কাব ইবনু মালিক রাদি. আনহু ও তাহাঁর সাথীদ্বয়ের তাওবার ঘটনা

কাব ইবনু মালিক রাদি. আনহু ও তাহাঁর সাথীদ্বয়ের তাওবার ঘটনা

কাব ইবনু মালিক রাদি. আনহু ও তাহাঁর সাথীদ্বয়ের তাওবার ঘটনা << নবুওয়তের মুজিযা হাদীসের মুল সুচিপত্র দেখুন

পয়ত্রিশতম পরিচ্ছেদ – কা`ব ইবনু মালিক রাদি. আনহু ও তাহাঁর সাথীদ্বয়ের তাওবার ঘটনা এবং এ থেকে শিক্ষা। এটা রাঃসাঃ  এর নবুওয়তের প্রমাণ।

আবদুল্লাহ্ ইবনু কা`আব ইবনু মালিক রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, কা`আব রাদি. `আনহু অন্ধ হয়ে গেলে তাহাঁর সন্তানদের মধ্যে থেক যিনি তাহাঁর সাহায্যকারী ও পথ-প্রদর্শনকারী ছিলেন, তিনি [আবদুল্লাহ্] বলেন, আমি কা`আব ইবনু মালিক রাদি. `আনহুকে বলতে শুনেছি, যখন তাবুক যুদ্ধ থেকে তিনি পশ্চাতে থেকে যান তখনকার অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ যতগুলো যুদ্ধে অংশগ্রহন করেন তার মধ্যে তাবুক যুদ্ধ ছাড়া আমি কোনো যুদ্ধ থেকে পেছনে থাকিনি। তবে আমি বদর যুদ্ধেও অংশগ্রহন করিনি। কিন্তু উক্ত যুদ্ধ থেকে যারা পেছনে পড়ে গেছেন, তাদের কাউকে ভৎসনা করা হয়নি। রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ কেবল কুরাইশ দলের সন্ধানে বের হয়েছিলেন। অবশেষে আল্লাহ্ তা`আলা তাহাঁদের এবং তাহাঁদের শত্রুবাহিনীর মধ্যে অঘোষিত যুদ্ধ সংঘটিত করেন। আর আকাবা রজনীতে যখন রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ আমাদের থেকে ইসলামের উপর অঙ্গীকার গ্রহন করেন, আমি তখন তাহাঁর সঙ্গে ছিলাম। ফলে বদর প্রান্তরের উপস্থিতিকে আমি প্রিয়তর ও শ্রেষ্ঠতর বলে বিবেচনা করিনি। যদিও আকাবার ঘটনা অপেক্ষা লোকদের মধ্যে বদরের ঘটনা অধিক প্রসিদ্ধ ছিল। আর আমার অবস্থার বিবরন এই- তাবুক যুদ্ধ থেকে আমি যখন পেছনে থাকি তখন আমি এত অধিক সুস্থ, শক্তিশালী ও সচ্ছল ছিলাম যে আল্লাহর কসম, আমার কাছে কখনো ইতোপূর্বে কোনো যুদ্ধে একই সাথে দু`টো যানবাহন সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি, যা আমি এ যুদ্ধের সময় সংগ্রহ করেছিলাম। আর রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ যে অভিযান পরিচালনার সংকল্প গ্রহন করতেন, দৃশ্যত তার বিপরীত ভাব দেখাতেন। এ যুদ্ধ ছিল ভীষন উত্তাপের সময়, অতি দূরের সফর, বিশাল মরুভূমি এবং অধিক সংখ্যক শত্রুসেনার মুকাবিলা করার। কাজেই রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ এ অভিযানের অবস্থা মুসলিমদের কাছে প্রকাশ করে দেন যেন তারা যুদ্ধের প্রয়োজনীয় সম্বল সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ এর সঙ্গী লোক সংখ্যা ছিল অধিক যাদের হিসাব কোনো রেজিষ্ট্রারে লিখিত ছিলনা। কা`আব রাদি. `আনহু বলেন, যার ফলে যেকোনো লোক যুদ্ধাভিযান থেকে বিরত থাকতে ইচ্ছা করলে তা সহজেই করতে পারত এবং অহী মারফত এ খবর পরিজ্ঞাত না করা পর্যন্ত তা সংগোপন থাকবে বলে সে ধারনা করত। রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ এ অভিযান পরিচালনা করেছিলেন এমন সময় যখন ফল-ফলাদি পাকার ও গাছের ছায়ায় আরাম উপভোগের সময় ছিল। রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ স্বয়ং এবং তাহাঁর সঙ্গী মুসলিম বাহিনী অভিযানে যাত্রার প্রস্তুতি গ্রহন করে ফেলেন। আমিও প্রতি সকালে তাহাঁদের সঙ্গে রওয়ানা হওয়ার প্রস্তুতি গ্রহন করতে থাকি। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারিনি। মনে মনে ধারনা করতে থাকি, আমি তো যখন ইচ্ছা যেতে সক্ষম। এই দ্বিধা-দ্বন্দ্বে আমার সময় কেটে যেতে লাগল। এদিকে অন্য লোকেরা পুরাপুরি প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেলল। ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ এবং তাহাঁর সাথী মুসলিমগন রওয়ানা করিলেন অথচ আমি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারলামনা। আমি মনে মনে ভাবলাম, আচ্ছা ঠিক আছে, এক দু`দিনের মধ্যে আমি প্রস্তুত হয়ে পরে তাহাঁদের সঙ্গে মিলিত হব। এভাবে আমি প্রতিদিন বাড়ি হতে প্রস্তুতিপর্ব সম্পন্ন করার মানসে বের হই, কিন্তু কিছু না করেই ফিরে আসি। আবার বের হই, আবার কিছু না করে ঘরে ফিরে আসি। ইত্যবসরে বাহিনী অগ্রসর হয়ে অনেক দূর চলে গেল। আর আমি রওয়ানা করে তাদের সাথে পথে মিলে যাবার ইচ্ছা পোষন করতে থাকলাম। আফসোস যদি আমি তাই করতাম! কিন্তু তা আমার ভাগ্যে জোটেনি। এরপর রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ রওয়ানা হওয়ার পর আমি লোকদের মধ্যে বের হয়ে তাদের মাঝে বিচরন করতাম। একথা আমার মনকে পীড়া দিত যে, আমি তখন [মদীনায়] মুনাফিক এবং দুর্বল ও অক্ষম লোক ছাড়া অন্য কাউকে দেখতে পেতাম না। এদিকে রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ তাবুক পৌঁছার পূর্ব পর্যন্ত আমার কথা আলোচনা করেননি। অনন্তর তাবুকে একথা জনতার মধ্যে উপবিষ্টাবস্থায় জিজ্ঞাসা করে বসলেন, কা`আব কি করল? বনী সালমা গোত্রের এক লোক বলল, ইয়া রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ তার ধন-সম্পদ ও আত্মগরিমা তাকে আসতে দেয়নি। একথা শুনে মু`আয ইবনু জাবাল রাদি. `আনহু বলিলেন, তুমি যা বললে তা ঠিক নয়। ইয়া রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ আল্লাহর কসম, আমরা তাঁকে উত্তম ব্যক্তি বলে জানি। তখন রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ নীরব রইলেন। কা`আব ইবনু মালিক রাদি. `আনহু বলেন আমি যখন অবগত হলাম যে, রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ মদীনার দিকে প্রত্যাবর্তন করেছেন, তখন আমি চিন্তাযুক্ত হয়ে পড়লাম এবং মিথ্যার বাহানা খুঁজতে থাকলাম। মনে স্থির করলাম, আগামীকাল এমন কথা বলব, যাতে করে রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ এর ক্রোধকে প্রশমিত করতে পারি। আর এ সম্পর্কে আমার পরিবারস্থ জ্ঞানীগুনীদের থেকে পরামর্শ গ্রহন করতে থাকি। এরপর যখন প্রচারিত হলো যে, রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ মদীনায় এসে পৌঁছে যাচ্ছেন, তখন আমার অন্তর থেকে মিথ্যা তিরোহিত হয়ে গেল। আর মনে দৃঢ় প্রত্যয় জন্মালো যে, এমন কোনো পন্থা অবলম্বন করে আমি তাঁকে কখনো ক্রোধমুক্ত করতে সক্ষম হবোনা, যাতে মিথ্যার নামগন্ধ থাকে। অতএব আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত গ্রহন করলাম যে, আমি সত্যই বলব। রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ প্রাতে মদীনায় পদার্পন করিলেন। তিনি সফর থেকে প্রত্যাবর্তন করে প্রথমে মসজিদে গিয়ে দু`রাকাত নামায আদায় করতেন, তারপর লোকদের সামনে বসতেন। যখন রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ এরূপ করিলেন, তখন যারা পশ্চাদপদ ছিলেন তারা তাহাঁর কাছে এসে শপথ করে করে অক্ষমতা ও আপত্তি পেশ করতে লাগল। এরা সংখ্যায় আশির অধিক ছিল। অনন্তর রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ বাহ্যিকভাবে তাদের ওযর-আপত্তি গ্রহন করিলেন, তাদের বায়আত করিলেন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিলেন। কিন্তু তাদের অন্তর্নিহিত অবস্থা আল্লাহর হাওয়ালা করে দিলেন। [কা`আব রাদি. `আনহু বলেন] আমিও এরপর রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ খেদমতে উপস্থিত হলাম। আমি যখন তাঁকে সালাম দিলাম তখন তিনি রাগান্বিত চেহেরায় মুচকি হাসি হাসলেন। তারপর বলিলেন, এসো। আমি সে অনুসারে অগ্রসর হয়ে একেবারে তাহাঁর সম্মুখে বসে গেলাম। তখন তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, কি কারনে তুমি অংশগ্রহন করলেনা? তুমি কি যানবাহন ক্রয় করনি? তখন আমি বলিলাম, হ্যাঁ, করেছি। আল্লাহর কসম, এ কথা সুনিশ্চিত যে, আমি যদি আপনি ছাড়া অন্য কোনো দুনিয়াদার ব্যক্তির সামনে বসতাম তাহলে আমি তাহাঁর অসন্তুষ্টিকে ওযর-আপত্তি উপস্থাপনের মাধ্যমে প্রশমিত করার প্রয়াস চালাতাম। আর আমি তর্কে সিদ্ধহস্ত। কিন্তু আল্লাহর কসম, আমি পরিজ্ঞাত যে, আজ যদি আমি আপনার কাছে মিথ্যা বলে আমার প্রতি আপনাকে রাযী করার চেষ্টা করি, তাহলেই অচিরেই মহান আল্লাহ্ তায়ালা আপনাকে আমার প্রতি অসন্তুষ্ট করে দিতে পারেন। আর যদি আপনার কাছে সত্য প্রকাশ করি, যাতে আপনি আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হন, তবুও আমি এতে মহান আল্লাহ্ তা`য়ালার ক্ষমা পাওয়ার নির্ঘাত আশা রাখি। না, আল্লাহর কসম, আমার কোনো ওযর ছিলনা। আল্লাহর কসম, সেই অভিযানে আপনার সাথে না যাওয়াকালীন সময় আমি সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ও সামর্থ্যবান ছিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ বলিলেন, সে সত্য কথাই বলেছে। তুমি এখন চলে যাও, যতদিনে না তোমার সম্পর্কে আল্লাহ্ তা`আলা ফায়সালা করে দেন। তাই আমি উঠে চলে গেলাম। তখন বনী সালিমার কতিপয় লোক আমার অনুসরণ করল। তারা আমাকে বলল, আল্লাহর কসম, তুমি ইতোপূর্বে কোনো গুনাহ্ করেছ বলে আমাদের জানা নেই। তুমি কি অন্যান্য পশ্চাদগামীর মতো তোমার অক্ষমতার একটি ওযর রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ এর কাছে পেশ করে দিতে পারতেনা? আর তোমার এ অপরাধের কারনে রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ এর তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনাই তো যথেষ্ট ছিল। আল্লাহর কসম, তারা আমাকে অনবরত কঠিনভাবে ভৎর্সনা করতে থাকে। ফলে আমি পূর্ব স্বীকারোক্তি থেকে প্রত্যাবর্তন করে মিথ্যা বলার বিষয়ে মনে মনে চিন্তা করতে থাকি। এরপর আমি তাদের বলিলাম, আমার মতো এ কাজ আর কেউ করেছে কি? তারা জওয়াব দিল, হ্যাঁ, আরও দু`জন তোমার মতো বলেছে। এবং তাদের ক্ষেত্রেও তোমার মতো একই রূপ ব্যাবস্থা গ্রহন করা হয়েছে। আমি তাদের জিজ্ঞাসা করলাম, তারা কে কে? তারা বললো, একজন মুরারা ইবনু রবী আমরী এবং অপরজন হলেন হিলাল ইবনু উমায়্যা ওয়াকিফী। এরপর তারা আমাকে অবহিত করল যে, তারা উভয়ে উত্তম মানুষ এবং তারা বদর যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছেন। সেজন্য উভয়ে আদর্শবান। যখন তারা তাদের নাম উল্লেখ করল, তখন আমি পূর্ব মতের উপর অটল রইলাম এবং রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ আমাদের মধ্যকার যে তিনজন তাবুকে অংশগ্রহন হতে বিরত ছিল তাদের সাথে কথা বলতে মুসলিমদের নিষেধ করে দিলেন। তদনুসারে মুসলিমরা আমাদের পরিহার করে চললো। আমাদের প্রতি তাদের আচরন পরিবর্তন করে নিল। এমনকি এদেশ যেন আমাদের কাছে অপরিচিত হয়ে গেল। এ অবস্থায় আমরা পঞ্চাশ রাত অতিবাহিত করলাম। আমার অপর দু`জন সাথী তো সংকট ও শোচনীয় অবস্থায় নিপতিত হলেন। তারা নিজেদের ঘরে বসে কাঁদতে থাকেন। আর আমি যেহেতু অধিকতর যুবক ও শক্তিশালী ছিলাম তাই বাইরে বের হয়ে আসতাম, মুসলিমদের জামাআতে নামায আদায় করতাম। এবং বাজারে চলাফেরা করতাম কিন্তু কেউ আমার সাথে কথা বলতনা। আমি রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ এর খেদমতে হাযির হয়ে তাঁকে সালাম দিতাম। যখন তিনি নামায শেষে মজলিসে বসতেন তখন আমি মনে মনে বলতাম ও লক্ষ করতাম, তিনি আমার সালামের জবাবে তাহাঁর ঠোঁটদ্বয় নেড়েছেন কিনা? তারপর আমি তাহাঁর নিকটবর্তী স্থানে নামায আদায় করতাম এবং গোপন দৃষ্টিতে তাহাঁর দিকে দেখতাম যে, আমি যখন সালাতে মগ্ন হতাম তখন তিনি আমার প্রতি দৃষ্টি দিতেন, আর যখন আমি তাহাঁর দিকে তাকাতাম তখন তিনি দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতেন। এভাবে আমার প্রতি লোকদের কঠোরতা ও এড়িয়ে চলার আচরন দীর্ঘকাল ধরে বিরাজমান থাকে। একদা আমি আমার চাচাত ভাই ও প্রিয় বন্ধু আবু কাতাদা রাদি. `আনহুর বাগানের প্রাচীর টপকে প্রবেশ করে তাঁকে সালাম দেই। কিন্তু আল্লাহর কসম, তিনি আমার সালামের জওয়াব দিলেন না। আমি তখন বলিলাম, হে আবু কাতাদা, আপনাকে আমি আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞাসা করছি, আপনি কি জানেন যে, আমি আল্লাহ্ ও তাহাঁর রাঃসাঃকে ভালোবাসি? তখন তিনি নীরবতা পালন করিলেন। আমি পুনরায় তাঁকে কসম দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি এবারও কোনো জবাব দিলেন না। আমি পুনরায় [তৃতীয়বারও] তাঁকে কসম দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। তখন তিনি বলিলেন, আল্লাহ্ ও তাহাঁর রাঃসাঃই ভালো জানেন। তখন আমার চক্ষুদ্বয় থেকে অশ্রু ঝরতে লাগল। অগত্যা আমি পুনরায় প্রাচীর টপকে ফিরে এলাম। কা`আব রাদি. `আনহু বলেন, একদা আমি মদীনার বাজারে বিচরন করছিলাম। এমতাবস্থায় সিরিয়ার এক কৃষক বনিক যে মদীনার বাজারে খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করার উদ্দেশ্যে এসেছিল, সে বলছে, আমাকে কা`আব ইবনু মালিককে কেউ পরিচয় করিয়ে দিতে পারে কি? তখন লোকেরা তাকে আমার প্রতি ইশারায় দেখাচ্ছিল। তখন সে এসে গাসসানি বাদশার একটি পত্র আমার কাছে হস্তান্তর করল। তাতে লেখা ছিল, পর সমাচার এই, আমি জানতে পারলাম যে, আপনার সাথী আপনার প্রতি জুলুম করেছে। আর আল্লাহ্ আপনাকে মর্যাদাহীন ও আশ্রয়হীন করে সৃষ্টি করেননি। আপনি আমাদের দেশে চলে আসুন, আমরা আপনাকে সাহায্য-সহানুভূতি করব। আমি যখন এ পত্র পড়লাম, তখন আমি বলিলাম, এটাও আর একটি পরীক্ষা। তখন আমি চুলা খোঁজ করে তার মধ্যে পত্রটি নিক্ষেপ করে জ্বালিয়ে দিলাম। এ সময় পঞ্চাশ দিনের চল্লিশ দিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ এর পক্ষ থেকে এক সংবাদবাহক আমার কাছে এসে বলল, রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ নির্দেশ দিয়েছেন যে, আপনি আপনার স্ত্রী হতে পৃথক থাকবেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আমি কি তাকে তালাক দিয়ে দিব, না অন্য কিছু করব? তিনি উত্তর দিলেন, তালাক দিতে হবে না বরং তার থেকে পৃথক থাকুন এবং তার নিকটবর্তী হবেননা। আমার অপর দু`জন সঙ্গীর প্রতি একই আদেশ পৌঁছালেন। তখন আমি আমার স্ত্রীকে বলিলাম, তুমি তোমার পিত্রালয়ে চলে যাও। আমার এ ব্যাপারে মহান আল্লাহর ফায়সালা না হওয়া পর্যন্ত তুমি তথায় অবস্থান কর। কা`আব রাদি. `আনহু বলেন, আমার সঙ্গী হিলাল ইবনু উমায়্যার স্ত্রী রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করল, ইয়া রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ, হিলাল ইবনু উমায়্যা অতি বৃদ্ধ, এমন বৃদ্ধ যে, তাহাঁর কোনো খাদিম নেই। আমি তাহাঁর খেদমত করি, এটা কি অপছন্দ করেন? রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ বলিলেন, না তবে সে তোমার বিছানায় আসতে পারবেনা। সে বলল, আল্লাহর কসম, এ সম্পর্কে তার কোনো অনুভূতিই নেই। আল্লাহর কসম, তিনি এ নির্দেশ পাওয়া অবধি সর্বদা কান্নাকাটি করছেন। [কা`আব রাদি. `আনহু বলেন] আমার পরিবারের কেউ আমাকে পরামর্শ দিল যে, আপনিও যদি আপনার স্ত্রী সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ এর কাছে অনুমতি চাইতেন, যেমন রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ হিলাল ইবনু উমায়্যার স্ত্রীকে তাহাঁর [স্বামীর] খেদমত করার অনুমতি দিয়েছেন। আমি বলিলাম, আল্লাহর কসম আমি কখনো তার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ এর কাছে অনুমতি চাইবো না। আমি যদি তার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ এর অনুমতি চাই, তবে তিনি কি বলবেন, তা আমার জানা নেই। আমি তো নিজেই আমার খেদমতে সক্ষম। এরপর আরও দশরাত অতিবাহিত করলাম। এভাবে রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ যখন থেকে আমাদের সাথে কথা বলতে নিষেধ করেন তখন থেকে পঞ্চাশ রাত পূর্ন হলো। এরপর আমি পঞ্চাশতম রাত শেষে ফজরের নামায আদায় করলাম এবং আমাদের ঘরের ছাদে এমন অবস্থায় বসে ছিলাম যা আল্লাহ্ তা`আলা [কুরআনে] বর্ণনা করেছেন। আমার জান-প্রাণ দুর্বিষহ এবং গোটা জগতটা যেন আমার জন্য প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও সংকীর্ন হয়ে গিয়েছিল। এমতাবস্থায় শুনতে পেলাম এক চীৎকার কারীর চীৎকার। সে সালা পাহাড়ের উপর চড়ে উচ্চস্বরে ঘোষনা করছে, হে কা`আব ইবনু মালিক! সুসংবাদ গ্রহন করুন। কা`আব রাদি. `আনহু বলেন, এ শব্দ আমার কানে পৌঁছামাত্র আমি সিজদায় লুটে পড়লাম। আর আমি অনুভব করলাম যে, আমার সুদিন ও খুশীর খবর এসেছে। রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ ফজরের নামায আদায়ের পর আল্লাহ্ তায়ালার পক্ষ হতে আমাদের তাওবা কবুল হওয়ার সুসংবাদ প্রকাশ করেন। তখন লোকেরা আমার এবং আমার সঙ্গীদ্বয়ের কাছে সুসংবাদ পরিবেশন করতে থাকে। এবং তড়িঘড়ি একজন অশ্বারোহী লোক আমার কাছে আসে এবং আসলাম গোত্রের অপর এক ব্যক্তি দ্রুত আগমন করে পাহাড়ের উপর আরোহন করত চীৎকার দিতে থাকে। তার চীৎকারের শব্দ ঘোড়া অপেক্ষাও দ্রুত পৌঁছল। যার শব্দ আমি শুনেছিলাম সে যখন আমার কাছে সুসংবাদ প্রদান করতে আসল, আমি তখন আমার নিজের পরিধেয় দুটো কাপড় তাকে সুসংবাদ দেওয়ার জন্য দান করলাম। আর আমি আল্লাহর কসম করে বলছি যে, ঐ সময় সেই দুটো কাপড় ছাড়া আমার কাছে আর কোনো কাপড় ছিলোনা। আমি দুটো কাপড় ধার করে পরিধান করলাম এবং রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ এর কাছে রওয়ানা হলাম। লোকেরা দলে দলে আমাকে ধন্যবাদ জানাতে আসতে লাগল। তারা তাওবা কবুলের মুবারকবাদ জানাচ্ছিল। তারা বলছিল, তোমাকে মুবারকবাদ যে মহান আল্লাহ্ রাববুল আলামিন তোমার তাওবা কবুল করেছেন। কা`আব রাদি. `আনহু বলেন, অবশেষে আমি মসজিদে প্রবেশ করলাম। তখন রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ সেখানে বসা ছিলেন এবং তাহাঁর চতুস্পার্শ্বে জনতার সমাবেশ ছিল। তালহা ইবনু উবায়দুল্লাহ রাদি. `আনহু দ্রুত উঠে এসে আমার সাথে মুসাফাহা করিলেন ও মুবারকবাদ জানালেন। আল্লাহর কসম, তিনি ব্যতীত আর কোনো মুহাজির আমার জন্য দাঁড়াননি। আমি তালহার ব্যবহার ভুলতে পারবোনা। কা`আব রাদি. `আনহু বলেন, এরপর আমি যখন রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃকে সালাম জানালাম, তখন তাহাঁর চেহারা আনন্দের আতিশয্যে ঝকঝক করছিল। তিনি আমাকে বলিলেন, তোমার মাতা তোমাকে জন্মদানের দিন হতে যতদিন তোমার উপর অতিবাহিত হয়েছে তার মধ্যে উৎকৃষ্ট ও উত্তম দিনের সুসংবাদ গ্রহন কর। কা`আব রাদি. `আনহু বলেন, আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ এটা কি আপনার পক্ষ থেকে না আল্লাহর পক্ষ থেকে? তিনি বলিলেন, আমার পক্ষ থেকে নয় বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ যখন খুশী হতেন তখন তাহাঁর চেহারা মুবারক এতো উজ্জ্বল ও প্রোজ্জ্বল হতো যেন পূর্নিমার চাঁদের ফালি। এতে আমরা তাহাঁর সন্তুষ্টি বুঝতে পারতাম। আমি যখন তাহাঁর সম্মুখে বসলাম তখন আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ, আমার তাওবা কবুলের শুকরিয়া স্বরূপ আমার ধন-সম্পদ আল্লাহ্ ও তাহাঁর রাঃসাঃ  এর পথে দান করতে চাই। রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ বলিলেন, তোমার কিছু মাল তোমার কাছে রেখে দাও। তা তোমার জন্য উত্তম। আমি বলিলাম, খাইবরে অবস্থিত আমার অংশটি আমার জন্য রাখলাম। আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ, মহান আল্লাহ্ তা`আলা সত্য বলার কারনে আমাকে রক্ষা করেছেন, তাই আমার তাওবা কবুলের নিদর্শন অক্ষুন্ন রাখতে আমার অবশিষ্ট জীবনে সত্যই বলব। আল্লাহর কসম! যখন থেকে আমি এ সত্য বলার কথা রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ এর কাছে জানিয়েছি, তখন থেকে আজ পর্যন্ত আমার জানামতে কোনো মুসলিমকে সত্য কথার বিনিময়ে এরুপ নিয়ামত আল্লাহ্ দান করেননি যে নিয়ামত আমাকে দান করেছেন। [কা`আব রাদি. `আনহু বলেন] যেদিন রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ এর সম্মুখে সত্য কথা বলেছি সেদিন হতে আজ পর্যন্ত অন্তরে মিথ্যা বলার ইচ্ছাও করিনি। আমি আশা পোষন করি যে, বাকী জীবনও আল্লাহ্ তাআলা আমাকে মিথ্যা থেকে হিফাজত করবেন। এরপর আল্লাহ্ তাআলা, রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ এর উপর এই আয়াত নাযিল করেন, “আল্লাহ্ অনুগ্রহ পরায়ন হলেন রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ প্রতি এবং মুহাজিরদের প্রতি…… এবং তোমরা সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও”। [কোরআনের সুরা আত-তাওবা: ১১১-১১৯]। [কা`আব রাদি. `আনহু বলেন] আল্লাহর শপথ, ইসলাম গ্রহনের পর থেকে কখনো আমার উপর এতো উৎকৃষ্ট নিয়ামত আল্লাহ্ প্রদান করেননি যা আমার কাছে শ্রেষ্ঠতর, তা হলো রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ এর কাছে আমার সত্য বলা ও তাহাঁর সাথে মিথ্যা না বলা, যদি মিথ্যা বলতাম তবে মিথ্যাবাদীদের মতো আমিও ধ্বংস হয়ে যেতাম। সেই মিথ্যাবাদিদের সম্পর্কে যখন ওহী নাযিল হয়েছে তখন জঘন্য অন্তরের সেই লোকদের সম্পর্কে আল্লাহ্ তা`আলা বলিয়াছেন, “তোমরা তাদের নিকট ফিরে আসলে তারা আল্লাহর শপথ করবে………… আল্লাহ্ সত্যত্যাগী সম্প্রদায়ের প্রতি তুষ্ট হবেন না”। [কোরআনের সুরা আত-তাওবা: ৯৫-৯৬]। কা`আব রাদি. `আনহু বলেন, আমাদের তিনজনের তাওবা কবুল করতে বিলম্ব করা হয়েছে— যাদের তাওবা রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ কবুল করেছেন যখন তারা তাহাঁর কাছে শপথ করেছে, তিনি তাদের বাই`আত গ্রহন করেছেন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। আমাদের বিষয়টি আল্লাহর ফায়সালা না হওয়া পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ স্থগিত রেখেছেন। এর প্রেক্ষাপটে আল্লাহ্ বলেন— “সেই তিনজনের প্রতিও যাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল”। [কোরআনের সুরা তাওবা: ১১৮]। কুরআনের এই আয়াতে তাদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়নি যারা তাবুক যুদ্ধ থেকে পিছনে ছিল ও মিথ্যা কসম করে ওযর- আপত্তি পেশ করেছিল এবং রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ ও তা গ্রহন করেছিলেন। বরং এই আয়াতে তাদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে আমরা যারা পেছনে ছিলাম এবং যাদের প্রতি সিদ্ধান্ত দেওয়া স্থগিত রাখা হয়েছিল।[1]


[1] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৪৪১৮, সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর ২৭৬৯।

Leave a Reply