যাকাত কাকে দেওয়া যাবে – যাকাত এর মাসালা

যাকাত কাকে দেওয়া যাবে – যাকাত এর মাসালা

যাকাত কাকে দেওয়া যাবে – যাকাত এর মাসালা >> আল হিদায়া ফিকহ এর মুল সুচিপত্র দেখুন

কিতাবঃ আল হিদায়া, ষষ্ঠ অনুচ্ছেদ: জাকাত-সাদাদা কাকে দেয়া জাইয বা জাইয নয়

পরিচ্ছেদঃ সাদাকাতুল ফিতরের পরিমাণ ও সময়

হিদায়া গ্রন্থকার বলেন, এ সম্পর্কে মূল হলো আল্লাহ্‌ তায়ালার বাণীঃ

সাদাকা হলো দরিদ্রদের জন্য, নিঃস্বদের জন্য সাদাকা উশুলের কাজে নিয়োজিতদের জন্য, ঐ লোকদের জন্য যাদের চিত্ত আকর্ষণ করা হয়। দাস মুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহ্‌র রাস্তায় নিয়োজিতদের জন্যে এবং মুসাফিরের জন্য। এটা আল্লাহ্র পক্ষ হতে ফরযকৃত । আর আল্লাহ সর্বজ্ঞানী ও মহা প্রজ্ঞাবান(৯ জ ৬০)।

এই হল আট প্রকার। তার মধ্য থেকে ‘যাদের চিত্ত আকর্ষণ করা হয় সে শ্রেণীটি বাদ পড়েছে। কেননা, আল্লাহ্‌ তা’আলা ইসলামকে মর্যাদা দান করেছেন এবং তাদরে থেকে অমুখাপেক্ষী করে দিয়েছেন। এর উপর ইজমা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

ফকীর ঐ ব্যক্তি, যার সামান্য পরিমাণ জিনিস রহিয়াছে। আর মিসকীন ঐ ব্যক্তি, যার কিছুই নেই। এ ব্যাখ্যা ইমাম আবূ হানীফা (রঃআঃ) হতে বর্ণীত। কেউ কেউ এর বিপরীত বর্ণনা করেছেন।

উভয়টি যুক্তি রহিয়াছে। আবার এরা স্বতন্ত্র দুই শ্রেনী কিংবা একই শ্রেণী। ওসীয়ত অধ্যায়ে ইনশাল্লাহ্‌ এ বিষয়ে আলোচনা করবো। ( যাকাত কাকে দেওয়া যাবে )

জাকাত উসূলের জন্য নিয়োজিত ব্যক্তিকে শাসক তার কাজের পরিমাণ অনুসারে পারিশ্রমিক প্রদান করবেন। এবং এই পরিমাণ দান করবেন, যা তার ও তার অধীনস্তদের (জীবিকার) জন্য যথেষ্ট হয়। তা অষ্টমাংশে সীমাবদ্ধ নয়। ইমাম শাফিঈ(রঃআঃ) ভিন্নমত পোষণ করেন।

কারণ সে যাকাতের হকদার হয়েছে দায়িত্ব পালনের সূত্রে। এ জন্যই নিয়োজিত ব্যক্তি ধনী হলেও তা গ্রহণ করিতে পারে। তবে যেহেতু তাত জাকাত কিঞ্চিত ছাপ রহিয়াছে, সেহেতু রসূলুল্লাহ(সাঃআঃ) এর খান্দানকে ময়লার সন্দেহ থেকেও পবিত্র রাখার জন্য হাশেমী পরিবারের কোন নিয়োজিত ব্যক্তি যাকাতের অর্থ থেকে পারিশ্রমিক গ্রহণ করিতে পারিবে না।

পক্ষান্তরে মর্যাদার যোগ্য হওয়ার ক্ষেত্রে ধনী ব্যক্তি হাশেমীর সমতুল্য নয়। সুতরাং তার ক্ষেত্রে সামান্য সন্দেহ বিবেচ্য নয়।

দাসমুক্তির অর্থ এই যে, মুকাতাবেক দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি লাভের জন্য সাহায্য করা।

রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃআঃ) থেকে এ ব্যাখ্যাই বর্ণীত হয়েছে।

ঋণগ্রস্ত হলো ঐ ব্যক্তি, যার উপর ঋণ রহিয়াছে এবং সে ঋণের পরিমাণ থেকে বেশী নিসাবের মালিক নয়।

ইমাম শাফিঈ(রঃআঃ)-এর মতে হলো ঐ ব্যক্তি, যে দুজনের মাঝে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করিতে গিয়ে কিংবা দুই গোত্রের মাঝে শত্রুতা বিদূরিত করিতে গিয়ে আর্থিক দায় বহন করছে।

আল্লা্হ্‌র রাস্তায় নিয়োজিত ব্যক্তি ইমাম আবূ ইউসূফের মতে ঐ মুজাহিদ, যে সম্পদহীন হয়ে পড়ে। কেননা নিঃশর্তভাবে ব্যবহার করিলে সাধারণতঃ মুজাহিদকেই বুঝায়।

ইমাম মুহাম্মাদ(রঃআঃ)এর মতে, এর অর্থ হজ্জের সফরে অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি। কেননা, বর্ণীত আছে যে, এক ব্যক্তি তার উট আল্লাহর রাস্তায় দান করায় নিয়ত করেছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃআঃ) এর উপর তাকে কোন হজ্জ যাত্রীকে আরোহণ করানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।

ধণী মুজাহিদকে দান করা যাবে না। কেননা দরিদ্ররাই হলো যাকাতের হকদার।

(মুসাফির) অর্থ ঐ ব্যক্তি, নিজের আবাসস্থলে যার অর্থ রহিয়াছে; কিন্তু সে অন্য স্থানে রহিয়াছে, যেখানে তার হাতে কিছুই নেই।

ইমাম কুদূরী (রঃআঃ) বলেন, এই (আটটি) শ্রেণীগুলো যাকাতের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্র । সুতরাং মালিকের ইখতিয়ার আছে যাকাতের অর্থ প্রতিটি শ্রেণীতে প্রদান করার কিংবা্ যে কোন একটি শ্রেণীর মধ্যে দান করার।

ইমাম শাফিঈ (রঃআঃ) বলেন, প্রত্যেক শ্রেণীর (অন্ততঃ) তিনজনকে প্রদান না করিলে জাকাত আদায় হবে না। কেননা অব্যয়ের দ্বারা সম্বন্ধের মাধ্যমে অধিকার সাব্যস্ত হয়।

আমাদের দলিল এই যে, এই সম্বন্ধ নিছক এ কথা বর্ণনা করার জন্য যে, এরা হলো জাকাত প্রদানের ক্ষেত্রে হয়েছে। সুতরাং ক্ষেত্রের বিভিন্নতার প্রতি লক্ষ্য করা হবে না। আর আমরা যে মত গ্রহণ করেছি, তা উমর ও ইব্‌ন আব্বাস(রাঃআঃ) হতে বর্ণীত। ( যাকাত কাকে দেওয়া যাবে )

কোন যিম্মীর জাকাত প্রদান করা জাইয নয়। কেননা রসূলুল্লাহ (সাঃআঃ) মুআয (রাঃআঃ) কে বলেছেনঃ জাকাত মুসলমানদের ধণীদের কাছ থেকে গ্রহণ করো এবং তাহাদের দরিদ্রদের মাঝে ফিরিয়ে দাও।

জাকাত ছাড়া অন্যান্য সাদাকা তাকে দেয়া যাবে।

যাকাতের উপর কিয়াস করে ইমাম শাফিঈ (রঃআঃ) বলেন, (অন্যান্য সাদাকাও যিম্মীকে) দেয়া যাবে না। এটি ইমাম আবূ ইউসুফ (রঃআঃ) থেকে প্রাপ্ত একটি বর্ণনা।

আমাদের দলিল হলো রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃআঃ) এর হাদিস- সকল ধর্মের লোককে সাদাকা প্রদান করো।

মুআয (রাঃআঃ) এর হাদিস না হলে জাকাত প্রদানও আমরা জাইয বলতাম।

যাকাতের অর্থ দ্বারা মসজিদ তৈরী করা যাবে না এবং তা দ্বারা মাইয়েতের কাফন দেওয়া যাবে না। কেননা এখানে মালিক বানানো অনুপস্থিত। অথচ এটাই জাকাত আদায়ের রুকন।

যাকাতের অর্থ দ্বারা কোন মাইয়েতের ঋণ আদায় করা যাবে না। কেননা অন্যের ঋণ আদায় করা ঋণী ব্যক্তিকে মালিক বানানো প্রমাণ করে না, বিশেষতঃ ঋণী মাইয়েতের ক্ষেত্রে।

জাকাতরে অর্থ দ্বারা আযাদ করার জন্য কোন দাস ক্রয় করা যাবে না।

ইমাম মালিক (রঃআঃ) ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি আল্লাহ্‌র বাণী – গোলাম আযাদ করানো। এর ব্যাখ্যা করেছেন।

আমাদের দলিল এই যে, এরূপ আযাদ করার দ্বারা (গোলাম থেকে) মালিকানা রহিত হয় (গোলামকে ) মালিক বানানো হয় না। (অথচ মালিক বানানো যাকাতের রুকন)।

ধনীকে জাকাত দেয়া যাবে না। কেননা, রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃআঃ) বলেছেন- কোন ধণীর জন্য সাদাকা হালাল নয়।

এ নির্দেশ ব্যাপক হওয়ার কারণে এ হাদিস মালদার মুজাহিদের ব্যাপারে ইমাম শাফিঈ (রঃআঃ)-এর বিপক্ষে আমাদের দলিল। তদ্রুপ আমাদের বর্ণীত মুআয (রাঃআঃ) এর হাদিসও (তার বিপক্ষে দলিল)।

ইমাম কুদূরী বলেন, জাকাত আদায়কারী তার পিতা ও পিতামহকে যত উর্ধ্বতনই হোক, তদ্রুপ আপন পু্ত্র এবং পুত্রের পুত্রকে যত অবঃস্তনই হোক, জাকাত দিতে পারিবে না। কেননা, মালিকানার লাভালাভ তাহাদের মাঝে ওতপ্রোতভাবে জড়িত পূর্ণরূপে। সুতরাং মালিক বানানো সাব্যস্ত হবে না।

আপন স্ত্রীকেও দিতে পারিবে না। কেননা সাধারণতঃ উপকার গ্রহণে (তাহাদের মাঝে) অংশীদারিত্ব রহিয়াছে।

ইমাম আবূ হানীফা (রঃআঃ) এর মতে স্ত্রী তার স্বামীকে জাকাত দিতে পারিবে না, উল্লেখিত কারণে।

আর সাহেবাইন বলেন, তাকে দিতে পারিবে। কেননা রাসূলুল্লাহ্‌(সাঃআঃ) বলেছেন- তোমার জন্য রহিয়াছে দুটি প্রতিদান ঃ সাদাকার প্রতিদান এবং স্বজনের সহানুভূতির প্রতিদান।

ইবন মাসউদ (রাঃআঃ) এর স্ত্রী ইব্‌ন মাসঊদ (রাঃআঃ) কে সাদাকা প্রদান সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করিলে তিনি একথা বলেছিলেন।

আমরা এর উত্তরে বলি, আলোচ্য হাদিস নফল সাদাকার উপর প্রযোজ্য।

ইমাম কুদূরী (রঃআঃ) বলেন,  আপন মুদাব্বার, মুকাতাব এবং উম্মু ওয়ালাকে জাকাত দিতে পারিবে না। কেননা, এ সকল ক্ষেত্রে তামলীক (বা মালিক বানানো) অনুপস্থিত। যেহেতু দাসদাসীর যাবতীয় উপার্জন তার মনিবের মুকাতারেব উপার্জনেও মনিবের অধিকার রহিয়াছে। সুতরাং পূর্ণ রূপে তাতে মালিক বানানো হয় না।

আর এমন গোলামকেও দিতে পারিবে না, যার একাংশ আযাদ করা হয়েছে।

এটা ইমাম আবূ হানীফা (রঃআঃ)-এর মত। কেননা, তার বিবেচনায় উক্ত গোলাম মুকাতাবের পর্যায়ভূক্ত।

আর সাহেবাইনের বলেন, তাকে দেওয়া যাবে। কেননা, তাহাদের মতে স্বাধীন ঋণগ্রস্ত।

কোন ধনীর দাসকে জাকাত দিবে না। কেননা, মালিকানা তার মনিবের জন্যই সাব্যস্ত হয়ে থাকে।

আর কোন ধনীর নাবালেগ সন্তানকে দিবে না। কেননা, তাকে তার পিতার সম্পদের কারণে ধণী গণ্য করা হয়। তবে সাবালক দরিদ্র সন্তানকে দেওয়া যাবে। কেননা, পিতার সচ্ছলতার কারণে তাকে মালদার গণ্য করা হয় না। যাদিও (বিশেষ কারণে) তার ভরণ-পোষণ তার পিতার যিম্মায় থাকে। আর ধনী লোকের স্ত্রীর হুকুম এর বিপরীত। কেননা সে নিজে দরিদ্র হলে স্বামীর সচ্ছলতার কারণে তাকে ধনী বিবেচনা করা হয় না। আর ভরণ পোষণের পরিমাণ দ্বারা সে মালদার গণ্য হবে না।

আর হাশিমী বংশের কাউকে জাকাত দিবে না। কেননা রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃআঃ) বলেছেন-

হে হাশিমীগণ! আল্লাহ তা’আলা তোমাদের জন্য মানুষের এটো পানি এবং তাহাদের ময়লা হারাম করেছেন এবং তার বিনিময়ে তোমাদেরকে পঞ্চম ভাগের পঞ্চমাংশ দান করেছেন।

তবে নফল দান তাহাদের দেয়া যাবে । কেননা এ  ক্ষেত্রে সম্পদ হলো পানির মতো। ফরয আদায় করার কারণে তা ময়লা হয়ে যায়। আর নফল দান হলো শীতলতা লাভ করার জন্য পানি ব্যবহার করার মতো।

ইমাম কুদূরী (রঃআঃ) বলেন, হাশিমীগণ হলেন আলী (রাঃআঃ) ‘আব্বাস (রাঃআঃ) জাফর (রাঃআঃ) আকীল (রাঃআঃ) ও হারিস ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিব (রাঃআঃ)-এর পরিবারগণ এবং তাহাদের আযাদকৃত গোলামগণ। কেননা এরা সকলে হাশিম ইব্‌নে আবদে মুনাফ এর সংগে সম্পৃক্ত। আর হাশিম গোত্রের পরিচয়ও তার সাথেই সম্পৃক্ত। তাহাদের আযাদকৃত গোলামদের ক্ষেত্রে কারণ এই যে, বর্ণীত আছে, রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃআঃ) এর আযাদকৃত গোলাম (আবূ রাফে) একবার তাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আমার জন্য কি সাদাকা হালাল হবে? তিনি বলিলেন, না, তুমি তো আমাদের মাওলা(আযাদকৃত)।

পক্ষান্তরে কোন কুরায়শী যদি কোন নাসরানী গোলামকে আযাদ করে তবে তার নিকট হতে জিয্‌যা গ্রহণ করা হবে। এবং এ ক্ষেত্রে আযাদকৃত ব্যক্তির অবস্থা্য়ই বিবেচনা করা হবে। কেননা এটাই কিয়াস ও যুক্তির দাবী। পক্ষান্তরে মনিবের সংগে যুক্ত করার বিষয়টি সাব্যস্ত হয়েছে হাদিস দ্বারা আর হাদিসে বিশেষভাবে সাদাকাকেই উল্লেখ করা হয়েছে।

ইমাম আবূ হানীফা ও মুহাম্মাদ(রঃআঃ) বলেন, যদি কোন ব্যক্তিকে দরিদ্র মনে করে জাকাত দিয়ে থাকে এবং পরে প্রকাশ পায় যে, সে সচ্ছল ব্যক্তি বা হাশিমী পরিবারের লোক বা কাফির, কিংবা অন্ধকারে জাকাত প্রদান রহিয়াছে, কিন্তু পরে প্রকাশ পেল যে, লোকটি তার পিতা কিংবা ভাই, তাহলে তার জন্য পুনঃ জাকাত প্রদান জরুরী নয়। ইমাম আবূ ইউসুফ (রঃআঃ) বলেন, তার জন্য পুনঃ জাকাত প্রদান জরুরী। কেননা, সুনিশ্চিত ভাবে তার ভুল প্রকাশ পেয়েছে। অথচ এ বিষয়গুলো জেনে নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিলো। বিষয়টি পাত্র ও বস্ত্রের হুকুমের অনুরূপ হয়ে গেল।

ইমাম আবূ হানীফা ও মুহাম্মাদ (রঃআঃ) এর দলিল হলো মাআন ইব্‌ন ইয়াযীদ এর হাদিস।

কেননা, নাবী করিম (সাঃআঃ) এ প্রসংগে বলেছেন- হে ইয়াযীদ, তুমি যা নিয়্যত করেছো, তা তুমি পাবে। আর হে মাআন, তুমি যা নিয়েছো তা তোমার।

ঘটনা ছিলো এই যে, মাআন (রাঃআঃ)-এর আব্বা ইয়াযীদ এর ওয়াকীল তার সাদাকার অর্থ তার পুত্র মাআন কে প্রদান করেছিলেন।

তাছাড়া এ সমস্ত বিষয় অবগত হওয়া ইজতিহাদ ও চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে হয়ে থাকে। নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং এ ক্ষেত্রে চিন্তা-ভাবনার পর যা স্থিরীকৃত হয় তার উপরই বিষয়টি নির্ভরশীল হবে। যেমন যখন কিবলার দিক তার জন্য সন্দেহযুক্ত হয়।

ইমাম আবূ হানীফা (রঃআঃ) হতে বর্ণীত আছে যে, মালদার ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্র গুলোতে প্রদত্ত জাকাত যথেষ্ট হবে না। (পুনরায় জাকাত প্রদান করিতে হবে)।

তবে প্রথমোক্ত মতই হলো জাহিরী রিওয়ায়াত। এ সিদ্ধান্ত তখনই হবে, যখন সে চিন্তা-ভাবনা করে জাকাত প্রদান করে আর তার প্রবল ধারণা হয়ে থাকে যে, লোকটি যাকাতের উপযুক্ত পাত্র। পক্ষান্তরে যদি তার সন্দেহ হয়ে থাকে অথচ চিন্তা না করে থাকে, কিংবা চিন্তা করে প্রদান করেছে, অথচ তার প্রবল ধারণা হয়ে ছিলো যে, সে যাকাতের উপযুক্ত পাত্র নয়; তবে প্রদত্ত জাকাত গ্রহণযোগ্য হবে না, তবে যদি পরে সে জানতে পারে যে, সে দরিদ্র। এটাই বিশুদ্ধ মত।

যদি কোন ব্যক্তিকে জাকাত প্রদানের পর জানতে পারে যে, সে তার নিজের গোলাম কিংবা মুকাতাব ছিল, তাহলে প্রদত্ত জাকাত যথেষ্ট হবে না। কেননা এ ক্ষেত্রে মালিক বানানো অনুপস্থিত। কারণ (তাহাদের মধ্যে) মালিকানার যোগ্যতা নেই, অথচ পুর্বে আলোচনা করা হয়েছে যে, মালিক বানানো হলো জাকাত আদায়ের রুকন।

যে ব্যক্তি যে কোন মালের নিসাব পরিমাণের মালিক হবে, তাকে জাকাত প্রদান করা জাইয নয়। কেননা শরীআতের পরিভাষায় মালদার হওয়া নিসাব দ্বারাই নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে শর্ত এই যে, এ নিসাব তার মৌলিক প্রয়োজন থেকে উদ্বৃত্ত হতে হবে।

সম্পদের বর্ধনশীলতার গুণটি হলো জাকাত ওয়াজিব হওয়ার শর্ত।

নিসাবের কম পরিমাণ মালের অধিকারীকে জাকাত প্রদান করা জাইয, যদিও সে সুস্থ ও উপার্জণযোগ্য হয়ে থাকে। কেননা সে দরিদ্র, আর দরিদ্ররাই হলো যাকাতের ক্ষেত্র।

তাছাড়া যেহেতু প্রকৃত প্রয়োজন সম্পর্কে অবগত হওয়া সম্ভব নয়, সেহেতু প্রয়োজনের প্রমাণের উপর হুকুম আবর্তিত হবে। আর প্রমাণ হলো নিসাব পরিমাণ মাল না থাকা।

এক ব্যক্তিকে দুশ দিরহাম বা তার বেশী প্রদান করা মাকরূহ। তবে যদি প্রদান করে তবে জাইয হবে।

ইমাম যুফার (রঃআঃ) বলেন, জাইয হবে না। কেননা তার সচ্ছলতা জাকাত প্রদানের সংগে যুক্ত হয়ে যায়। সুতরাং মালদার ব্যক্তিকে জাকাত দেওয়া হয়ে গেল।

আমাদের যুক্তি এই যে, মালদার হওয়া জাকাত প্রদানের ফল, সুতরাং তা জাকাত প্রদানের পরেই সাব্যস্ত হবে, তবে সচ্ছলতাটা জাকাত আদায়ের অতি নিকটবর্তী  হওয়ার কারণে তা মাকরূহ হবে।

যেমন কেউ নাজাসাতের পাশে দাড়িয়ে নামাজ আদায় করল।

ইমাম মুহাম্মাদ (রঃআঃ) বলেন, জাকাত প্রদান করে এক ব্যক্তিকে সচ্ছল করে দেওয়া আমার নিকট পসন্দনীয়।

এর অর্থ হলো সওয়াল করার প্রয়োজন থেকে তাকে মুক্ত করে দেওয়া। কেননা একেবারেই মালদার করে দেওয়া মাকরূহ।

এক শহর থেকে অন্য শহরে জাকাত স্থানান্তরিত করা মাকরূহ। বরং প্রত্যেক সমাজের সাদাকা তাহাদের (দরিদ্রদের) মাঝেই বন্টন করা হবে।

দলিল হলো আমাদের পূর্ব বর্ণীত মুআয (রাঃআঃ) এর হাদিস। তাছাড়া এতে প্রতিবেশতার হক রক্ষা হয়।

তবে মানুষ তার নিকটাত্মীয়দের কাছে জাকাত পাঠাতে পারে কিংবা এমন জনগোষ্ঠীর কাছে পাঠাতে পারে, যাদের প্রয়োজন তার শহরের লোকদের চেয়ে বেশী।

কেননা, এতে আত্মীয়তার হক রক্ষার কিংবা অধিক পরিমাণ প্রয়োজন দূর করার বিষয় রহিয়াছে। তবে এদের ব্যতীত অন্যদের নিকট স্থানান্তরিত করিলেও জাকাত আদায় হয়ে যাবে। যদিও তা মাকরূহ। কেননা শরীআতের বিধানে যাকাতের ক্ষেত্র নিঃশর্তভাবে যে কোন দরিদ্র। আল্লাহ্‌ই অধিক জানেন।

সপ্তম অনচ্ছেদঃ সাদাকাতুল ফিতর

ইমাম কুদূরী (রঃআঃ) বলেন, সাদাকাতুল ফিত্‌র ওয়াজিব সে স্বাধীন মুসলমানের উপর, যে নিসাব পরিমাণ মালের মালিক হয় এবং তা তার বাসস্থান, বস্ত্র, ব্যবহারিক সামগ্রী, ঘোড়া, অস্ত্র ও দাসদাসীদের থেকে অতিরিক্ত হয়।

ওয়াজিব হওয়ার দলিল এই যে, রাসূলুল্লাহ্‌(সাঃআঃ) তার খুতবায় বলেছেন- প্রত্যেক স্বাধীন ও ছোট বা বড় দাস ব্যক্তির পক্ষ হতে অর্ধ সাআ গম কিংবা এক সাআ যব আদায় করো।

ছাআলাবা ইব্‌ন দুআয়র আল-আদাবী এ হাদিস বর্ণনা করেছেন। আর এ ধরণের হাদিস দ্বারা ওয়াজিব সাব্যস্ত হয়। অকাট্য না হওয়ার কারণে(ফরয সাব্যস্ত হয় না)।

স্বাধীনতার শর্ত আরোপ করা হয়েছে মালিকানা সাব্যস্ত হওয়ার জন্য। আর ইসলামের শর্ত আরোপ করা হয়েছে যেন কাজটি ইবাদত হিসাবে পরিগণিত হয়। সচ্ছলতার শর্ত আরোপ করা হয়েছে, কেননা রাসূলুল্লাহ্‌(সাঃআঃ) বলেছেন- মালদার ছাড়া সাদাকা আরোপিত হয় না। ( যাকাত কাকে দেওয়া যাবে )

এ হাদিস ইমাম শাফিঈ(রঃআঃ) এর বিপক্ষে দলিল। তার বক্তব্য হল, যে ব্যক্তি নিজের ও পরিবারের এক দিনের আহার সামগ্রীর অতিরিক্ত মালের অধিকারী হবে তার উপর সাদাকায়ে ফিত্‌র ওয়াজিব হবে।

সচ্ছলতার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে নিসাব দ্বারা। কেননা শরীআতে নিসাব দ্বারাই মালদারী সাব্যস্ত হয়, যা উপরোক্ত জিনিসগুলো থেকে অতিরিক্ত থাকে। কেননা সেগুলো মৌলিক প্রয়োজনে দায়বদ্ধ। আর মৌলিক প্রয়োজনে দায়বদ্ধ জিনিসকে অস্তিত্বহীন ধরে নেয়া হয়।

এ হিসাবের বর্ধনশীলতার শর্ত নেই। আর এই নিসাবের সংগে সাদাকা গ্রহণের অযোগ্যতা এবং কুরবানী ও সাদকাতুল ফিত্‌র ওয়াজিব হওয়ার সম্পর্ক রহিয়াছে।

ইমাম কুদূরী(রঃআঃ) বলেন, ছাদাকাতুল ফিত্‌র সে আদায় করবে নিজের পক্ষ থেকে। কেননা ইব্‌ন উমর (রাঃআঃ) বর্ণীত হাদিসে রয়েছেঃ রাসূলুল্লাহ্‌(সাঃআঃ) স্ত্রী ও পুরূষের উপর সাদাকাতুল ফিত্‌র ফরয করেছেন।

আর আদায় করবে নিজে অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানদের পক্ষ থেকে। কেননা, সাদাকাতুল ফিত্‌র ওয়াজিব হওয়ার (কারণ) হলো সে সব ব্যক্তি, যার সে ভরণ-পোষণ ও প্রতিপালন করে। কেননা সাদাকা ব্যক্তির সংগে সম্পর্কিত করা হয় এবং বলা হয় অর্থাত্ ব্যক্তির জাকাত। আর সম্বন্ধই হল সবব বা কারণ হওয়ার আলামত। তবে ঈদুল ফিত্‌র এর দিকে সম্বন্ধ করে সাদাকাতুল ফিত্‌র বলা হয় এই হিসাব যে, তা হলো সাদাকাতুল ফিতরের সময়।

যেহেতু ব্যক্তিই হলো সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হওয়ার কারণ, সেহেতু দিন একটি হওয়া সত্ত্বেও ব্যক্তি বিভিন্ন হওয়ার কারণে সাদাকাতুল ফিত্‌র বিভিন্ন হয়ে থাকে।

তবে সাদাকা ওয়াজিব হওয়ার ক্ষেত্রে মূল হলো তার নিজ সত্তা। কেননা, নিজের সত্তার সে প্রতিপালন ও ভরণ-পোষণ করে থাকে। সুতরাং তার সংগে তাহারা যুক্ত হবে যারা তার পর্যায়ভূক্ত। যেমন তার অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানগণ। কেননা সে-ই তাহাদের প্রতিপালন ও ভরণ-পোষণ করে থাকে।

আর আদায় করবে আপন গোলামদের পক্ষ থেকে। কেননা (এদের ক্ষেত্রেও) ভরণ-পোষণ ও প্রতিপালন বিদ্যমান রহিয়াছে। ( যাকাত কাকে দেওয়া যাবে )

অবশ্য গোলামের পক্ষ থেকে ফিতরা তখনই ওয়াজিব হবে, যখন তাহারা খিদমতের জন্য হয়, এবং অপ্রাপ্ত বয়স্কদের পক্ষ থেকে, যখন তাহাদের নিজস্ব সম্পদ না থাকে। আর যদি তাহাদের মাল থাকে, তবে ইমাম আবূ হানীফা ও ইমাম আবূ ইউসুফ(রঃআঃ) এর মতে তাহাদের মাল থেকেই ফেতরা আদায় করবে।

ইমাম মুহাম্মাদ (রঃআঃ) ভিন্নমত পোষণ করেন। কেননা, শরীআত এটাকে আর্থিক দায়-দায়িত্বের পর্যায়ভূক্ত করেছেন। সুতরাং তা ভরন-পোষণের সদৃশ হলো।

আর তার স্ত্রীর পক্ষ থেকে আদায় করিতে হবে না। কেননা অভিভাবক্ত ও আর্থিক দায়িত্ব অসম্পূর্ণ। কারণ বিবাহ সম্পর্কিত হকসমূহ ছাড়া অন্য কোন বিষয়ে সে তার অভিভাবকত্বের অধিকারী নয়। এবং নির্ধারিত বিষয় ছাড়া অন্য কোন বিষয়ে সে তার আর্থিক দায় বহন করে না। যেমন, ঔষধপত্রের ব্যয়।

তদ্রুপ তার প্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানদের পক্ষ থেকে আদায় করিতে হবে না, যদিও তাহারা তার পরিবারভুক্ত। কেননা তাহাদের ক্ষেত্রে ‘অভিভাবকত্ব নেই।

তবে তাহাদের পক্ষ থেকে কিংবা তার স্ত্রীর পক্ষ থেকে তাহাদের সম্মতি ছাড়া যদি সে আদায় করে দেয়, তাহলে তাহাদের পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে। এটা সূক্ষ কিয়াসের দাবী। কেননা, তাহাদের সম্মতি থাকাটাই স্বাভাবিক।

তদ্রুপ আপন মুকাতাবের পক্ষ থেকেও আদায় করিতে হবে না। কেননা, অভিভাবকত্ব বিদ্যমান নেই।

মুকাতাব নিজেও তার পক্ষ হতে আদায় করবে না। কেননা, সে দরিদ্র।

মুদাব্বার ও উম্মু ওয়ালামাদের উপর মনিবের অভিভাবকত্ব বিদ্যমান রহিয়াছে। তাই সে তাহাদের পক্ষ হতে ফিতরা আদায় করবে।

আর তার ব্যবসায়ের গোলামদের পক্ষ থেকেও আদায় করিতে হবে না। ( যাকাত কাকে দেওয়া যাবে )

ইমাম শাফিঈ (রঃআঃ) ভিন্নমত পোষণ করেন। তার মতে সাদাকাতুল ফিত্‌র ওয়াজিব হয়ে গোলামের উপর আর জাকাত ওয়াজিব হয় মনিবের উপর। সুতরাং একটি আর একটির প্রতিবন্ধক হবে না।

আমাদের মতে যাকাতের মত গোলামের কারণে সাদাকাতুল ফিত্‌রও মনিবের উপর ওয়াজিব সাব্যস্ত হয়। যাতে তার উপর দুটি ওয়াজিব আরোপিত হয়ে যায়। (যা শরীআত বিধি বহির্ভূত)।

একটি গোলাম দজন মনিবের মাঝে শরীক হলে কারো উপর ফিতরা ওয়াজিব হবে না। কেননা তাহাদের প্রত্যেকের অভিভাবকত্ব ও ভরন-পোষণ অসম্পূর্ণ।

তদ্রুপ দুজনের মাঝে বহু গোলাম শরীকানায় থাকলে (কারো উপরই ফিত্‌রা ওয়াজিব হবে না)।

এ হল ইমাম আবূ হানীফা(রঃআঃ)-এর মত।

আর সাহেবাইন বলেন, প্রত্যেকের হিস্‌সায় যে কটি পূর্ণ মাথা আসবে, প্রত্যেকের উপর সেগুলোর ফিতরা ওয়াজিব হবে, ভগ্নাংশটির উপর নয়।

এই মতানৈক্যের ভিত্তি এই যে, ইমাম আবূ হানীফা (রঃআঃ) গোলামদের ভাগের প্রতি লক্ষ্য করেন না, আর সাহেবাইন তা ভাগের প্রতি লক্ষ্য করেন।

কোন কোন মতে এটা (কারো উপর ওয়াজিব না হওয়া) সর্বসম্মত মাযহাব। কেননা, তাকসীনের পূর্বে হিস্‌সা একত্র হয় না। সুতরাং দুজনের কারোরই কোন গোলামের উপর মালিকানা পূর্ণ হলো না।

মুসলমান তার কাফির গোলামের পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করবে। এর দলিল হল আমাদের পূর্ব বর্ণীত হিস্‌সা একত্র হয় না। সুতরাং দুজনের কারোরই কোন গোলামের উপর মালিকানা পূর্ণ হলো না।

মুসলমান তার কাফির গোলামের পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করবে। এর দলিল হল আমাদরে পূর্ব বর্ণীত মুতলক ও নিঃশর্ত হাদিস।

তাছাড়া হযরত ইব্‌ন ‘আব্বাস (রাঃআঃ) বর্ণীত হাদিসে রসূলুল্লাহ(সাঃআঃ) বলেছেন- প্রত্যেক স্বাধীন ও দাসের পক্ষ থেকে আদায় কর, সে দাস ইয়াহূদী থাক কিংবা নাসরানী কিংবা মাজুসী হোক।

তাছাড়া যুক্তিগত প্রমাণ এই যে, সাদাকাতুল ফিতরের সবব সাব্যস্ত হয়ে গেছে আর মনিব ফিতরা আরোপের যোগ্য।

এক্ষেত্রে ইমাম শাফিঈ(রঃআঃ) ভিন্নমত পোষণ করেন। কেননা তার মতে ফিতরা ওয়াজিব হয় গোলামের উপর। আর সে ফিতরা ওয়াজিব হওয়া যোগ্য নয়। যদি বিষয়টি বিপরীত হয় তবে সর্ব সম্মতিক্রমেই ফিতরা ওয়াজিব হবে না।

গ্রন্থকার বলেন, যদি কেউ একটি গোলাম বিক্রি করে আর তা উভয়ের মধ্যে একজনের ইখতিয়ার থাকে, তবে গোলাম অবশেষে যার হবে, ফিতরা তার উপরই ওয়াজিব হবে।

অর্থাত্ যদি ইখতিয়ার বাকি থাকা অবস্থায় ঈদুল ফিতরের দিন অতিবাহিত হয়।

যুফার(রঃআঃ) বলেন, যার অনুকূলে ইখতিয়ার থাকবে, তার উপরই ফিতরা ওয়াজিব। কেননা, তারই অধিকারভূক্ত রহিয়াছে।

ইমাম শাফিঈ(রঃআঃ) বলেন, মালিকানা যার জন্য সাব্যস্ত (অর্থাত্ ক্রেতা) তার উপরই ফিতরা ওয়াজিব। কেননা, এটা মালিকানা সম্পর্কিত বিষয়। যেমন ভরন-পোষণের ব্যাপার। আমাদের যুক্তি এই যে, (এমতাবস্থায়) মালিকানা স্থাগিত থাকে। কেননা যদি (ক্রেতা) ফিরিয়ে দেয় তবে তা বিক্রেতার মালিকানায় ফিরে আসবে। পক্ষান্তরে বিক্রয় যদি বহাল রাখে, তবে চুক্তির সময় হতেই মালিকানা সাব্যস্ত হবে। সুতরাং মালিকানার উপর যে জিনিসের ভিত্তি-সেটাও স্থগিত থাকবে। ভরণ-পোষণের বিষয়টি এর বিপরীত। কেননা তার তাত্ক্ষণিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে আরোপিত, যা স্থগিত রাখা সম্ভব নয়।

ব্যবসায়ের জাকাত সম্পর্কেও অনুরূপ মতভেদ রহিয়াছে।

পরিচ্ছেদঃ সাদাকাতুল ফিতরের পরিমাণ ও সময় { হেদায়া কিতাব বাংলা }

ফিতরার পরিমাণ হলো অর্ধ সাআ গম, বা আটা, ছাতু বা কিশমিশ অথবা এক সাআ খেজুর বা যব। সাহেবাইনের মতে কিশমিশ যবের পর্যায়ভূক্ত।

ইমাম আবূ হানীফা (রঃআঃ) থেকেও এ মত বর্ণীত আছে। প্রথম মতটি কিতাবের বর্ণনা অনুযায়ী। ( যাকাত কাকে দেওয়া যাবে )

ইমাম শাফিঈ(রঃআঃ)-এর মতে উল্লেখিত সব কটি জিনিসের ক্ষেত্রেই এক সাআ ওয়াজিব হবে । কেননা আবূ সাঈদ খুদরী(রাঃআঃ) তার বর্ণনায় বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌(সাঃআঃ) এর যামানায় আমরা এই পরিমাণ আদায় করতাম।

আমাদের দলিল হলো সালাবা(রাঃআঃ) বর্ণীত হাদিস যা ইতোপূর্বে আমরা বর্ণনা করেছি। আর এটা একদল সাহাবা ও মাযহাব, যাদের মাঝে খুলাফায়ে রাশেদীন(রাঃআঃ) ও রহিয়াছেন।

ইমাম শাফিঈ (রঃআঃ) যে হাদিস বর্ণনা করেছেন, তা নফল রূপে অতিরিক্ত দানের সংগে সম্পৃক্ত।

কিশমিশ সম্পর্কে সাহেবাইনের বক্তব্য এই যে, কিশমিশ ও খেজুর উদ্দেশ্যের দিক থেকে নিকটবর্তী।

ইমাম আবূ হানীফা (রঃআঃ) –এর দলিল এই যে, কিশমিশ ও গম গুণগত দিকে থেকে নিকটবর্তী। কেননা উভয়টি সর্বাংশে ভক্ষণ করা হয়। অথচ খেজুরের বীচি এবং যবের খোসা ফেলে দিতে হয়। এখান থেকেই গম ও খেজুরের মাঝে সুস্পষ্ট হয়ে যায়।

মতনে উল্লেখিত আটা ও ছাতুর দ্বারা (ইমাম মুহাম্মাদ (রঃআঃ)-এর)উদ্দেশ্য হলো গমের আটা ও ছাতু। যবের ছাতু যবেরই শ্রেণীভূক্ত হবে। তবে সতর্কতার খাতিরে উভয়ের মধ্যে পরিমাণ ও মূল্য বিবেচনা করা উত্তম। যদিও কোন কোন বর্ণনায় ‘আটা কথাটা স্পষ্টভাবে বর্ণীত হয়েছে। সাধারণ অবস্থায় উপর নির্ভর করে কিতাবে বিষয়টি বর্ণনা করা হয়নি।

রুটির ক্ষেত্রে মূল্য বিবেচ্য হবে। এ-ই বিশুদ্ধ মত।

ইমাম আবূ হানীফা (রঃআঃ) এর মতে অর্ধ সাআ গম পাল্লার ওযনে বিবেচনা করা হবে। আর ইমাম মুহাম্মাদ (রঃআঃ) এর বর্ণনা মতে পাত্রের ধর্তব্য হবে।

গমের চেয়ে আটা দ্বারা পরিশোধ করাই উত্তম। আর দিরহাম দ্বারা আদায় করা আটার চেয়ে উত্তম। এ হল ইমাম আবূ ইউসুফ(রঃআঃ) হতে বর্ণীত মত। ফকীহ্‌ আবূ জাফর এ মতই গ্রহণ করেছেন। কেননা, এ দ্বারা প্রয়োজনে অধিক ও ত্বরায় সম্পন্ন হয়।

ইমাম আবূ বকর আল আমাশ থেকে অবশ্য গমকে অগ্রাধিকার প্রদানের কথা বর্ণীত হয়েছে। কেননা, এটা মতভেদ থেকে অধিক দূরবর্তী। কারণ আটা ও মূল্য দ্বারা ফিতরা আদায় হওয়ার ব্যাপারে ইমাম শাফিঈ (রঃআঃ) এর ভিন্নমত রহিয়াছে।

ইমাম আবূ হানীফা (রঃআঃ) ও মুহাম্মাদ (রঃআঃ) এর মতে এক সাআ এর পরিমাণ হচ্ছে আট ইরাকী ‘রতল। আর ইমাম আবূ ইউসুফ (রঃআঃ) এর মতে পাচ রতল ও এক রতলের এক-তৃতীয়াংশ।

এটা ইমাম শাফিঈ(রঃআঃ) এরও মত। কেননা, রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃআঃ) বলেছেন, আমাদের সাআ হলো সকল সাআ এর মধ্যে ক্ষুদ্রতম।

আমাদের দলিল হলো বর্ণীত হাদিস যে, নাবী (সাঃআঃ) ‘মুদ্দ পাত্র দ্বারা উযূ করিতেন যার পরিমাণ ছিলো দুই রতল এবং গোসল করিতেন এক সাআ দ্বারা, যার পরিমাণ ছিলো আট ‘রতল। উমরা(রাঃআঃ) এর সাআও অনুরূপ ছিলো।

আর হাশেমী সাআ-এর তুলনায় এটা ছোট আর তাহারা সাধারণত। হাশিমী সাআ-ই ব্যবহার করিতেন।

কুদূরী(রঃআঃ) এর ভাষ্য, ঈদুল ফিতরের দিন ফজর উদয় হওয়ার সাথে ফিতরা ওয়াজিব হওয়া সম্পর্কিত।

আর ইমাম শাফিঈ (রঃআঃ) বলেন, রমযানের শেষ দিন সূর্যাস্তের সংগে সম্পর্কিত। সুতরাং যে ঈদের রাতে ইসলাম গ্রহণ করে কিংবা জন্মগ্রহণ করে, আমাদের মতে তার উপর ফিতরা ওয়াজিব হবে। কিন্তু তার মতে ওয়াজিব হবে না। আর ঈদের রাত্রে তার যে গোলাম কিংবা সন্তান মারা যাবে, তাহাদের ক্ষেত্রে মতামত হল বিপরীত।

তার যুক্তি এই যে, এটার সম্পর্ক হলো ‘ফিতর তথা রোজা ভংগের সংগে। আর এ-ই হলো তার সময়।

আমাদের দলিল এই যে, ফিতরের সাথে সাদাকার সম্পর্ক হল বিশেষত্ব প্রকাশের জন্য আর ফিতর (বা রোজা রাখা না রাখা) এর সম্পর্ক হলো দিনের সাথে, রাত্রের সাথে নয়।

ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগায় রওয়ানা হওয়ার পূর্বে ফিত্‌রা আদায় করা মুসতাহাব। কেননা নাবী করীম (সাঃআঃ) রওয়ানা হওয়ার পূর্বেই তা আদায় করিতেন।

তাছাড়া যুক্তিগত দলিল এই যে, সচ্ছল করে দেয়ার আদেশ প্রদানের উদ্দেশ্য হলো, যেন গরীব লোকটি ব্যস্ততায় লিপ্ত না হয়ে পড়ে।

এটা আগেভাগে আদায় করার মাধ্যমেই সম্ভব। ( যাকাত কাকে দেওয়া যাবে )

যদি ফিতরা ঈদুল ফিতরের আগেই আদায় করে দেয়, তবে জাইয হবে। কেননা সবব (রামাযান) আগমনের পরেই সে তা আদায় করেছে। সুতরাং আগে-ভাগে জাকাত আদায় করার অনুরূপ হবে।

আর সময়ের পরিমাণে কোন তারতম্য নেই। এ-ই বিশুদ্ধ মত।

যদি ঈদুল ফিতরের দিন আদায় না করে বিলম্বিত করে, তবে ওয়াজিব রহিত হবে না। বরং তা আদায় করিতেই হবে।

এটা ইবাদত হওয়ার কারণ যুক্তিসংগত। সুতরাং এ সাদাকার ক্ষেত্রে আদায় করার সময় সীমাবদ্ধ হবে না। কুরবানীর বিষয়টি এর বিপরীত।

আল্লাহ্‌ই অধিক জানেন।

Leave a Reply