রাঃসাঃ কর্তৃক আহলে কিতাব ও অন্যান্যদের প্রশ্নের জবাব

রাঃসাঃ কর্তৃক আহলে কিতাব ও অন্যান্যদের প্রশ্নের জবাব

রাঃসাঃ কর্তৃক আহলে কিতাব ও অন্যান্যদের প্রশ্নের জবাব << নবুওয়তের মুজিযা হাদীসের মুল সুচিপত্র দেখুন

একাদশ পরিচ্ছেদ: রাঃসাঃ কর্তৃক আহলে কিতাব ও অন্যান্যদের প্রশ্নের জবাব যা তারা গোপন রাখত।

`আবদুল্লাহ ইবনু মাস`ঊদ রাদি. আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমি রাসূলুল্লাহ্‌ রাঃসাঃ এর সঙ্গে মদীনার বসতিহীন এলাকা দিয়ে চলছিলাম। তিনি একখানি খেজুরের ডালে ভর দিয়ে একদল ইহুদীর কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তারা একজন অন্যজনকে বলতে লাগল, `তাঁকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা কর।` আর একজন বলল, `তাঁকে কোনো প্রশ্ন করো না, হয়ত এমন কোনো জওয়াব দিবেন যা তোমার পছন্দ করো না।` আবার তাদের কেউ কেউ বলল, `তাঁকে আমরা প্রশ্ন করবই।` তারপর তাদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, `হে আবুল কাসিম রূহ কী?` রাসূলুল্লাহ্‌ রাঃসাঃ চুপ করে রইলেন, আমি মনে মনে বলিলাম, তাহাঁর প্রতি অহী নাযিল হচ্ছে। তাই আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর যখন সে অবস্থা কেটে গেল তখন তিনি বলিলেন,

﴿ وَيَسۡ‍َٔلُونَكَ عَنِ ٱلرُّوحِۖ قُلِ ٱلرُّوحُ مِنۡ أَمۡرِ رَبِّي وَمَآ أُوتِيتُم مِّنَ ٱلۡعِلۡمِ إِلَّا قَلِيلٗا ٨٥ ﴾ [الاسراء: ٨٥]

“তারা তোমাকে রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বল, রূহ আমার প্রতিপালকের আদেশঘটিত এবং তাদেরকে সামান্যই জ্ঞান দেওয়া হয়েছে।” [কোরআনের সুরা ইসরা: ৮৫]

`আমাশ [রহমাতুল্লাহি আলাইহি] বলেন, এভাবেই আয়াতটিকে আমাদের কিরাআতে –এর স্থলে পড়া হয়েছে।[1]

ইবনু আব্বাস রাদি. আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, কুরাইশরা ইহুদীদেরকে বলল, তোমরা আমাদেরকে কিছু প্রশ্ন দাও এ লোকটিকে জিজ্ঞেস করি। তারা বলল, তাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো। তখন এ আয়াত নাযিল হয়,

“তারা তোমাকে রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বল, রূহ আমার প্রতিপালকের আদেশঘটিত এবং তাদেরকে সামান্যই জ্ঞান দেওয়া হয়েছে।” [কোরআনের সুরা ইসরা: ৮৫]

তারা বলল, আমাদেরকে অনেক ইলম দান করা হয়েছে। আমাদেরকে তাওরাত দান করা হয়েছে। আর যাকে তাওরাত দান করা হয়েছে মূলতঃ তাকে অনেক কল্যাণ দান করা হয়েছে। তখন আল্লাহ নাযিল করেন,

“বল, `আমার রবের কথা লেখার জন্য সমুদ্র যদি কালি হয়ে যায় তবে সমুদ্র নিঃশেষ হয়ে যাবে আমার রবের কথা শেষ হওয়ার আগেই”। [কোরআনের সুরা আল-কাহফ: ১০৯। [2]

আনাস ইবনু মালিক রাদি. আনহু হইতে বর্ণিত, দ্বিপ্রহরের পর নাবী রাঃসাঃ বেরিয়ে আসলেন এবং যোহরের নামায আদায় করিলেন। সালাম ফিরানোর পর তিনি মিম্বরে উঠে দাঁড়ালেন এবং কিয়ামত সম্পর্কে আলোচনা করিলেন। তিনি উল্লেখ করিলেন যে, কিয়ামতের পূর্বে অনেক বড় বড় ঘটনা সংঘটিত হবে। তারপর তিনি বলিলেন, কেউ যদি আমাকে কোনো বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতে ভাল মনে করে, তাহলে সে তা করতে পারবে। আল্লাহর শপথ! আমি এখানে অবস্থান করা পর্যন্ত তোমরা আমাকে যে বিষয়েই জিজ্ঞাসা করবে, আমি তা তোমাদের অবহিত করব। আনাস রাদি. আনহু বলেন, এতে লোকেরা খুব কাঁদতে থাকল। আর রাঃসাঃ খুব বলতে থাকলেন। তোমরা আমার কাছে প্রশ্ন কর। আনাস রাদি. আনহু বলেন, তখন এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার আশ্রয়স্থল কোথায়? তিনি বলিলেন, জাহান্নাম। তারপর আবদুল্লাহ্ ইবনু হুযাফা রাদি. আনহু দাঁড়িয়ে বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতা কে? তিনি বলিলেন, তোমার পিতা হুযাফা। আনাস রাদি. আনহু বলেন, তারপর তিনি বার বার বলতে থাকলেন, তোমরা আমার কাছে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা কর। তোমরা আমার কাছে প্রশ্ন কর। এতে উমর রাদি. আনহু হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন এবং বলিলেন, আমরা আল্লাহকে রব হিসাবে মেনে, ইসলামকে দীন হিসাবে গ্রহণ করে এবং মুহাম্মদ রাঃসাঃকে রাসূল হিসাবে বিশ্বাস করে সন্তুষ্ট আছি। আনাস রাদি. আনহু বলেন, উমর রাদি. আনহু যখন এ কথা বলিলেন, তখন রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ নীরব হয়ে গেলেন। তারপর নাবী রাঃসাঃ বলিলেন, যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ তাহাঁর কসম করে বলছি, এইমাত্র আমি যখন সালাতে ছিলাম তখন এই দেওয়ালের প্রান্তে জান্নাত ও জাহান্নাম আমার সম্মুখে পেশ করা হয়েছিল। আজকের ন্যায় এমন কল্যাণ ও অকল্যাণ আমি আর দেখিনি।[3]

রাঃসাঃ  এর আযাদকৃত গোলাম সাওবান রাদি. আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একবার রাঃসাঃ  এর কাছে দাঁড়িয়েছিলাম। ইতিমধ্যেই ইহুদীদের এক পণ্ডিত ব্যক্তি এসে বলল, আসসালামুআলাইকা ইয়া মুহাম্মাদ! এরপর আমি তাকে এমন এক ধাক্কা মারলাম যে, সে প্রায় পড়েই গিয়েছিল আর কি! সে বলল, তুমি আমাকে ধাক্কা মারলে কেন? আমি বলিলাম, `ইয়া রাসুলুল্লাহ বলতে পার না। ইহুদী বলল, আমরা তাঁকে তাহাঁর পরিবার পরিজন যে নাম রেখেছে সে নামেই ডাকি। রাঃসাঃ  বলিলেন, আমার নাম মুহাম্মাদ। আমার পরিবারের লোকই আমার এ নাম রেখেছে। এরপর ইহুদী বলল, আমি আপনাকে [কয়েকটি কথা] জিজ্ঞাসা করতে এসেছি। রাঃসাঃ  তাকে বলিলেন, তোমার কি লাভ হবে, যদি আমি তোমাকে কিছু বলি? সে বলল, আমি আমার কান পেতে শুনব। এরপর রাঃসাঃ  তাহাঁর কাছে যে লাঠিটি ছিল তা দিয়ে মাটিতে আঁকা-ঝোকা করিলেন। তারপর বলিলেন, জিজ্ঞাসা কর। ইহুদী বলল, যেদিন এক যমীন ও আসমান পাল্টে গিয়ে কি অন্য যমীন ও আসমানে পরিণত হবে [অর্থাৎ কিয়ামাত হবে] সেদিন লোকজন কোথায় থাকবে? রাঃসাঃ  বলিলেন, তারা সেদিন পুলসিরাতের কাছে অন্ধকারে থাকবে। সে বলল, কে সর্বপ্রথম [তা পার হবার] অনুমতি লাভ করবে? তিনি বলিলেন, দরিদ্র মুহাজিরগন। ইহুদী বলল, জান্নাতে যখন তারা প্রবেশ করবে তখন তাদের তোহফা কি হবে? তিনি বলিলেন, মাছের কলিজার টুকরা। সে বলল, এরপর তাদের সকালের নাস্তা কি হবে? তিনি বলিলেন, তাদের জন্য জান্নাতের ষাড় যবেহ করা হবে যা জান্নাতের আশে পাশে চরে বেড়াত। সে বলল, এরপরে তাদের পানীয় কি হবে? তিনি বলিলেন, সেখানকার একটি ঝর্ণার পানি যার নাম `সালসাবীল`। সে বলল, আপনি ঠিক বলিয়াছেন। সে আরো বলল যে, আমি আপনার কাছে এমন একটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে এসেছি যা নাবী ছাড়া পৃথিবীর কোন অধিবাসী জানে না অথবা একজন কি দুইজন লোক ছাড়া। তিনি বলিলেন, আমি, যদি তোমাকে তা বলে দিই তাতে তোমার কি কোনো উপকার হবে? সে বলল, আমি এ আমার কান পেতে শুনব। সে বলল, আমি আপনাকে সন্তান সম্পর্কে জিজ্ঞাস করতে এসেছি। তিনি বলিলেন, পুরুষের বীর্য সাদা এবং মেয়েলোকের বীর্য হলুদ। যখন উভয়টি একত্রিত হয়ে যায় এবং পুরুষের বীর্য মেয়েলোকের ডিম্বের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে তখন আল্লাহর হুকুমে পুত্র সন্তান হয়। আর যখন মেয়েলোকের ডিম্বপুরুষের বীর্যের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে তখন আল্লাহর হুকুমে কন্যা সন্তান হয়। ইহুদী বলল, আপনি ঠিকই বলিয়াছেন এবং নিশ্চয়ই আপনি নাবী। এরপর সে চলে গেল। তখন রাঃসাঃ  বলিলেন, এ লোক আমার কাছে যা জিজ্ঞাসা করেছে, ইতোপূর্বে আমার সে সম্পর্কে কোন জ্ঞানই ছিল না। আল্লাহ তা`আলা এক্ষণে আমাকে তা জানিয়ে দিলেন।[4]

আবূ হুরাইরা রাদি. আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন খায়বার বিজিত হয়, তখন রাঃসাঃ কে একটি [ভুনা] বকরী হাদীয়া দেওয়া হয়; যাতে বিষ ছিল। নাবী রাঃসাঃ আদেশ দিলেন যে, এখানে যত ইয়াহূদী আছে, সকলকে একত্রিত কর্ তাদের সকলকে তাহাঁর সামনে একত্রিত করা হল। তখন তিনি বলিলেন, আমি তোমাদের একটি প্রশ্ন করব। তোমরা কি আমাকে তার সত্য উত্তর দিবে? তারা বলল, হ্যাঁ, সত্য উত্তর দিব, নাবী রাঃসাঃ জিজ্ঞাসা করিলেন, `তোমাদের পিতা কে? তারা বলল, অমুক।` রাঃসাঃ বলিলেন, `তোমরা মিথ্যা বলেছ, বরং তোমাদের পিতা অমুক।` তারা বলল, `আপনিই সত্য বলিয়াছেন।` তখন তিনি বলিলেন, `আমি যদি তোমাদের একটি প্রশ্ন করি, তোমরা কি তার সঠিক উত্তর দিবে? তারা বলল, হ্যাঁ, দিব, হে আবুল কাসিম! আর যদি আমরা মিথ্যা বলি, তবে আপনি আমাদের মিথ্যা ধরে ফেলবেন, যেমন আমাদের পিতা সম্পর্কে আমাদের মিথ্যা ধরে ফেলেছেন।` তখন তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করিলেন, `কারা দোযখবাসী?` তারা বলল, আমরা তথায় অল্প কিছু দিন অবস্থান করব, তারপর আপনারা [মুসলিমরা] আমাদের পেছনে সেখানে থেকে যাবেন।` নাবী রাঃসাঃ বলিলেন, `দুর হও, তোমরাই তথাই থাকবে। আল্লাহর কসম। আমরা কখনো কখনো তাতে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত হব না।` তারপর রাঃসাঃ বলিলেন, `আমি যদি তোমাদের একটি প্রশ্ন করি, তোমরা কি তার সঠিক উত্তর দিবে? তারা বলল, হ্যাঁ, হে আবুল কাসিম!` রাঃসাঃ জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা কি এ বকরীটিতে বিষ মিশিয়েছ?` তারা বলল, `হ্যাঁ।` তিনি বলিলেন, `কিসে তোমাদের এ কাজে উদ্ধুদ্ধ করল?` তারা বলল, `আমরা চেয়েছি আপনি যদি মিথ্যাবাদী হন, তবে আমরা আপনার থেকে মুক্তি পেয়ে শান্তি লাভ করব আর আপনি যদি নাবী হন তবে তা আপনার কোনো ক্ষতি করবে না।` [5]

আনাস রাদি. আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু সালামের কাছে রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ এর মদীনায় আগমনের খবর পৌঁছল, তখন তিনি তাহাঁর কাছে আসলেন। এরপর তিনি বলিয়াছেন, আমি আপনাকে এমন তিনটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতে চাই যার উত্তর নাবী ছাড়া আর কেউ অবগত নয়। তিনি জিজ্ঞেস করিলেন, কিয়ামতের প্রথম নিদর্শন কি? আর সর্বপ্রথম খাবার কি, যা জান্নাতবাসী খাবে? আর কি কারণে সন্তান তার পিতার সাদৃশ্য লাভ করে? আর কিসের কারণে [কোন কোনো সময়] তার মামাদের সাদৃশ্য হয়? তখন রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ বলিলেন, এইমাত্র জিবরীল আলাইহিস সালাম আমাকে এ বিষয়ে অবহিত করেছেন। রাবি বলেন, তখন আবদুল্লাহ রাদি. আনহু বলিলেন, সে তো ফিরিশতাগণের মধ্যে ইয়াহূদীদের শত্রু। রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ বলিলেন, কিয়ামতের প্রথম নিদর্শন হলো আগুন যা মানুষকে পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে তাড়িয়ে নিয়ে একত্রিত করবে। আর প্রথম খাবার যা জান্নাতবাসীরা খাবেন তা হলো মাছের কলিজার অতিরিক্ত অংশ। আর সন্তান সদৃশ হওয়ার রহস্য এই যে পুরুষ যখন তার স্ত্রীর সাথে সহবাস করে তখন যদি পুরুষের বীর্যের পূর্বে স্খলিত হয় তখন সন্তান তার সাদৃশ্যতা লাভ করে। তিনি বলিলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি-নিঃসন্দেহে আপনি আল্লাহর রাসুল। এরপর তিনি বলিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! ইয়াহূদিরা অপবাদ ও কুৎসা রটনাকারী সম্প্রদায়। আপনি তাদেরকে আমার সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করার পূর্বে তারা যদি আমার ইসলাম গ্রহণের বিষয় জেনে ফেলে, তাহলে তারা আপনার কাছে আমার কুৎসা রতনা করবে। তারপর ইয়াহূদিরা এলো এবং আবদুল্লাহ রাদি. আনহু ঘরে প্রবেশ করিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ তাদের জিজ্ঞেস করিলেন, তোমাদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনু সালাম কেমন লোক? তারা বলল, তিনি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বিজ্ঞ ব্যক্তি এবং সবচেয়ে বিজ্ঞ ব্যাক্তির পুত্র। তিনি আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি এবং সর্বোত্তম ব্যক্তির পুত্র। তখন রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ বলিলেন, যদি আবদুল্লাহ ইসলাম গ্রহন করে, এতে তোমাদের অভিমত কি হবে? তারা বলল, এর থেকে আল্লাহ তার তাঁকে রক্ষা করুক। এমন সময় আবদুল্লাহ রাদি. আনহু তাদের সামনে বের হয়ে আসলেন এবং বলিলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ রাঃসাঃ আল্লাহর রাসূল। তখন তারা বলতে লাগল, সে আমাদের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি এবং সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তির সন্তান এবং তারা তাহাঁর গীবত ও কুৎসা রটনায় লিপ্ত হয়ে গেল। [6] 

বারা ইবনু আযিব রাদি. আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার নাবী রাঃসাঃ এর সম্মুখ একজন ইহুদীকে কালি মাখা এবং বেত্রাঘাত কৃত অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তখন তিনি বলেন, তোমরা কি তোমাদের কিতাবে ব্যভিচারের শাস্তি এরূপই পেয়েছে? তারা বলল, হ্যাঁ। এরপর তাদের মধ্য হতে একজন আলিম [পাদরী] ব্যক্তিকে ডাকালেন এবং বলিলেন, তোমাকে সেই আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, যিনি মুসা আলাইহিস সালামের প্রতি তাওরাত কিতাব অবতীর্ণ করেছিলেন, তোমরা কি তোমাদের কিতাবে ব্যভিচারের শাস্তি এরূপই পেয়েছ? তখন ইহুদী আলিম ব্যক্তি বলিলেন, না। তিনি আরো বলিলেন, আপনি যদি আমাকে আল্লাহর কসম দিয়ে এভাবে না বলতেন তবে আমি আপনাকে জানাতাম না যে, এর প্রকৃত শাস্তি রজম [পাথর নিক্ষেপ করা]। কিন্তু আমাদের সমাজের সম্মানীত ব্যক্তিদের মাঝে এর ব্যাপক প্রচলন হয়ে গেছে। অতএব, আমরা যখন এতে কোনো সম্ভ্রান্ত লোককে পেতাম, তখন তাকে ছেড়ে দিতাম এবং যখন কোনো দুর্বল ব্যক্তিকে পাকড়াও করতাম তখন তার উপর শরী`য়তের প্রকৃত শাস্তি বাস্তবায়িত করতাম। পরিশেষে আমরা বলিলাম, তোমরা সকলেই এসো, আমরা সম্মিলিতভাবে এ ব্যাপারে একটি শাস্তি নির্ধারিত করে নেই, যা ভদ্র ও অভদ্র সকলের উপরই প্রযোজ্য হবে। সুতরাং আমরা ব্যভিচারের শাস্তি কালি লাগানো এবং বেত্রাঘাত করাকেই গ্রহন করে নিলাম, পাথর নিক্ষেপের পরিবর্তে। তখন রাঃসাঃ  বলিলেন: হে আল্লাহ! আমিই প্রথম ব্যক্তি, যে তোমার নির্দেশ `রজম` বাস্তবায়িত করলাম যা তারা বাতিল করে ফেলেছিল। সুতরাং তিনি তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিলেন। অবশেষে ঐ ইহুদীকে পাথর মারা হল। এরপর মহান আল্লাহ এই আয়াত নাযিল করেন, “হে রাসুল! যারা কাজে দ্রুতগামী তাদের কার্যকলাপ যেন আপনাকে চিন্তিত না করে”। “যদি তোমদেরকে তা প্রদত্ত করা হয়, তবে তা ধারণ কর” [কোরআনের সুরা আল-মায়েদা: ৪১] পর্যন্ত অবতীর্ণ করেন। তারা [ইহুদীরা] বলতো যে, তোমরা মুহাম্মাদ রাঃসাঃ এর নিকট গমন করো, যদি তিনি তোমাদেরকে এ ব্যাপারে কালি লাগালো এবং বেত্রাঘাতের নির্দেশ প্রদান করেন, তবে তোমরা তা কার্যকর করবে; আর যদি তিনি রজমের নির্দেশ দেন তবে তা প্রত্যাখ্যান করবে। আল্লাহ তা`আলা [এই মর্মে] আয়াত অবতীর্ণ করেন, “যারা আল্লাহর নাযিলকৃত আয়াত মুতাবিক বিচারকার্য পরিচালনা করে না তারাই হলো কাফির তথা অস্বীকারকারী সম্প্রদায়”। “আর যারা আল্লাহর নাযিলকৃত আয়াত অনুসারে বিচার করে না তারাই- হলো জালিম তথা অত্যাচারী দল”। “আর যারা আল্লাহর নাযিলকৃত আয়াত অনুযায়ী বিচার করে না তারাই হলো ফাসিক তথা সীমালঙ্ঘনকারী দল”। এই সবগুলো আয়াত কাফিরদের সম্পর্কেই অবতীর্ণ হয়। [7]

আনাস ইবনু মালিক রাদি. আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাঃসাঃ কে কোনো বিষয়ে [অতিরিক্ত] প্রশ্ন করার ব্যাপারে আমাদের নিষেধ করা হয়েছিল। তাই আমরা চাইতাম যে, গ্রাম থেকে কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি এসে তাঁকে প্রশ্ন করুক আর আমরা তা শুনি। তারপর একদিন গ্রাম থেকে এক ব্যক্তি এসে রাঃসাঃ কে বলল, হে মুহাম্মাদ! আমাদের কাছে আপনার দূত এসে বলেছে, আপনি দাবি করেছেন যে, আল্লাহ আপনাকে রাসুল হিসাবে পাঠিয়েছেন। রাসুল রাঃসাঃ বলিলেন, সত্যই বলেছে। আগন্তুক বলল, আসমান কে সৃষ্টি করেছেন? তিনি বলিলেন, আল্লাহ। আগন্তুক বলল, যমীন কে সৃষ্টি করেছেন? রাসুল রাঃসাঃ বলিলেন, আল্লাহ। আগন্তুক বলল, এসব পর্বতমানা কে স্থাপন করেছেন এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে তা কে সৃষ্টি করেছেন? রাঃসাঃ  বলিলেন, আল্লাহ। আগন্তুক বলল, কসম সেই সত্তার! যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন এবং এসব পর্বতমালা স্থাপন করেছেন। আল্লাহই আপনাকে রাসুল হিসেবে পাঠিয়েছেন? রাঃসাঃ  বলিলেন, হ্যাঁ। আগন্তুক বলল, আপনার দূত বলেছে যে, আমাদের উপর দিনে ও রাতে পাচ ওয়াক্ত নামায ফরয। রাঃসাঃ  বলিলেন, সত্যই বলেছে। আগন্তুক বলল, যিনি আপনাকে রাসুল হিসেবে পাঠিয়েছেন তাহাঁর কসম, আল্লাহ-ই কি আপনাকে এর নির্দেশ দিয়েছেন? রাঃসাঃ  বলিলেন, হ্যাঁ। আগন্তুক বলল, আপনার দূত বলেছে যে, আমাদের উপর আমাদের মালের যাকাত দেওয়া ফরয। রাঃসাঃ  বলিলেন, ঠিকই বলেছো। আগন্তুক বলল, যিনি আপনাকে রাসুল হিসেবে পাঠিয়েছেন, তাহাঁর কসম, আল্লাহ-ই কি আপনাকে এর নির্দেশ দিয়েছেন? রাঃসাঃ  বলিলেন, হ্যাঁ। আগন্তুক বলল, আপনার দূত বলেছে যে, প্রতি বছর রমাদান মাসের সাওম পালন করা আমাদের উপর ফরয। রাঃসাঃ  বলিলেন, সত্যই বলেছে। আগন্তুক বলল, যিনি আপনাকে রাসুল হিসেবে পাঠিয়েছেন, তার কসম, আল্লাহ-ই কি আপনাকে এর নির্দেশ দিয়েছেন? রাঃসাঃ  বলিলেন, হ্যাঁ। আগন্তুক বলল, আপনার দূত বলেছে যে, আমাদের মধ্যে যে বায়তুল্লায় যেতে সক্ষম তার উপর হজ্জ ফরয। রাঃসাঃ  বলিলেন, সত্যি বলেছে। রাবী বলেন যে, তারপর আগন্তুক চলে যেতে যেতে বলল, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তার কসম, আমি এর অতিরিক্তও করব না এবং এর কমও করব না। এ কথা শুনে নাবী রাঃসাঃ বলিলেন, লোকটি সত্য বলে থাকলে অবশ্যই সে জান্নাতে যাবে। [8]


[1] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ১২৫।

[2] মুসনাদে আহমদ, হাদিস নম্বর ২৩০৯। হাদীসের সনদটি সহিহ।

[3] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৭২৯৪, সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর ২৩৫৯।

[4] সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর ৩১৫।

[5] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩১৬৯।

[6] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৩২৯।

[7] সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর ১৭০০।

[8] সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর ১২।

Leave a Reply