ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম – যাকাত – মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল-উসাইমীন

ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম – যাকাত – মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল-উসাইমীন

ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম – যাকাত – মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল-উসাইমীন

ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম-৩

যাকাত

শাইখ মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল-উসাইমীন

অনুবাদ: আব্দুল্লাহ শাহেদ আল-মাদানী

মুহাম্মাদ শাহেদ আল-কাফী

সম্পাদনা: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

সূচিপত্র

 

ক্রমবিষয়পৃষ্ঠা
 অধ্যায়: যাকাত 
 যাকাত আবশ্যক হওয়ার শর্তাবলী কী কী? 
 প্রতিমাসে প্রাপ্য বেতনের যাকাত কীভাবে প্রদান করতে হবে? 
 শিশু ও পাগলের সম্পদে কি যাকাত ওয়াজিব হবে? 
 প্রদত্ব ঋণের যাকাত আদায় করার বিধান কী? 
 মৃত ব্যক্তির ঋণ কি যাকাত থেকে পরিশোধ করা যাবে? 
 ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির সাদকা করা কি ঠিক হবে? … 
 জনৈক ব্যক্তি চার বছর যাকাত আদায় করে নি। এখন তার করণীয় কী? 
 বছরের অর্ধেক সময় পশু চারণ ভূমিতে চরে খেলে তাতে কি যাকাত দিতে হবে? 
 বাড়ী-ঘরের আশেপাশে ফলদার বৃক্ষের ফলে যাকাত 
 স্বর্ণ ও রৌপ্যের যাকাতের নিসাব কী? সা‘ এর পরিমাণ কত? 
 মেয়েদেরকে দেওয়া স্বর্ণ একত্রিত করলে নিসাব পরিমাণ হয়। একত্রিত না করলে নিসাব হয় না। করণীয় কী? 
 নিজের প্রদত্ব যাকাত থেকে গ্রহীতা যদি উপহারস্বরূপ কিছু প্রদান করে, তাহলে কি তা গ্রহণ করা যাবে? 
 সম্পদের যাকাতের পরিবর্তে কাপড় ইত্যাদি প্রদান করা কি জায়েয হবে? 
 স্বর্ণের সাথে মূল্যবান ধাতু হীরা প্রভৃতি থাকলে কীভাবে স্বর্ণের যাকাত দিবে? 
 যাকাতের অর্থ দ্বারা মসজিদ নির্মাণ করার বিধান কী?… 
 ভাড়া বা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহৃত গাড়ীতে কি যাকাত আবশ্যক? 
 ভাড়া দেওয়া হয়েছে এমন বাড়ীর যাকাত দেওয়ার বিধান কী? 
 বসবাসের উদ্দেশ্যে যমীন খরিদ করার পর তা দ্বারা ব্যবসা করার ইচ্ছা করলে তার যাকাত। 
 রামাযানের প্রথম দশকে ফিতরা আদায় করার বিধান কী? 
 সাদকার নিয়তে বেশি করে ফিতরা আদায় করা জায়েয হবে কি? 
 চাউল দ্বারা ফিতরা আদায় করা 
 মৃত ব্যক্তির অসীয়তকৃত সম্পদে এবং ইয়াতীমের সম্পদে যাকাত 
 ব্যক্তিগত গাড়ীতে কি যাকাত দিতে হবে? 
 যাকাত দেওয়ার সময় কি বলে দিতে হবে যে, এটা যাকাত? 
 এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাকাত স্থানান্তর করার বিধান কী? 
 অন্য স্থানে বসবাসকারী পরিবারের লোকদের ফিতরা আদায় করা 
 ঋণগ্রস্তের হাতে যাকাত দেওয়া উত্তম নাকি পাওনাদারের নিকট গিয়ে তার পক্ষ থেকে ঋণ পরিশোধ করা? 
 যারাই যাকাত গ্রহণের জন্য হাত বাড়ায় তারাই কি তার হকদার? 
 যাকাত বন্টনের কাজে নিযুক্ত ব্যক্তি যাকাতের হকদার নয়। 
 দুর্বল ঈমানের মানুষকে ঈমান শক্তিশালী করার জন্য যাকাত দেওয়া যাবে কী? 
 ইসলামী জ্ঞান শিক্ষায় নিয়োজিত ছাত্রকে যাকাত দেওয়ার বিধান কী? 
 মুজাহিদদেরকে যাকাত প্রদান করা কি জায়েয? 
 মসজিদ নির্মাণের কাজে যাকাত প্রদান করার বিধান কী? 
 নিকটাত্মীয়দের যাকাত প্রদান করার বিধান কী? 
 যাকাত-সাদকা আদায় করা কি শুধু রামাদান মাসের জন্যই বিশেষ? 
 সাদকায়ে জারিয়া কাকে বলে? 
 স্বামীর সম্পদ থেকে তার বিনা অনুমতিতে স্ত্রীর দান করা জায়েয নয় 
 বন্টনের জন্য যাকাত নিয়ে এসে নিজের কাছেই রেখে দেওয়া 

ভূমিকা

الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين وعلى آله وصحبه أجمعين ومن تبعهم بإحسان إلى يوم الدين، أما بعد:

আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহর নিকট মনোনিত দীন হচ্ছে ইসলাম।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯]

তিনি আরো বলেন, “যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দীন অনুসন্ধান করবে, তা তার নিকট থেকে গ্রহণ করা হবে না। আর সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৮৫]

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “দীন ইসলামের ভিত্তি হচ্ছে পাঁচটি বিষয়ের ওপর:

১) এ কথার স্বাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোনো উপাস্য নেই, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল।

২) সালাত প্রতিষ্ঠা করা।

৩) যাকাত প্রদান করা।

৪) মাহে রামাযানের সিয়াম পালন করা এবং

৫) সাধ্য থাকলে আল্লাহর ঘরের হজ পালন করা।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

ইসলামের এ পাঁচটি ভিত্তি সম্পর্কে মানুষের প্রশ্নের অন্ত নেই, জিজ্ঞাসার শেষ নেই। তাই নির্ভরযোগ্য প্রখ্যাত আলেমে দীন, যুগের অন্যতম সেরা গবেষক আল্লামা শাইখ মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল-উসাইমীন রহ. ঐ সকল জিজ্ঞাসার দলীল ভিত্তিক নির্ভরযোগ্য জবাব প্রদান করেছেন। প্রতিটি জবাব পবিত্র কুরআন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশুদ্ধ হাদীস ও পূর্বসূরী নির্ভরযোগ্য উলামাদের মতামত থেকে দেওয়া হয়েছে। সেই জবাবগুলোকে একত্রিত করে বই আকারে বিন্যস্ত করেছেন জনাব ‘ফাহাদ ইবন নাসের ইবন ইবরাহীম আল-সুলাইমান’। নাম দিয়েছেন ফাতওয়া আরকানুল ইসলাম। ইসলামী জ্ঞানের জগতে বইটি অত্যন্ত মূল্যবান হওয়ায় বাংলা ভাষায় আমরা তা অনুবাদ করার প্রয়োজন অনুভব করি। তাছাড়া বাংলা ভাষী মুসলিমদের জন্য এধরণের দলীল নির্ভর পুস্তকের খুবই অভাব। তাই বইটিকে সম্মানিত পাঠক-পাঠিকাদের হাতে তুলে দিতে পেরে আমরা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি জুবাইল দা‘ওয়া সেন্টারের দা‘ওয়া বিভাগের পরিচালক শাইখ খালেদ নাসের আল-উমাইরির। তিনি বইটি প্রকাশ করার ব্যাপারে যাবতীয় নির্দেশনা প্রদান করেছেন।

সুবিজ্ঞ পাঠক সমাজের প্রতি বিশেষ নিবেদন, কোনো প্রকার ভুল-ত্রুটি নজরে আসলে আমাদেরকে জানিয়ে বাধিত করবেন। যাতে করে পরবর্তী সংস্করণে তা সংশোধন করা যায়। হে আল্লাহ এ বইয়ের লেখক, অনুবাদক, সম্পাদক ও ছাপানোর কাজে সহযোগিতাকারী, তত্বাবধানকারী এবং পাঠক-পাঠিকাদের সবাইকে উত্তম বিনিময় দান কর। সকলকে মার্জনা কর এবং এ কাজটিকে তোমার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কবূল কর।

আব্দুল্লাহ শাহেদ আল-মাদানী

মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-কাফী

كتاب الزكاة

যাকাত অধ্যায়

প্রশ্ন: (৩৫৪) যাকাত ফরয হওয়ার শর্তাবলী কী কী?

উত্তর: যাকাত ফরয হওয়ার শর্তাবলী নিম্নরূপ:

ক) ইসলাম

খ) স্বাধীন

গ) নিসাবের মালিক হওয়া ও তা স্থীতিশীল থাকা।

ঘ) বছর পূর্ণ হওয়া।

ইসলাম :কাফিরের ওপর যাকাত ফরয নয়। যাকাতের নামে সে প্রদান করলেও আল্লাহ তা কবুল করবেন না। আল্লাহ বলেন,

﴿وَمَا مَنَعَهُمۡ أَن تُقۡبَلَ مِنۡهُمۡ نَفَقَٰتُهُمۡ إِلَّآ أَنَّهُمۡ كَفَرُواْ بِٱللَّهِ وَبِرَسُولِهِۦ وَلَا يَأۡتُونَ ٱلصَّلَوٰةَ إِلَّا وَهُمۡ كُسَالَىٰ وَلَا يُنفِقُونَ إِلَّا وَهُمۡ كَٰرِهُونَ ٥٤﴾ [التوبة: ٥٤] 

“তাদের সম্পদ ব্যয় শুধু মাত্র এ কারণে গ্রহণ করা হবে না যে, তারা আল্লাহ ও তার রাসূলের সাথে কুফুরী করেছে। অলসভঙ্গিতে ছাড়া তারা সালাতে আসে না এবং মনের অসন্তুষ্টি নিয়ে খরচ করে।” [সূরা আত-তাওবা, আয়াত: ৫৪]

কাফিরের ওপর যাকাত ফরয নয় এবং আদায় করলেও গ্রহণ করা হবে না একথার অর্থ এটা নয় যে, পরকালেও তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে; বরং তাকে এজন্য শাস্তি দেওয়া হবে। আল্লাহ বলেন,

﴿كُلُّ نَفۡسِۢ بِمَا كَسَبَتۡ رَهِينَةٌ ٣٨ إِلَّآ أَصۡحَٰبَ ٱلۡيَمِينِ ٣٩ فِي جَنَّٰتٖ يَتَسَآءَلُونَ ٤٠ عَنِ ٱلۡمُجۡرِمِينَ ٤١ مَا سَلَكَكُمۡ فِي سَقَرَ ٤٢ قَالُواْ لَمۡ نَكُ مِنَ ٱلۡمُصَلِّينَ ٤٣ وَلَمۡ نَكُ نُطۡعِمُ ٱلۡمِسۡكِينَ ٤٤ وَكُنَّا نَخُوضُ مَعَ ٱلۡخَآئِضِينَ ٤٥ وَكُنَّا نُكَذِّبُ بِيَوۡمِ ٱلدِّينِ ٤٦ حَتَّىٰٓ أَتَىٰنَا ٱلۡيَقِينُ ٤٧ ﴾ [المدثر: ٣٨،  ٤٧]

“প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃতকর্মের জন্য দায়ী; কিন্তু ডান দিকস্থরা। তারা থাকবে জান্নাতে এবং পরস্পরে জিজ্ঞাসাবাদ করবে অপরাধীদের সম্পর্কে। বলবে, তোমাদেরকে কিসে জাহান্নামে প্রবেশ করিয়েছে? তারা বলবে, আমরা সালাত পড়তাম না, অভাবগ্রস্তকে আহার্য দিতাম না। আমরা সমালোচকদের সাথে সমালোচনা করতাম এবং আমরা প্রতিফল দিবসকে অস্বীকার করতাম। এমনকি আমাদের মৃত্যু এসে গেছে।” [সূরা মুদ্দাসসির: ৩৮-৪৭] এ থেকে বুঝা যায় ইসলামের বিধি-বিধান না মেনে চলার কারণে কাফিরদেরকে শাস্তি দেওয়া হবে।

স্বাধীনতা: ক্রীতদাসের কোনো সম্পদ নেই। কোনো সম্পদ থাকলেও তা তার মালিকের সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, مَنِ ابْتَاعَ عَبْدًا فَمَالُهُ لِلَّذِي بَاعَهُ إِلَّا أَنْ يَشْتَرِطَ الْمُبْتَاع “সম্পদের অধিকারী কোনো ক্রীতদাস যদি কেউ বিক্রয় করে, তবে উক্ত সম্পদের মালিকানা বিক্রেতার থাকবে। কিন্তু যদি ক্রেতা উক্ত সম্পদের শর্তারোপ করে থাকে তবে ভিন্ন কথা।”[1]

িসাবের মালিক হওয়া: অর্থাৎ তার কাছে এমন পরিমাণ সম্পদ থাকবে, শরী‘আত যা নিসাব হিসেবে নির্ধারণ করেছে। সম্পদের প্রকারভেদ অনুযায়ী এর পরিমাণ বিভিন্নরূপ হয়ে থাকে। অতএব, মানুষের কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ না থাকলে বা নেসাবের কম সম্পদ থাকলে তাতে যাকাত দিতে হবে না। কেননা তার সম্পদ কম। আর অল্প সম্পদ দ্বারা অন্যের কল্যাণ করা সম্ভব নয়।

চতুষ্পদ জন্তুর নিসাবে শুরু এবং শেষ সংখ্যার খেয়াল রাখতে হবে। কিন্তু অন্যান্য সম্পদে শুধু প্রথমে কত ছিল তার হিসাব ধর্তব্য। পরে যা অতিরিক্ত হবে তার হিসাব করে যাকাত দিতে হবে।

বছর অতিক্রান্ত হওয়া: কেননা বছর পূর্ণ না হওয়া সত্বেও যাকাত আবশ্যক করে দেওয়ার মাধ্যমে সম্পদশালীর প্রতি কঠোরতা আরোপ করা হয়। বছর পূর্তি হওয়ার পরও যাকাত বের না করলে যাকাতের হকদারদের প্রতি অবিচার করা হয়; তাদের ক্ষতি করা হয়। এ কারণে প্রজ্ঞাপূর্ণ শরী‘আত এর জন্য একটি সীমারেখা নির্ধারণ করেছে এবং এর মধ্যে যাকাতের আবশ্যকতা নির্ধারণ করেছে। আর তা হচ্ছে বছরপূর্তি। অতএব, এর মধ্যে সম্পদশালী ও যাকাতের হকদারদের মধ্যে একটি সামঞ্জস্যতা বিধান করা হয়েছে।

এ কারণে বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বে কোনো মানুষ যদি মারা যায় বা তার সম্পদ বিনষ্ট হয়ে যায়, তবে যাকাত রহিত হয়ে যাবে। অবশ্য তিনটি জিনিস এ বিধানের ব্যতিক্রম:

১) ব্যবসার লভ্যাংশ ২) চতুষ্পদ জন্তুর বাচ্চা ৩) উশর।

ব্যবসার লভ্যাংশে ব্যবসার মূল সম্পদের সাথে যোগ করে যাকাত দিতে হবে। আর চতুস্পদ জন্তুর ভুমিষ্ট বাচ্চার যাকাত তার মায়ের সাথে মিলিত করে দিতে হবে। আর উশর অর্থাৎ যমীনে উৎপাদিত ফসল ঘরে উঠালেই যাকাত দিতে হবে।

প্রশ্ন: (৩৫৫) প্রতিমাসে প্রাপ্য বেতনের যাকাত কীভাবে প্রদান করতে হবে?

উত্তর: এক্ষেত্রে সুন্দর পন্থা হচ্ছে, প্রথম বেতনের যদি এক বছরপূর্তি হয়; তবে তার সাথে সংশ্লিষ্ট করে সবগুলোর যাকাত আদায় করে দিবে। যে বেতনে বছর পূর্ণ হয়েছে তার যাকাত সময়ের মধ্যেই আদায় করা হল। আর যাতে বছর পূর্ণ হয় নি তার যাকাত অগ্রীম আদায় হয়ে গেল। প্রতিমাসের বেতন আলাদা হিসাব রাখার চাইতে এটাই হচ্ছে সহজ পন্থা। কিন্তু দ্বিতীয় মাসের বেতন আসার আগেই যদি প্রথম মাসের বেতন খরচ হয়ে যায়, তবে তার উপর কোনো যাকাত নেই। কেননা যাকাত ওয়াজিব হওয়ার শর্ত হচ্ছে বছর পূর্ণ হওয়া।

প্রশ্ন: (৩৫৬) শিশু ও পাগলের সম্পদে কি যাকাত ওয়াজিব হবে?

উত্তর: বিষয়টি বিদ্বানদের মধ্যে মতবিরোধপূর্ণ। কেউ বলেন, নাবালেগ ও পাগলের সম্পদে যাকাত ওয়াজিব নয়। কেননা এরা তো শরী‘আতের বিধি-নিষেধ মেনে চলার বাধ্যবাধকতার বাইরে। অতএব, তাদের সম্পদে যাকাত আবশ্যক হবে না।

কোনো কোনো বিদ্বান বলেন, বরং তাদের সম্পদে যাকাত আবশ্যক হবে। আর এটাই বিশুদ্ধ মত। কেননা যাকাত সম্পদের অধিকার। মালিক কে তা দেখার বিষয় নয়। আল্লাহ বলেন, ﴿خُذۡ مِنۡ أَمۡوَٰلِهِمۡ صَدَقَةٗ﴾ [التوبة: ١٠٣]  “তাদের সম্পদ থেকে যাকাত গ্রহণ করুন।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১০৩] এখানে আবশ্যকতার নির্দেশ সম্পদে করা হয়েছে। তাছাড়া মু‘আয ইবন জাবাল রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়ামান প্রেরণ করে বলেছিলেন,

«أَعْلِمْهُمْ أَنَّ اللَّهَ افْتَرَضَ عَلَيْهِمْ صَدَقَةً فِي أَمْوَالِهِمْ تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَائِهِمْ وَتُرَدُّ عَلَى فُقَرَائِهِمْ»

“তাদেরকে জানিয়ে দিবে আল্লাহ তাদের সম্পদে যাকাত ফরয করেছেন। ধনীদের থেকে যাকাত গ্রহণ করে তাদের মধ্যে অভাবীদের মাঝে বিতরণ করা হবে।”[2] অতএব, এ ভিত্তিতে নাবালেগ ও পাগলের সম্পদে যাকাত আবশ্যক হবে। তাদের অভিভাবক এ যাকাত বের করার দায়িত্ব পালন করবেন।

প্রশ্ন: (৩৫৭) প্রদত্ত ঋণের যাকাত আদায় করার বিধান কী?

উত্তর: সম্পদ যদি ঋণ হিসেবে অন্যের কাছে থাকে, তবে ফিরিয়ে না পাওয়া পর্যন্ত তাতে যাকাত আবশ্যক নয়। কেননা তা তার হাতে নেই। কিন্তু ঋনগ্রস্ত ব্যক্তি যদি সম্পদশালী লোক হয়, তবে প্রতি বছর তাকে (ঋণদাতাকে) যাকাত বের করতে হবে। নিজের অন্যান্য সম্পদের সাথে তার যাকাত আদায় করে দিলে যিম্মামুক্ত হয়ে যাবে। অন্যথায় তা ফেরত পাওয়ার পর হিসেব করে বিগত প্রত্যেক বছরের যাকাত আদায় করতে হবে। কেননা তা সম্পদশালী লোকের হাতে ছিল। আর তা তলব করাও সম্ভব ছিল। সুতরাং ঋণদাতার ইচ্ছাতেই চাইতে দেরী করা হয়েছে।

কিন্তু ঋণ যদি অভাবী লোকের হাতে থাকে। অথবা এমন ধনী লোকের হাতে যার নিকট থেকে উদ্ধার করা কষ্টকর, তবে তার উপর প্রতি বছর যাকাত আবশ্যক হবে না। কেননা তা হাতে পাওয়া তার জন্য অসম্ভব। কারণ আল্লাহ বলেন,

﴿وَإِن كَانَ ذُو عُسۡرَةٖ فَنَظِرَةٌ إِلَىٰ مَيۡسَرَةٖۚ﴾ [البقرة: ٢٨٠]

“যদি অভাবী হয় তবে তাকে সচ্ছলতা পর্যন্ত অবকাশ দিবে।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৮০] অতএব, তার জন্য সম্ভব নয় এসম্পদ পূণরুদ্ধার করা এবং তা দ্বারা উপকৃত হওয়া। কিন্তু পূণরুদ্ধার করতে পারলে বিদ্বানদের মধ্যে কেউ বলেন, তখন থেকে নতুন করে বছর গণনা শুরু করবে। আবার কেউ বলেন, বিগত এক বছরের যাকাত বের করবে এবং পরবর্তী বছর আসলে আবার যাকাত আদায় করবে। এটাই অত্যধিক সতর্ক অভিমত।

প্রশ্ন: (৩৫৮) মৃত ব্যক্তির ঋণ কি যাকাত থেকে পরিশোধ করা যাবে?

উত্তর: ইবনআবদুল বার ও আবু উবাইদা বলেন, বিদ্বানদের ইজমা‘ বা ঐকমত্য হচ্ছে, কোনো সম্পদ রেখে যায় নি এমন অভাবী ঋণগ্রস্ত মৃত ব্যক্তির ঋণ যাকাত দ্বারা পরিশোধ করা যাবে না। কিন্তু আসলে বিষয়টি মতবিরোধপূর্ণ। অবশ্য অধিকাংশ আলিম বলে থাকেন, যাকাত দ্বারা মৃতের ঋণ পরিশোধ করা যাবে না। কেননা মৃত ব্যক্তি তো আখিরাতে পাড়ি জমিয়েছে। ঋণের কারণে জীবিত ব্যক্তি যে ধরণের লাঞ্ছনা ও অবমাননার স্বীকার হয় মৃত ব্যক্তি এরূপ হয় না। তাছাড়া নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃতের ঋণ যাকাত থেকে আদায় করতেন না; বরং গনীমতের সম্পদ থেকে উক্ত ঋণ পরিশোধ করতেন। এথেকে বুঝা যায় যাকাত থেকে মৃতের ঋণ পরিশোধ করা বিশুদ্ধ নয়।

বলা হয়, মৃত ব্যক্তি যদি পরিশোধ করার নিয়ত রেখে ঋণ করে থাকে, তবে আল্লাহ তাঁর দয়া ও অনুগ্রহে তার পক্ষ থেকে তা আদায় করে দিবেন। কিন্তু গ্রহণ করার সময় পরিশোধের নিয়ত না থাকলে, অপরাধী হিসেবে তার জিম্মায় তা অবশিষ্ট থাকবে এবং ক্বিয়ামত দিবসে তা পরিশোধ করবে। আমার মতে যাকাত থেকে তার ঋণ পরিশোধ করার মতের চেয়ে এ মতটিই অধিক পছন্দনীয়।

এমনও বলা হয়, প্রয়োজনীয়তার দিকে লক্ষ্য রেখে জীবিত ও মৃতের মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। জীবিত লোকদের অভাব, ঋণ, জিহাদ প্রভৃতি ক্ষেত্রে যদি যাকাতের অধিক প্রয়োজনীয়তা থাকে, তবে তাদের বিষয়টি অগ্রগণ্য। কিন্তু তাদের এধরণের কোনো প্রয়োজনীয়তা না থাকলে, সহায়-সম্বলহীন মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া ঋণ যাকাত দ্বারা পরিশোধ করতে কোনো অসুবিধা নেই। সম্ভবতঃ এটি মধ্যমপন্থী মত।

প্রশ্ন: (৩৫৯) ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির সাদকা করা কি ঠিক হবে? ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি কোন ধরণের শরীআতের দাবী থেকে মুক্তি পাবে?

উত্তর: শরী‘আত নির্দেশিত একটি খরচ হচ্ছে দান-সাদকা। সাদকা জায়গা মত দেওয়া হলে তা হবে আল্লাহর বান্দাদের উপর অনুগ্রহ। সাদকাকারী ছাওয়াব পাবে, কিয়ামত দিবসে সদকার ছায়ার নিচে অবস্থান করবে। সাদকা কবূল হওয়ার শর্ত পূর্ণ করে যাকেই দান করা হোক তার দান গ্রহণ করা হবে। চাই দানকারী ঋণগ্রস্ত হোক বা না হোক। ইখলাস বা একনিষ্ঠতার সাথে, হালাল উপার্জন থেকে জায়গা মত দান করলেই শরী‘আতের দলীল অনুযায়ী তার দান কবূল হবে। দানকারী ঋণমুক্ত হতে হবে এমন কোনো শর্ত নেই। কিন্তু কোনো ব্যক্তি যদি এমন ঋণে ডুবে থাকে যা পরিশোধ করার জন্য তার সমস্ত সম্পত্তি দরকার, তবে এটা কোনো যুক্তিসংগত ও বিবেকসম্মত কথা নয় যে, জরুরি ও আবশ্যক ঋণ পরিশোধ না করে সে নফল দান-সাদকা করবে! অতএব, তার উপর আবশ্যক হচ্ছে, প্রথমে ফরয কাজ করা তারপর নফল কাজ করা। তারপরও ঐ অবস্থায় দান করলে তার ব্যাপারে আলিমগণ মতভেদ করেছেন। কেউ বলেন, এরূপ করা জায়েয নয়। কেননা এতে পাওনাদারের ক্ষতি করা হয় এবং নিজের জিম্মায় আবশ্যিক ঋণের বোঝা বহন করে রাখা হয়। আবার কেউ বলেন, দান করা জায়েয আছে কিন্তু উত্তমতার বিপরীত।

মোটকথা, যে ব্যক্তির আপাদমস্তক ঋণে জর্জরিত আর পরিশোধ করার জন্য নিজের সমস্ত সম্পত্তি দরকার, তার পক্ষে দান-সাদকা করা উচিৎ নয়। কেননা নফল কাজের চাইতে ওয়াজিব কাজের গুরুত্ব বেশি এবং তা অগ্রগণ্য।

আর ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি ঋণ মুক্ত হওয়া পর্যন্ত কোন ধরণের শরী‘আতের দাবী থেকে মুক্তি পাবে?

তার মধ্যে একটি হচ্ছে হজ। ঋণ পরিশোধ করা পর্যন্ত ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির ওপর হজের দায়িত্ব নেই বা হজ ফরয নয়।

কিন্তু যাকাতের ব্যাপারে বিদ্বানগণ মতভেদ করেছেন। ঋণগ্রস্তের উপর থেকে যাকাতের আবশ্যকতা রহিত হবে কি হবে না?

একদল আলিম বলেছেন, ঋণ পরিমাণ সম্পদে যাকাতের আবশ্যকতা রহিত হবে। চাই উক্ত সম্পদ প্রকাশ্য হোক বা অপ্রকাশ্য।

আরেক দল আলিম বলেন, তার উপর কোনো সময় যাকাতের আবশ্যকতা রহিত হবে না। হাতে যে সম্পদই থাক না কেন হিসেব করে তার যাকাত বের করতে হবে। যদিও তার উপর এমন ঋণ থাকে যা পরিশোধ করে দিলে অবশিষ্ট সম্পদ নিসাব পরিমাণ হয় না।

অন্যদল আলিম বলেন, বিষয়টি ব্যাখ্যা সাপেক্ষ। তার সম্পদ যদি অপ্রকাশ্য ধরণের হয় যা প্রত্যক্ষ নয় গোপন থাকে। যেমন, টাকা-পয়সা এবং ব্যবসায়িক পণ্য, তবে তাতে ঋণ পরিমাণ সম্পদে যাকাত রহিত হবে। আর সম্পদ যদি প্রকাশ্য ধরণের হয়। যেমন, পশু, যমীন থেকে উৎপাদিত ফসল ইত্যাদি, তবে তাতে যাকাত রহিত হবে না।

আমার মতে বিশুদ্ধ কথা হচ্ছে: কোনো সময়ই যাকাত রহিত হবে না। চাই সম্পদ প্রকাশ্য হোক বা অপ্রকাশ্য। তার হাতে যে সম্পদ আছে তা যদি যাকাতের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং নিসাব পরিমাণ হয়, তবে তার যাকাত দিতে হবে। যদিও তার উপর ঋণ থাকে। কেননা যাকাত হচ্ছে সম্পদের অধিকার। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿خُذۡ مِنۡ أَمۡوَٰلِهِمۡ صَدَقَةٗ تُطَهِّرُهُمۡ وَتُزَكِّيهِم بِهَا وَصَلِّ عَلَيۡهِمۡۖ إِنَّ صَلَوٰتَكَ سَكَنٞ لَّهُمۡۗ وَٱللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ ١٠٣ ﴾ [التوبة: ١٠٣]

“(হে নবী) আপনি তাদের ধন-সম্পদ থেকে যাকাত গ্রহণ করুন, যা দ্বারা আপনি তাদেরকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবেন, আর তাদের জন্য দো‘আ করুন। নিঃসন্দেহে আপনার দো‘আ হচ্ছে তাদের জন্য শান্তির কারণ। আর আল্লাহ খুব শোনেন, খুব জানেন।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১০৩] তাছাড়া মু‘আয ইবন জাবাল রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়ামান প্রেরণ করে বলেছিলেন,

«أَعْلِمْهُمْ أَنَّ اللَّهَ افْتَرَضَ عَلَيْهِمْ صَدَقَةً فِي أَمْوَالِهِمْ تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَائِهِمْ وَتُرَدُّ عَلَى فُقَرَائِهِمْ»

“তাদেরকে জানিয়ে দিবে আল্লাহ তাদের সম্পদে যাকাত ফরয করেছেন। ধনীদের থেকে যাকাত গ্রহণ করে তাদের মধ্যে অভাবীদের মাঝে বিতরণ করা হবে।”[3] কুরআন-সুন্নাহর এ দলীলের ভিত্তিতে বিষয় দু’টি আলাদা হয়ে গেল। অতএব, যাকাত ও ঋণের মাঝে কোনো দ্বন্দ্ব থাকল না। কেননা ঋণ হচ্ছে ব্যক্তির যিম্মায় আবশ্যক। আর যাকাত সম্পদে আবশ্যক। প্রত্যেকটি বিষয় তার নির্দিষ্ট স্থানে আবশ্যক হবে। কেউ কারো স্থলাভিষিক্ত হবে না। অতএব, ঋণ ব্যক্তির যিম্মায় বাকী থাকবে। আর সময় হলে শর্ত পূর্ণ হলে অবশ্যই যাকাত বের করে দিবে।

প্রশ্ন: (৩৬০) জনৈক ব্যক্তি চার বছর যাকাত আদায় করে নিএখন তার করণীয় কী?

উত্তর: যাকাত আদায়ে বিলম্ব করার কারণে এ লোক গুনাহ্গার। কেননা মানুষের ওপর ওয়াজিব হচ্ছে যাকাত ওয়াজিব হওয়ার সাথে সাথে দেরী না করে যাকাত আদায় করে দেওয়া। আবশ্যিক বিষয়ের মূল হচ্ছে, সময় হওয়ার সাথে সাথে দেরী না করে তা সম্পাদন করে ফেলা। এ লোকের উচিৎ আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা, তওবা করা। তার ওপর আবশ্যক হচ্ছে, বছরগুলোর হিসেব করে যাকাত আদায় করে দেওয়া। উক্ত যাকাতের কোনো কিছুই তার থেকে রহিত হবে না। তাকে তওবা করতে হবে এবং দ্রুত যাকাত আদায় করে দিতে হবে। যাতে করে দেরী করার কারণে গুনাহ আরো বাড়তে না থাকে।

প্রশ্ন: (৩৬১) বছরের অর্ধেক সময় পশু চারণ ভূমিতে চরে খেলে তাতে কি যাকাত দিতে হবে?

উত্তর: যে পশু বছরের পূর্ণ অর্ধেক সময় চারণ ভূমিতে চরে খায় তাতে যাকাত দিতে হবে না। কেননা পশু সায়েমা না হলে তাতে যাকাত ওয়াজিব হয় না। সায়েমা সেই পশুকে বলা হয়, যা বছরের পূর্ণ সময় বা বছরের অধিকাংশ সময় মাঠে-ঘাটে চরে বেড়ায় ও তৃণ-লতা খেয়ে বড় হয়। কিন্তু বছরের কিছু সময় বা অর্ধেক সময় চরে খেলে তাতে যাকাত আবশ্যক নয়। অবশ্য যদি উহা ব্যবসার জন্য হয়ে থাকে, তখন তার বিধান ভিন্ন। ব্যবসায়িক পণ্য হিসেবে যাকাত বের করতে হবে। তখন বছর পূর্ণ হলে মূল্য নির্ধারণ করে ২.৫% (আড়াই শতাংশ) হারে যাকাত বের করবে।

বাড়ী-ঘরের আশেপাশে ফলদার বৃক্ষের ফলের যাকাত

প্রশ্ন: (২৬২) তিন বছর আগে আমি বাড়ী ক্রয় করেছি। (আলহামদু লিল্লাহ) বাড়ীর সীমানার মধ্যে তিনটি খেজুর গাছ আছে। প্রত্যেক গাছে প্রচুর পরিমাণে খেজুর পাওয়া যায়। এ খেজুরে কি যাকাত দিতে হবে? যাকাত দেওয়া ওয়াজিব হয়ে থাকলে তো এ সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষই অজ্ঞ। এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে:

১) খেজুরগুলো নিসাব পরিমাণ হলো কি না তা জানার উপায় কী? আমি তো বিভিন্ন সময় খেজুর পেড়ে থাকি?

২) কীভাবে যাকাতের পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে? প্রত্যেক প্রকার খেজুরের যাকাত কি আলাদাভাবে বের করতে হবে? নাকি সবগুলো একত্রিত করে যে কোনো এক প্রকার থেকে যাকাত দিলেই চলবে?

৩) খেজুর থেকে যাকাত না দিয়ে এর বিনিময় মূল্য দিলে চলবে কী?

৪) বিগত বছরগুলোতে তো যাকাত বের করিনি। এখন আমি কি করব?

উত্তর: বাড়ির আশে পাশে খেজুর গাছে প্রাপ্ত খেজুর থেকে যে যাকাত আবশ্যক হতে পারে এ ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ জ্ঞান রাখে না প্রশ্নকারীর এ কথা সত্য ও সঠিক। কারো বাড়িতে সাতটি কারো দশটি কারো কম বা বেশি সংখ্যার গাছ থাকে। এগুলোর ফল নিসাব পরিমাণও হয়ে যায়। কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না যে এতেও যাকাত দিতে হবে। তাদের ধারণা যে, বাগানের খেজুরেই শুধু যাকাত দেওয়া লাগবে। অথচ খেজুর বৃক্ষ বাগানে হোক বা বাড়ীতে হোক, উৎপাদিত ফসল নিসাব পরিমাণ হলেই তাতে যাকাত দিতে হবে। এ ভিত্তিতে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন মানুষ অনুমান করবে, এ গাছগুলোতে যাকাতের নিসাব পরিমাণ খেজুর আছে কি না? যদি নিসাব পরিমাণ হয় তবে কীভাবে যাকাত দিবে; কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কীভাবে সে যাকাত দিবে সে তো বিভিন্ন সময় ফল পেড়ে খেয়ে থাকে? যেমনটি প্রশ্নকর্তা বলেছে।

আমি মনে করি, এ অবস্থায় খেজুরের মূল্য নির্ধারণ করবে এবং পূর্ণ মূল্যের এক বিশমাংশ যাকাত হিসেবে বের করবে। কেননা এ পদ্ধতি মালিকের জন্য যেমন সহজ তেমনি অভাবীদের জন্যও উপকারী। এতে যাকতের পরিমাণ হবে ৫% (শতকরা পাঁচ) টাকা। কেননা তা হচ্ছে ফসলের যাকাত; ব্যবসায়িক পণ্যের যাকাত নয়। কিন্তু অন্যান্য সম্পদ যদি হয় যেমন- স্বর্ণ-রৌপ্য, টাকা-পয়সা, তবে তাতে যাকাতের পরিমাণ হচ্ছে ২.৫% (শতকরা আড়াই) টাকা।

আর অজ্ঞতাবশতঃ বিগত যে কয় বছরের যাকাত আদায় করে নি, তার জন্য অনুমাণ করে সর্বমোট একটা পরিমাণ নির্ধারণ করবে, তারপর তার যাকাত এখনই আদায় করে দিবে। আর যাকাত আদায় করতে এ দেরীর কারণে তার কোনো গুনাহ হবে না। কেননা সে ছিল অজ্ঞ। কিন্তু বিগত বছরগুলোর যাকাত অবশ্যই আদায় করতে হবে।

প্রশ্ন: (৩৬৩) স্বর্ণ ও রৌপ্যের যাকাতের নিসাব কী? আর কিলোগ্রাম হিসেবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সা‘ এর পরিমাণ কত?

উত্তর: স্বর্ণের নিসাব হচ্ছে, বিশ মিসক্বাল তথা ৮৫ পঁচাশি গ্রাম।

আর রৌপ্যের নিসাব হচ্ছে ১৪০ (একশ চল্লিশ) মিসক্বাল তথা সৌদী আরবের রৌপ্যের দিরহাম অনুযায়ী ৫৬ রিয়াল অর্থাৎ ৫৯৫ গ্রাম।

আর কিলোগ্রাম হিসেবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সা‘ এর পরিমাণ হচ্ছে, দু’কিলো চল্লিশ গ্রাম (২.৪০ কেজি) পাকা পুষ্ট গম।

প্রশ্ন: (৩৬৪) মেয়েদেরকে দেওয়া স্বর্ণ একত্রিত করলে নিসাব পরিমাণ হয়। একত্রিত না করলে নিসাব হয় না। এ অবস্থায় করণীয় কী?

উত্তর: কোনো মানুষ যদি গয়নাগুলো তার মেয়েদেরকে ধারস্বরূপ শুধুমাত্র পরিধান করার জন্য দিয়ে থাকে, তবে সেই তার মালিক। সবগুলো একত্রিত করে যদি নিসাব পরিমাণ হয় তবে যাকাত প্রদান করবে। কিন্তু যদি তাদেরকে সেগুলো দানস্বরূপ প্রদান করে থাকে অর্থাৎ মেয়েরাই সেগুলোর মালিক, আর তখন গয়নাগুলো একত্রিত করা আবশ্যক নয়। কেননা প্রত্যেকেই আলাদাভাবে স্বর্ণগুলোর মালিক। অতএব, তাদের একজনের স্বর্ণ যদি নিসাব পরিমাণ হয়, তবেই যাকাত প্রদান করবে। অন্যথায় নয়।

প্রশ্ন: (৩৬৫) নিজের প্রদত্ব যাকাত থেকে গ্রহীতা যদি উপহারস্বরূপ কিছু প্রদান করে, তবে তা কি গ্রহণ করা যাবে?

উত্তর: যাকাতের হকদার কোনো ব্যক্তি যদি প্রাপ্ত যাকাত থেকে প্রদানকারীকে কিছু হাদিয়া বা উপহারস্বরূপ দেয়, তবে তা নিতে কোনো বাধা নেই। কিন্তু তাদের মাঝে যদি পূর্ব থেকে কোনো গোপন সমঝোতা হয়ে থাকে তবে তা হারাম। এ কারণে তার উক্ত হাদিয়া বা উপহার গ্রহণ না করাই উত্তম।

প্রশ্ন: (৩৬৬) সম্পদের যাকাতের পরিবর্তে কাপড় ইত্যাদি প্রদান করা কি জায়েয হবে?

উত্তর: না, তা জায়েয হবে না।

প্রশ্ন: (৩৬৭) স্বর্ণের সাথে মূল্যবান ধাতু হীরা প্রভৃতি থাকলে কীভাবে স্বর্ণের যাকাত দিবে?

উত্তর: অভিজ্ঞ ব্যক্তিগণ তা নির্ধারণ করবে। স্বর্ণ ব্যবসায়ী বা স্বর্ণকারের কাছে গিয়ে পরিমাণ জেনে নিবে। এখানে যে পরিমাণ স্বর্ণ আছে তা নিসাব পরিমাণ হয় কি না? নিসাব পরিমাণ না হলে যাকাত নেই। তবে তার কাছে অন্য স্বর্ণ থাকলে তা দ্বারা নিসাব পূর্ণ করে হিরা প্রভৃতি মিশ্রিত স্বর্ণের মূল্য নির্ধারণ করে তা থেকে ২.৫% (আড়াই শতাংশ) হারে যাকাত আদায় করবে।

প্রশ্ন: (৩৬৮) যাকাতের অর্থ দ্বারা মসজিদ নির্মাণ করার বিধান কী? ফক্বীর বা অভাবী কাকে বলে?

উত্তর: যাকাতের জন্য আল্লাহ তা‘আলা যে আট শ্রেণির কথা কুরআনে উল্লেখ করেছেন, তা ছাড়া অন্য কোনো খাতে যাকাত প্রদান করা জায়েয নয়। কেননা আল্লাহ তা‘আলা আয়াতেإِنَّمَا  অব্যয় দ্বারা যাকাত প্রদানের খাতকে আট শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন,

﴿إِنَّمَا ٱلصَّدَقَٰتُ لِلۡفُقَرَآءِ وَٱلۡمَسَٰكِينِ وَٱلۡعَٰمِلِينَ عَلَيۡهَا وَٱلۡمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمۡ وَفِي ٱلرِّقَابِ وَٱلۡغَٰرِمِينَ وَفِي سَبِيلِ ٱللَّهِ وَٱبۡنِ ٱلسَّبِيلِۖ فَرِيضَةٗ مِّنَ ٱللَّهِۗ وَٱللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٞ ٦٠﴾ [التوبة: ٦٠]

“যাকাত তো হচ্ছে শুধুমাত্র গরীবদের এবং অভাবগ্রস্তদের আর এ যাকাত আদায়ের জন্য নিযুক্ত কর্মচারীদের এবং ইসলামের প্রতি তাদের (কাফিরদের) হৃদয় আকৃষ্ট করতে, ঋণ পরিশোধে, আল্লাহর পথে জিহাদে, আর মুসাফিরদের সাহায্যে। এ বিধান আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী অতি প্রজ্ঞাময়।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৬০]

সুতরাং তা মসজিদ নির্মাণের কাজে বা জ্ঞানার্জনের কাজে খরচ করা জায়েয হবে না। আর নফল সাদকাসমূহের ক্ষেত্রে উত্তম হচ্ছে যেখানে বেশি উপকার পাওয়া যাবে সেখানে প্রদান করা।

ফকীরের সংজ্ঞা হচ্ছে: স্থান ও কাল ভেদে যার কাছে পূর্ণ এক বছরের নিজের ও পরিবারের খরচ পরিমাণ অর্থ না থাকবে তাকে বলা হয় ফক্বীর। স্থান-কাল ভেদে এ জন্য বলা হয়েছে, হয়তো কোনো কালে বা কোনো স্থানে এক হাজার রিয়ালের অধিকারীকে ধনী বলা হয়। আবার কোনো কালে বা কোনো স্থানে এটা কোনো সম্পদই নয়। কেননা সে সময় বা স্থানে জীবন ধারণের উপকরণ খুবই চড়া মূল্যের।

প্রশ্ন: (৩৬৯) ভাড়া বা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহৃত গাড়ীতে কি যাকাত আবশ্যক?

উত্তর: ভাড়ার কাজে মানুষ যে গাড়ী ব্যবহার করে অথবা নিজের ব্যক্তিগত কাজে যে গাড়ী ব্যবহার করা হয় তার কোনটাতেই যাকাত নেই। তবে প্রাপ্ত ভাড়া যদি নিসাব পরিমাণ হয় বা তা অন্য অর্থের সাথে মিলিত করে তা নিসাব পরিমাণ পৌঁছে এবং এক বছর অতিক্রান্ত হয় তবে তাতে যাকাত দিতে হবে। অনুরূপভাবে ভাড়ায় ব্যবহৃত জমি বা ভূমিতে যাকাত নেই। তার প্রাপ্ত ভাড়া থেকে যাকাত দিতে হবে।

প্রশ্ন: (৩৭০) ভাড়া দেওয়া হয়েছে এমন বাড়ীর যাকাত দেওয়ার বিধান কী?

উত্তর: ভাড়া দেওয়া হয়েছে এমন বাড়ী যদি ভাড়ার জন্যই নির্মাণ করা হয়ে থাকে তবে বাড়ীর মূল্যে কোনো যাকাত নেই। তবে বাড়ী থেকে প্রাপ্ত ভাড়ার যাকাত দিতে হবে, যদি ভাড়া দেওয়ার দিন থেকে প্রাপ্ত অর্থের উপর বছর পূর্ণ হয়। ভাড়ার চুক্তিনামা স্বাক্ষর করার দিন থেকে যদি বছর পূর্ণ না হয় তবে তাতে যাকাত নেই। যেমন বছরে ১০,০০০ (দশ হাজার) টাকা প্রদানের চুক্তিতে ঘর ভাড়া দেওয়া হল। চুক্তির শুরুতে পাঁচ হাজার টাকা গ্রহণ করে তা খরচ হয়ে গেল। অবশিষ্ট পাঁচ হাজার টাকা বছরের মধ্যবর্তী সময়ে গ্রহণ করে তাও বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই খরচ হয়ে গেল, তবে এক বছরে প্রাপ্ত দশ হাজার টাকার এ ভাড়ার মধ্যে কোনো যাকাত দিতে হবে না। কেননা এ অর্থে বছর পূর্ণ হয় নি।

কিন্তু বাড়ীটি যদি ব্যবসার জন্য নির্মাণ করে মূল্য বৃদ্ধি বা লাভের অপেক্ষায় থাকে এবং বিক্রি হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ভাড়া আদায় করে, তবে উক্ত বাড়ীর মূল্যে যেমন যাকাত দিতে হবে তেমনি তার ভাড়ারও যাকাত দিতে হবে যখন তাতে বছর পূর্ণ হবে। কেননা তা ব্যবসার জন্য নির্মাণ করা হয়েছে। নিজ মালিকানায় থেকে যাওয়া বা তা থেকে উপকৃত হওয়ার উদ্দেশ্যে নয়। আর এমন প্রত্যেক বস্তু যা ব্যবসা বা উপার্জনের উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা হয় তাতেই যাকাত রয়েছে। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “প্রত্যেকটি কর্ম নিয়তের উপর নির্ভরশীল। আর মানুষ যা নিয়ত করে তাই রয়েছে তার জন্য।”[4]

এই ব্যক্তির নিকট যে সম্পদ রয়েছে তার উদ্দেশ্য হচ্ছে উপার্জন করা। তার লক্ষ্য তো বস্তুটির মূল্যের প্রতি -মূল বস্তু নয়। আর তার মূল্য হচ্ছে দিরহাম বা টাকা বা নগদ অর্থ। আর জানা কথা যে, নগদ অর্থে বা টাকা-পয়সায় যাকাত ওয়াজিব। অতএব, যে গৃহ ব্যবসার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে বছর শেষে তার মূল্য নির্ধারণ করে তাতে এবং তা যদি ভাড়ায় থাকে তবে ভাড়ার চুক্তির দিন থেকে বছর পূর্ণ হলে তারও যাকাত দিতে হবে।

বসবাসের উদ্দেশ্যে যমীন খরিদ করার পর তা দ্বারা ব্যবসা করার ইচ্ছা করলে তার যাকাত

প্রশ্ন: (৩৭১) জনৈক ব্যক্তি বসবাসের উদ্দেশ্যে একটি যমীন খরিদ করেছে। তিন বছর পর সে তা দ্বারা ব্যবসা করার ইচ্ছা করল। এখন উক্ত তিন বছরের কি যাকাত দিতে হবে?

উত্তর: বিগত বছরগুলোর জন্য কোনো যাকাত ওয়াজিব হবেনা। কেননা সে তো বসবাসের জন্য তা খরিদ করেছিল। কিন্তু ব্যবসা ও উপার্জনের নিয়ত করার সময় থেকেই বছরের হিসাব শুরু করতে হবে। যখন বছর পূর্ণ হবে তখনই তাতে যাকাত আবশ্যক হবে।

প্রশ্ন: (৩৭২) রামাযানের প্রথম দশকে যাকাতুল ফিতর (ফিতরা) আদায় করার বিধান কী?

উত্তর: যাকাতুল ফিতর শব্দটির নামকরণ করা হয়েছে সাওম ভঙ্গকে কেন্দ্র করে। সাওম ভঙ্গ বা শেষ করার কারণেই উক্ত যাকাত প্রদান করা আবশ্যক। সুতরাং উক্ত নির্দিষ্ট কারণের সাথেই সংশ্লিষ্ট রাখতে হবে, অগ্রীম করা চলবে না। একারণে ফিতরা বের করার সর্বোত্তম সময় হচ্ছে ঈদের দিন সালাতের পূর্বে। কিন্তু ঈদের একদিন বা দু’দিন আগে তা আদায় করা জায়েয। কেননা এতে প্রদানকারী ও গ্রহণকারীর জন্য সহজতা রয়েছে। কিন্তু এরও আগে বের করার ব্যাপারে বিদ্বানদের প্রাধান্যযোগ্য মত হচ্ছে তা জায়েয নয়। এ ভিত্তিতে ফিতরা আদায় করার সময় দু’টি:

১) জায়েয বা বৈধ সময়। তা হচ্ছে ঈদের একদিন বা দু’দিন পূর্বে। ২) ফযীলতপূর্ণ উত্তম সময়। তা হচ্ছে ঈদের দিন – ঈদের সালাতের পূর্বে। কিন্তু সালাতের পর পর্যন্ত দেরী করে আদায় করা হারাম। ফিতরা হিসেবে কবূল হবেনা। ইবন আব্বাসের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:

«مَنْ أَدَّاهَا قَبْلَ الصَّلَاةِ فَهِيَ زَكَاةٌ مَقْبُولَةٌ وَمَنْ أَدَّاهَا بَعْدَ الصَّلَاةِ فَهِيَ صَدَقَةٌ مِنَ الصَّدَقَاتِ»

“সালাতের পূর্বে যে উহা আদায় করে তার যাকাত গ্রহণযোগ্য। আর যে ব্যক্তি সালাতের পর আদায় করবে তার জন্য তা একটি সাধারণ সাদকা হিসেবে গণ্য হবে।”[5]

তবে কোনো লোক যদি জঙ্গল বা মরুভূমি বা এ ধরণের জনমানবহীন কোনো স্থানে থাকার কারণে ঈদের দিন সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে এবং ঈদের সালাত শেষ হওয়ার পর সে সম্পর্কে অবগত হয়, তবে ঈদের পর ফিতরা আদায় করলেও তার কোনো অসুবিধা হবে না।

প্রশ্ন: (৩৭৩) সাদ্কার নিয়তে বেশি করে ফিতরা আদায় করা জায়েয হবে কী?

উত্তর: হ্যাঁ, বেশি করে ফিতরা আদায় করা জায়েয। ফিতরার অতিরিক্ত বস্তু সাদকার নিয়তে প্রদান করবে। যেমন, আজকাল বহু লোক এরূপ করে থাকে। মনে করুন একজন লোক দশ জনের ফিতরা আদায় করবে। এ উদ্দেশ্যে সে এক বস্তা চাউল খরিদ করে, যাতে দশ জনের অধিক ব্যক্তির ফিতরা আদায় করা যাবে। অতঃপর তা নিজের পক্ষ থেকে এবং নিজ পরিবারের পক্ষ থেকে আদায় করে। এটা জায়েয; যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, নির্দিষ্ট পরিমাণ বা তার চাইতে বেশি চাউল আছে। বস্তার মধ্যে নির্দিষ্ট ফিতরার পরিমাপ যদি জানা যায় তবে তা আদায় করাতে কোনো দোষ নেই।

চাউল দ্বারা ফিতরা আদায় করা

প্রশ্ন: (৩৭৪) কতিপয় বিদ্বান মনে করেন, যে সমস্ত বস্তু দ্বারা ফিতরা দেওয়ার কথা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, তা যেহেতু বর্তমানে পাওয়া যায়, তাই চাউল দ্বারা ফিতরা দেওয়া বিধিসম্মত নয়। এ সম্পর্কে আপনার মতামত জানতে চাই?

উত্তর: একদল আলিম বলেন, হাদীসে উল্লিখিত পাঁচ প্রকার বস্তু: গম, খেজুর, যব, কিসমিস এবং পনীর- এগুলো যদি থাকে, তবে অন্য বস্তু দ্বারা ফিতরা আদায় করা জায়েয হবে না।

অন্য একটি মত হচ্ছে উল্লিখিত বস্তু এবং অন্য যে কোনো বস্তু এমনকি টাকা-পয়সা দ্বারাও ফিতরা আদায় করা বৈধ। এ হচ্ছে পরস্পর বিরোধী দু’টি মত।

বিশুদ্ধ কথা হচ্ছে:- মানুষের সাধারণ খাদ্য থেকে ফিতরা আদায় করা বৈধ। কেননা সহীহ বুখারীতে আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন,

«كُنَّا نُخْرِجُ فِي عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ زكاة الْفِطْرِ صَاعًا مِنْ طَعَامٍ أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ أَقِطٍ أَوْ صَاعًا مِنْ زَبِيبٍ»

“আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে এক সা‘ পরিমাণ খাদ্য ফিতরা হিসেবে বের করতাম, এক সা‘ খেজুর, এক সা‘ যব, এক সা‘ কিসমিস বা এক সা‘ পনীর।”[6] এ হাদীসে গমের কথা উল্লেখ নেই। তাছাড়া যাকাতুল ফিতরে গম দেওয়া যাবে এরকম সুস্পষ্ট ও বিশুদ্ধ কোনো হাদীস আমার জানা নেই। কিন্তু তারপরও নিঃসন্দেহে গম দ্বারা ফিতরা আদায় বৈধ।

আবদুল্লাহ্ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:

«فَرَضَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ زَكَاةَ الْفِطْرِ طُهْرَةً لِلصَّائِمِ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ وَطُعْمَةً لِلْمَسَاكِينِ»

“রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাকাতুল ফিতর ফরয করেছেন রোযাদ্বারকে অনর্থক কথা ও অশ্লীলতা থেকে পবিত্র করার জন্য ও মিসকীনদের জন্য খাদ্যস্বরূপ।”[7] অতএব, মানুষের প্রচলিত খাদ্য থেকে ফিতরা বের করাই যথেষ্ট; যদিও তা ফিকাহবিদদের উক্তিতে উল্লিখিত পাঁচ প্রকারের অন্তর্ভুক্ত না হয়। কেননা এ প্রকারসমূহ -যেমন পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে- চারটি ছিল। যা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে মানুষের সাধারণ খাদ্য হিসেবে প্রচলিত ছিল। অতএব, চাউল দ্বারা ফিতরা আদায় করা জায়েয; বরং আমি মনে করি বর্তমান যুগে ফিতরা হিসেবে চাউল-ই উত্তম। কেননা তা সহজলভ্য ও মানুষের অধিক পছন্দনীয় বস্তু। তাছাড়া বিষয়টি স্থানভেদে বিভিন্ন রকম হতে পারে। হতে পারে গ্রামাঞ্চলে কোনো কোনো গোষ্ঠির নিকট খেজুর অধিক প্রিয় খাদ্য। তারা খেজুর দ্বারা ফিতরা আদায় করবে। কোনো এলাকায় কিসমিস, কোনো এলাকায় পনীর প্রিয় খাদ্য হতে পারে তারা তা দিয়েই ফিতরা আদায় করবে। প্রত্যেক এলাকা ও সম্প্রদায়ের জন্য সেটাই উত্তম যেটাতে রয়েছে তাদের জন্য অধিক উপকার।

মৃত ব্যক্তির অসীয়তকৃত সম্পদে এবং ইয়াতীমের সম্পদে যাকাত

প্রশ্ন: (৩৭৫) কারো নিকট যদি মৃত ব্যক্তির অসীয়তকৃত সম্পদের এক তৃতীয়াংশ থাকে এবং ইয়াতীমের কিছু সম্পদ থাকে, তাতে কি যাকাত দিতে হবে?

উত্তর: মৃত ব্যক্তির ছেড়ে যাওয়া সম্পদের উক্ত এক তৃতীয়াংশে কোনো যাকাত নেই। কেননা তার কোনো মালিক নেই। তা তো অসীয়ত অনুযায়ী জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করা হবে। কিন্তু ইয়াতীমের অর্থ যদি নিসাব পরিমাণ হয় এবং বছর পূর্ণ হয় তবে তাতে যাকাত ওয়াজিব হবে। ইয়াতীমের অভিভাবক সেই যাকাত বের করবে। বিদ্বানদের মতসমূহের মধ্যে বিশুদ্ধ মত হচ্ছে যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া বা বিবেকবান হওয়া শর্ত নয়; কেননা যাকাত সম্পদে ওয়াজিব হয়।

প্রশ্ন: (৩৭৬) ব্যক্তিগত গাড়ীতে কি যাকাত দিতে হবে?

উত্তর: এতে কোনো যাকাত নেই। স্বর্ণ-রৌপ্য ছাড়া মানুষের ব্যবহৃত কোনো বস্তুতে যাকাত নেই। যেমন, গাড়ী, উট, ঘোড়া, ঘর-বাড়ী ইত্যাদি। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«لَيْسَ عَلَى الْمُسْلِمِ فِي عَبْدِهِ وَلَا فَرَسِهِ صَدَقَةٌ»

“মুসলিম ব্যক্তির ক্রীতদাস, ঘোড়ায় কোনো যাকাত নেই।”[8]

প্রশ্ন: (৩৭৭) যাকাত দেওয়ার সময় কি বলে দিতে হবে যে, এটা যাকাত?

উত্তর: যাকে যাকাত প্রদান করা হবে সে যদি যাকাতের হকদার হয় কিন্তু সাধারণত: সে যাকাত গ্রহণ করে না, তাহলে যাকাত দেওয়ার সময় তাকে বলে দিতে হবে যে, এটা যাকাত। যাতে করে বিষয়টি তার নিকট সুস্পষ্ট হয়; ফলে সে ইচ্ছা হলে যাকাত গ্রহণ করবে ইচ্ছা হলে প্রত্যাখ্যান করবে। আর যে লোক যাকাত গ্রহণে অভ্যস্ত তাকে যাকাত দেওয়ার সময় কোনো কিছু না বলাই উচিৎ। কেননা এতে তার প্রতি দয়া প্রদর্শনের খোঁটা দেওয়া হয়। আল্লাহ বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تُبۡطِلُواْ صَدَقَٰتِكُم بِٱلۡمَنِّ وَٱلۡأَذَىٰ﴾ [البقرة: ٢٦٤]

“হে ঈমানদারগণ খোঁটা দিয়ে ও কষ্ট দিয়ে তোমরা তোমাদের সাদ্কা বা দানসমূহকে বিনষ্ট করে দিও না।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৬৪]

প্রশ্ন: (৩৭৮) এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাকাত স্থানান্তর করার বিধান কী?

উত্তর: এক শহর থেকে অন্য শহরে যাকাত স্থানান্তর করলে যদি কল্যাণ থাকে তবে তা জায়েয। যাকাত প্রদানকারীর কোনো নিকটাত্মীয় যাকাতের হকদার অন্য শহরে থাকে তবে তার নিকট যাকাত প্রেরণ করলে কোনো অসুবিধা নেই।

অনুরূপভাবে জীবন যাত্রার মান উঁচু এমন দেশে বসবাস করে এবং তুলনামূলক অভাবী দেশে যদি যাকাত প্রেরণ করে তবেও কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু যদি অন্য শহরে বা দেশে যাকাত প্রেরণ করাতে তেমন কোনো কল্যাণ না থাকে তবে তা স্থানান্তর করা যাবে না।

অন্য স্থানে বসবাসকারী পরিবারের লোকদের ফিতরা আদায় করা

প্রশ্ন: (৩৭৯) জনৈক ব্যক্তি মক্কায় থাকে আর তার পরিবার রিয়াদে। সে কি নিজ পরিবারের লোকদের ফিতরা মক্কায় আদায় করতে পারবে?

উত্তর: নিজ পরিবারের পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করা জায়েয যদিও তারা তার সাথে তার শহরে না থাকে। অতএব, সে মক্কায় আর তার পরিবার রিয়াদে, সে মক্কাতেই তার ও তার পরিবারের ফিতরা আদায় করতে পারে। কিন্তু উত্তম হচ্ছে যে স্থানে ফিতরা আদায় করার সময় হবে সে স্থানেই তা আদায় করা। ফিতরা আদায় করার সময় সে যদি মক্কায় থাকে তবে মক্কাতেই আদায় করবে। রিয়াদে থাকলে রিয়াদে। পরিবারের কিছু লোক মক্কায় কিছু রিয়াদে থাকলে যারা মক্কায় আছে তারা মক্কায়, যারা রিয়াদে আছে তারা রিয়াদে ফিতরা আদায় করবে। কেননা ফিতরা শরীরের সাথে সম্পর্কিত। সাওম আদায়কারী যেখানে তার ফিতরাও সেখানে।

প্রশ্ন: (৩৮০) ঋণগ্রস্তের হাতে যাকাত দেওয়া উত্তম? না কি তার পাওনাদারের নিকট গিয়ে তার পক্ষ থেকে ঋণ পরিশোধ করা উত্তম?

উত্তর: বিষয়টির বিধান অবস্থাভেদে বিভিন্ন রকম হতে পারে। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি যদি দায়মুক্তি ও ঋণ পরিশোধ করার ব্যাপারে আগ্রহী হয়। অর্থ হাতে এলে ঋণ পরিশোধ করবে এ রকম বিশ্বস্ত হয় তবে যাকাতের অর্থ তার হাতেই প্রদান করা উচিৎ। যাতে করে তা পরিশোধ করতে পারে। তার ব্যাপারটা গোপন থাকে। দাবীদারদের সামনে লজ্জিত হওয়া থেকে রক্ষা পায়।

কিন্তু ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি যদি বেহিসাবী অপব্যয়ী হয়। তার হাতে অর্থ আসলে ঋণ পরিশোধের পরিবর্তে অপ্রয়োজনীয় খাতে তা খরচ করে, তবে যাকাতের অর্থ তাকে না দিয়ে সরাসরি পাওনাদারের নিকট গিয়ে, প্রাপ্য জেনে নিয়ে- তা পরিশোধ করে দিবে অথবা সাধ্যানুযায়ী তার ঋণ হালকা করে দিবে।

প্রশ্ন: (৩৮১) যারাই যাকাত গ্রহণের জন্য হাত বাড়ায় তারাই কি তার হকদার?

উত্তর: যাকাতের জন্য যে কেউ হাত বাড়ালেই তাকে যাকাত দেওয়া উচিৎ নয়। কেননা সম্পদশালী হওয়া সত্বেও অনেক মানুষ পয়সার লোভে হাত বাড়ায়। এসমস্ত লোক কিয়ামত দিবসে এমন অবস্থায় আসবে যে তার মুখমন্ডলে এক টুকরা গোশতও থাকবে না (নাউযুবিল্লাহ) সমস্ত মানুষের সাক্ষাতে কিয়ামত দিবসে তার মুখ মন্ডলের শুধুমাত্র হাড়-হাড্ডি ছাড়া আর কিছুই দেখা যাবে না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«مَنْ سَأَلَ النَّاسَ أَمْوَالَهُمْ تَكَثُّرًا فَإِنَّمَا يَسْأَلُ جَمْرًا فَلْيَسْتَقِلَّ أَوْ لِيَسْتَكْثِرْ»

“যে ব্যক্তি সম্পদ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে মানুষের কাছে হাত পাতে সে যেন জাহান্নামের আগুন চাইল। অতএব, বেশি চাইলে চাইতে পারে বা কম চাইলে চাইতে পারে।”[9]

এ সুযোগে আমি সর্তক করছি সেই লোকদেরকে যারা ভিক্ষা বৃত্তি চর্চা করে। সর্তক করছি সেই লোকদেরকে যারা যাকাতের হকদার না হওয়া সত্বেও যাকাত গ্রহণ করে। সাবধান! যাকাতের হকদার না হয়েও আপনি যদি যাকাত গ্রহণ করেন, তবে আপনি হারাম খেলেন। (নাউযুবিল্লাহ) আল্লাহকে ভয় করুন। অথচ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«وَمَنْ يَسْتَغْنِ يُغْنِهِ اللَّهُ وَمَنْ يَسْتَعْفِفْ يُعِفَّهُ اللَّهُ»

“যে ব্যক্তি অভাব মুক্ত থাকতে চায় আল্লাহ তাকে অভাবমুক্ত করেন। যে ব্যক্তি পবিত্র থাকতে চায় আল্লাহ তাকে পবিত্র করে দেন।”[10]

তবে কোনো লোক যদি আপনার কাছে হাত পাতে, আর তার বাহ্যিক অবস্থা দেখে আপনি মনে করেন সে যাকাতের হকদার, তবে তাকে যাকাত দিলে আদায় হয়ে যাবে এবং আপনি দায় মুক্ত হবেন। পরবর্তীতে যদি জানা যায় যে, সে যাকাতের হকদার ছিল না তবে পুনরায় যাকাত দিতে হবে না। দলীল:

«قَالَ رَجُلٌ لَأَتَصَدَّقَنَّ الليلة بِصَدَقَةٍ فَخَرَجَ بِصَدَقَتِهِ فَوَضَعَهَا فِي يَدِ سَارِقٍ فَأَصْبَحُوا يَتَحَدَّثُونَ تُصُدِّقَ عَلَى سَارِقٍ فَقَالَ اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ لَأَتَصَدَّقَنَّ بِصَدَقَةٍ فَخَرَجَ بِصَدَقَتِهِ فَوَضَعَهَا فِي يَدَيْ زَانِيَةٍ فَأَصْبَحُوا يَتَحَدَّثُونَ تُصُدِّقَ اللَّيْلَةَ عَلَى زَانِيَةٍ فَقَالَ اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ عَلَى زَانِيَةٍ لَأَتَصَدَّقَنَّ بِصَدَقَةٍ فَخَرَجَ بِصَدَقَتِهِ فَوَضَعَهَا فِي يَدَيْ غَنِيٍّ فَأَصْبَحُوا يَتَحَدَّثُونَ تُصُدِّقَ عَلَى غَنِيٍّ فَقَالَ اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ عَلَى سَارِقٍ وَعَلَى زَانِيَةٍ وَعَلَى غَنِيٍّ فَأُتِيَ فَقِيلَ لَهُ أَمَّا صَدَقَتُكَ عَلَى سَارِقٍ فَلَعَلَّهُ أَنْ يَسْتَعِفَّ عَنْ سَرِقَتِهِ وَأَمَّا الزَّانِيَةُ فَلَعَلَّهَا أَنْ تَسْتَعِفَّ عَنْ زِنَاهَا وَأَمَّا الْغَنِيُّ فَلَعَلَّهُ يَعْتَبِرُ فَيُنْفِقُ مِمَّا أَعْطَاهُ اللَّهُ»

“একদা (বনী ইসরাঈলের) জনৈক ব্যক্তি বলল, অবশ্যই আমি এ রাত্রে কিছু দান করব। এ উদ্দেশ্যে সে স্বীয় দান নিয়ে বের হলো এবং (গোপনীয়তার কারণে নিজের অজান্তে) এক চোরের হাতে তা রেখে দিল। সকালে মানুষে বলাবলি করতে লাগল, কি আশ্চর্য! আজ রাতে এক চোরকে দান করা হয়েছে! সে বলল, হে আল্লাহ চোরের হাতে আমার দান যাওয়ার কারণে সকল প্রশংসা তোমার জন্য। অবশ্যই (আবার) দান করব। অতঃপর সে তার দান নিয়ে বের হলো এবং এক ব্যভিচারিনীর হাতে রেখে দিল। সকালে মানুষ বলাবলি করতে লাগল, কি আশ্চর্য! গত রাতে একজন ব্যভিচারিনীকে দান করা হয়েছে। সে বলল, হে আল্লাহ ব্যভিচারিনীকে দান করার কারণে সমসত প্রশংসা তোমারই প্রাপ্য। অবশ্যই (আবার) সাদকা করব। সে তার দান নিয়ে বের হলো অতঃপর এক ধনী লোকের হাতে দিয়ে দিল। সকালে মানুষ বলতে লাগল, আশ্চর্য ব্যাপার! আজ রাতে একজন ধনী মানুষকে দান করা হয়েছে। সে বললঃ হে আল্লাহ যাবতীয় প্রশংসা তোমারই প্রাপ্য। চোর ব্যভিচারিনী এবং ধনী লোককে দান করার কারণে।

তার নিকট আসা হলো (কোন ঐশী দূত হতে পারে), অতঃপর তাকে বলা হলো, তোমার দান চোরের হাতে যাওয়ার কারণে- হতে পারে সে চুরি থেকে বিরত থাকবে। আর ব্যভিচারিনী, হতে পারে সে এ দানের কারণে ব্যভিচার থেকে বিরত হবে। আর ধনী ব্যক্তি এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে হতে পারে সেও তার সম্পদ থেকে দান করবে।”[11]

দেখুন সৎ নিয়তের কিরূপ প্রভাব হয়। অতএব, যে ব্যক্তি আপনার কাছে হাত পেতেছে আপনি তাকে ফকীর বা অভাবী মনে করে দান করেছেন কিন্তু পরে জানা গেল সে অভাবী নয় সম্পদশালী তবে আপনার যাকাত হয়ে যাবে। পুনরায় আদায় করতে হবে না।

যাকাত বন্টনের কাজে নিযুক্ত ব্যক্তি যাকাতের হকদার নয়

প্রশ্ন: ৩৮২) জনৈক ধনী ব্যক্তি একজন লোককে বলল আপনি যাদেরকে হকদার মনে করেন তাদের কাছে আমার এ যাকাত বন্টন করে দিন। এখন এ ব্যক্তি কি যাকাতের কাজে নিযুক্ত হিসেবে গণ্য হবে এবং কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী যাকাতের হকদার হবে?

উত্তর: না, এ লোক যাকাতের কাজে নিযুক্ত বলে গণ্য হবে না। ফলে সে যাকাতেরও হকদার হবে না। কেননা সে নির্দিষ্ট ভাবে এক ব্যক্তির যাকাত বন্টন করার দায়িত্ব নিয়েছে। (আল্লাহই ভালো জানেন) পবিত্র কুরআনের বাক্য ভঙ্গির গোপন উদ্দেশ্য হচ্ছে এটাই- আল্লাহ বলেন, والعاملين عليها এখানে علي অব্যয় দ্বারা এক প্রকার কর্তৃত্ব বুঝা যায়। অর্থাৎ যাকাত আদায় ও বন্টনের কাজে সরকারের পক্ষ থেকে নিযুক্ত কর্মচারী। এ জন্য নির্দিষ্ট ভাবে একক ব্যক্তির পক্ষ থেকে নিযুক্ত কর্মচারী কুরআনে বর্ণিত উক্ত প্রকারের অন্তর্ভুক্ত হবে না।

প্রশ্ন: (৩৮৩) দুর্বল ঈমানের অধিকারী কোনো ব্যক্তিকে ঈমান শক্তিশালী করার জন্য যাকাত দেওয়া যাবে কী? সে কিন্তু কোনো এলাকার নেতা বা সরদার নয়।

উত্তর: মাসআলাটি বিদ্বানদের মাঝে মতবিরোধপূর্ণ। আমার মতে ইসলামের প্রতি ধাবিত করতে ঈমান শক্তিশালী করার জন্য তাকে যাকাত দিলে কোনো অসুবিধা নেই। যদিও সে কোনো কবীলা বা এলাকায় সরদার বা নেতা না হয়। যদিও একান্ত ব্যক্তিগতভাবে উক্ত উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়। কেননা আল্লাহ বলেন, “তাদের হৃদয়গুলো ইসলামের দিকে ধাবিত করার জন্য।” যখন ফকীর ও অভাবীকে যাকাত দেওয়া বৈধ তখন দুর্বল ঈমানের অধিকারী ব্যক্তিকে তা প্রদান করা তো আরো অধিক বৈধ। কেননা কোনো ব্যক্তির শরীর শক্তিশালী করার চেয়ে তার ঈমানকে শক্তিশালী করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন: (৩৮৪) ইসলামী জ্ঞান শিক্ষায় নিয়োজিত ছাত্রকে যাকাত দেওয়ার বিধান কী?

উত্তর: ইসলামী জ্ঞান শিক্ষার কাজে সম্পূর্ণরূপে নিয়োজিত ছাত্রদেরকে যাকাত দেওয়া জায়েয, যদিও তারা কামাই রোজগার করার সামর্থ রাখে। কেননা ইসলামী জ্ঞান শিক্ষা করা এক প্রকার জিহাদ। আর আল্লাহর পথে জিহাদ হচ্ছে যাকাতের একটি খাত। আল্লাহ বলেন,

﴿إِنَّمَا ٱلصَّدَقَٰتُ لِلۡفُقَرَآءِ وَٱلۡمَسَٰكِينِ وَٱلۡعَٰمِلِينَ عَلَيۡهَا وَٱلۡمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمۡ وَفِي ٱلرِّقَابِ وَٱلۡغَٰرِمِينَ وَفِي سَبِيلِ ٱللَّهِ وَٱبۡنِ ٱلسَّبِيلِۖ فَرِيضَةٗ مِّنَ ٱللَّهِۗ وَٱللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٞ ٦٠﴾ [التوبة: ٦٠]

“যাকাত তো হচ্ছে শুধুমাত্র গরীবদের এবং অভাবগ্রস্তদের আর এ যাকাত আদায়ের জন্য নিযুক্ত কর্মচারীদের এবং ইসলামের প্রতি যাদের হৃদয় আকৃষ্ট করতে হয়, গোলাম আযাদ করার জন্য, ঋণ পরিশোধে, আল্লাহর পথে জিহাদে আর মুসাফিরদের সাহায্যে। এ বিধান আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী অতিপ্রজ্ঞাময়।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৬০]

কিন্তু শিক্ষার্থী যদি শুধুমাত্র দুনিয়াবী শিক্ষায় সম্পূর্ণরূপে ব্রতী থাকে তবে তাকে যাকাত দেওয়া যাবে না। আমরা তাকে বলব তুমি তো দুনিয়ার কর্মেই ব্যস্ত আছ। অতএব, চাকরী করার মাধ্যমে তো দুনিয়া অর্জন করতে পার। তাই তোমাকে যাকাত দেওয়া যাবে না।

কিন্তু আমরা যদি এমন লোক পাই যে নিজ পানাহার ও বাসস্থানের জন্য রোজগার করতে সক্ষম কিন্তু তার নিকট এমন সম্পদ নেই যা দ্বারা সে বিবাহ করতে পারে, তবে যাকাতের অর্থ দিয়ে কি এ ব্যক্তির বিবাহের ব্যবস্থা করা যাবে?

উত্তর: হ্যাঁ, বিবাহের জন্য তাকে যাকাত দেওয়া যাবে। যাকাত থেকে তার পূর্ণ মাহর আদায় করা যাবে।

যদি প্রশ্ন করা হয় বিবাহে অপরাগ ব্যক্তিকে যাকাত দেওয়া কীভাবে জায়েয হতে পারে?

জবাবে আমরা বলব: কেননা মানুষের বিবাহের প্রয়োজনীয়তা অত্যধিক। কখনো খানা পিনার মতই এর প্রয়োজনীয়তা মানুষের জীবনে প্রকট হয়ে দেখা যায়। এ জন্য বিদ্বানগণ বলেন, কারো ভরণ-পোষণের অর্থ বহন করা যার ওপর আবশ্যক থাকে তার উপর ওয়াজিব হচ্ছে তার বিবাহেরও ব্যবস্থা করে দেওয়া- যদি তার কাছে প্রয়োজনীয় সম্পদ থাকে। অতএব, পুত্র যদি বিবাহ উপযুক্ত হয় এবং বিবাহের দরকার মনে করে তবে পিতার উপর ওয়াজিব হচ্ছে পুত্রের বিবাহের ব্যবস্থা করে দেওয়া। কিন্তু আমি শুনেছি পুত্র যদি বিবাহের কথা উত্থাপন করে তবে কোনো কোনো পিতা নিজেদের যৌবনকালের কথা ভুলে গিয়ে পুত্রকে ধমক দেন আর বলেন, নিজের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পরিশ্রম করে উপার্জন কর তারপর বিবাহ কর। এটা মোটেও জায়েয নয়। পিতা সামর্থবান থাকলে পুত্রের সাথে এরকম ব্যবহার করা হারাম। পিতার সামর্থ থাকা সত্বেও পুত্রের বিবাহের ব্যবস্থা না করলে সে অবশ্যই কিয়ামত দিবসে পিতার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করবে।

একটি মাসাআলা: জনৈক ব্যক্তির কয়েকটি পুত্র সন্তান আছে। সে যদি উপযুক্ত বড় ছেলের বিবাহ নিজের খরচে প্রদান করে, তবে মৃত্যুর পূর্বে ছোট ছেলেদের জন্য কি নিজ সম্পত্তি থেকে বড় ছেলের মাহরের অনুরূপ প্রদান করার ওছিয়ত করে যেতে পারে?

উত্তর: না এরূপ করা জায়েয হবে না। তবে পিতার জীবদ্দশাতেই যদি ছোট ছেলেরা বিবাহের উপযুক্ত হয় এবং বড় ছেলের ন্যায় তাদের নিজ খরচে বিবাহ দিয়ে দেয় তবে তা জায়েয। কিন্তু তারা এখনও ছোট তাই মৃত্যুর পর তাদের জন্য আলাদা অছিয়ত করে যাবে তা হারাম। এর দলীল হচ্ছে: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَعْطَى لِكُلِّ ذِي حَقٍّ حَقَّهُ فَلَا وَصِيَّةَ لِوَارِثٍ»

“নিশ্চয় আল্লাহ প্রত্যেক অধিকারীকে তার নির্দিষ্ট অধিকার প্রদান করেছেন। অতএব, উত্তরাধিকারের জন্য কোনো অছিয়ত নেই।”[12]

প্রশ্ন: (৩৮৫) মুজাহিদদেরকে যাকাত প্রদান করা কি জায়েয?

উত্তর: যাকাত প্রদানের খাতসমূহের মধ্যে আল্লাহ তা‘আলা মুজাহিদদের কথা উল্লেখ করেছেন। অতএব, আল্লাহর পথের মুজাহিদেরকে যাকাত প্রদান করা জায়েয। কিন্তু আল্লাহর পথে মুজাহিদ কে? জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লড়াইকারী সর্ম্পকে প্রশ্ন করলেন, একজন বীরত্ব প্রকাশ করার জন্য লড়াই করে, একজন গোত্রীয় সম্প্রীতি রক্ষার জন্য লড়াই করে, একজন নিজের শক্তি প্রদর্শনের জন্য যুদ্ধ করে, এদের মধ্যে কে প্রকৃত পক্ষে আল্লাহর পথে? এর জবাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের ইনসাফপূর্ণ মূল্যবান একটি মাপকাঠি প্রদান করেছেন, তিনি বলেন,

«مَنْ قَاتَلَ لِتَكُونَ كَلِمَةُ اللَّهِ هِيَ الْعُلْيَا فَهُوَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ»

“যে ব্যক্তি লড়াই করবে আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত করার উদ্দেশ্যে সেই প্রকৃত পক্ষে আল্লাহর পথে যুদ্ধকারী।”[13] অতএব, প্রত্যেক যে ব্যক্তি আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত করার জন্য যুদ্ধ করবে- লড়াই করবে আল্লাহর শরী‘আতকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে, কাফির রাষ্ট্রে আল্লাহর দীনকে কায়েম করার জন্য সে-ই আল্লাহর পথে, সেই মুজাহিদ। তাকে যাকাত প্রদান করা যাবে। তাকে নগদ অর্থ প্রদান করবে, যাতে জিহাদের পথে তা ব্যয় করতে পারে অথবা যাকাতের অর্থ দ্বারা যুদ্ধের সরঞ্জাম ক্রয় করে দিবে।

প্রশ্ন: (৩৮৬) মসজিদ নির্মাণের কাজে যাকাত প্রদান করার বিধান কী?

উত্তর: মসজিদ নির্মাণের কাজ কুরআনের বাণী ‘ফি সাবিলিল্লার’ অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা তাফসীরবিদগণ ‘ফি সাবিলিল্লার’ তাফসীরে উল্লেখ করেছেন: এ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর পথে জিহাদ।

মসজিদ নির্মাণসহ অন্যান্য জনকল্যাণমূলক কাজে যাকাত ব্যয় করা প্রকৃত কল্যাণের পথকে বিনষ্ট করারই নামান্তর। কেননা কৃপণতা ও লোভ অনেক লোকের মধ্যে স্বভাবজাত প্রকৃতি। যখন তারা দেখবে মসজিদ নির্মাণ এবং অন্যান্য সব ধরণের কল্যাণমূলক ক্ষেত্রে যাকাত দেওয়া হচ্ছে, তখন তারা সমস্ত যাকাত সে সকল কাজেই ব্যবহার করা শুরু করবে। ফলে দুঃস্থ অভাবী মানুষ তাদের অভাব অনটনের মধ্যেই রয়ে যাবে।

প্রশ্ন: (৩৮৭) নিকটাত্মীয়দের যাকাত প্রদান করার বিধান কী?

উত্তর: নিকটাত্মীয়ের ব্যাপারে মূলনীতি হচ্ছে: নিকটাত্মীয়ের ব্যয়ভার বহন করা যদি যাকাত প্রদানকারীর উপর ওয়াজিব বা আবশ্যক হয়ে থাকে, তবে তাকে (উক্ত নিকটাত্মীয়কে) যাকাত দেওয়া জায়েয নয়। কিন্তু সে যদি এমন ব্যক্তি হয় যার খরচ বহন করা যাকাত প্রদানকারীর উপর আবশ্যক নয়, তবে তাকে যাকাত প্রদান করা জায়েয যেমন সহদোর ভাই। যদি ভাইয়ের পুত্র সন্তান থাকে, তবে তার ব্যয়ভার বহন করা অন্য ভাইয়ের উপর আবশ্যক নয়। কেননা তার পুত্র সন্তান থাকার কারণে দু’ভাই পরষ্পর মীরাছ (উত্তরাধিকার) পাবে না। এ অবস্থায় উক্ত ভাই যদি যাকাতের হকদার হয় তবে তাকে যাকাত দেওয়া যাবে।

অনুরূপভাবে নিকটাত্মীয়ের কোনো ব্যক্তি ভরণ-পোষণের ক্ষেত্রে যদি অভাবী না হয়, কিন্তু সে ঋণগ্রস্ত, তবে ঋণ পরিশোধ করার জন্য তাকে যাকাত প্রদান করা যাবে। যদিও উক্ত নিকটাত্মীয় নিজের পিতা মাতা ছেলে বা মেয়ে হোক। যখন এ ঋণ ভরণ-পোষণে ত্রুটির কারণে নয়।

উদাহরণ: জনৈক ব্যক্তির পুত্র গাড়ি দুর্ঘটনা কবলিত হওয়ার কারণে বড় একটি জরিমানার সম্মুখিন হয়েছে। অথচ তার নিকট জরিমানা আদায় করার মত কোনো অর্থ নেই। এ অবস্থায় তার পিতা নিজের যাকাতের অর্থ পুত্রের ঋণ পরিশোধ করার জন্য প্রদান করলে তা বৈধ হবে। কেননা এ ঋণ ভরণ-পোষণের কারণে নয়। এমনিভাবে কোনো মানুষ যাকাতের কারণ ছাড়া অন্য কারণে যদি কোনো আত্মীয়কে যাকাত থেকে প্রদান করে, তবে তা জায়েয।

প্রশ্ন: (৩৮৮) যাকাত-সাদকা আদায় করা কি শুধু রামাযান মাসের জন্যই বিশিষ্ট?

উত্তর: দান-সাদকা রামাযান মাসের সাথে নির্দিষ্ট নয়; বরং তা সর্বাবস্থায় প্রদান করা মুস্তাহাব। আর নিসাব পরিমাণ সম্পদে বছর পূর্ণ হলেই যাকাত দেওয়া ওয়াজিব। রামাযানের অপেক্ষা করবে না; হ্যাঁ রামাযান যদি নিকটবর্তী হয় যেমন শাবান মাসে বছর পূর্ণ হচ্ছে- তবে রামাযান পর্যন্ত বিলম্ব করে যাকাত বের করলে কোনো অসুবিধা নেই।

কিন্তু যাকাত যদি উদাহরণস্বরূপ মুহাররমে আবশ্যক হয়, তবে রামাযান পর্যন্ত অপেক্ষা করা জায়েয হবে না। অবশ্য যদি পূর্ববর্তী রামাযানে অগ্রীম যাকাত বের করে তবে তা জায়েয। কিন্তু ওয়াজিব হওয়ার পর বিলম্ব করা জায়েয নয়। কেননা নির্দিষ্ট কারণের সাথে সংশ্লিষ্ট ওয়াজিবসমূহ উক্ত কারণ পাওয়া গেলেই আদায় করতে হবে। বিলম্ব করা জায়েয হবে না। তাছাড়া মানুষের জীবনের এমন তো কোনো গ্যারান্টি নেই যে বিলম্বিত সময় পর্যন্ত সে বেঁচে থাকবে। যদি যাকাত প্রদান করার পূর্বেই মারা যায় তবে তার যিম্মায় যাকাত রয়েই গেল। হতে পারে উত্তরাধিকারীগণ বিষয়টি না জানার কারণে তার পক্ষ থেকে যাকাত আদায় করবে না অথবা হতে পারে সম্পদের লোভে ও মোহে পড়ে তারা তা করবে না।

কিন্তু দান-সাদকার জন্য নির্ধারিত কোনো সময় নেই। বছরের প্রতিদিনই তার সময়। কিন্তু লোকেরা রামাযান মাসে দান সাদকা ও যাকাত প্রদান পছন্দ করে। কেননা সময়টি ফযীলত পূর্ণ। দান ও বদান্যতার সময়। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বাধিক দানশীল। রামাযান মাসে তিনি আরো বেশি দানশীল হতেন, যখন জিবরীল আলাইহিস সালাম তাঁর সাথে সাক্ষাত করতেন এবং তাঁকে কুরআন পড়াতেন।

কিন্তু জানা আবশ্যক যে রামাযান মাসে যাকাত প্রদান বা দান সাদকার ফযীলত নির্দিষ্ট সময়ের (শুধু এক মাস) ফযীলতের সাথে সংশ্লিষ্ট। এর চাইতে ফযীলতপূর্ণ অন্য কোনো সময় বা অবস্থা যদি পাওয়া যায়, তবে সে সময়ই দান করা বা যাকাত প্রদান করা উত্তম। যেমন রামাযান ছাড়া অন্য সময় যদি ফকীর মিসকীনদের অভাব প্রকট আকার ধারণ করে বা দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা যায়, তবে সে সময় দান করার ছাওয়াব রামাযান মাসে দান করার চাইতে নিঃসন্দেহে বেশি।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফকীর মিসকীনদের অবস্থা রামাযান ছাড়া অন্যান্য মাসে বেশি শোচনীয় থাকে। রামাযান মাসে দান সাদকা বা যাকাতের ব্যাপকতার কারণে তারা সে সময় অনেকটা অভাবমুক্ত হয়। কিন্তু বছরের অবশিষ্ট সময়ে তারা প্রচণ্ড অভাব ও অনটনের মাঝে দিন কাটায়। সুতরাং বিষয়টির প্রতি লক্ষ্য করা উচিৎ।

সাদকায়ে জারিয়া কাকে বলে?

প্রশ্ন: (৩৮৯) মানুষ তার জীবদ্দশায় যা দান করে তাকেই কি সাদকায়ে জারিয়া বলে? নাকি মৃত্যুর পর আত্মীয়-স্বজনের দানকে সাদকায়ে জারিয়া বলে?

উত্তর: হাদীসে এসেছে: মানুষ মারা গেলে তিনটি আমল ছাড়া সব আমল বন্ধ হয়ে যায়।

১) সাদকায়ে জারিয়া

২) ইসলামী জ্ঞান, উপকারী বিদ্যা লিপিবদ্ধ করে যাওয়া

৩) সৎ সন্তানদের দো‘আ।[14]

এ হাদীসের বাহ্যিক অর্থে বুঝা যায়, জীবিত অবস্থায় ব্যক্তির দানকেই সাদকা জারিয়া বলা হয়। মৃত্যুর পর তার সন্তানদের দানকে নয়। কেননা মৃত্যুর পর সন্তানদের থেকে যা হবে তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘অথবা সৎ সন্তান যে তার জন্য দো‘আ করবে।’

অতএব, কোনো ব্যক্তি যদি মৃত্যুর পূর্বে কিছু দান করার অসীয়ত করে যায় অথবা ওয়াক্ফ্ করে যায়, তবে তা সাদকা জারিয়া হিসাবে গণ্য হবে। মৃত্যুর পর কবরে সে তা থেকে উপকৃত হবে। অনুরূপভাবে ইসলামী জ্ঞান, তার উপার্জন থেকে হতে হবে। এমনিভাবে সন্তান, যদি পিতার জন্য দো‘আ করে।

এ জন্য কেউ যদি প্রশ্ন করে আমি কি পিতার জন্য দু’রাকাত সালাত পড়ব? নাকি নিজের জন্য দু’রাকাত সালাত আদায় করে এর মধ্যে পিতার জন্য দো‘আ করব? আমি বলব: উত্তম হচ্ছে নিজের জন্য দু’রাকাত সালাত আদায় করবেন এবং এর মধ্যে পিতার জন্য দো‘আ করবেন।

কেননা এ দিকেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশনা প্রদান করেছেন। তিনি বলেন, অথবা ‘সৎ সন্তান’ যে তার জন্য দো‘আ করবে, এরূপ বলেন নি যে তার জন্য সালাত আদায় করবে বা অন্য কোনো নেক আমল করবে।

স্বামীর সম্পদ থেকে তার বিনা অনুমতিতে স্ত্রীর দান করা জায়েয নয়

প্রশ্ন: ৩৯০) স্ত্রী যদি স্বামীর সম্পদ থেকে নিজের জন্য দান করে বা তা মৃত নিকটাত্মীয়ের জন্য দান করে, তবে তা জায়েয হবে কী?

উত্তর: একথা নিশ্চিত জানা যে, স্বামীর সম্পদ স্বামীরই। অনুমতি ছাড়া কারো সম্পদ দান করা কারো জন্য বৈধ নয়।

স্বামী যদি অনুমতি প্রদান করে তবে স্ত্রীর নিজের জন্য বা তার মৃত আত্মীয়ের জন্য দান করা জায়েয, কোনো অসুবিধা নেই। অনুমতি না পেলে এরূপ করা হালাল নয়। কেননা এটা তার সম্পদ। কারো সম্পদ তার আত্মার সন্তুষ্টিতে প্রদান করা ছাড়া অন্যের দ্বারা খরচ করা বৈধ নয়।

বন্টনের জন্য যাকাত নিয়ে এসে নিজের কাছেই রেখে দেয়া

প্রশ্ন: (৩৯১) জনৈক ফক্বীর এক ধনী লোকের যাকাত নিয়ে আসে এ কথা বলে যে, তার পক্ষ থকে সে তা বিতরণ করে দিবে। তারপর তা সে নিজের কাছেই রেখে দেয়। তার এ কাজের বিধান কী?

উত্তর: এটা হারাম। ইহা আমানতের খিয়ানত। কেননা মালিক তো দায়িত্বশীল হিসেবে তাকে যাকাত দিয়েছে। যাতে করে তা বন্টন করে দেয়। অথচ সে নিজেই তা রেখে দেয়। বিদ্বানগণ উল্লেখ করেছেন, কোনো বস্তুর জিম্মাদারপ্রাপ্ত ব্যক্তি উক্ত বস্তু থেকে নিজের জন্য কোনো কিছু নিতে পারবে না। অতএব, এ ব্যক্তির ওপর আবশ্যক হচ্ছে যাকাতের মালিককে একথা বলে দেওয়া যে, ইতোপূর্বে যা সে নিয়েছিল তা নিজের কাছে রেখে দিয়েছে। মালিক যদি তাতে অনুমতি দিয়ে দেয় তো ভালো, অন্যথা যা সে নিয়েছে তার জিম্মাদার হবে এবং তাকে তা আদায় করতে হবে।

এ উপলক্ষে একটি বিষয়ে আমি মানুষকে সতর্ক করতে চাই। তা হচ্ছে, কোনো ব্যক্তি ফক্বীর থাকাবস্থায় যাকাত নিয়ে থাকে। তারপর আল্লাহ তাকে সম্পদশালী করেন। কিন্তু তখনও মানুষ তাকে যাকাত দিতে থাকে আর সেও নিতে থাকে। বলে, আমি তো চাইনি। আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার কাছে এ রিযিক এসেছে..। এটা কিন্তু হারাম। কেননা আল্লাহ যাকে অভাবমুক্ত করেন, যাকাত গ্রহণ করা তার জন্য হারাম।

আবার কেউ কেউ যাকাত নিয়ে নিজে খায় না, অন্য মানুষকে দেয়। কিন্তু যাকাতের মালিক বিষয়টি জানেনা বা তাকে এ ব্যাপারে দায়িত্বও দেওয়া হয় নি। এরূপ করাও তার জন্য হরাম। যদিও এ লোকের বিষয়টি আগের জনের চাইতে কিছুটা হালকা। কিন্তু তারপরও নাজায়েয। সে যাকাতের মালিককে বিষয়টি অবহিত করে অনুমতি নিয়ে নিবে। অনুমতি না দিলে তার ঘাড়ে যিম্মাদারী রয়ে যাবে। (আল্লাহই অধিক জ্ঞান রাখেন)

দীন ইসলামের ভিত্তি হচ্ছে পাঁচটি বিষয়ের ওপর। এ পাঁচটি ভিত্তি সম্পর্কে মানুষের প্রশ্নের অন্ত নেই, জিজ্ঞাসার শেষ নেই। তাই নির্ভরযোগ্য প্রখ্যাত আলিমে দীন, যুগের অন্যতম সেরা গবেষক আল্লামা শাইখ মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল-উসাইমীন রহ. ঐ সকল জিজ্ঞাসার দলীল ভিত্তিক নির্ভরযোগ্য জবাব প্রদান করেছেন উক্ত বইটিতে। প্রতিটি জবাব পবিত্র কুরআন-সুন্নাহ ও পূর্বসূরী নির্ভরযোগ্য উলামাদের মতামত থেকে দেওয়া হয়েছে। সেই জবাবগুলোকে একত্রিত করে বই আকারে বিন্যস্ত করেছেন জনাব ‘ফাহাদ ইবন নাসের ইবন ইবরাহীম আল-সুলাইমান’। নাম দিয়েছেন ‘ফাতওয়া আরকানুল ইসলাম’


[1] সহীহ বুখারী, কিতাবুল মুসাক্বাত, অনুচ্ছেদ: খেজুরের বাগানে কারো যদি চলার পথ থাকে বা পানির ব্যবস্থা থাকে সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: বেচা-কেনা, অনুচ্ছেদ: ফল সমৃদ্ধ যে ব্যক্তি খেজুর গাছ বিক্রয় করে ।

[2] সহীহ বুখারী, অধ্যায়: যাকাত, অনুচ্ছেদ: যাকাত আবশ্যক হওয়া সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: ঈমান, অনুচ্ছেদ: কালেমায়ে শাহাদাত ও ইসলামী শরীয়তের প্রতি আহবান করা।

[3] সহীহ বুখারী, অধ্যায়: যাকাত, অনুচ্ছেদ: যাকাত আবশ্যক হওয়া সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: ঈমান, অনুচ্ছেদ: কালেমায়ে শাহাদাত ও ইসলামী শরী‘আতের প্রতি আহ্বান করা।

[4] সহীহ বুখারী ও মুসলিম।

[5] আবু দাউদ, অধ্যায়: যাকাত, অনুচ্ছেদ: যাকাতুল ফিতর, ইবন মাজাহ, অধ্যায়: যাকাত, অনুচ্ছেদ: সাদাকা ফিতর।

[6] সহীহ বুখারী, অধ্যায়: যাকাত, অনুচ্ছেদ: ফিতরা হচ্ছে এক সা‘ পরিমাণ খাদ্য।

[7] আবু দাউদ, অধ্যায়: যাকাত, অনুচ্ছেদ: যাকাতুল ফিতর, ইবন মাজাহ, অধ্যায়: যাকাত, অনুচ্ছেদ: সাদাকাতুল ফিতর।

[8] সহীহ বুখারী, অধ্যায়: যাকাত, অনুচ্ছেদ: মুসলিম ব্যক্তির ক্রীতদাসে যাকাত নেই সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: যাকাত, অনুচ্ছেদ: মুসলিম ব্যক্তির ক্রীতদাস ও ঘোড়ার যাকাত নেই।

[9] সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: যাকাত, অনুচ্ছেদ: মানুষের কাছে ভিক্ষা চাওয়া নাজায়েয।

[10] সহীহ বুখারী, অধ্যায়: যাকাত, অনুচ্ছেদ: সম্পদের প্রতি লোভমুক্ত না হয়ে সাদকা হয় না সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: যাকাত, অনুচ্ছেদ: পবিত্র থাকা ও ধৈর্যাবলম্বন করার ফযীলত।

[11] সহীহ বুখারী, অধ্যায়: যাকাত, অনুচ্ছেদ: ধনী মানুষের অজান্তে তাকে দান করা সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: যাকাত, অনুচ্ছেদ: দানকারীর প্রতিদানের আবশ্যকতা যদিও তা অপাত্রে দেওয়া হয়।

[12] আবু দাঊদ, অধ্যায়: বেচা-কেনা, অনুচ্ছেদ: উত্তরাধিকারকে ওছীয়ত করার বর্ণনা। তিরমিযী, ওছীয়ত করার বর্ণনা,

[13] সহীহ বুখারী, অধ্যায়: জিহাদ, অনুচ্ছেদ: যে ব্যক্তি আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত করার জন্য লড়াই করে।

[14] সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: অসীয়ত, অনুচ্ছেদ: মুত্যুর পর মানুষ যার সাওয়াব পেয়ে থাকে তার বর্ননা।

Leave a Reply