ত্যাগ ও সহমর্মিতা প্রসঙ্গে -রিয়াদুস সালেহীন হাদিস সংকলিত

ত্যাগ ও সহমর্মিতা প্রসঙ্গে -রিয়াদুস সালেহীন হাদিস সংকলিত

ত্যাগ ও সহমর্মিতা প্রসঙ্গে -রিয়াদুস সালেহীন হাদিস সংকলিত >> রিয়াদুস সালেহীন  হাদিস শরীফ এর মুল সুচিপত্র দেখুন >> নিম্নে রিয়াদুস সালেহীন হাদিস শরীফ এর একটি পরিচ্ছেদের হাদিস পড়ুন

পরিচ্ছেদ – ৬২: ত্যাগ ও সহমর্মিতা প্রসঙ্গে

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ وَيُؤۡثِرُونَ عَلَىٰٓ أَنفُسِهِمۡ وَلَوۡ كَانَ بِهِمۡ خَصَاصَةٞۚ ﴾ [الحشر: ٩] 

অর্থাৎ “নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও তারা [অপরকে] নিজেদের উপর প্রাধান্য দেয়।” [সূরা হাশ্‌র ৯ আয়াত]

তিনি আরো বলেন,

﴿ وَيُطۡعِمُونَ ٱلطَّعَامَ عَلَىٰ حُبِّهِۦ مِسۡكِينٗا وَيَتِيمٗا وَأَسِيرًا ٨ ﴾ [الانسان: ٨] 

অর্থাৎ “আহার্যের প্রতি আসক্তি সত্ত্বেও তারা অভাবগ্রস্ত, ইয়াতীম ও বন্দীকে অন্নদান করে।” [সূরা দাহার ৮ আয়াত]

1/569 وَعَن أَبي هُرَيرَةَ رضي الله عنه، قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ ﷺ، فَقَالَ: إنِّي مَجْهُودٌ، فَأرسَلَ إِلَى بَعْضِ نِسَائِهِ، فَقَالَت: وَالَّذي بَعَثَكَ بِالحَقِّ مَا عِنْدِي إِلاَّ مَاءٌ، ثُمَّ أَرْسَلَ إِلَى أُخْرَى، فَقَالَتْ مِثلَ ذَلِكَ، حَتَّى قُلْنَ كُلُّهُنَّ مِثلَ ذَلِكَ: لاَ وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالحَقِّ مَا عِنْدِي إِلاَّ مَاءٌ . فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ: «مَنْ يُضِيفُ هَذَا اللَّيْلَةَ ؟ » فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الأنْصَارِ: أنَا يَا رَسُولَ اللهِ،  فَانْطَلَقَ بِهِ إِلَى رَحْلِهِ، فَقَالَ لامْرَأَتِهِ: أكرِمِي ضَيْفَ رَسُولِ اللهِ ﷺ .

وفي روايةٍ قَالَ لامْرَأَتِهِ: هَلْ عِنْدَكِ شَيْءٌ ؟ فَقَالَتْ: لاَ، إِلاَّ قُوتَ صِبيَانِي . قَالَ: فَعَلِّليهم بِشَيْءٍ وَإذَا أرَادُوا العَشَاءَ فَنَوِّمِيهمْ، وَإِذَا دَخَلَ ضَيْفُنَا فَأطْفِئي السِّرَاجَ، وَأَرِيهِ أنَّا نَأكُلُ . فَقَعَدُوا وَأكَلَ الضَّيْفُ وَبَاتَا طَاوِيَيْنِ، فَلَمَّا أصْبَحَ غَدَا عَلَى النَّبيِّ ﷺ، فَقَالَ: «لَقَدْ عَجِبَ الله مِنْ صَنِيعِكُمَا بِضَيْفِكُمَا اللَّيْلَةَ ». متفقٌ عَلَيْهِ

১/৫৬৯। আবু হুরায়রা রাঃআঃ বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাঃআঃ এর নিকট এসে বলিল, ‘আমি ক্ষুধায় কাতর হয়ে আছি।’ আল্লাহর রসূল সাঃআঃ তাহাঁর কোন স্ত্রীর নিকট সংবাদ পাঠালেন। তিনি বলিলেন, ‘সেই সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সত্যের সঙ্গে পাঠিয়েছেন! আমার কাছে পানি ছাড়া কিছুই নেই।’ অতঃপর অন্য স্ত্রীর নিকট পাঠালেন। তিনিও অনুরূপ কথা বলিলেন। এমনকি শেষ পর্যন্ত সকল [স্ত্রী]ই ঐ একই কথা বলিলেন, ‘সেই সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সত্যের সাথে পাঠিয়েছেন! আমার কাছে পানি ছাড়া কোন কিছুই নেই।’ তারপর নবী সাঃআঃ বলিলেন, ‘‘আজকের রাতে কে একে মেহমান হিসাবে গ্রহণ করিবে?’’ এক আনসারী বলিলেন, ‘হে আল্লাহর রসূল! আমি একে মেহমান হিসাবে গ্রহণ করব।’ সুতরাং তিনি তাকে সাথে করে নিজ গৃহে নিয়ে গেলেন এবং তাহাঁর স্ত্রীকে বলিলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাঃআঃ এর মেহমানের খাতির কর।’

অন্য এক বর্ণনায় আছে, তিনি [আনসারী] তাহাঁর স্ত্রীকে বলিলেন, ‘তোমার নিকট কোন কিছু আছে কি?’ তিনি বলিলেন না, ‘কেবলমাত্র বাচ্চাদের খাবার আছে।’ তিনি বলিলেন, ‘কোন জিনিস দ্বারা তাহাদেরকে ভুলিয়ে রাখবে এবং তারা যখন রাত্রে খাবার চাইবে, তখন তাহাদেরকে ঘুম পাড়িয়ে দেবে। অতঃপর যখন আমাদের মেহমান [ঘরে] প্রবেশ করিবে, তখন বাতি নিভিয়ে দেবে এবং তাকে দেখাবে যে, আমরাও খাচ্ছি।’ সুতরাং তাঁরা সকলেই খাওয়ার জন্য বসে গেলেন; মেহমান খাবার খেল এবং তাঁরা দু’জনে উপবাসে রাত কাটিয়ে দিলেন। অতঃপর যখন তিনি সকালে নবী সাঃআঃ এর নিকট গেলেন, তখন তিনি বলিলেন, ‘‘তোমরা দু’জনের আজকের রাতে তোমাদের মেহমানের সাথে তোমাদের ব্যবহারে আল্লাহ বিস্মিত হয়েছেন!’’ [বুখারী ও মুসলিম] [1]

2/570 وَعَنهُ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ:«طَعَامُ الاثْنَيْنِ كَافِي الثَّلاَثَةِ، وَطَعَامُ الثَّلاَثَةِ كَافِي الأربَعَةِ» متفقٌ عَلَيْهِ . وَفِي رِوَايَةٍ لِمُسلِمٍ عَن جَابِرٍ رضي الله عنه، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ، قَالَ: «طَعَامُ الوَاحِدِ يَكْفِي الاثْنَيْنِ، وَطَعَامُ الاثْنَيْنِ يَكْفِي الأَرْبَعَةَ، وَطَعَامُ الأَرْبَعَة يَكْفِي الثَّمَانِية » .

২/৫৭০। উক্ত রাবী রাঃআঃ হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাঃআঃ বলেছেন, ‘‘দু’জনের খাবার তিনজনের জন্য এবং তিনজনের খাবার চারজনের জন্য যথেষ্ট।’’ [বুখারী-মুসলিম] [2]

মুসলিমের অন্য এক বর্ণনায় জাবের রাঃআঃ হইতে বর্ণিত, নবী সাঃআঃ বলেছেন, ‘‘একজনের খাবার দু’জনের জন্য, দু’জনের খাবার চারজনের জন্য এবং চারজনের খাবার আটজনের জন্য যথেষ্ট।’’

3/571 وَعَن أَبي سَعِيدٍ الخُدرِي رضي الله عنه، قَالَ: بَيْنَمَا نَحْنُ فِي سَفَرٍ مَعَ النَّبيِّ ﷺ إذْ جَاءَ رَجُلٌ عَلَى رَاحِلَةٍ لَهُ، فَجَعَلَ يَصرِفُ بَصَرَهُ يَميناً وَشِمَالاً، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: «مَنْ كَانَ مَعَهُ فَضْلُ ظَهْرٍ فَليَعُدْ بِهِ عَلَى مَنْ لاَ ظَهرَ لَهُ، وَمَنْ كَانَ لَهُ فَضْلٌ مِنْ زَادٍ، فَلْيَعُدْ بِهِ عَلَى مَنْ لاَ زَادَ لَهُ ». فَذَكَرَ مِنْ أصْنَافِ المالِ مَا ذَكَرَ حَتَّى رَأيْنَا أنَّهُ لاَ حَقَّ لأَحَدٍ مِنَّا فِي فَضْلٍ . رواه مسلم

৩/৫৭১। আবূ সা‘ঈদ খুদরী রাঃআঃ বলেন, একদা আমরা নবী সাঃআঃ এর সাথে সফরে ছিলাম। ইতোমধ্যে একটি লোক তার একটি সওয়ারীর উপর চড়ে [আমাদের নিকট] এল এবং ডানে ও বামে তার দৃষ্টি ফিরাতে লাগল। [এ দেখে] রাসূলুল্লাহ সাঃআঃ বলিলেন, ‘‘যার নিকট উদ্বৃত্ত সওয়ারী আছে, সে যেন তা ঐ ব্যক্তিকে দেয় যার নিকট কোন সওয়ারী নেই। আর যার নিকট উদ্বৃত্ত পাথেয় [খাদ্য] রয়েছে, সে যেন ঐ ব্যক্তিকে দেয় যার কোন পাথেয় নেই।’’ এভাবে তিনি বিভিন্ন প্রকার মালের কথা উল্লেখ করিলেন। এমনকি আমরা ধারণা করলাম যে, উদ্বৃত্ত মালে আমাদের কারো অধিকার নেই। [মুসলিম]  [3]

4/572 وَعَن سَهلِ بنِ سَعدٍ رضي الله عنه: أنَّ أمْرَأةً جَاءَتْ إِلَى رَسُولِ اللهِ ﷺ بِبُرْدَةٍ مَنْسُوجَةٍ، فَقَالَتْ: نَسَجْتُهَا بِيَدَيَّ لأَكْسُوكَهَا، فَأَخَذَهَا النَّبيُّ ﷺ مُحْتَاجاً إِلَيْهَا، فَخَرَجَ إِلَيْنَا وَإنَّهَا إزَارُهُ، فَقَالَ فُلانٌ: اكْسُنِيهَا مَا أحْسَنَهَا ! فَقَالَ: «نَعَمْ » فَجَلَسَ النَّبيُّ ﷺ في المَجْلِسِ، ثُمَّ رَجَعَ فَطَواهَا، ثُمَّ أرْسَلَ بِهَا إِلَيْهِ: فَقَالَ لَهُ الْقَومُ: مَا أحْسَنْتَ ! لَبِسَهَا النَّبيُّ ﷺ مُحتَاجَاً إِلَيْهَا، ثُمَّ سَألْتَهُ وَعَلِمْتَ أنَّهُ لاَ يَرُدُّ سَائِلاً، فَقَالَ: إنّي وَاللهِ مَا سَألْتُهُ لأَلْبِسَهَا، إنَّمَا سَألْتُهُ لِتَكُونَ كَفَنِي . قَالَ سَهْلٌ: فَكَانَتْ كَفَنَهُ . رواه البخاري

৪/৫৭২।  সাহল ইবনি সা‘দ রাঃআঃ হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক মহিলা নবী সাঃআঃ এর নিকট একটি [হাতে] বুনা চাদর নিয়ে এল। সে বলিল, ‘আপনার পরিধানের জন্য চাদরটি আমি নিজ হাতে বুনেছি।’ আল্লাহর রসূল সাঃআঃ তা গ্রহণ করিলেন এবং তাহাঁর চাদরের প্রয়োজনও ছিল। তারপর তিনি লুঙ্গীরূপে পরিধান করে আমাদের সামনে আসলেন। তখন অমুক ব্যক্তি বলিল, ‘এটি আমাকে পরার জন্য দান করে দিন। এটি কত সুন্দর!’ তিনি বলিলেন, ‘‘হ্যাঁ, [তাই দেব।]’’ নবী সাঃআঃ মজলিসে [কিছুক্ষণ] বসলেন। অতঃপর ফিরে গিয়ে তা ভাঁজ করে ঐ লোকটির কাছে পাঠিয়ে দিলেন। লোকেরা বলিল, ‘তুমি কাজটা ভাল করলে না। নবী সাঃআঃ তা তাহাঁর প্রয়োজনে পরেছিলেন, তবুও তুমি চেয়ে বসলে। অথচ তুমি জান যে, তিনি কারো চাওয়া রদ করেন না।’ ঐ ব্যক্তি বলিল, ‘আল্লাহর কসম! আমি তা পরার উদ্দেশ্যে চাইনি, আমার চাওয়ার একমাত্র উদ্দেশ্য যে, তা আমার কাফন হবে।’  সাহল বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত তা তাহাঁর কাফনই হয়েছিল।’ [বুখারী]  [4]

5/573 وَعَن أَبي مُوسَى رضي الله عنه، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: «إنَّ الأشْعَرِيِّينَ إِذَا أرْمَلُوا في الغَزْوِ، أَوْ قَلَّ طَعَامُ عِيَالِهِمْ بِالمَديِنَةِ، جَمَعُوا مَا كَانَ عِنْدَهُمْ في ثَوْبٍ وَاحِدٍ، ثُمَّ اقْتَسَمُوهُ بَيْنَهُمْ في إنَاءٍ وَاحدٍ بِالسَّوِيَّةِ، فَهُمْ مِنِّي وَأنَا مِنْهُمْ ». متفقٌ عَلَيْهِ

৫/৫৭৩। আবূ মূসা আশআরী রাঃআঃ বলেন, আল্লাহর রসূল সাঃআঃ বলেছেন, ‘‘আশআরী গোত্রের লোকদের যখন জিহাদের পাথেয় ফুরিয়ে যায় অথবা মদীনাতে তাহাদের পরিবার পরিজনদের খাদ্য কমে যায়, তখন তারা তাহাদের নিকট যা কিছু থাকে, তা সবই একটি কাপড়ে জমা করে। অতঃপর তা নিজেদের মধ্যে একটি পাত্রে সমানভাবে বণ্টন করে নেয়। সুতরাং তারা আমার [দলভুক্ত] এবং আমিও তাহাদের [দলভুক্ত]।’’ [বুখারী ও মুসলিম] [5]


[1] সহীহুল বুখারী ৩৭৯৮, মুসলিম ২০৫৪, তিরমিযী ৩৩০৪

[2] সহীহুল বুখারী ৫৩৯২, মুসলিম ২০৫৮, তিরমিযী ১৮২০, আহমাদ ৭২৭৮, ৯০২৪, মুওয়াত্তা মালিক ১৭২৬

[3] মুসলিম ১৭২৮, আবূ দাউদ ১৬৬৩, আহমাদ ১০৯০০

[4] সহীহুল বুখারী ১২৭৭, ২০৯৩, ৫৮১০, ৬০৩৬, নাসায়ী ৫৩২১, ইবনু মাজাহ ৩৫৫৫, আহমাদ ২২৩১৮

[5] সহীহুল বুখারী ২৪৮৬, মুসলিম ২৫০০

By রিয়াদুস সালেহিন

এখানে কুরআন শরীফ, তাফসীর, প্রায় ৫০,০০০ হাদীস, প্রাচীন ফিকাহ কিতাব ও এর সুচিপত্র প্রচার করা হয়েছে। প্রশ্ন/পরামর্শ/ ভুল সংশোধন/বই ক্রয় করতে চাইলে আপনার পছন্দের লেখার নিচে মন্তব্য (Comments) করুন। “আমার কথা পৌঁছিয়ে দাও, তা যদি এক আয়াতও হয়” -বুখারি ৩৪৬১। তাই এই পোস্ট টি উপরের Facebook বাটনে এ ক্লিক করে শেয়ার করুন অশেষ সাওয়াব হাসিল করুন

Leave a Reply