তাফহিমুল কুরআন ১৪ খ. সুরা হামিম, শূরা, জুখরফ, দুখান, জাসিয়া, আহকাফ

তাফহিমুল কুরআন ১৪ খ. সুরা হামিম, শূরা, জুখরফ, দুখান, জাসিয়া, আহকাফ

তাফহিমুল কুরআন ১৪ খ. সুরা হামিম, শূরা, জুখরফ, দুখান, জাসিয়া, আহকাফ

সুরা হামিম – আলোচ্য বি্বক্ম ও মুল বক্তব্য

‘উতবার এই কথার জবাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে যে বক্তব্য নাধিল হয়েছে তাতে সে
নবীকে (সা) যে অর্থহীন কথা বলেছে সেদিকে আদৌ দৃষ্টিপাত করা হয়নি। কারণ, সে যা
বলেছিলো তা ছিন প্রকৃতপক্ষে নবীর (সা) নিয়ত ও জ্ঞান-বুদ্ধির ওপর হামলা। তার গোটা
বক্তব্যের পেছনে এই অনুমান কাজ করছিল যে, তাঁর নবী হওয়া এবং কুরআনের অহী
হওয়ার কোন সম্ভাবনাই নেই। তাই অনিবার্যরূপে তাঁর এই আন্দোলনের চালিকা শক্তি
হয় ধন-সম্পদ এবং শাসন ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব লাভের প্রেরণা, নয়তো তাঁর জ্ঞান-বুদ্ধিই
লোপ পেয়ে বসেছে (নাউযুবি্লাহ)। প্রথম ক্ষেত্রে সে নবীর (সা) সাথে বিকিকিনির কারবার
করতে চাচ্ছিলো। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সে এ কথা বলে নবীকে সো) হেয় করছিলো যে, আমরা
নিজের খরচে আপনার উন্মাদ রোগের চিকিৎসা করে দিচ্ছি। এ কথা সুস্পষ্ট যে,
বিরোধীরা যখন এ ধরনের মুর্থতার আচরণ করতে থাকে তখন তাদের এ কাজের জবাব
দেয়া শরীফ সন্্ান্ত মানুষের কাজ হয় না। তার কাজ হয় তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা
করে নিজের বক্তব্য তুলে ধরা। কুরআনের দাওয়াতকে ব্যথ করার জন্য মক্কার কাফেরদের
পক্ষ থেকে সে সময় চরম হঠকারিতা ও অসঙ্চরিত্রের মাধ্যমে যে বিরোধিতা করা
হচ্ছিলো ‘উতবার বক্তব্য উপেক্ষা করে এখানে সেই বিরোধিতাকে আলোচ্য বিষয় হিসেবে
গ্রহণ করা হয়েছে। তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি গুয়া সাল্লামকে বলতো, আপনি যাই
করেন না কেন আমরা আপনার কোন কথাই শুনবো না। আমরা আমাদের মনের গায়ে
চাদর ঢেকে দিয়েছি এবং কান বন্ধ করে দিয়েছি। আমাদের ও আপনার মাঝে একাট
প্রাচীর আড়াল করে দাড়িয়েছে, যা আপনাকে ও আমাদের কখনো এক হতে দেবে না।

তারা তকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিলো, আপনি আপনার দাওয়াতের কাজ চালিয়ে
যান, আপনার বিরোধিতায় আমাদের পক্ষে সম্ভবপর সবই আমরা করবো।

তারা নবীকে (সা) পরাস্ত করার উদ্দেশ্যে যে কর্মসূচী তৈরী করেছিলো তা হচ্ছে,
যখনই তিনি কিংবা তাঁর অনুসারীদের কেউ সর্বসাধারণকে কুরআন শুনানোর চেষ্টা করবেন
তখনই হৈ চৈ ও হট্টগোল সৃষ্টি করতে হবে এবং এতো শোরগোল করতে হবে যাতে
কানে যেন কোন কথা প্রবেশ না করে।

কুরআন মজীদের আয়াত সমূহের উন্টা পান্টা অর্থ করে জনসাধারণের মধ্যে নানা
রকম বিভ্রান্তি ছড়ানোর কাজ তারা পূর্ণ তৎপরতার সাথে চালিয়ে যাচ্ছিলো ।..কোন কথা
বলা হলে তারা তাকে ভিন রূপ দিতো। সরল সোজা কথার বাঁকা অথ করতো পূর্বাপর
প্রস থেকে বিচ্ছির করে এক স্থানের একটি শব্দ এবং আরেক স্থানের একটি বাক্যাংশ
নিয়ে তার সাথে নিজের পক্ষ থেকে আরো অধিক কথা যুক্ত করে নতুন নতুন বিষয়বন্তূ
তৈরী করতো যাতে কুরআান ও তার উপস্থাপনকারী রাসূল সম্পর্কে মানুষের মতামত
খারাপ করা যায়।

অদ্ভুত ধরনের আপত্তিসমূহ উ্থাপন করতো যার একটি উদাহরণ এ সূরায় পেশ করা
হয়েছে। তারা বলতো, আরবী ভাষাভাষী একজন মানুষ যদি আরবী ভাষায় কোন কথা

শোনায় ভাতে মু’জিযার কি থাকতে পারে? আরবী তো তার মাতৃভাষা যে কেউ ইচ্ছা
করলে তার মাতৃভাষায় একটি বাণী রচনা করে ঘোষণা করতে পারে যে, সেই বাণী তার
কাছে আল্লাহ্র পক্ষ থেকে নাযিল হয়েছে। মুনজিযা বলা যেতো কেবল তখনই যখন হঠাৎ
কোন ব্যক্তি তার অজানা কোন ভাষায় একটি বিশুদ্ধ ও উত সাহিত্য রস সমৃদ্ধ বৃতা
শুরু করে দিতো। তখনই বুঝা যেতো, এটা ভার নিজের কথা নয়, বরং তা ওপরে
কোথাও থেকে তার ওপর নাযিল হচ্ছে।

অযৌক্তিক ও অবিবেচনা প্রসূত এই বিরোধিতার জবাবে যা বলা হয়েছে তার সারকথা
হলো £

0) এ বাণী আল্লাহরই পক্ষ থেকে এবং আরবী ভাষায় নাধিলবৃতি। এর মধ্যে যেসব
সত্য স্পষ্টভাবে খোলামেলা বর্ণনা! করা হয়েছে মূর্খেরা তার মধ্যে জ্ঞানের কোন আলো
দেখতে পায় না। কিন্তু জ্ঞান-বুদ্ধির অধিকারীরা সে আলো দেখতে পাচ্ছে এবং তা ছারা
উপকৃতও হচ্ছে। এটা আল্লাহর রহমত যে, মানুষের হিদায়াতের জন্য তিনি এ বামী নাযিল
করেছেন। কেউ তাকে অকল্যাণ ভাবলে সেটা তার নিজের দুর্ভাগ্য। যারা এ বাণী কাজে
লাগিয়ে উপকৃত হচ্ছে তাদের জন্য সু-খবর। কিন্তু যারা এ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে
তাদের সাবধান হওয়া উচিতা।

(২) তোমরা যদি নিজেদের মনের ওপর পর্দা টেনে এবং কান বধির করে দিয়ে থাকো,
সে অবস্থায় নবীর কাজ এটা নয় যে, যে শুনতে আথহী তাকে শুনাবেন আর যে শুনতে ও
বুঝতে আগ্রহী নয় জোর করে তার মনে নিজের কথা প্রবেশ করাবেন। তিনি তোমাদের
মতই একজন মানুষ। যুরা শুনতে আগ্রহী তিনি কেবল তাদেরকেই শুনাতে পারেন এবং
যারা বুঝতে আথহী কেবল তাদেরকেই বুঝাতে পারেন।

(৩) তোমরা নিজেদের চোখ বন্ধ করে নাও আর মনের ওপর পর্দা টেনে দাও প্রকৃত
সত্য এই যে, একজনই মাত্র তোমাদের আল্লাহ, তোমরা অন্য কোন আল্লাহর বান্দা নও।
তোমাদের হঠকারিতার কারণে এ সত্য কখনো পরিবর্তিত হওয়ার নয়। তোমরা যদি এ
কথা মেনে নাও এবং সে অনুসারে নিজেদের কাজকর্ষ শুধরে নাও তাহলে নিজেদেরই
কল্যাণ সাধন করবে। আর যদি না মানো তাহলে নিজেরাই ধ্বংসের মুখোমুখি হবে।

(8) তোমরা কার সাথে শিরক ও কুফরী করছো সে বিষয়ে কি তোমাদের কোন
অনুভূতি আছে? তোমরা কি সেই আল্লাহ্র সাথে শিরক ও কুফরী করছো যিনি বিশাল ও
অসীম এই বিশ্বজাহান সৃষ্টি করেছেন, যিনি যমীন ও আসমানের অষ্টা, যার সৃষ্ট কল্যাণ
সমূহ দ্বারা তোমরা এই পৃথিবীতে উপকৃত হচ্ছো এবং যার দেয়া রিষিকের ছারা
প্রতিপালিত হচ্ছোঃ তাঁরই নগণ্য সৃষ্টি সমূহকে তোমরা তীর শরীক বানাচ্ছো আর এ
বিষয়টি বুঝানোর চেষ্টা করলে জিদ ও হঠকারিতা করে মুখ ফিরিয়ে লিচ্ছো?

(৫) ঠিক আছে, যদি মানতে প্রস্তুত না হও সে ক্ষেত্রে আদ ও সামূদ জাতির ওপর যে
ধরনের আযাব এসেছিল অকম্মাত সে ধরনের আযাব আপতিত হওয়া সম্পর্কে সাবধান
হয়ে যাও। এ আযাবও তোমাদের অপরাধের চুড়ান্ত শাস্তি নয়। বরং এর পরে আছে হাশরের
জবাবদিহি ও জাহান্নামের আগুন।
(৬) সেই মানুষ বড়ই দুর্ভাগা যার পেহনে এমন সব জিন ও মানুষ শয়তান লেগেছে
যারা তাকে তার চারদিকেই শ্যামল-সবৃজ মনোহর দৃশ্য দেখায়, তার নিবুদ্ধিতাকে তার
সামনে সুদৃশ্য বানিয়ে পেশ করে এবং তাকে কখনো সঠিক চিন্তা করতে দেয় না। অন্যের
কথা শুনতেও দেয় না। এই শ্রেণীর নির্বোধ লোকেরা আজ এই পৃথিবীতে পরস্পরকে
উৎসাহ দিচ্ছে ও লোভ দেখাচ্ছে এবং প্রত্যেকেই পরস্পরের প্রশ্রয় পেয়ে দিনকাল ভালই
কাটাচ্ছে। কিন্তু কিয়ামতের দিন যখন দুর্ভাগ্যের পালা আসবে তখন তাদের প্রত্যেকেই
বলবে, যারা আমাকে বিভ্রান্ত করেছিলো তাদের হাতে পেলে পায়ের তলায় পিষে
ফেলতাম।

(৭) এই কুরআন একটি অপরিবর্তনীয় গ্রহথ। তোমরা নিজেদের হীন চত্রান্ত এবং মিথ্যার
অন্্র দিয়ে তাকে পরাস্ত করতে পারবে না। বাতিল পেছন থেকে আসুক, মুখোশ পরে
আসুক কিংবা পরোক্ষভাবে আক্রমণ করুক কখনো তাকে পরাজিত করতে সক্ষম হবে
না।

(৮) তোমরা যাতে বুঝতে পার সে জন্য কুরআনকে আজ তোমাদের নিজেদের ভাষায়
পেশ করা হচ্ছে। অথচ তোমরা বলছো, কোন অনারব ভাষায় তা নাযিল হওয়া উচিত
ছিল। কিন্তু তোমাদের হিদায়াতের জন্য যদি আমি কুরআনকে আরবী ছাড়া ভিন্ন কোন
ভাষায় নাযিল করতাম তাহলে তোমরাই বলতে, এ কোন ধরনের তামাশা, আরব জাতির
হিদায়াতের জন্য অনারব ভাষায় বক্তব্য পেশ করা হচ্ছে যা এখানকার কেউই বুঝে না।
এর অর্থ, হিদায়াত লাভ আদৌ তোমাদের কাম্য নয়। কুরআনকে না মানার জন্য নিত্য
নতুন বাহানা তৈরী করছো মাত্র।

(৯) তোমরা কি কখনো এ বিষয়টি ভেবে দেখেছো, যদি এটাই সত্য বলে প্রমাণিত
হয় যে, এ কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে, তাহলে তা অস্বীকার করে এবং তার
বিরোধিতায় এতদূর অথসর হয়ে তোমরা কোন পরিণতির মুখোমুখি হবে?

(১০) আজ তোমরা এ কুরআনকে মানছো না। কিন্তু অচিরেই নিজের চোখে দেখতে
পাবে, এ কুরআনের দাওয়াত দশ দিগন্তে ছড়িয়ে পড়েছে এবং তোমরা নিজেরা তার কাছে
পরাজিত হয়ে গিয়েছো। তখন তোমরা বুঝতে পারবে, ইতিপূর্বে তোমাদের যা বলা
হয়েছিল তা ছিল সত্য।

বিরোধীদেরকে এসব জবাব দেয়ার সাথে সাথে এই চরম প্রতিকূল পরিবেশে
ঈমানদারগণ এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে যে সমস্যাবলীর সম্মুখীন
ছিলেন সেদিকেও দৃষ্টি দেয়া হয়েছে। মুমিনদের পক্ষে সে সময় তাবলীগ ও প্রচার তো
দূরের কথা ঈমানের পথে টিকে থাকাও অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছিলো। যে ব্যক্তি সম্পর্কেই
প্রকাশ হয়ে পড়তো যে, সে মুসলমান হয়ে গিয়েছে সে-ই শাস্তির যাঁতাকলে পিষ্ট হতো।
শত্রুদের ভয়াবহ জোটবদ্ধতা এবং সর্বত্র বিস্তৃত শক্তির ম্েকাবিলায় তারা নিজেদেরকে
একেবারেই অসহায় ও বন্ধুহীন মনে করছিলো। এই পরিস্থিতিতে প্রথমত এই বলে
তাদেরকে সাহস যোগানো হয়েছে যে, তোমরা সত্যি সত্যিই বান্ধব ও সহায়হীন নও। বরং
যে ব্যক্তিই একবার আল্লাহকে তার রব মেনে নিয়ে সেই আকীদা ও পথ দৃঢ়ভাবে আকড়ে
ধরে থাকে তার কাছে আল্লাহর ফেরেশতা নাধিল হয় এবং দুনিয়া থেকে শুরু করে
আখেরাত পর্যন্ত তার সাথে থাকে। অতপর তাকে সাহস ও উৎসাহ যোগানো হয়েছে এ
কথা বলে যে, সেই মানুষ সর্বোতবৃষ্ট যে নিজে সৎ কাজ করে, অন্যদের আল্লাহর দিকে
আহ্বান জানায় এবং সাহসিকতার সাথে বলে, আমি মুসলমান।

সেই সময় যে প্রশ্নটি নবীর (সা) সামনে অত্যন্ত বিব্রতকর ছিল তা হচ্ছে, এসব জগদ্দল
পাথর যখন এ আন্দোলনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তখন এসব পাথরের মধ্যে দিয়ে
ইসলামের প্রচার ও প্রসারের রাস্তা কিভাবে বের করা যাবে? এ প্রশ্নের সমাধানের জন্য
নবীকে (সা) বলা হয়েছে, এসব প্রদর্শনীমূলক বাধার পাহাড় বাহ্যত অত্যন্ত কঠিন বসে
মনে হয়। কিন্তু উত্তম নৈতিক চরিত্রের হাতিয়ার এমন হাতিয়ার যা এঁ সব বাধার পাহাড়
চর্ণবিচর্ণ করে গলিয়ে দেবে। ধৈর্যের সাথে উত্তম নৈতিক চরিত্রকে কাজে লাশাও এবং
যখনই শয়তান উত্তেজনা সৃষ্টি করে অন্য কোন হাতিয়ার ব্যবহার করতে উষ্কানি দেবে
তখনই আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করো।

Leave a Reply