুরস্কারের সাথে সাদৃশ নয় (বরং এটি মহান রবের বিশেষ পুরস্কার)।

পরিবারের লোকদেরকে জাগানো: রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের শেষ দশকে তাঁর পরিবার-পরিজনকে সালাতের জন্য জাগাতেন, যা তিনি অন্য মাসে করতেন না। আবু যার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, “রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তেইশ, পঁচিশ ও সাতাশ রমযান তার পরিবারকে সালাতের জন্য জাগাতেন। আরও বর্ণিত আছে যে, তিনি বিশেষ করে সাতাশ রমযান তাঁর পরিবার-পরিজনকে সালাতের জন্য আহ্বান করতেন। এটি প্রমাণ করে যে, যে সময় লাইলাতুল কদর হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা তিনি সেসময় তাদেরকে জাগিয়ে দিতেন।

«أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يُوقِظُ أَهْلَهُ فِي العَشْرِ الأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ».

“রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের শেষ দশ দিন তার পরিবারের লোকদেরকে জাগাতেন”।[86]

সুফইয়ান সাওরী রহ. বলেন, আমার কাছে সর্বাধিক প্রিয় কাজ হলো রমযানের শেষ দশ দিন আসলে রাতে বেশি পরিমাণ তাহাজ্জুদ পড়া, এতে কঠোর অধ্যাবসয়ী হওয়া, পরিবার-পরিজন ও সন্তানদেরকে সম্ভব হলে জাগিয়ে দেওয়া। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতিমা ও আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমার দরজায় কড়া নাড়তেন এবং বলতেন, তোমরা কি উঠেছ ও সালাত আদায় করেছ?[87] তিনি রাতের বেলায় তাহাজ্জুদ সালাত শেষে বিতরের সালাত আদায় করার সময় আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে জাগাতেন। তারগীবে বর্ণিত আছে, তিনি তাঁর এক স্ত্রীকে সালাতের জন্য জাগিয়েছেন এবং তার চেহারায় পানির ছিটা দিয়েছেন।

মুয়াত্তায় বর্ণিত আছে,

أَنَّ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ كَانَ يُصَلِّي مِنَ اللَّيْلِ مَا شَاءَ اللهُ. حَتَّى إِذَا كَانَ مِنْ آخِرِ اللَّيْلِ، أَيْقَظَ أَهْلَهُ لِلصَّلاَةِ. يَقُولُ لَهُمُ: الصَّلاَةَ، الصَّلاَةَ. ثُمَّ يَتْلُو هذِهِ الآيَةَ: ﴿وَأۡمُرۡ أَهۡلَكَ بِٱلصَّلَوٰةِ وَٱصۡطَبِرۡ عَلَيۡهَا١٣٢﴾ [طه: ١٣٢] 

“উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু রাতে যতটুকু সম্ভব সালাত আদায় করতেন। রাতের শেষাংশ হলে তিনি তার পরিবারের লোকদেরকে সালাতের জন্য জাগাতেন এবং বলতেন, সালাত, সালাত। অতঃপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করতেন:

﴿وَأۡمُرۡ أَهۡلَكَ بِٱلصَّلَوٰةِ وَٱصۡطَبِرۡ عَلَيۡهَا١٣٢﴾ [طه: ١٣٢]

“আর তোমার পরিবার-পরিজনকে সালাত আদায়ের আদেশ দাও এবং নিজেও তার ওপর অবিচল থাক”। [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ১৩২][88] 

শক্ত করো কোমর বাঁধা: তিনি রমযানের শেষ দশকে লুঙ্গি শক্ত করে বাঁধতেন (অর্থাৎ খুব বেশি ইবাদত করতেন) এবং স্ত্রীদের থেকে আলাদা থাকতেন (অর্থাৎ তাদের বিছানায়া যেতেন না), এভাবে রমযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত করতেন।

তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের শেষ দশদিন যেহেতু ই‘তিকাফ করতেন তাই ই‘তিকাফ অবস্থায় স্ত্রীদের নিকটবর্তী হওয়া তাদের সাথে মেলামেশা করা কুরআন, হাদীস ও ইজমা‘ দ্বারা যেহেতু নিষিদ্ধ তাই তিনি সে সময় স্ত্রীদের কাছে যেতেন না। কোনো কোনো সৎপূর্বসূরী নিম্নোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা এভাবে করেছেন যে,

﴿فَٱلۡـَٰٔنَ بَٰشِرُوهُنَّ وَٱبۡتَغُواْ مَا كَتَبَ ٱللَّهُ لَكُمۡ١٨٧﴾ [البقرة: ١٨٧]

“অতএব, এখন তোমরা তাদের সাথে মিলিত হও এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা লিখে দিয়েছেন, তা অনুসন্ধান কর”। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৭]  অর্থাৎ লাইলাতুল কদর তালাশ করো। এ আয়াতের ব্যাখ্যা এরূপ, সাওমের রাতে আল্লাহ স্ত্রী সহবাস হালাল করেছেন যতক্ষণ না ফজরের সাদা রেখা কাল রেখা থেকে স্পষ্ট হয়। তবে সাথে সাথে তিনি লাইলাতুল কদরও তালাশ করার আদেশ দিয়েছেন যাতে রমযানের সারারাত স্ত্রী উপভোগে কেটে না যায়। আর সারারাত স্ত্রী উপভোগে মত্ত থাকলে লাইলাতুল কদর ছুটে যাবে। এ কারণে রাতে তাহাজ্জুদের সালাত আদায়ের নির্দেশ দিয়ে লাইলাতুল কদর অন্বেষণের নির্দেশ দিয়েছেন, বিশেষ করে সে সব রাতে যাতে লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের প্রথম বিশ দিন তার স্ত্রীগণের কাছে গমন করতেন অতঃপর শেষ দশকে স্ত্রীদের থেকে আলাদা থাকে লাইলাতুল কদরের তালাশে নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন।

রাতের খাবার বিলম্ব করে সাহরীতে গ্রহণ: রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ দশকে রাতের খাবার বিলম্ব করে সাহরীতে একসাথে গ্রহণ করতেন। আবু সা‘ঈদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন যে,

«لاَ تُوَاصِلُوا، فَأَيُّكُمْ إِذَا أَرَادَ أَنْ يُوَاصِلَ، فَلْيُوَاصِلْ حَتَّى السَّحَرِ، قَالُوا: فَإِنَّكَ تُوَاصِلُ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ: إِنِّي لَسْتُ كَهَيْئَتِكُمْ إِنِّي أَبِيتُ لِي مُطْعِمٌ يُطْعِمُنِي، وَسَاقٍ يَسْقِينِ».

“তোমরা সাওমে বেসাল পালন করবে না। তোমাদের কেউ সাওমে বেসাল পালন করতে চাইলে সে যেন সাহরীর সময় পর্যন্ত করে। লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যে সাওমে বেসাল পালন করেন? তিনি বললেন, আমি তোমাদের মতো নই, আমি রাত্রি যাপন করি এরূপ অবস্থায় যে, আমার জন্য একজন খাদ্য পরিবেশনকারী থাকেন যিনি আমাকে আহার করান এবং একজন পানীয় পরিবেশনকারী আমাকে পান করান”।[89]

এ হাদীসে রাসূলের সাওম, রবের উদ্দেশ্যে নির্জনে থাকা, তাঁর মুনাজাত ও যিকিরে মশগুল থাকার জন্য আল্লাহ তাঁর রাসূলের জন্য তাঁর ভালোবাসা ও তাঁর পবিত্র ফুৎকার ইত্যাদি যা কিছু নি‘আমত দান করেছেন সে সবের ইঙ্গিত বহন করে। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার অন্তরে আল্লাহর পরিচয় অনুভব করতেন, রবের প্রদত্ত খাবার গ্রহণ করতেন এবং মানবীয় পানাহার মুক্ত থাকতেন।

আল্লাহর জ্ঞানপ্রাপ্ত ব্যক্তির কাছে তাঁর যিকির হলো তাদের অন্তরের খাদ্য, যা তাদেরকে পানাহার থেকে অমুখাপেক্ষী করে রাখে। আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনে নিবেদিত কঠোর পরিশ্রমীগণ ক্ষুধা অনুভব করলে মুনাজাতের খাদ্য দ্বারা তৃপ্তি লাভ করে। অতএব, তাদের জন্য অত্যন্ত পরিতাপ যারা অতিরিক্ত খাওয়ার কারণে রবের মোনাজাতের স্বাদ থেকে বঞ্চিত।

মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময় গোসল করা:

ইবন জারীর রহ. বলেন, আলিমগণ রমযানের প্রতি রাতে গোসল করতেন, কেউ আবার রমযানের শেষ দশকে যেসব রাতে লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি সে সব রাতে গোসল করে সুগন্ধি ব্যবহার করতেন।

হাম্মাদ ইবন সালামাহ রহ. বলেন, সাবেত ও হুমাইদ রহ. রমযানের শেষ দশকে যে রাতে লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি সে সব রাতে সুন্দর পোশাক পরিধান করে সুগন্ধি ব্যবহার করে মসজিদে যেতেন এবং মসজিদ সুগন্ধি ও ধোঁয়া দিয়ে সুগন্ধময় করতেন। অতএব, রমযানের শেষ দশকে যে রাতে লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি সে সব রাতে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়া, সুগন্ধি ব্যবহার করা, গোসল করে সুন্দর জামা-কাপড় পরিধান করা ভালো, যেভাবে অন্যান্য ঈদের দিনগুলোতে করা হয়। এছাড়া সব সালাতে পোশাকের দ্বারা সুসজ্জিত হওয়া শরী‘আতসম্মত। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿خُذُواْ زِينَتَكُمۡ عِندَ كُلِّ مَسۡجِدٖ٣١﴾ [الاعراف: ٣١]    

“তোমরা প্রতি সালাতে তোমাদের বেশ-ভূষা গ্রহণ করো”। [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৩১] ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, আল্লাহর জন্য বেশ-ভূষা গ্রহণ করা অধিক হকদার। তবে ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ সাজ-সজ্জা ব্যতীত বাহ্যিক সাজ-সজ্জা পরিপূর্ণ হয় না। আর আল্লাহর কাছে নিবেদিত হওয়া, তাওবা করা, সমস্ত গুনাহ থেকে পবিত্রতা অর্জন করা ইত্যাদির মাধ্যমে ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ পবিত্রতা ও সাজ-সজ্জা অর্জিত হয়। কেননা বাতেনী সৌন্দর্য ব্যতীত বাহ্যিক সৌন্দর্য কোনো কাজে আসে না। কবি বলেছেন:

কেউ যদি তাকওয়ার পোশাক পরিধান না করে, তবে সে সাধারণ পোশাক পরিধান করলেও উলঙ্গই হয়ে থাকে।

আল্লাহ কারো বাহ্যিক অবস্থা ও সম্পদের দিকে তাকান না; বরং তিনি তাদের অন্তর ও আমলের দিকে লক্ষ্য করেন। সুতরাং যে ব্যক্তি তাঁর সন্মুখে সালাতে দাঁড়াবে সে যেন উত্তম পোশাকে বাহ্যিক সুসজ্জিত হয়ে এবং তাকওয়ার পোশাকে বাতেনী সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿يَٰبَنِيٓ ءَادَمَ قَدۡ أَنزَلۡنَا عَلَيۡكُمۡ لِبَاسٗا يُوَٰرِي سَوۡءَٰتِكُمۡ وَرِيشٗاۖ وَلِبَاسُ ٱلتَّقۡوَىٰ ذَٰلِكَ خَيۡرٞ٢٦﴾ [الاعراف: ٢٦]   

“হে বনী আদম, আমি তো তোমাদের জন্য পোশাক অবতীর্ণ করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকবে এবং যা সৌন্দর্যস্বরূপ। আর তাকওয়ার পোশাক, তা উত্তম”। [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ২৬]

ই‘তিকাফ করা: রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রমযানের শেষ দশকে ইবাদতের মধ্যে অন্যতম ছিল ই‘তিকাফ করা। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، كَانَ يَعْتَكِفُ العَشْرَ الأَوَاخِرَ مِنْ رَمَضَانَ حَتَّى تَوَفَّاهُ اللَّهُ».

“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত রমযানের শেষ দশক ই‘তিকাফ করতেন”।[90]  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লাইলাতুল কদরের তালাশে রমযানের শেষ দশ দিন সমস্ত কাজ-কর্ম ছেড়ে, অন্যান্য চিন্তা-ভাবনা মুক্ত হয়ে তার রবের মুনাজাত, যিকির ও দো‘আয় মগ্ন হওয়ার জন্য ই‘তিকাফ করতেন।

ইমাম আহমাদ রহ. বলেন, ই‘তিকাফকারীর জন্য মানুষের সাথে বেশি মেলা-মেশা না হওয়াই মুস্তাহাব; এমনকি ইলম ও কুরআন শিক্ষার জন্যও নয়, বরং তার জন্য উত্তম হলো একাকী থাকা, তার রবের মুনাজাত, যিকির ও দো‘আয় একাগ্র থাকা।

এ ধরণের ই‘তিকাফ হলো শর‘ঈ নির্জনবাস যা মসজিদে করতে হয়, এতে মানুষের সাথে একত্রিত হওয়া বাদ পড়ে না আবার জামা‘আতে সালাত আদায়ও বাদ পড়ে না। অন্যদিকে মানুষের থেকে একেবারেই আলাদা হয়ে নির্জনবাস করা শরী‘আতে নিষেধ। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে একলোক সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো যে রাত জেগে সালাত আদায় করে আর দিনে সাওম পালন করে, তবে সে জুমু‘আর সালাত ও জামা‘আতে উপস্থিত হয় না। তিনি বললেন, লোকটি জাহান্নামী।

অতএব, এ উম্মাতের জন্য শরী‘আতসম্মত নির্জনবাস হলো মসজিদে ই‘তিকাফ পালন করা, বিশেষ করে রমযান মাসে, আরও নির্দিষ্ট করে রমযানের শেষ দশ দিন, যেমনিভাবে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করতেন। ই‘তিকাফকারী আল্লাহর ইবাদত, আনুগত্য ও যিকিরে  নিজেকে মসজিদে আবদ্ধ করে রাখে, দুনিয়ার সমস্ত ঝামেলামুক্ত হয়ে অন্তরকে একমাত্র রবের দিকে ঝুঁকিয়ে দেয় এবং তাঁর নৈকট্য লাভের প্রচেষ্টা করে। অতএব, আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ ব্যতীত তার কোনো কাজ থাকে না।

ই‘তিকাফের হাকীকী অর্থ হলো, সৃষ্টির সাথে সব ধরণের সম্পর্ক ছিন্ন করে স্রষ্টার সাথে সম্পর্কযুক্ত হওয়া। তার রবের পরিচিতি, তাঁর ভালোবাসা ও তাঁর মমত্ববোধ যত বেশি শক্তিশালী হবে ব্যক্তি তত বেশি দুনিয়ার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে তাঁর প্রতি সম্পূর্ণ সম্পর্কযুক্ত হবে। কোনো একলোক গৃহে সম্পূর্ণ একাকী থেকে তার রবের জন্য নিজেকে মুক্ত করল। তাকে একজন জিজ্ঞাসা করল, তুমি কি একাকীত্ব অনুভব করো না? সে বলল, কীভাবে আমি একাকীত্ব অনুভব করব অথচ তিনি তো বলেছেন: যে ব্যক্তি আমাকে স্মরণ করে আমি তার মজলিশের সাথী।

হে মানুষ! যে নিজের জীবনকে নিঃশেষ করে দিয়েছ, উঠ। তোমার জীবনে যা কিছু ছুটে গেছে সেগুলো লাইলাতুল কদরে ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করো। কেননা একটি লাইলাতুল কদরই তোমার জীবনে ছুটে যাওয়া দিনগুলোর জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿إِنَّآ أَنزَلۡنَٰهُ فِي لَيۡلَةِ ٱلۡقَدۡرِ ١ وَمَآ أَدۡرَىٰكَ مَا لَيۡلَةُ ٱلۡقَدۡرِ ٢ لَيۡلَةُ ٱلۡقَدۡرِ خَيۡرٞ مِّنۡ أَلۡفِ شَهۡرٖ٣﴾ [القدر: ١،  3]

“নিশ্চয় আমরা এটি (কুরআন) নাযিল করেছি ‘লাইলাতুল কদরে।’ তোমাকে কিসে জানাবে ‘লাইলাতুল কদর’ কী? ‘লাইলাতুল কদর’ হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম।” [সূরা আল-কাদর, আয়াত: ১-৩]

«إِنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم أُرِيَ أَعْمَارَ النَّاسِ قَبْلَهُ. أَوْ مَا شَاءَ اللهُ مِنْ ذلِكَ. فَكَأَنَّهُ تَقَاصَرَ أَعْمَارَ أُمَّتِهِ أَنْ لاَ يَبْلُغُوا مِنَ الْعَمَلِ، مِثْلَ الَّذِي بَلَغَ غَيْرُهُمْ فِي طُولِ الْعُمْرِ، فَأَعْطَاهُ اللهُ لَيْلَةَ الْقَدْرِ، خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ».

“রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার পূর্বের মানুষের হায়াত দেখানো হলো অথবা আল্লাহ যতটুকু চেয়েছেন ততটুকু দেখানো হয়েছে। এতে তিনি তার উম্মতের হায়াত নিতান্তই কম মনে করলেন। যেহেতু অন্যান্য উম্মাতের দীর্ঘ হায়াতের কারণে তাদের বেশি আমল তার উম্মাতের কম হায়াতের কারণে অল্প আমল তাদের সমকক্ষ হতে পারবে না। অতঃপর আল্লাহ তাকে লাইলাতুল কদর দান করেছেন যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম।”[91]

মুজাহিদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ذَكَرَ رَجُلًا مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ لَبِسَ السِّلَاحَ فِي سَبِيلِ اللهِ أَلْفَ شَهْرٍ قَالَ: فَعَجِبَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ ذَلِكَ قَالَ: فَأَنْزَلَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ ﴿إِنَّآ أَنزَلۡنَٰهُ فِي لَيۡلَةِ ٱلۡقَدۡرِ ١ وَمَآ أَدۡرَىٰكَ مَا لَيۡلَةُ ٱلۡقَدۡرِ ٢ لَيۡلَةُ ٱلۡقَدۡرِ خَيۡرٞ مِّنۡ أَلۡفِ شَهۡرٖ٣﴾ [القدر: ١،  3] الَّتِي لَبِسَ فِيهَا ذَلِكَ الرَّجُلُ السِّلَاحَ فِي سَبِيلِ اللهِ أَلْفَ شَهْرٍ».

“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনী ইসরাঈলের একলোকের কথা উল্লেখ করেন যিনি আল্লাহর পথে এক হাজার মাস অস্ত্র পরিহিত ছিল (অর্থাৎ হাজার মাস জিহাদ করেছেন)। এতে মুসলিমগণ আশ্চর্যন্বিত হলেন। তখন আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াত নাযিল করেন,

﴿إِنَّآ أَنزَلۡنَٰهُ فِي لَيۡلَةِ ٱلۡقَدۡرِ ١ وَمَآ أَدۡرَىٰكَ مَا لَيۡلَةُ ٱلۡقَدۡرِ ٢ لَيۡلَةُ ٱلۡقَدۡرِ خَيۡرٞ مِّنۡ أَلۡفِ شَهۡرٖ٣﴾ [القدر: ١،  3]

“নিশ্চয় আমরা এটি (কুরআন) নাযিল করেছি ‘লাইলাতুল কদরে।’ তোমাকে কিসে জানাবে ‘লাইলাতুল কদর’ কী? ‘লাইলাতুল কদর’ হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম।” [সূরা আল-কাদর, আয়াত: ১-৩] অর্থাৎ বর্ম পরিহিত সে ব্যক্তি এক হাজার মাসের জিহাদের চেয়েও লাইলাতুল কদর উত্তম।”[92]

নাখা‘ঈ রহ. বলেন, কদরের রাতে আমল করা অন্য সময়ের এক হাজার মাস আমল করা অপেক্ষা উত্তম। সহীহাইনে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«مَنْ قَامَ لَيْلَةَ القَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ».

“যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদরে ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রাত জেগে ইবাদাত করে, তাঁর পিছনের সমস্ত গুনাহ মাফ করা হবে”।[93]

মুসনাদে আহমাদের বর্ণনায় এসেছে,

«فَمَنْ قَامَهَا ابْتِغَاءَهَا إِيمَانًا، وَاحْتِسَابًا، ثُمَّ وُفِّقَتْ لَهُ غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ وَمَا تَأَخَّرَ».

“যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদরে ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রাত জেগে ইবাদাত করবে, অতঃপর সে রাত লাভ করার তাওফীকপ্রাপ্ত হবে, তার পিছনের ও পরের সমস্ত গুনাহ মাফ করা হবে।”[94]

 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«فِيهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ، مَنْ حُرِمَ خَيْرَهَا فَقَدْ حُرِمَ».

“এ মাসে একটি রাত রয়েছে যা এক হাজার মাস অপেক্ষাও উত্তম। যে ব্যক্তি সে রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত রয়ে গেল সে প্রকৃতই বঞ্চিত রয়ে গেল।”[95]

জুওয়াইবার রহ. বলেন, আমি দাহহাক রহ.-কে জিজ্ঞসে করলাম, হায়েয ও নিফাসবতী, মুসাফির ও ঘুমন্ত ব্যক্তির ব্যাপারে আপনি কী মনে করেন? তারা কি লাইলাতুল কদরের মর্যাদা পাবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। যাদের আমলই আল্লাহ কবুল করেন তাদেরকেই লাইলাতুল কদরের মর্যাদা দান করবেন। সুতরাং কবুল হওয়াই এখানে মূল বিষয়, বেশি পরিমাণ ইবাদত মূখ্য উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য হলো অন্তরের সৎকাজ ও এর পবিত্রতা। এখানে শারীরিক বেশি আমল উদ্দেশ্য নয়। কেননা কতিপয় রাত জাগরণকারী সালাত আদায়কারী কষ্ট আর রাত জাগা ব্যতীত কিছুই পায় না, কত সালাতে দণ্ডায়মান লোক সাওয়াব থেকে বঞ্চিত অথচ ঘুমন্ত ব্যক্তি আল্লাহর দয়াপ্রাপ্ত হয়। এ ঘুমন্ত ব্যক্তি যদিও ঘুমাচ্ছে কিন্তু তার অন্তর আল্লাহর যিকিরে জাগ্রত থাকে, আর সালাতে দণ্ডায়মান সে ব্যক্তি যদিও সালাত আদায় করছে কিন্তু তার অন্তর পাপী। বান্দা কল্যাণকর কাজের প্রচেষ্টা করতে, সৎকাজে কঠোর পরিশ্রম, অসৎ ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকতে আদিষ্ট। প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার কাজের ধরণ অনুযায়ী তার কাজ সহজ করা হয়। সৌভাগ্যবানদেরকে সৌভাগ্যবানদের আমল করতে সহজ করে দেওয়া হয় আর দুর্ভাগাকে দুর্ভাগাদের কাজ করতে সহজ করে দেওয়া হয়। সুতরাং এ মাসে আমলের মাধ্যমে গনীমত গ্রহণে দ্রুত এগিয়ে আসো। তোমার জীবনে যা হারিয়ে গেছে তা হয়ত ফিরে পাবে।

পরিচ্ছেদ: রমযানের শেষ সাত দিন

ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত যে,

«أَنَّ رِجَالًا مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أُرُوا لَيْلَةَ القَدْرِ فِي المَنَامِ فِي السَّبْعِ الأَوَاخِرِ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَرَى رُؤْيَاكُمْ قَدْ تَوَاطَأَتْ فِي السَّبْعِ الأَوَاخِرِ، فَمَنْ كَانَ مُتَحَرِّيهَا فَلْيَتَحَرَّهَا فِي السَّبْعِ الأَوَاخِرِ».

“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কতিপয় সাহাবীকে স্বপ্নযোগে রমযানের শেষের সাত রাতে লাইলাতুল কদর দেখানো হয়। (এ কথা শোনে) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমাকেও তোমাদের স্বপ্নের অনুরূপ দেখানো হয়েছে। (তোমাদের দেখা ও আমার দেখা) শেষ সাত দিনের ক্ষেত্রে মিলে গেছে। অতএব, যে ব্যক্তি এর সন্ধান প্রত্যাশী, সে যেন শেষ সাত রাতে সন্ধান করে।”[96]

ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«الْتَمِسُوهَا فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ يَعْنِي لَيْلَةَ الْقَدْرِ فَإِنْ ضَعُفَ أَحَدُكُمْ أَوْ عَجَزَ، فَلَا يُغْلَبَنَّ عَلَى السَّبْعِ الْبَوَاقِي».

“তোমরা রমযানের শেষ দশদিনে কদরের রাত অনুসন্ধান কর। তোমাদের কেউ যদি দুর্বল অথবা অপারগ হয়ে পড়ে, তবে সে যেন শেষ সাত রাতে অলসতা না করে”।[97] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ দশকের বেজোড় রাতে লাইলাতুল কদর তালাশ করতে আদেশ করেছেন। ইবন ‘আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«التَمِسُوهَا فِي العَشْرِ الأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ لَيْلَةَ القَدْرِ، فِي تَاسِعَةٍ تَبْقَى، فِي سَابِعَةٍ تَبْقَى، فِي خَامِسَةٍ تَبْقَى».

“তোমরা তা (লাইলাতুল কদর) রমযানের শেষ দশকে তালাশ কর। লাইলাতুল কদর (শেষ দিক থেকে গনণায়) নবম, সপ্তম বা পঞ্চম রাত অবশিষ্ট থাকে”।[98]

বুখারীর অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«هِيَ فِي العَشْرِ الأَوَاخِرِ، هِيَ فِي تِسْعٍ يَمْضِينَ، أَوْ فِي سَبْعٍ يَبْقَيْنَ».

“তা শেষ দশকে, তা অতিবাহিত নবম রাতে অথবা অবশিষ্ট সপ্তম রাতে অর্থাৎ লাইলাতুল কদর”।[99]

উয়াইনা ইবন আবদুর রহমান বলেন, আমার পিতা আবদুর রহমান বলেন,

«ذُكِرَتْ لَيْلَةُ القَدْرِ عِنْدَ أَبِي بَكْرَةَ فَقَالَ: مَا أَنَا مُلْتَمِسُهَا لِشَيْءٍ سَمِعْتُهُ مِنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلاَّ فِي العَشْرِ الأَوَاخِرِ، فَإِنِّي سَمِعْتُهُ يَقُولُ: التَمِسُوهَا فِي تِسْعٍ يَبْقَيْنَ، أَوْ فِي سَبْعٍ يَبْقَيْنَ، أَوْ فِي خَمْسٍ يَبْقَيْنَ، أَوْ فِي ثَلاَثِ أَوَاخِرِ لَيْلَةٍ، وَكَانَ أَبُو بَكْرَةَ يُصَلِّي فِي العِشْرِينَ مِنْ رَمَضَانَ كَصَلاَتِهِ فِي سَائِرِ السَّنَةِ، فَإِذَا دَخَلَ العَشْرُ اجْتَهَدَ».

“আবু বাকরা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর কাছে একবার লাইলাতুল কদর সম্পর্কে আলোচনা হলো। তিনি বললেন, আমি লাইলাতুল ক্বাদর রামাযানের শেষ দশ দিন ছাড়া অন্য কোনো রাতে অনুসন্ধান করব না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে একটি বাণী শোনার কারণে; কারণ আমি তাকে বলতে শুনেছি যে, তোমরা এ রাতটিকে রমযানের নয় দিন বাকী থাকতে বা সাত দিন বাকী থাকতে বা পাঁচ দিন বাকী থাকতে বা তিন দিন বাকী থাকতে বা এর শেষ রাতে অন্বেষণ কর। বর্ণনাকারী বলেন, আবু বাকরা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু রামাযানের বিশ দিন পর্যন্ত অন্যান্য সুন্নাতের মতোই সালাত আদায় করতেন। কিন্তু শেষ দশ দিনের ক্ষেত্রে খুবই প্রচেষ্টা চালাতেন”।[100]

….

আব্দুল্লাহ ইবন উনাইস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,

«قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّ لِي بَادِيَةً أَكُونُ فِيهَا، وَأَنَا أُصَلِّي فِيهَا بِحَمْدِ اللَّهِ، فَمُرْنِي بِلَيْلَةٍ أَنْزِلُهَا إِلَى هَذَا الْمَسْجِدِ، فَقَالَ: «انْزِلْ لَيْلَةَ ثَلَاثٍ وَعِشْرِينَ».

“আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি এক গ্রামে থাকি এবং সেখানে আলহামদুলিল্লাহ সালাত আদায় করি। অতএব, আমাকে লাইলাতুল কদরের সংবাদ দিন সে রাতে এ মসজিদে এসে সালাত আদায় করব। তিনি বললেন, তুমি তেইশ তারিখ রাতে এসো”।[101]

কেউ কেউ চব্বিশ রমযান রাতে লাইলাতুল কদর তালাশ করে থাকেন। এটি আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু ও হাসান রহ. এর মত। হাসান রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি সূর্যকে বিশ বছর যাবত পর্যবেক্ষণ করেছি। আর চব্বিশে রমযান সূর্য উদিত হয় কিন্তু এর আলোকরশ্মি থাকে না। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে অনুরূপ বর্ণনা আছে, ইমাম বুখারী তা উল্লেখ করেছেন, তবে তিনি বলেছেন: ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে সঠিক বর্ণনা হলো তেইশ তারিখ দিবাগত রাত। আইঊব সাখতিয়ানী রহ. তেইশে রমযান রাতে গোসল করতেন, আর চব্বিশে রমযান সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তিনি বলতেন, তেইশে রমযান মদীনাবাসীর রাত আর চব্বিশে রমযান বসরাবাসীর রাত।

লাইলাতুল কদরের ব্যাপারে আলেমগণ মতানৈক্য করেছেন। জমহুর আলেমের মতে এটি রমযানের শেষ দশকে। সহীহ হাদীসসমূহ এ মতটিই প্রমাণ করে। তবে শেষ দশকের কোন রাতটি বেশি সম্ভাবনাময় সে ব্যাপারে তারা মতানৈক্য করেছেন। হাসান ও মালিক রহ. থেকে বর্ণিত, তারা বলেন, শেষ দশকের সব রাতেই লাইলাতুল কদর তালাশ করতে হবে। এ মতটি আমাদের অনেক আলেম গ্রহণ করেছেন। তবে অধিকাংশ আলিমের মতে, শেষ দশকের কতিপয় রাত লাইলাতুল কদরের সম্ভাবনাময় রাত। অতঃপর তারা বলেছেন: বেজোড় রাতগুলোই বেশি সম্ভাবনাময়। নির্দিষ্ট কোন রাত সে ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে স্পষ্ট বাণী নেই।

লাইলাতুল কদরের রাত নির্ধারণ না করার হিকমত (আল্লাহই ভালো জানেন) মুমিনগণ যাতে এ রাতগুলোতে বেশি বেশি ইবাদত করতে পারে। তাই রমযানের শেষ দশকের প্রতিটি রাতকেই লাইলাতুল কদর বলা হয়। লাইলাতুল কদর পাওয়ার আশায় এ শেষ দশকের প্রতিটি রাতে ইবাদতে কঠোর পরিশ্রম করা ও ই‘তিকাফ করা দ্বারা এটিই প্রমাণিত হয়।

পরিচ্ছেদ: লাইলাতুল কদরের সর্বাধিক সম্ভাবনাময় রাত

রমযানের সাতাশ তারিখ লাইলাতুল কদরের সর্বাধিক সম্ভাবনাময় রাত। সহীহ মুসলিমে উবাই ইবন কা‘ব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি লাইলাতুল কদর সম্পর্কে বলেন,

«وَاللهِ إِنِّي لَأَعْلَمُهَا، وَأَكْثَرُ عِلْمِي هِيَ اللَّيْلَةُ الَّتِي أَمَرَنَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِقِيَامِهَا هِيَ لَيْلَةُ سَبْعٍ وَعِشْرِينَ».

 “আল্লাহর কসম আমি এ রাত (লাইলাতুল কদর) সম্পর্কে অধিক জানি। আমার অধিক জ্ঞান হলো, এটি সে রাত যে রাতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে সালাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। আর এটি সাতাশ তারিখের রাত”।[102]

যির ইবন হুবাইশ রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি উবাই ইবন কা‘ব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে বললাম,

«إِنَّ أَخَاكَ ابْنَ مَسْعُودٍ يَقُولُ: مَنْ يَقُمِ الْحَوْلَ يُصِبْ لَيْلَةَ الْقَدْرِ؟ فَقَالَ رَحِمَهُ اللهُ: أَرَادَ أَنْ لَا يَتَّكِلَ النَّاسُ، أَمَا إِنَّهُ قَدْ عَلِمَ أَنَّهَا فِي رَمَضَانَ، وَأَنَّهَا فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ، وَأَنَّهَا لَيْلَةُ سَبْعٍ وَعِشْرِينَ، ثُمَّ حَلَفَ لَا يَسْتَثْنِي، أَنَّهَا لَيْلَةُ سَبْعٍ وَعِشْرِينَ، فَقُلْتُ: بِأَيِّ شَيْءٍ تَقُولُ ذَلِكَ؟ يَا أَبَا الْمُنْذِرِ، قَالَ: بِالْعَلَامَةِ، أَوْ بِالْآيَةِ الَّتِي أَخْبَرَنَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهَا تَطْلُعُ يَوْمَئِذٍ، لَا شُعَاعَ لَهَا».

“আপনার ভাই আব্দুল্লাহ ইবন মাস‘উদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, যে ব্যক্তি গোটা বছর রাত জাগরণ করে সে কদরের রাতের সন্ধান পাবে। তিনি (উবাই) বললেন, আল্লাহ তাকে রহম করুন, এর দ্বারা তিনি একথা বুঝাতে চাচ্ছেন যে, লোকেরা যেন কেবল একটি রাতের ওপর ভরসা করে বসে না থাকে। অথচ তিনি অবশ্যই জানেন যে, তা রমযান মাসে শেষের দশ দিনের মধ্যে এবং ২৭তম রজনী। অতঃপর তিনি শপথ করে বললেন! তা ২৭তম রজনী। আমি (যির) বললাম, হে আবুল মুনযির! আপনি কিসের ভিত্তিতে তা বলছেন? তিনি বললেন, বিভিন্ন আলামত ও নিদর্শনের ভিত্তিতে যে সস্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের অবহিত করেছেন। যেমন, সেদিন সূর্য উঠবে কিন্তু তাতে আলোক রশ্মি থাকবে না।”[103]

আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«أَنَّ رَجُلًا أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: يَا نَبِيَّ اللهِ، إِنِّي شَيْخٌ كَبِيرٌ عَلِيلٌ، يَشُقُّ عَلَيَّ الْقِيَامُ، فَأْمُرْنِي بِلَيْلَةٍ لَعَلَّ اللهَ يُوَفِّقُنِي فِيهَا لِلَيْلَةِ الْقَدْرِ. قَالَ: ” عَلَيْكَ بِالسَّابِعَةِ».

“একলোক নবী রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর নবী! আমি একজন অসুস্থ বৃদ্ধ মানুষ, দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করা আমার জন্য কষ্টকর। অতএব, আপনি আমাকে এমন একটি রাতের কথা আদেশ করুন যে রাতে আল্লাহ আমাকে তাওফিক দিলে লাইলাতুল কদর পাবো। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, নিশ্চয়ই তা রমযানের সাতাশ তারিখ।”[104]

ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত যে,

«أَنَّ رِجَالًا مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أُرُوا لَيْلَةَ القَدْرِ فِي المَنَامِ فِي السَّبْعِ الأَوَاخِرِ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَرَى رُؤْيَاكُمْ قَدْ تَوَاطَأَتْ فِي السَّبْعِ الأَوَاخِرِ، فَمَنْ كَانَ مُتَحَرِّيهَا فَلْيَتَحَرَّهَا فِي السَّبْعِ الأَوَاخِرِ».

“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কতিপয় সাহাবীকে স্বপ্নযোগে রমযানের শেষের সাত রাতে লাইলাতুল কদর দেখানো হয়। (এ শোনে) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমাকেও তোমাদের স্বপ্নের অনুরূপ দেখানো হয়েছে। (তোমাদের দেখা ও আমার দেখা) শেষ সাত দিনের ক্ষেত্রে মিলে গেছে। অতএব, যে ব্যক্তি এর সন্ধান প্রত্যাশী, সে যেন শেষ সাত রাতে সন্ধান করে”।[105]

উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«تَحَرَّوْهَا لَيْلَةَ سَبْعٍ وَعِشْرِينَ ” يَعْنِي لَيْلَةَ الْقَدْرِ».

“তোমরা রমযানের সাতাশ তারিখ লাইলাতুল কদর তালাশ করো।”[106]

মু‘আবিয়া রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে মারফু‘ সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«لَيْلَةُ الْقَدْرِ لَيْلَةُ سَبْعٍ وَعِشْرِينَ».

“সাতাশ রমযান লাইলাতুল কদর”।[107]

ইমাম আহমাদ রহ.-এর মত হচ্ছে, কোনো তারিখ নির্দিষ্ট না করে বিরত থাকাটাই বিশুদ্ধ। এ মতের পক্ষে প্রমাণ হলো আবু যার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে নিয়ে রমযানের শেষ সাত দিনের বেজোড় রাত্রিগুলোতে সালাত আদায় করেছেন।

«قام بهم في الثالثة والعشرين إلى ثلث الليل. وفي الخامسة إلى نصف الليل، وفي السابعة إلى آخر الليل، حتى خشوا أن يفوتهم الفلاحُ»

তিনি তাদেরকে নিয়ে তেইশ তারিখ রাত্রির এক তৃতীয়াংশ, পঁচিশ তারিখ অর্ধ রাত্রি ও সাতাশ তারিখ রাতে প্রায় শেষ রাত্রি পর্যন্ত সালাত আদায় করেছেন, তা এত পরিমাণ দীর্ঘ ছিল যে, মনে হচ্ছিল কল্যাণ তথা সাহরী ছুটে যাবে। তিনি এ সময় তার পরিবার ও লোকদেরকে সালাতে একত্রিত করেছেন। হাদীসে বর্ণিত «الفلاحُ» মানে সাহরী।

কেউ কেউ সে রাতের আলামত ও নিদর্শন দ্বারা দলীল দিয়ে থাকেন। কারণ উল্লিখিত উবাই ইবন কা‘ব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর হাদীসে এসেছে যে, এ দিন ভোরে সূর্য উদিত হবে তবে আলোকরশ্মি থাকবে না।

কোনো এক সৎলোক সাতাশ রমযান বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করছিল। সে দেখল মানুষের মাথার উপরে ফিরিশতাগণ তাওয়াফ করছে।

একলোক অন্ধকারে বারবার কী যেন দেখছিল। তাকে আরেকলোক জিজ্ঞাসা করল, আপনি কী দেখছেন? সে বলল আমি কদরের রাত তালাশ করছি। তখন লোকটি তাকে বলল, আপনি ঘুমান। আমি আপনাকে কদরের রাতের সংবাদ দিব। যখন সাতাশ রমযান এলো তখন সে ঐ লোকটিকে নিয়ে খেজুর বাগানে গেল। দেখল খেজুর গাছগুলো জমিনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। তিনি বললেন, কদরের রাত ব্যতীত আমরা সারা বছর গাছগুলোকে এমন দেখি না।

এক পঙ্গু এ রাতে আল্লাহর কাছে তার পঙ্গুত্ব ভালো হওয়ার জন্য দো‘আ করছিল। আল্লাহ তার পঙ্গুত্ব ভালো করে দেন।

এমনিভাবে এক বোবা লোক ত্রিশ বছর আল্লাহর কাছে দো‘আ করছিলেন। আল্লাহ তার যবান খুলে দেন এবং সে কথা বলতে সক্ষম হয়।

মন্ত্রী আবুল মুযাফফর উল্লেখ করেন, তিনি সাতাশ তারিখ রাতে (সেদিন জুমু‘আর দিন ছিল) দেখেন যে, আকাশের দরজা কা‘বা বরাবর খোলা। তিনি ধারণা করছিলেন তা নবুওয়াতের কামরার মতো। এভাবে সূর্যোদয় পর্যন্ত বলবৎ ছিল। শেষ দশকের বেজোড় রাতের কোনো একটি যদি জুম‘আ বার হয়, তাহলে সেটিই লাইলাতুল কদর হওয়ার বেশি সম্ভাবনা।

পরিচ্ছেদ: লাইলাতুল কদরের আমল

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«مَنْ قَامَ لَيْلَةَ القَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ».

“যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদরে ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রাত জেগে ইবাদাত করে, তাঁর পিছনের সমস্ত গুনাহ মাফ করা হবে”।[108]

মুসনাদে আহমাদের বর্ণনায় এসেছে,

«فَمَنْ قَامَهَا ابْتِغَاءَهَا إِيمَانًا، وَاحْتِسَابًا، ثُمَّ وُفِّقَتْ لَهُ غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ وَمَا تَأَخَّرَ».

“যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদরে ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রাত জেগে ইবাদাত করবে, অতঃপর সে রাত লাভ করার তাওফীকপ্রাপ্ত হবে, তার পিছনের ও পরের সমস্ত গুনাহ মাফ করা হবে”।[109]

নাসাঈর বর্ণনায় এসেছে,

«وَمَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ».

“যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদরে ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রাত জেগে ইবাদাত করে, তাঁর পিছনের সমস্ত গুনাহ মাফ করা হবে”।[110]

এ রাতের কিয়াম হলো, তাহাজ্জুদের সালাত আদায় ও অন্যান্য সালাত আদায় করা।

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে দো‘আ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। সুফইয়ান রহ. বলেন, লাইলাতুল কদরে দো‘আ করা আমার কাছে সালাত আদায়ের চেয়ে অধিক প্রিয়। আর যদি কুরআন তিলাওয়াত করে, দো‘আ করে এবং দো‘আর দ্বারা আল্লাহ নৈকট্য তালাশ করে তাহলে তা উত্তম। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের রাতে তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করতেন এবং দীর্ঘ কিরাত পড়তেন। রহমাতের কোনো আয়াত আসলে আল্লাহর কাছে রহমাত চাইতেন, আযাবের আয়াত আসলে তাঁর কাছে পানাহ চাইতেন। অতএব, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাত, কিরাত, দো‘আ ও গবেষণা একত্রিত করতেন।

রমযানের শেষ দশকে ও অন্যান্য সময় এভাবে সালাত আদায় করা উত্তম। শা‘বী বলেন, কদরের দিন রাতের মতোই মর্যাদাবান। ইমাম শাফে‘ঈ রহ. বলেন, কদরের রাতের পরিশ্রমের মতো কদরের দিনেও ইবাদতে কঠোর পরিশ্রম আমি মুস্তাহাব মনে করি। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَرَأَيْتَ إِنْ وَافَقْتُ لَيْلَةَ الْقَدْرِ مَا أَدْعُو؟ قَالَ: تَقُولِينَ: اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي».

“ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি যদি কদরের রাত পেয়ে যাই তবে কী দো‘আ পড়বো? তিনি বলেন, তুমি বলবে, হে আল্লাহ! তুমি ক্ষমাকারী, তুমি ক্ষমা করতেই ভালোবাসো। অতএব, তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও।”[111]

আল্লাহর পরিচয় লাভকারীগণ আল্লাহর মহত্ব ও বড়ত্ব জানার কারণে তার সমীপে নতজানু হয়ে পড়ে। পাপীগণ ক্ষমার ঘোষণা শুনে আল্লাহর কাছে তাওবা করে ক্ষমার আশা করে। সুতরাং হয় মুক্তি চাইবে নতুবা জাহান্নামে যাবে। তবে লাইলাতুল কদরে এবং রমযানের শেষ দশকে ইবাদতে কঠোর পরিশ্রম করার পরেও আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে; কারণ, আল্লাহর সত্যিকার পরিচয় লাভকারীরা বান্দাগণ ভালো কাজে কঠোর পরিশ্রম করে থাকেন কিন্তু নিজেদের আমল, অবস্থা ও কথাবার্তার দিকে তাকান না, বরং তারা আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনার দিকে প্রত্যাবর্তন করেন। যেমনটি ঘটে থাকে নিজের অপরাধ স্বীকারকারী গুনাহগারের অবস্থা। এজন্যই মুতাররিফ রহ. তার দো‘আয় বলতেন, হে আল্লাহ আপনি আমাদের ওপর রাজি-খুশি হয়ে যান। আর যদি আপনি রাজি-খুশি না হন তাহলে অন্তত আমাদেরকে ক্ষমা করুন।

পরিচ্ছেদ: রমযানের বিদায়

ইতোপূর্বে আলোচনা হয়েছে যে, সহীহাইনে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে,

«مَنْ صَامَ رَمَضَانَ، إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ».

“যে ব্যক্তি ঈমানসহ সওয়াবের আশায় রমযানের সাওম পালন করে, তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়”।[112]

মুসনাদে আহমাদের বর্ণনায় এসেছে, «وما تأخر» এ হাদীসের সনদ হাসান। আরও এসেছে,

«مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ، وَمَنْ قَامَ لَيْلَةَ القَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ».

“যে ব্যক্তি রমযানে ঈমানের সাথে ও সাওয়াব লাভের আশায় সাওম পালন করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হয় এবং যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াব লাভের আশায় লাইলাতুল কদরে রাত জেগে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হয়”।[113]

নাসাঈ আরও বৃদ্ধি করেছেন, «غفر له ما تقدم من ذنبه وما تأخر»  তার পূর্ব ও পরের সব গুনাহ মাফ হয়ে যায়।[114]

ইমাম আহমাদ লাইলাতুল কদর সম্পর্কে মারফু‘ সূত্রে বর্ণনা করেছেন,

«فَمَنْ قَامَهَا ابْتِغَاءَهَا إِيمَانًا، وَاحْتِسَابًا، ثُمَّ وُفِّقَتْ لَهُ غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ وَمَا تَأَخَّرَ».

“যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদরে ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রাত জেগে ইবাদাত করবে, অতঃপর সে রাত লাভ করার তাওফীকপ্রাপ্ত হবে, তার পিছনের ও পরের সমস্ত গুনাহ মাফ করা হবে”।[115]

গুনাহ ক্ষমা হওয়া বা গুনাহের কাফফারা হওয়ার শর্ত হলো, সাওম অবস্থায় যা কিছু থেকে বিরত থাকা জরুরি সে সব জিনিস থেকে বিরত থাকা ও নিজেকে সংরক্ষিত রাখা। জমহুরের মতে, এখানে কাফফারা বলতে সগীরা গুনাহ মাফ হবে। কেননা মুসলিমে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«الصَّلَوَاتُ الْخَمْسُ، وَالْجُمْعَةُ إِلَى الْجُمْعَةِ، وَرَمَضَانُ إِلَى رَمَضَانَ، مُكَفِّرَاتٌ مَا بَيْنَهُنَّ إِذَا اجْتَنَبَ الْكَبَائِرَ».

“পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, এক জুমু‘আ থেকে আরেক জুমু‘আ পর্যন্ত এবং এক রমযান থেকে অপর রমযান পর্যন্ত এসব তাদের মধ্যবর্তী সময়ের জন্য কাফফারা হয়ে যাবে, যদি সে কবীরা গুনাহ থেকে বিরত থাকে”।[116] এ হাদীসের ব্যাখ্যা দু’ধরণের:

প্রথমত: গুনাহের কাফফারার জন্য শর্ত হলো কবীরা গুনাহ থেকে বিরত থাকা।

দ্বিতীয়ত: হাদীসে বর্ণিত এসব ফরযসমূহ বিশেষ করে সগীরা গুনাহর কাফফারা।

ইবন মুনযির রহ. বলেন, লাইলাতুল কদরে কবীরা ও সগীরা উভয় ধরণের গুনাহ মাফের আশা করা যায়।

কেউ কেউ বলেছেন: এর মতো সাওমের দ্বারাও কবীরা ও সগীরা গুনাহ মাফ হয়ে যায়।

তবে অধিকাংশ আলেমের মতে, কবীরা গুনাহ খাটি তাওবা ব্যতীত মাফ হয় না। অবশ্য আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণিত হাদীস প্রমাণ করে যে, উক্ত তিনটি কারণ (সালাত, জুমু‘আ ও রমযান) প্রতিটি তার পূর্ববর্তী গুনাহের কাফফারা। অতএব, লাইলাতুল কদরে সালাত আদায়ের দ্বারা পূর্বের গুনাহের কাফফারা হবে, যখন সে তা প্রাপ্ত হবে, যদিও ব্যক্তি সে দিনটি অনুভব করতে পারে নি। অন্যদিকে রমযানের সাওম পালন ও তারাবীহর সালাত আদায় দ্বারা গুনাহের কাফফারা হওয়ার বিষয়টি পুরো রমযান মাস পূর্ণ করে সেগুলো আদায় করার সাথে সম্পৃক্ত।  

কেউ কেউ বলেন, রমযানের শেষ দিনের রাতে ক্ষমা করা হয়।

….

মু‘আয রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«مَنْ صَامَ رَمَضَانَ وَصَلَّى الصَّلَوَاتِ وَحَجَّ البَيْتَ – لَا أَدْرِي أَذَكَرَ الزَّكَاةَ أَمْ لَا – إِلَّا كَانَ حَقًّا عَلَى اللَّهِ أَنْ يَغْفِرَ لَهُ ».

“যে ব্যক্তি রমযানের সাওম পালন করল, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করল –বর্ণনাকারী বলেন, তিনি যাকাতের কথা উল্লেখ করেছেন কী-না জানি না- আল্লাহর ওপর কর্তব্য হলো তাকে ক্ষমা করে দেওয়া”।[117]

ইমাম যুহরী রহ. বলেন, ঈদের দিন মানুষ যখন সালাতের জন্য ঈদগাহে বের হয় তখন আল্লাহ তাদের সম্মুখে বের হয়ে বলেন, হে আমার বান্দা তোমরা আমার জন্য সাওম পালন করেছ, আমার জন্য সালাতে দাঁড়িয়েছ। আজ তোমরা ক্ষমাকৃত হয়ে ফিরে যাও। মুওয়াররিক্ব বলেন, সেদিন (ঈদের) কতিপয় লোক এমনভাবে ফিরে আসে যেমন একজন সন্তান তার মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ট হয়।

সাওম ও অন্যান্য ইবাদত যে কেউ পুরোপুরি হক আদায় করে পালন করবে সে আল্লাহর প্রতিদানপ্রাপ্ত উত্তম বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি হক আদায় না করে ত্রুটি-বিচ্যুতি ও গাফলতিসহ আদায় করবে তার জন্য দুর্ভোগ। দুনিয়ার পরিমাপেই যদি তাদের জন্য দুর্ভোগ হয় তাহলে আখিরাতের পরিমাপে তাদের জন্য কী পরিমাণ দুর্ভোগ হবে তা কল্পনাই করা যায় না। কবি বলেছেন:

ويحصدُ الزَّارعُونَ ما زرعواغدًا توفّى النفوسُ ما عَمِلت
وإن أساءُوا، فبئْسَما صنعواإِن أحسنوا أحسنوا لأنفسِهمُ

আগামী দিন সব আত্মাকে তাদের কৃতফল দেওয়া হবে। শস্য বপনকারী যা বপন করেছে তা সে তুলবে। তারা যদি নিজের জন্য উত্তম কাজ করে থাকে তাহলে সে উত্তমই পাবে। আর যদি নিজের জন্য খারাপ কিছু করে থাকে তাহলে কতই না নিকৃষ্ট কাজ সে করল।

সৎপূর্বসূরীগণ কোনো কাজ পরিপূর্ণ ও নিঁখুতভাবে করতে কঠোর পরিশ্রম করতেন। কাজটি সুন্দরভাবে করার পরে তা কবুল করানোর জন্য তৎপর ছিলেন এবং আল্লাহ কর্তৃক ফেরত দেওয়ার ভয় করতেন। আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, তোমরা আমল করার সাথে আমল কবুল হওয়ার ব্যাপারেও খুব গুরুত্ববান হও। কেননা তাকওয়া ব্যতীত আমল কবুল হয় না।[118] তোমরা কি শুনো নি যে, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ ٱللَّهُ مِنَ ٱلۡمُتَّقِينَ٢٧﴾ [المائ‍دة: ٢٧] 

“আল্লাহ কেবল মুত্তাকীদের থেকে গ্রহণ করেন”। [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ২৭]

ফুদালাহ রহ. বলেন, আল্লাহ আমার থেকে এক শস্যদানা পরিমাণ আমল কবুল করা আমার কাছে দুনিয়া ও এর মধ্যকার সবকিছুর চেয়ে উত্তম। কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ ٱللَّهُ مِنَ ٱلۡمُتَّقِينَ٢٧﴾ [المائ‍دة: ٢٧] 

“আল্লাহ কেবল মুত্তাকীদের থেকে গ্রহণ করেন।” [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ২৭]

মালিক ইবন দীনার রহ. বলেন, আমল কবুল না হওয়ার ভয় আমল করার চেয়ে অধিক কঠিন।

‘আতা আস-সুলামী রহ. বলেন, ভালো আমল কবুল না হওয়ার মারাত্মক ভয় হচ্ছে তা একমাত্র আল্লাহর জন্য না হওয়া।

আব্দুল আযীয ইবন আবী রাওয়াদ রহ. বলেন, আমি তাদেরকে (আলিমদেরকে) এমন পেয়েছি যে তারা সৎ আমলের ব্যাপারে কঠোর পরিশ্রম করত। যখন তারা ভালো কাজটি সম্পন্ন করত তখন তারা চিন্তা করত আমলটি কি কবুল হলো নাকি কবুল হয় নি?

কোনো এক সৎপূর্বসূরী বলেন, তারা (আলিমগণ) ছয় মাস রমযান মাস পাওয়ার জন্য দো‘আ করতেন আর ছয় মাস তাদের আমল কবুল হওয়ার জন্য দো‘আ করতেন।

কোনো এক সৎপূর্বসূরীর চেহারায় ঈদের দিন দুশ্চিন্তা দেখা গেল। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, এটি তো আনন্দ ও খুশির দিন। তিনি বললেন, তোমরা ঠিকই বলেছ। কিন্তু আমি তো আল্লাহর বান্দা মাত্র। তিনি আমাকে আমল করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আমার আমল কবুল হয়েছে কি হয় নি তা তো আমি জানি না।

উহাইব রহ. একদল লোককে ঈদের দিন হাসতে দেখে তাদেরকে তিনি বললেন, ঐসব সাওম পালনকারীদের আমল যদি কবুল করা হয় তাহলে তাদের আনন্দ-হাসি আল্লাহর শুকর আদায়কারীদের কাজ নয়। আর যদি তাদের আমল কবুল করা না হয় তাহলে তাদের এ কাজ তো ভীতি-সন্ত্রস্ত লোকদের কাজ নয়। (অর্থাৎ কবুল হলে শুকরিয়া আদায় করা, আর কবুল না হলে কান্নাকাটি করা উচিত, হাসা-হাসি করা নয়)

হাসান রহ. বলেন, আল্লাহ তা‘আলা রমযানকে বান্দার জন্য প্রতিযোগিতার ময়দান হিসেবে দিয়েছেন। তারা এ মাসে আল্লাহর আনুগত্য ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের প্রতিযোগিতা দিয়ে থাকেন। সুতরাং যারা প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে তারা সফলকাম আর যারা পিছিয়ে থাকবে তারা ব্যর্থ ও অকৃতকার্য হবে। তাই যেদিন সৎকর্মশীলকে সফলতার পুরস্কার ও ব্যর্থদেরকে তিরস্কার করা হবে সেদিন (ঈদের দিন) প্রতিযোগী হাসি-তামাশা করবে এটা বড়ই আশ্চর্যের বিষয়।

আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু রমযানের শেষ দিন রাতে ডেকে বলতেন, হায় আফসোস! আমি তো জানি না, কার আমল কবুল হয়েছে যাকে আমি অভিনন্দন জানাবো, আর কার আমল কবুল হওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে যাকে আমি সমবেদনা জানাব। হে যার আমল গ্রহণ করা হয়েছে, তোমার জন্য সুসংবাদ, আর হে যার আমল কবুল না হয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, দো‘আ করছি আল্লাহর তোমার মুসিবত দূর করে দিন।

রমযান মাসে ক্ষমা ও মাগফিরাতের অনেক উপকরণ রয়েছে। ক্ষমার অন্যতম উপায় হচ্ছে, রমযানের সাওম পালন করা ও কিয়াম তথা তারাবীহর সালাত আদায় করা, বিশেষ করে লাইলাতুল কদরে সালাত আদায়।

ক্ষমার আরেকটি উপায় হচ্ছে, সাওম পালনকারীদেরকে ইফতার করানো এবং দাস-দাসী ও কর্মচারীর কাজের চাপ কমানো।

তাছাড়া ক্ষমার আরেকটি উপায় হলো, আল্লাহর যিকির করা। কেননা হাদীসে এসেছে, আল্লাহর যিকিরকারী ক্ষমাপ্রাপ্ত এবং তাঁর কাছে প্রার্থনাকারীকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় না।

ক্ষমার আরেকটি উপায় হলো, আল্লাহর কাছে ইসতিগফার করা, তাঁর ক্ষমা প্রার্থনা করা, আর সাওম পালনকারীর সিয়াম অবস্থায় ও ইফতারির মুহূর্তে করা দো‘আ কবুল করা হয়। …

ক্ষমার আরেকটি উপায় হলো, সাওম পালনকারীর জন্য ফিরিশতাগণ ইফতার করার আগ পর্যন্ত ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন। রমযানে যেহেতু ক্ষমার অনেক উপায় রয়েছে, তাই এত উপায় থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি ক্ষমা পেল না সে প্রকৃতপক্ষেই বঞ্চিত। কা‘ব ইবন উজরাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার বললেন,

«احْضَرُوا الْمِنْبَرَ فَحَضَرْنَا فَلَمَّا ارْتَقَى دَرَجَةً قَالَ: آمِينَ ، فَلَمَّا ارْتَقَى الدَّرَجَةَ الثَّانِيَةَ قَالَ: «آمِينَ» فَلَمَّا ارْتَقَى الدَّرَجَةَ الثَّالِثَةَ قَالَ: آمِينَ، فَلَمَّا نَزَلَ قُلْنَا: يَا رَسُولَ اللَّهِ لَقَدْ سَمِعْنَا مِنْكَ الْيَوْمَ شَيْئًا مَا كُنَّا نَسْمَعُهُ قَالَ: إِنَّ جِبْرِيلَ عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَرَضَ لِي فَقَالَ: بُعْدًا لِمَنْ أَدْرَكَ رَمَضَانَ فَلَمْ يَغْفَرْ لَهُ قُلْتُ: آمِينَ، فَلَمَّا رَقِيتُ الثَّانِيَةَ قَالَ: بُعْدًا لِمَنْ ذُكِرْتُ عِنْدَهُ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَيْكَ قُلْتُ: آمِينَ، فَلَمَّا رَقِيتُ الثَّالِثَةَ قَالَ: بُعْدًا لِمَنْ أَدْرَكَ أَبَوَاهُ الْكِبَرَ عِنْدَهُ أَوْ أَحَدُهُمَا فَلَمْ يُدْخِلَاهُ الْجَنَّةَ قُلْتُ: آمِينَ».

“তোমরা মিম্বার নিয়ে আসো, ফলে আমরা মিম্বার নিয়ে আসলাম। যখন তিনি মিম্বারের প্রথম সিঁড়িতে উঠলেন, বললেন, আমীন। দ্বিতীয় সিঁড়িতে উঠে আবার বললেন, আমীন। অনুরূপভাবে তৃতীয় সিঁড়িতে উঠে বললেন, আমীন। তিনি মিম্বার থেকে নেমে আসলে আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার কাছে আমরা আজ যা শুনলাম ইতোপূর্বে কখনও এরূপ শুনি নি। তিনি বললেন, জিবরীল আলাইহিস সালাম আমার কাছে আসলেন, তিনি বললেন, সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক যে রমযান পেলো অথচ নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারল না, আমি বললাম, আমীন। আমি যখন দ্বিতীয় সিঁড়িতে উঠলাম জিবরীল আলাইহিস সালাম বললেন, সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক যার কাছে আপনার নাম উল্লেখ করা হলো অথচ সে আপনার ওপর দুরুদ ও সালাম পেশ করল না। আমি বললাম, আমীন। আবার আমি যখন তৃতীয় সিঁড়িতে উঠলাম তখন জিবরীল আলাইহিস সালাম বললেন, সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক যে বৃদ্ধ অবস্থায় তার পিতামাতা দু’জনকে বা একজনকে পেল অথচ তাদের সেবা যত্ন করে জান্নাতে যেতে পারল না। আমি বললাম, আমীন।”[119]

কাতাদা রহ. বলেন, বলা হয়ে থাকে যে ব্যক্তি রমযানে ক্ষমা পেল না সে এরপরে আর ক্ষমা পাবে না।… কেননা যে ব্যক্তি রমযানে ক্ষমা পেল না সে কখন ক্ষমা পাবে? যার লাইলাতুল কদরে তাওবা ফিরিয়ে দেওয়া হবে তার তাওবা কখন কবুল করা হবে? রমযানে সংশোধন না হলে সে কখন সংশোধিত হবে? যার অজ্ঞতা ও অলসতার রোগ রয়েছে সে কখন সে রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করবে? কবি বলেছেন:

واختصَّ بالفوزِ بالجنات مَنْ خَدَمارحَّلَ الشَّهرُ وَا لهْفَاهُ وانــــصرمَا
مثلي، فيا ويْحهُ، ياعُظْمَ ما حُــرِماوأصبح الغافلُ المسكينُ منكسرا
تراهُ يحصد إلاّ الهمّ والنَّـــــدَمَـامن فاته الزرعُ في وقت البذارِ فما

রমযান চলে যাচ্ছে, সে শেষ হওয়ার দিকে ধাবিত হচ্ছে। যে ব্যক্তি রমযানকে কাজে লাগিয়েছে তার জন্য জান্নাত অবধারিত। আমার মত গাফিল, মিসকীন ভেঙ্গে পড়ছে। তার জন্য আফসোস, সে কত বড় জিনিস থেকে বঞ্চিত। চারা বপনের সময়ই যদি সেটি বপন না করা যায়, তাহলে ফসল তোলার সময় তো দুঃখ-দুশ্চিন্তা আর অনুশোচনা ব্যতীত কিছুই পাবে না।

রমযান মাসের প্রথমে রহমত, মাঝে মাগফিরাত আর শেষে আছে জাহান্নাম থেকে মুক্তি। হাদীসে এসেছে,

«إِذَا كَانَ رَمَضَانُ فُتِّحَتْ أَبْوَابُ الرَّحْمَةِ».

“রমযান মাস আসলে রহমাতের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়”।[120]

«وَلِلَّهِ عُتَقَاءُ مِنَ النَّارِ، وَذَلكَ كُلُّ لَيْلَةٍ».

“আর বহু লোককে আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে এ মাসে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং প্রত্যেক রাতেই এরূপ থেকে থাকে”।[121]

তবে রমযানের প্রথম ভাগে রহমতের অংশ বেশি, মধ্য ভাগে মাগফিরাত ও শেষ ভাগে রয়েছে সেসব লোকদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি যারা গুনাহের ভারে জর্জরিত ও যাদের ওপর কবীরা গুনাহের কারণে জাহান্নাম ওয়াজিব হয়ে গেছে।

ফিতরের দিন মুসলিম উম্মাহর জন্য ঈদের দিন। কেননা সেদিন সাওম পালনকারী কবীরা গুনাহগারকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। সেদিন গুনাহগারগণ সৎকর্মশীলদের সাথে মিলিত হয়। এমনিভাবে ইয়াওমুন নাহর তথা কুরবানীর দিন হলো মুসলিমের জন্য বড় ঈদের দিন। কেননা এ ঈদের পূর্বে রয়েছে আরাফার দিন। আর ‘আরাফার দিনে দুনিয়াতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। সুতরাং যে ব্যক্তি এ দু’দিনে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে তার জন্য এ দিন দু’টি সত্যিকারের ঈদের দিন; কিন্তু যার মুক্তি মিলবে না তার জন্য এ দিন দু’টি শুধুই পরিতাপ আর শাস্তি ভোগ করার প্রতিশ্রুতির দিন।

ক্ষমা ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি যেহেতু রমযানের সাওম পালন ও সালাত আদায়ের সাথে জড়িত, তাই আল্লাহ তাঁর তাকবীর ও শুকরিয়াস্বরূপ দিনগুলো পরিপূর্ণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿وَلِتُكۡمِلُواْ ٱلۡعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُواْ ٱللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَىٰكُمۡ وَلَعَلَّكُمۡ تَشۡكُرُونَ١٨٥﴾ [البقرة: ١٨٥]

“আর যাতে তোমরা সংখ্যা পূরণ কর এবং তিনি তোমাদেরকে যে হিদায়াত দিয়েছেন, তার জন্য আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা কর এবং যাতে তোমরা শোকর কর”। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৫] সুতরাং যিনি বান্দাকে সাওম পালন ও সালাত আদায়ে তাওফিক দান করেছেন, এসব কাজে যিনি তাদের সাহায্য করেছেন এবং তাদেরকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়েছেন তাঁর শুকরিয়া হচ্ছে, তাঁর যিকির করা, তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ থাকা এবং যথাযথ তাঁর তাকওয়া অবলম্বন করা।

ওহে সে ব্যক্তি যাকে আল্লাহ জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়েছেন, সাবধান তুমি (গোনাহ থেকে) স্বাধীন হওয়ার পরে আবার (গোনাহের) গোলামীর কাতারে ফিরে যেওনা। তোমার মনিব তোমাকে জাহান্নামের কিনারা থেকে দুরে সরিয়ে নিয়েছেন তুমি কি সেটার কিনারায় উপনীত হতে চাও? তোমার মাওলা তোমাকে সেখান থেকে রক্ষা করেছেন, তুমি কি সেটায় পড়তে চাও? তুমি কি তা থেকে পাশ কাটিয়ে চলবে না?

মুহসিনীন তথা সৎকর্মশীলদের জন্য তাঁর রহমতের অঙ্গিকার থাকলেও পাপীরা তাঁর রহমত থেকে নিরাশ হয় না। তাঁর মাগফিরাত মুত্তাকিনদের জন্য হলেও যালিমগণ তাঁর মাগফিরাত থেকে বঞ্চিত হয় না। কবি বলেছেন:

فمن الذي يرجوُ ويدعو المذنبُ؟إن كانَ لا يرجوكَ إلا مُحسنٌ

তোমার (আল্লাহর) কাছে যদি সৎকর্মশীলরাই পাওয়ার আশা করে, তাহলে গুনাহগাররা কার কাছে গুনাহ মাফের আশা করবে এবং কাকে ডাকবে?

কেন আমাদের রবের কাছে ক্ষমার আশা করে না? আর কেনই বা তাঁর সহিষ্ণুতার প্রত্যাশা করে না?

হাদীসে এসেছে, আল্লাহ তাঁর বান্দার ব্যাপারে তার মায়ের চেয়েও অধিক দয়াশীল। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿قُلۡ يَٰعِبَادِيَ ٱلَّذِينَ أَسۡرَفُواْ عَلَىٰٓ أَنفُسِهِمۡ لَا تَقۡنَطُواْ مِن رَّحۡمَةِ ٱللَّهِۚ إِنَّ ٱللَّهَ يَغۡفِرُ ٱلذُّنُوبَ جَمِيعًا٥٣﴾ [الزمر: ٥٢]   

“বলুন ‘হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। অবশ্যই আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন”। [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৫২]

হে অপরাধী গুনাহগার (আমরা সকলেই গুনাহগার) তোমার পাপের কারণে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। তোমার মতো কত পাপীকে রমযানের এ দিনগুলোতে কত মানুষকে আল্লাহ জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। তাই তোমার রবের ব্যাপারে সুধারণা কর, তাঁর কাছে তাওবা কর। কেননা নিজেকে নিজে ধ্বংসকারী ব্যতীত অপর কাউকে আল্লাহ ধ্বংস করেন না। কবি বলেছেন:

برفع يَدٍ بالليل والليلُ مظلمُإذا أوجعتْك الذنوب فداوِها
قنوطك منها من ذنوبك أعظمولا تقنطن من رحمة الله، إنما

তুমি গুনাহের রোগে রোগাক্রান্ত হলে রাতের অন্ধকারে হাত তুলো। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। তোমার গুনাহের চেয়ে তাঁর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া অধিক মারাত্মক অপরাধ।

যে ব্যক্তি জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেতে চায় তার উচিৎ জাহান্নাম থেকে নাজাতের যেসব উপায় আছে সেগুলো অনুসরণ করা। আবু কিলাবা রহ. জাহান্নাম থেকে মুক্তির আশায় তার এক সুন্দরী দাসীকে রমযানের শেষ দিনে মুক্ত করে দেন।

সুতরাং রমযানে সায়িমকে ইফতার করানো, অধীনস্ত কর্মচারীর কাজ হালকা করে দেওয়া, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহা এর সাক্ষ্য দেওয়া এবং ইসতিগফার পড়া জাহান্নাম থেকে মুক্তির উপায়।

তাওহীদের কালেমা গুনাহকে নিঃশেষ করে দেয়। তাওহীদের কালেমা উচ্চরণকারীর পূর্বের ও পরের গুনাহ অবশিষ্ট থাকে না। এ কালেমা জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করে। যে ব্যক্তি এ কালেমা সকাল সন্ধ্যা পাঠ করবে আল্লাহ তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিবেন। যে ব্যক্তি এ কালেমা ইখলাসের সাথে অন্তর থেকে বলবে আল্লাহ তার জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম করে দিবেন।

ইসতিগফারের কালেমা ক্ষমা পাওয়ার অন্যতম উপায়। কেননা ইসতিগফার মানে ক্ষমার দো‘আ। সাওম অবস্থায় ও ইফতারের সময় সায়িমের দো‘আ আল্লাহ কবুল করেন। হাসান রহ. বলেন, তোমরা অধিক পরিমাণে ইসতিগফার করো। কেননা তোমরা জানো না কখন রহমত নাযিল হয়। লুকমান আলাইহিস সালাম তার সন্তানকে বলেছেন: হে আমার প্রিয় সন্তান! তুমি তোমার যবানে ইসতিগফার চালু রাখো। কেননা আল্লাহর কাছে এমন কিছু সময় আছে যে সময় দো‘আকারীর দো‘আ ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। কোনো এক লোক বলেছেন: ইবলিশ শয়তান বলে, আমি গুনাহের দ্বারা মানুষকে ধ্বংস করেছি, আর তারা আমাকে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ও ইসতিগফার দ্বারা ধ্বংস করেছে। সব ভালো আমলের উত্তম পরিণাম হলো ইসতিগফার। ইসতিগফারের দ্বারাই সালাত, হজ, কিয়ামুল লাইল ও সব ধরণের মজলিশ শেষ কর। মজলিশ যদি আল্লাহর যিকিরের হয় তাহলে ইসতিগফার তাতে সীলমোহরের কাজ করবে, আর যদি মজলিশে কোনো ভুল-ভ্রান্তি হয়ে থাকে তাহলে ইসতিগফারের দ্বারা তার কাফফারা হয়ে যাবে। এমনিভাবে ইসতিগফারের দ্বারাই রমযানের সাওম পালন সমাপ্তি করা উচিৎ।

উমার ইবন আব্দুল আযীয বিভিন্ন জায়গায় এ ফরমান জারি করেন যে, রমযান মাস, সদকা ও সদকা ফিতর ইসতিগফারের মাধ্যমে শেষ করা। কেননা সদকা ফিতর সায়িমের সাওমের ভুল-ত্রুটি ও অনর্থক কথা ও কাজ থেকে পবিত্রতা। আর ইসতিগফার সায়িমের অনর্থক ও অশ্লীল কাজের কাফফারাস্বরূপ।

উমার ইবন আব্দুল আযীয তার এক চিঠিতে লেখেন, তোমাদের পিতা আদম আলাইহিস সালাম যেমন বলেছেন তোমরাও সেভাবে বলো,

﴿رَبَّنَا ظَلَمۡنَآ أَنفُسَنَا وَإِن لَّمۡ تَغۡفِرۡ لَنَا وَتَرۡحَمۡنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ٢٣﴾ [الاعراف: ٢٣]     

“হে আমাদের রব, আমরা নিজদের উপর যুলুম করেছি। আর যদি আপনি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন এবং আমাদেরকে দয়া না করেন তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ২৩] আল্লাহর নবী নূহ আলাইহিস সালাম যেভাবে বলেছেন তোমরাও সেভাবে বলো,

﴿وَإِلَّا تَغۡفِرۡ لِي وَتَرۡحَمۡنِيٓ أَكُن مِّنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ٤٧﴾ [هود: ٤٧] 

“আর যদি আপনি আমাকে মাফ না করেন এবং আমার প্রতি দয়া না করেন, তবে আমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব”। [সূরা হূদ, আয়াত: ৪৭]

মূসা আলাইহিস সালাম যেভাবে বলেছেন তোমরাও সেভাবে বলো,

﴿رَبِّ إِنِّي ظَلَمۡتُ نَفۡسِي فَٱغۡفِرۡ لِي١٦﴾ [القصص: ١٦] 

‘হে আমার রব, নিশ্চয় আমি আমার নফসের প্রতি যুলুম করেছি। সুতরাং আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন”। [সূরা আল-কাসাস, আয়াত: ১৬]

যুন নূন যেভাবে বলেছেন তোমরাও সেভাবে বলো,

﴿لَّآ إِلَٰهَ إِلَّآ أَنتَ سُبۡحَٰنَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ ٱلظَّٰلِمِينَ٨٧﴾ [الانبياء: ٨٧] 

“আপনি ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই। আপনি পবিত্র মহান। নিশ্চয় আমি ছিলাম যালিম।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৮৭]

সাওম জাহান্নাম থেকে রক্ষার ঢালস্বরূপ। অনর্থক কথাবার্তা সে ঢালকে নষ্ট করে দেয় আর ইসতিগফার সে জ্বলন্ত ঢালকে রক্ষা করে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লাইলাতুল কদরে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে ক্ষমা চাইতে বলেছেন। সুতরাং মুমিন রমযানে সাওম ও কিয়ামুল লাইলে কঠোর পরিশ্রম করে। রমযান শেষ হওয়ার উপক্রম হলে এবং লাইলাতুল কদর আসলে সে শুধু আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা করে, যেমনিভাবে অল্প আমলকারী অপরাধের জন্য ক্ষমা চায়।

ইয়াহইয়া ইবন মু‘আয রহ. বলেন, সে ব্যক্তি প্রকৃত আল্লাহর পরিচয় লাভকারী (‘আরিফ) নয় যার একমাত্র উদ্দেশ্য আল্লাহর ক্ষমা চাওয়া হবে না। যে ব্যক্তি মুখে ইসতিগফার করল; কিন্তু তার অন্তর গুনাহের কাজ আবার করার দৃঢ় সংকল্প, সে রমযান শেষ হলেই আবার পাপে ফিরে যাবে তার সাওমও প্রত্যাখান করা হবে এবং তার সাওম কবুলের দরজাও বন্ধ হয়ে যাবে।

কা‘ব রহ. বলেন, যে ব্যক্তি সাওম পালন করল আর সে মনে মনে ভাবল যে রমযান শেষ হলে তার রবের অবাধ্যতা করবে তাহলে তার সাওম প্রত্যাখান করা হবে। আর যে ব্যক্তি সাওম পালন অবস্থায় এ নিয়াত করল যে রমযান মাস শেষ হলে আর গুনাহ করবে না তাহলে তার সাওম কবুল করা হবে এবং সে বিনা হিসেবে জান্নাতে যাবে।

জান্নাত চাওয়া ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি চাওয়া: রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এটা অন্যতম দো‘আ ছিল, তিনি বলেছিলেন,  

«حَوْلَهَا نُدَنْدِنُ».

“আমিও জান্নাত চাওয়া ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্যই দো‘আ করি এবং সেটার আশেপাশেই ঘুরে থাকি”।[122] সুতরাং সাওম পালনকারী দো‘আ করার সময় তা কবুল হওয়ার আশা করবে এবং অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দো‘আ করা ছেড়ে দিবে না। … সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর উপহার পাবে সে সর্বদা সৌভাগ্যবানই হবে, এরপরে সে কখনও হতভাগা হবে না। দো‘আ কবুল হওয়ার সময় আল্লাহর সুবাস ছড়িয়ে দেয়। তখন ব্যক্তির জান্নাত চাওয়া উচিৎ ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি চাওয়া উচিৎ। তার দো‘আ কবুল হলে সে আজীবনের জন্য সফলকাম হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿فَمَن زُحۡزِحَ عَنِ ٱلنَّارِ وَأُدۡخِلَ ٱلۡجَنَّةَ فَقَدۡ فَازَ١٨٥﴾ [ال عمران: ١٨٥] 

“সুতরাং যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সে-ই সফলতা পাবে।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৮৫]

কবি বলেছেন: যে ব্যক্তি দুনিয়া দ্বারা সৌভাগ্যবান সে প্রকৃত সৌভাগ্যবান নয়, বরং সে-ই আসল সৌভাগ্যবান যে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে।

হে আল্লাহর বান্দা! রমযান মাস চলে যাচ্ছে। আর মাত্র কয়েক দিন বাকী। যারা রমযানের হক আদায় করছ তারা অবশিষ্ট দিনগুলোও ভালোভাবে পূরণ করো। আর যারা এতদিন সাওম পালন ছেড়ে দিয়েছ তারা ভালোর সাথে রমযানকে শেষ করো। শেষ পরিণতি হিসেবেই ব্যক্তির আমল ধর্তব্য। সুতরাং রমযানের বাকী দিনগুলোকে গনীমত হিসেবে গ্রহণ করো এবং তাকে সর্বোত্তম অভিবাদন দিয়ে গ্রহণ করো।

কত হতভাগাকে নসীহত করা হয়, কিন্তু সে নসীহত গ্রহণ করে না। কত মানুষকে সংশোধনের দিকে আহ্বান করা হয়, কিন্তু সে সংশোধনের ডাকে সাড়া দেয় না। কত পথিক চলে গেছে, কিন্তু সে এখনও বসে আছে। যখন সময় সংকীর্ণ হয়ে যাবে, মৃত্যু ঘনিয়ে আসবে তখন নিজের বাড়াবাড়ির জন্য অনুশোচনা ছাড়া কিছুই থাকবে না।… রমযান মাস শেষ হয়ে যাচ্ছে, আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের চোখের অশ্রু ঝড়ছে, রমযান চলে যাওয়ার বেদনায় তারা ব্যথিত। সম্ভবত রমযানের বিদায়ের ব্যাপারে একটু চিন্তা-ভাবনা জ্বলন্ত আগুন নিভে যাবে, সম্ভবত এটি তাওবার সময়, হয়ত সাওমের দ্বারা সব আগুন নিভে যাবে, হয়ত যে ব্যক্তি সৎকাফেলার দল থেকে বিচ্ছিন্ন তারা সে কাফেলায় যোগ দিবে, হয়ত যার ওপর জাহান্নাম ওয়াজিব হয়ে গেছে সে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে।

পরিশিষ্ট: শাওয়ালের ছয়টি সাওম

আবু আইয়্যুব আনসারী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«مَنْ صَامَ رَمَضَانَ ثُمَّ أَتْبَعَهُ سِتًّا مِنْ شَوَّالٍ، كَانَ كَصِيَامِ الدَّهْرِ».

“রমযান মাসের সাওম পালন করে পরে শাওয়াল মাসে ছয় দিন সাওম পালন করা সারা বছর সাওম রাখার মতো”।[123]

সাওবান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«صِيَامُ رَمَضَانَ بِعَشْرِ أَشْهُرٍ، وَصِيَامُ سِتَّةِ أَيَّامٍ بِشَهْرَيْنِ، فَذَلِكَ صِيَامُ سَنَةٍ».

“রমযানের সাওম পালন করা দশ মাস সাওম পালনের সমান আর শাওয়ালের ছয়টি সাওম পালন বছরের অবশিষ্ট দু’মাস সাওম পালন করার সমান।”[124]

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«مَنْ صَامَ رَمَضَانَ، ثُمَّ أَتْبَعَهُ بِسِتٍّ مِنْ شَوَّالٍ، فَكَأَنَّمَا صَامَ الدَّهْرَ».

“রমযান মাসের সাওম পালন করে পরে শাওয়াল মাসে ছয় দিন সাওম পালন করে সে যেন সারা বছর সাওম পালন করল”।[125]

তাবরানী ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«مَنْ صَامَ رَمَضَانَ وَأَتْبَعَهُ سِتًّا مِنْ شَوَّالٍ خَرَجَ مِنْ ذُنُوبِهِ كَيَوْمِ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ».

“রমযান মাসের সাওম পালন করে পরে শাওয়াল মাসে ছয় দিন সাওম পালন করে সে যেন সদ্য মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ট হওয়া নিষ্পাপ হয়ে গেল”।[126]

পরিশেষে রাব্বুল আলামীন আল্লাহর প্রশংসা করছি এবং দুরূদ ও সালাত বর্ষিত হোক মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর পরিবার-পরিজন ও তার সাহাবীদের ওপর।

এ বইটিতে ইবন রজব আল-হাম্বলী রহ.-এর ‘লাতায়িফুল মা‘আরিফ’ অবলম্বনে রমযানের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করা হয়েছে। পাঠক এতে নিম্নোক্ত বিষয়সমূহ জানতে পারবেন:

রমযান ও এ মাসে সাওম পালনের ফযীলত, রমযানে দান-সাদাকা ও কুরআন তিলাওয়াতের মর্যাদা, তারাবীহ, রমযানে তাহাজ্জুদ, রমযানের মধ্য দশ দিন, রমযানের শেষ দশকের রমজান মাসের ফজিলত , রমযানের শেষ সাত দিন, লাইলাতুল কদরের সর্বাধিক সম্ভাবনাময় রাত এবং শাওয়ালের ছয়টি সাওম।

[1] নাসাঈ, হাদীস নং ২১০৬, আলবানী রহ. বলেছেন, হাদীসটি সহীহ। মুসনাদে আহমদ, ৭১৪৮, শু‘আইব আরনাঊত বলেছেন, হাদীসটি সহীহ।

[2] মুসনাদুশ শামিয়্যীন, তাবরানী, ৩/২৭১, হাদীস নং ২২৩৮। কিতাবটির লেখক আব্দুর রহমান ইবন মুহাম্মাদ ইবন কাসেম বলেন, হাদীসটির বর্ণনাকারীগণ সিকাহ; তারতীবুল আমালিল খামীসিয়্যাহ লিশশাজারী, ইয়াহইয়া ইবন হুসাইন আশ-শাজারী আল-জুরজানী, ১/৩৫০, হাদীস নং ১২৩৪।

[3] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৮৯৯।

[4] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০৭৯।

[5] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০৭৯।

[6] তিরমিযী, হাদীস নং ৬৮২, ইমাম তিরমিযী রহ. বলেছেন, এ পরিচ্ছেদে আব্দুর রহমান ইবন ‘আউফ, ইবন মাস‘ঊদ ও সালমান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম থেকে হাদীস বর্ণিত আছে। ইবন মাজাহ, হাদীস নং ১৬৪২। আলবানী রহ. বলেছেন, হাদীসটি সহীহ। নাসাঈ, হাদীস নং ২১০৭। মুসতাদরাক হাকিম, হাদীস নং ১৫৩২, তিনি হাদীসটিকে বুখারী ও মুসলিমের শর্তানুযায়ী সহীহ বলেছেন।    

[7] ইবন খুযাইমাহ, হাদীস নং ২২১২, আলবানী রহ. হাদীসের সনদটি সহীহ বলেছেন। সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস নং ৩৪৩৮, শু‘আইব আরনাঊত হাদীসের সনদটিকে শাইখাইনের শর্তানুযায়ী সহীহ বলেছেন।

[8] মু‘জামুল আওসাত, তাবরানী, ৪/১৮৯, হাদীস নং ৩৯৩৯, তাবরানী রহ. বলেন, এ সনদ ব্যতীত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এ হাদীসটি বর্ণিত হয় নি, যায়েদ ইবন আবু রুকাদ এককভাবে বর্ণনা করেছেন। শু‘আবুল ঈমান, বাইহাকী, ৫/৩৪৮, হাদীস নং ৩৫৩৪। ইমাম হাইসামী রহ. মাজমা‘উয যাওয়ায়েদে (৩/১৪০) বলেন, হাদীসটি ইমাম তাবরানী রহ. আল-আওসাতে যায়েদ ইবন আবু রুকাদ থেকে বর্ণনা করেছেন। তার ব্যাপারে ইমামগণ মতানৈক্য করেছেন। কেউ কেউ তাকে সিকাহ বলেছেন। 

[9] মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ১৪০৩, শু‘আইব আরনুঊত হাদীসটিকে হাসান লিগাইরিহি বলেছেন। সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস নং ২৯৮২, আলবানী রহ. ‘আততা‘লীক আততারগীব’ (১/১৪২) এ হাদীসটি সহীহ বলেছেন।

[10] তিরমিযী, ৩৫৩১, ইমাম তিরমিযী রহ. বলেছেন, হাদীসটি হাসান সহীহ। ইবন মাজাহ, ৩৮৫০, আলবানী রহ. বলেছেন, হাদীসটি সহীহ। মুসতাদরাক হাকিম, ১৯৪২, ইমাম হাকিম রহ. বলেছেন, হাদিসটি বুখারী ও মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহীহ, তবে তারা কেউ তাখরিজ করেননি।

[11] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৯০৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৫১।

[12] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৯০৪।

[13] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৭৫৩৮।

[14] মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ১০৫৫৪। হাদীসের সনদটি শাইখাইনের শর্তানুযায়ী সহীহ। 

[15] নাসাঈ, হাদীস নং ২৪০৮, আলবানী রহ. বলেছেন, হাদীসটি সহীহ। ইবন হিব্বান, ৩৬৫৯।

[16] সহীহ ইবন খুযাইমা, হাদীস নং ১৮৮৭। মুহাক্কীক মুহাম্মাদ মুস্তফা আল-‘আযামী রহ. হাদীসটিকে দ‘ঈফ বলেছেন। 

[17] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১১৯০; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৩৯৪।

[18] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৩৯৪।

[19] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৮৬৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২৫৬; আবু দাউদ, হাদীস নং ১৯৯০।  

[20] সুনান আল-কুবরা, বাইহাকী, হাদীস নং ৮৩৩৫।

[21] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৮৯৪, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৫১। 

[22] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৯০৩।

[23] আততারগীর ওয়াততারহীব, ২/৩৬২, হাদীস নং ১৭৭৪। ইবনুল মাদীনী হাদীসের সনদটিকে মুসলিমের শর্তানুযায়ী সহীহ বলেছেন। 

[24] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৯০৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৫১।  

[25] নাসাঈ, হাদীস নং ২২৩৫; আলবানী রহ. হাদীসটির সনদটিকে সহীহ ও মাকতু‘ বলেছেন। মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ১৬৯০, মুহাক্কীক শু‘আইব আরনাঊত হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।

[26] ইবন মাজাহ, হাদীস নং ১৬৯০, ইবন খুযাইমা, হাদীস নং ১৯৯৭, ইবন হিব্বান, হাদীস নং ৩৪৮১। হাদীসটির সনদ সহীহ।

[27] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৯০৪।

[28] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৯৫৭, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০৯৮।

[29] মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ১১৩৯৬; ইবন হিব্বান, হাদীস নং ৩৪৬৭, শু‘আইব আরনাঊত হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। তবে গ্রন্থকারের বর্ণিত হাদীসের নস হুবহু পাওয়া যায়নি।

[30] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭৩৪।

[31] তিরমিযী, হাদীস নং ৩৪৯৮, ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। আলবানী রহ. হাদীসটিকে দ‘ঈফ বলেছেন, তবে তিনি হাদীসের প্রথম অংশ ইমামুল ‘আদিলের পরিবর্তে মুসাফিরের কথা বা অন্য বর্ণনায় আল-ওয়ালিদের কথা উল্লেখ পূর্বক সহীহ বলেছেন। মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ৮০৪৩, শু‘আইব আরনাঊত হাদীসটিকে তার অন্যান্য বর্ণনাসূত্র ও শাওয়াহেদের ভিত্তিতে সহীহ বলেছেন।

[32] আবু দাউদ, হাদীস নং ২৩৫৭। আলবানী রহ. হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। 

[33] তিরমিযী, হাদীস নং ২৪৮৬, তিরমিযী রহ. হাদীসটিকে হাসান গরীব বলেছেন। আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[34] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৯০৪; ইবন খুযাইমাহ, হাদীস নং ১৮৯৬।

[35] মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ২০৭৩৯, শু‘আইব আরনাঊত হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[36] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৮৯৬।

[37] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৯০৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৫১।

[38] তিরমিযী, হাদীস নং ২৮৬৩, ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান সহীহ গরীব বলেছেন। আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[39] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৯০২।

[40] মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ২০৪২, শু‘আইব আরনাঊত হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[41] মুসনাদ বাযযার, হাদীস নং ৮৯৪৯; মুসতাদরাক হাকিম, হাদীস নং ৪২২১, ইমাম হাকিম হাদীসটিকে মুসলিমের শর্তানুযায়ী সহীহ বলেছেন। ইমাম যাহাবীও একমত পোষণ করেছেন। আস-সুনান আল-কুবরা লিলবায়হাকী, হাদীস নং ২০৭৮২।

[42] তিরমিযী, হাদীস নং ৮০৭, ইমাম তিরমিযী রহ. বলেছেন, হাদীসটি হাসান সহীহ। ইবন মাজাহ, হাদীস নং ১৭৪৬। ইমাম আলবানী রহ. বলেছেন, হাদীসটি সহীহ। ইবন হিব্বান, ৩৪২৯।

[43] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১২৮৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯২৩।

[44] তিরমিযী, হাদীস নং ১৯৮৪, ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে গরীব বলেছেন। আলবানী রহ. হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।

[45] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০৮২।

[46] সুনানে নাসাঈ, হাদীস নং ২২৩০, সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস নং ৩৬৪৯। হাদীসটি সহীহ।

[47] মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ৯২২৫, শু‘আইব আরনাঊত হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, তবে এ সনদটিকে হাসান বলেছেন।

[48] মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ২২০১৬, শু‘আইব আরনাঊত হাদীসটিকে তুরুক ও শাওয়াহেদের ভিত্তিতে সহীহ বলেছেন, তবে এ সনদটি মুনকাতি‘।

[49] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৪১৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০১৬।

[50] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৪৫০।

[51] «كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَجْوَدَ النَّاسِ بِالخَيْرِ، وَكَانَ أَجْوَدُ مَا يَكُونُ فِي رَمَضَانَ حِينَ يَلْقَاهُ جِبْرِيلُ، وَكَانَ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلاَمُ يَلْقَاهُ كُلَّ لَيْلَةٍ فِي رَمَضَانَ، حَتَّى يَنْسَلِخَ، يَعْرِضُ عَلَيْهِ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ القُرْآنَ، فَإِذَا لَقِيَهُ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلاَمُ، كَانَ أَجْوَدَ بِالخَيْرِ مِنَ الرِّيحِ المُرْسَلَةِ»

“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধন-সম্পদ ব্যয় করার ব্যাপারে সকলের চেয়ে দানশীল ছিলেন। রমযানে জিবরীল আলাইহিস সালাম যখন তাঁর সাথে দেখা করতেন, তখন তিনি আরো অধিক দান করতেন। রমযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি রাতেই জিবরীল আলাইহিস সালাম তাঁর একবার সাক্ষাৎ করতেন। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে কুরআন শোনাতেন। জিবরীল আলাইহিস সালাম যখন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন তখন তিনি রহমত প্রেরিত বায়ূর চেয়ে অধিক ধন-সম্পদ দান করতেন।” সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৯০২। (অনুবাদক)

[52] আল-আহাদীসুল মুখরাতাহ, যিয়াউদ্দীন আল-মাকদীসী, হাদীস নং ৩৮৭।

[53] নাসাঈ, হাদীস নং ১৬৬৪, আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ২৩৩৯, শু‘আইব আরনাঊত হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, তবে এ সনদটি দ‘ঈফ।

[54] নাসাঈ, হাদীস নং ১৬৬৫, আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[55] মুখতাসারু কিয়ামুল লাইল, মুহাম্মাদ ইবন নসর আল-মারওয়াযী, পৃ. ২২০; কিয়ামু রমযান, নাসির উদ্দীন আলবানী রহ. পৃ. ২৪।

[56] মুসাননাফ আব্দুর রাযযাক, ৪/২৬১/৭৭৩১; বায়হাকী, ২/৪৯৭; কিয়ামু রমযান, নাসির উদ্দীন আলবানী রহ. পৃ. ২৪, তিনি এ বর্ণনাগুলোকে সহীহ বলেছেন।

[57] তিরমিযী, হাদীস নং ৮০৬, ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ। নাসাঈ, হাদীস নং ১৬০৫, আলবানী রহ. বলেছেন, হাদীসটি সহীহ। ইবন খুযাইমা, হাদীস নং ২২০৬, ‘আযামী রহ. বলেছেন, হাদীসের সনদটি সহীহ। ইবন হিব্বান, ২৫৪৭। শু‘আইব আরনাঊত বলেছেন, হাদীসের সনদটি মুসলিমের শর্তে সহীহ।

[58] আবু দাউদ, হাদীস নং ১৩৯৮। আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[59] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৭৫২৭; আবু দাউদ, হাদীস নং ১৪৬৯।

[60] মুসলিম, হাদীস নং ৮০৪।

[61] তিরমিযী, হাদীস নং ২৯১০।

[62] আবু দাউদ, হাদীস নং ১৪৬৪; তিরমিযী, হাদীস নং ২৯১৪। আলবানী রহ. হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন। 

[63] ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৩৭৮০; আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ১১৩৬০।

[64] সুনান নাসাঈ, হাদীস নং ১৭৮৩। আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহুল ইসনাদ বলেছেন।

[65] মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ২২৯৫০। শু‘আইব আরনাঊত হাদীসটির সনদকে মুতাবা‘আত ও শাওয়াহেদের ভিত্তিকে হাসান বলেছেন।

[66] মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ২০১৬৫, শু‘আইব আরনাঊত হাদীসটিকে শাইখাইনের শর্তানুযায়ী সহীহ বলেছেন।

[67] মুসান্নাফ ইবন আবু শাইবা, হাদীস নং ৩০০৪৪; আল-মাতালিবুল ‘আলিয়্যাহ বিযাওয়ায়িদিল মাসানিদিস সামানিয়্যাহ, ইবন হাজার আসকালালী, ১৪/৩৮২, হাদীস নং ৩৪৯১, ইবন হাজার রহ. হাদীসের সনদটিকে হাসান বলেছেন। 

[68] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৭, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭৫৯।

[69] তিরমিযী, হাদীস নং ২৪৮৫, ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[70] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৬৩।

[71] তিরমিযী, হাদীস নং ৩৫৪৯, ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে গরীব বলেছেন। সহীহ ইবন খুযাইমা, হাদীস নং ১১৩৫, আলবানী রহ. হাদীসটিকে শাওয়াহেদের ভিত্তিতে হাসান বলেছেন।

[72] তিরমিযী, হাদীস নং ৩২৩৫, ইমাম তিরমিঈ হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন। আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। 

[73] মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ৩৯৪৯, শু‘আইব আরনাঊত হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।

[74] মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ১৭৭৯১, শু‘আইব আরনাঊত হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[75] মুয়াত্তা মালিক, ১/৩১৯, হাদীস নং ৯; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ১১০৩৪, শু‘আইব আরনাঊত হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন; সহীহ ইবন খুযাইমা, হাদীস নং ২১৭১।

[76] সহীহ ইবন খুযাইমা, হাদীস নং ২১৭১; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ১১৭০৪, শু‘আইব আরনাঊত হাদীসটিকে শায়খাইনের শর্তানুযায়ী সহীহ বলেছেন।

[77] মু‘জাম কাবীর, তাবরানী, ১৩/১৪১; শরহে মা‘আনিল আসার, ৩/৮৮।

[78] আবু দাউদ, হাদীস নং ১৩৮৪, আলবানী রহ. হাদীসটিকে দ‘ঈফ বলেছেন। জামে‘উল উসূল, ৯/২৫৫, মুহাক্কিক আইমান সালিহ শা‘বান হাদীসের সনদটিকে হাসান বলেছেন; তাছাড়া শু‘আইবও আরনাঊত হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। 

[79] মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ১০৭৩৪, শু‘আইব আরনাঊত হাদীসটিকে হাসানের সম্ভাবনা বলেছেন। মাজমা‘উয যাওয়ায়েদে (৩/১৭৬) হাইসামী রহ. বলেছেন, হাদীসটি আহমাদ, বাযযার ও তারবানী বর্ণনা করেছেন এবং তাদের বর্ণনাকারীগণ সিকাহ। আলবানী রহ. হাদীসটিকে হাসান বলেছেন, সহীহহুল জামে‘ আস-সাগীর, ২/৯৬১।

[80] সহীহ ইবন খুযাইমা, হাদীস নং ২১৯০, আলবানী রহ. হাদীসটিকে ২১৯২ ও ২১৯৩ নং শাওয়াহেদের ভিত্তিতে সহীহ বলেছেন। শু‘আইব আরনাঊত হাদীসটিকে শাওয়াহেদের ভিত্তিতে সহীহ বলেছেন।

[81] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২০২৪, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৭৪।

[82] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৭৫।

[83] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭৪৬।

[84] ইতহাফুল মাহারা, ইবন হাজার আসকালানী, ১৫/৪১৪।

[85] ফাদায়েলু রমযান, ইবন আবীদ দুনিয়া, পৃ. ৪৮।

[86] তিরমিযী, হাদীস নং ৭৯৫, ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন; আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[87] মাশীখাতু ইবন বুখারী, জামালুদ্দীন ইবনুয যাহিরী আল-হানাফী, ১/৫৭২, তিনি হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[88] মুয়াত্তা মালিক, ২/১৬২, হাদীস নং ৩৮৯; জামে‘উল উসূল, ৬/৬৮, হাদীস নং ৪১৭৯, মুহাক্কিক আব্দুল কাদির আরনাঊত হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[89] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৯৬৩।

[90] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২০২৬, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৭২। 

[91] মুয়াত্তা মালিক, হাদীস নং ১১৪৫, মুহাক্কিক আইমান শা‘বান সালিহ বলেন, ইমাম মালিক আহলে ইলমের সিকাহদের থেকে এ হাদীস শুনেছেন। এ হাদীসের মুরসাল শাওয়াহেদ আছে। দেখুন, জামে‘উল উসূল, ৯/২৪১। আলবানী রহ. হাদীসটিকে দ‘ঈফ মু‘দাল বলেছেন। 

[92] আস-সুনান আল-কুবরা, বাইহাকী, হাদীস নং ৮৫২২, তিনি হাদীসটিকে মুরসাল বলেছেন; তাখরীজ আহাদীস আল-কাশশাফ, ৪/২৫৩, মুহাক্কিক হাদীসটিকে মুরসাল বলেছেন।

[93] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৯০১।

[94] মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ২২৭১৩, শু‘আইব আরনাঊত হাদীসটিকে হাসান বলেছেন; তবে দুটি ইবারত ব্যতীত। সে দুটি ইবারত হলো (أَوْ فِي آخِرِ لَيْلَةٍ) এবং (وَمَا تَأَخَّرَ)।

[95] নাসাঈ, হাদীস নং ২১০৬, আলবানী রহ. বলেছেন, হাদীসটি সহীহ। মুসনাদে আহমদ, ৭১৪৮, শু‘আইব আরনাঊত বলেছেন, হাদীসটি সহীহ।

[96] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২০১৫, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৬৫।

[97] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৬৫।

[98] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২০২১।

[99] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২০২২।

[100] তিরমিযী, ৭৯৪, ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ। ইবন হিব্বান, ৩৬৮৬, শু‘য়াইব আরনাঊত বলেছেন, হাদীসের সনদটি সহীহ। মুসতাদরাকে হাকিম, ১৫৯৮, ইমাম হাকিম রহ. বলেছেন, হাদীসটির সনদ সহীহ, তবে ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ. তাখরিজ করেননি। 

[101] আবু দাউদ, হাদীস নং ১৩৮০, আলবানী রহ. হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন।

[102] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭৬২।

[103] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭৬২।

[104] মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ২১৪৯। শু‘আইব আরনাঊত হাদীসটিকে বুখারীর শর্তানুসারে সহীহ বলেছেন।

[105] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২০১৫, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৬৫।

[106] মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ৪৮০৮, শু‘আইব আরনাঊত হাদীসটিকে বুখারী ও মুসলিমের শর্তানুসারে সহীহ বলেছেন।

[107] আবু দাউদ, হাদীস নং ১৩৮৬, আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[108] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৯০১।

[109] মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ২২৭১৩, শু‘আইব আরনাঊত হাদীসটিকে হাসান বলেছেন; তবে দুটি ইবারত ব্যতীত। সে দুটি ইবারত হলো (أَوْ فِي آخِرِ لَيْلَةٍ) এবং (وَمَا تَأَخَّرَ)।

[110] নাসাঈ, হাদীস নং ৩৪০৫। নাসাঈর হাদীসে مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ وَمَا تَأَخَّرَ কথাটি সাওমের সাথে সম্পৃক্ত; কিন্তু গ্রন্থকার এটিকে লাইলাতুল কদরের সাথে সম্পৃক্ত করে দিয়ে হাদীসকে সহীহ বলেছেন। (অনুবাদক)

[111] তিরমিযী, ৩৫৩১, ইমাম তিরমিযী রহ. বলেছেন, হাদীসটি হাসান সহীহ। ইবন মাজাহ, ৩৮৫০, আলবানী রহ. বলেছেন, হাদীসটি সহীহ। মুসতাদরাক হাকিম, ১৯৪২, ইমাম হাকিম রহ. বলেছেন, হাদিসটি বুখারী ও মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহীহ, তবে তারা কেউ তাখরিজ করেন নি।

[112] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৮।

[113] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২০১৪, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭৬০।

[114] সুনান নাসাঈ আল-কুবরা, হাদীস নং ২৫২৩।

[115] মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ২২৭১৩, শু‘আইব আরনাঊত হাদীসটিকে হাসান বলেছেন; তবে দুটি ইবারত ব্যতীত। সে দুটি ইবারত হলো (أَوْ فِي آخِرِ لَيْلَةٍ) এবং (وَمَا تَأَخَّرَ)।

[116] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৩৩।

[117] তিরমিযী, হাদীস নং ২৫৩০, আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[118] হিলইয়াতুল আওলিয়া, ১/৭৫।

[119] মুসতাদরাক হাকিম, হাদীস নং ৭২৫৬, ইমাম হাকিম রহ. বলেছেন, হাদীসের সনদটি সহীহ, তবে বুখারী ও মুসলিম কেউ উল্লেখ করেননি। ইমাম যাহাবী রহ. সহীহ বলেছেন। আবূ হুরাইরা, আনাস ও জাবির রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে অনুরূপ বর্ণনা আছে। দেখুন, তিরমিযী, হাদীস নং ৩৫৪৫। ইমাম তিরমিযী রহ. বলেছেন, হাদীসটি হাসান সহীহ। আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[120] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০৭৯।

[121] তিরমিযী, হাদীস নং ৬৮২, ইমাম তিরমিযী রহ. বলেছেন, এ পরিচ্ছেদে আব্দুর রহমান ইবন ‘আউফ, ইবন মাস‘ঊদ ও সালমান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম থেকে হাদীস বর্ণিত আছে। ইবন মাজাহ, ১৬৪২। আলবানী রহ. বলেছেন, হাদীসটি সহীহ। নাসাঈ, ২১০৭।  

[122] আবু দাউদ, হাদীস নং ৭৯২। আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[123] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৬৪।

[124] সুনান নাসাঈ আল-কুবরা, হাদীস নং ২৮৭৩। আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[125] আবু দাউদ, হাদীস নং ২৪৩৩। আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। 

[126] তাবরানী আওসাত, হাদীস নং ৮৬২২।

By ফিকাহ কিতাব

এখানে কুরআন শরীফ, তাফসীর, প্রায় ৫০,০০০ হাদীস, প্রাচীন ফিকাহ কিতাব ও এর সুচিপত্র প্রচার করা হয়েছে। প্রশ্ন/পরামর্শ/ ভুল সংশোধন/বই ক্রয় করতে চাইলে আপনার পছন্দের লেখার নিচে মন্তব্য (Comments) করুন। “আমার কথা পৌঁছিয়ে দাও, তা যদি এক আয়াতও হয়” -বুখারি ৩৪৬১। তাই এই পোস্ট টি উপরের Facebook বাটনে এ ক্লিক করে শেয়ার করুন অশেষ সাওয়াব হাসিল করুন

Leave a Reply