মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা আছার – Mussanaf Ibne Abi Saiba

মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা আছার – Mussanaf Ibne Abi Saiba

মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা আছার হাদীস (১৫৯ হিজরি – ২৩৫ হিজরি). মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা হাদীস ও আছারের সুবৃহৎ সংকলন, যা সংকলিত হইয়াছে হিজরী তৃতীয় শতাব্দীর প্রথম দিকে। সংকলক ঈমাম আবু বকর ইবনে আবী শাইবা আলকূফী (১৫৯ হিজরি-২৩৫ হিজরি) ইলমে হাদীসের অনেক বড় ঈমাম ছিলেন। ঈমাম বুখারী, ঈমাম মুসলিম ও তাদের সমসাময়িক হাদীসের ঈমামগণ তাঁর শীষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন।

মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা আছার ডাউনলোড

ইলমে হাদীসে অনেক কিতাব তিনি রেখে গেছেন। সেগুলোর মধ্যে মুসান্নাফ গ্রন্থটিই সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ও সহজলভ্য।

এই কিতাব প্রথমে হিন্দুস্তানে এরপর পাকিস্তান ও বৈরুতে কয়েকবার মুদ্রিত হলেও আজ পর্যন্ত পূর্ণ গ্রন্থের যথাযথ তাহকীককৃত কোনো সংস্করণ প্রকাশিত হয়নি। আল্লাহ তাআলার শোকর, বর্তমান যুগের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ও ফকীহ, উলূমুল হাদীস ও উলূমুল ফিকহ বিষয়ে গভীর পারদর্শিতাহাঁর অধিকারী শায়খ মুহাম্মদ আওয়ামা হালাবী (৭১), মুকীম মদীনা মুনাওয়ারা, তাঁর তিন পুত্রের সহযোগিতায়, যারা প্রত্যেকে যোগ্যতা সম্পন্ন আলিম, দীর্ঘ ষোল বছরে পূর্ণ গ্রন্থের তাহকীক, তাখরীজ ও তালীক সম্পন্ন করিয়াছেন এবং আধুনিক মুদ্রনের মাধ্যমে বৈরুত থেকে প্রকাশ করিয়াছেন।

মোট ২৬ জিলদে এই এডিশন প্রকাশিত হইয়াছে। পাঁচ জিলদে বিভিন্ন ধরনের সূচি ও নির্ঘন্ট। অবশিষ্ট ২১ জিলদে পূর্ণ কিতাব উন্নত সম্পাদনা ও দৃষ্টিনন্দন সজ্জায়নের সঙ্গে পেশ করা হইয়াছে। টীকায় প্রায় সকল রেওয়ায়াতের তাখরীজ অর্থাৎ এ রেওয়ায়েত অন্যান্য হাদীসগ্রন্থে কোথায় কোথায় রয়েছে তাহাঁর স্থান-নির্দেশ, রেওয়ায়াতের সনদগত মান, তুলনামূলক কম প্রচলিত শব্দের সংক্ষিপ্ত ও প্রয়োজনীয় বিশ্লেষণ ইত্যাদি এসেছে। এছাড়া অন্যান্য প্রাসঙ্গিক কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা তো রয়েছেই।

পাঠক-গবেষকদের অধিকতর সুবিধার জন্য মুহাক্কিক (পান্ডুলিপি-সম্পাদক) গ্রন্থটির সিডিও প্রস্ত্তত করিয়েছেন, যা প্রত্যেক নুসখার সঙ্গে পাওয়া যাবে।

এই এডিশনে সর্বমোট রেওয়ায়েত-সংখ্যা উনচল্লিশ হাজার আটানববই (৩৯০৯৮)। মারফু হাদীসের পাশাপাশি আছারে সাহাবা, তাবেয়ী ঈমামগণের বাণী ও ফতোয়া এবং কিছু সংখ্যক তাবে তাবেয়ী ঈমামদেরও বাণী সংকলিত হইয়াছে। এছাড়া অনেক ইতিহাসের বর্ণনাও স্থান পেয়েছে। প্রত্যেক বর্ণনা সনদসহ উল্লেখিত হইয়াছে আর টীকায় সনদগুলোর শাস্ত্রীয় মান চিহ্নিত করা হইয়াছে।

রেওয়ায়েতের উপরোক্ত সংখ্যা থেকেই এ গ্রন্থের কলেবর ও গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা করা সম্ভব। কিতাবের শুরুতে শায়খ মুহাম্মদ আওয়ামা লিখিত ১৯৮ পৃষ্ঠার একটি দীর্ঘ ভূমিকা রয়েছে, যা উলূমুল হাদীসের মূল্যবান তথ্য ও আলোচনায় সুসমৃদ্ধ। এ ভূমিকায় তিনি ওই পান্ডুলিপিগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন যেগুলোর সাহায্যে এই এডিশন প্রস্ত্তত হইয়াছে। পান্ডুলিপিগুলোর কিছু নমুনার হুবহু ফটোও সংযুক্ত হইয়াছে। তাহকীক, তাখরীজ এবং তালীক (পান্ডুলিপি পাঠ ও সম্পাদনা, বর্ণনাসমূহের সূত্র-নির্দেশ ও টীকা-সংযুক্তি)-এই সকল বিষয়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য, নিখুঁত ও বিশুদ্ধ পদ্ধতি অনুসরণ করা হইয়াছে। এ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা ভূমিকা থেকেই হয়ে যায়। এরপর কিতাবের অধ্যয়নের সঙ্গে সঙ্গে তা আরো পরিষ্কার হতে থাকবে।

আলোচিত এডিশন বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের কারণে আলেমদের মাঝে অত্যন্ত সমাদৃত হইয়াছে এবং প্রায় সকল ঘরানার আলেম-ওলামা শায়খের এই অবদানকে অত্যন্ত মূল্যায়ন করিয়াছেন।

কৃতজ্ঞতাহাঁর সঙ্গে স্মরণ করার বিষয় এই যে, আরবের কিছু বিত্তশালী ব্যক্তি কিতাবটির এই পূর্ণাঙ্গ এডিশন ব্যাপক আকারে প্রচার করার জন্য বাংলা-পাক-ভারত অঞ্চলের মাদরাসা ও প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিতরণ করার নিয়্যত করেন। সে হিসেবে ১৪২৭ হিজরী মোতাবেক ২০০৬ ঈসাব্দে বিতরণের উদ্দেশ্যেই উপরোক্ত তাহকীককৃত এডিশনের একটি ফটো এডিশন শায়খের অনুমতিক্রমে পাকিস্তান থেকে ছাপানো হয়, যা মূল এডিশনের কয়েক মাস পরই মুদ্রিত হয়। এই এডিশনের শুরুতে শায়খের আরেকটি ভূমিকা সংযুক্ত হইয়াছে, যা চার পৃষ্ঠার ক্ষুদ্র কলেবরে হলেও জরুরি কিছু আলোচনা তাতে স্থান পেয়েছে। এ ক্ষুদ্র ভূমিকাও উলামা-তলাবার অধ্যয়নে আসা অত্যন্ত প্রয়োজন।

বাংলাদেশের দাওরায়ে হাদীস মাদরাসায় বিতরণ করার জন্য তিনশ নুসখা পাঠানো হয়েছিল। বিতরণের যিম্মাদারী শায়খের পক্ষ থেকে মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা- এর উপর অর্পিত হয়। মাশাআল্লাহ, তাখাসসুস- এর প্রতিষ্ঠান এবং মিশকাত-জালালাইন মাদরাসাগুলো ছাড়াই আমাদের দেশে শুধু দাওরায়ে হাদীস মাদরাসাই তিন শতাধিক। যেহেতু মাত্র তিনশ নুসখা, এজন্য আবার শায়খকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হইয়াছে। তিনি বন্টনের জন্য একটি নীতি নির্ধারণ করে দেন। সেই নীতি অনুযায়ী মারকাযুদ দাওয়ার দায়িত্বশীলরা কিতাব বিতরণের দায়িত্ব পালন করেন। আল্লাহ তাআলা এই সামান্য খিদমত কবুল করুন এবং মুহাক্কিক, প্রকাশক ও এ কিতাব বিতরণে যে বিত্তশালী ব্যক্তিবর্গ অংশ নিয়েছেন তাদের সবাইকে এই বিশাল খিদমতের যথাযোগ্য প্রতিদান দান করুন। আমীন।

হাদীস ও সুন্নাহর এই সুবিশাল সংকলনের এতগুলো নুসখা সারা দেশে বিতরণ করা হইয়াছে এবং দেশের প্রায় সকল বড় মাদরাসায় এ কিতাবের এক নুসখা পৌছে গিয়েছে-এরই পরিপ্রেক্ষিতে কীভাবে এ কিতাব থেকে সর্বোচ্চ ফায়দা অর্জন করা যায় এ বিষয়ে লেখার জন্য বন্ধুরা আদেশ করিয়াছেন। বর্তমান নিবন্ধটি তাঁদের আদেশ পালন ছাড়া আর কিছু নয়। আল্লাহ তাআলা প্রয়োজনীয় ও উপকারী কিছু কথা পেশ করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

মুসান্নাফ থেকে আমরা কী কী ফায়েদা গ্রহণ করতে পারি

এ গ্রন্থের সংকলক হলেন ঈমাম আবু বকর ইবনে আবী শাইবা। মূল নাম আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ। ১৫৯ হিজরীতে জন্ম এবং ২৩৫ হিজরীতে মৃত্যু। ঈমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, ঈমাম আলী ইবনুল মাদীনী এবং ঈমাম ইয়াহইয়া ইবনে মায়ীন-এর মতো ইলমে হাদীসের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব ও জরহ-তাদীলের ঈমামগণের তিনি সমসাময়িক এবং তাঁদের সমপর্যায়ের ঈমাম।

আর উপরোক্ত মনীষীগণ ছিলেন কুতুবে সিত্তা (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ, সুনানে নাসায়ী, সুনানে তিরমিযী ও সুনানে ইবনে মাজাহ)এর সংকলকদের উস্তাদ কিংবা দাদা উস্তাদ ।

ওই সময়ের ঈমামগণের এবং তাঁদেরও পূর্বসূরী ঈমামগণের সংকলিত অনেক হাদীসগ্রন্থ আমাদের সামনে বিদ্যমান রয়েছে। ঈমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রাহ., যিনি বুখারী ও আবু দাউদের উস্তাদ ছিলেন, তাঁর সংকলিত সুবৃহৎ হাদীসগ্রন্থ আলমুসনাদ-এর ১৩১৩ হিজরি থেকে এ পর্যন্ত অনেকগুলো এডিশন প্রকাশিত হইয়াছে। অল্প কিছুদিন আগে প্রকাশিত হইয়াছে এ গ্রন্থের সবচেয়ে নিখুঁত ও সুসম্পাদিত এডিশন। বৈরুতের মুআসসাতুর রিসালা থেকে ৫২ খন্ডে তা প্রকাশিত হইয়াছে। শায়খ শোয়াইব আরনাউত্ব-এর তত্ত্বাবধানে আলেমদের একটি জামাত এর তাহকীক ও তাখরীজ করিয়াছেন।

ঈমাম আবদুর রাযযাক ইবনে হাম্মাম আসসানআনী ঈমাম ইবনে আবী শাইবা (২৩৫ হিজরি) এরও আগের মনীষী। ১২৬ হিজরীতে জন্ম ও ২১১ হিজরীতে মৃত্যু। তিনিও হাদীস ও আছারের অনেক বড় সংকলনআলমুসান্নাফ নামে তৈরি করেন। তিনি ঈমাম আবু হানীফা (৮০-১৫০ হিজরি) ঈমাম ইবনে জুরাইজ (৮০-১৫০ হিজরি) ঈমাম সুফিয়ান ছাওরী (৯৭-১৬১ হিজরি), ঈমাম মামার ইবনে রাশিদ (৯৫-১৫৪ হিজরি) , ঈমাম মালিক (৯৩-১৭৯ হিজরি) এবং এঁদের সমসাময়িক তাবেয়ীন ও তাবে তাবেয়ীনের শাগরিদ ছিলেন। আর ঈমাম আহমদ, ইবনুল মাদীনী ও ইবনে মায়ীন ছিলেন তাহাঁর শাগরিদ।

ঈমাম আবদুর রাযযাক ছানআনী সংকলিত হাদীসগ্রন্থটি ১৩৯০ হিজরি মোতাবেক ১৯৭০ ঈসাব্দে সর্বপ্রথম বৈরুত থেকে এগারো খন্ডে প্রকাশিত হয়। এর তাহকীক ও তাসহীহ, পান্ডুলিপি পাঠ ও সম্পাদনার কাজ সম্পন্ন করেছিলেন এ উপমহাদেশেরই বিখ্যাত মুহাদ্দিস হাবীবুর রহমান আজমী রাহ. যিনি দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে শিক্ষা সমাপন করেছিলেন এবং হযরত মাওলানা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী রাহ. এর বিশিষ্ট শাগরিদ ছিলেন। ১৪১২ হিজরীতে তাঁর ইন্তেকাল হয়।

মুসান্নাফে আবদুর রাযযাকে সর্বমোট রেওয়ায়েত সংখ্যা একুশ হাজার তেত্রিশ।

ঈমাম আবদুর রাযযাক (২১১ হিজরি) ও তাঁর পূর্বসূরী ঈমামদের সংকলিত বহু হাদীস-গ্রন্থও আলহামদুলিল্লাহ বহু পূর্বেই মুদ্রিত হইয়াছে এবং দীর্ঘদিন যাবৎ পাঠক-গবেষকদের মাঝে সমাদৃত। ঈমাম আবু ইউসুফ রাহ. (১১৩-১৮২ হিজরি) যিনি ঈমাম আবু হানীফার বিশিষ্ট শাগরিদ এবং দ্বিতীয় হিজরী শতকে গোটা ইসলামী বিশ্বেরকাযিউল কুযাত ছিলেন, ফিকহ ও হাদীস বিষয়ে তাঁর অন্যতম রচনা কিতাবুল খারাজ বহুদিন যাবৎ মুদ্রিত। ঈমাম মালেক রাহ. (৯৩-১৭৯ হিজরি)-এর মুয়াত্তা এরও আগে সংকলিত ও মুদ্রিত।

ঈমাম মালেক রাহ. প্রথম শতাব্দীর শেষ দিকে জন্মগ্রহণ করলেও তাবেয়ী ছিলেন না। ঈমাম আবু হানীফা রাহ. তাঁর আগে ৮০ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং একাধিক সাহাবীর সাক্ষাত-সৌভাগ্য লাভ করেন। এজন্য তিনি তাবেয়ী ছিলেন। তাঁর সংকলিত হাদীস-গ্রন্থ কিতাবুল আছারও আজ থেকে প্রায় আড়াই শত বছর আগে মুদ্রিত হইয়াছে। মুদ্রিত নুসখাটি ঈমাম মুহাম্মাদ রাহ.-এর বিন্যাসকৃত ও রেওয়ায়েতকৃত।

বিশিষ্ট সাহাবী সাইয়্যেদুনা আবু হুরায়রা রা.-এর শাগরিদ হাম্মাম ইবনে মুনাবিবহ, যিনি ৪০ হিজরী সনের কাছাকাছি কোনো এক সময়ে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৩১ হিজরীতে মৃত্যু বরণ করেন, তাঁর হাদীস-সংকলন সহীফা হাম্মাম ইবনে মুনাবিবহ নামে প্রসিদ্ধ। ১৩৭৫ হিজরি মোতাবেক ১৯৫৬ ঈসাব্দে ড. হামীদুল্লাহর তাহকীক ও মুকাদ্দিমাসহ প্রকাশিত হয়।

এ নিবন্ধে আমার আলোচ্য গ্রন্থ মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা থেকে সহীফা হাম্মাম ইবনে মুনাবিবহ পর্যন্ত এই হাদীস-সংকলনগুলো এবং এ ধরনের আরো বহু হাদীস-গ্রন্থ, যা এ নিবন্ধে উল্লেখিত হয়নি, সবগুলোই হাদীসের প্রসিদ্ধ ছয় কিতাবের পূর্বের সংকলন। হাদীস ও সুন্নাহ এবং আছারে ছাহাবা ও তাবেয়ীদের এই প্রাচীন গ্রন্থগুলো । আফসোসের বিষয় এই যে, আমাদের দেশেও এদের অবাধ বিচরণ রয়েছে।

বইটির PDF/ মুল কপি পেতে হলে নিচে Comment/ কমেন্ট এর মাধ্যমে আমাদেরকে জানান, তাহলে আমরা আপনাদেরকে পাঠিয়ে দিতে পারব। ইনশাল্লাহ।

By মুসলিম শরীফ

এখানে কুরআন শরীফ, তাফসীর, প্রায় ৫০,০০০ হাদীস, প্রাচীন ফিকাহ কিতাব ও এর সুচিপত্র প্রচার করা হয়েছে। প্রশ্ন/পরামর্শ/ ভুল সংশোধন/বই ক্রয় করতে চাইলে আপনার পছন্দের লেখার নিচে মন্তব্য (Comments) করুন। “আমার কথা পৌঁছিয়ে দাও, তা যদি এক আয়াতও হয়” -বুখারি ৩৪৬১। তাই এই পোস্ট টি উপরের Facebook বাটনে এ ক্লিক করে শেয়ার করুন অশেষ সাওয়াব হাসিল করুন

Leave a Reply