তাওহীদ শিরক ও “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর মর্যাদা

১ম অধ্যায়ঃ তাওহীদ
২য় অধ্যায়ঃ তাওহীদের মর্যাদা
৩য় অধ্যায়ঃ তাওহীদের উপরে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি বিনা হিসেবে জান্নাতে যাবে
৪র্থ অধ্যায় ঃ শিরক সম্পর্কীয় ভীতি
৫ম অধ্যায় ঃ“লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর প্রতি সাক্ষ্যদানের আহ্বান
৬ষ্ঠ অধ্যায় ঃ তাওহীদ এবং লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর সাক্ষ্য দানের ব্যাখ্যা

১ম অধ্যায়: তাওহীদ

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করিয়াছেন,
“আমি জিন এবং মানব জাতিকে একমাত্র আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি।” [যারিয়াত . ৫৬]।
২। আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করিয়াছেন,
“আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রসুল পাঠিয়েছি। {তাঁহার মাধ্যমে এ নির্দেশ দিয়েছি} তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, আর তাগুতকে বর্জন করো।” [নাহল: ৩৬]
আল্লাহ তাআলা অন্যত্র এরশাদ করিয়াছেন,
৩। “তোমার রব এ নির্দেশ দিয়াছেন যে তাঁহাকে ছাড়া তোমরা আর কারো ইবাদত করো না। আর মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করো”। [ইসরাদি. ২৩]
৪। সুরা নিসাতে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করিয়াছেন,
“তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো। আর তাঁহার সাথে কাউকে শরিক করো না।” [নিসা: ৩৬]
৫। সুরা আনআমে আল্লাহ ঘোষণা করিয়াছেন,
“হে মুহাম্মদ বলো, {হে আহলে কিতাব} তোমরা এসো তোমাদের রব তোমাদের জন্য যা হারাম করে দিয়াছেন তা পড়ে শুনাই। আর তা হচ্ছে এই, “তোমরা তাঁহার সাথে কাউকে শরিক করবে না।” [আনআম: ‘১৫১]
৬। ইবনে মাসউদ [রাদি.] বলিয়াছেন,
“যে ব্যক্তি মুহাম্মদ সাঃআঃ এর মোহরাঙ্কিত অসিয়ত দেখতে চায়, সে যেন আল্লাহ তাআলার এ বাণী পড়ে নেয়, “হে মুহাম্মদ বলো, তোমাদের রব তোমাদের উপর যা হারাম করিয়াছেন তা পড়ে শুনাই। আর তা হলো, তোমরা তাঁহার সাথে কাউকে শরিক করবে না . . . . আর এটাই হচ্ছে আমার সরল, সোজা পথ”।
৭। সাহাবি মুআয বিন জাবাল [রাদি.] হইতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রসুল সাঃআঃ এর পিছনে একটি গাধার পিঠে বসে ছিলাম। তিনি আমাকে ডাক দিয়ে বললেন,”
“হে মুআয, তুমি কি জানো, বান্দার উপর আল্লাহর কি হক রয়েছে? আর আল্লাহর উপর বান্দার কি হক আছে? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁহার রসুলই ভালো জানেন। তিনি বললেন, বান্দার উপর আল্লাহর হক হচ্ছে তারা তাঁহারই ইবাদত করবে এবং তাঁহার সাথে কাউকে শরিক করবে না। আর আল্লাহর উপর বান্দার হক হচ্ছে “যারা তার সাথে
কাউকে শরিক করবে না, তাহলে তিনি তাদেরকে শাস্তি দেবেন না।” আমি বললাম, ইয়া রসুলুল্লাহ, আমি কি এ সুসংবাদ লোকদেরকে জানিয়ে দেব না? তিনি বললেন, তুমি তাদেরকে এ সুসংবাদ দিওনা, তাহলে তারা ইবাদত ছেড়ে দিয়ে {আল্লাহর উপর ভরসা করে} হাত গুটিয়ে বসে থাকবে। [বুখারি ও মুসলিম]

এ অধ্যায় থেকে নিুোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:
১। জ্বিন ও মানব জাতি সৃষ্টির রহস্য।
২। ইবাদতই হচ্ছে তাওহীদ। কারণ এটা নিয়েই বিবাদ।
৩। যার তাওহীদ ঠিক নেই, তার ইবাদতও ঠিক নেই। এ কথার মধ্যে
৪। রসুল পাঠানোর অন্তর্নিহিত হিকমত বা রহস্য।
৫। সকল উম্মতই রিসালতের আওতাধীন ছিল।
৬। আম্বিয়ায়ে কেরামের দীন এক ও অভিন্ন।
৭। মূল কথা হচ্ছে, তাগুতকে অস্বীকার করা ব্যতীত ইবাদতের মর্যাদা অর্জন করা যায় না।
৮। আল্লাহর ইবাদত ব্যতীত আর যারই ইবাদত করা হয়, সেই তাগুত হিসেবে গণ্য।
৯। সালাফে-সালেহীনের কাছে সুরা আনআমের উল্লেখিত তিনটি মুহকাম আয়াতের বিরাট মর্যাদার কথা জানা যায়। এতে দশটি বিষয়ের কথা রয়েছে। এর প্রথমটিই হচ্ছে; শিরক নিষিদ্ধ করণ।
১০্ সুরা ইস্রায় কতগুলো মুহকাম আয়াত রয়েছে। এবং তাতে আঠারোটি বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে। আল্লাহ বিষয়গুলোর সূচনা করিয়াছেন তাঁহার বাণী- لا تجعل مع الله إلها آخر فتقعد مذموما مخذولا এর মাধ্যমে, আর সমাপ্তি ঘোষণা করিয়াছেন তাঁহার বাণী-
ولا تجعل مع الله إلها آخر فتلقى في جهنم ملوما مدحوراً
এর মাধ্যমে। সাথে সাথে আল্লাহ তাআলা এ বিষয়টির সুমহান মর্যাদাকে উপলব্ধি করার জন্য তাঁহার বাণী,
ذلك مما أوحى إليك ربك من الحكمة এর মাধ্যমে আমাদেরকে সতর্ক করে দিয়াছেন।
১১। সুরা নিসার ‘আল- হুকুকুল আশারা’ {বা দশটি হক} নামক আয়াতের কথা জানা গেলো। যার সূচনা হইয়াছেআল্লাহ তাআলার বাণী,
واعبدوا الله ولا تشركوا به شيئا
এর মাধ্যমে। যার অর্থ হচ্ছে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, আর তাঁহার সাথে কাউকে শরিক করো না।
১২। রসুল সাঃআঃ এর অন্তিমকালের অসিয়তের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন।
১৩। আমাদের উপর আল্লাহ তাআলার হক সম্পর্কে জ্ঞানার্জন।
১৪। বান্দা যখন আল্লাহর হক আদায় করবে, তখন আল্লাহ তাআলার উপর বান্দার হক সম্পর্কে জ্ঞানার্জন।
১৫। অধিকাংশ সাহাবিই এ বিষয়টি জানতেন না।
১৬। কোন বিশেষ স্বার্থে এলেম [জ্ঞান] গোপন রাখার বৈধতা।
১৭। আনন্দদায়ক বিষয়ে কোন মুসলিমকে খোশখবর দেয়া মুস্তাহব।
১৮। আল্লাহর অপরিসীম রহমতের উপর ভরসা করে আমল বাদ দেয়ার ভয়।
১৯। অজানা বিষয়ে জিজ্ঞাসিত ব্যক্তির الله ورسوله أعلم {অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁহার রসুলই সবচেয়ে ভাল জানেন} বলা।
২০। কাউকে বাদ রেখে অন্য কাউকে জ্ঞান দানে বিশেষিত করার বৈধতা।
২১। একই গাধার পিঠে পিছনে আরোহণকারীর প্রতি রসুল সাঃআঃ এর দয়া ও নম্রতা প্রদর্শন।
২২। একই পশুর পিঠে একাধিক ব্যক্তি আরোহণের বৈধতা।
২৩। মুআয বিন জাবাল [রাদি.] এর মর্যাদা।
২৪। আলোচিত বিষয়টির মর্যাদা ও মোহত্ব।

২য় অধ্যায় : তাওহীদের মর্যাদা

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করিয়াছেন,
“যারা ঈমান এনেছে এবং ঈমানকে জুলুম {শিরক} এর সাথে মিশ্রিত করেনি” {তাদের জন্যই রয়েছে শান্তি ও নিরাপত্তা} [আনআম : ৮২]
২। সাহাবি উবাদা ইবনে সামেত [রাদি.] হইতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রসুল [সাঃআঃ] এরশাদ করিয়াছেন,
“যে ব্যক্তি এ সাক্ষ্য দান করল যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। তিনি একক। তাঁহার কোন শরিক নেই। মুহাম্মদ সাঃআঃ তাঁহার বান্দা ও রসুল। ঈসা [আঃ] আল্লাহর বান্দা ও রসুল। তিনি তাঁহার এমন এক কালিমা যা তিনি মরিয়াম [আঃ] এর প্রতি প্রেরণ করিয়াছেন এবং তিনি তাঁহারই পক্ষ থেকে প্রেরিত রুহ বা আত্মা। জান্নাত সত্য জাহান্নাম
সত্য। সে ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা জান্নাত দান করবেন, তার আমল যাই হোক না কেন। [বুখারি ও মুসলিম]
সাহাবি ইতবানের হাদিসে বর্ণিত আছে, ইমাম বুখারি ও মুসলিম হাদিসটি সংকলন করিয়াছেন,
“আল্লাহ তাআলা এমন ব্যক্তির উপর জাহান্নামের আগুন হারাম করে দিয়াছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলেছে।’
৩। প্রখ্যাত সাহাবি আবু সাঈদ খুদরী [রাদি.] রসুল সাঃআঃ থেকে বর্ণনা করিয়াছেন, তিনি এরশাদ করিয়াছেন, মূসা [আঃ] বললেন,
“হে আমার রব, আমাকে এমন জিনিস শিক্ষা দিন যা দ্বারা আমি আপনাকে স্মরণ করবো এবং আপনাকে ডাকবো। আল্লাহ বললেন, ‘হে মূসা, তুমি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলো। মূসা বললেন, “আপনার সব বান্দাই তো এটা বলে।” তিনি বললেন, “হে মূসা, আমি ব্যতীত সপ্তাকাশে যা কিছু আছে তা, আর সাত তবক যমীন যদি এক পাল্লায় থাকে আরেক পাল্লায় যদি শুধু লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ থাকে, তাহলে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর পাল্লাই বেশী ভারী হবে।”
[ইবনে হিব্বান, হাকিম]
৪। বিখ্যাত সাহাবি আনাস [রাদি.] হইতে বর্ণিত আছে, তিনি বলিয়াছেন, ‘আমি রসুল [সাঃআঃ] কে এ কথা বলতে শুনেছি,
“আল্লাহ তাআলা বলিয়াছেন, “হে আদম সন্তান, তুমি দুনিয়া ভর্তি গুনাহ নিয়ে যদি আমার কাছে হাজির হও, আর আমার সাথে কাউকে শরিক না করা অবস্থায় মৃত্যু বরণ করো, তাহলে আমি দুনিয়া পরিমাণ
মাগফিরাত নিয়ে তোমার দিকে এগিয়ে আসবো”। [তিরমিজী]

এ অধ্যায় থেকে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ-
১। আল্লাহর অসীম করুণা।
২। আল্লাহর নিকট তাওহীদের অপরিসীম সওয়াব।
৩। গুনাহ সত্ত্বেও তাওহীদের দ্বারা পাপ মোচন।
৪। সুরা আন আনআমের ৮২ নং আয়াতের তাফসির।
৫। উবাদা বিন সামেতের হাদীসে বর্ণিত পাঁচটি বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দেয়া।
৬। উবাদা বিন সামেত এবং ইতবানের হাদীসকে একত্র করলে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর অর্থ সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে এবং ধোকায় নিপতিত লোকদের ভুল সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়বে।
৭। ইতবান [রাদি.] হতে বর্ণিত হাদীসে উল্লেখিত শর্তের ব্যাপারে সতর্কী করণ।
৮। লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর ফজীলতের ব্যাপারে সতর্কীকরণের প্রয়োজনীয়তা নবীগণের জীবনেও ছিলো।
৯। সমগ্র সৃষ্টির তুলনায় এ কালেমার পাল্লা ভারী হওয়ার ব্যাপারে সতর্কীকরণ, যদিও এ কলেমার অনেক পাঠকের পাল্লা ইখলাসের সাথে পাঠ না করার কারণে হালকা হয়ে যাবে।
১০। সপ্তাকাশের মত সপ্ত যমীন বিদ্যমান থাকার প্রমাণ।
১১। যমীনের মত আকাশেও বসবাসকারীর অস্তিত্ব আছে।
১২। আল্লাহর সিফাত বা গুণাবলীকে ইতিবাচক বলে সাব্যস্ত করা যা আশআরী সম্প্রদায়ের চিন্তা ধারার সম্পূর্ণ বিপরীত।
১৩। সাহাবি আনাস [রাদি.] এর হাদীস সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর ইতবান [রাদি.] এর হাদীসে বর্ণিত রসুল সাঃআঃ এর বাণী।
এর মর্মার্থ হচ্ছে শিরক বর্জন করা। শুধু মুখে বলা এর উদ্দেশ্য নয়।
১৪। নবি ঈসা [আঃ] এবং মুহাম্মদ সাঃআঃ উভয়ই আল্লাহর বান্দা এবং রসুল হওয়ার বিষয়টি গভীর ভাবে চিন্তা করা।
১৫। “কালিমাতুল্লাহ” বলে ঈসা [আঃ] কে খাস করার বিষয়টি জানা।
১৬। হযরত ঈসা [আঃ] আল্লাহর পক্ষ থেকে রুহ [পবিত্র] আত্মা হওয়া সম্পর্কে অবগত হওয়া।
১৭। জান্নাত ও জাহান্নামের প্রতি ঈমান আনার মর্যাদা।
১৮। আমল যাই হোক না কেন, এ কথার মর্মার্থ উপলব্ধি করা।
১৯। মিজানের দুটি পাল্লা আছে এ কথা জানা।
২০। আল্লাহার চেহারার উল্লেখ আছে, এ কথা জানা।

৩য় অধ্যায় .তাওহীদের উপরে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি বিনা হিসেবে জান্নাতে যাবে

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করিয়াছেন,
“নিশ্চয়ই ইবরাহীম ছিলেন একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর হুকুম পালনকারী একটি উম্মত বিশেষ। এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন না।” [নাহলঃ১২০]
২। আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করিয়াছেন,
“আর যারা তাদের রবের সাথে শিরক করে না” [মুমিনুনঃ ৫৯]
৩। হুসাইন বিন আবদুর রহমান হইতে বর্ণিত আছে, তিনি বলিয়াছেন, একবার আমি সাঈদ বিন জুবাইরের কাছে উপস্থিত ছিলাম। তিনি বললেন, গতকাল রাত্রে যে নক্ষত্রটি ছিটকে পড়েছে তা তোমাদের মধ্যে কে দেখতে পেয়েছে? তখন বললাম, “আমি”। তারপর বললাম, ‘বিষাক্ত প্রাণী কর্তৃক দংশিত হওয়ার কারণে আমি নামাজে উপস্থিত থাকতে পারিনি’। [তিনি বললেন, ‘তখন তুমি কি চিকিৎসা করেছ?
বললাম “ঝাড় ফুঁক করেছি” তিনি বললেন, কিসে তোমাকে এ কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে? {অর্থাৎ তুমি কেন এ কাজ করলে?} বললাম, ‘একটি হাদীস’ {এ কাজে উদ্বুদ্ধ করেছে} যা শা’বী আমাদের কাছে বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি বললেন, তিনি তোমাদেরকে কি বর্ণনা করিয়াছেন? বললাম ‘তিনি বুরাইদা বিন আল হুসাইব থেকে আমাদের কাছে বর্ণনা করিয়াছেন যে, চোখের দৃষ্টি বা চোখ লাগা এবং জ্বর ব্যতীত অন্য কোন রোগে ঝাড়- ফুঁক নেই।’ তিনি বললেন, ‘সে ব্যক্তিই উত্তম কাজ করেছে, যে শ্র“ত জিনিস শেষ পর্যন্ত আমল করতে পেরেছে’। কিন্তু ইবনে আব্বাস [রাদি.] রসুল সাঃআঃ থেকে আমাদের কাছে বর্ণনা করিয়াছেন যে, রসুল সাঃআঃ এরশাদ করিয়াছেন,
“আমার সম্মুখে সমস্ত জাতিকে উপস্থাপন করা হলো। তখন আমি এমন একজন নবীকে দেখতে পেলাম যার সাথে অল্প সংখ্যক লোক রয়েছে। এরপর আরো একজন নবীকে দেখতে পেলাম যার সাথে মাত্র দু’জন লোক রয়েছে। আবার এমন একজন নবীকে দেখতে পেলাম যার সাথে কোন লোকই নেই। ঠিক এমন সময় আমার সামনে এক বিরাট জনগোষ্ঠী পেশ করা হলো। তখন আমি ভাবলাম, এরা আমার উম্মত। কিন্তু আমাকে বলা হলো এরা হচ্ছে মূসা [আঃ] এবং তাঁহার জাতি।
এরপর আরো একটি বিরাট জনগোষ্ঠীর দিকে আমি তাকালাম। তখন আমাকে বলা হলো, এরা আপনার উম্মত। এদের মধ্যে সত্তুর হাজার লোক রয়েছে যারা বিনা হিসেবে এবং বিনা আযাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। একথা বলে তিনি দরবার থেকে উঠে বাড়ীর অভ্যন্তরে চলে গেলেন। এরপর লোকেরা ঐ সব ভাগ্যবান লোকদের ব্যাপারে বিতর্ক শুরু করে দিলো। কেউ বললো, তারা বোধ হয় রসুল সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সহচার্য লাভকারী ব্যক্তিবর্গ। আবার কেউ বললো, তারা বোধ হয় ইসলাম পরিবেশে অথবা মুসলিম মাতা-পিতার ঘরে জন্মগ্রহণ করেছে আর আল্লাহর সাথে তারা কাউকে শরিক করেনি। তারা এ ধরনের আরো অনেক কথা বলাবলি করলো। অতঃপর রসুল সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের মধ্যে উপস্থিত হলে বিষয়টি তাঁহাকে জানানো হলো। তখন তিনি বললেন,
“তারা হচ্ছে ঐ সব লোক যারা ঝাড়-ফুক করে না। পাখি উড়িয়ে ভাগ্যের ভাল-মন্দ যাচাই করে না। শরীরে সেক বা দাগ দেয় না। আর তাদের রবের উপর তারা ভরসা করে।” একথা শুনে ওয়াকাশা বিন মুহসিন দাড়িয়ে বললো, আপনি আমার জন্য দোয়া করুন যেন আল্লাহ তাআলা আমাকে এই সৌভাগ্যবান ব্যক্তিদের দলভূক্ত করে নেন। তিনি বললেন, আমি দোয়া করলাম, “তুমি তাদের দলভুক্ত”। অতঃপর অন্য একজন লোক দাড়িয়ে বললো, আল্লাহর কাছে আমার জন্যও দোয়া করুন যেন তিনি আমাকেও তাদের দলভুক্ত করে নেন। তিনি বললেন, “তোমার পূর্বেই ওয়াকাশা সে সুযোগ নিয়ে গেছে।”

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ
১। তাওহীদের ব্যাপারে মানুষের বিভিন্ন স্তরে অবস্থান সম্পর্কিত জ্ঞান।
২। নবি ইবরাহীম [আ:] মুশরিক ছিলেন না বলে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা।
৩। বড় বড় বুজুর্গ ব্যক্তিগণ শিরক মুক্ত ছিলেন বলে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা।
৪। ঝাড়-ফুঁক এবং আগুনের দাগ পরিত্যাগ করা তাওহীদপন্থী হওয়ার প্রকৃষ্ট প্রমান।
৫। আল্লাহর উপর ভরসা বা তাওয়াক্কুলই বান্দার মধ্যে উল্লেখিত গুণ ও স্বভাবসমূহের সমাবেশ ঘটায়।
৬। বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশকারী সৌভাগ্যবান লোকেরা কোন আমল ব্যতীত উক্ত মর্যাদা লাভ করতে পারেননি, এটা জানার ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামের জ্ঞানের গভীরতা।
৭। মঙ্গল ও কল্যাণের প্রতি তাঁদের অপরিসীম আগ্রহ।
৮। সংখ্যা ও গুণাবলরি দিক থেকে উম্মতে মুহাম্মদীর ফজিলত।
৯। নবি মূসা [আঃ] এর সাহাবিদের মর্যাদা।
১০। সব উম্মতকে রসুল সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সম্মুখে উপস্থিত করা হবে।
১১। প্রত্যেক উম্মতই নিজ নিজ নবীর সাথে পৃথকভাবে হাশরের ময়দানে উপস্থিত হবে।
১২। নবীগণের আহ্বানে সাড়া দেয়ার মত লোকের স্বল্পতা।
১৩। যে নবীর দাওয়াত কেউ গ্রহণ করেনি তিনি একাই হাশরের ময়দানে উপস্থিত হবেন।
১৪। এ জ্ঞানের শিক্ষা হচ্ছে, সংখ্যাধিক্যের দ্বারা ধোকা না খাওয়া আবার সংখ্যাল্পতার কারণে অবহেলা না করা।
১৫। চোখ-লাগা এবং জ্বরের চিকিৎসার জন্য ঝাড়-ফুঁকের অনুমতি।
১৬। সালাফে সালেহীনের জ্ঞানের গভীরতা।
قد أحسن من انتهى إلى ما سمع
“সে ব্যক্তিই ভাল কাজ করেছে যে নবি সাঃআঃ থেকে যা শুনেছে তাই আমল করেছে” এ কথাই এর প্রমাণ পেশ করে। তাই প্রথম হাদীস দ্বিতীয় হাদিসের বিরোধী নয়।
১৭। মানুষের মধ্যে যে গুণ নেই তার প্রশংসা থেকে সালাফে সালেহীন বিরত থাকতেন।
১৮। أنت منهم [তুমি তাদের অন্তর্ভূক্ত] ওয়াকাশার ব্যাপারে একথা নবুওয়তেরই প্রমাণ পেশ করে।
১৯। ওয়াকাশা [রাদি.] এর মর্যাদা ও ফজিলত।
২০। কোন কথা সরাসরি না বলে হিকমত ও কৌশল অবলম্বন করা।

৪র্থ অধ্যায় . শিরক সম্পর্কীয় ভীতি

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করিয়াছেন-
“আল্লাহ তাঁহার সাথে শিরক করা গুনাহ মাফ করবেন না। শিরক ছাড়া অন্যান্য যে সব গুনাহ রয়েছে সেগুলো যাকে ইচ্ছা মাফ করে দিবেন।” [নিসাঃ৪৮]
২। ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম আল্লাহ তাআলার কাছে এ দোয়া করেছিলেন,
“আমাকে এবং আমার সন্তানদের মূর্তিপূজা থেকে রক্ষা কর” [ইবরাহীম . ৩৫]
৩। এক হাদীসে রসুল সাঃআঃ এরশাদ করিয়াছেন,
“ আমি তোমাদের জন্য সে জিনিসটি সবচেয়ে বেশী ভয় করি তা হচ্ছে শিরকে আসগার অর্থাৎ ছোট শিরক। তাকে শিরকে আসগার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তরে বললেন, [ছোট শিরক হচ্ছে] “রিয়া”।
৪। ইবনে মাসউদ [রাদি.] হইতে বর্ণিত আছে, রসুল সাঃআঃ এরশাদ করিয়াছেন,
“যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা অবস্থায় মৃত্যু বরণ করবে। সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” [বুখারি]
৫। সাহাবি জাবের [রাদি.] হইতে বর্ণিত আছে, রসুল সাঃআঃ এরশাদ করিয়াছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক না করে মৃত্যু বরণ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি তাঁহার সাথে কাউকে শরিক করে মৃত্যু বরণ করবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” [মুসলিম]

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় .
১। শিরককে ভয় করা।
২। রিয়া শিরকের মধ্যে শামিল।
৩। রিয়া হল ছোট শিরকের অন্তর্ভূক্ত।
৫। জান্নাত ও জাহান্নাম কাছাকাছি হওয়া।
৬। জান্নাত ও জাহান্নাম নিকটবর্তী হওয়ার বিষয়টি একই হাদীসে বর্ণিত হওয়া।
৭। আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক না করে মৃত্যুবরণ করলে মৃত ব্যক্তি জান্নাতে যাবে। পক্ষান্তরে আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক বানিয়ে মৃত্যু বরণ করলে মৃত ব্যক্তি যত বড় আবেদই হোক না কেন সে জাহান্নামে যাবে।
৮। ইবরাহীম খলীল [আঃ] এর দোয়ার প্রধান বিষয় হচ্ছে, তাঁহাকে এবং তাঁহার সন্তানদেরকে মূর্তিপূজা তথা শিরক থেকে রক্ষা করা।
৯। “হে আমার রব, এমূর্তিগুলো বহু লোককে গুমরাহ করেছে” এ কথা দ্বারা ইবরাহীম [আঃ] বহু লোকের অবস্থা থেকে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করিয়াছেন।
১০। এখানে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর তাফসির রয়েছে যা ইমাম বুখারি বর্ণনা করিয়াছেন।
১১। শিরক মুক্ত ব্যক্তির মর্যাদা।

৫ম অধ্যায় ঃ“লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর প্রতি সাক্ষ্যদানের আহ্বান

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করিয়াছেন,
“[হে মুহাম্মদ] আপনি বলে দিন, এটাই আমার পথ। পূর্ণ জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সাথে আমি আল্লাহর দিকে আহ্বান জানাই।” [ইউসুফ ঃ ১০৮]
২। সাহাবি ইবনে আব্বাস [রাদি.] হতে বর্ণিত আছে, রসুল [সাঃআঃ] যখন মুআ’য বিন জাবাল [রাদি.] কে ইয়ামানের শাসনকর্তা নিয়োগ করে পাঠালেন তখন {রসুল [সাঃআঃ] মুআ’যকে লক্ষ্য করে} বললেন,
“তুমি এমন এক কাওমের কাছে যাচ্ছ যারা আহলে কিতাব। {যারা কোন আসমানী কিতাবে বিশ্বাসী} সর্ব প্রথম যে জিনিসের দিকে তুমি তাদেরকে আহ্বান জানাবে তা হচ্ছে, “লা-ইলাহ ইল্লাল্লাহুর সাক্ষ্য দান”। অন্য বর্ণনায় আছে, আল্লাহর ওয়াহদানিয়্যাত বা একত্ববাদের স্বীকৃতি প্রদান। এ বিষয়ে তারা যদি তোমার আনুগত্য করে তবে তাদেরকে জানিয়ে দিও যে, আল্লাহ তাআলা তাদের উপর দিনে-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করে দিয়াছেন। এ ব্যাপারে তারা যদি তোমার কথা মেনে নেয় তবে তাদেরকে জানিয়ে দিও যে, আল্লাহ তাআলা তাদের উপর যাকাত ফরজ করে দিয়াছেন, যা বিত্তশালীদের কাছ থেকে নিয়ে গরীবদেরকে দেয়া হবে। তারা যদি এ ব্যাপারে তোমার আনুগত্য করে তবে তাদের উৎকৃষ্ট মালের ব্যাপারে তুমি খুব সাবধানে থাকবে। আর মজলুমের ফরিয়াদকে ভয় করে চলবে। কেননা মজলুমের ফরিয়াদ এবং আল্লাহ তাআলার মাঝখানে কোন পর্দা নেই।” [বুখারি ও মুসলিম]
৩। সাহাল বিন সাআদ [রাদি.] হইতে বর্ণিত আছে, রসুল [সাঃআঃ] খাইবারের {যুদ্ধের} দিন বললেন,
“আগামীকাল এমন ব্যক্তির কাছে আমি ঝান্ডা প্রদান করবো যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁহার রসুলকে ভালবাসে এবং আল্লাহ ও তাঁহার রসুল তাকে ভালবাসে। তার হাতে আল্লাহ তাআলা বিজয় দান করবেন। কাকে ঝান্ডা প্রদান করা হবে এ উৎকণ্ঠা ও ব্যাকুলতার মধ্যে লোকজন রাত্রি যাপন করলো। যখন সকাল হয়ে গেলো তখন লোকজন রসুল [সাঃআঃ] এর নিকট গেলো তাদের প্রত্যেকেই আশা পোষণ করছিলো যে ঝান্ডা তাকেই দেয়া হবে, তখন তিনি বললেন, আলী বিন আবি তালিব কোথায়? বলা হলো, তিনি চক্ষুর পীড়ায় ভোগছেন। তাদেরকে

এ অধ্যায় থেকে নিম্বোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়,
১। রসুল সাঃআঃকে অনুসরণকারীর নীতি ও পথ হচ্ছে আল্লাহর দিকে মানুষকে আহ্বান করা।
২। ইখলাসের ব্যাপারে শতর্কতা অবলম্বন করা। কেননা অনেক লোক হকের পথে মানুষকে আহ্বান জানালেও মূলতঃ তারা নিজের নফস বা স্বার্থের দিকেই আহ্বান জানায়।
৩। তাওহীদের দাওয়াতের জন্য অন্তর দৃষ্টি সম্পন্ন জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অপরিহার্য্য।
৪। উত্তম তাওহীদের প্রমাণ হচ্ছে, আল্লাহ তাআলার প্রতি গাল-মন্দ আরোপ করা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র থাকা।
৫। আল্লাহ তাআলার প্রতি গাল-মন্দ আরোপ করা নিকৃষ্ট এবং শিরকের অন্তর্ভূক্ত।
৭। তাওহীদই হচ্ছে সর্ব প্রথম ওয়াজিব।
৮। সর্বাগ্রে এমন কি নামাযেরও পূর্বে তাওহীদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।
৯। আল্লাহর ওয়াহদানিয়াতের অর্থ হচ্ছে, “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর সাক্ষ্য প্রদান করা। অর্থাৎ “আল্লাহ তাআলা ব্যতীত কোন ইলাহ নেই” এ ঘোষণা দেয়া।
১০। একজন মানুষ আহলে কিতাবের অন্তর্ভূক্ত হওয়া সত্ত্বেও সে তাওহীদ সম্পর্কে অজ্ঞ থাকতে পারে কিংবা তাওহীদের জ্ঞান থাকলেও তা দ্বারা আমল নাও করতে পারে।
১১। শিক্ষা দানের প্রতি পর্যায়ক্রমে গুরুত্বারোপ।
১২। সর্ব প্রথম অপেক্ষাকৃত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুরু করা।
১৩। যাকাত প্রদানের খাত সম্পর্কিত জ্ঞান।
১৪। শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রের সংশয় ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব উন্মোচন করা বা নিরসন করা।
১৫। যাকাত আদায়ের সময় বেছে বেছে উৎকৃষ্ট মাল নেয়ার প্রতি নিষেধাজ্ঞা।
১৬। মজলুমের বদ দোয়া থেকে বেঁচে থাকা।
১৭। মজলুমের ফরিয়াদ এবং আল্লাহ তাআলার মধ্যে কোন প্রতিবন্ধকতা না থাকার সংবাদ।
১৮। সাইয়্যিদুল মুরসালীন মুহাম্মদ সাঃআঃ এর বড় বড় বজুর্গানে
দ্বীনের উপর যে সব দুঃখ- কষ্ট এবং কঠিন বিপদাপদ আপতিত হইয়াছেতা তাওহীদেরই প্রমাণ পেশ করে।
১৯। “আমি আগামীকাল এমন একজনের হাতে পতাকা প্রদান করবো যার হাতে আল্লাহ বিজয় দান করবেন।” রসুল সাঃআঃ এর এ উক্তি নবুয়তেরই একটি নিদর্শন।
২০। আলী রাদি. এর চোখে থু থু প্রদানে চোখ আরোগ্য হয়ে যাওয়াও নবুয়্যতের একটি নিদর্শন।
২১। আলী রাদি. এর মর্যাদা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ।
২২। আলী রাদি. এর হাতে পতাকা তুলে দেয়ার পূর্বে রাতে পতাকা পাওয়ার ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামের উদ্বেগ ও ব্যাকুলতার মধ্যে রাত্রি যাপন এবং বিজয়ের সুসংবাদে আশ্বস্ত থাকার মধ্যে তাদের মর্যাদা নিহিত আছে।
২৩। বিনা প্রচেষ্টায় ইসলামের পতাকা তথা নেতৃত্ব লাভ করা আর চেষ্টা করেও তা লাভে ব্যর্থ হওয়া, উভয় অবস্থায়ই তাকদীরের প্রতি ঈমান রাখা।
২৪। “বীর পদক্ষেপে এগিয়ে যাও” রসুল সাঃআঃ এর এ উক্তির মধ্যে ভদ্রতা ও শিষ্ঠাচার শিক্ষা দানের ইঙ্গিত রয়েছে।
২৫। যুদ্ধ শুরু করার পূর্বে ইসলামের দাওয়াত পেশ করা।
২৬। ইতিপূর্বে যাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেয়া হইয়াছেএবং যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হইয়াছেতাদেরকেও যুদ্ধের আগে ইসলামের দাওয়াত দিতে হবে।
২৭। أخبرهم بمايجب عليهم রসুল সাঃআঃ এর বাণী হিকমত ও কৌশলের সাথে দাওয়াত পেশ করার ইঙ্গিত বহন করে।
২৮। দীন ইসলামে আল্লাহর হক সম্পর্কে জ্ঞানার্জন।
২৯। আলী রাদি. এর হাতে একজন মানুষ হেদায়াত প্রাপ্ত হওয়ার সওয়াব।
৩০। ফতোয়ার ব্যাপারে কসম করা।

৬ষ্ঠ অধ্যায় ঃ তাওহীদ এবং লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর সাক্ষ্য দানের ব্যাখ্যা

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করিয়াছেন,
“এসব লোকেরা যাদেরকে ডাকে তারা নিজেরাই তাদের রবের নৈকট্য লাভের আশায় অসীলার অনুসন্ধান করে [আর ভাবে] কোনটি সবচেয়ে বেশী নিকটবর্তী।” [ইসরাদি. ৫৭]
২। আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করিয়াছেন,
“সে সময়ের কথা স্মরণ করো যখন ইবরাহীম তার পিতা ও কওমের লোকদেরকে বলেছিলেন, তোমরা যার ইবাদত করো তার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। আর আমার সম্পর্ক হচ্ছে কেবল মাত্র তাঁহারই সাথে যিনি আমাকে সৃষ্টি করিয়াছেন।” [যুখরুফ ঃ ২৬]
৩। আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে ঘোষণা করিয়াছেন,
“তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে নিজেদের আলেম ও দরবেশ লোকদেরকে নিজেদের রব বানিয়ে নিয়েছে” [তাওবাঃ ৩১]
“মানুষের মধ্যে এমন লোকও আছে যারা আল্লাহ ছাড়া অপর কোন শক্তিকে আল্লাহর অংশীদার বা সমতুল্য হিসেবে গ্রহণ করে এবং তাকে এমনভাবে ভালবাসে যেমনিভাবে একমাত্র আল্লাহকেই ভালবাসা উচিৎ।” [বাকারা : ১৬৫]
৫। সহীহ বুখারীতে বর্ণিত রয়েছে, রসুল সাঃআঃ এরশাদ করিয়াছেন,
“যে ব্যক্তি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ {আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই} বলবে, আর আল্লাহ ব্যতীত যারই ইবাদত করা হয় তাকেই অস্বীকার করবে তার জান ও মাল হারাম {অর্থাৎ মুসলমানদের কাছে সম্পূর্ণ নিরাপদ} গোপন তৎপরতা ও অন্তরের কুটিলতা বা মুনাফিকির জন্য} তার শাস্তি আল্লাহর উপরই ন্যস্ত।”
পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে এর ব্যাখ্যা করা হইয়াছেএবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করা হয়েছে। আর তা হচ্ছে তাওহীদ এবং
শাহাদাতের তাফসির। কয়েকটি সুস্পষ্ট বিষয়ের মাধ্যমে এর বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যেমন ঃ
[ক] সুরা ইসরার আয়াত, এ আয়াতে সে সব মুশরিকদের সমুচিত জওয়াব দেযা হইয়াছেযারা বুজুর্গ ও নেক বান্দাদেরকে [আল্লাহকে ডাকার মত} ডাকে। আর এটা যে ‘শিরকে আকবার’ এ কথার বর্ণনাও এখানে রয়েছে।
[খ] সুরা তাওবার আয়াত। এতে আহলে কিতাব অর্থাৎ ইহুদি খৃষ্টানরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের আলেম ও দরবেশ ব্যক্তিরদেরকে রব হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে। আরো বর্ণনা করা হইয়াছেযে, এক আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়নি। এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, অন্যায় ও পাপ কাজে আলেম ও আবেদদের আনুগত্য করা যাবে না। তাদের কাছে দোয়াও করা যাবে না।
[গ] কাফেরদেরকে লক্ষ্য করে ইবরাহীম খলীল [আঃ] এর কথা
দ্বারা তাঁহার রবকে যাবতীয় মা’বুদ থেকে আলাদা করিয়াছেন। আল্লাহ তাআলা এখানে এটাই বর্ণনা করিয়াছেন যে {বাতিল মা’বুদ থেকে} পবিত্র থাকা আর প্রকৃত মাবুদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করাই হচ্ছে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর ব্যাখ্যা। তাই আল্লাহ তাআলা এরশাদ করিয়াছেন,
“আর ইবরাহীম এ কথাটি পরবর্তীতে তার সন্তানের মধ্যে রেখে গেলো, যেন তারা তার দিকে ফিরে আসে।”
[ঘ] সুরা বাকারার কাফেরদের বিষয় সম্পর্কিত আয়াত। যাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করিয়াছেন,
“তারা কখনো জাহান্নাম থেকে বের হতে পারবে না।”
এখানে আল্লাহ তাআলা উল্লেখ করিয়াছেন যে, মুশরিকরা তাদের শরীকদেরকে {যাদেরকে তারা আল্লাহর সমকক্ষ বা অংশীদার মনে করে} আল্লাহকে ভালবাসার মতই ভালবাসে।
এর দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, তারা আল্লাহকে ভালবাসে, কিন্তু এ ভালবাসা তাদেরকে ইসলামে দাখিল করতে পারেনি। তাহলে আল্লাহর শরীককে যে ব্যক্তি আল্লাহর চেয়েও বেশী ভালবাসে সে কিভাবে ইসলামকে গ্রহণ করবে। আর যে ব্যক্তি শুধুমাত্র শরীককেই ভালবাসে। আল্লাহর প্রতি তার কোন ভালবাসা নেই তার অবস্থাই বা কি হবে?
[ঙ] রসুল সাঃআঃ এর বাণী .
“যে ব্যক্তি লা- ইলাহ ইল্লাল্লাহু বলবে আর আল্লাহ ব্যতীত যারই
ইবাদত করা হয় তাকেই অস্বীকার করবে, তার ধন-সম্পদ ও রক্ত পবিত্র।” {অর্থাৎ জান, মাল, মুসলমানের কাছে নিরাপদ} এ বাণী হচ্ছে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যা। কারণ, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর শুধুমাত্র মৌখিক উচ্চারণ, শব্দসহ এর অর্থ জানা, এর স্বীকৃতি প্রদান, এমনকি শুধুমাত্র লা- শারীক আল্লাহকে ডাকলেই জান-মালের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে না যতক্ষণ পর্যন্ত উক্ত কালেমা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর সাথে গাইরুল্লাহর ইবাদত তথা মিথ্যা মা’বুদগুলোকে অস্বীকার করার বিষয়টি সংযুক্ত না হবে। এতে যদি কোন প্রকার সন্দেহ, সংশয় কিংবা দ্বিধা সংকোচ পরিলক্ষিত হয় তাহলে জান-মাল ও নিরাপত্তার কোন নিশ্চয়তা নেই। অতএব, এটাই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ বিষয়, সুস্পষ্ট বর্ণনা ও অকাট্য দলীল।

Leave a Reply