শুয়াবুল ইমান- ইমাম বাইহাকী (ঈমানের শাখা সমূহ )

শুয়াবুল ইমান- ইমাম বাইহাকী

Hadith: Suab Ul Iman
Familiar Hadith: Suab Ul Iman
Writer: Imam al Bayhaqi
Full Name: Abu Bakr Aḥmad ibn Ḥusayn Ibn Ali ibn Musa al Khosrojerdi al-Bayhaqi
Born Place: Khorasan Province, Iran
Born: 384 AH
Died: 458 AH
Total Hadith: 11000 (According to Maktaba Shamila)
Hadith Type: Sahih, Daif, Moudu

হাদীস: শুয়াবুল ঈমান
হাদীস পরিচিতিঃ শুয়াবুল ঈমান
লেখকঃ ইমাম আল বায়হাকী
সম্পূর্ণ নামঃ আবু বাকর আহমাদ ইবনে হুসাইন ইবনে আলী ইবনে মুসা আল খোসরোযেরদী আল-বায়হাকী
জন্মস্থানঃ নিশাপুর, বর্তমান খোরাসান, ইরান
জন্মঃ ৩৮৪ হিজরি
মৃত্যুঃ ৪৫৮ হিজরি
মোট হাদীসঃ ১১০০০ (মকতবা শামেলা অনুসারে)
হাদীস প্রকারঃ সহীহ, জয়ীফ, মউদু

সুচিপত্র

শুয়াবুল ইমান – ঈমানের ঈমানের শাখা সমূহ অনুচ্ছেদ ৭৫ টি

শাখাবিষয়
আল্লাহর প্রতি ইমান
২-৪রাসূলগণের প্রতি, ফেরেশতাদের প্রতি ও আল-কুরআনের উপর ইমান
তাকদীরের প্রতি ইমান
আখিরাতের প্রতি ইমান
পুনরুত্থানের প্রতি ইমান
হাশরের ময়দানের প্রতি ইমান
মুমিনের আবাসস্থল জান্নাত আর কাফিরের আবাসস্থল জাহান্নাম
১০আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা
১১মনে সদা আল্লাহর ভয় জাগ্রত থাকা
১২আল্লাহর প্রতি সু-ধারণা রাখা
১৩আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা
১৪রাসূলুল্লাহ (সাঃআঃ)-কে ভালোবাসা
১৫রাসূলুল্লাহ (সাঃআঃ)-কে শ্রদ্ধা ও সহযোগিতা করা
১৬ইসলামের উপর অটল থাকা
১৭জ্ঞান অর্জন করা
১৮শিক্ষার প্রসার
১৯কুরআন মাজীদের সম্মান করা
২০পাক পবিত্রতা
২১সালাত (নামায)
২২যাকাত
২৩সিয়াম (রোযা)
২৪ইতিকাফ
২৫হাজ্জ
২৬জিহাদ (সংগ্রাম)
২৭আল্লাহর পথে পাহারা (মুরাবাতাহ)
২৮শত্রুর মোকাবেলায় দৃঢ় থাকা
২৯গানিমাতের এক পঞ্চমাংশ
৩০দাসত্ব মোচন
৩১কাফফারা (প্রতিকার)
৩২চুক্তি লংঘন না করা
৩৩আল্লাহর নি’আমাতের কৃতজ্ঞতা
৩৪অপ্রয়োজনীয় কথা না বলা
৩৫আমানাত (গচ্ছিত বস্তু)
৩৬মানুষ হত্যা না করা
৩৭লজ্জাস্থানের হিফাযত করা
৩৮অন্যায়ভাবে সম্পদ ভোগ দখল না করা
৩৯হারাম খাদ্য ও পানীয় বর্জন করা
৪০পোশাক ও সাজসজ্জা বিষয়ে সতর্কতা
৪১নিষিদ্ধ খেলাধুলা বর্জন করা
৪২আয় ও ব্যয়ের মধ্যে সমন্বয় করা (বাইহাকী)
৪৩হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার
৪৪কাউকে অপবাদ না দেয়া বা হেয় না করা
৪৫ইখলাস (একনিষ্ঠতা বা আন্তরিকতা)
৪৬সৎ কাজে আনন্দ ও অসৎ কাজে মর্মপীড়া অনুভব করা
৪৭গুনাহ্‌র চিকিৎসা : তাওবা।
৪৮আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য কুরবানী ও আত্মত্যাগ
৪৯নেতার আনুগত্য করা
৫০জামাআতবদ্ধ জীবন যাপন
৫১আদল-ইনসাফের সাথে বিচার-ফায়সালা করা
৫২সৎ কাজের আদেশ এবং অন্যায়ের নিষেধ
৫৩সৎ কাজে পরস্পর সহযোগিতা করা
৫৪লজ্জাশীলতা
৫৫মা-বাপের সাথে সদাচরণ
৫৬আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা
৫৭সচ্চরিত্র
৫৮অধীনস্থদের সাথে সদাচরণ
৫৯ক্রীতদাসের উপর মনিবের অধিকার
৬০সন্তান ও অধীনস্থদের অধিকার
৬১দীনি কারণে পরস্পর সম্পর্ক
৬২সালামের জবাব দেয়া
৬৩অসুস্থ ভাইয়ের খোঁজ খবর নেয়া
৬৪জানাযা ও দাফন কাফনে অংশগ্রহণ করা।
৬৫হাঁচিদাতার হাঁচির জবাব দেয়া
৬৬কাফির মুশরিকদের সাথে বন্ধুত্ব না রাখা
৬৭প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ
৬৮অতিথি আপ্যায়ন/মেহমানদারী
৬৯দোষ গোপন রাখা (বাইহাকী)
৭০বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করা
৭১দুনিয়ার মোহমুক্তি (যুহুদ) ও পরিমিত আশা
৭২আত্মসম্মানবোধ
৭৩অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা পরিহার করা
৭৪বদান্যতা ও দানশীলতা
৭৫ছোটদের স্নেহ ও বড়োদের সম্মান করা
৭৬পরস্পর সংশোধন
৭৭নিজের যা পছন্দ অপরের জন্য তাই পছন্দ করা
৭৭মোট

শাখা-১. আল্লাহর প্রতি ঈমান

আল্লাহর প্রতি ঈমান সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন

وَالْمُؤْمِنُونَ ۚ كُلٌّ آمَنَ بِاللَّهِ

“আর মুমিনরা প্রত্যেকেই আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে।” (সুরা আল-বাকারা : ২৮৫)। আরও বলা হয়েছে

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا آمِنُوا بِاللَّهِ

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রাখো।’ (সুরা আন নিসা : ১৩৬)

সহিহ আল-বুখারী ও সহিহ মুসলিমে{১} আবু হুরাইরা (রাদি.) হতে বর্ণিত। নবী করীম ﷺ বলেছেন

“যতক্ষণ মানুষ এ সাক্ষ্য না দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই’, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করিতে আদিষ্ট হয়েছি। কাজেই যে ব্যক্তি স্বীকার করে নেবে যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই’ সে আমার থেকে তার জীবন ও সম্পদকে নিরাপদ করে নিল। তবে শরীআহসম্মত কোনো কারণ ঘটলে তা ভিন্ন কথা। আর তার (কৃতকর্মের) হিসাব-নিকাশ আল্লাহর কাছে।”

উসমান (রাদি.) হতে বর্ণিত একটি হাদীস মুসলিম শরীফে সংকলন করা হয়েছে। তাতে নবী করীম ﷺ বলেছেন

“যে ব্যক্তি এই বিশ্বাস নিয়ে মারা যাবে- আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ্ নেই, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”{২}

{১}.ইমাম বুখারী যাকাত অধ্যায়ে এবং ইমাম মুসলিম ঈমান অধ্যায়ে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।

{২}. সহীহু মুসলিম, ‘যে ব্যক্তি তাওহীদের উপর ইন্তিকাল করবে সে জান্নাতী অনুচ্ছেদ, ঈমান অধ্যায়।

শাখা-২, ৩, ৪. রাসুলগণের প্রতি, ফেরেশতাদের প্রতি ও আল-কুরআনের উপর ঈমান

ঈমানের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ অংশ বা শাখা হচ্ছে নবী-রাসুল, ফেরেশতা এবং আল্লাহ প্রদত্ত কিতাবসমূহের উপর ঈমান আনা। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা ইরশাদ করেন

وَالْمُؤْمِنُونَ ۚ كُلٌّ آمَنَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ

‘এবং সকল মুমিন— আল্লাহ, ফেরেশতা, কিতাবসমূহ এবং নবীদের উপর ঈমান আনে।{১}

উমার ইবনিল খাত্তাব (রাদি.) কর্তৃক বর্ণিত হাদীস- যা হাদীসে জিবরীল নামে খ্যাত সেখানে জিবরীল (আঃসাঃ)-এর এক প্রশ্নের জবাবে বলা হয়েছে

“ঈমান হচ্ছে- আল্লাহ, ফেরেশতা, কিতাবসমূহ ও রাসুলগণের উপর তোমার ঈমান আনয়ন।{২}

কিতাবসমূহের উপর ঈমান আনার সাথে সাথে আল-কুরআনের উপর ঈমান আনাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছেঃ

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান আনো এবং সেই কিতাবের (কুরআনের) প্রতিও যা তার রাসূলের উপর নাযিল করেছেন, সেই সাথে আগে যেসব কিতাব নাযিল হয়েছিল সেগুলোর প্রতিও।{৩}

{১}. সুরা আল-বাকারা : ২৮৫।

{২}. হাদীসটি সহিহ আল-বুখারীতে আবু হুরাইরা (রাদি.) থেকে এবং সহিহ মুসলিম উমার ইবনিল খাত্তাব (রাদি.) হতে বর্ণিত হয়েছে। পুরো হাদীসটি নিম্নরূপঃ

উমার ইবনিল খাত্তাব (রাদি.) বলেছেন, আমরা একদিন রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর কাছে ছিলাম। একজন লোক এলেন। তার পরনের কাপড় ছিলো সাদা ধবধবে, মাথার চুলগুলো ছিলো কাল কুচকুচে। তিনি অনেক দূর থেকে সফর করে এসেছেন, দেখে এমন মনে হলো না, কিন্তু আমরা কেউ তাকে চিনলাম না। এসে নিজের হাঁটুদ্বয় নবী করীম ﷺ-এর হাঁটুদ্বয়ের সাথে লাগিয়ে বসে পড়লেন। দুহাত নবী করীম ﷺ-এর উরুর উপর রাখলেন। তারপর বললেনঃ হে মুহাম্মদ! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বলুন। রসুলুল্লাহ ﷺ বললেন- ইসলাম হলো তুমি এ কথার সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ্ নেই, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল, সালাত কায়েম করবে, যাকাত প্রদান করবে, রমযানের রোযা রাখবে এবং বাইতুল্লাহ পৌঁছার সামর্থ্য থাকলে হজ্জ করবে। আগন্তুক বললেন, আপনি ঠিক বলেছেন।

তার কথা শুনে আমরা বিস্মিত হলাম, কী আশ্চর্য! প্রশ্নও করছেন আবার সত্যায়িতও করছেন। তারপর বললেনআমাকে ঈমান সম্পর্কে বলুন। রসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, ঈমান হচ্ছে- তুমি আল্লাহ, ফেরেশতা, কিতাবসমূহ, রাসুলগণ, আখিরাত এবং তাকদীরের ভালোমন্দের ব্যাপারে ঈমান রাখবে। আগন্তুক বললেন- আপনি ঠিকই বলেছেন। তারপর বললেন- আমাকে ইহসান সম্পর্কে বলুন। নবী করীম ﷺ বললেন, ইহসান হচ্ছে- তুমি আল্লাহকে দেখছে এই অনুভূতি নিয়ে ইবাদাত-বন্দেগী করবে। যদি তাকে নাও দেখ মনে করবে তিনি তো তোমাকে দেখছেন। এবার আগন্তুক বললেন, কিয়ামত সম্পর্কে কিছু বলুন। রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বললেন, এ বিষয়ে প্রশ্নকারীর চেয়ে যাকে প্রশ্ন করা হয়েছে তিনি (উত্তরদাতা) বেশী কিছু জানেন না।

তিনি বললেন, আমাকে এর কিছু নিদর্শন সম্পর্কে বলুন। রসুলুল্লাহ ﷺ বললেন- দাসী তার মনিবকে প্রসব করবে। খালি পা উদাম গা এরূপ দরিদ্র মেষের রাখালদেরকে অট্টালিকা নির্মাণে পরস্পর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত দেখতে পাবে। আগন্তুক প্রস্থান করলেন। আমিও বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। রসুলুল্লাহ ﷺ বললেন- উমার! তুমি কি জাননা প্রশ্নকারী কে? বললাম- আল্লাহ ও তার রাসুলই এ সম্পর্কে ভালো জানেন। নবী করীম ﷺ বললেন, তিনি জিবরীল, তোমাদেরকে তোমাদের দীন শেখাতে এসেছিলেন। (সহিহ মুসলিম)।

{৩}. সুরা আন-নিসা, আয়াত : ১৩৬।

শাখা-৫. তাকদীরের প্রতি ঈমান

ভালো হোক কিংবা মন্দ, সবকিছুই যে আল্লাহর পক্ষ থেকে পূর্ব নির্ধারিত এ কথার উপর ঈমান রাখা। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা ইরশাদ করেন

قُلْ كُلٌّ مِّنْ عِندِ اللَّهِ

বলুন, সবকিছুই আল্লাহর পক্ষ থেকে।{১}

সহিহ আল-বুখারী ও সহিহ মুসলিমে আবু হুরাইরা (রাদি.) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে- (নবী করীম সা. বলেছেন) একবার আদম (আঃসাঃ) ও মূসা (আঃসাঃ)-এর মধ্যে বিতর্ক হয়েছিলো। মূসা (আঃসাঃ) বললেন- হে আদম! আপনি আমাদের পিতা। আমাদেরকে বঞ্চিত করেছেন এবং জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছেন। আদম (আঃসাঃ) বললেন- আপনি তো মূসা! আল্লাহ তাআলা আপনার সাথে কথা বলে আপনাকে সম্মানিত করেছেন। লিখিত কিতাব (তাওরাত) দিয়েছেন। আপনি কি এমন বিষয়ে আমাকে তিরস্কার করছেন যা আল্লাহ আমাকে সৃষ্টি করার চল্লিশ বছর আগে নির্ধারণ করে রেখেছিলেন? আদম (আঃসাঃ) মূসা (আঃসাঃ)-এর উপর বিতর্কে বিজয়ী হলেন।{২}

জুনাইদ ইবনি আহমদ আতাবারী থেকে বর্ণনা পরম্পরায় আবু বকর আল বাইহাকী নিম্নোক্ত কবিতাটি জানতে পেরেছেন।

নিয়তি নির্ধারিত বলে স্রষ্টার প্রতি

মানুষের কত না অভিযোগ,

সময়ের পরিবর্তনে সবকিছুই যাবে হারিয়ে

রবে না কোনোই সুযোগ।

ভালো মন্দ রিযিক দৌলত সবকিছু সে তো

মহান স্রষ্টারই হাত

তবু নিন্দুকেরা কেবল তারই নিন্দা করে।

চলছে দিন রাত।

{১}. সুরা আন-নিসা, আয়াত : ৭৮।

{২}. হাদীসটি সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে তাকদীর অধ্যায়ে ‘আদম ও মূসা-এর বিতর্ক শিরোনামে উল্লেখ করা হয়েছে।

শাখা-৬. আখিরাতের প্রতি ঈমান

আখিরাত বা পরকালের ব্যাপারে বিশ্বাস রাখাও ঈমানের অংশ। এ সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন,

قَاتِلُوا الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ

‘তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ কর, যারা আল্লাহ ও পরকালকে বিশ্বাস করে না।”{১}

হুলাইমী{২} বলেন, অবশ্যই একদিন এই দুনিয়া শেষ হয়ে যাবে। একদিন একদিন করে মূলত পৃথিবী সেই দিনটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে যা হঠাৎ করে এসে হাজির হবে। সেই দিনটিকে পাশ কাটানোর কোনো উপায়ই নেই। সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে আবু হুরাইরা (রাদি.) হতে বর্ণিত হয়েছে, নবী করীম ﷺ বলেছেন- যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ তার শপথ! কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে। দোকানদার ও খরিদ্দার কাপড় দর দাম করে মূল্য পরিশোধের আগেই তা সংঘটিত হয়ে যাবে।'{৩}

{১}. সুরা আত তাওবা, আয়াত : ২৯।

{২}. পুরো নাম আল হসাইন ইবনি আল হাসান হুলাইমী (হি-৩৩৮-৪০৩)। শাফিঈ মাযহাবের অনুসারী। ইমাম বাইহাকীর শিক্ষক। তার অন্যতম গবেষণা হচ্ছে ‘আল মিনহাজ ফী শুআবুল ঈমান’। ইমাম বাইহাকী এই গ্রন্থটির অনুকরণেই শুআবুল ঈমান’ গ্রন্থটি রচনা করেন। টীকা- ইমাম কাযভিনী।

{৩}. সহিহ আল বুখারী, সহিহ মুসলিম।

শাখা-৭. পুনরুত্থানের প্রতি ঈমান

মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করা হবে এ আস্থা রাখা। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা নিজেই বলেন,

زَعَمَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَن لَّن يُبْعَثُوا ۚ قُلْ بَلَىٰ وَرَبِّي لَتُبْعَثُنَّ

‘অবিশ্বাসীরা ভেবে নিয়েছে তাদেরকে আর কখনও জীবিত করে উঠানো হবে না। বলে দিন, হা, অবশ্যই আমার প্রতিপালক তোমাদেরকে পুনরায় জীবন দান করে উঠাবেন।{১}

অন্যত্র বলা হয়েছে

قُلِ اللَّهُ يُحْيِيكُمْ ثُمَّ يُمِيتُكُمْ ثُمَّ يَجْمَعُكُمْ إِلَىٰ يَوْمِ الْقِيَامَةِ لَا رَيْبَ فِيهِ

বলুন, আল্লাহই তোমাদেরকে জীবন দান করেন এবং মৃত্যু দেন। কিয়ামতের দিন পুনরায় তোমাদেরকে একত্রিত করবেন। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।'{২}

উমার ইবনিল খাত্তাব (রাদি.) হতে বর্ণিত এক সহিহ হাদীসে বলা হয়েছেঃ

‘আল্লাহ, ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ, নবী-রাসুলগণ, মৃত্যুর পর পুনরুত্থান এবং তাকদীরের ভালো মন্দের প্রতি তোমার আস্থার নাম হচ্ছে ঈমান।

{১}. সুরা আত তাগাবুন, আয়াত ৭।

{২}. সুরা আল জাসিয়া, আয়াত : ২৬।

শাখা-৮. হাশরের ময়দানের প্রতি ঈমান

সকল মানুষকে একদিন কবর থেকে জীবিত করে একত্রিত করা হবে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় (যার নাম হাশরের ময়দান), এ কথার উপর বিশ্বাস রাখা হচ্ছে ঈমানের অংশ। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন,

أَلَا يَظُنُّ أُولَٰئِكَ أَنَّهُم مَّبْعُوثُونَ ٭ لِيَوْمٍ عَظِيمٍ ٭ يَوْمَ يَقُومُ النَّاسُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ

তারা কি চিন্তা করে না যে, পুনরুত্থিত হবে। সেই মহাদিবসে। যেদিন মানুষ দাঁড়াবে বিশ্ব প্রতিপালকের সামনে।{১}

আবদুল্লাহ ইবনি উমার (রাদি.) হতে বর্ণিত সহিহ মুসলিমের এক হাদীসে বলা হয়েছে,

মানুষ বিশ্ব প্রতিপালকের সামনে দাঁড়াবে। তখন তারা ঘামে ডুবে থাকবে।

{১}. সুরা আল মুতাফফিফীন, আয়াত : ৪, ৫, ৬।

শাখা-৯. মুমিনের আবাসস্থল জান্নাত আর কাফিরের আবাসস্থল জাহান্নাম

পরকালিন জীবনে মুমিন এবং কাফিরের আবাসস্থল হবে যথাক্রমে জান্নাত ও জাহান্নাম, এ বিষয়ে আস্থা রাখা। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন

بَلَىٰ مَن كَسَبَ سَيِّئَةً وَأَحَاطَتْ بِهِ خَطِيئَتُهُ فَأُولَٰئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ ۖ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ * وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أُولَٰئِكَ أَصْحَابُ الْجَنَّةِ ۖ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ

“হাঁ, যে ব্যক্তি পাপ উপার্জন করেছে এবং পাপ তাকে ঘিরে নিয়েছে, তারা জাহান্নামের অধিবাসী। সেটি তাদের স্থায়ী আবাস। আর যারা ঈমান এনেছে এবং সৎ কাজ করেছে, তারা জান্নাতের অধিবাসী। তারা চিরদিন সেখানেই থাকবে।{১}

আবদুল্লাহ্ ইবনি উমার (রাদি.) থেকে সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে বলা হয়েছে, নবী করীম ﷺ বলেছেন

“তোমাদের কারও মৃত্যু হলে সকাল সন্ধ্যায় তাকে তার আবাসস্থল দেখানো হয়। জান্নাতী হলে জান্নাত আর জাহান্নামী হলে জাহান্নাম। বলা হবে এটিই তোমার আবাসস্থল। এভাবে কিয়ামত পর্যন্ত চলতে থাকবে।{২}

{১}. সুরা আল বাকারা, আয়াত : ৮১।

{২}. সহিহ আল বুখারী, জানাযা অধ্যায়; সহিহ মুসলিম, জান্নাত, জান্নাতের নিয়ামত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ অধ্যায়।

শাখা-১০. আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা

আল্লাহ সুবহানাহু তাআলার প্রতি গভীর ভালোবাসা ঈমানেরই অন্যতম অংশ। কালামে হাকীমে বলা হয়েছে,

وَمِنَ النَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ اللَّهِ أَندَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ ۖ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِّلَّهِ

‘মানুষের মধ্যে এমনও রয়েছে যারা অন্যকে আল্লাহর মত মনে করে এবং তাদেরকে সেই রকম ভালোবাসে যেমন ভালোবাসা হয় আল্লাহকে। অথচ যারা ঈমানদার তারা আল্লাহকেই সবচেয়ে বেশী ভালোবাসে।{১}

আনাস (রাদি.) হতে বর্ণিত সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমের এক হাদীসে বলা হয়েছে, নবী করীম ﷺ বলেছেন,

‘তিনটি জিনিস যার মধ্যে রয়েছে, সে ঈমানের প্রকৃত স্বাদ অনুভব করিতে পেরেছে। ১. যার কাছে আল্লাহ ও তার রাসুল ﷺ সবচেয়ে বেশী প্রিয়। ২. কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই অন্যকে ভালোবাসে। ৩. যাকে আল্লাহ কুফর থেকে মুক্তি দিয়েছেন, সে পুনরায় কুফরের দিকে ফিরে যাওয়াকে এমন অপছন্দ করে যেমন অপছন্দ করে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে।{২}

আল সারী আস সাকাতীকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, আপনি কেমন আছেন? উত্তরে তিনি নিচের চরণটি আবৃত্তি করেছিলেনঃ

যে জন বুঝে না ভালোবাসা কী

সে কি কখনো হয় রে ব্যাকুল,

সে তো জানেনা কী জ্বালা বিরহে

এ যে হৃদয়ে রণাঙ্গন॥

আবু দুজানা বলেছেন, রাবেয়া বসরী যখন আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন হতেন, তখন নিচের কবিতাটি আবৃত্তি করিতেনঃ

তুমি ভান করবে আল্লাহকে ভালোবাসার

আর অমান্য করবে নির্দেশ তার

এ যে ভালোবাসার নামে ভণ্ডামী

দু’জনের মাঝে অথৈ পারাবার

তুমি যদি ভালোই বাসো তাকে, তবে-

হওনা কেন অনুগত তার,

প্রেমিকরা তো চিরকাল অনুরাগের বাঁধনে

বাধা থাকে দুজন দুজনার॥

{১}. সুরা আল বাকারা, আয়াত : ১৬৫।

{২}. সহিহ আল বুখারী, ঈমান অধ্যায়; যে গুণে গুণান্বিত হলে ঈমানের স্বাদ পাওয়া যায় শিরোনামে। সহিহ মুসলিম, ঈমান অধ্যায়; যেসব গুণে গুণান্বিত হলে ঈমানের স্বাদ পাওয়া যায়’ শিরোনাম। অবশ্য সহিহ মুসলিমের হাদীসে দুয়েকটি শব্দের পার্থক্যও রয়েছে।

শাখা-১১. মনে সদা আল্লাহর ভয় জাগ্রত থাকা

মনে সর্বদা আল্লাহর ভয় জাগ্রত থাকাও ঈমানের আরেকটি অংশ। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা ইরশাদ করেন

فَلَا تَخَافُوهُمْ وَخَافُونِ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ

‘তোমরা যদি মুমিন-ই হয়ে থাক, তাহলে তাদেরকে নয় আমাকেই ভয় কর।{১}

فَلَا تَخْشَوُا النَّاسَ وَاخْشَوْنِ

‘তোমরা মানুষকে ভয় করো না, আমাকে ভয় কর।{২}

وَإِيَّايَ فَارْهَبُونِ

‘আর ভয় কেবলমাত্র আমাকেই কর।{৩}

অন্য জায়গায় আল্লাহভীতিকে মুমিনের বৈশিষ্ট্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন,

وَهُم مِّنْ خَشْيَتِهِ مُشْفِقُونَ

‘তারা সর্বদা আল্লাহর ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত।{৪}

وَيَدْعُونَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا ۖ وَكَانُوا لَنَا خَاشِعِينَ

তারা ভয় ও আশা নিয়ে আমাকে ডাকতো এবং তারাই ছিলো আমার কাছে বিনয়ী।{৫}

যারা আক্ষরিক অর্থেই আল্লাহকে ভয় করে, তাদের জন্য রয়েছে পুরস্কার। ইরশাদ হচ্ছে

وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتَانِ

“যে ব্যক্তি আল্লাহর সামনে একদিন দাঁড়াতে হবে, এই ভয় রাখে, তার জন্য রয়েছে (জান্নাতে) দুটো বাগান।{৬}

ذَٰلِكَ لِمَنْ خَافَ مَقَامِي وَخَافَ وَعِيدِ

যারা আমাকে এবং আমার আযাবের ওয়াদাকে ভয় করে, তাদের জন্য রয়েছে এ মর্যাদা।{৭}

সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে আদী ইবনি হাতিম (রাদি.) হতে বর্ণিত হয়েছে, নবী করীম ﷺ বলেছেন,

‘তোমরা এক টুকরা খেজুরের বিনিময়ে হলেও জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচো।”{৮}

আনাস (রাদি.) হতে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন

‘আমি যা জানি তা যদি তোমরা জানতে তাহলে কম হাসতে এবং বেশী কাঁদতে।”{৯}

একবার এক ব্যক্তি তার বন্ধুকে জোরে জোরে কাঁদতে দেখে ভর্ৎসনা করলেন, কিন্তু তিনি বিরত না হয়ে কেঁদেই চললেন। কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেনঃ

‘আমি কাঁদি কারণ, আমার গুনাহ্ অনেক

যারা গুনাহগার তাদের প্রত্যেকেরই কাদা উচিত।

যদি আমি নিশ্চিত হতে পারতাম, দুঃশ্চিন্তা আমার

দূর করে দেবে ক্রন্দন

তাহলে কেঁদে কেঁদে চোখ দিয়ে ঝরাতাম রক্ত।

অন্য এক কবি বলেছেনঃ

কি করে মানুষ ঘুমায় নিশ্চিন্তে সে কি জানে না

ভয়াবহ এক সময় অপেক্ষমান সম্মুখে তার?

যে জানে সে তো অলক্ষে সবার

সিজদায় কাটায় প্রহর, ছেড়ে আরামের বিছানা।’

{১}. সুরা তাওবা, আয়াত : ১৭৫।

{২}. সুরা আল মায়িদা, আয়াত : ৪৪।

{৩}. সুরা আল বাকারা, আয়াত : ৪০।

{৪}. সুরা আল আম্বিয়া, আয়াত : ২৮।

{৫}. সুরা আল আম্বিয়া, আয়াত : ৯০।

{৬}. সুরা আর রাহমান, আয়াত : ৪৬।

{৭}. সুরা ইবরাহীম, আয়াত : ১৪।

{৮}. সহিহ আল বুখারী, যাকাত অধ্যায়; সহিহ মুসলিম, যাকাত অধ্যায়।

{৯}. মুসনাদ আহমদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনি মাজা।

শাখা-১২. আল্লাহর প্রতি সু-ধারণা রাখা

আল্লাহ্‌র প্রতি সু-ধারণা রাখা এবং তার রহমতের প্রত্যাশী হওয়াও ঈমানের অন্যতম অংশ। মহান আল্লাহ বলেন,

يَرْجُونَ رَحْمَتَهُ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ

তারা আল্লাহর করুণা প্রত্যাশী আবার তার শাস্তির ভয়ে ভীত।{১}

আরও বলা হয়েছে,

إِنَّ رَحْمَتَ اللَّهِ قَرِيبٌ مِّنَ الْمُحْسِنِينَ

অবশ্যই আল্লাহর রহমত সচ্চরিত্র লোকদের কাছাকাছি রয়েছে।{২}

সুরা আয-যুমারে বলা হয়েছে

قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ

‘আপনি বলে দিন, (মহান আল্লাহ বলেন) হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের সাথে বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে তারা আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হয়ো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেবেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, দয়াবান।”{৩}

তবে শর্ত হচ্ছে আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলীর মত আর কাউকে যেন অনুরূপ সত্তা ও গুণাবলীর অধিকারী মনে না করা হয়। ইরশাদ হচ্ছে-

إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ

“আল্লাহ কেবল শিরকের গুনাহ মাফ করেন না, তাছাড়া যত গুনাহ্ আছে, চাইলে। তিনি মাফ করে দেবেন।{৪}

সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে আবু হুরাইরা (রাদি.) থেকে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, নবী করীম ﷺ বলেছেনঃ

‘আল্লাহর কাছে কী ভয়াবহ শাস্তি রয়েছে তা যদি ঈমানদারগণ জানতো তাহলে কেউ আল্লাহর কাছে জান্নাতের প্রত্যাশা করিতে সাহস পেতো না। আর আল্লাহ যে কী পরিমাণ দয়ার সাগর তা যদি কাফিররা জানতো, তাহলে কেউ তার জান্নাতের ব্যাপারে নিরাশ হতো না।{৫}

সহিহ মুসলিমে জাবির (রাদি.) হতে বর্ণিত আরেক হাদীসে বলা হয়েছে, নবী করীম ﷺ-এর মৃত্যুর তিন দিন আগে আমি তাকে বলতে শুনেছি,

‘তোমাদের প্রত্যেকেই যেন মৃত্যুর সময় আল্লাহর প্রতি ভালো ধারণা রেখে মৃত্যু বরণ করে।'{৬}

সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত আবু হুরাইরা (রাদি.)-এর আরেক হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

আল্লাহ আয্‌যা ওয়া জাল্লা ইরশাদ করেন, বান্দা আমাকে যে রকম মনে করে, আমাকে সে সেইভাবেই পায়। আর যেখানেই সে আমাকে স্মরণ করে আমি তার সাথেই থাকি।{৭}

{১}. সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৫৭।

{২}. সুরা আল আ’রাফ, আয়াত : ৫৬।

{৩}. সুরা আয যুমার, আয়াত : ৫৩।

{৪}. সুরা আন নিসা, আয়াত : ৪৮।

{৫}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম, তাওবা অধ্যায় (হাদীস-৬৭২৬)।

{৬}. সহিহ মুসলিম, হাদীস-৬৯৬০, অধ্যায় : জান্নাত, জান্নাতের নি’আমত ও অধিবাসীদের বর্ণনা।

{৭}. সহিহ আল বুখারী, তাওহীদ অধ্যায়; সহিহ মুসলিম, তাওবা অধ্যায় (হাদীস-৬৭০০)

শাখা-১৩. আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা

ঈমানের আরেকটি শাখা হচ্ছে, আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা বা তাওয়াক্কুল। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন,

وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ

যারা মুমিন তাদের তো আল্লাহর উপরই ভরসা করা উচিত।”{১}

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে,

وَعَلَى اللَّهِ فَتَوَكَّلُوا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ

‘তোমরা কেবল আল্লাহর উপরই নির্ভরশীল হও, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাক।'{২}

যারা সত্যিই আল্লাহর উপর নির্ভর করিতে পারে, আল্লাহ তাদের জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন,

وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ ۚ إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ

“যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করবে, তার জন্য তো আল্লাহই যথেষ্ট। আল্লাহ তার কাজ সমাপ্ত করবেনই।'{৩}

সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে ইবনে আব্বাস (রাদি.) হতে বর্ণিত হয়েছে,

যে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে তাদের সম্পর্কে রসুলুল্লাহ ﷺ-কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এসব লোক হচ্ছে তারা, যারা লৌহ পুড়িয়ে দাগ দেয় না, যাদুটোনা চর্চা করে না, গণক বা জ্যোতিষীদের কথায় বিশ্বাস করে না, এসবের বিপরীতে কেবলমাত্র তাদের প্রতিপালকের উপরই ভরসা রাখে। ওকাশা ইবনিল মুহাসান আসাদী দাঁড়িয়ে বললেন- ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি যেন তাদের মধ্যে থাকতে পারি। রসুলুল্লাহ ﷺ বললেন- তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত। আরেক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমিও যেন তাদের সাথে থাকতে পারি। তিনি বললেন- এক্ষেত্রে ওকাশা তোমার চেয়ে এগিয়ে।{৪}

আল্লাহর উপর ভরসার সাথে সাথে সাধ্যানুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপও গ্রহণ করিতে হবে। সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে যুবাইর (রাদি.) হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন- মানুষের কাছে চেয়ে বেড়ানোর চেয়ে এক গাছি রশি নিয়ে পাহাড়ে চলে যাওয়া উচিত। তারপর লাকড়ি সংগ্রহ করে বোঝা বয়ে এনে তা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করা ভিক্ষাবৃত্তির চেয়ে অনেক ভালো। মানুষের কাছে চেয়ে বেড়ালে কেউ তাকে দিতেও পারে আবার নাও দিতে পারে।{৫}

সহিহ আল বুখারীতে মিকদাম ইবনি মাদী কার্‌ব (রাদি.) হতে বর্ণিত হয়েছে, নবী করীম ﷺ বলেছেন,

‘নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম কোনো খাদ্য কেউ খেতে পারে না। দাউদ (আঃসাঃ) নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্য খেতেন।’

আবু বকর সিদ্দীক (রাদি.) বলতেন- দীন হচ্ছে তোমার আখিরাতের সম্বল আর সম্পদ হচ্ছে দুনিয়ার সম্বল। আর টাকা পয়সা ছাড়া (পার্থিব জীবনে) কোনো মানুষের মূল্যায়ন হয় না।

{১}. সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১২২, ১৬০; সুরা আল মায়িদা, আয়াত : ১১; সুরা আত তাওবা, আয়াত : ৫১; সুরা ইবরাহীম, আয়াত : ১১; সুরা আল মুজাদালা, আয়াত : ১০; সুরা আত তাগাবুন, আয়াত : ১৩।

{২}. সুরা আল মায়িদা, আয়াত : ২৩।

{৩}. সুরা আত্ তালাক, আয়াত : ৩।

{৪}. সহিহ আল বুখারী, কিতাবুর রিকাক, সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে’ শিরোনাম। সহিহ মুসলিম, ‘একদল মুসলিম বিনা হিসাবে জান্নাতে যাবে ’শিরোনামে।

{৫}. সহিহ আল বুখারী, সহিহ মুসলিম ছাড়াও এ হাদীসটি নাসাঈ শরীফেও বর্ণিত হয়েছে।

শাখা-১৪. রসুলুল্লাহ ﷺ-কে ভালোবাসা

নবী করীম ﷺ-কে ভালোবাসাও ঈমানের একটি অংশ। সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে আনাস (রাদি.) হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

‘তোমাদের কেউই ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ আমি তার কাছে তার সন্তান সন্ততি ও অন্যদের চেয়ে বেশী প্রিয় না হবো।{১}

সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে আনাস (রাদি.) হতে বর্ণিত আরেক হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন- তিনটি জিনিস যার মধ্যে রয়েছে সে ঈমানের প্রকৃত স্বাদ পেয়েছে। (তার একটি হচ্ছে) যার কাছে আল্লাহ ও তার রাসুল ﷺ অন্য সবকিছু থেকে অধিক প্রিয়।

আরেক হাদীসে বলা হয়েছে- ‘এক ব্যক্তি নবী করীম ﷺ-এর কাছে এলেন। বললেন- হে আল্লাহর রাসুল! কিয়ামত কবে হবে? রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বললেন, তুমি সেজন্য কী ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে? লোকটি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! সেজন্য বেশী রো

যা কিংবা দান সাদকা আমার প্রস্তুতির মধ্যে নেই। আমি কেবল আল্লাহ ও তার রাসুলকে ভালোবাসি। তিনি বললেন, তুমি যাকে ভালোবাস তার সাথেই থাকবে।

{১}. সহিহ আল বুখারী, ঈমান অধ্যায়; সহিহ মুসলিম, ঈমান অধ্যায়, (হাদীস-৭৫)।

শাখা-১৫. রসুলুল্লাহ ﷺ-কে শ্রদ্ধা ও সহযোগিতা করা

রসুলুল্লাহ ﷺ-কে সম্মান ও শ্রদ্ধা করা ঈমানেরই অংশ। কেননা আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা নিজেই বলেছেন,

وَتُعَزِّرُوهُ وَتُوَقِّرُوهُ

তাকে (অর্থাৎ রাসুল ﷺ-কে) সম্মান ও মর্যাদা দিন এবং সহযোগিতা করুন।{১}

অন্য জায়গায় বলা হয়েছে,

فَالَّذِينَ آمَنُوا بِهِ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِي أُنزِلَ مَعَهُ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ

যারা ঈমান আনবে, তার (অর্থাৎ রাসূলের) প্রতি শ্রদ্ধা রাখবে এবং তার সাহায্য সহযোগিতা করবে … তারাই কল্যাণ লাভ করবে।'{২}

রাসুল ﷺ-কে সম্মান ও মর্যাদার ব্যাপারে আলাদা মাত্রা রয়েছে যা আর কারও বেলায়ই প্রযোজ্য নয়। ইরশাদ হচ্ছে,

لَّا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءِ بَعْضِكُم بَعْضًا

‘তোমরা রাসুলকে নিজেদের মধ্যে ডেকে আনাকে এরূপ মনে করো না, যেরূপ তোমরা একে অপরকে ডেকে আনো{৩}

অর্থাৎ এভাবে বলো না হে মুহাম্মদ কিংবা হে আবুল কাশেম, বরং ইয়া রাসূলাল্লাহ্ অথবা ইয়া নাবীআল্লাহ বলো। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর সাথে বাড়াবাড়ি, উচ্চস্বরে কথাবার্তা বলাও নিষেধ। সুরা হুজুরাতে বলা হয়েছে-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ * يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَن تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنتُمْ لَا تَشْعُرُونَ

“তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের চেয়ে বেশী অগ্রসর হয়ে যেও না… নিজেদের কণ্ঠস্বর নবীর কণ্ঠস্বরের চেয়ে উঁচু করো না, নবীর সাথে জোরে কথাও বলো না যেমন তোমরা পরস্পরের সাথে করে থাক। এরূপ করলে তোমাদের আমল নষ্ট হয়ে যাবে, তোমরা টেরও পাবে না।{৪}

(ইমাম বাইহাকী বলেন, আমি মনে করি এ স্তরটি ভালোবাসার স্তরের চেয়েও উঁচুতে। এটি হচ্ছে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সম্মিলন। তবে তা পিতা, শিক্ষক ও গুরুজনের ভালোবাসার চেয়েও অনেক গভীর। সন্তান, বন্ধু-বান্ধবসহ অন্যদের ভালোবাসার মত তো নয়ই।

{১}. সুরা আল ফাতহ, আয়াত : ৯।

{২}. সুরা আল আরাফ, আয়াত : ১৫৭।

{৩}. সুরা আন নূর, আয়াত : ৬৩।

{৪}. সুরা আল হুজুরাত, আয়াত : ১, ২।

শাখা-১৬. ইসলামের উপর অটল থাকা

দীন বা ইসলামের উপর অটল থাকা, এটিও ঈমানের অংশ। আক্ষরিক অর্থেই মুমিন, এমন একজন ব্যক্তি আগুনে পুড়ে শাস্তি গ্রহণে রাজি হতে পারে কিন্তু কোনো মূল্যেই ঈমান ত্যাগ করিতে রাজী হতে পারে না।

সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে আনাস (রাদি.) হতে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন‘তিনটি জিনিস যার মধ্যে রয়েছে সে ঈমানের স্বাদ পেয়েছে।

১. যার কাছে আল্লাহ ও তার রাসুল সবচেয়ে বেশী প্রিয়।

২. যে কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই তার বান্দাকে ভালোবাসে ।

৩. যাকে আল্লাহ কুফর থেকে মুক্তি দিয়েছেন, তারপর সে কুফরের দিকে ফিরে যাওয়াকে এমন অপছন্দ করে, যেমন অপছন্দ করে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে।{১}

ইমাম মুসলিম আনাস (রাদি.) থেকে নিম্নোক্ত হাদীসটিও বর্ণনা করেছেন। একবার এক লোক নবী করীম ﷺ-এর কাছে কিছু সাহায্য চাইলেন। রসুলুল্লাহ ﷺ তাকে এক উপত্যকা পরিমাণ ছাগল দিলেন। সে তার গোত্রে গিয়ে বলতে লাগলো- তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর, আল্লাহর শপথ! তিনি এমন পরিমাণে দান করেন, দরিদ্রতার ভয় করেন না।’ একথা শুনে এক ব্যক্তি নবী করীম ﷺ-এর কাছে এলেন, দুনিয়া অর্জন করা ছাড়া তার আর কোনো উদ্দেশ্য ছিলো না। কিন্তু যখন সে ইসলাম গ্রহণ করলো তখন দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে দীনই তার কাছে প্রিয় বলে মনে হল।

{১}. সহিহ আল বুখারী, ঈমান অধ্যায়; সহিহ মুসলিম, ঈমান অধ্যায়, (হাদীস-৭১)।

শাখা-১৭. জ্ঞান অর্জন করা

আল্লাহকে চেনার মাধ্যম হচ্ছে জ্ঞান বা ইলম। আল্লাহর কাছ থেকে যা কিছু এসেছে নবুওয়তের মাধ্যমে, সেসবও ইলম এর অন্তর্ভুক্ত। নবী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্যকারী যেসব বৈশিষ্ট্য রয়েছে সেগুলো জানা এবং বুঝাও ইলম এর অংশ। আল্লাহকে চেনা, জানা এবং তার নির্দেশ ও নিষেধসমূহ ইলম। এই ইলম অর্জনের মাধ্যম হচ্ছে চারটি। ১. আল কিতাব বা আল কুরআন। ২. আস্ সুন্নাহ্। ৩. কিয়াস এবং ৪. শর্ত সাপেক্ষে ইজতিহাদ। আল্লাহর কিতাব বা আল কুরআন এবং রসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাদীসে ইলম (জ্ঞান) ও আলিম (জ্ঞানী) সম্পর্কে অনেক ফযীলতের কথা বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা আলিমদের সম্পর্কে বলেছেন

إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ

আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল আলিমগণই আল্লাহকে ভয় করে।”{১}

অন্যত্র বলা হয়েছে,

شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُولُو الْعِلْمِ قَائِمًا بِالْقِسْطِ

‘আল্লাহ নিজেই সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ্ নেই। ফেরেশতাগণ এবং যারা জ্ঞানী (অর্থাৎ আলিম) তারাও সততা ও ইনসাফের সাথে এই সাক্ষ্য দিচ্ছে।'{২}

আল্লাহর ওহীই যে জ্ঞান সেই সম্পর্কে আল্লাহ নিজেই বলেন,

وَعَلَّمَكَ مَا لَمْ تَكُن تَعْلَمُ ۚ وَكَانَ فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكَ عَظِيمًا

‘তিনি আপনাকে এমন বিষয় জানিয়েছেন যা আপনার জানা ছিলো না। মূলত আপনার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ বিরাট।'{৩}

ইলম বা জ্ঞানের অধিকারীরা যে অত্যন্ত মর্যাদাবান সেই সম্পর্কে বলা হয়েছে,

يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ

‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদেরকে সুউচ্চ মর্যাদা দান করবেন।{৪}

আরেক জায়গায় বলা হয়েছে-

هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ ۗ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ

যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা উভয়ে কি সমান হতে পারে? যাদের জ্ঞান বুদ্ধি আছে নসীহত কেবল তারাই গ্রহণ করে থাকে।{৫}

সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে আবদুল্লাহ ইবনি আমর (রাদি.) হতে বর্ণিত হয়েছে, নবী করীম ﷺ বলেছেন,

আল্লাহ অবশ্য মানুষের অন্তর থেকে ইম কেড়ে নেবেন না কিন্তু তিনি আলিমদেরকে তুলে নেবেন। যখন কোনো আলিম থাকবে না তখন মানুষ মূর্খ জাহিলদের নেতা বানিয়ে নেবে। তাদের কাছে কিছু জিজ্ঞেস করা হলে তারা না জেনেই মতামত দিয়ে দেবে। ফলে তারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে এবং লোকদেরও পথভ্রষ্ট করবে।{৬}

সহিহ মুসলিমের অন্য হাদীসে বলা হয়েছে (বর্ণনাকারী আবু হুরাইরা রাদি.), রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ

যে ব্যক্তি একজন মুমিনের কষ্ট দূর করে দেবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার একটি কষ্ট দূর করে দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো লোকের কষ্ট লাঘব করবে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার কষ্ট লাঘব করে দেবেন। যে ব্যক্তি কারও দোষত্রুটি গোপন রাখবে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষত্রুটি গোপন রাখবেন। বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সাহায্যে নিয়োজিত থাকে ততক্ষণ আল্লাহ তার জন্য তার সাহায্য অব্যাহত রাখেন। যে ব্যক্তি ইলম (জ্ঞান) অর্জনের জন্য বের হয় আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথটি সহজ করে দেন। যখন কিছু লোক আল্লাহর ঘরসমূহের কোনো একটিতে সমবেত হয়ে আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত এবং তার পর্যালোচনায় নিয়োজিত থাকে তখন তাদের উপর প্রশান্তি বর্ষিত হতে থাকে। তাদেরকে রহমতের চাদর দিয়ে ঢেকে দেয়া হয় এবং ফেরেশতারা তাদেরকে ঘিরে রাখেন। আর তখন আল্লাহ তাআলা তার নিকটবর্তী ফেরেশতাদের সাথে তাদের কথা স্মরণ (বলাবলি করিতে থাকেন। যার কার্যকলাপ তাকে পিছিয়ে দেবে, বংশমর্যাদা তাকে এগিয়ে নিতে পারবে না।{৭}

{১}. সুরা ফাতির, আয়াত : ২৮।

{২}. সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৮।

{৩}. সুরা আন নিসা, আয়াত : ১১৩।

{৪}. সুরা আল মুজাদালা, আয়াত : ১১।

{৫}. সুরা আয যুমার, আয়াত : ৯।

{৬}. সহিহ আল-বুখারী, ইলম অধ্যায়; সহিহ মুসলিম, ইলম অধ্যায় (হাদীস ৬৫৫২)।

{৭}. সহিহ মুসলিম, যিকির, দুআ, তাওবা ও ইস্তিগফার অধ্যায়, (হাদীস-৬৬০৮)।

শাখা-১৮. শিক্ষার প্রসার

শিক্ষা ও জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা এবং বিকাশ ঈমানের অন্যতম শাখা। লোকদের শিক্ষা দান তথা শিক্ষার বিকাশ সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন,

لَتُبَيِّنُنَّهُ لِلنَّاسِ وَلَا تَكْتُمُونَهُ

‘(আল্লাহর কিতাবের শিক্ষা) লোকদের মধ্যে প্রচার করিতে হবে, তা গোপন করে রাখা যাবে না।{১}

অন্য জায়গায় বলা হয়েছে,

وَلِيُنذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوا إِلَيْهِمْ

তারা নিজ গোত্রে ফিরে গিয়ে লোকদের সতর্ক করুক।”{২}

আবু বাকরা (রাদি.) হতে বর্ণিত হাদীস যা ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম স্ব-স্ব গ্রন্থে সংকলন করেছেন, সেখানে বলা হয়েছে নবী করীম ﷺ বিদায় হজ্জের দিন লোকদের লক্ষ্য করে বলেছেন,

সাবধান! তোমাদের উপস্থিত ব্যক্তিগণ অবশ্যই অনুপস্থিত ব্যক্তিদের কাছে আমার এ কথা পৌছে দেবে। এখানকার উপস্থিত ব্যক্তিগণ যাদের কাছে আমার কথা পৌছাবে, তারা হয়ত উপস্থিত শ্রোতাদের চেয়ে অধিকতর সংরক্ষণকারী হবে।”{৩}

সুনানু আবু দাউদে আবু হুরাইরা (রাদি.) হতে বর্ণিত এক হাদীসে বলা হয়েছে, নবী করীম ﷺ বলেছেন

‘কাউকে যদি ইলম সম্পর্কিত কিছু জিজ্ঞেস করা হয় এবং সে জানা সত্ত্বেও তা গোপন রাখে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে আগুনের লাগাম পরাবেন।'{৪}

উমার ইবনি আবদুল আযীয (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেছেন, যে ব্যক্তি তার কথাকে নিয়ন্ত্রণ করিতে পারে না সে বেশীর ভাগ সময় ভুল করে। আর যে ব্যক্তি ইলম ছাড়া কোনো আমল করে (অর্থাৎ না জেনে কাজ করে) তা কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণই বয়ে আনে।'{৫}

আল হারিছ আল মুহাসিবী (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেছেন, ‘দীনি ইলম মানুষের ভেতর আল্লাহভীতি সৃষ্টি করে, আল্লাহ নির্ভরতা মানুষের অন্তরে প্রশান্তি এনে দেয় এবং আল্লাহর পরিচয় (মা’আরিফাত) তাকে দায়িত্বশীল বানায়।

ইবনি সা’দ (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি হাদীসের উপর আমল করবে তাকে আল্লাহ অন্তদৃষ্টি দান করবেন, আর যে তার অন্তদৃষ্টির আলোকে কাজ করবে সে-ই সত্য পথের সন্ধান পাবে।’

মালিক ইবনি দীনার (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেছেন, ‘বান্দা যখন ইলম শিখে আমলের জন্য তখন সেই ইলম তাকে মার্জিত করে, আর যদি ইলম শিখে আমল না করে তাহলে সেই ইলম তাকে অহংকারী বানিয়ে দেয়।

মারূফ আল কারখী (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেছেন, আল্লাহ যখন তার কোনো বান্দার কল্যাণ চান, তার জন্য আমল (কাজ)-এর দরজা খুলে দেন এবং অভিযোগের দরজা বন্ধ করে দেন। আর আল্লাহ যখন তার কোনো বান্দার সর্বনাশ চান তখন আমলের দরজা বন্ধ করে দেন এবং অভিযোগের দরজা খুলে দেন।

একবার হাসান বসরী (রহমাতুল্লাহি আলাইহি)-এর সামনে দিয়ে এক ব্যক্তি যাচ্ছিলেন, বলা হলো, ইনি ফকীহ্ (অর্থাৎ ইসলামী আইন বিশারদ), তিনি বললেন, তুমি কি জান ফকীহ্ কাকে বলে? ফকীহ্ হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যিনি দীনি বিষয়ে বিশেষ প্রজ্ঞার অধিকারী এবং দুনিয়ার প্রতি নির্লোভ। আল্লাহর ইবাদাতে রাত কাটিয়ে দেন।’

মালিক ইবনি দীনার (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেছেন, আমি তাওরাতে পড়েছি- ‘যে আলিম তার ইলম অনুযায়ী আমল করে না, তার কথার কোনো প্রভাব মানুষের উপর পড়ে না। তার কথা মূলত এমন, যেন পাথরের উপর বর্ষিত বৃষ্টি।

আবু বকর ইবনি আবু দাউদ বলেছেন,

পানি পানে পরিতৃপ্ত হয় মন

কিন্তু পানিই যদি হয়ে পড়ে গলগ্রহ

তাহলে সেই পানি পানের

থাকে কি কারও আগ্রহ॥

আবু ওসমান (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেছেন,

তাকওয়া নেই নিজের মাঝে, অথচ এ কেমন ধারা

অন্যকে বলবে মুত্তাকী হতে, নিজেই যে আত্মহারা।

যে ডাক্তার নিজেই অসুস্থ

তার কাছে যায় না রোগী হলেও বিপদগ্রস্ত॥

আল্লাহ যেন আমাদেরকে ইলম অনুযায়ী আমল করার তাওফীক দেন এবং লোভ-লালসা, উচ্চাকাক্ষা ও বেপরওয়া হওয়া থেকে রক্ষা করেন।

{১}. সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৮৭।

{২}. সুরা আত তাওবা, আয়াত : ১২২।

{৩}. এটি একটি দীর্ঘ হাদীসের অংশবিশেষ। সহিহ আল বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, বিদায় হাজ্জ শিরোনাম। সহিহ মুসলিম, কাসাস অধ্যায়, (হাদীস-৪২৩৬)।

{৪}. আবু দাউদ, ইলম অধ্যায়, জামি আত-তিরমিযী, ইমাম তিরমিযী একে হাসান সহিহ বলেছেন।

{৫}. ইমাম বাইহাকী তার নিজস্ব সনদে বর্ণনা করেছেন।

শাখা-১৯. কুরআন মাজীদের সম্মান করা

আল কুরআনের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, সংরক্ষণ এবং তার নির্দেশ অনুযায়ী হালালকে হালাল এবং হারামকে হারাম মনে করে চলা-ই হচ্ছে মূলত কুরআন মাজীদকে সম্মান করা। যেসব বিষয়ে আল কুরআন মানুষকে সতর্ক করেছে এবং ভয় দেখিয়েছে সেসব বিষয়ে ভয় করা এবং সতর্ক থাকার নাম আল্লাহভীতি (খাশইয়াতুল্লাহ্) বা তাকওয়া (সতর্কতা)। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন,

لَوْ أَنزَلْنَا هَٰذَا الْقُرْآنَ عَلَىٰ جَبَلٍ لَّرَأَيْتَهُ خَاشِعًا مُّتَصَدِّعًا مِّنْ خَشْيَةِ اللَّهِ

‘আমরা যদি এই কুরআনকে পাহাড়ের উপর নাযিল করতাম তাহলে দেখতে পেতে আল্লাহর ভয়ে পাহাড় পর্যন্ত বিদীর্ণ হয়ে যেত।{১}

আরেক জায়গায় বলা হয়েছে,

إِنَّهُ لَقُرْآنٌ كَرِيمٌ * فِي كِتَابٍ مَّكْنُونٍ * لَّا يَمَسُّهُ إِلَّا الْمُطَهَّرُونَ * تَنزِيلٌ مِّن رَّبِّ الْعَالَمِينَ

‘নিঃসন্দেহে এই কুরআন মহাসম্মানিত। কিতাব আকারে (লিখিত) সংরক্ষিত। পবিত্রগণ ছাড়া আর কেউ এটি স্পর্শ করে না। বিশ্বজাহানের রবের পক্ষ থেকে নাযিলকৃত।”{২}

সুরা আর রাদে বলা হয়েছে,

وَلَوْ أَنَّ قُرْآنًا سُيِّرَتْ بِهِ الْجِبَالُ أَوْ قُطِّعَتْ بِهِ الْأَرْضُ أَوْ كُلِّمَ بِهِ الْمَوْتَىٰ ۗ بَل لِّلَّهِ الْأَمْرُ جَمِيعًا

যদি কুরআন এমন হতো যার সাহায্যে পাহাড় চলমান হয়, অথবা জমিন বিদীর্ণ হয় কিংবা মৃতরা কথা বলে, তবে কেমন হতো? বরং সব কাজ তো আল্লাহ্‌র হাতে।{৩}

সহিহ আল বুখারীতে উসমান ইবনি আফফান (রাদি.) হতে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, নবী করীম ﷺ বলেছেন,

‘তোমাদের মধ্যে মর্যাদাবান বা উত্তম সেই ব্যক্তি যে নিজে আল কুরআন শিখে এবং অপরকে শেখায়।’

আবু মূসা আশআরী (রাদি.) হতে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ

‘তোমরা আল কুরআনের মুখস্থ অংশের প্রতি লক্ষ্য রেখো। যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ আমি সেই সত্তার শপথ করে বলছি, আল কুরআনের মুখস্থ সুরা বা আয়াতসমূহ মানুষের মন থেকে এক পা বাধা উটের চেয়েও দ্রুত পলায়ন পর (অর্থাৎ মুখস্থ অংশ মানুষ তাড়াতাড়ি ভুলে যায়)।{৪}

আবদুল্লাহ্ ইবনি উমার (রাদি.) হতে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, নবী করীম ﷺ বলেছেন

দুটো ব্যাপার ছাড়া ঈর্ষা করা ঠিক নয়। একটি হচ্ছে, যাকে আল্লাহ তাআলা এই কুরআনের জ্ঞান দিয়েছেন এবং সে দিনরাত সেই জ্ঞানানুযায়ী আমল (কাজ) করে। অপরটি হচ্ছে, যাকে আল্লাহ তাআলা ধন সম্পদ দান করেছেন এবং সেই ধনসম্পদ সে রাতদিন আল্লাহর পথে খরচ করছে।’ (এ ক্ষেত্রে তাদের চেয়ে বেশী আমল ও দান করার চেষ্টা করাকে ঈর্ষা বলা হয়েছে)।{৫}

উমার (রাদি.) হতে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন

‘আল্লাহ তাআলা এই কিতাবের দ্বারা এক জাতির উত্থান ঘটান আবার আরেক জাতির পতন ঘটান।{৬}

{১}. ৫৮. সুরা আল হাশর, আয়াত : ২১।

{২}. সুরা আল ওয়াকিয়া, আয়াত : ৭৭-৮০।

{৩}. সুরা আর রা’দ, আয়াত :৩১।

{৪}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম, হাদীস-১৭২১)।

{৫}. সহিহ মুসলিম, (হাদীস-১৭৭২); সহিহ আল বুখারী, কিতাবুত তাওহীদ।

{৬}. সহিহ মুসলিম, মুসাফিরের নামায অধ্যায়।

শাখা-২০. পাক পবিত্রতা

পবিত্রতা সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,

إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلَاةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَامْسَحُوا بِرُءُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَيْنِ

যখন তোমরা নামাযের জন্য উঠবে তখন তোমাদের মুখমণ্ডল, দু’হাত কনুই পর্যন্ত ধুয়ে নাও। তোমাদের মাথা মাসেহ্ কর এবং দু’পা গোড়ালীর গিটসহ ধুয়ে নাও।{১}

আবু মালেক আল আশআরী হতে বর্ণিত, নবী করীম ﷺ বলেছেন

‘পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক। আলহামদুলিল্লাহ’ ওজনদণ্ডের (মিযানের) পরিমাপকে পরিপূর্ণ করে দেবে এবং সুবহানাল্লাহ্ ওয়াল হামদু লিল্লাহ’ আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী স্থানকে পরিপূর্ণ করে দেবে। নামায হচ্ছে একটি উজ্জ্বল জ্যোতি। সাদকা। হচ্ছে প্রমাণ। সবর হচ্ছে জ্যোতি। প্রতিটি ভোরে প্রত্যেক মানুষই আমলের বিনিময়ে নিজেকে বিক্রি করে দেয়। তার আমল দ্বারা নিজেকে (আল্লাহর শাস্তি থেকে) রক্ষা করে কিংবা ধ্বংস করে।”{২}

ইবনি উমার (রাদি.) হতে বর্ণিত সহিহ মুসলিমে আরেকটি হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

মহান ও পরাক্রমশালী আল্লাহ পবিত্রতা ছাড়া নামায এবং অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের দান কবুল করেন না।{৩}

ছাওবান (রাদি.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

তোমরা দৃঢ় থাক দ্বিধাগ্রস্ত হয়ো না। জেনে রেখো তোমাদের সর্বোত্তম কাজ হচ্ছে নামায। আর মুমিন ছাড়া কেউ ওযুকে সংরক্ষণ করে না।'{৪}

ইয়াহইয়া ইবনি আদাম থেকে হালিমী (الطَّهُورُ شَطْرُ الْإِيمَانِ)-এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেছেন, আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা নামাযকেও ঈমান বলে অভিহিত করেছেন। যেমন আল কুরআনে বলা হয়েছে

وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُضِيعَ إِيمَانَكُمْ

আল্লাহ তোমাদের ঈমান (অর্থাৎ বাইতুল মাকদাস-এর দিকে মুখ করে নামায)-কে নষ্ট হতে দেবেন না।{৫}

এ আয়াতের আলোকে বুঝা যায় পবিত্রতা যদি ঈমানের অর্ধেক হয় তাহলে অবশিষ্ট অর্ধেক হচ্ছে নামায যা ঈমান নামে অভিহিত করা হয়েছে।

{১}. সুরা আল মায়িদা, আয়াত : ৬।

{২}. সহিহ মুসলিম, পবিত্রতা অধ্যায়, (হাদীস-৪৪১)।

{৩}. সহিহ মুসলিম, পবিত্রতা অধ্যায়।

{৪}. মুসনাদে ইমাম আহমদ ইবনি হাম্বল, হাকিম, বাইহাকী প্রমুখ ছাওবান (রাদি.) থেকে এবং বাইহাকী (এর অন্য রিওয়ায়েত) ও তাবারানী ইবনি আমর ইবনিল আস হতে বর্ণিত হাদীস সংকলন করেছেন। ইমাম সুয়ূতী একে সহিহ বলেছেন। হাফিয মুনযিরী বলেছেন, ইবনি মাজা বর্ণিত সনদটিও সহিহ। রাফিঈ বলেছেন, হাদীসটি প্রমাণিত।

{৫}. সুরা আল বাকারা, আয়াত : ১৪৩।

শাখা-২১. সালাত (নামায)

দৈনিক পাঁচবার সালাত প্রতিষ্ঠিত করাকে অত্যাবশ্যকীয় (ফরয) করা হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা ইরশাদ করেন,

وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُضِيعَ إِيمَانَكُمْ

‘আল্লাহ তোমাদের ঈমান (তথা নামায)-কে নষ্ট করে দেবেন, ব্যাপারটি এমন নয়।{১}

আরও বলা হয়েছে,

وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ

‘তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠিত কর এবং যাকাত আদায় কর।{২}

সুরা আন নিসায় বলা হয়েছে,

إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَّوْقُوتًا

“নিশ্চয়ই মুমিনদের উপর নামায ফরয করা হয়েছে ওয়াক্ত (সময়) মত।'{৩}

হাদীসে রাসূলে বলা হয়েছে

إِنَّ بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الشِّرْكِ وَالْكُفْرِ تَرْكَ الصَّلَاةِ

‘অবশ্যই একজন ব্যক্তি এবং শিরক ও কুফরীর মধ্যে পার্থক্যকারী হচ্ছে সালাত (নামায)।{৪}

আবদুল্লাহ্ ইবনি মাসউদ (রাদি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-কে জিজ্ঞেস করলাম, কোন কাজটি আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশী প্রিয়? জবাবে তিনি বললেন

الصلوة لوقتها

সঠিক সময়ে সালাত আদায় করা।{৫}

আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, তারপর কোনটি? তিনি বললেন- বাপ মায়ের সাথে সদাচরণ । আমি বললাম- তারপর কোনটি? তিনি বললেন- জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ্।

আবদুল্লাহ্ ইবনি উমার (রাদি.) বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, নবী করীম ﷺ বলেছেন

صلاة الجماعة أفضل من صلاة الفَذِّ بسبع وعشرين درجة

জামায়াতের সাথে নামায পড়া একাকী নামায থেকে সাতশ’ গুণ বেশী মর্যাদাসম্পন্ন।{৬}

উসমান (রাদি.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

যখন কোনো মুসলিমের ফরয নামাযের সময় উপস্থিত হয়, তখন সে যদি উত্তমরূপে ওযু করে এবং একান্ত বিনয়-নম্রতার সাথে রুকু সিজদা আদায় করে তাহলে সে কবীরা গুনাহয় লিপ্ত না হওয়া পর্যন্ত আগের সব গুনাহ্ মাফ হয়ে যায়। আর এরূপ সারা বছরই হতে থাকে।{৭}

{১}. সুরা আল বাকারা, আয়াত : ১৪৩।

{২}. সুরা আন নিসা, আয়াত :৭৭; সুরা আন নূর, আয়াত : ৫৮; সুরা আল-মুযযাম্মিল, আয়াত : ২০।

{৩}. সুরা আন নিসা, আয়াত : ১০৩।

{৪}. সহিহ মুসলিম, ঈমান অধ্যায়, সালাত পরিত্যাগ করা কুফরী অনুচ্ছেদ। একই শিরোনামে আবু দাউদ, তিরমিযী ও ইবনি মাজা জাবির (রাদি.) থেকে বর্ণনা করেছেন।

{৫}. সহিহ আল বুখারী, নামাযের ওয়াক্ত অধ্যায়, সময় মত নামায পড়ার ফযীলত” শিরোনাম। সহিহ মুসলিম, ঈমান অধ্যায়, উত্তম আমল হচ্ছে সঠিক সময়ে নামায’ শিরোনাম।

{৬}. সহিহ মুসলিম, মাসজিদ ও নামাযের জায়গা অধ্যায় (হাদীস-১৩২৬)।

{৭}. সহিহ মুসলিম, পবিত্রতা অধ্যায়, ‘ওযু ও নামাযের ফযীলত’ শিরোনাম (হাদীস-৪৫০)।

শাখা-২২. যাকাত

ঈমানের ২২তম শাখা হচ্ছে যাকাত প্রদান করা। নামাযের পরই যাকাতের গুরুত্ব। যাকাত সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন,

وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ وَيُقِيمُوا الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ ۚ وَذَٰلِكَ دِينُ الْقَيِّمَةِ

তাদেরকে এছাড়া আর কোনো নির্দেশ দেয়া হয়নি যে, একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে, নামায কায়েম করবে এবং যাকাত দেবে। এটিই দীনি স্থায়ী ব্যবস্থাপনা।{১}

সুরা আত তাওবায় বলা হয়েছে,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ كَثِيرًا مِّنَ الْأَحْبَارِ وَالرُّهْبَانِ لَيَأْكُلُونَ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ وَيَصُدُّونَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ ۗ وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٍ * يَوْمَ يُحْمَىٰ عَلَيْهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكْوَىٰ بِهَا جِبَاهُهُمْ وَجُنُوبُهُمْ وَظُهُورُهُمْ ۖ هَٰذَا مَا كَنَزْتُمْ لِأَنفُسِكُمْ فَذُوقُوا مَا كُنتُمْ تَكْنِزُونَ

আর যারা সোনা রূপা জমা করে রাখে, তা থেকে আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ শুনিয়ে দিন। সেদিন জাহান্নামের আগুনে সেগুলো উত্তপ্ত করা হবে। তা দিয়ে তাদের মুখমণ্ডল, পিঠ ও পার্শ্বদেশে ছ্যাকা দেয়া হবে, আর বলা হবে- এগুলো তো তোমরা নিজেদের জন্য জমা করে রেখেছিলে। এবার এর মজা গ্রহণ কর।'{২}

আরেক জায়গায় বলা হয়েছে এভাবে-

وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ بِمَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ هُوَ خَيْرًا لَّهُم ۖ بَلْ هُوَ شَرٌّ لَّهُمْ ۖ سَيُطَوَّقُونَ مَا بَخِلُوا بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ۗ وَلِلَّهِ مِيرَاثُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۗ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ

‘আল্লাহ তাদেরকে নিজের অনুগ্রহে যা কিছু দান করেছেন, তাতে যারা কৃপণতা করে এবং ভাবে এতে তাদের কল্যাণ হবে। না, বরং এতে তাদের অকল্যাণই ডেকে আনবে। যে ধন সম্পদের ব্যাপারে তারা কার্পণ্য করে সেই ধন সম্পদ কিয়ামতের দিন বেড়ি বানিয়ে তাদের গলায় পরিয়ে দেয়া হবে।{৩}

ইবনি আব্বাস (রাদি.) হতে বর্ণিত, মুয়ায ইবনি জাবালকে যখন রাসূলুল্লাহ্ ﷺ ইয়েমেন পাঠান, তখন তাকে বলেছিলেন,

তুমি আহলে কিতাব সম্প্রদায়ের কাছে যাচ্ছে। তাদের সাথে সাক্ষাৎ হলে তুমি আহ্বান জানাবে তারা যেন সাক্ষ্য দেয় আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। তারা যদি মেনে নেয় তাহলে বলবে আল্লাহ তাআলা দিনে রাতে মোট পাচ ওয়াক্ত নামায ফরয করেছেন। তারা যদি মেনে নেয় তাহলে বলবে- আল্লাহ তাদের উপর যাকাত ফরয করেছেন। যা ধনীদের থেকে আদায় করে গরীবদের মাঝে বন্টন করা হবে। তারা যদি একথাটিও মেনে নেয়, তাহলে সাবধান! যাকাত হিসেবে তুমি তাদের বাছাই করা উত্তম মালগুলো নেবে না। অবশ্যই মযলুম (অত্যাচারিত)-এর (বদ) দুআ থেকে বেঁচে থাকবে। কারণ আল্লাহ আর মযলুমের দুআর মধ্যখানে কোনো আড়াল নেই।{৪}

ইমাম বুখারী আবু হুরাইরা (রাদি.) হতে বর্ণিত এক হাদীস সংকলন করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

যাকে আল্লাহ ধন সম্পদ দিয়েছেন কিন্তু তা থেকে যাকাত দেয় না, কিয়ামতের দিন সেগুলো বিরাট অজগর হয়ে তার গলা পেচিয়ে ধরে ছোবল মারতে থাকবে। সে অজগর কানে শুনবে না, তার চোখ দুটো থাকবে কালো কুচকুচে। ছোবল মারবে আর বলতে থাকবে। আমি তোমার ধন সম্পদ আমি তোমার টাকা পয়সা। তারপর তিনি সুরা আলে ইমরানের ১৮০নং আয়াত তিলাওয়াত করলেন। যার অর্থ-

‘আল্লাহ তাদেরকে নিজের অনুগ্রহে যা কিছু দান করেছেন, তাতে যারা কৃপণতা করে এবং ভাবে এতে তাদের কল্যাণ হবে। না, বরং এতে তাদের অকল্যাণই বয়ে আনবে। যে ধন সম্পদের ব্যাপারে তারা কার্পণ্য করে সেই ধন-সম্পদ কিয়ামতের দিন বেড়ি বানিয়ে তাদের গলায় পরিয়ে দেয়া হবে।’

{১}. সুরা আল বাইয়্যিনাহ্, আয়াত : ৫।

{২}. সুরা আত তাওবা, আয়াত : ৩৪-৩৫।

{৩}. সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৮০।

{৪}. সহিহ আল বুখারী, যাকাত অধ্যায়, যাকাত হিসেবে লোকদের থেকে উত্তম সম্পদ গ্রহণ না করা শিরোনাম; সহিহ মুসলিম, ঈমান অধ্যায় (হাদীস-২৯)।

শাখা-২৩. সিয়াম (রোযা)

ঈমানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সিয়াম বা রোযা। সিয়ামের ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা ইরশাদ করেছেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ

হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে। যেভাবে ফরয করা হয়েছিলো তোমাদের আগেকার লোকদের উপর।{১}

সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে আবদুল্লাহ্ ইবনি উমার (রাদি.) হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

‘পাঁচটি বিষয়ের উপর ইসলামের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত। ১. আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ ﷺ তার বান্দা ও রাসুল- এ কথার সাক্ষ্য দেয়া, ২. সালাত কায়েম করা, ৩. যাকাত দেয়া, ৪. রমযানের সিয়াম পালন করা এবং ৫. বাইতুল্লাহয় হাজ্জ করা।”{২}

আবু হুরাইরা (রাদি.) হতে বর্ণিত, নবী করীম ﷺ বলেছেন,

‘আদম সন্তানের প্রতিটি নেক কাজের বিনিময় দশ গুণ থেকে সাতশ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়া হয়। আল্লাহ আযযা ও জাল্লা বলেন- “রোযার বিনিময় ছাড়া। কারণ রোযা আমার জন্য তাই আমিই তার বিনিময়।

আবু হুরাইরা (রাদি.) বর্ণিত অন্য হাদীসে বলা হয়েছে,

لِلصَّائِمِ فَرْحَتَانِ: فَرْحَةٌ عِنْدَ فِطْرِهِ، وَفَرْحَةٌ عِنْدَ لِقَاءِ رَبِّهِ

‘রোযাদারের জন্য দুটো খুশীর সময় রয়েছে। একটি যখন সে ইফতার করে (রোযাপূর্ণ করে), আরেকটি যখন সে তার রবের সাথে সাক্ষাৎ করবে।

অন্য হাদীসে বলা হয়েছে,

لَخُلُوفُ فَمِ الصَّائِمِ أَطْيَبُ عِنْدَ اللهِ مِنْ رِيحِ الْمِسْك

রোযাদারের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশকের সুগন্ধির চেয়েও প্রিয়।

আরও বলা হয়েছে,

الصوم جنة

রোযা হচ্ছে ঢাল।{৩}

{১}. সুরা আল বাকারা, আয়াত : ১৮৩।

{২}. সহিহ মুসলিম, ঈমান অধ্যায় (হাদীস-২১)।

{৩}. উপরিউক্ত সবগুলো হাদীস সহিহ মুসলিমের সাওম (বা রোযা) অধ্যায়ের।

শাখা-২৪. ইতিকাফ

ই’তিকাফ সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন

وَعَهِدْنَا إِلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ أَن طَهِّرَا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعَاكِفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ

‘আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, ই’তিকাফকারী ও রুকু সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখ।{১}

সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে আয়িশা (রাদি.) থেকে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে,

রসুলুল্লাহ ﷺ আমৃত্যু রমযানের শেষ দশকে ই’তিকাফ করেছেন। রাসুল ﷺ-এর ইন্তিকালের পর তার স্ত্রীগণও রমযানের শেষ দশকে ইতিকাফ করিতেন।”{২}

{১}. সুরা আল বাকারা, আয়াত :১২৫।

{২}. সহিহ আল বুখারী, সহিহ মুসলিম, ই’তিকাফ অধ্যায়, রমযানের শেষ দশকে ই’তিকাফ’ শিরোনাম।

শাখা-২৫. হাজ্জ

হাজ্জ সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেছেন

وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا

‘এ ঘরে হাজ্জ করা মানুষের কাছে আল্লাহ্‌র প্রাপ্য (দাবী)। অবশ্য যার সামর্থ্য রয়েছে এ অবধি পৌছার।{১}

অন্য জায়গায় বলেছেন এভাবে,

وَأَذِّن فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ يَأْتُوكَ رِجَالًا وَعَلَىٰ كُلِّ ضَامِرٍ يَأْتِينَ مِن كُلِّ فَجٍّ عَمِيقٍ

আর মানুষের মধ্যে হাজ্জের জন্য ঘোষণা করে দিন। তারা আপনার কাছে আসবে দূর দূরান্ত থেকে পায়ে হেঁটে এবং জীর্ণশীর্ণ{২} উটের পিঠে চড়ে।{৩}

সুরা আল বাকারায় বলা হয়েছে,

وَأَتِمُّوا الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ لِلَّهِ

‘তোমরা হাজ্জ এবং উমরা পালন কর।”{৪}

সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে আবদুল্লাহ্ ইবনি উমার (রাদি.) হতে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

পাঁচটি বিষয়ের উপর ইসলামের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত। ১. আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ তার বান্দা ও রাসুল’- একথার সাক্ষ্য দেয়া, ২. সালাত কায়েম করা, ৩. যাকাত দেয়া, ৪. রমযানের রোযা রাখা এবং ৫. বাইতুল্লাহয় হাজ্জ করা।{৫}

সহিহ মুসলিমে উমার (রাদি.) বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদীসে (যা হাদীসে জিবরীল নামে খ্যাত) বলা হয়েছে- আগন্তুক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-কে জিজ্ঞেস করলেন,

‘হে মুহাম্মাদ! ইসলাম কী? তিনি বললেন- ইসলাম হচ্ছে তুমি এ কথার সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহ্‌র রাসুল। নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে, রমযানের রোযা রাখবে আর বাইতুল্লাহয় হাজ্জ করবে।”{৬}

আবু উমামা আল বাহিলী (রাদি.) হতে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

(হাজ্জ ফরয হয়েছে এমন ব্যক্তি) অসুখ বিসুখ যার বাধা হয়ে দাঁড়ালো না, গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রয়োজনও তার নেই। এমনকি অত্যাচারী কোনো শাসকের ভয়ও তার নেই, এমতাবস্থায় সে হাজ্জ না করেই মারা গেল। চাই সে ইহুদী হয়ে মরুক কিংবা খৃস্টান হয়ে (তাতে আমার কিছু যায় আসে না)।{৭}

{১}. সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৯৭।

{২}. আরবী দা-মিরিন’ (ضامر) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থ- জীর্ণশীর্ণ কৃষকায় উট। একথা দিয়ে হাজ্জ করিতে আসা ক্লান্তশ্রান্ত মুসাফিরের চিত্র অংকন করা হয়েছে। অর্থাৎ ঠিকমত আহার ও বিশ্রামের অভাবে মুসাফিরের সাথে সাথে তাদের উটগুলোও দুর্বল-কৃষ হয়ে যায়। -অনুবাদক।

{৩}. সুরা আল হাজ্জ, আয়াত : ২৭।

{৪}. সুরা আল বাকারা, আয়াত : ১৯৬।

{৫}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম, (হাদীস-২১)।

{৬}. সহিহ মুসলিম, ঈমান অধ্যায়, (হাদীস-১)।

{৭}. ইবনি আল জাওযী তার মাওযুআতের এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তবে এ হাদীসটির সনদ সম্পর্কে অনেকের আপত্তি রয়েছে।

শাখা-২৬. জিহাদ (সংগ্রাম)

আল্লাহ্‌র পথে সংগ্রাম বা জিহাদও ঈমানের অন্যতম অংশ। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেছেন,

وَجَاهِدُوا فِي اللَّهِ حَقَّ جِهَادِهِ

তোমরা সংগ্রাম (জিহাদ) কর আল্লাহর জন্য, যে রকম সগ্রাম করা উচিত।{১}

আরেক জায়গায় বলা হয়েছে,

يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لَائِمٍ

তারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে এবং কোনো তিরস্কারকারীর তিরস্কারকে তারা পরওয়া করে না।{২}

সুরা আত তাওবায় বলা হয়েছে,

قَاتِلُوا الَّذِينَ يَلُونَكُم مِّنَ الْكُفَّارِ وَلْيَجِدُوا فِيكُمْ غِلْظَةً

‘যেসব কাফির তোমাদের সাথে লাগতে আসে তোমরা তাদের সাথে লড়াই করো, তারা যেন বুঝতে পারে তোমাদের মধ্যে কঠোরতা আছে।”{৩}

আরেক জায়গায় বলা হয়েছে,

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ حَرِّضِ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى الْقِتَالِ

হে নবী! আপনি ঈমানদারদেরকে লড়াইয়ের জন্য উৎসাহিত করুন।{৪}

সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে আবু হুরাইরা (রাদি.) হতে বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল,

‘কোন আমলটি উত্তম? তিনি বললেন- আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি বিশ্বাস। জিজ্ঞেস করা হলো। তারপর কোনটি? বললেন- আল্লাহর পথে সংগ্রাম (জিহাদ)। আবার জিজ্ঞেস করা হলো। তারপর কোনটি? বললেন- মাবরুর হাজ্জ।{৫}

সহিহ আল বুখারীতে আবদুল্লাহ্ ইবনি আবু আওফা (রাদি.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন

‘তোমরা শত্রুর সাথে সাক্ষাতের জন্য উদগ্রীব হয়ো না। আর আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা চাইতে থাকে। যখন তোমরা তাদের মুখোমুখি হয়ে যাবে তখন ধৈর্যধারণ করবে। জেনে রেখো- জান্নাত তরবারীর ছায়াতলে।{৬}

{১}. সুরা আল হাজ্জ, আয়াত : ৭৮।

{২}. সুরা আল মায়িদা, আয়াত : ৫৪।

{৩}. সুরা আত তাওবা, আয়াত : ১২৩।

{৪}. সুরা আল আনফাল, আয়াত : ৬৫।

{৫}. সহিহ আল বুখারী, ঈমান অধ্যায়; সহিহ মুসলিম, ঈমান অধ্যায়।

{৬}. সহিহ আল বুখারী।

শাখা-২৭. আল্লাহর পথে পাহারা (মুরাবাতাহ)

আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেছেন

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا

“হে ঈমানদারগণ! ধৈর্যের পথ অবলম্বন কর, বাতিলের মুকাবেলায় দৃঢ় থাকো এবং শত্রুর মুকাবেলায় সদাপ্রস্তুত থাকো।{১}

সহিহ আল বুখারীতে সাহল ইবনি সা’দ সাঈদী (রাদি.) হতে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহর রাসুল ﷺ বলেছেন,

‘আল্লাহর পথে একদিন পাহারা দেয়া পৃথিবী এবং তার মধ্যস্থিত সবকিছু থেকে উত্তম। তোমাদের কারও একটি চাবুক রাখতে যে জায়গাটুকু লাগে জান্নাতের সেই জায়গাটুকু গোটা পৃথিবী ও তার মধ্যস্থিত সবকিছু থেকে উত্তম।

সংগ্রাম (জিহাদ) কিংবা লড়াই (কিতাল)-এর সময় একটি দিন কিংবা একটি রাত শক্রর মুকাবেলায় পাহারায় কাটানো, মাসজিদে ই’তিকাফে বসে সারাক্ষণ নামাযরত অবস্থায় থাকার চেয়ে উত্তম।

{১}. সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ২০০।

শাখা-২৮. শত্রুর মোকাবেলায় দৃঢ় থাকা

আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا لَقِيتُمْ فِئَةً فَاثْبُتُوا

‘যে ঈমানদারগণ! যখন কোনো বাহিনীর সাথে সংঘাতে লিপ্ত হও তখন সুদৃঢ় থাকো।'{১}

আরও বলা হয়েছে,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا زَحْفًا فَلَا تُوَلُّوهُمُ الْأَدْبَارَ * وَمَن يُوَلِّهِمْ يَوْمَئِذٍ دُبُرَهُ إِلَّا مُتَحَرِّفًا لِّقِتَالٍ أَوْ مُتَحَيِّزًا إِلَىٰ فِئَةٍ فَقَدْ بَاءَ بِغَضَبٍ مِّنَ اللَّهِ وَمَأْوَاهُ جَهَنَّمُ ۖ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন কাফিরদের মুখোমুখি হবে তখন আর পেছন ফিরে আসবে না। অবশ্য লড়াইয়ের কৌশল হিসেবে কিংবা নিজ সৈন্যদের সাথে মিলিত হতে চাইলে ভিন্ন কথা। যদি কেউ পেছন ফিরে আসে সে যেন আল্লাহর গযব নিয়ে এলো। তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম। আবাসস্থল হিসেবে তা খুবই নিকৃষ্ট।{২}

আরেক জায়গায় বলা হয়েছে,

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ حَرِّضِ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى الْقِتَالِ ۚ إِن يَكُن مِّنكُمْ عِشْرُونَ صَابِرُونَ يَغْلِبُوا مِائَتَيْنِ ۚ وَإِن يَكُن مِّنكُم مِّائَةٌ يَغْلِبُوا أَلْفًا

“হে নবী! আপনি মুমিনদেরকে জিহাদের জন্য উৎসাহিত করুন। (বলুন) তোমাদের মধ্যে যদি বিশজন দৃঢ় ব্যক্তি থাকে তাহলে দু’শ’ জনের মুকাবেলায় বিজয় দান করা হবে। আর যদি তোমাদের মধ্যে একশ’ জন থাকে তাহলে বিজয়ী হবে হাজার জনের উপর।{৩}

সহিহ আল বুখারীতে আবদুল্লাহ ইবনি আবু আওফা (রাদি.) হতে বর্ণিত হয়েছে, রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

‘তোমরা শত্রুর মুখখামুখি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করো না। বরং আল্লাহর কাছে সর্বদা নিরাপত্তা চাবে। শত্রুর মুখখামুখি যখন হয়েই যাও তখন ধৈর্য ধারণ করবে। মনে রাখবে জান্নাত তরবারীর ছায়াতলে।{৪}

{১}. সুরা আল আনফাল, আয়াত : ৪৫।

{২}. সুরা আল আনফাল, আয়াত : ১৫, ১৬।

{৩}. সুরা আল আনফাল, আয়াত : ৬৫।

{৪}. সহিহ আল বুখারী, জিহাদ অধ্যায়, জিহাদের ফযীলত’ শিরোনাম।

শাখা-২৯, গানিমাতের এক পঞ্চমাংশ

যুদ্ধে শত্রুপক্ষের পরিত্যক্ত সম্পদ, ইসলামী পরিভাষায় যাকে ‘গানিমা’ বা ‘গানিমাত’ বলা হয়, সম্পূর্ণ সম্পদের ২০% রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে পরিগণিত হয়। সরকার প্রধান কিংবা তার কোনো প্রতিনিধির মাধ্যমে তা গৃহিত হয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু তাআলার ঘোষণা-

وَاعْلَمُوا أَنَّمَا غَنِمْتُم مِّن شَيْءٍ فَأَنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ إِن كُنتُمْ آمَنتُم بِاللَّهِ وَمَا أَنزَلْنَا عَلَىٰ عَبْدِنَا

আরও জেনে রাখো, গানিমাত হিসেবে যা কিছু তোমরা পাবে তার এক পঞ্চমাংশ (অর্থাৎ ২০%) হচ্ছে আল্লাহর, তার রাসূলের, তার নিকটাত্মীয়-স্বজনের এবং ইয়াতিম, অসহায় ও পর্যটকদের জন্য। যদি তোমরা আল্লাহ তার বান্দার উপর যা কিছু নাযিল করেছেন তার উপর বিশ্বাসী হও।{১}

অন্য জাগয়ায় বলা হয়েছে,

وَمَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَن يَغُلَّ ۚ وَمَن يَغْلُلْ يَأْتِ بِمَا غَلَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ

‘কোনো বস্তু গোপন করে রাখা নবীর কাজ নয়। যে ব্যক্তি কোন জিনিস গোপন বা আত্মসাৎ করবে সে কিয়ামতের দিন সেই জিনিস নিয়েই উঠবে।{২}

সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে ইবনি আব্বাস (রাদি.) হতে বর্ণিত, আবদুল কায়েসের এক প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর কাছে উপস্থিত হয়ে কতিপয় প্রশ্ন করলে আল্লাহর রাসুল ﷺ জবাবে বলেন,

‘আমি তোমাদেরকে চারটি বিষয়ে নির্দেশ দিচ্ছি এবং চারটি বিষয় নিষেধ করছি। এক আল্লাহর প্রতি ঈমান, একথা বলে জিজ্ঞেস করলেন- তোমরা কি জাননা আল্লাহর প্রতি ঈমান কী? তারা বললেন- এ বিষয়ে আল্লাহ ও তার রাসুলই ভালো জানেন। তিনি বললেন- এ সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ্ নেই, আর মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল। আর তোমরা নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে, রমযানের রোযা রাখবে এবং গানিমাতের এক পঞ্চমাংশ (শতকরা বিশ ভাগ) দান করবে। তিনি তাদের চারটি বিষয়ে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। তা হচ্ছে- দুব্বা, হানতাম, নাকীর এবং মুযাফাত। তারপর বললেন- এসব নীতিমালা মেনে চলবে এবং যারা আসেনি তাদের জানিয়ে দেবে।{৩}

{১}. সুরা আল আনফাল, আয়াত : ৪১।

{২}. সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৬১।

{৩}. সহিহ আল বুখারী, ঈমান অধ্যায়, ‘গানিমাতের এক পঞ্চমাংশ প্রদান’ শিরোনাম; সহিহ মুসলিম, ঈমান অধ্যায় (হাদীস-২৩, ২৪)।

শাখা-৩০. দাসত্ব মোচন

আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন,

فَلَا اقْتَحَمَ الْعَقَبَةَ * وَمَا أَدْرَاكَ مَا الْعَقَبَةُ * فَكُّ رَقَبَةٍ

‘কিন্তু সেই দুর্গম-বন্ধুর ঘাটিপথ অতিক্রম করার সাহস করেনি। আপনি কি জানেন সেই দুর্গম-বন্ধুর ঘটিপথ কী? কোনো ঘাড় হতে দাসত্বের শৃঙ্খল মুক্ত করা।{১}

সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে আবু হুরাইরা (রাদি.) হতে বর্ণিত এক হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

‘যে ব্যক্তি কোনো ক্রীতদাসকে মুক্ত করে দেবে সেই ক্রীতদাসের প্রতিটি অঙ্গের বিনিময়ে আল্লাহ মুক্তিদাতার প্রতিটি অঙ্গকে জাহান্নামের আগুন থেকে হিফাযত করবেন। এমনকি লজ্জাস্থানের বিনিময়ে তার লজ্জাস্থানও।{২}

{১}. সুরা আল বালাদ, আয়াত : ১১, ১২, ১৩।

{২}. সহিহ আল বুখারী, গোলাম আযাদ অধ্যায়, গোলাম আযাদের ফযীলত’ শিরোনাম; সহিহ মুসলিম, দাস মুক্তি অধ্যায় (হাদীস-৩৬৫৪)।

শাখা-৩১. কাফফারা (প্রতিকার)

আল কুরআন ও সুন্নাহ্ অনুযায়ী চারটি অপরাধের প্রতিবিধানের নাম কাফফারা । অপরাধগুলো হচ্ছে- ১. হত্যা, ২. জিহার (স্ত্রীকে মায়ের কোনো অংগের সাথে তুলনা করা), ৩. শপথ এবং ৪. রমযানে দিনের বেলা স্ত্রীকে নিয়ে বিছানায় যাওয়া। শরী’আহ্ যে জরিমানা নির্দিষ্ট করেছে তাকে ফিয়াও বলা হয়। ফিদয়া শুধু আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে শাস্তিই নয় এটি আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম হিসেবেও কাজ করে।

শাখা-৩২. চুক্তি লংঘন না করা

আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন,

أَوْفُوا بِالْعُقُودِ

‘তোমরা চুক্তিসমূহ পূর্ণ কর।{১}

ইবনি আব্বাস (রাদি.) বলেছেন, চুক্তি বলতে এখানে আল কুরআনে যা কিছু হালাল করা হয়েছে, যা কিছু হারাম করা হয়েছে, যা কিছু ফরয করা হয়েছে এবং যে সীমা পরিসীমা বলে দেয়া হয়েছে তার সবকিছুকেই বুঝানো হয়েছে। মহান আল্লাহ আরও বলেন,

يُوفُونَ بِالنَّذْرِ

যারা মানত পূরণ করে।{২}

১০৯। সুরা আন নাহল এ বলা হয়েছে-

وَأَوْفُوا بِعَهْدِ اللَّهِ إِذَا عَاهَدتُّمْ وَلَا تَنقُضُوا الْأَيْمَانَ بَعْدَ تَوْكِيدِهَا

‘আল্লাহর নামে অঙ্গীকার করার পর সেই অঙ্গীকার পূর্ণ কর। আর পাকাপাকি কসম করার পর তা ভঙ্গ করো না।{৩}

সহিহ আল বুখারীতে ইবনি মাসউদ (রাদি.) হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

কিয়ামতের দিন প্রত্যেক ওয়াদা ভঙ্গকারীর একটি পরিচিতি ব্যানার থাকবে, সেই ব্যানারই বলে দেবে সে কী ওয়াদা ভঙ্গ করেছে।{৪}

সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে আবদুল্লাহ ইবনি উমার (রাদি.) হতে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ্‌র রাসুল ﷺ বলেছেন,

‘চারটি বৈশিষ্ট্য যার ভেতর পাওয়া যাবে সে পুরোপুরি মুনাফিক। আর যদি সেই বৈশিষ্টের কোনো একটি বৈশিষ্ট্যও তার মধ্যে পাওয়া যায় তাহলে কিছু মুনাফিকী তার মধ্যেও রয়েছে বলা যায়, যদি সে তা পরিহার না করে। ১. কথা বললে মিথ্যে বলে। ২. চুক্তি করলে তা ভঙ্গ করে। ৩. কাউকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিলে তা রক্ষা করে না এবং ৪. কারও সাথে ঝগড়া হলে সে বোফাঁস কথাবার্তা বলে।{৫}

আবদুল্লাহ্ ইবনি আমের আল জুহানী (রাদি.) থেকে সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

‘যে শর্তের মাধ্যমে তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের লজ্জাস্থান বৈধ করে নিয়েছ, তা গুরুত্বপূর্ণ শর্ত, অবশ্যই তোমাদেরকে পূরণ করিতে হবে।{৬}

{১}. ১০৮. সুরা আল মায়িদা, আয়াত :১।

{২}. সুরা ইনসান (আদ-দাহর), আয়াত : ৭।

{৩}. সুরা আন নাহল, আয়াত : ৯১।

{৪}. সহিহ আল বুখারী, আদাব (শিষ্টাচার) অধ্যায়।

{৫}. সহিহ আল বুখারী, ঈমান অধ্যায়, মুনাফিকের নিদর্শন’ শিরোনাম; সহিহ মুসলিম, ঈমান অধ্যায়, মুনাফিকের বৈশিষ্ট্য” শিরোনাম।

{৬}. সহিহ মুসলিম, বিবাহ অধ্যায়, বিবাহের শর্তাবলী পূরণ’ শিরোনাম (হাদীস-৩৩৩৭)।

শাখা-৩৩. আল্লাহর নি’আমাতের কৃতজ্ঞতা

আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন

قُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ

বল, প্রশংসা তো কেবল আল্লাহর।{১}

তিনি আরও বলেছেন,

وَإِن تَعُدُّوا نِعْمَةَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا

যদি আল্লাহ্‌র নিআমাত তোমরা শুনতে চাও তা গুনে শেষ করিতে পারবে না।{২}

আবু যার (রাদি.) থেকে সহিহ আল বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ যখন ঘুমাতে বিছানায় যেতেন তখন বলতেন,

“হে আল্লাহ আপনার নামে মৃত্যুবরণ করবো এবং আপনার নামে বেঁচে উঠব।’

আবার যখন ঘুম থেকে জেগে উঠতেন, তখন বলতেন,

الحمد لله الذي أحياني بعدما أماتني وإليه النشور

সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি মৃত্যুর পর পুনরায় আমাকে জীবিত করেছেন। তার দিকেই একদিন ফিরে যেতে হবে।{৩}

সহিহ মুসলিমে সুহাইব (রাদি.) হতে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহর রাসুল ﷺ বলেছেন,

মুমিনের ব্যাপারটি খুবই আশ্চর্যজনক। সমস্ত কাজই তার জন্য কল্যাণকর। মুমিন ছাড়া আর কেউ এ কল্যাণ লাভ করিতে পারে না। সচ্ছলতার সময় শুকরিয়া জ্ঞাপন করে- এটি তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। আর অসচ্ছলতায় ধৈর্য ধারণ করে, এও তার জন্য কল্যাণকর।{৪}

আবুল হাসান আল কিন্দি বলেছেন,

সুখ স্বাচ্ছন্দে রয়েছো মাতি সবকিছু ভুলে যেয়ে

নাফরমানীর কারণে কত নি’আমাত চলে গেছে দেখনি তা চেয়ে।

{১}. সুরা আন নামল, আয়াত : ৫৯; সুরা আল আনকাবুত, আয়াত : ৬৩; সুরা লুকমান, আয়াত : ২৫।

{২}. সুরা ইবরাহীম, আয়াত : ৩৪।

{৩}. সহিহ আল বুখারী, দুআ অধ্যায়, ঘুমানোর সময় যা পড়তে হবে’ শিরোনাম। সামান্য শাব্দিক পার্থক্য সহকারে সহিহ আল বুখারীতে হুযাইফা (রাদি.) থেকেও এরকম হাদীস বর্ণিত হয়েছে।

{৪}. সহিহ মুসলিম, যুহদ- দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণহীনতা’ অধ্যায় (হাদীস-৭২২৯)।

শাখা-৩৪. অপ্রয়োজনীয় কথা না বলা

অপ্রয়োজনীয় কথা, মিথ্যা কথা, পরনিন্দা, পরচর্চা, অশ্লীল কথাবার্তা পরিহার করা একান্ত কর্তব্য। আল কুরআন ও সুন্নাতে রাসূলে এ সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। যারা সর্বদা সত্য কথা বলেন তাদের প্রশংসা করিতে গিয়ে আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন,

وَالصَّادِقِينَ وَالصَّادِقَاتِ

সত্যবাদী পুরুষ এবং সত্যবাদী মহিলাগণ …।{১}

আরেক জায়গায় বলেছেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ

“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ সম্পর্কে সতর্ক হও এবং সত্যবাদীদের সাথে থাকো।”{২}

সুরা ইসরা বা বানী ইসরাঈলে বলা হয়েছে,

وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ

‘যে সম্পর্কে তোমার ধারণা নেই, তার পেছনে ছুটো না।{৩}

সুরা আয যুমারে বলা হয়েছে,

فَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّن كَذَبَ عَلَى اللَّهِ وَكَذَّبَ بِالصِّدْقِ إِذْ جَاءَهُ ۚ أَلَيْسَ فِي جَهَنَّمَ مَثْوًى لِّلْكَافِرِينَ * وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

তার চেয়ে বড়ো যালিম আর কে আছে, যে আল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যা বলে এবং সত্য আসার পর তা মিথ্যা মনে করে? অবিশ্বাসীদের আবাসস্থল জাহান্নাম নয় কি? যারা সত্য নিয়ে এসেছে এবং সত্যকে সত্য বলে মেনে নিয়েছে, তারাই মূলত মুত্তাকী।{৪}

অন্যত্র আরও বলা হয়েছে,

إِنَّ الَّذِينَ يَفْتَرُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ لَا يُفْلِحُونَ

যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে তারা কখনও কল্যাণ পেতে পারে না।{৫}

সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে ইবনি মাসউদ (রাদি.) হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

সত্য নেকীর দিকে পথ দেখায়, নেকী জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়। কোনো মানুষ সত্যের অনুশীলন করলে আল্লাহর কাছে সত্যবাদী হিসেবে তার নাম লিখা হয়। আর মিথ্যা পাপের পথে পরিচালিত করে, পাপ জাহান্নামের পথ দেখায়। কোনো ব্যক্তি মিথ্যা বলতে থাকলে আল্লাহর কাছে তার নাম মিথ্যাবাদী হিসেবেই লিখিত হয়।{৬}

সহিহ মুসলিমে সাহল ইবনি সা’দ (রাদি.) হতে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ্‌র রাসুল ﷺ বলেছেন,

‘কেউ যদি তার দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী এবং দুই রানের মধ্যবর্তী জিনিসের গ্যারান্টি দিতে পারে আমি তাকে জান্নাতের গ্যারান্টি দিতে পারি।{৭}

শুরাইহ্ আল কুযায়ী (রাদি.) থেকে সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

‘যে আল্লাহ এবং পরকালের বিশ্বাস করে তার উচিত ভালো কথা বলা কিংবা চুপ থাকা।{৮}

{১}. সুরা আল আহযাব, আয়াত : ৩৫।

{২}. সুরা আত তাওবা, আয়াত : ১১৯।

{৩}. সুরা ই (বানী ইসরাঈল), আয়াত : ৩৬।

{৪}. সুরা আয যুমার, আয়াত : ৩২, ৩৩।

{৫}. সুরা ইউনুস, আয়াত : ৬৯।

{৬}. সহিহ আল বুখারী, আদাব অধ্যায়; সহিহ মুসলিম, সদ্ব্যবহার, আত্মীয়তার সম্পর্ক ও শিষ্টাচার অধ্যায়, মিথ্যার কদর্য ও সত্যের সৌন্দর্য ও তার ফযীলত’ শিরোনাম (হাদীস-৬৩৩৯)।

{৭}. দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী জিনিস বলতে মুখ এবং দুই রানের মধ্যবর্তী জিনিস বলতে লজ্জাস্থানকে বুঝানো হয়েছে। কারণ বেশীর ভাগ পাপ মানুষ মুখ ও লজ্জাস্থানের মাধ্যমেই করে থাকে।– অনুবাদক।

{৮}. সহিহ আল বুখারী, আদাব বা শিষ্টাচার অধ্যায়; সহিহ মুসলিম, সুকতা বা হারানো বস্তু প্রাপ্তি অধ্যায় (হাদীস-৪৩৬৪)।

শাখা-৩৫. আমানাত (গচ্ছিত বস্তু)

কেউ কারও কাছে কিছু আমানত বা গচ্ছিত রাখলে তা তার মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেয়া অবশ্যকর্তব্য। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন,

إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا

আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, আমানাতকে তার প্রাপকের কাছে ফিরিয়ে দিতে।{১}

অন্যত্র বলা হয়েছে,

فَإِنْ أَمِنَ بَعْضُكُم بَعْضًا فَلْيُؤَدِّ الَّذِي اؤْتُمِنَ أَمَانَتَهُ

যদি একে অন্যকে বিশ্বাস করে তবে যাকে বিশ্বাস করা হয় তার উচিত অন্যের প্রাপ্য পরিশোধ করা।{২}

আবু হুরাইরা (রাদি.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

‘তোমার কাছে কেউ কিছু আমানাত রাখলে সেই আমানাত তার কাছে ফিরিয়ে দাও, আর কেউ যদি তোমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে তবে তুমি তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করো না।{৩}

সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে বলা হয়েছে, নবী করীম ﷺ বলেছেন,

‘তিনটি অভ্যাস যার মধ্যে থাকবে সে মুনাফিক। যদি রোযা রাখে, নামায পড়ে এবং নিজেকে মুসলিম মনে করে তবু। অভ্যাস তিনটি হচ্ছে- কথা বললে মিথ্যা বলে, কাউকে ওয়াদা দিলে তা পূর্ণ করে না এবং তার কাছে কিছু আমানাত রাখা হলে খিয়ানত করে বসে।{৪}

{১}. সুরা আন নিসা, আয়াত : ৫৮।

{২}. সুরা আল বাকারা, আয়াত : ২৮৩।

আমানাত একটি ব্যাপক ও গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা। এর সংরক্ষণ ও প্রাপকের কাছে তা প্রত্যর্পণ করা অন্যতম ঈমানী দায়িত্ব। ইমাম কুরতুবী বলেছেন- “আমানাত অনেক প্রকার তার মধ্যে প্রধান কয়েক প্রকার হচ্ছে- গচ্ছিত বস্তু, হারানো বস্তু প্রাপ্তি, রেহেন, ধার ইত্যাদি। ইমাম নববী বলেছেন- ‘আমানতের সাধারণ অর্থ হচ্ছে অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা। যেমন আল্লাহর ইবাদাতের মাধ্যমে তার বান্দা হিসেবে সঠিক দায়িত্ব পালনের জন্য আল্লাহ ওয়াদা নিয়েছেন। আল্লাহ নিজেই বলেছেন

إِنَّا عَرَضْنَا الْأَمَانَةَ عَلَى السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَالْجِبَالِ فَأَبَيْنَ أَن يَحْمِلْنَهَا وَأَشْفَقْنَ مِنْهَا وَحَمَلَهَا الْإِنسَانُ

‘আমি এই আমানাতকে আসমান, জমিন ও পাহাড়-পর্বতের কাছে রাখতে চাইলাম, তারা গ্রহণ করিতে রাজী হলো না, ভয় পেয়ে গেল কিন্তু মানুষ তা নিজের কাঁধে তুলে নিল। (সুরা আল আহযাব : ৭২)

আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে বলা হয়েছে- ‘আমানাত বলা হয় আনুগত্য, ইবাদাত এবং নির্জযোগ্যতাকে। বারা ইবনি আযিব, ইবনি মাসউদ এবং ইবনি আব্বাস (রাদি.) প্রমুখের মতে- প্রত্যেকটি জিনিসের সাথেই আমানাত শব্দটি জড়িয়ে আছে। যেমন- ওযু, সালাত, যাকাত, রোযা, বিচার-আচার, ওজন-পরিমাপ ইত্যাদি সহ চোখ, কান, জিহ্বা, হাত, পা এসব অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সুষ্ঠু ব্যবহারও আমানতের অন্তর্ভুক্ত। এ সম্পর্কে আল্লাহ নিজেই বলেছেনঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা জেনে শুনে আল্লাহ ও তার রাসূলের সাথে বিশ্বাস ভঙ্গ করো। আর নিজেদের আমানতের ব্যাপারেও খিয়ানত করো না।’ (সুরা আনফাল :২৭) -লেখক।

{৩}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম।

{৪}. সহিহ মুসলিম, ঈমান অধ্যায়, মুনাফিকের বৈশিষ্ট্য’ শিরোনাম।

শাখা-৩৬. মানুষ হত্যা না করা

মানুষ হত্যা করা ফৌজদারী অপরাধ হিসাবে গণ্য। মানুষ হত্যা শরীআতে নিষিদ্ধ। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেছেন,

وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ

কেউ ইচ্ছেকৃত কোনো ঈমানদারকে হত্যা করলে তার পরিণাম জাহান্নাম। সেখানে স্থায়ীভাবে সে থাকবে। আর আল্লাহও তার উপর অসন্তুষ্ট থাকবেন।{১}

আরও বলা হয়েছে,

وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ

‘তোমরা পরস্পর খুনাখুনিতে লিপ্ত হয় না।

সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে আবদুল্লাহ্ ইবনি মাসউদ (রাদি.) হতে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহর রাসুল ﷺ বলেছেন,

قِتَالُ الْمُسْلِمِ كُفْرٌ وَسِبَابُهُ فُسُوقٌ

‘কোনো মুসলিমের সাথে লড়াই করা কুফরী এবং গালি দেয়া ফাসেকী।{২}

সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমের অন্য হাদীসে বলা হয়েছে, নবী করীম ﷺ বলেছেন,

‘কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম মানুষের মধ্যে খুনের বিচার করা হবে।{৩}

ইবনি উমার (রাদি.) হতে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

‘একজন মুসলিম কখনও তার দীনের সীমালংঘন করে না এবং অযথা রক্তপাত এড়িয়ে চলে, যা আল্লাহ হারাম করেছেন।{৪}

{১}. সুরা আন নিসা, আয়াত : ৯৩।

{২}. সহিহ আল বুখারী, ঈমান অধ্যায়; সহিহ মুসলিম, ঈমান অধ্যায়।

{৩}. সহিহ আল বুখারী, রিকাক অধ্যায়; সহিহ মুসলিম, কাসামা অধ্যায়।

{৪}. সহিহ আল বুখারী, সহিহ মুসলিম।

শাখা-৩৭. লজ্জাস্থানের হিফাযত করা

ঈমানের অন্যতম একটি শাখা হচ্ছে লজ্জাস্থানের হিফাযত বা বৈধ যৌন সম্পর্ক স্থাপন। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেছেন,

وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ

‘তারা যেন নিজেদের লজ্জাস্থানসমূহের হিফাযত করে।{১}

মহিলাদের লক্ষ্য করে আবার বলা হয়েছে,

وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ

মহিলারা যেন তাদের লজ্জাস্থানসমূহের হিফাযত করে।{২}

সুরা আল মুমিনূনে বলা হয়েছে,

وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ

‘(সফল সেইসব মুমিন) যারা তাদের লজ্জাস্থানসমূহের হিফাযত করে।{৩}

লজ্জাস্থানের হিফাযত বলতে যৌনস্পৃহাকে অস্বীকার করা নয়। বৈধপথে যৌন চাহিদা পূরণ করা জায়েয। অবৈধ পথে যৌন চাহিদা পূরণ না করাকে লজ্জাস্থান হিফাযত’ বলা হয়েছে। এ কথাটি অন্য আয়াতে সুস্পষ্ট বলেই দেয়া হয়েছে-

وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا

‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না, কেননা তা অশ্লীল ও মন্দ পথে নিয়ে যায়।{৪}

সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে আবু হুরাইরা (রাদি.) হতে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

ব্যভিচারী ব্যভিচারে লিপ্ত থাকাবস্থায় মুমিন থাকে না। চুরি করার সময় চোরও ঈমানদার থাকে না। মাদকসেবী মাদক সেবনের সময় মুমিন থাকে না। এমনকি মানুষের চোখের সামনে লুটেরা যখন লুটপাট করিতে থাকে তখন সে ঈমানদার থাকে না।{৫}

{১}. সুরা আন নূর, আয়াত : ৩০

{২}. সুরা আন নূর, আয়াত : ৩১।

{৩}. সুরা আল মুমিনূন, আয়াত : ৫।

{৪}. সুরা বানী ইসরাঈল, আয়াত : ৩২।

{৫}. সহিহ আল বুখারী, পানীয় অধ্যায়; সহিহ মুসলিম, ঈমান অধ্যায় (হাদীস-১০৮)।

শাখা-৩৮. অন্যায়ভাবে সম্পদ ভোগ দখল না করা

অন্যায়ভাবে সম্পদ ভোগ দখল বলতে বুঝায়, চুরি, ডাকাতি, সুদ, ঘুষ সহ বিভিন্নভাবে প্রতারণার মাধ্যমে অন্যের সম্পদ নিজ করায়ত্তে নেয়া। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন,

وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ

“তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভোগ দখল করো না।{১}

অন্যত্র বলা হয়েছে,

فَبِظُلْمٍ مِّنَ الَّذِينَ هَادُوا حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ طَيِّبَاتٍ أُحِلَّتْ لَهُمْ وَبِصَدِّهِمْ عَن سَبِيلِ اللَّهِ كَثِيرًا * وَأَخْذِهِمُ الرِّبَا وَقَدْ نُهُوا عَنْهُ وَأَكْلِهِمْ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ

‘তাদের পাপের কারণে এবং আল্লাহর পথে অধিক পরিমাণে বাধা দেয়ার কারণে ইহুদীদের জন্য হারাম করে দিয়েছি অনেক পূতপবিত্র জিনিস যা তাদের জন্য হালাল ছিল। (তাদের আরও অপরাধ ছিল) তারা লোকদের থেকে সুদ গ্রহণ করতো যা তাদেরকে বারণ করা হয়েছিল; তারা মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করতো।{২}

ওজন বা পরিমাপে কম দেয়া, আবার নেয়ার সময় ওজন বা পরিমাপে বেশী নেয়া- এটি অন্যায়। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলার ঘোষণা-

وَيْلٌ لِّلْمُطَفِّفِينَ * الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُوا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ * وَإِذَا كَالُوهُمْ أَو وَّزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ

‘ধ্বংস ঠগবাজদের জন্য। যারা লোকদের থেকে নেয়ার সময় পুরোপুরি নেয় এবং ওজন বা পরিমাপ করে দেয়ার সময় কম দেয়।{৩}

সুরা বানী ইসরাঈলে বলা হয়েছে,

وَأَوْفُوا الْكَيْلَ إِذَا كِلْتُمْ وَزِنُوا بِالْقِسْطَاسِ الْمُسْتَقِيمِ

‘মেপে দেয়ার সময় সঠিকভাবে মেপে দেবে এবং ওজন করে দিলে সঠিক দাঁড়িপাল্লায় ওজন করবে।{৪}

সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, নবী করীম ﷺ বিদায় হাজ্জের দিন মিনায় বলেছেন,

‘তোমাদের জীবন, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মানকে পবিত্র ঘোষণা করা হল।{৫}

{১}. সুরা আল বাকারা, আয়াত : ১৮৮।

{২}. সুরা আন নিসা, আয়াত : ১৬০, ১৬১।

{৩}. সুরা আল মুতাফফিফীন, আয়াত : ১-৩।

{৪}. সুরা বানী ইসরাঈল, আয়াত : ৩৫।

{৫}. সহিহ আল বুখারী, হাজ্জ অধ্যায়; সহিহ মুসলিম, হাজ্জ অধ্যায়, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর হাজ্জ’ শিরোনাম।

শাখা-৩৯. হারাম খাদ্য ও পানীয় বর্জন করা

 খাদ্য ও পানীয় গ্রহণের বেলায়ও বাছবিচার করিতে হবে। এটি ঈমানের অন্যতম শাখা। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেছেন,

حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ وَالْمُنْخَنِقَةُ وَالْمَوْقُوذَةُ وَالْمُتَرَدِّيَةُ وَالنَّطِيحَةُ وَمَا أَكَلَ السَّبُعُ إِلَّا مَا ذَكَّيْتُمْ

‘তোমাদের জন্য হারাম করে দেয়া হয়েছে- মৃত পশু, রক্ত, শূকরের গোশত এবং সেইসব পশু যা আল্লাহ ছাড়া আর কারও নামে যবাহ করা হয়েছে, যা গলায় ফাঁস লেগে, আঘাত পেয়ে বা উপর থেকে পড়ে গিয়ে বা অন্য পশুর শিঙের আঘাতে অথবা যা কোনো হিংস্র পশু ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে- তা জীবিত পেয়ে যবাহ করলে ভিন্ন কথা- যা কোনো আস্তানায় বলি দেয়া হয়েছে।{১}

সুরা আন’আমে বলা হয়েছে এভাবে-

قُل لَّا أَجِدُ فِي مَا أُوحِيَ إِلَيَّ مُحَرَّمًا عَلَىٰ طَاعِمٍ يَطْعَمُهُ إِلَّا أَن يَكُونَ مَيْتَةً أَوْ دَمًا مَّسْفُوحًا أَوْ لَحْمَ خِنزِيرٍ فَإِنَّهُ رِجْسٌ أَوْ فِسْقًا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ

“হে নবী! আপনি বলে দিন, আমার কাছে যে ওহী আসে তাতে এমন কোনো জিনিস পাইনা যা খাওয়া কারও জন্য হারাম। তবে মৃত, প্রবাহিত রক্ত কিংবা শূকরের গোত হলে ভিন্ন কথা, কারণ তা অপবিত্র জিনিস। আর যদি ফিস্ক হয়, যা আল্লাহ ছাড়া আর কারও নামে যবাহ করা হয়ে থাকে- তাও।{২}

আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা আরও বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ

‘হে ঈমানদারগণ! মাদকদ্রব্য, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য নির্ধারক তীর এসব শয়তানী কাজ। এসব থেকে বেঁচে থাক।{৩}

অন্যত্র বলা হয়েছে,

يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ ۖ قُلْ فِيهِمَا إِثْمٌ كَبِيرٌ

‘তারা আপনাকে মাদকদ্রব্য ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, বলে দিন এগুলোর মধ্যে রয়েছে মহাপাপ।{৪}

আল্লাহ আরও বলেছেন,

قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ

‘আপনি বলে দিন, আমার প্রতিপালক অশ্লীল বিষয়সমূহ হারাম করেছেন যা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য, আরও হারাম করেছেন গুনাহ্ এবং অন্যায়-অত্যাচার।{৫}

সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে আয়িশা (রাদি.) হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

‘নেশা সৃষ্টি করে এমন যে কোনো পানীয়ই হারাম।{৬}

সহিহ মুসলিমে ইবনি উমার (রাদি.) হতে বর্ণিত হয়েছে, রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

‘যা নেশা সৃষ্টি করে তাই মাদকদ্রব্য, আর মাদকদ্রব্য মাত্রই হারাম।{৭}

ইবনি উমার (রাদি.) হতে বর্ণিত অন্য হাদীসে বলা হয়েছে, আল্লাহর রাসুল ﷺ বলেছেন,

“যে ব্যক্তি পৃথিবীতে নেশাজাত দ্রব্য গ্রহণ করবে এবং তাওবা না করে মারা যাবে, আখিরাতে সে তা থেকে বঞ্চিত হবে।'{৮}

সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে আবু হুরাইরা (রাদি.) হতে বর্ণিত হয়েছে,

‘মিরাজের রাতে বাইতুল মুকাদ্দাসে রসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে মদ ও দুধের দুটো গ্লাস হাজির করা হলে তিনি দুটোর দিকেই তাকালেন, তারপর দুধের গ্লাস তুলে নিয়ে পান করলেন। জিবরীল (আঃসাঃ) বললেন- সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ যিনি আপনাকে স্বভাবসুলভ পথ গ্রহণে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। যদি আপনি মদ গ্রহণ করিতেন তাহলে আপনার উম্মাত বিভ্রান্ত হয়ে যেত।{৯}

অন্য হাদীসে বলা হয়েছে,

‘কোনো মাদকদ্রব্য সেবনকারী যখন মাদকদ্রব্য সেবন করে তখন সে মুমিন থাকে না।{১০}

সহিহ মুসলিম সহ আরও কিছু গ্রন্থে আবু হুরাইরা (রাদি.) হতে বর্ণিত এক হাদীসে বলা হয়েছে, রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

‘হে লোক সকল! নিঃসন্দেহে আল্লাহ পবিত্র এবং পবিত্র জিনিস ছাড়া তিনি গ্রহণ করেন না। মুমিনদেরকে তিনি সেই নির্দেশ দিয়েছেন, যে নির্দেশ নবী রাসুলদের দিয়েছিলেন। নির্দেশ ছিলো-

يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا ۖ إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ

“হে নবী রাসুলগণ! পবিত্র জিনিসসমূহ খাও এবং সৎ কাজ কর, তোমরা যা কিছু কর তা আমি খুব ভালো করেই জানি।’ (সুরা আল মুমিনূন : ৫১)।

মানুষকে লক্ষ্য করে তিনি সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন,

يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ

‘হে মানুষ! জমিনে যেসব হালাল ও পবিত্র জিনিস রয়েছে সেগুলো খাও, আর শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না।’ (সুরা আল বাকারা : ১৬৮)

তারপর বললেন- এক ব্যক্তি দীর্ঘ সফর করে এলো, চুলগুলো এলোমেলো, কাপড় ধুলোমলিন, এমতাবস্থায় সে উপরের দিকে হাত উঠিয়ে দুআ করিতে লাগলো- হে আমার প্রতিপালক! হে আমার রব! এইভাবে, অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম এমনকি তার পরনের পোশাকটিও হারামের টাকায় কেনা, এমতাবস্থায় কীভাবে তার দু’আ কবুল হতে পারে?

সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে নুমান ইবনি বশীর (রাদি.) হতে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, আল্লাহর রাসুল ﷺ বলেছেন,

‘হালালসমূহ সুস্পষ্ট, হারামসমূহও সুস্পষ্ট, আর কিছু আছে সংশয়যুক্ত, অধিকাংশ মানুষ তা জানে না। যে সংশয়যুক্ত বিষয় এড়িয়ে চলবে সে নিজের সম্মান ও দীনকে নিরাপদ রাখতে পারবে। আর যে সংশয়যুক্ত বিষয়ে জড়িয়ে পড়বে সে প্রকারান্তরে হারামে লিপ্ত হবে। যেমন কোনো রাখাল যদি সংরক্ষিত চারণভূমির প্রান্তসীমায় তার পশু চড়ায় তাহলে যে কোনো মুহূর্তে তা সীমালংঘন করে। সাবধান! প্রত্যেক বাদশাহর যেমন একটি সংরক্ষিত চারণভূমি রয়েছে, তেমনি পৃথিবীতে আল্লাহর সংরক্ষিত চারণভূমি হচ্ছে তার নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ।{১১}

সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে আবু হুরাইরা (রাদি.) হতে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, রাসুল ﷺ বলেছেন,

‘আমি একবার বাইরে থেকে বাড়ি ফিরে আমার বিছানায় বা ঘরে একটি খেজুর পেয়ে খেয়ে ফেললাম। পরক্ষণেই মনে হলো সেটি তো সাদকার খেজুরও হতে পারে। তখন আমি তা বমি করে ফেলে দিলাম।{১২}

সহিহ আল বুখারীতে আয়িশা (রাদি.) হতে বর্ণিত হয়েছে,

আবু বকর (রাদি.)-এর এক ক্রীতদাস খারাজ{১৩} কালেকশানে নিয়োজিত ছিলো। একদিন সে কিছু খাদ্য নিয়ে এলো। আবু বকর (রাদি.) তা থেকে খেলেন। ক্রীতদাস বললো- আপনি কি জানেন এ খাদ্য আমি কোথেকে পেয়েছি। তিনি বললেন- কোত্থেকে? সে বললো- আমি জাহেলী যুগে লোকদের ভাগ্য গণনা করতাম, অথচ সেই বিদ্যা আমার জানা ছিল না। শুধু শুধু লোকদের ধোকা দিতাম। আজ তাদের একজনের সাথে সাক্ষাৎ হওয়ায় এগুলো আমাকে দিয়েছে, যা আপনি খেলেন। আয়িশা (রাদি.) বলেন- তখন আবু বকর (রাদি.) মুখের ভেতর আঙ্গুল ঢুকিয়ে দিয়ে পেটে যা কিছু ছিল বমি করে ফেলে দিলেন।{১৪}

উমার ইবনিল খাত্তাব (রাদি.) সম্পর্কে যায়িদ ইবনি আসলাম (রাদি.) বর্ণনা করেছেন,

‘একবার উমার (রাদি.)-কে কিছু দুধ পান করানো হলো। যা তিনি পছন্দ করিতেন। পরে যিনি দুধ পান করিয়েছেন তাকে জিজ্ঞেস করলেন- তুমি এ দুধ কিভাবে পেলে? তাকে বলা হলো তিনি পানি আনতে কূপের কাছে গিয়েছিলেন। দেখলেন বেশ কিছু সাদকার ছাগল সেখানে পানি পান করানোর জন্য আনা হয়েছে। অনেকে সেসব ছাগলের দুধ দোহন করে নিচ্ছে, তিনিও একটি ছাগলের দুধ দোহন করে এনেছেন। একথা শুনে উমার (রাদি.) গলায় আঙ্গুল ঢুকিয়ে সবকিছু বমি করে ফেলে দিলেন।{১৫}

{১}. সুরা আল মায়িদা, আয়াত : ৩।

{২}. সুরা আনআম, আয়াত : ১৪৫।

{৩}. সুরা আল মায়িদা, আয়াত : ৯০।

{৪}. সুরা আল বাকারা, আয়াত : ২১৯।

{৫}. সুরা আল আ’রাফ, আয়াত : ৩৩।

{৬}. সহিহ আল বুখারী, পানীয় অধ্যায়; সহিহ মুসলিম, পানীয় অধ্যায় (হাদীস-৫০৪১)।

{৭}. ১৫০. সহিহ মুসলিম, পানীয় অধ্যায় (হাদীস-৫০৫১)।

{৮}. সহিহ আল বুখারী, পানীয় অধ্যায়; সহিহ মুসলিম, পানীয় অধ্যায়, (হাদীস-৫০৫৩)।

{৯}. সহিহ আল বুখারী, পানীয় অধ্যায়; সহিহ মুসলিম পানীয় অধ্যায় (হাদীস-৫০৭০)।

{১০}. সহিহ আল বুখারী, পানীয় অধ্যায়; সহিহ মুসলিম, ঈমান অধ্যায় (হাদীস-১০৮)।

{১১}. সহিহ আল বুখারী, ঈমান অধ্যায়; সহিহ মুসলিম, মুসাকাত অধ্যায়।

{১২}. সহিহ আল বুখারী, হারানো জিনিস প্রাপ্তি অধ্যায়; সহিহ মুসলিম, যাকাত অধ্যায়।

{১৩}. ভূমিকর যা অমুসলিমদের কাছ থেকে আদায় করা হতো।

{১৪}. সহিহ আল বুখারী।

{১৫}. ইমাম বাইহাকী তার নিজস্ব সনদে এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।

শাখা-৪০. পোশাক ও সাজসজ্জা বিষয়ে সতর্কতা

সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে আনাস (রাদি.) হতে বর্ণিত হয়েছে, নবী করীম ﷺ বলেছেন,

“যে ব্যক্তি দুনিয়ায় রেশমজাত কাপড় চোপড় পরবে সে আখিরাতে তা পরতে পারবে না।'{১}

একবার হুযাইফা (রাদি.) পানি পান করিতে চাইলে এক অগ্নি উপাসক তাকে রূপার গ্লাসে পানি এনে দেয় পান করার জন্য। তখন তিনি বললেন, আমি আল্লাহর রাসুল ﷺ-কে বলতে শুনেছি,

‘তোমরা মিহি কিংবা মোটটা রেশমী কাপড় পরবে না, সোনা-রূপার পাত্রে পানাহার করবে না। কারণ এসব দুনিয়াতে তাদের (অর্থাৎ কাফিরদের) জন্য এবং আখিরাতে তোমাদের জন্য।{২}

সহিহ মুসলিমে ইবনি মাসউদ (রাদি.) হতে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

‘আল্লাহ সুন্দর, তিনি সুন্দরকে পছন্দ করেন, অহংকার মানুষকে সত্য-বিমুখ করে এবং লোকদের কাছে হেয় করে।{৩}

আবু বুরদা (রাদি.) হতে বর্ণিত, একবার আয়িশা (রাদি.) একটি পশমী চাদর ও একটি মোটটা কাপড়ের পাজামা দেখিয়ে বললেন, আল্লাহর রাসুল ﷺ এগুলো রেখে গেছেন।{৪}

আবদুল্লাহ্ ইবনি উমার (রাদি.) বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

“যে ব্যক্তি অংহকার বশত পায়ের গোড়ালীর গিটের নিচে কাপড় ঝুলিয়ে পরবে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দিকে তাকিয়েও দেখবেন না।{৫}

{১}. সহিহ আল বুখারী, পোশাক পরিচ্ছদ অধ্যায়; সহিহ মুসলিম, পোশাক ও সাজসজ্জা অধ্যায় (হাদীস-৫২৫২)

{২}. সহিহ আল বুখারী, পোশাক পরিচ্ছদ অধ্যায়; সহিহ মুসলিম, পোশাক ও সাজসজ্জা অধ্যায়, (হাদীস-৫২২৬)।

{৩}. সহিহ মুসলিম।

{৪}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম।

{৫}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম; নাসাঈ।

শাখা-৪১. নিষিদ্ধ খেলাধুলা বর্জন করা

আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেছেন,

قُلْ مَا عِندَ اللَّهِ خَيْرٌ مِّنَ اللَّهْوِ وَمِنَ التِّجَارَةِ

হে নবী আপনি বলে দিন, আল্লাহর কাছে যা কিছু আছে তা খেলাধুলা ও ব্যবসা বাণিজ্যের চেয়ে অনেক ভালো।{১}

বুরাইদা (রাদি.) হতে বর্ণিত। রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

যে ব্যক্তি পাশা (বা জুয়া) খেললো সে যেন তার হাত শূকরের গোশত ও রক্তে রাঙিয়ে নিল।{২}

{১}. সুরা আল জুমআ, আয়াত : ১১।

{২}. সহিহ মুসলিম, কবিতা অধ্যায় (হাদীস-৫৬৯৯)।

শাখা-৪২. আয় ও ব্যয়ের মধ্যে সমন্বয় করা

আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেছেন,

وَلا تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلَى عُنُقِكَ وَلا تَبْسُطْهَا كُلَّ الْبَسْطِ فَتَقْعُدَ مَلُومًا مَحْسُورًا

তোমরা (কৃপণতা করে) নিজেদের হাত গলার সাথে বেঁধে রেখো না আবার খোলামেলা ছেড়েও দিয়ো না। তাহলে তোমরা অক্ষম হয়ে যাবে, তিরস্কৃত হবে।{১}

অন্য জায়গায় বলা হয়েছে,

وَالَّذِينَ إِذَا أَنفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَٰلِكَ قَوَامًا

তারা খরচ করলে অপচয়ও করে না আবার কার্পণ্যও করে না বরং তারা এ দুটো অবস্থার মাঝামাঝি অবস্থান করে।{২}

সহিহ মুসলিমে মুগীরা ইবনি শুবা (রাদি.) হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল ﷺ বলেছেন- তিনটি বিষয় পরিহার করিতে।

১. অতিরিক্ত ঠাট্টা মশকরা, ২. সম্পদের অপচয় এবং ৩. ভিক্ষাবৃত্তি।{৩}

{১}. সুরা বানী ইসরাঈল, আয়াত : ২৯।

{২}. সুরা আল ফুরকান, আয়াত : ৬৭।

{৩}. সহিহ মুসলিম।

শাখা-৪৩. হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার

আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন,

وَمِن شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ

‘এবং হিংসুকের অনিষ্ট হতে যখন সে হিংসা করে।{১}

অন্যত্র বলা হয়েছে,

أَمْ يَحْسُدُونَ النَّاسَ عَلَىٰ مَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ

‘এরা কি শুধু মানুষের প্রতি এজন্য হিংসা পোষণ করে যে, আল্লাহ তাদরেকে বিশেষ অনুগ্রহ দান করেছেন?{২}

সহিহ মুসলিমে আনাস (রাদি.) হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল ﷺ বলেছেন,

তোমরা পরস্পর হিংসা করো না, বিদ্বেষ পোষণ করো না, সম্পর্ক ছিন্ন করো না, তোমরা আল্লাহর বান্দা ও পরস্পর ভাই ভাই হয়ে থাক।'{৩}

আনাস ইবনি মালিক (রাদি.) হতে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

‘তোমরা পরস্পর ঘৃণা করো না, হিংসা করো না, একজন আরেকজনের পেছনে লেগে যেও না, আল্লাহর বান্দা ও ভাই হয়ে থাক। একজন মুসলমান আরেকজন মুসলমানের সাথে তিন দিনের বেশী কথা না বলা ঠিক নয়, পরস্পর দেখা হলে একজন এদিক আরেকজন ওদিক মুখ ফিরিয়ে নেবে এটি ভালো কথা নয়। দু’জনের মধ্যে উত্তম সেই, যে আগে সালাম দিয়ে কথা বলবে।{৪}

‘এবং হিংসুটের অনিষ্ট থেকে যখন সে হিংসা করে।’ (সুরা আল ফালাক : ৫)

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান বসরী (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেছেন- এটিই প্রথম অপরাধ যা জান্নাতে সংঘটিত হয়েছিল।{৫}

আহনাফ ইবনি কাইস (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেছে- পাঁচটি কথা আমাদের মধ্যে বহুল প্রচলিত ছিল, কথাগুলো হচ্ছে- হিংসুটের শান্তি নেই, মিথ্যেবাদীর কোনো ভাবমূর্তি নেই, লোভীকে দিয়ে কোনো বিশ্বাস নেই, কৃপণের কোনো মনোবল নেই এবং অসৎ লোকের কোনো চরিত্র নেই।{৬}

{১}. সুরা আল ফালাক, আয়াত : ৫।

{২}. সুরা আন নিসা, আয়াত : ৫৪।

{৩}. সহিহ মুসলিম।

{৪}. ১৭২. সহিহ আল বুখারী।

{৫}. ইমাম বাইহাকী নিজস্ব সনদে বর্ণনা করেছেন।

{৬}. ইমাম বাইহাকী নিজস্ব সনদে বর্ণনা করেছেন।

শাখা-৪৪. কাউকে অপবাদ না দেয়া বা হেয় না করা

আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেছেন

إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَن تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ

যারা চায় ঈমানদার লোকদের মধ্যে বেহায়াপনা-অশ্লীলতা বিস্তার লাভ করুক, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে কঠিন শাস্তি পাওয়ার যোগ্য।{১}

সুরা আন নূরেরই অন্য আয়াতে বলা হয়েছে,

إِنَّ الَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ لُعِنُوا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ

যারা পবিত্র চরিত্রের সাদাসিদা মুসলিম মহিলাদের অপবাদ দেয়, দুনিয়া ও আখিরাতে তারা অভিশপ্ত, তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।{২}

সহিহ মুসলিমে আবু হুরাইরা (রাদি.) হতে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, নবী করীম ﷺ বলেছেন,

‘এক মুসলমান আরেক মুসলমানের ভাই। সে তার উপর যুলম করবে না, তাকে লাঞ্ছিত করবে না এবং হেয় করবে না। তাকওয়া এখানে’- একথা বলে তিনি তিনবার বুকের দিকে ইঙ্গিত করলেন। একজন মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য এটিই যথেষ্ট যে, সে তার ভাইকে হেয় করে। প্রতিটি মুসলমানের উপর আরেক মুসলমানের জান, মাল ও সম্মান (ক্ষতি করা) হারাম।{৩}

সহিহ আল বুখারীতে আবু যার (রাদি.) বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, আল্লাহর রাসুল ﷺ বলেছেন,

‘কেউ যেন কাউকে ফাসিক বা কাফির না বলে। যাকে ফাসিক বা কাফির বলা হলো সে যদি সেরূপ না হয় তাহলে সেই কথা বক্তার উপরই পতিত হয়।{৪}

{১}. সুরা আন নূর, আয়াত : ১৯।

{২}. সুরা আন নূর, আয়াত : ২৩।

ইমাম বাইহাকী বলেন- পবিত্র চরিত্রের মহিলাদের অপবাদ দেয়া বলতে ব্যভিচারের অপবাদের কথা বুঝানো হয়েছে। এটি বড়ো মারাত্মক অপরাধ। রসুলুল্লাহ ﷺ কবীরা গুনাহ্ হিসেবে যেসব অপরাধকে চিহ্নিত করেছেন। সেগুলোর মধ্যে পবিত্র চরিত্রের মহিলাদের বিরুদ্ধে অপবাদ দেয়াও একটি। যারা এরূপ অপরাধে লিপ্ত হবে তারা ফাসিক, তাদের সাক্ষ্য কখনও গ্রহণযোগ্য নয়। সেই সাথে তাদের উপর হাদ (শরীআহ্ নির্দিষ্ট শাস্তি)ও কার্যকর করা হবে।

{৩}. সহিহ মুসলিম (হাদীস-৬৩০৯)।

{৪}. সহিহ আল বুখারী।

শাখা-৪৫. ইখলাস (একনিষ্ঠতা বা আন্তরিকতা)

লোক দেখানো কাজ পরিহার করে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাজ করাও ঈমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাখা। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন,

وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ

তাদেরকে এ নির্দেশ ছাড়া আর কোন নির্দেশই দেয়া হয়নি যে, নিঃস্বার্থভাবে আল্লাহর ইবাদাত করবে এবং দীনকে কেবল তারই জন্য নির্দিষ্ট করে নেবে।{১}

সুরা আশ শূরায় বলা হয়েছে,

مَن كَانَ يُرِيدُ حَرْثَ الْآخِرَةِ نَزِدْ لَهُ فِي حَرْثِهِ ۖ وَمَن كَانَ يُرِيدُ حَرْثَ الدُّنْيَا نُؤْتِهِ مِنْهَا وَمَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِن نَّصِيبٍ

“যে ব্যক্তি পরকালিন ফসল চায়- তার ফসল আমরা বাড়িয়ে দেই আর যে দুনিয়ার ফসল পেতে চায়। তাকে দুনিয়াতেই দান করি। পরকালে সে কিছুই পাবে না।{২}

আরও বলা হয়েছে,

مَن كَانَ يُرِيدُ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لَا يُبْخَسُونَ (15) أُولَٰئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ إِلَّا النَّارُ ۖ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوا فِيهَا وَبَاطِلٌ مَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ

যারা কেবল পার্থিব জীবন এবং তার চাকচিক্যই প্রতাশা করে তাদের কাজকর্মের যাবতীয় ফল আমরা এখানেই তাদেরকে দান করি। এ ব্যাপারে কোনো কম করা হয় না। কিন্তু পরকালে আগুন ছাড়া তাদের জন্য আর কিছুই নেই। (তখন তারা বুঝতে পারবে) পৃথিবীতে যা কিছু বানিয়েছে এবং যা কিছু করেছে, তা সবই বিফল হয়ে গেছে।{৩}

সুরা আল কাহফে আরও সুস্পষ্ট বলে দেয়া হয়েছে, যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী তাদের কী করা উচিত। বলা হয়েছে,

فَمَن كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا

কাজেই যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের আশা রাখে, সে যেন আমলে সালেহ (সৎ কাজ) করে এবং প্রতিপালকের ইবাদাতের সাথে আর কাউকে শরীক না করে।{৪}

সহিহ মুসলিমে আবু হুরাইরা (রাদি.) হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল ﷺ বলেছেনমহান আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা বলেন, আমি অংশীদারমুক্ত। কাজেই কেউ যদি আমার জন্য আমল করে এবং তার সাথে অন্য কাউকে অংশীদার করে, শির্কযুক্ত সেই আমলের আমার কোনো প্রয়োজন নেই।

আবু উমারকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল- ইখলাস (আন্তরিকতা) কী? তিনি বললেন- আল্লাহ ছাড়া আর কারও প্রশংসা না করা।

সাহল ইবনি সাদ (রাদি.) বলেছেন- মুখলেস ব্যক্তি ছাড়া রিয়া (লোক দেখানো ইবাদাত)-এর মর্ম আর কেউ বুঝে না, তেমনিভাবে নিফাকের (কপটতা) মর্ম কেবল একজন ঈমানদারই বুঝে। আর আলিম (জ্ঞানী) ছাড়া মূর্খতার মর্ম কে আর বুঝবে, যেমন গুনাহর মর্ম আল্লাহর একান্ত বাধ্যগত ব্যক্তি ছাড়া আর কেউই বুঝে না।{৫}

রবী ইবনি খুশাইম (রাদি.) বলেছেন- ‘কোনো কাজের পেছনে যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যই না থাকে তবে সেই কাজ অনর্থক।

জুনাইদ (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেন- কোনো বান্দার ভেতর যদি আদম (আঃসাঃ)-এর মত মুখাপেক্ষিতা, ঈসা (আঃসাঃ)-এর মত সংসার বিমুখতা, আইউব (আঃসাঃ)-এর মত কষ্টক্লেশ ভোগ, ইয়াহইয়া (আঃসাঃ)-এর মত আনুগত্য, ইদরীস (আঃসাঃ)-এর মত দৃঢ়তা, ইবরাহীম (আঃসাঃ)-এর মত আন্তরিকতা এবং মুহাম্মদ ﷺ-এর মত চরিত্র থাকে। তারপরও যদি তার অন্তরে গাইরুল্লাহর প্রতি বিন্দু পরিমাণ আস্থা থাকে, তাহলে এসব গুণ আল্লাহ্‌র কোনো প্রয়োজন নেই।

সুফিয়ান সাওরী (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেছেন- আল্লাহ ছাড়া যেহেতু সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে তাই আমি তাকে ছাড়া আর কিছুই চাই না। তিনি আরও বলেছেন, আল্লাহর নবী ঈসা (আঃসাঃ) বলতেনঃ ‘কেউ যদি রোযা রাখে সে যেন তার দাড়ি এবং ঠোটে কিছু তেল মাখিয়ে নেয়, যেন অন্যেরা বুঝতে না পারে যে, সে রোযা রেখেছে। কেউ কিছু দান করিতে চাইলে সে যেন এমনভাবে দান করে যাতে তার বাম হাতও টের না পায়। আর যদি কেউ (নফল) নামায পড়তে চায় সে যেন তার ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়। আল্লাহ যেভাবে রিযিক বণ্টন করে থাকেন তেমনিভাবে প্রশংসা এবং মর্যাদাও বণ্টন করেন।

যিনুন মিসরী বলেছেন- ‘অনেক উলামা বলেন, ইখলাস (আন্তরিকতা) বান্দাকে আল্লাহর ভালবাসার গভীরতম স্থানে পৌছে দেয় যা সে নিজেও বুঝে না।

ইমাম মালিক ইবনি আনাস (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেছেন, একবার আমার শিক্ষক রবী’আ আর-রাঈ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে মালিক! বলতো সবচেয়ে নিকষ্ট ব্যক্তি কে? বললাম- যে ব্যক্তি তার দীনকে (বিক্রি করে) খায়। তখন আবার জিজ্ঞেস করলেন- এবার বলতো নিকৃষ্টদের মধ্যে নিকৃষ্ট কে? আমি বললাম- যে পার্থিব সুখ স্বাচ্ছন্দের জন্য তার দীনকে বিপর্যস্ত করে দেয়। তিনি বললেন- তুমি ঠিকই বলেছে।’

ইবনিল আরাবী (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেছেন- সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সেই ব্যক্তি, যে লোক দেখানো সৎ সাজে এবং মানুষকে দেখাবার জন্য কাজ করে। অথচ সে বুঝে না আল্লাহ ছাড়া আর কেউই তার অত্যন্ত কাছে থাকে না। আলিমগণ বলেছেন- মুমিনরা আল্লাহকে ভয় করে আর মুনাফিকরা ভয় করে শাসককে এবং লোক দেখানোর জন্য কাজ করে।

{১}. সুরা আল বাইয়্যিনাহ, আয়াত : ৫।

{২}. সুরা আশ শূরা, আয়াত : ২০।

{৩}. সুরা হূদ, আয়াত : ১৫, ১৬।

{৪}. সুরা আল কাহফ, আয়াত : ১১০।

{৫}. ইমাম বাইহাকী।

শাখা-৪৬. সৎ কাজে আনন্দ ও অসৎ কাজে মর্মপীড়া অনুভব করা

উমার ইবনুল খাত্তাব (রাদি.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীস ইমাম আবু দাউদ তাঁর সুনানে সংকলন করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, নবী করীম ﷺ বলেছেন,

যে ব্যক্তি সৎ কাজে আনন্দ পায় এবং মন্দ কাজে মর্মপীড়া অনুভব করে সে মুমিন।

শাখা-৪৭. গুনাহ্‌র চিকিৎসা : তাওবা।

আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন,

وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

“হে মুমিনগণ! তোমরা সকলে মিলে আল্লাহর কাছে তাওবা কর। আশা করা যায় তোমরা কল্যাণ লাভ করবে।{১}

অন্য জায়গায় বলা হয়েছে,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَّصُوحًا

“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর কাছে তাওবা কর, খাঁটি ও সত্যিকার তাওবা।{২}

সুরা আয যুমারে বলা হয়েছে,

وَأَنِيبُوا إِلَىٰ رَبِّكُمْ وَأَسْلِمُوا لَهُ مِن قَبْلِ أَن يَأْتِيَكُمُ الْعَذَابُ

‘ফিরে এসো তোমার প্রতিপালকের দিকে এবং তাঁর অনুগত হও, তোমাদের উপর আযাব আসার আগে।{৩}

রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

‘আমার অন্তরও মাঝে মাঝে ভারাক্রান্ত হয়ে যায়। আমি আল্লাহর কাছে প্রতিদিন একশ’বার তাওবা করে থাকি।{৪}

{১}. সুরা আন নূর, আয়াত : ৩১।

{২}. সুরা আত তাহরীম, আয়াত : ৮।

কাতাদা (র) বলেছেন- নাসূহা অর্থ খাটি ও আন্তরিক

তাওবা। নুমান ইবনু বশীর আমীরুল মুমিনীন উমার ইবনুল খাত্তাব (রাদি.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন- তাওবাতান নাসূহা কী? জবাবে তিনি বলেছিলেন- মানুষ কোনো অন্যায় করার পর এমনভাবে তাওবা করবে যাতে সেই অন্যায়ের আর পুনরাবৃত্তি না ঘটে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন- ‘কোনো অপরাধী যদি (উপরিউক্তভাবে) তাওবা করে তাহলে তাকে এমনভাবে মাফ করে দেয়া হয় তার আর কোনো গুনাহ্ অবশিষ্ট থাকে না।

{৩}. সুরা আয যু

মার, আয়াত : ৫৪।

{৪}. সহিহ মুসলিম; সুনানু আবু দাউদ।

শাখা-৪৮. আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য কুরবানী ও আত্মত্যাগ

আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেছেন

فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ

‘আপনার প্রতিপালকের জন্য নামায পড়ুন এবং কুরবানী করুন।{১}

সুরা আল হাজ্জে বলা হয়েছে,

وَالْبُدْنَ جَعَلْنَاهَا لَكُم مِّن شَعَائِرِ اللَّهِ لَكُمْ فِيهَا خَيْرٌ

আর কুরবানীর জন্য নির্দিষ্ট উটগুলোতে আমরা তোমাদের জন্য আল্লাহর নিদর্শনসমূহের মধ্যে গণ্য করেছি। এতে বিপুল কল্যাণ নিহিত রয়েছে।{২}

এই সুরার অন্য আয়াতে বলা হয়েছে,

وَمَن يُعَظِّمْ شَعَائِرَ اللَّهِ فَإِنَّهَا مِن تَقْوَى الْقُلُوبِ

“যে ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শনসমূহের সম্মান করে, তা মূলত অন্তরের তাকওয়া হতেই হয়ে থাকে।{৩}

সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে আনাস ইবনু মালিক (রাদি.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-কে শিংওয়ালা সাদা দুটো মেষ কুরবানী করতে দেখেছি। তিনি মেষের পাঁজরে হাঁটু রেখে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে নিজ হাতে কুরবানী করেছেন।{৪}

{১}. সুরা আল কাউছার, আয়াত : ২।

{২}. সুরা আল হাজ্জ, আয়াত : ৩৬।

{৩}. সুরা আল হাজ্জ, আয়াত : ৩২।

{৪}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম।

শাখা-৪৯. নেতার আনুগত্য করা

নেতার আনুগত্য করাও ঈমানের অন্যতম দাবী। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন,

أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ

তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর এবং তোমাদের মধ্যে যারা নির্দেশ দেবার অধিকারী তাদের আনুগত্য কর।{১}

আবু হুরাইরা (রাদি.) থেকে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করলো সে প্রকারান্তরে আল্লাহর আনুগত্য করলো, তেমনিভাবে যে আমার অবাধ্য হলো সে যেন আল্লাহর অবাধ্য হলো। আর যে আমীরের আনুগত্য করলো সে যেন আমারই আনুগত্য করলো, যে ব্যক্তি আমীরের অবাধ্য হলো সে প্রকারান্তরে আমারই অবাধ্য হলো।{২}

আবু যার (রাদি.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ ﷺ তাকে লক্ষ্য করে বলেছেন,

হে আবু যার! শুনবে এবং মানবে। যদি কালো কুৎসিত এবং এবড়ো থেবড়ো মাথাবিশিষ্ট হাবশী (তোমাদের নেতা) হয় তবু।{৩}

{১}. সুরা আন নিসা, আয়াত : ৫৯।

{২}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম।

{৩}. ইমাম বাইহাকী নিজস্ব সনদে।

শাখা-৫০. জামাআতবদ্ধ জীবন যাপন

আল্লাহ্ সুবহানাহু তাআলা ইরশাদ করেন

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا

‘তোমরা দৃঢ়ভাবে আল্লাহ্‌র রশিকে আঁকড়ে ধর, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।{১}

আবু হুরাইরা (রাদি.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

“যে ব্যক্তি জামা’আত থেকে বিচ্ছিন্ন হলো এবং আনুগত্য পরিহার করলো অতপর মারা গেল, তার মৃত্যু হলো জাহেলিয়াতের মৃত্যু।{২}

আরফাজা ইবনু শুরাইহ্ আল জুহানী (রাদি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

‘আমার পরে যে ব্যক্তি উম্মতে মুহাম্মাদীর ঐক্য-সংহতি বিনষ্ট করতে চাবে এবং জামা’আতকে ছিন্নভিন্ন করতে চাবে তাকে তোমরা হত্যা করবে।{৩}

{১}. সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১০৩।

{২}. সহিহ মুসলিম।

{৩}. সহিহ মুসলিম, ইমারাহ্ (নেতৃত্ব) অধ্যায়।

শাখা-৫১. আদল-ইনসাফের সাথে বিচার-ফায়সালা করা

আদল-ইনসাফের সাথে বিচার-ফায়সালা করাও ঈমানের অন্যতম শাখা। আল্লাহ্ সুবহানাহু তাআলা বলেন,

وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ النَّاسِ أَن تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ

‘তোমরা যখন লোকদের মধ্যে বিচার-ফায়সালা করবে তখন আদল-ইনসাফের সাথে করবে।{১}

আরেক জায়গায় বলা হয়েছে,

وَلَا تَكُن لِّلْخَائِنِينَ خَصِيمًا

(হে নবী!) আপনি খিয়ানতকারী ও দুর্নীতিপরায়ণ লোকদের সমর্থনে বিতর্ককারী হবেন না।{২}

সুরা আল হুজুরাতে বলা হয়েছে,

وَأَقْسِطُوا ۖ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ

‘তোমরা ইনসাফ কর। আল্লাহ ইনসাফকারী লোকদেরকেই পছন্দ করেন।{৩}

আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রাদি.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

‘দুই ব্যক্তি ছাড়া আর কারও ব্যাপারে ঈর্ষা করা যায় না। এক. যাকে আল্লাহ্ ধন-সম্পদ দান করেছেন এবং তা যথার্থ ক্ষেত্রে ব্যয় করার তাওফিক দিয়েছেন। দুই, যাকে আল্লাহ্ হিকমাত দান করেছেন, সেই ব্যক্তি তদানুযায়ী কাজ করে এবং অন্যকে তা শিক্ষা দেয়।{৪}

{১}. সুরা আন নিসা, আয়াত : ৫৮।

{২}. সুরা আন নিসা, আয়াত : ১০৫।

{৩}. সুরা আল হুজুরাত, আয়াত : ৯।

{৪}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম।

শাখা-৫২. সৎ কাজের আদেশ এবং অন্যায়ের নিষেধ

আল্লাহ্ সুবহানাহু তাআলা বলেছেন,

وَلْتَكُن مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ ۚ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ

তোমাদের মধ্যে এমন একদল লোক থাকতেই হবে যারা সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অন্যায় কাজে নিষেধ করবে। তারাই সত্যিকারের সফল।{১}

আরও বলা হয়েছে,

كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ

‘তোমরাই উত্তম উম্মাত, মানুষের মধ্য থেকে বের করা হয়েছে, তোমাদের কাজ হচ্ছে) তোমরা সৎ কাজের আদেশ দিবে এবং অন্যায় কাজের নিষেধ করবে এবং সেই সাথে আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখবে।{২}

সুরা আত তাওবায় বলা হয়েছে,

إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَىٰ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُم بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ

‘অবশ্যই আল্লাহ মুমিনদের জান মাল জান্নাতের বিনিময়ে কিনে নিয়েছেন।”{৩}

সমাজ ও রাষ্ট্রকে পরিচ্ছন্ন ও পঙ্কিলতামুক্ত রাখতে এ কাজ অপরিহার্য। বানী ইসরাঈল সম্প্রদায় এ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করার কারণে আল্লাহ্ তাদের নিন্দা করেছেন। বলা হয়েছে,

لُعِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِن بَنِي إِسْرَائِيلَ عَلَىٰ لِسَانِ دَاوُودَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ۚ ذَٰلِكَ بِمَا عَصَوا وَّكَانُوا يَعْتَدُونَ * كَانُوا لَا يَتَنَاهَوْنَ عَن مُّنكَرٍ فَعَلُوهُ ۚ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ

বানী ইসরাঈলের মধ্যে যারা কুফরী করেছে তাদের প্রতি দাউদ ও মারইয়াম পুত্র ঈসার মুখ দিয়ে অভিশাপ করা হয়েছে। কারণ তারা বিদ্রোহী হয়ে গিয়েছিল এবং খুব বাড়াবাড়ি শুরু করে দিয়েছিল। তারা একে অপরকে অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখার দায়িত্ব পালন করছিল না। যা তারা অবলম্বন করেছিল তা ছিলো অত্যন্ত খারাপ কর্মনীতি।{৪}

আবু সাঈদ খুদরী (রাদি.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

‘তোমাদের কেউ যখন কোনো অন্যায় কাজ দেখে সে যেন হাত দিয়ে (শক্তি প্রয়োগ করে) বন্ধ করে দেয়। যদি না পারে তাহলে যেন মুখ (এর কথা দিয়ে জনমত গঠন করে) বন্ধ করে দেয়। যদি তাও না পারে তবে মনে মনে ঘৃণা করবে। এটি হচ্ছে ঈমানের সবচেয়ে নিচের স্তর।{৫}

অন্য হাদীসে বলা হয়েছে, আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন,

‘আমার আগে কোনো জাতির কাছে যে নবীকেই পাঠানো হয়েছে, তার সহযোগিতার জন্য তাঁর উম্মাতের মধ্য থেকে একদল সাহায্যকারী সাথী থাকতো। তারা তার সুন্নাত (নিয়মনীতি)-কে আঁকড়ে ধরতো এবং তাঁর নির্দেশ মেনে চলতো। এদের পর এমন কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটলো, যারা বলতো ঠিকই কিন্তু তারা তা করতো না। এমন কাজ করতে যার নির্দেশ তাদেরকে দেয়া হয়নি। তাই এ ধরনের লোকদের বিরুদ্ধে যে হাত দিয়ে (অর্থাৎ শক্তি প্রয়োগ করে) জিহাদ (সংগ্রাম) করবে সে মুমিন। যে মুখ দিয়ে এদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবে সে মুমিন। যে অন্তর দিয়ে এদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবে সেও মুমিন। এরপর একটি সরিষা দানা পরিমাণ ঈমানের স্তরও আর নেই।{৬}

নবী করীম ﷺ-এর স্ত্রী যয়নাব (রাদি.) বলেছেন, একদিন রাসূল ﷺ ঘুম থেকে হঠাৎ জেগে উঠলেন। মলিন মুখ। তিনবার বললেন, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ তারপর বললেন- আরবদের জন্য ধ্বংস, দ্রুত মন্দ তাদের গ্রাস করতে আসছে। ইয়াজুজ মাজুজের দেয়াল আজ এতটুকু ছিদ্র করে ফেলেছে। একথা বলে তিনি বৃদ্ধাঙ্গুলী ও মধ্যমা গোল করে ধরে দেখালেন। একথা শুনে যয়নাব (রাদি.) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে এত সৎ লোক থাকার পরও কি আমরা ধ্বংস হয়ে যাব? তিনি বললেন- হ্যাঁ, যখন দুর্নীতির বিস্তৃতি ঘটবে।{৭}

{১}. সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১০৪।

{২}. সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১১০।

{৩}. সুরা আত তাওবা, আয়াত : ১১১।

{৪}. সুরা আল মায়িদা, আয়াত : ৭৮-৭৯।

{৫}. সহিহ মুসলিম।

{৬}. সহিহ মুসলিম, ইবন মাসউদ (রাদি.) কর্তৃক বর্ণিত।

{৭}. সহীহ্ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম।

শাখা-৫৩. সৎ কাজে পরস্পর সহযোগিতা করা

আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা ইরশাদ করেন

وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ

তাকওয়া ও নেক কাজে তোমরা পরস্পর একে অপরের সহযোগিতা করো। তবে পাপ ও সীমালংঘনমূলক কাজে পরস্পর সহযোগিতা করো না।{১}

আনাস ইবনু মালিক (রাদি.) থেকে সহীহ্ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

انصر أخاك ظالمًا أو مظلومًا، فقال رجل: يا رسول الله، أنصره مظلومًا فكيف انصره ظالمًا فقال: تمنعه من الظلم فذٰلك نصرك اياه

‘তোমার ভাইকে সাহায্য কর, সে যালিম (অত্যাচারী) হোক কিংবা মাযলুম (অত্যাচারিত)। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মাযলুমকে সাহায্য করার ব্যাপারটি তো বুঝলাম কিন্তু যালিমকে সাহায্য করব কিভাবে? রাসূল ﷺ বললেন, যুলম (অত্যাচার) থেকে বিরত রাখাই হচ্ছে যালিমকে সাহায্য করা।{২}

{১}. সুরা আল মায়িদা, আয়াত : ২।

{২}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম।

শাখা-৫৪. লজ্জাশীলতা

সালিম ইবনে আবদুল্লাহ্ ইবনে উমার (রাদি.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ ﷺ দেখলেন, এক ব্যক্তি তার ভাইকে লাজুক স্বভাবের জন্য তিরস্কার করছে, তিনি তাকে লক্ষ্য করে বললেন,

دعه فإن الحياء من الإيمان

‘তাকে ছেড়ে দাও। মনে রেখো লজ্জা ঈমানের অংশ।{১}

ইমরান ইবনে হুসাইন (রাদি.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন,

الْحَيَاءُ لاَ يَأْتِي إِلاَّ بِخَيْرٍ

‘লজ্জাশীলতা (শুধু) কল্যাণ ছাড়া আর কিছুই নিয়ে আসে না।”{২}

আবু সাঈদ খুদরী (রাদি.) বলেছেন,

রাসূলুল্লাহ্ ﷺ কুমারী মেয়ের চেয়েও লাজুক ছিলেন। যখন তিনি কোনো কিছু অপছন্দ করতেন তখন আমরা তাঁর চেহারা দেখেই বুঝতে পারতাম।{৩}

সহিহ আল বুখারীতে ইবনু মাসউদ (রাদি.) বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, নবী করীম ﷺ বলেছেন,

‘আগের নবীগণ মানুষকে শিষ্টাচার শেখানোর যেসব কথা বলতেন, তার প্রথম কথাই ছিলো- যদি তোমার শরমই না থাকে তাহলে তুমি যা খুশী তাই করতে পার।{৪}

{১}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ, মুসলিম।

{২}. বাইহাকী।

{৩}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম; বাইহাকী।

{৪}. সহীহ্ আল বুখারী।

শাখা-৫৫. মা-বাপের সাথে সদাচরণ

আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন,

وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا

বাপ মায়ের সাথে ইহসান{১} করো।{২}

وَوَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ إِحْسَانًا

‘আমি মানুষকে উপদেশ দিয়েছি তার বাপ-মায়ের সাথে ইহসান (সদাচরণ) করার জন্য।{৩}

সুরা বানী ইসরাঈলে বলা হয়েছে,

وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا ۚ إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا * وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُل رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا

‘তোমার রব (প্রতিপালক) ফায়সালা করে দিয়েছেন, তার ইবাদাত ছাড়া আর কারও ইবাদাত করা যাবে না। মা-বাবার সাথে ভালো ব্যবহার করবে। তোমাদের মাঝে যদি তাদের কোনো একজন কিংবা উভয়ে বৃদ্ধাবস্থায় থাকে তাহলে তুমি তাদেরকে উহ্ পর্যন্ত বলবে না। তাদেরকে তিরস্কার করবে না বরং তাদের সামনে বিশেষ মর্যাদার সাথে কথা বলবে। সারাক্ষণ বিনয় ও নম্রতার সাথে তাদের সামনে নত হয়ে থাকবে। আর এই দুআ করবে- হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি সেই রকম রহম করুন যেমন করে বাল্যকালে আমাকে প্রতিপালন করেছেন।{৪}

আবদুল্লাহ্ ইবনি মাসউদ (রাদি.) বলেছেন, আমি নবী করীম ﷺ-কে জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ!

‘আল্লাহর কাছে কোন কাজটি সবচেয়ে পছন্দনীয়? তিনি বললেন, সময় মত নামায পড়া। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, তারপর কোনটি? তিনি বললেন- বাপ মায়ের সাথে ভালো ব্যবহার করা। আমি বললাম, তারপর কোনটি? তিনি বললেন- আল্লাহর পথে জিহাদ।{৫}

{১}. আদল আর ইহসান প্রায় কাছাকাছি অর্থবোধক শব্দ। আদল অর্থ যে যেটুকু পাবার অধিকারী তাকে যথাযথভাবে সেটুকু পাওনা বুঝিয়ে দেয়া। আর ইহসান অর্থ পাওনাদার কিংবা হকদারকে তার অধিকারের চেয়ে কিছু বেশী দেয়া। -অনুবাদক

{২}. সুরা আল বাকারা, আয়াত : ৮৩; সুরা আন নিসা, আয়াত : ৩৬; সুরা আল আনআম, আয়াত : ১৫১।

{৩}. সুরা আহকাফ, আয়াত : ১৫।

শাখা-৫৬. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা

আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেছেন,

فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِن تَوَلَّيْتُمْ أَن تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ * أُولَٰئِكَ الَّذِينَ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فَأَصَمَّهُمْ وَأَعْمَىٰ أَبْصَارَهُمْ

‘তোমাদের কাছে এর চেয়ে বেশী কিছু আশা করা যায় কি, তোমরা (ক্ষমতা পাওয়ার পর) মুখ ফিরিয়ে নেবে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করার জন্য এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে। এদের প্রতিই আল্লাহর লানত, তাদেরকেই আল্লাহ অন্ধ ও বধির করে দিয়েছেন।{১}

অন্যত্র বলা হয়েছে,

الَّذِينَ يَنقُضُونَ عَهْدَ اللَّهِ مِن بَعْدِ مِيثَاقِهِ وَيَقْطَعُونَ مَا أَمَرَ اللَّهُ بِهِ أَن يُوصَلَ وَيُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ ۚ أُولَٰئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ

‘(বিপথগামী তো তারা) যারা আল্লাহর সাথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে এবং যা অবিচ্ছিন্ন রাখার নির্দেশ দিয়েছেন তা ছিন্ন করে আর পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়ায়। প্রকৃতপক্ষে ওরাই ক্ষগ্রিস্ত।{২}

আনাস ইবনি মালিক (রাদি.) হতে বর্ণিত। রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

“যে ব্যক্তি চায়- তার রিযিকের প্রশস্ততা হোক এবং আয়ু বেড়ে যাক তার উচিত আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখা।{৩}

যুবাইর ইবনি মুতয়িম (রাদি.) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”{৪}

{১}. সুরা মুহাম্মাদ, আয়াত : ২২, ২৩।

{২}. সুরা আল বাকারা, আয়াত : ২৭।

{৩}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম।

{৪}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসিলম।

শাখা-৫৭. সচ্চরিত্র

ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণ এবং বিনয়ের সবগুলো দিকই সচ্চরিত্রের অন্তর্ভুক্ত। আর সচ্চরিত্র ঈমানের অন্যতম শাখা। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেছেন,

وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ

“হে রাসুল! আমি আপনাকে সর্বোচ্চ চরিত্র মাধুর্য দিয়ে সৃষ্টি করেছি।”{১}

অন্য জায়গায় বলা হয়েছে,

وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ ۗ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ

যারা ক্রোধকে হজম করে এবং অন্যদের মাফ করে দেয় আল্লাহ এ ধরনের নেক লোকদেরই ভালোবাসেন।{২}

আবদুল্লাহ্ ইবনি আমর (রাদি.) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ ﷺ অশ্লীলভাষী এবং নির্লজ্জ ছিলেন না। বরং তিনি বলতেন,

مِنْ خِيَارِكُمْ أَحْسَنَكُمْ أَخْلَاقًا

তোমাদের মধ্যে উত্তম সেই ব্যক্তি যে সচ্চরিত্রবান।{৩}

অন্য বর্ণনায় আছে,

إن أحبكم إلي أحاسنكم أخلاقا

‘তোমাদের মধ্যে যে সচ্চরিত্রবান সেই আমার কাছে বেশী প্রিয়।

আয়িশা (রাদি.) হতে বর্ণিত।

রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-কে দুটো বিষয়ের কোনো একটি গ্রহণের সুযোগ দিলে এবং তা গুনাহ্র বিষয় না হলে, তিনি সর্বদা অপেক্ষাকৃত সহজটিকে গ্রহণ করিতেন। আর যদি তা গুনাহর বিষয় হতো তবে সকলের চেয়ে তিনি আরও বেশী দূরে অবস্থান করিতেন। তিনি ব্যক্তিগত ব্যাপারে কখনও কারও থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। তবে আল্লাহর বিধান লংঘিত হলে তিনি শুধু মহান আল্লাহর (সন্তুষ্টির) জন্যই প্রতিশোধ গ্রহণ করিতেন।{৪}

(আবু বকর আল বাইহাকী বলেন) সচ্চরিত্র বলতে মূলত আত্মার বিশুদ্ধতা বুঝানো হয়েছে। প্রশংসনীয় কাজ করা, সবকিছু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা এসব সচ্চরিত্রেরই বহিঃপ্রকাশ। সচ্চরিত্রের বিনিময়ে আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা তার অন্তরকে সৎ কাজের জন্য খুলে দেন। অসৎ কাজ থেকে হিফাযত করেন। তখন সে আল্লাহর নির্দেশ মেনে আনন্দ পায়, নফল ইবাদাতের প্রতি উৎসাহ বোধ করে। হারাম কাজ তো দূরের কথা মুবাহ্ কাজও সে পরিহার করে চলতে সচেষ্ট হয়। যখন দেখে আল্লাহর বান্দারা তার ইবাদাতের পথ ভুলে বিপথে চলে যাচ্ছে তখন তাদরেকে সতর্ক করে এবং সুসংবাদ দেয়। আল্লাহ ছাড়া আর কারও কাছে প্রার্থনা করে না, কিছু চায় না।

অন্যের প্রয়োজন পূরণ করিতে সদা সচেষ্ট থাকে। অসুখ বিসুখে দেখা শুনা করে। সফরে যেতে কিংবা সফর থেকে ফিরে আসতে সে তার সঙ্গী সাথীকে ফেলে আসে না। মোটকথা ব্যক্তি জীবনে, সামাজিক জীবনে এবং পারিবারিক জীবনে সর্বদা সে আল্লাহর সন্তুষ্টি মত চলার চেষ্টা করে। সচ্চরিত্রের কিছু কিছু বিষয় মানুষ জন্মগতভাবেই পেয়ে থাকে আবার অনেক বিষয় চেষ্টা সাধনার মাধ্যমে অর্জন করিতে হয়। এ অর্জনের উপায় দুটো। এক, ইল্ম বা জ্ঞান অর্জন করা এবং দুই. সেই ইলম অনুযায়ী আমল বা কাজ করা।

{১}. সুরা আল কলম, আয়াত : ৪।

{২}. সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৩৪।

{৩}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম।

{৪}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম।

শাখা-৫৮. অধীনস্থদের সাথে সদাচরণ

আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেছেন

وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا ۖ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ

‘তোমরা আল্লাহর ইবাদাত করো। তার সাথে আর কাউকে অংশীদার মনে করো না। পিতামাতার সাথে সদাচরণ করো, নিকটাত্মীয়, ইয়াতিম, মিসকীনদের প্রতিও। প্রতিবেশী আত্মীয়ের প্রতি এবং আত্মীয়ের প্রতিবেশীর প্রতি, চলার সাথী এবং পথিকের প্রতি, সেইসাথে তোমাদের অধীনস্থ দাসদাসীর প্রতিও দয়া অনুগ্রহ প্রদর্শন করো।{১}

মারুর ইবনি সুয়াইদ (রাদি.) বলেছেন, আমি আবু যার (রাদি.) ও তার এক ক্রীতদাসকে একই রকম পোশাক পরা দেখে কারণ জানতে চাইলাম। তিনি বললেন,

‘আমি একবার এক লোককে অবজ্ঞা করেছিলাম, সে আমার বিরুদ্ধে আল্লাহর রাসুল ﷺ-এর কাছে অভিযোগ করেছিলো। রাসুল ﷺ আমাকে ডেকে নিয়ে বললেন, তুমি কি তার মায়ের কারণে তাকে অবজ্ঞা করছো? আমি দেখছি তোমার ভেতর এখনও জাহেলিয়াত রয়ে গেছে। মনে রেখো তোমার ক্রীতদাস সেও তোমার ভাই, আল্লাহ তাকে তোমার অধীনস্থ করেছেন। তাই তুমি যা খাবে তোমার ভাইকেও তাই খেতে দেবে। তুমি যা পরবে তোমার ভাইকেও তাই পরাবে। তাকে দিয়ে সাধ্যের অতিরিক্ত কাজ করাবে না। যদি করাও তুমিও তার কাজে সাহায্য করবে।{২}

{১}. সুরা আন নিসা, আয়াত : ৩৬।

{২}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম।

শাখা-৫৯. ক্রীতদাসের উপর মনিবের অধিকার

আবদুল্লাহ্ ইবনি উমার (রাদি.) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

‘যে দাস তার মনিবের কল্যাণ কামনা করবে এবং সেই সাথে তার প্রতিপালকের ইবাদাত করবে তার জন্য দুটো পুরস্কার রয়েছে।{১}

জারীর ইবনি আবদুল্লাহ (রাদি.) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

‘যে দাস পালিয়ে যায় তার থেকে (আল্লাহ ও তার রাসূলের) যিম্মাদারী (দায়দায়িত্ব) শেষ হয়ে যায়।”{২}

অন্য হাদীসে বলা হয়েছে, রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

‘পলাতক দাস যতক্ষণ পর্যন্ত তার মনিবের কাছে ফিরে না আসবে ততক্ষণ তার নামায আল্লাহর কাছে কবুল হবে না।{৩}

{১}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম।

{২}. সহিহ মুসলিম, হাদীস-১৩৩।

{৩}. সুনানু আবু দাউদ।

 শাখা-৬০. সন্তান ও অধীনস্থদের অধিকার

সন্তান ও পরিবার পরিজনের নেতা হচ্ছে পুরুষ ব্যক্তিটি। তার কর্তব্য হচ্ছে অধীনস্থদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলার চেষ্টা করা, দ্বীনি নির্দেশনা মুতাবিক তাদের পরিচালনা করা এবং জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করা। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا

“হে ঈমানদারগণ! নিজেকে ও পরিবার পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।{১}

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান বসরী (রহ) বলেছেন, কর্তা ব্যক্তিটির উচিত তাদেরকে আল্লাহর নির্দেশ মত চলতে বলা এবং কল্যাণমূলক শিক্ষা দান করা। আলী (রাদি.) বলেছেন- তাদেরকে ইলম ও আদব কায়দা শিক্ষা দেয়া। আনাস (রাদি.) হতে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

“যে ব্যক্তি দুটো মেয়েকে বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়া পর্যন্ত প্রতিপালন করলো সে আর আমি কিয়ামতের দিন এ রকম হবো। একথা বলে তিনি তার আঙ্গুল মিলিয়ে দেখালেন।{২}

{১}. সুরা আত তাহরীম, আয়াত : ৬।

{২}. সহিহ মুসলিম।

শাখা-৬১. দীনি কারণে পরস্পর সম্পর্ক

দীনি সম্পর্ককে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করার জন্য পারস্পরিক মহব্বত, সালাম বিনিময়, মুসাফাহা ইত্যাদির প্রচলনের উপর জোর দেয়া হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّىٰ تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَىٰ أَهْلِهَا

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা বাড়ির মালিককে সালাম না দিয়ে এবং তার অনুমতি নিয়ে কারও ঘরে প্রবেশ করো না।{১}

আবু হুরাইরা (রাদি.) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

যার হাতে আমার প্রাণ তার শপথ! তোমরা জান্নাতে যেতে পারবে না যতক্ষণ মুমিন না হও। আবার (সত্যিকার) মুমিনও হতে পারবে না যতক্ষণ একে অপরকে ভালো না বাসবে। আমি কি তোমাদেরকে বলবো না, কোন্ জিনিস তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেবে? তা হচ্ছে একে অপরকে সালাম দেয়ার প্রচলন করা।{২}

সহিহ আল বুখারীতে বলা হয়েছে, একবার কাতাদা (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) আনাস (রাদি.)-কে জিজ্ঞেস করলেন,

নবী করীম ﷺ-এর সাহাবাগণ কি পরস্পর মুসাফাহা করিতেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, করিতেন।{৩}

আবু হুরাইরা (রাদি.) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

‘মহান আল্লাহ কিয়ামতের দিন বলবেন, আমার জন্য যারা একে অপরকে ভালবাসতো তারা কোথায়? আমি তাদেরকে আমার আরশের ছায়ায় স্থান দেবো। আমার ছায়া ছাড়া আজ আর কোনো ছায়া নেই।'{৪}

{১}. সুরা আন নূর, আয়াত : ২৭।

{২}. সহিহ মুসলিম।

{৩}. সহিহ মুসলিম।

{৪}. সহিহ মুসলিম।

শাখা-৬২. সালামের জবাব দেয়া

আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন

وَإِذَا حُيِّيتُم بِتَحِيَّةٍ فَحَيُّوا بِأَحْسَنَ مِنْهَا أَوْ رُدُّوهَا

কেউ যখন যথাযোগ্য সম্মানের সাথে তোমাদেরকে সালাম দেবে তোমরা আরও উত্তমভাবে তার জবাব দাও। অন্ততঃ অনুরূপভাবে তো দিতেই হবে।{১}

আবু সাঈদ আল খুদরী (রাদি.) হতে বর্ণিত। রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

তোমরা রাস্তার মধ্যে বসো না। সাহাবাগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! না বসে তো আমাদের চলে না, আমরা সেখানে বসে পরস্পর কথাবার্তা বলি। তখন রসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, ঠিক আছে রাস্তার পাশে যখন বসবেই তখন রাস্তার হক আদায় করবে। তারা জিজ্ঞেস করলেন, রাস্তার হক আবার কী? তিনি বললেন, দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, কারও কষ্টের কারণ না হওয়া (অর্থাৎ কাউকে বিরক্ত না করা), সালামের জবাব দেয়া, সৎ কাজের নির্দেশ এবং নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত রাখা।{২}

{১}. সুরা আন নিসা, আয়াত : ৮৬।

{২}. ইমাম বাইহাকী, নিজস্ব সনদে।

শাখা-৬৩. অসুস্থ ভাইয়ের খোঁজ খবর নেয়া

বারাআ ইবনি আযিব (রাদি.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ আমাদেরকে সাতটি কাজের নির্দেশ দিয়েছেন এবং সাতটি কাজ থেকে বিরত থাকতে বলেছেন,

তিনি আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, রোগীর খোঁজখবর নিতে, জানাযার সাথে যেতে, সালামের জবাব দিতে, হাঁচিদাতার হাঁচির জবাব দিতে, শপথ পূরণ করিতে, মযলুমের সাহায্য করিতে এবং দাওয়াত কবুল করিতে। আর নিষেধ করেছেন, সোনার আংটি, সোনা রূপার পাত্র ব্যবহার করিতে, মায়াসির (এক প্রকার নরম রেশমী কাপড়), কাসসী (রেশম মিশ্রিত মিসরী এক জাতীয় কাপড়) ব্যবহার করিতে, মিহি রেশমী কাপড়, মোটটা রেশমী কাপড় এবং খাঁটি রেশমের তৈরী কাপড় পরতে।{১}

ছাওবান (রাদি.) হতে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে

عائد المريض في خرفة الجنة حتى يرجع

‘যদি কেউ অসুস্থ কোনো ব্যক্তিকে দেখতে যায় সে ফিরে না আসা পর্যন্ত জান্নাতের ফল সগ্রহ করিতে থাকে।{২}

{১}. ২৪১. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম (হাদীস-৫২১৫); সুনানু আবু দাউদ।

{২}. সহিহ মুসলিম।

শাখা-৬৪. জানাযা ও দাফন কাফনে অংশগ্রহণ করা।

 শেয়ার ও অন্যান্য

আবু হুরাইরা (রাদি.) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, নবী করীম ﷺ বলেছেনঃ

এক মুসলিমের উপর আরেক মুসলিমের পাঁচটি হক (অধিকার) রয়েছে, সালামের জবাব দেয়া, রোগী দেখতে যাওয়া, হাঁচিদাতার হাঁচির দু’আর জবাব দেয়া, জানাযার সাথে চলা এবং দাওয়াত কবুল করা।{১}

ছাওবান (রাদি.) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, আল্লাহর রাসুল ﷺ বলেছেন,

যে ব্যক্তি জানাযার নামাযে অংশগ্রহণ করবে তার জন্য এক কীরাত আর যে দাফনেও শরীক হবে তার জন্য দুই কীরাত। এক কীরাত (নেকী) উহুদ পাহাড় সমতুল্য।{২}

{১}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম।

{২}. সহিহ মুসলিম।

শাখা-৬৫. হাঁচিদাতার হাঁচির জবাব দেয়া

আবু মূসা আশআরী (রাদি.) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

তোমাদের কেউ হাঁচি দিয়ে আলহামদু লিল্লাহ’ বললে তার জবাবে তোমরা ‘ইয়ারহামুকাল্লাহু’ বলবে আর যদি সে ‘আলহমাদু লিল্লাহ্’ না বলে তাহলে তোমরাও ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলবে না।

{১}. সহিহ মুসলিম।

শাখা-৬৬. কাফির মুশরিকদের সাথে বন্ধুত্ব না রাখা

কাফির মুশরিকদের সাথে বন্ধুত্ব না করাটাও ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেছেন,

لَّا يَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِن دُونِ الْمُؤْمِنِينَ ۖ وَمَن يَفْعَلْ ذَٰلِكَ فَلَيْسَ مِنَ اللَّهِ فِي شَيْءٍ إِلَّا أَن تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةً

মুমিনগণ যেন ঈমানদারদের পরিবর্তে কাফিরদেরকে নিজেদের বন্ধু ও পৃষ্ঠপোষক রূপে গ্রহণ না করে। যে এরূপ করবে তার সাথে আল্লাহর কোনও সম্পর্ক থাকবে। অবশ্য তাদের নির্যাতন থেকে বাচার জন্য এরূপ করলে আল্লাহ মাফ করবেন।{১}

অন্য জায়গায় কাফিরদের সাথে সম্পর্ক রাখা তো দূরের কথা তাদের সাথে সংগ্রাম চালিয়ে যাবার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে,

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ جَاهِدِ الْكُفَّارَ وَالْمُنَافِقِينَ وَاغْلُظْ عَلَيْهِمْ

‘হে নবী! কাফির এবং মুনাফিকদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যান, আর তাদের সম্পর্কে কঠোর নীতি অবলম্বন করুন।{২}

আরও বলা হয়েছে,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قَاتِلُوا الَّذِينَ يَلُونَكُم مِّنَ الْكُفَّارِ وَلْيَجِدُوا فِيكُمْ غِلْظَةً

“হে ঈমানদার লোকেরা! লড়াই করো সেইসব কাফিরদের বিরুদ্ধে যারা তোমাদের কাছাকাছি রয়েছে। তারা যেন তোমাদের মধ্যে দৃঢ়তা ও কঠোরতা দেখতে পায়।{৩}

সুরা আল মুমতাহিনা-এ বলা হয়েছে,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِم بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوا بِمَا جَاءَكُم مِّنَ الْحَقِّ يُخْرِجُونَ الرَّسُولَ وَإِيَّاكُمْ ۙ أَن تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ رَبِّكُمْ إِن كُنتُمْ خَرَجْتُمْ جِهَادًا فِي سَبِيلِي وَابْتِغَاءَ مَرْضَاتِي

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা যদি সংগ্রাম করার জন্য এবং আমার সন্তোষ লাভের আশায় বের হয়ে থাকো তাহলে আমার ও তোমাদের যারা শত্রু তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তোমরা তো তাদের সাথে বন্ধুত্ব করো কিন্তু যে সত্য তোমাদের কাছে এসেছে তা মেনে নিতে তারা অস্বীকার করেছে। রাসুল ও তোমাদের নির্বাসিত করার যে আচরণ তারা শুরু করেছে তা এজন্য যে, তোমরা তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহর উপর ঈমান এনেছে।{৪}

এতো গেল দূর সম্পর্কীয় কাফিরদের কথা। এবার বলা হয়েছে যাদের সাথে রক্তের বাঁধন রয়েছে তারাও যদি কুফরী করে, তাদের সাথে বন্ধুত্বসুলভ সম্পর্ক না রাখার জন্য। ইরশাদ হচ্ছে-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا آبَاءَكُمْ وَإِخْوَانَكُمْ أَوْلِيَاءَ إِنِ اسْتَحَبُّوا الْكُفْرَ عَلَى الْإِيمَانِ ۚ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

‘হে ঈমানদারেরা! নিজের পিতা এবং ভাইও যদি ঈমানের চেয়ে কুফরীকে বেশী ভালোবাসে তাদেরকেও বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। যে ব্যক্তিই এ ধরনের লোকদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে সেই যালিম হিসেবে গণ্য হবে।{৫}

আবু হুরাইরা (রাদি.) হতে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

‘তোমরা যদি রাস্তা চলার সময় কোনো মুশরিককে দেখ তাহলে প্রথমে তাদের সালাম দেবে না। বরং তাদেরকে রাস্তার এক পাশ দিয়ে চলতে বাধ্য করবে।{৬}

আবু সাঈদ (রাদি.) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, আল্লাহর রাসুল ﷺ বলেছেন,

মুত্তাকী ছাড়া কেউ যেন তোমার খাদ্য না খায় এবং ঈমানদার ছাড়া কেউ যেন তোমার সাথী না হয়।{৭}

{১}. সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ২৮।

{২}. সুরা আত তাওবা, আয়াত : ৭৩।

{৩}. সুরা আত তাওবা, আয়াত : ১২৩।

{৪}. সুরা আল মুমতাহিনা, আয়াত : ১।

{৫}. সুরা আত তাওবা, আয়াত : ২৩।

{৬}. সহিহ মুসলিম।

{৭}. হাফিয সুয়ূতী এ হাদীসটি জামিউস সগীর নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তাছাড়া ইমাম আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে হিব্বান এবং হাকিম স্ব স্ব গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।

শাখা-৬৭. প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ

আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেছেন,

وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنبِ وَابْنِ السَّبِيلِ

পিতা মাতার সাথে ভালো ব্যবহার করো, নিকটাত্মীয়, ইয়াতিম ও মিসকিনদের প্রতি এবং প্রতিবেশী আত্মীয়ের প্রতি, আত্মীয়ের প্রতিবেশীর প্রতি, চলার সাথী ও পথিক-মুসাফিরদের প্রতি।{১}

ইবনি আব্বাস (রাদি.), মুজাহিদ (রহমাতুল্লাহি আলাইহি), কাতাদা (রহমাতুল্লাহি আলাইহি), কালবী (রহমাতুল্লাহি আলাইহি), মুকাতিল ইবনি হিব্বান (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) এবং মুকাতিল ইবনি সুলাইমান (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) প্রমুখ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন

(وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَىٰ) বলতে তোমার ও অন্যান্য প্রতিবেশীর মধ্যে যে বা যারা অপেক্ষাকৃত কম দূরত্বে রয়েছে তাদেরকে বুঝানো হয়েছে। আর-

(وَالْجَارِ الْجُنُبِ) বলতে অপেক্ষাকৃত দূরের প্রতিবেশী বা প্রতিবেশীর প্রতিবেশীকে বুঝানো হয়েছে।

(وَالصَّاحِبِ بِالْجَنبِ) বলতে সফরসঙ্গী এবং বন্ধুকে বুঝানো হয়েছে।

আলী (রাদি.), আবদুল্লাহ ইবনি মাসউদ (রাদি.) এবং ইবরাহীম নখঈ (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেছেন, (وَالصَّاحِبِ بِالْجَنبِ) বলতে স্ত্রীকে বুঝানো হয়েছে। সাঈদ ইবনি যুবাইর (রাদি.)-এর অভিমতও অনুরূপ।

আয়িশা (রাদি.) হতে বর্ণিত। রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন

“জিবরীল এসে আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে এমন উপদেশ দিতে থাকলেন, ভাবলাম হয়তো তিনি প্রতিবেশীকে ওয়ারিশ বানিয়ে দেবেন।”{২}

{১}. সুরা আন নিসা, আয়াত : ৩৬।

{২}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম।

শাখা-৬৮. অতিথি আপ্যায়ন/মেহমানদারী

আবু শুরাইহ আল আদাবী (রাদি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল ﷺ যখন এ হাদীসটি বলেছেন তখন আমার দু’কান তা শুনেছে এবং দু’চোখ তা দেখেছে। তিনি বলেছেন-

‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে তার উচিত সাধ্যমত অতিথি আপ্যায়ন করা। লোকেরা জিজ্ঞেস করলো, সাধ্যমত কথার তাৎপর্য কী? তিনি বললেন, একদিন একরাত। মেহমানদারী সর্বোচ্চ তিন দিন। এর বেশী যদি কেউ করে সেটি তার বদান্যতা। তিনি আরও বললেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে তার উচিত ভালো কথা বলা অথবা চুপ থাকা।{১}

{১}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম।

শাখা-৬৯. দোষ গোপন রাখা

আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন,

إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَن تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ

যারা চায় ঈমানদারদের মধ্যে নির্লজ্জতা বিস্তার লাভ করুক তারা দুনিয়া ও আখিরাতে কঠিন শাস্তি পাওয়ার যোগ্য।{১}

ইবনি উমার (রাদি.) হতে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, আল্লাহর রাসুল ﷺ বলেছেন,

এক মুসলমান আরেক মুসলমানের ভাই। সে না তার উপর যুলম করিতে পারে আর না তাকে শক্রর হাতে তুলে দিতে পারে। যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণে সচেষ্ট হয় আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করে দেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের একটি কষ্ট দূর করে দেয় এর বিনিময়ে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার কষ্টসমূহ থেকে একটি কষ্ট দূর করে দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দোষ গোপন করে রাখবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন।{২}

{১}. সুরা আন নূর, আয়াত : ১৯।

{২}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম।

শাখা-৭০. বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করা

আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন,

وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ ۚ وَإِنَّهَا لَكَبِيرَةٌ إِلَّا عَلَى الْخَاشِعِينَ

‘তোমরা নামায ও ধৈর্যের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা কর। তবে কাজটি বেশ কঠিন কিন্তু যারা আল্লাহর জন্য নিবেদিতপ্রাণ তাদের জন্য অবশ্য কঠিন নয়।{১}

আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা আরও বলেন,

وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ أُولَٰئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ ۖ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ

যারা ধৈর্য ধরে সুসংবাদ তাদের জন্য। যখন তাদের উপর কোনো মুসিবত আসে তখন তারা বলে- আমরা আল্লাহর জন্য এবং তার দিকেই আমাদের ফিরে যেতে হবে। তাদের প্রতি তাদের রবের পক্ষ থেকে বিপুল অনুগ্রহ বর্ষিত হবে এবং রহমত। প্রকৃতপক্ষে এরাই সঠিক পথে রয়েছে।{২}

সুরা আয যুমারে বলা হয়েছে,

إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ

যারা ধৈর্যশীল তাদের জন্য রয়েছে এমন বিনিময় যার কোনো হিসেবই নেই।{৩}

সহিহ আল বুখারী ও সহিহ মুসলিমে আবু সাঈদ আল খুদরী (রাদি.) হতে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে,

আনসারদের কতিপয় লোক রাসুল ﷺ-এর কাছে সাহায্য চাইলো, তিনি তাদেরকে দিলেন। তারা আবার চাইলো, তিনি আবার তাদেরকে দিলেন। এমনকি তার কাছে যা ছিলো সবই শেষ হয়ে গেল। সবকিছু দান করার পর তিনি তাদেরকে বললেন- যা আসে তা আমি তোমাদেরকে না দিয়ে জমা করে রাখি। যে পবিত্র থাকতে চায় আল্লাহ তাকে পবিত্র রাখেন। যে ব্যক্তি কারও মুখাপেক্ষী হতে চায় না, আল্লাহ তাকে স্বাবলম্বী করে দেন। যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করিতে চায় আল্লাহ তাকে ধৈর্য দান করেন। ধৈর্যের চেয়ে উত্তম আর প্রশস্ত কোনো কিছু কাউকে দেয়া হয়নি।{৪}

আবদুল্লাহ্ ইবনি মাসউদ (রাদি.) বলেছেন,

‘একবার আমি রসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে গেলাম। দেখলাম, তিনি ভীষণ অসুস্থ। বললাম, আমার মনে হয় আপনার অসুস্থতা দু’জনের সমান। তিনি স্বীকার করলেন এবং বললেন, আশা করি আমি এজন্য দ্বিগুন পুরস্কার পাবো। তারপর বললেন, কোনো মুসলিমের উপর বিপদ মুসিবত কিংবা অসুস্থতা তার গুনাহ্ মাফের কারণ ছাড়া আসে না। গাছের শুকনো পাতা যেমন ঝরে যায় তেমনিভাবে মুমিনের কষ্টের কারণে তার গুনাহগুলোও ঝরে যায়।{৫}

{১}. সুরা বাকারা, আয়াত ৪৫।

{২}. সুরা আল বাকারা, আয়াত : ১৫৫, ১৫৬, ১৫৭।

{৩}. সুরা আয যুমার, আয়াত : ১০।

{৪}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম।

{৫}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম।

শাখা-৭১. দুনিয়ার মোহমুক্তি (যুহুদ) ও পরিমিত আশা

দুনিয়ার নশ্বরতা সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেছেন,

فَهَلْ يَنظُرُونَ إِلَّا السَّاعَةَ أَن تَأْتِيَهُم بَغْتَةً ۖ فَقَدْ جَاءَ أَشْرَاطُهَا

এরা কি শুধু কিয়ামতের অপেক্ষায় রয়েছে যে, সহসা তা তাদের উপর এসে পড়বে? তার নিদর্শন তো এসেই পড়েছে।{১}

আনাস ইবনি মালিক এবং সাহল ইবনি সা’দ (রাদি.) হতে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

‘আমি এবং কিয়ামত এরূপ দূরত্বে, একথা বলে তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙ্গুল দুটো একত্রিত করে দেখালেন।”{২}

রাসূলুল্লাহ্ ﷺ আর বলেছেন,

‘আল্লাহ প্রদত্ত দুটো নিয়ামাত অধিকাংশ মানুষকেই বিভ্রান্ত করে ছাড়ে। একটি সুস্বাস্থ্য বা সুস্থতা অপরটি অবকাশ।{৩}

আবু সাঈদ (রাদি.) হতে বর্ণিত। নবী করীম ﷺ বলেছেন,

নিঃসন্দেহে দুনিয়া খুবই আকর্ষণীয় ও সবুজ শ্যামল। আল্লাহ তোমাদেরকে প্রতিনিধি বানিয়ে এখানে পাঠিয়েছেন। তিনি দেখতে চান তোমরা কী করো। কাজেই তোমরা দুনিয়া এবং নারীদের ব্যাপারে সতর্ক থাকো। বানী ইসরাঈলের বিপর্যয় শুরুই হয়েছিলো নারী দিয়ে।{৪}

{১}. সুরা মুহাম্মাদ, আয়াত : ১৮।

{২}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম।

{৩}. সহিহ আল বুখারী; জামি আত তিরমিযী; নাসাঈ, ইবনি মাজাহ।

{৪}. সহিহ মুসলিম।

শাখা-৭২. আত্মসম্মানবোধ

আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ

“হে ঈমানদারগণ! নিজে বাঁচো এবং অধীনস্থদের বাঁচাও সেই আগুন থেকে যার জ্বালানী হবে মানুষ ও পাথর।{১}

সুরা আন নূরে বলা হয়েছে,

وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ

‘হে নবী! আপনি মুমিন মহিলাদের বলে দিন তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে।{২}

আবু হুরাইরা (রাদি.) হতে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

আল্লাহ্‌রও আত্মসম্মানবোধ আছে এবং মুমিনেরও আত্মসম্মানবোধ রয়েছে। আল্লাহর আত্মসম্মানে তখনই বাধে যখন একজন মুমিন এমন কাজে লিপ্ত হয় যা তিনি হারাম করেছেন।{৩}

উম্মু সালামা (রাদি.) হতে বর্ণিত আরেক হাদীসে বলা হয়েছে,

রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বাড়িতে থাকা অবস্থায় একদিন এক নপুংসক (হিজড়া) বাড়িতে এসেছিল (নপুংসক বিধায় সে অন্দর মহলেও প্রবেশ করতো)। সে উম্মু সালামার (রাদি.) ভাই আবদুল্লাহকে বললো, আগামীকাল যদি তায়েফ বিজয় হয় তাহলে তুমি গায়লানের কন্যাকে আয়ত্তে নেবে। তার এমন ফিগার যে পেটে চারটি ভাঁজ পড়ে। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ পরিবারকে বলে দিলেন, তোমরা আর কখনও তাকে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করিতে দেবে না।”{৪}

আবু সাঈদ আল খুদরী (রাদি.) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,

‘আত্মসম্মানবোধ সৃষ্টি হয় ঈমান থেকে আর লৌকিকতা সৃষ্টি হয় মুনাফিকী থেকে।{৫}

{১}. সুরা আত তাহরীম, আয়াত : ৬।

{২}. সুরা আন নূর, আয়াত : ৩১।

{৩}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম।

{৪}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম।

{৫}. বাইহাকী।

শাখা-৭৩. অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা পরিহার করা

আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেছেন,

قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ * الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ * وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ

মুমিনরা তো সফল হয়ে গেছে। তারা নামাযে বিনয়ী এবং অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা পরিহার করে চলে।{১}

অন্য জায়গায় বলা হয়েছে,

وَالَّذِينَ لَا يَشْهَدُونَ الزُّورَ وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا

আর তারা মিথ্যার সাক্ষী হয় না। কোনো অর্থহীন বিষয়ের কাছ দিয়ে অতিক্রম করলে ভদ্র মানুষের মতই অতিক্রম করে।{২}

সুরা আল কাসাস-এ বলা হয়েছে,

وَإِذَا سَمِعُوا اللَّغْوَ أَعْرَضُوا عَنْهُ

তারা যদি অর্থহীন কিছু শুনতে পায়, তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।”{৩}

আলী (রাদি.) হতে বর্ণিত। রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

ইসলামের সৌন্দর্য হচ্ছে একজন মুমিন অপ্রয়োজনীয় বিষয় পরিত্যাগ করবে।{৪}

{১}. সুরা আল মুমিনূন, আয়াত : ১, ২, ৩।

{২}. সুরা আল ফুরকান, আয়াত : ৭২।

{৩}. সুরা আল কাসাস, আয়াত : ৫৫।

{৪}. জামি আত তিরমিযী; সুনান ইবনি মাজাহ।

শাখা-৭৪. বদান্যতা ও দানশীলতা

আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেছেন,

وَسَارِعُوا إِلَىٰ مَغْفِرَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ * الَّذِينَ يُنفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ

“তোমরা আল্লাহ ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে দ্রুতগতিতে চল, যার বিস্তৃতি আসমান জমিনের। যা মূলত, মুত্তাকীদের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। যারা সচ্ছল বা অসচ্ছল উভয় অবস্থাতেই নিজেদের সম্পদ খরচ করে।{১}

অন্য জায়গায় বলা হয়েছে

لَّذِينَ يَبْخَلُونَ وَيَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبُخْلِ وَيَكْتُمُونَ مَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ ۗ وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا مُّهِينًا

তাদেরকেও আল্লাহ পসন্দ করেন না যারা নিজেরা কৃপণতা করে এবং অন্যদেরও কার্পণ্য করিতে বলে। আর আল্লাহ নিজ দয়ায় যা দান করেছেন তা লুকিয়ে রাখে। এরূপ অকৃতজ্ঞ লোকদের জন্য আমি অপমানজনক শাস্তির ব্যবস্থা করে রেখেছি।{২}

وَمَن يَبْخَلْ فَإِنَّمَا يَبْخَلُ عَن نَّفْسِهِ

যে কৃপণতা করে সে প্রকৃতপক্ষে নিজের সাথেই কৃপণতা করে।{৩}

সুরা আল হাশর-এ বলা হয়েছে,

وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ

যাদের অন্তর সংকীর্ণতা থেকে রক্ষা করা হয়েছে তারাই প্রকৃতপক্ষে সফল।”{৪}

আবু হুরাইরা (রাদি.) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, আল্লাহর রাসুল ﷺ বলেছেন,

‘প্রতিদিন দু’জন ফেরেশতা অবতীর্ণ হন। তাদের একজন বলতে থাকেন- হে আল্লাহ যিনি অন্যকে দান করেন আপনিও তাকে দান করুন। আর যে কৃপণতা করে আপনি তাকে দান করা থেকে বিরত থাকুন।{৫}

{১}. সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৩৩, ১৩৪।

{২}. সুরা আন নিসা, আয়াত : ৩৭।

{৩}. সুরা মুহাম্মাদ, আয়াত : ৩৮।

{৪}. সুরা আল হাশর, আয়াত : ৯; সুরা আত তাগাবুন, আয়াত : ১৬।

{৫}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম।

শাখা-৭৫. ছোটদের স্নেহ ও বড়োদের সম্মান করা

জারীর ইবনি আবদুল্লাহ্ (রাদি.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন

“যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি দয়ার্দ্র নয় আল্লাহ তার প্রতি দয়া করেন না।”{১}

আবু হুরাইরা (রাদি.) বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, নবী করীম ﷺ বলেছেন,

‘আল্লাহ তাআলা দয়াকে একশ’ ভাগে ভাগ করে নিরানব্বই ভাগ নিজের জন্য রেখে এক ভাগ গোটা সৃষ্টি জগতের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছেন। সেইটুকু দয়ার কারণেই ঘোড়া সতর্কতার সাথে তার পা রাখে যেন নবজাতক বাচ্চার উপরে গিয়ে তা না পড়ে।{২}

আবদুল্লাহ্ ইবনি আমর (রাদি.) হতে বর্ণিত, রাসূলে আকরাম ﷺ বলেছেন,

‘আমাদের মধ্যে যারা ছোট তাদের প্রতি যে দয়া করে না এবং আমাদের মধ্যে যারা বড়ো তাদেরকে যথাযথ সম্মান করে না সে আমাদের দলভুক্ত নয়।{৩}

অন্য হাদীসে ইমামত সম্পর্কে বলা হয়েছে,

‘তোমাদের মধ্যে যে বেশী বয়স্ক সেই ইমাম হবে।

{১}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম।

{২}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম।

{৩}. সহিহ মুসলিম; সুনানু আবু দাউদ।

শাখা-৭৬. পরস্পর সংশোধন

আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন,

لَّا خَيْرَ فِي كَثِيرٍ مِّن نَّجْوَاهُمْ إِلَّا مَنْ أَمَرَ بِصَدَقَةٍ أَوْ مَعْرُوفٍ أَوْ إِصْلَاحٍ بَيْنَ النَّاسِ ۚ وَمَن يَفْعَلْ ذَٰلِكَ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللَّهِ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا

‘লোকদের গোপন শলাপরামর্শে কোনো কল্যাণ থাকে না, তবে কেউ যদি কাউকে দান খয়রাতের উপদেশ দেয় কিংবা কোনো ভালো কাজের জন্য অথবা লোকদের পরস্পরের কাজকর্ম সংশোধনের নিমিত্তে কাউকে কিছু বলা হয় তা অবশ্যই ভালো কথা। আল্লাহ্‌র সন্তোষ লাভের জন্য যে এরূপ করবে আমরা তাকে খুব বড়ো প্রতিফল দেবো।{১}

আরেক জায়গায় বলা হয়েছে,

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ

মুমিনগণ তো পরস্পরের ভাই। অতএব তোমার ভাইদের পারস্পরিক সম্পর্ক যথাযথভাবে পুনর্গঠিত করে দাও।{২}

উম্মু কুলসুম বিনতু উকবা (রাদি.) বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-কে বলতে শুনেছি-

‘পরস্পরের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য কেউ যদি অসত্য কথাও বলে তবে সে মিথ্যেবাদী নয়।”{৩}

তিনি আরও বলেন, আমি কোনো বিষয়ে তাকে মিথ্যে বলার অনুমতি দিতে শুনিনি শুধু তিনটি ক্ষেত্র ছাড়া- ১. যুদ্ধের সময়, ২. পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য এবং ৩. স্ত্রীর মনোরঞ্জনের (কিংবা অভিমান ভাঙার) জন্য।{৪}

{১}. সুরা আন নিসা, আয়াত : ১১৪।

{২}. সুরা আল হুজুরাত, আয়াত : ১০।

{৩}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম।

{৪}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম।

শাখা-৭৭. নিজের যা পছন্দ অপরের জন্য তাই পছন্দ করা

নিজের জন্য যা পছন্দ অপরের জন্য তাই পছন্দ করা এবং যে জিনিস নিজের অপছন্দ অপরের জন্যও তা অপছন্দ করা, এমনকি কারও যাতে কষ্ট না হয় সেজন্য কষ্টদায়ক কোনো বস্তু রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়াও ঈমানের অন্যতম অংশ। আবু হুরাইরা (রাদি.) হতে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেনঃ

‘ঈমানের ষাটটি কিংবা সত্তরটি শাখা রয়েছে, তার মধ্যে সর্বোত্তম শাখা হচ্ছে ‘আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই’- একথার স্বীকৃতি দেয়া আর সর্বনিম্ন স্তরের শাখা হচ্ছে- রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা। লজ্জাও ঈমানের অংশ।{১}

আনাস (রাদি.) হতে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, আল্লাহর রাসুল ﷺ বলেছেন,

‘তোমরা ততক্ষণ মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ তোমার জন্য যা পছন্দ করো তোমার ভাইয়ের জন্যও তা পছন্দ না করবে।”{২}

জারীর ইবনি আবদুল্লাহ্ (রাদি.) বলেছেন,

‘আমরা নামায প্রতিষ্ঠা করবো, যাকাত আদায় করবো এবং প্রত্যেক মুসলিমের কল্যাণ কামনা করবো এই শর্তে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর কাছে বাইয়াত গ্রহণ করেছি।'{৩}

{১}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসলিম।

{২}. সহিহ আল বুখারী।

{৩}. সহিহ আল বুখারী; সহিহ মুসিলম।

বইটির PDF/ মুল কপি পেতে হলে নিচে Comment/ কমেন্ট এর মাধ্যমে আমাদেরকে জানান, তাহলে আমরা আপনাদেরকে পাঠিয়ে দিতে পারব। ইনশাআল্লাহ।

Leave a Reply