নফল নামাজ ও অন্য যে কোন নফল ইবাদতের উপর মাতা-পিতার খিদমাত

নফল নামাজ ও অন্য যে কোন নফল ইবাদতের উপর মাতা-পিতার খিদমাত

নফল নামাজ ও অন্য যে কোন নফল ইবাদতের উপর মাতা-পিতার খিদমাত >> সহীহ মুসলিম শরীফ এর মুল সুচিপত্র দেখুন >> নিম্নে মুসলিম শরীফ এর একটি অধ্যায়ের হাদিস পড়ুন

২. অধ্যায়ঃ নফল নামাজ ও অন্য যে কোন নফল ইবাদতের উপর মাতা-পিতার খিদমাত অগ্রাধিকার প্রাপ্ত

৬৪০২. আবু হুরাইরাহ [রাদি.] হইতে বর্ণীতঃ

তিনি বলেন, জুরায়জ [বানী ইসরাঈলের একজন আবিদ ব্যক্তি] তাহাঁর ইবাদাতখানায় ইবাদাতে নিমগ্ন থাকতেন। [একবার] তাহাঁর মাতা তাহাঁর কাছে আসলেন।

হুমায়দ [রহমাতুল্লাহি আলাইহি] বলেন, আমাদের কাছে আবু রাফি এমন ভঙ্গিতে ব্যক্ত করেন, যেমনভাবে রসূলুল্লাহ [সাঃআঃ] তাহাঁর মায়ের ডাকের ভঙ্গিতে আবু হুরায়রা্ [রাদি.]-এর কাছে ব্যক্ত করিয়াছেন। কিভাবে তাহাঁর হাত তাহাঁর ভ্রুর উপর রাখছিলেন। এরপর তাহাঁর দিকে মাথা উঁচু করে তাকে ডাকছিলেন। বলিলেন, হে জুরায়জ! আমি তোমার মা, আমার সাথে কথা বলো। এ কথা এমন অবস্থায় বলছিলেন, যখন জুরায়জ সলাতে নিমগ্ন ছিলেন। তখন তিনি মনে মনে বলিতে লাগলেন, “হে আল্লাহ! [একদিকে] আমার মা আর [অপরদিকে] আমার নামাজ [আমি কী করি?]”। রাবী বলেন, অবশেষে তিনি তাহাঁর নামাজকে অগ্রাধিকার দিলেন এবং তাহাঁর মা ফিরে গেলেন। পরে তিনি দ্বিতীয়বার আসলেন এবং বলিলেন, হে জুরায়জ! আমি তোমার মা, তুমি আমার সঙ্গে কথা বলো। তিনি বলিলেন, ইয়া আল্লাহ! আমার মা, আমার নামাজ। তখন তিনি তাহাঁর সলাতে ব্যস্ত রইলেন। তখন তাহাঁর মা বলিলেন, “হে আল্লাহ! এ জুরায়জ আমারই ছেলে। আমি তার সঙ্গে কথা বলিতে চাচ্ছিলাম। সে আমার সাথে কথা বলিতে অস্বীকার করিল। হে আল্লাহ! তার মৃত্যু দিয়ো না, যে পর্যন্ত তাকে ব্যভিচারিণীর মুখ না দেখাও।”

তিনি [সাঃআঃ] বলেন, যদি তাহাঁর মাতা তাহাঁর বিরুদ্ধে অন্য কোন বিপদের জন্য বদদুআ করিতেন তাহলে অবশ্যই সে বিপদে পতিত হত।

তিনি [সাঃআঃ] বলেন, এক মেষ রাখাল জুরায়জ-এর ইবাদাতখানার নিকটেই [মাঝে মাঝে] আশ্রয় নিত। তিনি বলেন, এরপর গ্রাম থেকে এক মহিলা বের হয়ে এলে। উক্ত রাখাল তার সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়। এতে মহিলাটি গর্ভবতী হয়ে পড়ে এবং একটি পুত্র সন্তান জন্ম দেয়। তখন লোকেরা তাকে জিজ্ঞেস করলো, এ [সন্তান] কোথা থেকে? সে উত্তর দিল, এ ইবাদাতখানায় যে বাস করে, তার থেকে। তিনি বলেন, এরপর তারা শাবল-কোদাল ইত্যাদি নিয়ে এলো এবং চিৎকার করে ডাক দিল। তখন জুরায়জ সলাতে মশগুল ছিলেন। কাজেই তিনি তাদের সাথে কথা বলিলেন না। তিনি বলেন, এরপর তারা তাহাঁর ইবাদাতখানা ধ্বংস করিতে লাগল। তিনি এ অবস্থা দেখে নীচে নেমে এলেন। এরপর তারা বলিল, এ মহিলাকে জিজ্ঞেস করো [সে কী বলছে]। তিনি বলেন, তখন জুরায়জ মুচকি হেসে শিশুটির মাথায় হাত বুলিয়ে বলিলেন, তোমার পিতা কে? তখন শিশুটি বলিল, আমার পিতা সে মেষ রাখাল। যখন তারা সে শিশুটির মুখে এ কথা শুনতে পেল তখন তারা বলিল, [হে দরবেশ] আমরা তোমার ইবাদাতখানার [গীর্জার] যতটুকু ভেঙ্গে ফেলেছি তা সোনা-রূপা দিয়ে পুনঃনির্মাণ করে দেব। তিনি বলিলেন, না; বরং তোমরা মাটি দ্বারাই পূর্বের ন্যায় তা নির্মাণ করে দাও। এরপর তিনি তাহাঁর ইবাদাতগাহে উঠে বসলেন।

[ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬২৭৭; ইসলামিক সেন্টার- ৬৩২৬]

৬৪০৩. আবু হুরাইরাহ [রাদি.] হইতে বর্ণীতঃ

নবী [সাঃআঃ] বলেনঃ তিনজন ব্যতীত কেউ দোলনায় কথা বলেনি। তাঁদের মধ্যে একজন ঈসা ইবনি মারইয়াম [আঃ]। আরেকজন জুরায়জ সম্পর্কিত শিশুটি। জুরায়জ ছিলেন একজন ইবাদাতগুজার ব্যক্তি। তিনি একটি ইবাদাতখানা তৈরি করে সেখানে অবস্থান করিতেন। এক সময় তাহাঁর কাছে তাহাঁর মা আসলেন। তিনি সে সময় সলাতে নিমগ্ন ছিলেন। মা ডাকলেন, হে জুরায়জ! তখন তিনি [মনে মনে] বলিতে লাগলেন, হে আমার প্রতিপালক! [একদিকে] আমার মা আর [অন্যদিকে] আমার নামাজ। এরপর তিনি সলাতে মগ্ন থাকলেন। মা ফিরে গেলেন। পরের দিন তিনি আবার তার কাছে এলেন। তখনও তিনি নামাজ আদায় করছিলেন। তিনি বলিলেন, হে জুরায়জ! তখন তিনি [মনে মনে] বলিলেন, হে আমার প্রতিপালক! একদিকে আমার মা [আমাকে ডাকছেন] আর [অন্য দিকে] আমার নামাজ। এরপর তিনি সলাতে মশগুল রইলেন। মা ফিরে গেলেন। এরপরের দিন আবার এলেন। তখনও তিনি সলাতেই রত ছিলেন। এবারও [মা] বলিলেন, হে জুরায়জ! তখন তিনি [মনে মনে] বলিলেন, হে আমার প্রতিপালক! [একদিকে] আমার মা [আমাকে ডাকছেন]। [অন্যদিকে] আমার সালাত। এরপর তিনি সলাতেই লিপ্ত রইলেন। এবার তার মা বলিলেন, হে আল্লাহ! বদ্‌কার স্ত্রীলোকের সম্মুখীন করার আগ পর্যন্ত তুমি তার মৃত্যু দিয়ো না। এরপর বানু ইসরাঈলদের মধ্যে জুরায়জ ও তার ইবাদাত সম্পর্কে আলোচনা হইতে লাগল। [বানী ইসরাঈলের মধ্যে] সৌন্দর্য্য উপমেয় এক দুশ্চরিত্রা স্ত্রীলোক ছিল। সে বলিল, যদি তোমরা চাও তাহলে আমি তোমাদের সামনে তাকে [জুরায়জকে] ফিতনায় ফেলতে পারি। তিনি বলেন, এরপর সে জুরায়জের সামনে নিজেকে পেশ করে। কিন্তু জুরায়জ তার প্রতি ভ্রুক্ষেপও করেননি। অবশেষে সে এক মেষ রাখালের নিকট আসে। সে জুরায়েজের ইবাদাতখানায় মাঝে মধ্যে যাওয়া-আশা করত। সে তাকে নিজের দিকে প্রলুদ্ধ করিল। সে [রাখাল] তার উপর অনুরক্ত হলো। এতে সে গর্ভবতী হয়ে গেল। যখন সে সন্তান প্রসব করিল তখন বলে দিল যে, এ সন্তান জুরায়জের। লোকেরা [এ কথা শুনে] তাহাঁর কাছে এসে জড়ো হলো এবং তাঁকে নীচে নামতে বাধ্য করিল এবং তারা তার ইবাদাতখানা ভেঙ্গে ফেলল আর তাঁকে প্রহার করিতে লাগল। তখন তিনি [জুরায়জ] জিজ্ঞেস করিলেন, তোমাদের ব্যাপার কী? তারা বলিল, তুমি তো এ দুশ্চরিত্রা স্ত্রীলোকের সাথে ব্যভিচার করেছো এবং তোমার পক্ষ থেকে সে সন্তান প্রসব করেছে। তখন তিনি বলিলেন, শিশুটি কোথায়? তারা শিশুটি নিয়ে এলো। এরপর তিনি বলিলেন, আমাকে একটু অবকাশ দাও, আমি নামাজ আদায় করে নেই। তারপর তিনি নামাজ আদায় করিলেন এবং নামাজ শেষে শিশুটির কাছে এলেন। এরপর তিনি শিশুটির পেটে টোকা দিয়ে বলিলেন, হে বৎস! তোমার পিতা কে? সে উত্তর করিল। অমুক রাখাল। বর্ণনাকারী বলেন, তখন লোকেরা জুরায়জের দিকে এগিয়ে আসলো এবং তাঁকে চুম্বন করিতে এবং তাহাঁর গায়ে হাত বুলাতে লাগল। এরপর বলিল, আমরা আপনার ইবাদাতখানা স্বর্ণ দ্বারা নির্মাণ করে দিব। তিনি বলিলেন, না বরং পুনরায় মাটি দিয়ে তৈরি করে দাও, যেমন ছিল। লোকেরা তাই করিল। [তৃতীয় জন] একদা এক শিশু তার মায়ের দুধ পান করছিল। তখন উত্তম পোষাকে সজ্জিত এক লোক একটি হৃষ্টপুষ্ট সওয়ারীর উপর আরোহণ করে সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। তখন তার মা বলিল, “হে আল্লাহ! তুমি আমার ছেলেকে এর মত বানিয়ে দাও। তখন শিশুটি মাতৃস্তন ছেড়ে তার প্রতি লক্ষ করে বলিল, “হে আল্লাহ! তুমি আমাকে এর মত বানিও না।” এরপর সে আবার স্তনের দিকে ফিরে দুধ পান করিতে লাগল। রাবী বলেন, মনে হয় যেন আমি রসূলুল্লাহ [সাঃআঃ] কে এখনো দেখছি যে, তিনি তাহাঁর শাহাদাত আঙ্গুলি নিজ মুখে দিয়ে তা চুষে সে শিশুটির দুধ পানের দৃশ্য দেখাচ্ছেন। এরপর তিনি বর্ণনা করিলেন যে, কিছু লোক একজন যুবতীকে নিয়ে যাচ্ছিল এবং তাকে তারা প্রহার করছিল এবং বলাবলি করছিল যে, তুই ব্যভিচার করেছিস, তুই চুরি করেছিস। আর সে বলছিল, আল্লাহর উপরই আমার ভরসা; আর তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক। তখন তার মা বলিল, হে আল্লাহ! তুমি আমার পুত্রকে এর [দাসীর] মত বানিও না। তখন শিশুটি দুধপান ছেড়ে তার [দাসীর] প্রতি লক্ষ্য করে বলিল, “হে আল্লাহ! তুমি আমাকে এর [দাসীর] মত বানিয়ে দাও।” সে সময় মা ও পুত্রের মধ্যে কথোপকথন হলো। তখন মা বলিল, ঠাটা পড়ুক [এ কেমন কথা]। সুদর্শন এক ব্যক্তি যাচ্ছিল। তখন আমি বললাম, “হে আল্লাহ! তুমি আমার ছেলেকে এর মত বানিও”। আর তুমি বললে, “হে আল্লাহ! তুমি আমাকে এর মত বানিও না” এরপর লোকেরা এ দাসীকে নিয়ে যাচ্ছিল। তখন তারা তাঁকে প্রহার করছিল এবং বলছিল, তুই ব্যভিচার করেছিস এবং তুই চুরি করেছিস। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহ! তুমি আমার পুত্রকে তার মত বানিও না। আর তুমি বললে, হে আল্লাহ! তুমি আমাকে তার মতো বানাও। সে বলিল, সে আরোহী ব্যক্তি ছিল অত্যাচারী। তাই আমি বলেছি, হে আল্লাহ! তুমি আমাকে তার মত বানিও না। আর যে দাসীকে ওরা বলছিল, তুই যিনা করেছিস। আসলে সে ব্যভিচারে লিপ্ত হয় নি এবং বলছিল, চুরি করেছিস, অথচ সে চুরি করেনি। তাই আমি বললাম, “হে আল্লাহ! তুমি আমাকে তার মত বানিয়ে দাও”।

[ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬২৭৮; ইসলামিক সেন্টার- ৬৩২৭]

By মুসলিম শরীফ

এখানে কুরআন শরীফ, তাফসীর, প্রায় ৫০,০০০ হাদীস, প্রাচীন ফিকাহ কিতাব ও এর সুচিপত্র প্রচার করা হয়েছে। প্রশ্ন/পরামর্শ/ ভুল সংশোধন/বই ক্রয় করতে চাইলে আপনার পছন্দের লেখার নিচে মন্তব্য (Comments) করুন। “আমার কথা পৌঁছিয়ে দাও, তা যদি এক আয়াতও হয়” -বুখারি ৩৪৬১। তাই এই পোস্ট টি উপরের Facebook বাটনে এ ক্লিক করে শেয়ার করুন অশেষ সাওয়াব হাসিল করুন

Leave a Reply