কিতাবুত তাওহীদ – মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওহহাব

তাওহীদের বিশ্বাস (বাংলা)
মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওহহাব
অনুবাদ: উলামাদের একটি দল
islamhouse.com
২০১১ – ১৪৩২

১ম অধ্যায়:

তাওহীদ

১। আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেছেন,

“আমি জিন এবং মানব জাতিকে একমাত্র আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি।” (যারিয়াত . ৫৬)।

২। আল্লাহ তা‘আলা আরো এরশাদ করেছেন,

“আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রাসূল পাঠিয়েছি। [তাঁর মাধ্যমে এ নির্দেশ দিয়েছি] তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, আর তাগুতকে বর্জন করো।” (নাহল: ৩৬)

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র এরশাদ করেছেন,

৩। “তোমার রব এ নির্দেশ দিয়েছেন যে তাঁকে ছাড়া তোমরা আর কারো ইবাদত করো না। আর মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করো”। (ইসরা: ২৩)

৪। সূরা নিসাতে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো। আর তাঁর সাথে কাউকে শরিক করো না।” (নিসা: ৩৬)

৫। সূরা আনআমে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন,

“হে মুহাম্মদ বলো, [হে আহলে কিতাব] তোমরা এসো তোমাদের রব তোমাদের জন্য যা হারাম করে দিয়েছেন তা পড়ে শুনাই। আর তা হচ্ছে এই, “তোমরা তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না।” (আনআম: ‘১৫১)

৬। ইবনে মাসউদ (রা:) বলেছেন,

“যে ব্যক্তি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মোহরাঙ্কিত অসিয়ত দেখতে চায়, সে যেন আল্লাহ তাআলার এ বাণী পড়ে নেয়, “হে মুহাম্মদ বলো, তোমাদের রব তোমাদের উপর যা হারাম করেছেন তা পড়ে শুনাই। আর তা হলো, তোমরা তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না . . . . আর এটাই হচ্ছে আমার সরল, সোজা পথ”।

৭। সাহাবী মুআয বিন জাবাল (রা:) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পিছনে একটি গাধার পিঠে বসে ছিলাম। তিনি আমাকে ডাক দিয়ে বললেন,”

“হে মুআয, তুমি কি জানো, বান্দার উপর আল্লাহর কি হক রয়েছে? আর আল্লাহর উপর বান্দার কি হক আছে? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন, বান্দার উপর আল্লাহর হক হচ্ছে তারা তাঁরই ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না। আর আল্লাহর উপর বান্দার হক হচ্ছে “যারা তার সাথে

কাউকে শরিক করবে না, তাহলে তিনি তাদেরকে শাস্তি দেবেন না।” আমি বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি কি এ সুসংবাদ লোকদেরকে জানিয়ে দেব না? তিনি বললেন, তুমি তাদেরকে এ সুসংবাদ দিওনা, তাহলে তারা ইবাদত ছেড়ে দিয়ে [আল্লাহর উপর ভরসা করে] হাত গুটিয়ে বসে থাকবে। (বুখারি ও মুসলিম)

এ অধ্যায় থেকে নিুোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়:

১। জ্বিন ও মানব জাতি সৃষ্টির রহস্য।

২। ইবাদতই হচ্ছে তাওহীদ। কারণ এটা নিয়েই বিবাদ।

৩। যার তাওহীদ ঠিক নেই, তার ইবাদতও ঠিক নেই। এ কথার মধ্যে

৪। রাসূল পাঠানোর অন্তর্নিহিত হিকমত বা রহস্য।

৫। সকল উম্মতই রিসালতের আওতাধীন ছিল।

৬। আম্বিয়ায়ে কেরামের দীন এক ও অভিন্ন।

৭। মূল কথা হচ্ছে, তাগুতকে অস্বীকার করা ব্যতীত ইবাদতের মর্যাদা অর্জন করা যায় না।

৮। আল্লাহর ইবাদত ব্যতীত আর যারই ইবাদত করা হয়, সেই তাগুত হিসেবে গণ্য।

৯। সালাফে-সালেহীনের কাছে সূরা আনআমের উল্লেখিত তিনটি মুহকাম আয়াতের বিরাট মর্যাদার কথা জানা যায়। এতে দশটি বিষয়ের কথা রয়েছে। এর প্রথমটিই হচ্ছে; শিরক নিষিদ্ধ করণ।

১০্ সূরা ইস্রায় কতগুলো মুহকাম আয়াত রয়েছে। এবং তাতে আঠারোটি বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে। আল্লাহ বিষয়গুলোর সূচনা করেছেন তাঁর বাণী- لا تجعل مع الله إلها آخر فتقعد مذموما مخذولا এর মাধ্যমে, আর সমাপ্তি ঘোষণা করেছেন তাঁর বাণী-

ولا تجعل مع الله إلها آخر فتلقى في جهنم ملوما مدحوراً

এর মাধ্যমে। সাথে সাথে আল্লাহ তাআলা এ বিষয়টির সুমহান মর্যাদাকে উপলব্ধি করার জন্য তাঁর বাণী,

ذلك مما أوحى إليك ربك من الحكمة এর মাধ্যমে আমাদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন।

১১। সূরা নিসার ‘আল- হুকুকুল আশারা’ [বা দশটি হক] নামক আয়াতের কথা জানা গেলো। যার সূচনা হয়েছে আল্লাহ তাআলার বাণী,

واعبدوا الله ولا تشركوا به شيئا

এর মাধ্যমে। যার অর্থ হচ্ছে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, আর তাঁর সাথে কাউকে শরিক করো না।

১২। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অন্তিমকালের অসিয়তের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন।

১৩। আমাদের উপর আল্লাহ তাআলার হক সম্পর্কে জ্ঞানার্জন।

১৪। বান্দা যখন আল্লাহর হক আদায় করবে, তখন আল্লাহ তাআলার উপর বান্দার হক সম্পর্কে জ্ঞানার্জন।

১৫। অধিকাংশ সাহাবিই এ বিষয়টি জানতেন না।

১৬। কোন বিশেষ স্বার্থে এলেম (জ্ঞান) গোপন রাখার বৈধতা।

১৭। আনন্দদায়ক বিষয়ে কোন মুসলিমকে খোশখবর দেয়া মুস্তাহব।

১৮। আল্লাহর অপরিসীম রহমতের উপর ভরসা করে আমল বাদ দেয়ার ভয়।

            ১৯। অজানা বিষয়ে জিজ্ঞাসিত ব্যক্তির الله ورسوله أعلم [অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই সবচেয়ে ভাল জানেন] বলা।

            ২০। কাউকে বাদ রেখে অন্য কাউকে জ্ঞান দানে বিশেষিত করার বৈধতা।

            ২১। একই গাধার পিঠে পিছনে আরোহণকারীর প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দয়া ও নম্রতা প্রদর্শন।

            ২২। একই পশুর পিঠে একাধিক ব্যক্তি আরোহণের বৈধতা।

            ২৩। মুআয বিন জাবাল (রা:) এর মর্যাদা।

            ২৪। আলোচিত বিষয়টির মর্যাদা ও মোহত্ব।

২য় অধ্যায় :

তাওহীদের মর্যাদা

            ১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“যারা ঈমান এনেছে এবং ঈমানকে জুলুম [শিরক] এর সাথে মিশ্রিত করেনি” [তাদের জন্যই রয়েছে শান্তি ও নিরাপত্তা] (আনআম : ৮২)

            ২। সাহাবী উবাদা ইবনে সামেত (রা:) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূল (স:) এরশাদ করেছেন,

            “যে ব্যক্তি এ সাক্ষ্য দান করল যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। তিনি একক। তাঁর কোন শরিক নেই। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল। ঈসা (আঃ) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। তিনি তাঁর এমন এক কালিমা যা তিনি মরিয়াম (আঃ) এর প্রতি প্রেরণ করেছেন এবং তিনি তাঁরই পক্ষ থেকে প্রেরিত রুহ বা আত্মা। জান্নাত সত্য জাহান্নাম

সত্য। সে ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা জান্নাত দান করবেন, তার আমল যাই হোক না কেন। (বুখারি ও মুসলিম)

            সাহাবী ইতবানের হাদিসে বর্ণিত আছে, ইমাম বুখারি ও মুসলিম হাদিসটি সংকলন করেছেন,

            “আল্লাহ তা’আলা এমন ব্যক্তির উপর জাহান্নামের আগুন হারাম করে দিয়েছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলেছে।’

            ৩। প্রখ্যাত সাহাবী আবু সাঈদ খুদরী (রা:) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি এরশাদ করেছেন, মূসা (আঃ) বললেন,

“হে আমার রব, আমাকে এমন জিনিস শিক্ষা দিন যা দ্বারা আমি আপনাকে স্মরণ করবো এবং আপনাকে ডাকবো। আল্লাহ বললেন, ‘হে মূসা, তুমি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলো। মূসা বললেন, “আপনার সব বান্দাই তো এটা বলে।” তিনি বললেন, “হে মূসা, আমি ব্যতীত সপ্তাকাশে যা কিছু আছে তা, আর সাত তবক যমীন যদি এক পাল্লায় থাকে আরেক পাল্লায় যদি শুধু লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ থাকে, তাহলে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর পাল্লাই বেশী ভারী হবে।”

(ইবনে হিব্বান, হাকিম)

৪। বিখ্যাত সাহাবী আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, ‘আমি রাসূল (স:) কে এ কথা বলতে শুনেছি,

“আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “হে আদম সন্তান, তুমি দুনিয়া ভর্তি গুনাহ নিয়ে যদি আমার কাছে হাজির হও, আর আমার সাথে কাউকে শরিক না করা অবস্থায় মৃত্যু বরণ করো, তাহলে আমি দুনিয়া পরিমাণ

মাগফিরাত নিয়ে তোমার দিকে এগিয়ে আসবো”। (তিরমিজী)

এ অধ্যায় থেকে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ-

১। আল্লাহর অসীম করুণা।

২। আল্লাহর নিকট তাওহীদের অপরিসীম সওয়াব।

৩। গুনাহ সত্ত্বেও তাওহীদের দ্বারা পাপ মোচন।

৪। সূরা আন আনআমের ৮২ নং আয়াতের তাফসীর।

৫। উবাদা বিন সামেতের হাদীসে বর্ণিত পাঁচটি বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দেয়া।

৬। উবাদা বিন সামেত এবং ইতবানের হাদীসকে একত্র করলে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর অর্থ সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে এবং ধোকায় নিপতিত লোকদের ভুল সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়বে।

৭। ইতবান (রা:) হতে বর্ণিত হাদীসে উল্লেখিত শর্তের ব্যাপারে সতর্কী করণ।

৮। লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর ফজীলতের ব্যাপারে সতর্কীকরণের প্রয়োজনীয়তা নবীগণের জীবনেও ছিলো।

৯। সমগ্র সৃষ্টির তুলনায় এ কালেমার পাল্লা ভারী হওয়ার ব্যাপারে সতর্কীকরণ, যদিও এ কলেমার অনেক পাঠকের পাল্লা ইখলাসের সাথে পাঠ না করার কারণে হালকা হয়ে যাবে।

১০। সপ্তাকাশের মত সপ্ত যমীন বিদ্যমান থাকার প্রমাণ।

১১। যমীনের মত আকাশেও বসবাসকারীর অস্তিত্ব আছে।

১২। আল্লাহর সিফাত বা গুণাবলীকে ইতিবাচক বলে সাব্যস্ত করা যা আশআরী সম্প্রদায়ের চিন্তা ধারার সম্পূর্ণ বিপরীত।

১৩। সাহাবী আনাস (রাঃ) এর হাদীস সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর ইতবান (রা:) এর হাদীসে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী।

এর মর্মার্থ হচ্ছে শিরক বর্জন করা। শুধু মুখে বলা এর উদ্দেশ্য নয়।

১৪। নবী ঈসা (আঃ) এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উভয়ই আল্লাহর বান্দা এবং রাসূল হওয়ার বিষয়টি গভীর ভাবে চিন্তা করা।

১৫। “কালিমাতুল্লাহ” বলে ঈসা (আঃ) কে খাস করার বিষয়টি জানা।

১৬। হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহর পক্ষ থেকে রুহ (পবিত্র) আত্মা হওয়া সম্পর্কে অবগত হওয়া।

১৭। জান্নাত ও জাহান্নামের প্রতি ঈমান আনার মর্যাদা।

১৮। আমল যাই হোক না কেন, এ কথার মর্মার্থ উপলব্ধি করা।

১৯। মিজানের দুটি পাল্লা আছে এ কথা জানা।

২০। আল্লাহার চেহারার উল্লেখ আছে, এ কথা জানা।

৩য় অধ্যায় .

তাওহীদের উপরে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি

বিনা হিসেবে জান্নাতে যাবে

১। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন,

“নিশ্চয়ই ইবরাহীম ছিলেন একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর হুকুম পালনকারী একটি উম্মত বিশেষ। এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন না।” (নাহলঃ১২০)

২। আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করেছেন,

“আর যারা তাদের রবের সাথে শিরক করে না” (মুমিনুনঃ ৫৯)

৩। হুসাইন বিন আবদুর রহমান থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, একবার আমি সাঈদ বিন জুবাইরের কাছে উপস্থিত ছিলাম। তিনি বললেন, গতকাল রাত্রে যে নক্ষত্রটি ছিটকে পড়েছে তা তোমাদের মধ্যে কে দেখতে পেয়েছে? তখন বললাম, “আমি”। তারপর বললাম, ‘বিষাক্ত প্রাণী কর্তৃক দংশিত হওয়ার কারণে আমি নামাজে উপস্থিত থাকতে পারিনি’। (তিনি বললেন, ‘তখন তুমি কি চিকিৎসা করেছ?

বললাম “ঝাড় ফুঁক করেছি” তিনি বললেন, কিসে তোমাকে এ কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে? [অর্থাৎ তুমি কেন এ কাজ করলে?] বললাম, ‘একটি হাদীস’ [এ কাজে উদ্বুদ্ধ করেছে] যা শা’বী আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন। তিনি বললেন, তিনি তোমাদেরকে কি বর্ণনা করেছেন? বললাম ‘তিনি বুরাইদা বিন আল হুসাইব থেকে আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন যে, চোখের দৃষ্টি বা চোখ লাগা এবং জ্বর ব্যতীত অন্য কোন রোগে ঝাড়- ফুঁক নেই।’ তিনি বললেন, ‘সে ব্যক্তিই উত্তম কাজ করেছে, যে শ্র“ত জিনিস শেষ পর্যন্ত আমল করতে পেরেছে’। কিন্তু ইবনে আব্বাস (রাঃ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

“আমার সম্মুখে সমস্ত জাতিকে উপস্থাপন করা হলো। তখন আমি এমন একজন নবীকে দেখতে পেলাম যার সাথে অল্প সংখ্যক লোক রয়েছে। এরপর আরো একজন নবীকে দেখতে পেলাম যার সাথে মাত্র দু’জন লোক রয়েছে। আবার এমন একজন নবীকে দেখতে পেলাম যার সাথে কোন লোকই নেই। ঠিক এমন সময় আমার সামনে এক বিরাট জনগোষ্ঠী পেশ করা হলো। তখন আমি ভাবলাম, এরা আমার উম্মত। কিন্তু আমাকে বলা হলো এরা হচ্ছে মূসা (আঃ) এবং তাঁর জাতি।

এরপর আরো একটি বিরাট জনগোষ্ঠীর দিকে আমি তাকালাম। তখন আমাকে বলা হলো, এরা আপনার উম্মত। এদের মধ্যে সত্তুর হাজার লোক রয়েছে যারা বিনা হিসেবে এবং বিনা আযাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। একথা বলে তিনি দরবার থেকে উঠে বাড়ীর অভ্যন্তরে চলে গেলেন। এরপর লোকেরা ঐ সব ভাগ্যবান লোকদের ব্যাপারে বিতর্ক শুরু করে দিলো। কেউ বললো, তারা বোধ হয় রাসূল সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সহচার্য লাভকারী ব্যক্তিবর্গ। আবার কেউ বললো, তারা বোধ হয় ইসলাম পরিবেশে অথবা মুসলিম মাতা-পিতার ঘরে জন্মগ্রহণ করেছে আর আল্লাহর সাথে তারা কাউকে শরিক করেনি। তারা এ ধরনের আরো অনেক কথা বলাবলি করলো। অতঃপর রাসূল সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের মধ্যে উপস্থিত হলে বিষয়টি তাঁকে জানানো হলো। তখন তিনি বললেন,

“তারা হচ্ছে ঐ সব লোক যারা ঝাড়-ফুক করে না। পাখি উড়িয়ে ভাগ্যের ভাল-মন্দ যাচাই করে না। শরীরে সেক বা দাগ দেয় না। আর তাদের রবের উপর তারা ভরসা করে।” একথা শুনে ওয়াকাশা বিন মুহসিন দাড়িয়ে বললো, আপনি আমার জন্য দোয়া করুন যেন আল্লাহ তাআলা আমাকে এই সৌভাগ্যবান ব্যক্তিদের দলভূক্ত করে নেন। তিনি বললেন, আমি দোয়া করলাম, “তুমি তাদের দলভুক্ত”। অতঃপর অন্য একজন লোক দাড়িয়ে বললো, আল্লাহর কাছে আমার জন্যও দোয়া করুন যেন তিনি আমাকেও তাদের দলভুক্ত করে নেন। তিনি বললেন, “তোমার পূর্বেই ওয়াকাশা সে সুযোগ নিয়ে গেছে।”

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ

১। তাওহীদের ব্যাপারে মানুষের বিভিন্ন স্তরে অবস্থান সম্পর্কিত জ্ঞান।

২। নবী ইবরাহীম (আ:) মুশরিক ছিলেন না বলে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা।

৩। বড় বড় বুজুর্গ ব্যক্তিগণ শিরক মুক্ত ছিলেন বলে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা।

৪। ঝাড়-ফুঁক এবং আগুনের দাগ পরিত্যাগ করা তাওহীদপন্থী হওয়ার প্রকৃষ্ট প্রমান।

৫। আল্লাহর উপর ভরসা বা তাওয়াক্কুলই বান্দার মধ্যে উল্লেখিত গুণ ও স্বভাবসমূহের সমাবেশ ঘটায়।

৬। বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশকারী সৌভাগ্যবান লোকেরা কোন আমল ব্যতীত উক্ত মর্যাদা লাভ করতে পারেননি, এটা জানার ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামের জ্ঞানের গভীরতা।

৭। মঙ্গল ও কল্যাণের প্রতি তাঁদের অপরিসীম আগ্রহ।

৮। সংখ্যা ও গুণাবলরি দিক থেকে উম্মতে মুহাম্মদীর ফজিলত।

৯। নবী মূসা (আঃ) এর সাহাবীদের মর্যাদা।

১০। সব উম্মতকে রাসূল সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সম্মুখে উপস্থিত করা হবে।

১১। প্রত্যেক উম্মতই নিজ নিজ নবীর সাথে পৃথকভাবে হাশরের ময়দানে উপস্থিত হবে।

১২। নবীগণের আহ্বানে সাড়া দেয়ার মত লোকের স্বল্পতা।

১৩। যে নবীর দাওয়াত কেউ গ্রহণ করেনি তিনি একাই হাশরের ময়দানে উপস্থিত হবেন।

১৪। এ জ্ঞানের শিক্ষা হচ্ছে, সংখ্যাধিক্যের দ্বারা ধোকা না খাওয়া আবার সংখ্যাল্পতার কারণে অবহেলা না করা।

১৫। চোখ-লাগা এবং জ্বরের চিকিৎসার জন্য ঝাড়-ফুঁকের অনুমতি।

১৬। সালাফে সালেহীনের জ্ঞানের গভীরতা।

قد أحسن من انتهى إلى ما سمع

“সে ব্যক্তিই ভাল কাজ করেছে যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যা শুনেছে তাই আমল করেছে” এ কথাই এর প্রমাণ পেশ করে। তাই প্রথম হাদীস দ্বিতীয় হাদিসের বিরোধী নয়।

১৭। মানুষের মধ্যে যে গুণ নেই তার প্রশংসা থেকে সালাফে সালেহীন বিরত থাকতেন।

১৮। أنت منهم (তুমি তাদের অন্তর্ভূক্ত) ওয়াকাশার ব্যাপারে একথা নবুওয়তেরই প্রমাণ পেশ করে।

১৯। ওয়াকাশা (রা:) এর মর্যাদা ও ফজিলত।

২০। কোন কথা সরাসরি না বলে হিকমত ও কৌশল অবলম্বন করা।

৪র্থ অধ্যায় .

শিরক সম্পর্কীয় ভীতি

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন-

“আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করা গুনাহ মাফ করবেন না। শিরক ছাড়া অন্যান্য যে সব গুনাহ রয়েছে সেগুলো যাকে ইচ্ছা মাফ করে দিবেন।” (নিসাঃ৪৮)

            ২। ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম আল্লাহ তাআলার কাছে এ দোয়া করেছিলেন,

“আমাকে এবং আমার সন্তানদের মূর্তিপূজা থেকে রক্ষা কর” (ইবরাহীম . ৩৫)

            ৩। এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন,

“ আমি তোমাদের জন্য সে জিনিসটি সবচেয়ে বেশী ভয় করি তা হচ্ছে শিরকে আসগার অর্থাৎ ছোট শিরক। তাকে শিরকে আসগার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তরে বললেন, (ছোট শিরক হচ্ছে) “রিয়া”।

            ৪। ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

“যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা অবস্থায় মৃত্যু বরণ করবে। সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (বুখারি)

            ৫। সাহাবী জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক না করে মৃত্যু বরণ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি তাঁর সাথে কাউকে শরিক করে মৃত্যু বরণ করবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (মুসলিম)

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় .

১। শিরককে ভয় করা।

২। রিয়া শিরকের মধ্যে শামিল।

৩। রিয়া হল ছোট শিরকের অন্তর্ভূক্ত।

৫। জান্নাত ও জাহান্নাম কাছাকাছি হওয়া।

৬। জান্নাত ও জাহান্নাম নিকটবর্তী হওয়ার বিষয়টি একই হাদীসে বর্ণিত হওয়া।

৭। আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক না করে মৃত্যুবরণ করলে মৃত ব্যক্তি জান্নাতে যাবে। পক্ষান্তরে আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক বানিয়ে মৃত্যু বরণ করলে মৃত ব্যক্তি যত বড় আবেদই হোক না কেন সে জাহান্নামে যাবে।

৮। ইবরাহীম খলীল (আঃ) এর দোয়ার প্রধান বিষয় হচ্ছে, তাঁকে এবং তাঁর সন্তানদেরকে মূর্তিপূজা তথা শিরক থেকে রক্ষা করা।

৯। “হে আমার রব, এমূর্তিগুলো বহু লোককে গুমরাহ করেছে” এ কথা দ্বারা ইবরাহীম (আঃ) বহু লোকের অবস্থা থেকে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করেছেন।

১০। এখানে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর তাফসীর রয়েছে যা ইমাম বুখারি বর্ণনা করেছেন।

১১। শিরক মুক্ত ব্যক্তির মর্যাদা।

৫ম অধ্যায় ঃ

“লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর প্রতি

সাক্ষ্যদানের আহ্বান

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

            “(হে মুহাম্মদ) আপনি বলে দিন, এটাই আমার পথ। পূর্ণ জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সাথে আমি আল্লাহর দিকে আহ্বান জানাই।” (ইউসুফ ঃ ১০৮)

            ২। সাহাবী ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূল (স:) যখন মুআ’য বিন জাবাল (রাঃ) কে ইয়ামানের শাসনকর্তা নিয়োগ করে পাঠালেন তখন [রাসূল (স:) মুআ’যকে লক্ষ্য করে] বললেন,

            “তুমি এমন এক কাওমের কাছে যাচ্ছ যারা আহলে কিতাব। [যারা কোন আসমানী কিতাবে বিশ্বাসী] সর্ব প্রথম যে জিনিসের দিকে তুমি তাদেরকে আহ্বান জানাবে তা হচ্ছে, “লা-ইলাহ ইল্লাল্লাহুর সাক্ষ্য দান”। অন্য বর্ণনায় আছে, আল্লাহর ওয়াহদানিয়্যাত বা একত্ববাদের স্বীকৃতি প্রদান। এ বিষয়ে তারা যদি তোমার আনুগত্য করে তবে তাদেরকে জানিয়ে দিও যে, আল্লাহ তাআলা তাদের উপর দিনে-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করে দিয়েছেন। এ ব্যাপারে তারা যদি তোমার কথা মেনে নেয় তবে তাদেরকে জানিয়ে দিও যে, আল্লাহ তাআলা তাদের উপর যাকাত ফরজ করে দিয়েছেন, যা বিত্তশালীদের কাছ থেকে নিয়ে গরীবদেরকে দেয়া হবে। তারা যদি এ ব্যাপারে তোমার আনুগত্য করে তবে তাদের উৎকৃষ্ট মালের ব্যাপারে তুমি খুব সাবধানে থাকবে। আর মজলুমের ফরিয়াদকে ভয় করে চলবে। কেননা মজলুমের ফরিয়াদ এবং আল্লাহ তাআলার মাঝখানে কোন পর্দা নেই।” (বুখারি ও মুসলিম)

            ৩। সাহাল বিন সাআদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল (স:) খাইবারের [যুদ্ধের] দিন বললেন,

            “আগামীকাল এমন ব্যক্তির কাছে আমি ঝান্ডা প্রদান করবো যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তাকে ভালবাসে। তার হাতে আল্লাহ তাআলা বিজয় দান করবেন। কাকে ঝান্ডা প্রদান করা হবে এ উৎকণ্ঠা ও ব্যাকুলতার মধ্যে লোকজন রাত্রি যাপন করলো। যখন সকাল হয়ে গেলো তখন লোকজন রাসূল (স:) এর নিকট গেলো তাদের প্রত্যেকেই আশা পোষণ করছিলো যে ঝান্ডা তাকেই দেয়া হবে, তখন তিনি বললেন, আলী বিন আবি তালিব কোথায়? বলা হলো, তিনি চক্ষুর পীড়ায় ভোগছেন। তাদেরকে

এ অধ্যায় থেকে নিম্বোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়,

১। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুসরণকারীর নীতি ও পথ হচ্ছে আল্লাহর দিকে মানুষকে আহ্বান করা।

২। ইখলাসের ব্যাপারে শতর্কতা অবলম্বন করা। কেননা অনেক লোক হকের পথে মানুষকে আহ্বান জানালেও মূলতঃ তারা নিজের নফস বা স্বার্থের দিকেই আহ্বান জানায়।

৩। তাওহীদের দাওয়াতের জন্য অন্তর দৃষ্টি সম্পন্ন জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অপরিহার্য্য।

৪। উত্তম তাওহীদের প্রমাণ হচ্ছে, আল্লাহ তাআলার প্রতি গাল-মন্দ আরোপ করা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র থাকা।

৫। আল্লাহ তাআলার প্রতি গাল-মন্দ আরোপ করা নিকৃষ্ট এবং শিরকের অন্তর্ভূক্ত।

৭। তাওহীদই হচ্ছে সর্ব প্রথম ওয়াজিব।

৮। সর্বাগ্রে এমন কি নামাযেরও পূর্বে তাওহীদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।

৯। আল্লাহর ওয়াহদানিয়াতের অর্থ হচ্ছে, “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর সাক্ষ্য প্রদান করা। অর্থাৎ “আল্লাহ তাআলা ব্যতীত কোন ইলাহ নেই” এ ঘোষণা দেয়া।

১০। একজন মানুষ আহলে কিতাবের অন্তর্ভূক্ত হওয়া সত্ত্বেও সে তাওহীদ সম্পর্কে অজ্ঞ থাকতে পারে কিংবা তাওহীদের জ্ঞান থাকলেও তা দ্বারা আমল নাও করতে পারে।

১১। শিক্ষা দানের প্রতি পর্যায়ক্রমে গুরুত্বারোপ।

১২। সর্ব প্রথম অপেক্ষাকৃত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুরু করা।

১৩। যাকাত প্রদানের খাত সম্পর্কিত জ্ঞান।

১৪। শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রের সংশয় ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব উন্মোচন করা বা নিরসন করা।

১৫। যাকাত আদায়ের সময় বেছে বেছে উৎকৃষ্ট মাল নেয়ার প্রতি নিষেধাজ্ঞা।

১৬। মজলুমের বদ দোয়া থেকে বেঁচে থাকা।

১৭। মজলুমের ফরিয়াদ এবং আল্লাহ তাআলার মধ্যে কোন প্রতিবন্ধকতা না থাকার সংবাদ।

১৮। সাইয়্যিদুল মুরসালীন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বড় বড় বজুর্গানে

দ্বীনের উপর যে সব দুঃখ- কষ্ট এবং কঠিন বিপদাপদ আপতিত হয়েছে তা তাওহীদেরই প্রমাণ পেশ করে।

১৯। “আমি আগামীকাল এমন একজনের হাতে পতাকা প্রদান করবো যার হাতে আল্লাহ বিজয় দান করবেন।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এ উক্তি নবুয়তেরই একটি নিদর্শন।

২০। আলী রা. এর চোখে থু থু প্রদানে চোখ আরোগ্য হয়ে যাওয়াও নবুয়্যতের একটি নিদর্শন।

২১। আলী রা. এর মর্যাদা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ।

২২। আলী রা. এর হাতে পতাকা তুলে দেয়ার পূর্বে রাতে পতাকা পাওয়ার ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামের উদ্বেগ ও ব্যাকুলতার মধ্যে রাত্রি যাপন এবং বিজয়ের সুসংবাদে আশ্বস্ত থাকার মধ্যে তাদের মর্যাদা নিহিত আছে।

২৩। বিনা প্রচেষ্টায় ইসলামের পতাকা তথা নেতৃত্ব লাভ করা আর চেষ্টা করেও তা লাভে ব্যর্থ হওয়া, উভয় অবস্থায়ই তাকদীরের প্রতি ঈমান রাখা।

২৪। “বীর পদক্ষেপে এগিয়ে যাও” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এ উক্তির মধ্যে ভদ্রতা ও শিষ্ঠাচার শিক্ষা দানের ইঙ্গিত রয়েছে।

২৫। যুদ্ধ শুরু করার পূর্বে ইসলামের দাওয়াত পেশ করা।

২৬। ইতিপূর্বে যাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেয়া হয়েছে এবং যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হয়েছে তাদেরকেও যুদ্ধের আগে ইসলামের দাওয়াত দিতে হবে।

২৭। أخبرهم بمايجب عليهم রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী হিকমত ও কৌশলের সাথে দাওয়াত পেশ করার ইঙ্গিত বহন করে।

২৮। দীন ইসলামে আল্লাহর হক সম্পর্কে জ্ঞানার্জন।

২৯। আলী রা. এর হাতে একজন মানুষ হেদায়াত প্রাপ্ত হওয়ার সওয়াব।

৩০। ফতোয়ার ব্যাপারে কসম করা।

৬ষ্ঠ অধ্যায় ঃ

তাওহীদ এবং লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর

সাক্ষ্য দানের ব্যাখ্যা

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“এসব লোকেরা যাদেরকে ডাকে তারা নিজেরাই তাদের রবের নৈকট্য লাভের আশায় অসীলার অনুসন্ধান করে (আর ভাবে) কোনটি সবচেয়ে বেশী নিকটবর্তী।” (ইসরাঃ ৫৭)

২। আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করেছেন,

“সে সময়ের কথা স্মরণ করো যখন ইবরাহীম তার পিতা ও কওমের লোকদেরকে বলেছিলেন, তোমরা যার ইবাদত করো তার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। আর আমার সম্পর্ক হচ্ছে কেবল মাত্র তাঁরই সাথে যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন।” (যুখরুফ ঃ ২৬)

৩। আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে ঘোষণা করেছেন,

“তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে নিজেদের আলেম ও দরবেশ লোকদেরকে নিজেদের রব বানিয়ে নিয়েছে” (তাওবাঃ ৩১)

“মানুষের মধ্যে এমন লোকও আছে যারা আল্লাহ ছাড়া অপর কোন শক্তিকে আল্লাহর অংশীদার বা সমতুল্য হিসেবে গ্রহণ করে এবং তাকে এমনভাবে ভালবাসে যেমনিভাবে একমাত্র আল্লাহকেই ভালবাসা উচিৎ।” (বাকারা : ১৬৫)

৫। সহীহ বুখারীতে বর্ণিত রয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন,

“যে ব্যক্তি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ [আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই] বলবে, আর আল্লাহ ব্যতীত যারই ইবাদত করা হয় তাকেই অস্বীকার করবে তার জান ও মাল হারাম [অর্থাৎ মুসলমানদের কাছে সম্পূর্ণ নিরাপদ] গোপন তৎপরতা ও অন্তরের কুটিলতা বা মুনাফিকির জন্য] তার শাস্তি আল্লাহর উপরই ন্যস্ত।”

পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে এর ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করা হয়েছে। আর তা হচ্ছে তাওহীদ এবং

শাহাদাতের তাফসীর। কয়েকটি সুস্পষ্ট বিষয়ের মাধ্যমে এর বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যেমন ঃ

(ক) সূরা ইসরার আয়াত, এ আয়াতে সে সব মুশরিকদের সমুচিত জওয়াব দেযা হয়েছে যারা বুজুর্গ ও নেক বান্দাদেরকে (আল্লাহকে ডাকার মত] ডাকে। আর এটা যে ‘শিরকে আকবার’ এ কথার বর্ণনাও এখানে রয়েছে।

(খ) সূরা তাওবার আয়াত। এতে আহলে কিতাব অর্থাৎ ইহুদি খৃষ্টানরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের আলেম ও দরবেশ ব্যক্তিরদেরকে রব হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে। আরো বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়নি। এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, অন্যায় ও পাপ কাজে আলেম ও আবেদদের আনুগত্য করা যাবে না। তাদের কাছে দোয়াও করা যাবে না।

(গ) কাফেরদেরকে লক্ষ্য করে ইবরাহীম খলীল (আঃ) এর কথা

দ্বারা তাঁর রবকে যাবতীয় মা’বুদ থেকে আলাদা করেছেন। আল্লাহ তা’আলা এখানে এটাই বর্ণনা করেছেন যে [বাতিল মা’বুদ থেকে] পবিত্র থাকা আর প্রকৃত মাবুদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করাই হচ্ছে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর ব্যাখ্যা। তাই আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“আর ইবরাহীম এ কথাটি পরবর্তীতে তার সন্তানের মধ্যে রেখে গেলো, যেন তারা তার দিকে ফিরে আসে।”

(ঘ) সূরা বাকারার কাফেরদের বিষয় সম্পর্কিত আয়াত। যাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“তারা কখনো জাহান্নাম থেকে বের হতে পারবে না।”

এখানে আল্লাহ তাআলা উল্লেখ করেছেন যে, মুশরিকরা তাদের শরীকদেরকে [যাদেরকে তারা আল্লাহর সমকক্ষ বা অংশীদার মনে করে] আল্লাহকে ভালবাসার মতই ভালবাসে।

এর দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, তারা আল্লাহকে ভালবাসে, কিন্তু এ ভালবাসা তাদেরকে ইসলামে দাখিল করতে পারেনি। তাহলে আল্লাহর শরীককে যে ব্যক্তি আল্লাহর চেয়েও বেশী ভালবাসে সে কিভাবে ইসলামকে গ্রহণ করবে। আর যে ব্যক্তি শুধুমাত্র শরীককেই ভালবাসে। আল্লাহর প্রতি তার কোন ভালবাসা নেই তার অবস্থাই বা কি হবে?

(ঙ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী .

“যে ব্যক্তি লা- ইলাহ ইল্লাল্লাহু বলবে আর আল্লাহ ব্যতীত যারই

ইবাদত করা হয় তাকেই অস্বীকার করবে, তার ধন-সম্পদ ও রক্ত পবিত্র।” [অর্থাৎ জান, মাল, মুসলমানের কাছে নিরাপদ] এ বাণী হচ্ছে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যা। কারণ, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর শুধুমাত্র মৌখিক উচ্চারণ, শব্দসহ এর অর্থ জানা, এর স্বীকৃতি প্রদান, এমনকি শুধুমাত্র লা- শারীক আল্লাহকে ডাকলেই জান-মালের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে না যতক্ষণ পর্যন্ত উক্ত কালেমা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর সাথে গাইরুল্লাহর ইবাদত তথা মিথ্যা মা’বুদগুলোকে অস্বীকার করার বিষয়টি সংযুক্ত না হবে। এতে যদি কোন প্রকার সন্দেহ, সংশয় কিংবা দ্বিধা সংকোচ পরিলক্ষিত হয় তাহলে জান-মাল ও নিরাপত্তার কোন নিশ্চয়তা নেই। অতএব, এটাই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ বিষয়, সুস্পষ্ট বর্ণনা ও অকাট্য দলীল।

৭ম অধ্যায় ঃ

বালা মুসীবত দূর করা অথবা

প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে রিং, তাগা

[সূতা] ইত্যাদি পরিধান করা শিরক

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

[হে রাসূল] “আপনি বলে দিন, তোমরা কি মনে করো, আল্লাহ যদি আমার কোন ক্ষতি করতে চান তাহলে তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকে ডাকো, তারা কি তাঁর [নির্ধারিত] ক্ষতি হতে আমাকে রক্ষা করতে পারবে?” (ঝূমারঃ ৩৮)।

২। সাহাবী ইমরান বিন হুসাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, নবী করীম (সা:) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “এটা কি?” লোকটি বললো, এটা দুর্বলতা দূর করার জন্য দেয়া হয়েছে। তিনি বললেন, “এটা খুলে ফেলো। কারণ এটা তোমার দুর্বলতাকেই শুধু বৃদ্ধি করবে। আর এটা তোমার সাথে থাকা অবস্থায় যদি তোমার মৃত্যু হয়, তবে তুমি কখনো সফলকাম

হতে পারবে না।” (আহমাদ)

৩। উকবা বিন আমের রা. হতে একটি “মারফু” হাদীসে বর্ণিত আছে,

“যে ব্যক্তি তাবিজ ঝুলায় (পরিধান করে) আল্লাহ যেন তার আশা পূরণ না করেন। যে ব্যক্তি কড়ি, শঙ্খ বা শামুক ঝুলায় তাকে যেন আল্লাহ রক্ষা না করেন।” অপর একটি বর্ণনায় আছে,

“যে ব্যক্তি তাবিজ ঝুলালো সে শিরক করলো।”

৪। ইবনে আবি হাতেম হুযাইফা থেকে বর্ণনা করেছেন, “জ্বর নিরাময়ের জন্য হাতে সূতা বা তাগা পরিহিত অবস্থায় তিনি একজন লোককে দেখতে পেয়ে তিনি সে সূতা কেটে ফেললেন এবং কুরআনের এ আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন,

وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللَّهِ إِلَّا وَهُمْ مُشْرِكُونَ (يوسف: ১০৬)  (ইউসুফঃ ১০৬)

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়,

১। রিং (বালা) ও সূতা ইত্যাদি রোগ নিরাময়ের উদ্দেশ্যে পরিধান করার ব্যাপারে অত্যাধিক কঠোরতা।

২। স্বয়ং সাহাবীও যদি এসব জিনিস পরিহিত অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেন তাহলে তিনিও সফলকাম হতে পারবেন না। এতে সাহাবায়ে কেরামের এ কথারই প্রমাণ পাওয়া যায় যে, ছোট শিরক কবিরা গুনাহর চেয়েও মারাত্মক।

৩। অজ্ঞতার অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়।

৪। لا تزيدك إلا وهنا ইহা তোমার দুর্বলতা ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করবে না।” এ কথা দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, রোগ নিরাময়ের উদ্দেশ্যে রিং বা সূতা পরিধান করার মধ্যে কোন কল্যাণ নেই বরং অকল্যাণ আছে।

৫। যে ব্যক্তি উপরোক্ত কাজ করে তার কাজকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

৬। এ কথা সুস্পষ্ট যে, যে ব্যক্তি (রোগ নিরাময়ের জন্য কোন কিছু [রিং সূতা] শরীরে লটকাবে তার কুফল তার উপরই বর্তাবে।

৭। এ কথাও সুস্পষ্ট যে, যে ব্যক্তি রোগ নিরাময়ের উদ্দেশ্যে তাবিজ ব্যবহার করলো সে মূলতঃ শিরক করলো।

৮। জ্বর নিরাময়ের জন্য সূতা পরিধান করাও শিরকের অন্তর্ভুক্ত।

৯। সাহাবী হুযাইফা কর্তৃক কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত করা দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, সাহাবায়ে কেরাম শিরকে আসগরের দলীল হিসেবে ঐ আয়াতকেই পেশ করেছেন যে আয়াতে শিরকে আকবার বা বড় শিরকের কথা রয়েছে। যেমনটি ইবনে আব্বাস (রাঃ) বাকারার আয়াতে উল্লেখ করেছেন।

১০। নজর বা চোখ লাগা থেকে আরোগ্য লাভ করার জন্য শামুক, কড়ি, শঙ্খ ইত্যাদি লটকানো বা পরিধান করাও শিরকের অন্তর্ভুক্ত।

১১। যে ব্যক্তি তাবিজ ব্যবহার করে তার উপর বদ দোয়া করা হয়েছে, ‘আল্লাহ যেন তার আশা পূরণ না করেন।’ আর যে ব্যক্তি শামুক, কড়ি বা শঙ্খ (গলায় বা হাতে) লটকায় তাকে যেন আল্লাহ রক্ষা না করেন।

৮ম অধ্যায় ঃ

ঝাড়-ফুঁক ও তাবিজ-কবজ

১। আবু বাসীর আনসারী রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সফর সঙ্গী ছিলেন। এ সফরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি নির্দিষ্ট এলাকায় একজন দূত পাঠালেন। এর উদ্দেশ্য ছিল কোন উটের গলায় যেন ধনুকের কোন রজ্জু লটকানো না থাকে অথবা এ জাতীয় রজ্জু যেন কেটে ফেলা হয়। (বুখারি)

২। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, “আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একথা বলতে শুনেছি,

“ঝাড়-ফুঁক ও তাবিক- কবজ হচ্ছে শিরক” (আহমাদ, আবু দাউদ)

৩। আবদুল্লাহ বিন উকাইম থেকে মারফু’ হাদীসে বর্ণিত আছে,

“যে ব্যক্তি কোন জিনিস [অর্থাৎ তাবিজ- কবজ] লটকায় সে উক্ত জিনিসের

দিকেই সমর্পিত হয়”। [অর্থাৎ এর কুফল তার উপরই বর্তায়] (আহমাদ, তিরমিজি)

تمائم বা তাবিজ হচ্ছে এমন জিনিস যা চোখ লাগা বা দৃষ্টি লাগা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সন্তানদের গায়ে ঝুলানো হয়। ঝুলন্ত জিনিসটি যদি কুরআনের অংশ হয় তাহলে সালাফে সালেহীনের কেউ কেউ এর অনুমতি দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ অনুমতি দেননি বরং এটাকে শরীয়ত কর্তৃক নিষিদ্ধ বিষয় বলে গণ্য করতেন। ইবনে মাসউদ রা. এ অভিমতের পক্ষে রয়েছেন। আর رقى বা ঝাড়-ফুঁককে عزائم নামে অভিহিত করা হয়। যে সব ঝাড়-ফুঁক শিরক মুক্ত তা দলিলের মাধ্যমে খাস করা হয়েছে। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চোখের দৃষ্টি লাগা এবং সাপ বিচ্ছুর বিষের ব্যাপারে ঝাড়-ফুঁকের অনুমতি দিয়েছেন।

تولة এমন জিনিস যা কবিরাজদের বানানো। তারা দাবী করে যে, এ জিনিস [কবজ] দ্বারা স্ত্রীর অন্তরে স্বামীর ভালবাসা আর স্বামীর অন্তরে স্ত্রীর ভালবাসার উদ্রেক হয়। সাহাবী রুআইফি থেকে ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেন, তিনি [রুআইফি] বলেছেন, “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“হে রুআইফি, তোমার হায়াত সম্ভবত দীর্ঘ হবে। তুমি লোকজনকে জানিয়ে দিও, “যে ব্যক্তি দাড়িতে গিরা দিবে, অথবা গলায় তাবিজ- কবজ ঝুলাবে অথবা পশুর মল কিংবা হাড় দ্বারা এস্তেঞ্জা করবে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জিম্মাদারী থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।”

সাঈদ বিন জুবাইর থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,

“যে ব্যক্তি কোন মানুষের তাবিজ- কবজ ছিড়ে ফেলবে বা কেটে ফেলবে সে ব্যক্তি একটি গোলাম আযাদ করার মত কাজ করলো।” (ওয়াকী)

ইবরাহীম থেকে বর্নিত হাদীসে তিনি বলেন, তাঁরা সব ধরনের তাবীজ- কবজ অপছন্দ করতেন, চাই তার উৎস কুরআন হোক বা অন্য কিছু হোক।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ

১। ঝাড়-ফুঁক ও তাবিজ-কবজের ব্যাখ্যা।

২। (تولة) “তাওলাহ” এর ব্যাখ্যা।

৩। কোন ব্যাতিক্রম ছাড়াই উপরোক্ত তিনটি বিষয় শিরক এর অন্তর্ভূক্ত।

৪। সত্যবাণী তথা কুরআনের সাহায্যে [চোখের] দৃষ্টি লাগা এবং সাপ বিচ্ছুর বিষ নিরাময়ের জন্য ঝাড়Ñফুঁক করা শিরকের অন্তর্ভূক্ত নয়।

৫। তাবিজ- কবজ কুরআন থেকে হলে তা শিরক হওয়া না হওয়ার ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

৬। খারাপ দৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য পশুর রশি বা অন্য কিছু বুঝলানো শিরকের অন্তর্ভূক্ত।

৭। যে ব্যক্তি ধনুকের রজ্জু গলায় ঝুলায় তার উপর কঠিন অভিসম্পাত।

            ৮। কোন মানুষের তাবিজ- কবজ ছিড়ে ফেলা কিংবা কেটে ফেলার ফজিলত।

৯। ইবরাহীমের কথা পূর্বোক্ত মতভেদের বিরোধী নয়। কারণ এর দ্বারা আব্দুল্লাহর সঙ্গী- সাহাবীদেরকে বুঝানো হয়েছে।

৯ম অধ্যায় .

গাছ, পাথর ইত্যাদি দ্বারা বরকত

হাসিল করা

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“ তোমরা কি [পাথরের তৈরী মুর্তি] ‘লাত’ আর “উয্যা” দেখেছো?” (আন নাজমঃ ১৯)।

২। আবু ওয়াকিদ আল-লাইছী রা. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, “আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে হুনাইনের [যুদ্ধের] উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। আমরা তখন সবেমাত্র ইসলাম গ্রহণ করেছি [নও মুসলিম]। একস্থানে পৌত্তুলিকদের একটি কুলগাছ ছিল যার চারপাশে তারা বসতো এবং তাদের সমরাস্ত্র ঝুলিয়ে রাখতো। গাছটিকে তারা ذات أنواط [যাত আনওয়াত] বলতো। আমরা একদিন একটি কুলগাছের পার্শ্ব দিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল মুশরিকদের যেমন “যাতু আনওয়াত” আছে আমাদের জন্যও অনুরূপ “যাতু আনওয়াত” [অর্থাৎ একটি গাছ] নির্ধারণ করে দিন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,

“আল্লাহু আকবার, তোমাদের এ দাবীটি পূর্ববর্তী লোকদের রীতি-নীতি ছাড়া আর কিছুই নয়। যার হাতে আমার জীবন তাঁর কসম করে বলছি, তোমরা এমন কথাই বলেছো যা বনী ইসরাইল মূসা আ. কে বলেছিলো। তারা বলেছিলো, “হে মূসা, মুশরিকদের যেমন মা’বুদ আছে আমাদের জন্য তেমন মা’বুদ বানিয়ে দাও। মুসা আ. বললেন, তোমরা মূর্খের মতো কথা বার্তা বলছো” (আরাফঃ ১৩৮)। তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের রীতি-নীতিই অবলম্বন করছো। (তিরমিজি হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং সহীহ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয় গুলো জানা যায়ঃ-

১। সূরা নাজম এর أفرايتم اللات والعزى এর তাফসীর।

২। সাহাবায়ে কেরামের কাংখিত বিষয়টির পরিচয়।

৩। তারা [সাহাবায়ে কেরাম] শিরক করেননি।

৪। তাঁরা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে চেয়েছিলেন এ কথা ভেবে যে, আল্লাহ তা [কাংখিত বিষয়টি] পছন্দ করেন।

৫। সাহাবায়ে কেরামই যদি এ ব্যাপারে অজ্ঞ থাকেন তাহলে অন্য লোকেরা তো এ ব্যাপারে আরো বেশী অজ্ঞ থাকবে।

৬। সাহাবায়ে কেরামের জন্য যে অধিক সওয়াব দান ও গুনাহ মাফের ওয়াদা রয়েছে অন্যদের ব্যাপারে তা নেই।

৭। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের কাছে অপারগতার কথা বলেননি বরং তাঁদের কথার শক্ত জবাব এ কথার মাধ্যমে দিয়েছেনঃ

“আল্লাহু আকবার নিশ্চয়ই এটা পূর্ববর্তী লোকদের নীতি। তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের নীতি অনুসরণ করছো।” উপরোক্ত

তিনটি কথার দ্বারা বিষয়টি অধিক গুরুত্ব লাভ করেছে।

৮। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে “উদ্দেশ্য”। এখানে এ কথাও জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, সাহাবায়ে কেরামের দাবী মূলতঃ মূসা (আঃ) এর কাছে বনী ইসরাইলের মা’বুদ বানিয়ে দেয়ার দাবীরই অনুরূপ ছিল।

৯। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক না সূচক জবাবের মধ্যেই তাঁদের জন্য “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর” মর্মার্থ অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে নিহিত আছে।

১০। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফতোয়া দানের ব্যাপারে “হলফ” করেছেন।

১১। শিরকের মধ্যে ‘আকবার’ ও ‘আসগার’ রয়েছে। কারণ, তাঁরা এর দ্বারা দীন থেকে বের হয়ে যাননি।

১২। “আমরা কুফরী যমানার খুব কাছাকাছি ছিলাম” [অর্থাৎ আমরা সবেমাত্র মুসলমান হয়েছি] এ কথার দ্বারা বুঝা যায় যে অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম এ ব্যাপারে অজ্ঞ ছিলেন না।

১৩। আশ্চর্যজনক ব্যাপারে যারা ‘আল্লাহু আকবার’ বলা পছন্দ করে না, এটা তাদের বিরুদ্ধে একটা দলীল।

১৪। পাপের পথ বন্ধ করা।

১৫। জাহেলী যুগের লোকদের সাথে নিজেদের সামঞ্জস্যশীল করা নিষেধ।

১৬। শিক্ষাদানের সময় প্রয়োজন বোধে রাগ করা।

১৭। إنها السنن “এটা পূর্ববর্তী লোকদের নীতি” এ বাণী একটা চিরন্তন নীতি।

১৮। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সংবাদ বলেছেন, বাস্তবে তাই ঘটেছে। এটা নবুয়তেরই নিদর্শন।

১৯। কুরআনে কারীমে আল্লাহ তাআলা ইহুদী ও খৃষ্টানদের চরিত্র সম্পর্কে যে দোষ-ত্র“টির কথা বলেছেন, তা থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করার জন্যই বলেছেন।

২০। তাদের [আহলে কিতাবের] কাছে এ কথা স্বীকৃত যে ইবাদতের ভিত্তি হচ্ছে [আল্লাহ কিংবা রাসুলের] নির্দেশ। এখানে কবর সংক্রান্ত বিষয়ে শর্তকতা অবলম্বনের কথা বলা হয়েছে।

من ربك [তোমার রব কে?] দ্বারা যা বুঝানো হয়েছে তা সুস্পষ্ট। [অর্থাৎ আল্লাহ শিরক করার নির্দেশ না দেয়া সত্বেও তুমি শিরক করেছো। তাহলে তোমার রব কে যার হুকুমে শিরক করেছো?]। من نبيك [ তোমার নবী কে] এটা নবী কর্তৃক গায়েবের খবর [অর্থাৎ কবরে কি প্রশ্ন করা হবে এ কথা নবী ছাড়া কেউ বলতে পারেনা। এখানে এ কথার দ্বারা বুঝানো হচ্ছে কে তোমার নবী? তিনি তো শিরক করার কথা বলেননি। তারপর ও তুমি শিরক করেছো। তাহলে তোমার শিরক করার নির্দেশ দাতা নবী কে?]

ما دينك [তোমার দীন কি] এ কথা তাদের إجعل لنا آلهة [আমাদের জন্যও ইলাহ ঠিক করে দিন} এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন করা হবে। [অর্থাৎ তোমার দ্বীনতো শিরক করার নির্দেশ দেয়নি তাহলে তোমাকে শিরকের নির্দেশ দান কারী দ্বীন কি?]

২১। মুশরিকদের রীতি- নীতির মত আহলে কিতাবের [অর্থাৎ আসমানী কিতাব প্রাপ্তদের] রীতি-নীতিও দোষনীয়।

২২। যে বাতিল এক সময় অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিলো তা পরিবর্তনকারী একজন নওমুসলিমের অন্তর পূর্বের সে অভ্যাস ও স্বভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নয়। ونحن حدثاء عهد بكفر [আমরা কুফরী যুগের খুব নিকটবর্তী ছিলাম বা নতুন মুসলমান ছিলাম] সাহাবীদের এ কথার দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয়।

১০ম অধ্যায়

গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্যে যবেহ করা

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“আপনি বলুন, “আমার সালাত, আমার কোরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ [সবই] আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের উদ্দেশ্যে নিবেদিত, যার কোন শরিক নেই” (আনআম : ১৬২)

২। আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করেছেন,

“আপনি আপনার রবের উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ুন এবং কোরবানী করুন। (আল-কাউসার ঃ ২)

৩। আলী (রাঃ) থেকে বর্নিত আছে, তিনি বলেছেন, “রাসূল (স:) চারটি বিষয়ে আমাকে অবহিত করেছেন,

(ক)

“যে ব্যক্তি গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্যে (পশু) যবেহ করে তার উপর আল্লাহর লা’নত।”

(খ)

“যে ব্যক্তি নিজ পিতা- মাতাকে অভিশাপ দেয় তার উপর আল্লাহর লা’নত।”

(গ)

“যে ব্যক্তি কোন বিদআতীকে আশ্রয় দেয় তার উপর আল্লাহর লা’নত।”

(ঘ)

“যে ব্যক্তি জমির সীমানা [চিহ্ণ] পরিবর্তন করে তার উপর আল্লাহর লা’নত”। (মুসলিম)

৪। তারিক বিন শিহাব কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন :

“এক ব্যক্তি একটি মাছির ব্যাপারে জান্নাতে প্রবেশ করেছে। আর এক ব্যক্তি একটি মাছির ব্যাপারে জাহান্নামে গিয়েছে। সাহাবায়ে কেরাম বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, এমনটি কিভাবে হলো? তিনি বললেন, ‘দু’জন লোক এমন একটি কওমের নিকট দিয়ে যাচ্ছিল যার জন্য একটি মূর্তি নির্ধারিত ছিল। উক্ত মূর্তিকে কোন কিছু নযরানা বা উপহার না দিয়ে কেউ সে স্থান অতিক্রম করতোনা। উক্ত কওমের লোকেরা দু’জনের একজনকে বললো, ‘মূর্তির জন্য তুমি কিছু নযরানা পেশ করো’। সে বললো,

‘নযরানা দেয়ার মত আমার কাছে কিছুই নেই’ তারা বললো, ‘অন্ততঃ একটা মাছি হলেও নযরানা স্বরূপ দিয়ে যাও’। অতঃপর সে একটা মাছি মূর্তিকে উপহার দিলো। তারাও লোকটির পথ ছেড়ে দিলো। এর ফলে মৃত্যুর পর সে জাহান্নামে গেলো। অপর ব্যক্তিকে তারা বললো, “মূর্তিকে তুমিও কিছু নযরানা দিয়ে যাও। সে বললো, ‘একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নৈকট্য লাভের জন্য আমি কাউকে কোন নযরানা দেইনা’ এর ফলে তারা তার গর্দান উড়িয়ে দিলো। [শিরক থেকে বিরত থাকার কারণে] মৃত্যুর পর সে জান্নাতে প্রবেশ করলো।” (আহমদ)

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয় গুলো জানা যায় ঃ

১। قل إن صلاتي ونسكي এর তাফসীর।

২। فصل لربك وانحر এর তাফসীর।

৩। প্রথম অভিশপ্ত ব্যক্তি হচ্ছে গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্যে পশু যবেহকারী।

৪। যে ব্যক্তি নিজ পিতা-মাতাকে অভিশাপ দেয় তার উপর আল্লাহর লা’নত। এরমধ্যে এ কথাও নিহিত আছে যে তুমি কোন ব্যক্তির পিতা- মাতাকে অভিশাপ দিলে সেও তোমার পিতা-মাতাকে অভিশাপ দিবে।

৫। যে ব্যক্তি বিদআতীকে আশ্রয় দেয় তার উপর আল্লাহর লা’নত। বিদআতী হচ্ছে ঐ ব্যক্তি, যে দ্বীনের মধ্যে এমন কোন নতুন বিষয় আবিস্কার

বা উদ্ভাবন করে, যাতে আল্লাহর হক ওয়াজিব হয়ে যায়। এর ফলে সে এমন ব্যক্তির আশ্রয় চায় যে তাকে উক্ত বিষয়ের দোষ ত্র“টি বা অশুভ পরিণতি থেকে রক্ষা করতে পারে।

৬। যে ব্যক্তি জমির সীমানা বা চিহ্ণ পরিবর্তন করে তার উপর আল্লাহর লা’নত। এটা এমন চিহ্ণিত সীমানা যা তোমার এবং তোমার প্রতিবেশীর জমির অধিকারের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করে। এটা পরিবর্তনের অর্থ হচ্ছে, তার নির্ধারিত স্থান থেকে সীমানা এগিয়ে আনা অথবা পিছনে নিয়ে যাওয়া।

৭। নির্দিষ্ট ব্যক্তির উপর লা’নত এবং সাধারণভাবে পাপীদের উপর লা’নতের মধ্যে পার্থক্য।

৮। এ গুরুত্বপূর্ণ কাহিনীটি মাছির কাহিনী হিসেবে পরিচিত।

৯। তার জাহান্নামে প্রবশে করার কারণ হচ্ছে ঐ মাছি, যা নযরানা হিসেবে মূর্তিকে দেয়ার কোন ইচ্ছা না থাকা সত্বেও কওমের অনিষ্টতা হতে বাঁচার উদ্দেশ্যেই সে [মাছিটি নযরানা হিসেবে মূর্তিকে দিয়ে শিরকী] কাজটি করেছে।

১০। মোমিনের অন্তরে শিরকের [মারাত্মক ও ক্ষতিকর] অবস্থান সম্পর্কে জ্ঞান লাভ। নিহত [জান্নাতী] ব্যক্তি নিহত হওয়ার ব্যাপারে কি ভাবে ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু তাদের দাবীর কাছে সে মাথা নত করেনি। অথচ তারা তার কাছে কেলমাত্র বাহ্যিক আমল ছাড়া আর কিছুই দাবী করেনি।

১১। যে ব্যক্তি জাহান্নামে গিয়েছে সে একজন মুসলমান। কারণ সে যদি কাফের হতো তাহলে এ কথা বলা হতোনা دخل النار فى ذباب একটি মাছির ব্যাপারে সে জাহান্নামে প্রবেশ করেছে। [অর্থাৎ মাছি সংক্রান্ত শিরকী ঘটনার পূর্বে সে জান্নাতে যাওয়ার যোগ্য ছিল]

১২। এতে সেই সহীহ হাদিসের পক্ষে সাক্ষ্য পাওয়া যায়, যাতে বলা হয়েছে, الجنة اقرب إلى أجدكم من شراك نعله والنار مثل ذلك

“জান্নাত তোমাদের কোন ব্যক্তির কাছে তার জুতার ফিতার চেয়েও নিকটবর্তী। জাহান্নামও তদ্রুপ নিকটবর্তী।”

১৩। এটা জেনে নেয়া প্রয়োজন যে, অন্তরের আমলই হচ্ছে মূল উদ্দেশ্য। এমনকি মূর্তি পূজারীদের কাছেও এ কথা স্বীকৃত।

১১ তম অধ্যায়

যে স্থানে গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্যে [পশু]

যবেহ করা হয় সে স্থানে আল্লাহর

উদ্দেশ্যে যবেহ করা শরীয়ত সম্মত নয়।

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“হে নবী, আপনি কখনো সেখানে দাঁড়াবেন না।” তাওবাহ . ১০৮)

২। সাহাবী ছাবিত বিন আদ্দাহহাক (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন,

এক ব্যক্তি বুওয়ানা নামক স্থানে একটি উট কুরবানী করার জন্য মান্নত করলো। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, “সে স্থানে

এমন কোন মূর্তি ছিল কি, জাহেলী যুগে যার পূজা করা হতো” সাহাবায়ে কেরাম বললেন, ‘না,। তিনি বললেন, “সে স্থানে কি তাদের কোন উৎসব বা মেলা অনুষ্ঠিত হতো? “তাঁরা বললেন, ‘না’ [অর্থাৎ এমন কিছু হতোনা] তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তুমি তোমার মান্নত পূর্ণ করো।” তিনি আরো বললেন, “আল্লাহর নাফরমানীমূলক কাজে মান্নত পূর্ণ করা যাবে না। আদম সন্তান যা করতে সক্ষম নয় তেমন মান্নতও পূরা করা যাবে না। (আবু দাউদ)

এ অধ্যায় থেকে যে সব বিষয় জানা যায় তা নিম্নরূপঃ

১। لا تقم فيه أبدا এর তাফসীর।

২। দুনিয়াতে যেমনি ভাবে পাপের [ক্ষতিকর] প্রভাব পড়তে পারে, তেমনিভাবে [আল্লাহর] আনুগত্যের [কল্যাণময়] প্রভাবও পড়তে পারে।

৩। দুর্বোধ্যতা দূর করার জন্য কঠিন বিষয়কে সুস্পষ্ট ও সহজ বিষয়ের দিকে নিয়ে যাওয়া যায়।

৪। প্রয়োজন বোধে “মুফতী” জিজ্ঞাসিত বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ [প্রশ্ন কারীর কাছে] চাইতে পারেন।

৫। মান্নতের মাধ্যমে কোন স্থানকে খাস করা কোন দোষের বিষয় নয়, যদি তাতে শরিয়তের কোন বাধা-বিপত্তি না থাকে।

৬। জাহেলী যুগের মূর্তি থাকলে তা দূর করার পরও সেখানে মান্নত করতে নিষেধ করা হয়েছে।

৭। জাহেলী যুগের কোন উৎসব বা মেলা কোন স্থানে অনুষ্ঠিত হয়ে

থাকলে, তা বন্ধ করার পরও সেখানে মান্নত করা নিষিদ্ধ।

৮। এসব স্থানের মান্নত পূরণ করা জায়েজ নয়। কেননা এটা অপরাধমূলক কাজের মান্নত।

৯। মুশরিকদের উৎসব বা মেলার সাথে কোন কাজ সাদৃশ্যপূর্ণ ও সামঞ্জস্যশীল হওয়ার ব্যাপারে খুব সাবধান থাকতে হবে।

১০। পাপের কাজে কোন মান্নত করা যাবে না।

১১। যে বিষয়ের উপর আদম সন্তানের কোন হাত নেই সে বিষয়ে মান্নত পূরা করা যাবে না।

১২ তম অধ্যায়

গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্যে মান্নত করা শিরক

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“তারা মান্নত পূরা করে” (ইনসান ঃ ৭)

২। আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করেছেন,

“তোমরা যা কিছু খরচ করেছো আর যে মান্নত মেনেছো, তা আল্লাহ জানেন” (বাকারা : ২৭০)

৩। সহীহ বুখারীতে আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

“যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যের কাজে মান্নত করে সে যেন তা পূরা করার মাধ্যমে তাঁর আনুগত্য করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর নাফরমানীমূলক কাজে মান্নত করে সে যেন তাঁর নাফরমানী না করে।” [অথাৎ মান্নত যেন পূরা না করে।”

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ

১। নেক কাজে মান্নত পূরা করা ওয়াজিব।

২। মান্নত যেহেতু আল্লাহর ইবাদত হিসেবে প্রমাণিত, সেহেতু গাইরুল্লাহর জন্য মান্নত করা শিরক।

৩। আল্লাহর নাফরমানীমূলক কাজে মান্নত পূরণ করা জায়েয নয়।

১৩ তম অধ্যায়

গাইরুল্লাহর কাছে আশ্রয়

চাওয়া শিরক

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“মানুষের মধ্য থেকে কিছু সংখ্যক লোক কতিপয় জ্বিনের কাছে আশ্রয় চাইতেছিল, এর ফলে তাদের [জ্বিনদের] গর্ব ও আহমিকা আরো বেড়ে গিয়েছিল।” (জিন . ৬)

২। খাওলা বিনতে হাকীম (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, “আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এ কথা বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি কোন মঞ্জিলে অবতীর্ণ হয়ে বললো,

“আমি আল্লাহ তাআলার পূর্ণাঙ্গ কালামের কাছে তাঁর সৃষ্টির সকল অনিষ্টতা থেকে আশ্রয় চাই।” তাহলে যতক্ষণ পর্যন্ত সে ঐ মঞ্জিল ত্যাগ না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত কোন কিছুই তার ক্ষতি করতে পারবে না। (মুসলিম)

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় ঃ

১। সূরা জ্বিনের ৬ নং আয়াতের তাফসীর।

২। গাইরুল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া শিরকের মধ্যে গণ্য।

৩। হাদিসের মাধ্যমে এ বিষয়ের উপর [অর্থাৎ গাইরুল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া শিরক] দলীল পেশ করা। উলামায়ে কেরাম উক্ত হাদীস দ্বারা এ প্রমাণ পেশ করেন যে, কালিমাতুল্লাহ অর্থাৎ “আল্লাহর কালাম” মাখলুক [সৃষ্টি] নয়। তাঁরা বলেন ‘মাখলুকের কাছে আশ্রয় চাওয়া শিরক।’

৪। সংক্ষিপ্ত হলেও উক্ত দোয়ার ফজিলত।

৫। কোন বস্তু দ্বারা পার্থিক উপকার হাসিল করা অর্থাৎ কোন অনিষ্ট থেকে তা দ্বারা বেঁচে থাকা কিম্বা কোন স্বার্থ লাভ, এ কথা প্রমাণ করে না যে, উহা শেরকের অন্তর্ভুক্ত নয়।

১৪তম অধ্যায় .

গাইরুল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া

অথবা দোয়া করা শিরক

১। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন,

“আল্লাহ ছাড়া এমন কোন সত্তাকে ডেকোনা, যা তোমার কোন উপকার করতে পারবে না এবং ক্ষতিও করতে পারবে না। যদি তুমি এমন কারো তাহলে নিশ্চয়ই তুমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত। আর আল্লাহ যদি তোমাকে কোন বিপদে ফেলেন, তাহলে একমাত্র তিনি ব্যতীত আর কেউ তা থেকে তোমাকে উদ্ধার করতে পারবে না।” (ইউনুসঃ ১০৬, ১০৭)

২। আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করেছেন,

“আল্লাহর কাছে রিযিক চাও এবং তাঁরই ইবাদত করো”।

(আনকাবুত : ১৭)

৩। আল্লাহ তাআলা অন্য এক আয়াতে এরশাদ করেছেন,

“তার চেয়ে অধিক ভ্রান্ত আর কে হতে পারে, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ছাড়া এমন সত্তাকে ডাকে যে সত্তা কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়া দিতে পারবে না”। (আহকাফ : ৫)

৪। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির ডাকে কে সাড়া দেয় যখন সে ডাকে ? আর কে তার কষ্ট দূর করে?” (নামল : ৬২)

৫। ইমাম তাবরানী বর্ণনা করেছেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে এমন একজন মুনাফিক ছিলো, যে মোমিনদেরকে কষ্ট দিতো। তখন মুমিনরা পরস্পর বলতে লাগলো, চলো, আমরা এ মুনাফিকের অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাহায্য চাই। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেন,

“আমার কাছে সাহায্য চাওয়া যাবে না। একমাত্র আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইতে হবে।”

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় ঃ

১। সাহায্য চাওয়ার সাথে দোয়াকে আত্ফ্ করার ব্যাপারটি কোন عام বস্তুকে خاص বস্তুর সাথে সংযুক্ত করারই নামান্তর।

২। ولا وَلَا تَدْعُ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَنْفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَ আল্লাহর এ বাণীর তাফসীর।

৩। গাইরুল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া বা গাইরুল্লাহকে ডাকা ‘শিরকে আকবার।’

৪। সব চেয়ে নেককার ব্যক্তিও যদি অন্যের সন্তুষ্টির জন্য গাইরুল্লাহর কাছে সাহায্য চায় বা দোয়া করে , তাহলেও সে জালিমদের অন্তর্ভূক্ত।

৫। এর পরবর্তী আয়াত অর্থাৎ وَإِنْ يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ এর তাফসীর।

৬। গাইরুল্লাহর কাছে দোয়া করা কুফরী কাজ হওয়া সত্ত্বেও দুনিয়াতে এর কোন উপকারিতা নেই। [অর্থাৎ কুফরী কাজে কোন সময় দুনিয়াতে কিছু বৈষয়িক উপকারিতা পাওয়া যায়, কিন্তু গাইরুল্লাহর কাছে দোয়া করার মধ্যে দুনিয়ার উপকারও নেই]

৭। ৩য় আয়াত فَابْتَغُوا عِنْدَ اللَّهِ الرِّزْقَ وَاعْبُدُوهُ এর তাফসীর।

৮। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো কাছে রিযিক চাওয়া উচিত নয়। যেমনিভাবে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে জান্নাত চাওয়া উচিৎ নয়।

৯। ৪র্থ আয়াত অর্থাৎ

وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنْ يَدْعُو مِنْ دُونِ اللَّهِ مَنْ لَا يَسْتَجِيبُ لَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ

এর তাফসীর।

১০। যে ব্যক্তি গাইরুল্লাহর কাছে দোয়া করে, তার চেয়ে বড় পথভ্রষ্ট আর কেউ নয়।

১১। যে ব্যক্তি গাইরুল্লাহর কাছে দোয়া করে সে গাইরুল্লাহ দোয়াকারী সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবচেতন থাকে, অর্থাৎ তার ব্যাপারে গাইরুল্লাহ সম্পূর্ণ অনবহিত থাকে।

১২। مدعو [মাদউ’] অর্থাৎ যাকে ডাকা হয় কিংবা যার কাছে দোয়া করা হয়, দোয়াকারীর প্রতি তার রাগ ও শত্র“তার কারণেই হচ্ছে ঐ দোয়া যা তার [গাইরুল্লাহার] কাছে করা হয়। [কারণ প্রকৃত মাদউ’] কখনো এরকম শিরকী কাজের অনুমতি কিংবা নির্দেশ দেয়নি]।

১৩। গাইরুল্লাহকে ডাকার অর্থই হচ্ছে তার ইবাদত করা।

১৪। ঐ ইবাদতের মাধ্যমেই কুফরী করা হয়।

১৫। আর এটাই তার [গাইরুল্লাহর কাছে দোয়া কারীর] জন্য মানুষের মধ্যে সবচেয়ে পাপী ব্যক্তি হওয়ার একমাত্র কারণ।

১৬। পঞ্চম আয়াত অর্থাৎ

أَمَّنْ يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ এর তাফসীর।

১৭। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে এই যে, মূর্তি পূজারীরাও একথা স্বীকার করে যে, বিপদগ্রস্ত, অস্থির ও ব্যাকুল ব্যক্তির ডাকে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউ সাড়া দিতে পারে না। এ কারণেই তারা যখন কঠিন মুসীবতে পতিত হয়, তখন ইখলাস ও আন্তরিকতার সাথে তারা আল্লাহকে ডাকে।

১৮। এর মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক তাওহীদের হেফাযত, সংরক্ষণ এবং আল্লাহ তাআলার সাথে আদব-কায়দা রক্ষা করে চলার বিষয়টি জানা গেলো।

১৫তম অধ্যায়

তাওহীদের মর্মকথা

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“তারা কি আল্লাহর সাথে এমন সব বস্তুকে শরিক করে যারা কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না। বরং তারা নিজেরাই সৃষ্ট হয়। আর তারা তাদেরকে [মুশরিকদেরকে] কোন রকম সাহায্য করতে পারে না।”

(আরাফ: ১৯১-১৯২)

২। আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করেছেন,

“তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে [উপকার সাধন অথবা মুসীবত দূর করার জন্য] ডাকো তারা কোন কিছুরই মালিক নয়।” (ফাতের ঃ ১৩)

৩। সহীহ বুখারীতে আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, উহুদ যুদ্ধে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আঘাত প্রাপ্ত হলেন এবং তাঁর সামনের দাঁত ভেঙ্গে গেলো। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুঃখ করে বললেন,

“সে জাতি কেমন করে কল্যাণ লাভ করবে, যারা তাদের নবীকে আঘাত দেয়”। তখন ليس لك من الأمر شئএ আয়াত নাযিল হলো। যার অর্থ হচ্ছে, [আল্লাহর] এ [ফায়সালার] ব্যাপারে আপনার কোন হাত নেই।’

৪। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্নিত, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ফজরের নামাজের শেষ রাকাতে রুকু থেকে মাথা উঠিয়ে سمع الله لمن حمده ربنا ولك الحمد বলার পর এ কথা বলতে শুনেছেন اللهم العن فلانا وفلانا “আল্লাহ তুমি অমুক, অমুক, [নাম উল্লেখ করে] ব্যক্তির উপর তোমার লানত নাযিল করো।” তখন এ আয়াত নাযিল হয় ليس لك من الأمر شئ অর্থাৎ “এ বিষয়ে তোমার কোন এখতিয়ার নেই।” আরেক বর্ণনায় আছে, যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাফওয়ান ইবনে উমাইয়্যা এবং সোহাইল বিন আমর আল-হারিছ বিন হিশামের উপর বদদোয়া করেন তখন এ আয়াত ليس لك من الأمر شئ নাযিল হয়েছে।

৫। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর যখন وأنذر عشيرتك الأقربين নাযিল হলো তখন আমাদেরকে কিছু বলার জন্য দাঁড়ালেন। অতঃপর তিনি বললেন,

“হে কুরাইশ বংশের লোকেরা [অথবা এ ধরণেরই কোন কথা বলেছেন] তোমরা তোমাদের জীবনকে খরিদ করে নাও। [শিরকের পথ পরিত্যাগ করতঃ তাওহীদের পথ অবলম্বন করার মাধ্যমে জাহান্নামের শাস্তি থেকে নিজেদেরকে বাঁচাও] আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করার ব্যাপারে আমি তোমাদের কোন উপকারে আসব না। হে আব্বাস বিন আবদুল মোত্তালিব আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করার ব্যাপারে আমি আপনার জন্য কোন উপকার করতে সক্ষম নই। হে রাসূলুল্লাহর ফুফু সাফিয়্যাহ, আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করার ব্যাপারে আমি আপনার কোন উপকার করতে সক্ষম নই। হে মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমা, আমার সম্পদ থেকে যা খুশী চাও। কিন্তু আল্লাহার কাছে জবাবদিহি করার ব্যাপারে তোমার কোন উপকার করার ক্ষমতা আমার নেই।”

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ-

১। এ অধ্যায়ে উল্লেখিত দু’টি আয়াতের তাফসীর।    

২। উহুদ যুদ্ধের কাহিনী।

৩। নামাজে সাইয়্যেদুল মুরসালীন তথা বিশ্বনবী কর্তৃক “দোয়াতে কনুত” পাঠ করা এবং নেতৃস্থানীয় সাহাবায়ে কেরাম কর্তৃক আমীন বলা।

৪। যাদের উপর বদ দোয়া করা হয়েছে তারা কাফের।

৫। অধিকাংশ কাফেররা অতীতে যা করেছিলো তারাও তাই করেছে।

যেমন, নবীদেরকে আঘাত করা, তাঁদেরকে হত্যা করতে চাওয়া এবং একই বংশের লোক হওয়া সত্ত্বেও মৃত ব্যক্তির নাক, কান কাটা।

৬। এ ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর

ليس لك من الأمرشيئ নাযিল হওয়া।

৭। أو يتوب عليهم أن يعذبهم এরপর তারা তাওবা করলো।

আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করলেন, আর তারাও আল্লাহর উপর ঈমান আনলো।

৮। বালা-মুসীবতের সময় দোয়া-কুনুত পড়া।

৯। যাদের উপর বদ দোয়া করা হয়, নামাজের মধ্যে তাদের নাম এবং তাদের পিতার নাম উল্লেখ করে বদ দোয়া করা।

১০। “কুনুতে নাযেলায়” নির্দিষ্ট করে অভিসম্পাত করা।

১১। وأنذر عشيرتك الأقربين নাযিল হওয়ার পর পর নবী জীবনের ঘটনা।

১২। ইসলামের দাওয়াত প্রচারের ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অক্লান্ত

১৩। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর দূরবর্তী এবং নিকটাত্মীয়-স্বজনদের ব্যাপারে বলেছেন لا أغني عنك من الله شيئا [আল্লাহর কাছে জবাব দিহি করার ব্যাপারে আমি তোমার সাহায্য করতে পারব না”] এমনকি তিনি ফাতেমা রা.কেও লক্ষ্য করে বলেছিলেন,

“হে ফাতেমা, আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করার ব্যাপারে তোমার কোন উপকার আমি করতে সক্ষম হবো না”।] তিনি সমস্ত নবীগণের নেতা হওয়া সত্ত্বেও নারীকুল শিরোমণির জন্য কোন উপকার করতে না পারার ঘোষণা দিয়েছেন। আর মানুষ যখন এটা বিশ্বাস করে যে, তিনি সত্য ছাড়া কিছুই বলেন না, তখন সে যদি বর্তমান যুগের কতিপয় খাস ব্যক্তিদের অন্তরে সুপারিশের মাধ্যমে অন্যকে বাঁচানোর ব্যাপারে যে ধ্যান-ধারণার সৃষ্টি হয়েছে তার দিকে দৃষ্টিপাত করে, তাহলে তার কাছে তাওহীদের মর্মকর্থা এবং দ্বীন সম্পর্কে মানুষের অজ্ঞতার কথা সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়বে।

১৬তম অধ্যায় .

১। আল্লাহ তা’আলার বাণী,

“এমনকি শেষ পর্যন্ত যখন লোকদের অন্তর থেকে ভয়-ভীতি দূর হয়ে যাবে তখন তারা সুপারিশকারীদেরকে জিজ্ঞাসা করবে, তোমাদের রব কি জবাব দিয়েছেন? তারা বলবে, সঠিক জবাবই পাওয়া গিয়েছে আর তিনিই মহান ও শ্রেষ্ঠ। (সাবাঃ ২৩)

২। সহীহ্ বুখারীতে আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

“যখন আল্লাহ তাআলা আকাশে কোন বিষয়ের ফয়সালা করেন, তখন তাঁর কথার সমর্থনে বিনয়াবনত হয়ে ফিরিস্তারা তাদের ডানাগুলো নাড়াতে থাকে। ডানা নাড়ানোর আওয়াজ যেন ঠিক পাথরের উপর শিকলের আওয়াজ। তাদের অবস্থা এভাবেই চলতে থাকে। যখন তাদের অন্তর থেকে এক সময় ভয়-ভীতি দূর হয়ে যায়, তখন তারা বলে, তোমাদের রব তোমাদেরকে কি বলেছেন? তারা জবাবে বলে, আল্লাহ হক কথাই বলেছেন। বস্তুতঃ তিনিই হচ্ছেন মহান ও শ্রেষ্ঠ। এমতাবস্থায় চুরি করে কথা শ্রবণকারীরা উক্ত কথা শুনে ফেলে। আর এসব কথা চোরেরা এ ভাবে পর পর অবস্থান করতে থাকে। এ হাদীসের বর্ণনাকারী সুফইয়ান বিন উয়াইনা চুরি করে কথা শ্রবণকারী [খাত চোর] দের অবস্থা বর্ণ করতে গিয়ে হাতের তালু দ্বারা এর ধরণ বিশ্লেষণ করেছেন এবং হাতের আঙ্গুলগুলো ফাঁক করে তাদের অবস্থা বুঝিয়েছেন। অতঃপর চুপিসারে শ্রবণকারী কথাগুলো শুনে তার নিজের ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেয়। শেষ পর্যন্ত এ কথা একজন যাদুকর কিংবা গণকের ভাষায় দুনিয়াতে প্রকাশ পায়। কোন কোন সময় গণক বা যাদুকরের কাছে উক্ত কথা পৌঁছানোর পূর্বে শ্রবণকারীর উপর আগুনের তীর নিক্ষিপ্ত হয়। আবার কোন কোন সময় আগুণের তীর নিক্ষিপ্ত হওয়ার পূর্বেই সে কথা দুনিয়াতে পৌঁছে যায়। ঐ সত্য কথাটির সাথে শত শত মিথ্যা কথা যোগ করে মিথ্যার বেশাতি করা হয়। অতঃপর শত মিথ্যার সাথে মিশ্রিত সত্য কথাটি যখন বাস্তবে রূপ লাভ করে তখন বলা হয়, অমুক-অমুক দিনে এমন এমন কথা কি

তোমাদেরকে বলা হয়নি? এমতাবস্থায় আকাশে শ্র“ত কথাটিকেই সত্যায়িত করা হয়।

৩। নাওয়াস বিন সামআন রা. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

“আল্লাহ তাআলা যখন কোন বিষয়ে অহী করতে চান এবং অহীর মাধ্যমে কথা বলেন তখন আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের ভয়ে সমস্ত আকাশ মন্ডলী কেঁপে উঠে অথবা বিকট আওয়াজ করে। আকাশবাসী ফিরিস্তাগণ এ নিকট আওয়াজ শুনে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে। এ অবস্থা থেকে সর্ব প্রথম যিনি মাথা উঠান, তিনি হচ্ছেন জিবরাঈল তারপর আল্লাহ তাআলা যা ইচ্ছা করেন অহীর মাধ্যমে জিবরাঈল এর সাথে কথা বলেন। জিবরাঈল এরপর ফিরিস্তাদের পাশ দিয়ে যেতে থাকেন। যতবারই আকাশ অতিক্রম করতে থাকেন ততবারই উক্ত আকাশের

ফিরিস্তারা তাঁকে জিজ্ঞাসা করে, ‘হে জিবরাঈল, আমাদের রব কি বলেছেন? জিবরাঈল উত্তরে বলেন, ‘আল্লাহ হক কথাই বলেছেন, তিনিই মহান ও শ্রেষ্ঠ’। একথা শুনে তারা সবাই জিবরাঈল যা বলেছেন তাই বলে। তারপর আল্লাহ তাআলা জিবরাঈলকে যেখানে অহী নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন সে দিকে চলে যান।”

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় ঃ

১। সুরা সাবার ২৩ নং আয়াতের তাফসীর।

২। এ আয়াতে রয়েছে শিরক বাতিলের প্রমাণ। বিশেষ করে সালেহীনের সাথে যে শিরককে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এটিই সে আয়াত, যাকে অন্তর থেকে শিরক বৃক্ষের ‘শিকড় কর্তনকারী’ বলে আখ্যায়িত করা হয়।

৩। قال الحق وهو العلي الكبير এ আয়াতের তাফসীর।

৪। হক সম্পর্কে ফিরিস্তাদের জিজ্ঞাসার কারণ।

৫। ‘এমন এমন কথা বলেছেন’ এ কথার মাধ্যমে জিবরাঈল কর্তৃক জবাব প্রদান।

৬। জিসদারত অবস্থা থেকে সর্ব প্রথম জিবরাইল কর্তৃক মাথা উঠানোর উল্লেখ।

৭। সমস্ত আকাশবাসীর উদ্দেশ্যে জিবরাইল কথা বলবেন। কারণ তাঁর কাছেই তারা কথা জিজ্ঞাসা করে।

৮। বেহুশ হয়ে পড়ার বিষয়টি আকাশবাসী সকলের জন্যই প্রযোজ্য।

৯। আল্লাহর কালামের প্রভাবে সমস্ত আকাশ প্রকম্পিত হওয়া।

১০। জিবরাঈল আল্লাহর নির্দেশিত পথে অহি সর্ব শেষ গন্তব্যে পৌঁছান।

১৭তম অধ্যায় ঃ

শাফাআত [সুপারিশ]

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“তুমি কুরআনের মাধ্যমে সে সব লোকদের ভয় দেখাও, যারা তাদের রবের সামনে উপস্থিত হওয়াকে ভয় করে। সেদিন তাদের অবস্থা এমন হবে যে, আল্লাহ ছাড়া তাদের কোন সাহায্যকারী বন্ধু এবং কোন শাফাআতকারী থাকবে না।” (আনআ’মঃ ৫১)

২। আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করেন,

“বলুন, সমস্ত শাফাআত কেবলমাত্র আল্লাহরই ইখতিয়ার ভুক্ত”। (ঝুমার: ৪৪)

৩। আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে এরশাদ করেছেন,

“তাঁর [আল্লাহর] অনুমতি ব্যতীত তাঁর দরবারে কে শাফাআত [সুপারিশ] করতে পারে?” (বাকারাহ . ২৫৫)

৪। আল্লাহ তাআলা অন্যত্র এরশাদ করেছেন,

“আকাশ মন্ডলে কতইনা ফিরিস্তা রয়েছে। তাদের শাফাআত কোন কাজেই আসবে না, তবে হ্যাঁ, তাদের শাফাআত যদি এমন কোন ব্যক্তির পক্ষে হয় যার আবেদন শুনতে তিনি ইচ্ছা করবেন এবং তা পছন্দ করবেন।” (নাজম ঃ ২৬)

৫। আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করেন,

“[হে মুহাম্মদ, মুশরিকদেরকে] বলো, তোমরা তোমাদের সেই সব

মা’বুদদেরকে ডেকে দেখো, যাদেরকে তোমরা আল্লাহ ব্যতীত নিজেদের মা’বুদ মনে করে নিয়েছো, তারা না আকাশের, না যমীনের এক অনু পরিমাণ জিনিসের মালিক।” (সাবা ঃ ২২)

আবুল আব্বাস ইবনে তাইমিয়াহ র. বলেন, মুশরিকরা আল্লাহ ছাড়া যার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছে, তার সবই আল্লাহ তাআলা অস্বীকার করেছেন।

গাইরুল্লাহর জন্য রাজত্ব অথবা আল্লাহর ক্ষমতায় গাইরুল্লাহর অংশীদারিত্ব অথবা আল্লাহর জন্য কোন গাইরুল্লাহ সাহায্যকারী হওয়ার বিষয়কে তিনি অস্বীকার করেছেন। বাকী থাকলো শাফাআতের বিষয়। এ ব্যাপারে কথা হচ্ছে এই যে, “আল্লাহ তাআলা শাফাআত [সুপারিশ] এর জন্য যাকে অনুমতি দিবেন তার ছাড়া আর কারো শাফাআত কোন কাজে আসবে না।”

আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“তিনি [আল্লাহ] যার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হবে, কেবলমাত্র তার পক্ষেই তারা শাফাআত [সুপারিশ] করবে।” (আম্বিয়া ঃ ২৮)

মুশরিকরা যে শাফাআতের আশা করে, কেয়ামতের দিন তার কোন অস্তিত্বই থাকবে না। কুরআনে কারীমও এধরনের শাফাআতকে অস্বীকার করেছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানিয়েছেন,

“তিনি অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হবেন। অতঃপর তাঁর রবের উদ্দেশ্যে তিনি সেজদায় লুটিয়ে পড়বেন এবং আল্লাহর প্রশংসায় মগ্ন হবেন। প্রথমেই তিনি শাফাআত বা সুপারিশ করা শুরু করবেন না। অতঃপর তাঁকে বলা হবে, “হে মুহাম্মদ, তোমার মাথা উঠাও। তুমি তোমার কথা বলতে থাকো, তোমার কথা শ্রবন করা হবে। তুমি চাইতে থাকো, তোমাকে দেয়া হবে। তুমি সুপারিশ করতে থাকো, তোমার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।”

 আবু হুরাইয়ারা রা. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার শাফাআত লাভে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি কে? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাবে বললেন, ‘যে ব্যক্তি খালেস দিলে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে।”

এ হাদীসে উল্লেখিত শাফাআত [বা সুপারিশ] আল্লাহ তাআলার অনুমতি প্রাপ্ত এবং নেককার মুখলিস বান্দাদের জন্য নির্দিষ্ট। আল্লাহর সাথে যে ব্যক্তি কাউকে শরিক করবে তার ভাগ্যে এ শাফাআত জুটবে না।

এ আলোচনার মর্মার্থ হচ্ছে এই যে, আল্লাহ তাআলা মুখলিস বান্দাগণের প্রতি অনুগ্রহ করবেন এবং শাফাআতের জন্য অনুমতি প্রাপ্ত ব্যক্তিদের প্রার্থনায় তাদেরকে ক্ষমা করে দিবেন। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, শাফাআতকারীকে সম্মানিত করা এবং মাকামে মাহমূদ অর্থাৎ প্রশংসিত স্থান দান করা।

কুরআনে কারীম যে শাফাআতকে অস্বীকার করেছে, তাতে শিরক বিদ্যমান রয়েছে। এ জন্যই আল্লাহ তাআলার অনুমতি সাপেক্ষে শাফাআত এর স্বীকৃতির কথা কুরআনে বিভিন্ন জায়গায় এসেছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্ণনা করেছেন যে, শাফাআত একমাত্র তাওহীদবাদী নিষ্ঠাবানদের জন্যই নির্দিষ্ট।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয় গুলো জানা যায়ঃ

১। উল্লেখিত আয়াতসমূহের তাফসীর।

২। যে শাফাআতকে অস্বীকার করা হয়েছে তার প্রকৃতি।

৩। স্বীকৃত শাফাআতের গুণ ও বৈশিষ্ট্য।

৪। সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ শাফাআতের উল্লেখ। আর তা হচ্ছে “মাকামে মাহমুদ”

৫। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম [শাফাআতের পূর্বে] যা করবেন তার বর্ণনা। অর্থাৎ তিনি প্রথমেই শাফাআতের কথা বলবেন না, বরং তিনি সেজদায় পড়ে যাবেন। তাঁকে অনুমতি প্রদান করা হলেই তিনি শাফাআত করতে পারবেন।

৬। শাফাআতের মাধ্যমে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান ব্যক্তির উল্লেখ।

৭। আল্লাহর সাথে শিরককারীর জন্য কোন শাফাআত গৃহীত হবে না।

১৮তম অধ্যায় ঃ

একমাত্র আল্লাহই

হেদায়াতের মালিক

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“আপনি যাকে পছন্দ করেন, তাকে আপনি হেদায়াত করতে পারবেন না”। (কাসাস: ৫৭)

২। সহীহ বুখারীতের ইবনুল মোসাইয়্যাব তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, যখন আবু তালিবের মৃত্যু ঘনিয়ে এলো, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কাছে আসলেন। আবদুল্লাহ বিন আবি উমাইয়্যাহ এবং আবু জাহল আবু তালিবের পাশেই উপস্থিত ছিলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, ‘চাচা, আপনি ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলুন। এ কালিমা দ্বারা আমি আল্লাহর কাছে আপনার জন্য কথা বলবো, তখন তারা দু’জন [আবদুল্লাহ ও আবু জাহল] তাকে বললো, ‘তুমি আবদুল মোত্তালিবের ধর্ম ত্যাগ করবে?’ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কলেমা পড়ার কথা আরেকবার বললেন। তারা দু’জন আবু

তালিবের উদ্দেশ্যে পূর্বোক্ত কথা আরেকবার বললো। আবু তালিবের সর্বশেষ অবস্থা ছিল এই যে, সে আবদুল মোত্তালিবের ধর্মের উপরই অটল ছিলো এবং ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলতে অস্বীকার করেছিলো। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘আপনার ব্যাপারে যতক্ষন পর্যন্ত আমাকে নিষেধ করা না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমি আপনার জন্য মাগফিরাত কামনা করতে থাকবো।’ এরপর আল্লাহ তাআলা এ আয়াত নাযিল করেন,

“মুশরিকদের জন্য মাগফিরাত কামনা করা নবী এবং ইমানদার ব্যক্তিদের জন্য শোভনীয় কাজ নয়।” (তাওবা: ১১৩)

আল্লাহ তাআলা আবু তালিবের ব্যাপারে এ আয়াত নাযিল করেন,

“আপনি যাকে পছন্দ করেন, তাকে হেদায়াত করতে পারবেন না। কিন্তু আল্লাহ যাকে চান তাকে হেদায়াত করেন।” (আল-কাসাস: ৫৬)

 এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয় গুলো জানা যায়ঃ

১। أنك لا تهدى من أحببت এ আয়াতের তাফসীর।

২। সুরা তাওবার ১১৩ নং আয়াত অর্থাৎ

এর তাফসীর।

৩। قل لا إله إلا الله অর্থাৎ “আপনি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলুন” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কথার ব্যাখ্যা। এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা এক শ্রেণীর তথা কথিত জ্ঞানের দাবীদারদের বিপরীত।

৪। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃত্যুপথ যাত্রী আবু তালিবের ঘরে প্রবেশ করে যখন বললেন, চাচা, আপনি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলুন, এ কথার দ্বারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কি উদ্দেশ্য ছিল তা আবু জাহল এবং তার সঙ্গীরা বুঝতে পেরেছিল। আল্লাহ আবু জাহেলের ভাগ্য মন্দ করলেন, সে নিজেও পথভ্রষ্ট থেকে গেলো, অপরকেও গোমরাহীর পরামর্শ দিলো। আল্লাহর চেয়ে ইসলামের মূলনীতি সম্পর্কে আর কে বেশী জানে?

৫। আপন চাচার ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর তীব্র আকাংখ্যা ও প্রাণপন চেষ্টা।

৬। যারা আবদুল মোত্তালিব এবং তার পূর্বসূরীদেরকে মুসলিম হওয়ার দাবী করে, তাদের দাবী খন্ডন।

৭। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় চাচা আবু তালেবের জন্য মাগফিরাত চাইলেও তার গুনাহ মাফ হয়নি, বরং তার মাগফিরাত চাওয়ার ব্যাপারে নিষেধজ্ঞা এসেছে।

৮। মানুষের উপর খারাপ লোকদের ক্ষতিকর প্রভাব।

৯। পূর্ব পুরুষ এবং পীর-বুজুর্গের প্রতি অন্ধ ভক্তির কুফল।

১০। আবু জাহল কর্তৃক পূর্ব পুরুষদের প্রতি অন্ধ ভক্তির যুক্তি প্রদর্শনের কারণে বাতিল পন্থীর অন্তরে সংশয়।

১১। সর্বশেষ আমলের শুভাশুভ পরিণতির প্রত্যক্ষ প্রমাণ। কেননা আবু তালিব যদি শেষ মুহুর্তেও কালিমা পড়তো, তাহলে তার বিরাট উপকার হতো।

১২। গোমরাহীতে নিমজ্জিত লোকদের অন্তরে এ সংশয়ের মধ্যে বিরাট চিন্তার বিষয় নিহিত আছে। কেননা উক্ত ঘটনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈমান আনার কথা বারবার বলার পরও তারা [কাফির মুশরিকরা] তাদের পূর্ব পুরুষদের প্রতি অন্ধ অনুকরণ ও ভাল বাসাকেই যুক্তি হিসেবে পেশ করেছে। তাদের অন্তরে এর [গোমরাহীর তথা কথিত] সুস্পষ্টতা ও [তথা কথিত] শ্রেষ্ঠত্ব থাকার কারণেই অন্ধ অনুকরণকে যথেষ্ট বলে মনে করেছে।

১৯তম অধ্যায় ঃ

নেককার পীর-বুজুর্গ লোকদের

ব্যাপারে সীমা লংঘন করা আদম

সন্তানের কাফের ও বেদ্বীন হওয়ার

অন্যতম কারণ

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“হে আহলে কিতাব, তোমরা তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে সীমা লংঘন করো না।” (নিসা . ১৭১)

২। সহীহ হাদীসে ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাআলার বাণী ঃ

“কাফেররা বললো, ‘তোমরা নিজেদের মাবূদগুলোকে পরিত্যাগ

করোনা। বিশেষ করে ‘ওয়াদ’, ‘সুআ’, ‘ইয়াগুছ’ ‘ইয়াঊক’ এবং ‘নসর’ কে কখনো পরিত্যাগ করোনা। (নূহ ঃ ২৩)- এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘এগুলো হচ্ছে নূহ (আঃ) এর কওমের কতিপয় নেককার ও বুজুর্গ ব্যক্তিদের নাম, তারা যখন মৃত্যু বরণ করলো, তখন শয়তান তাদের কওমকে কুমন্ত্রণা দিয়ে বললো, ‘যেসব জায়গায় তাদের মজলিস বসতো সে সব জায়গাগুলোতে তাদের [বুজুর্গ ব্যক্তিদের] মুর্তি স্থাপন করো এবং তাদের সম্মানার্থে তাদের নামেই মুর্তিগুলোর নামকরণ করো। তখন তারা তাই করলো। তাদের জীবদ্দশায় মুর্তির পূজা করা হয়নি ঠিকই; কিন্তু মূর্তি স্থাপন কারীরা যখন মৃত্যু বরণ করলো এবং মুর্তি স্থাপনের ইতিকথা ভুলে গেলো, তখনই মুর্তিগুলোর ইবাদত শুরু হলো।

ইবনুল কাইয়্যিম (রহ:) বলেন, একাধিক আলেম ব্যক্তি বলেছেন, ‘যখন নেককার ও বুজুর্গ ব্যক্তিগণ মৃত্যু বরণ করলেন, তখন তাঁদের কওমের লোকেরা তাঁদের কবরের পাশে ধ্যান-মগ্ন হয়ে বসে থাকতো। এরপর তারা তাঁদের প্রতিকৃতি তৈরী করলো। এভাবে বহুদিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর তারা তাঁদের ইবাদতে লেগে গেলো।

৩। ওমর রা. থেকে বর্নিত হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

“তোমরা আমার মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসা করোনা যেমনিভাবে প্রশংসা করেছিলো নাসারারা মরিয়ম তনয় ঈসা (আঃ) এর। আমি আল্লাহ তাআলার বান্দা মাত্র। তাই তোমরা আমাকে আল্লাহর বান্দা এবং তাঁরই রাসূল বলবে।” (বুখারি ও মুসলিম)

৪। ওমর (রাঃ) আরো বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

إياكم والغلو فإنما أهلك من كان قبلكم الغلو

“তোমরা বাড়া-বাড়ি ও সীমা অতিক্রমের ব্যাপারে সাবধান থাকো। কেননা, তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো (দ্বীনের ব্যাপারে) সীমা লংঘন করার ফলে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।”

৫। মুসলিম শরীফে ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্নিত এক হাদীসে, রাসূল এরশাদ করেছেন,

“দ্বীনের ব্যাপারে সীমা লংঘন কারীরা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।” এ কথা তিনি তিনবার বলেছেন।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ

১। যে ব্যক্তি এ অধ্যায়টি সহ পরবর্তী দু’টি অধ্যায় উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে, ইসলাম সম্পর্কে মানুষ কতটুকু অজ্ঞ, তার কাছে তা সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে। সাথে সাথে আল্লাহ তাআলার কুদরত এবং মানব অন্তরের আশ্চর্য জনক পরিবর্তন ক্ষমতা লক্ষ্য করতে পারবে।

২। পৃথিবীতে সংঘটিত প্রথম শিরকের সূচনা, যা নেককার ও বুজুর্গ ব্যক্তিদের প্রতি সংশয় ও সন্দেহ থেকে উৎপত্তি হয়েছে।

৩। সর্বপ্রথম যে জিনিসের মাধ্যমে নবীগণের দ্বীনে পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল এবং এর কারণ সম্পর্কে জ্ঞান লাভের সাথে সাথে একথাও জেনে নেয়া যে, আল্লাহ তাআলাই তাদেরকে [দ্বীন কায়েমের জন্য] পাঠিয়েছেন।

৪। ‘শরীয়ত’ এবং ফিতরাত’ ‘বিদআতকে’ প্রত্যাখ্যান করা সত্তেও বেদআত গ্রহণ করার কারণ সম্পর্কে অবগতি লাভ।

৫। উপরোক্ত সকল গোমরাহীর কারণ হচ্ছে, হকের সাথে বাতেলের সংমিশ্রন, এর প্রথমটি হচ্ছে, সালেহীন বা নেককার ও বুজুর্গ লোকদের প্রতি [মাত্রাতিরিক্ত] ভালবাসা।

আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, কতিপয় জ্ঞানী ধার্মিক ব্যক্তিদের এমন কিছু আচরণ, যার উদ্দেশ্য ছিল মহৎ, কিন্তু পরবর্তীতে কিছু লোক উক্ত কাজের উদ্দেশ্য ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে ‘বেদআত ও শিরকে লিপ্ত হয়।

৬। সূরা নূহের ২৩ নং আয়াতের তাফসীর।

৭। মানুষের অন্তরে হকের প্রতি ঝোক প্রবণতার পরিমাণ কম। কিন্তু বাতিলের প্রতি ঝোক প্রবণতার পরিমাণ অপক্ষোকৃত বেশী।

৮। কোন কোন সালাফে-সালেহীন থেকে বর্ণিত আছে যে, বেদআত হচ্ছে কুফরীর কারণ। তাছাড়া ইবলিস অন্যান্য পাপের চেয়ে এটাকেই বেশী পছন্দ করে। কারণ পাপ থেকে তওবা করা সহজ হলেও বেদআত থেকে তওবা করা সহজ নয়। [কারণ বিদয়াত তো সওয়াবের কাজ মনে করে করা হয় বলে পাপের অনুভূতি থাকে না, তাই তাওবারও প্রয়োজন অনুভুত হয় না]

৯। আমলকারীর নিয়ত যত মহৎই হোক না কেন, বিদআতের পরিণতি কি, তা শয়তান ভাল করেই জানে। এ জন্যই শয়তান আমল কারীকে বিদআতের দিকে নিয়ে যায়।

১০। “দ্বীনের ব্যাপারে সীমা লংঘন করা না করা” এ নীতি সম্পর্কে এবং সীমা লংঘনের পরিণতি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা।

১১। নেক কাজের নিয়তে কবরের পাশে ধ্যান-মগ্ন হওয়ার ক্ষতি সম্পর্কে অবগত হওয়া।

১২। মূর্তি বানানো বা স্থাপনের নিষেধাজ্ঞা এবং তা অপসারণের কল্যাণ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা।

১৩। উপরোল্লিখিত কিসসার অপরিসীম গুরুত্ব অনুধাবন করা এবং এর অতীব প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানা।

১৪। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এই যে, বেদআত পন্থীরা তফসীর হাদিসের কিতাব গুলোতে শিরক বিদআতের কথাগুলো পড়েছে এবং আল্লাহর কালামের অর্থও তারা জানতো, শিরক ও বিদআতের ফলে আল্লাহ তাআলা এবং তাদের অন্তরের মাঝখানে বিরাট প্রতিবন্ধকের সৃষ্টি হয়েছিল, তারপরও তারা বিশ্বাস করতো যে, নূহ আ. এর কওমের লোকদের কাজই ছিল শ্রেষ্ঠ ইবাদত। তারা আরো বিশ্বাস করতো যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা নিষেধ করেছিলেন সেটাই ছিল এমন কুফরী যার ফলে জান-মাল পর্যন্ত বৈধ হয়ে যায়। [অর্থাৎ হত্যা করে ধন-সম্পদ দখল করা যায়]।

১৫। এটা সুস্পষ্ট যে, তারা শিরক ও বেদআত মিশ্রিত কাজ দ্বারা সুপারিশ ছাড়া আর কিছুই চায়নি।

১৬। তাদের ধারণা এটাই ছিল যে, যেসব পন্ডিত ব্যক্তিরা ছবি মুর্তি তৈরী করেছিল তারাও শাফাআত লাভের আশা পোষণ করতো।

১৭। “তোমরা আমার মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসা করোনা যেমনিভাবে খৃষ্টানরা মরিয়ম তনয়কে করতো।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর এ মহান বাণীর দাওয়াত তিনি পূর্ণাঙ্গ ভাবে পৌঁছিয়েছেন।

১৮। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে উপদেশ দিয়েছেন যে দ্বীনের ব্যাপারে সীমা লংঘনকারীদের ধ্বংস অনিবার্য।

১৯। এ কথা সুস্পষ্ট যে, ইলমে দ্বীন ভুলে না যাওয়া পর্যন্ত মুর্তি পুজার সূচনা হয়নি। এর দ্বারা ইলমে দ্বীন থাকার মর্যাদা আর না থাকার পরিণতি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ।

২০। ইলমে দ্বীন উঠে যাওয়ার কারণ হচ্ছে আলেমগণের মৃত্যু।

২০তম অধ্যায় ঃ

নেককার বুজুর্গ ব্যক্তির কবরের পাশে

ইবাদত করার ব্যাপারে যেখানে কঠোর

নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, সেখানে ঐ নেককার

ব্যক্তির উদ্দেশ্যে ইবাদত কিভাবে জায়েয হতে পারে?

১। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, উম্মে সালামা রা. হাবশায় যে গীর্জা দেখতে পেয়েছিলেন এবং তাতে যে ছবি প্রত্যক্ষ করেছিলেন তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে উল্লেখ করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,

“তাদের মধ্যে কোন নেককার বুজুর্গ ব্যক্তির মৃত্যু বরণ করার পর তার কবরের উপর তারা মসজিদ তৈরী করতো এবং মসজিদে ঐ ছবিগুলো অংকন করতো। [অর্থাৎ তুমি সে জাতীয় ছবিগুলোই দেখেছ]। তারা হচ্ছে আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট।” তারা দুটি ফেতনাকে একত্রিত করেছে। একটি হচ্ছে কবর পুজার ফেতনা। অপরটি হচ্ছে মূর্তি পূজার ফেতনা। (বুখারি)

২। সহীত বুখারি ও মুসলিমে আয়েশা রা. থেকে আরো একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মৃত্যু

ঘনিয়ে আসলো, তখন তিনি নিজের মুখমন্ডলকে স্বীয় চাদর দিয়ে ঢেকে ফেলতে লাগলেন। আবার অস্বস্তিবোধ করলে তা চেহারা থেকে সরিয়ে ফেলতেন। এমন অবস্থায়ই তিনি বললেন,

لعنة الله على اليهود والنصارى اتخذوا قبور أنبياءهم مساجد

“ইয়াহুদী নাসারাদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত। তারা তাদের নবীদের কবরকে মসজিদ বানিয়েছে” তাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সতর্ক করে দিয়েছেন। কবরকে ইবাদত খানায় পরিণত করার আশংকা না থাকলে তাঁর কবরকে উন্মুক্ত রাখা হতো। (বুখারি ও মুসলিম)

৩। জুনদুব বিন আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাঁর ইন্তেকালের পূর্বে এ কথা বলতে শুনেছি, “তোমাদের মধ্য থেকে কাউকে আমার খলীল [বন্ধু] হিসেবে গ্রহণ করার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে মুক্ত। কেননা আল্লাহ তাআলা আমাকে খলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। যেমনিভাবে তিনি ইবরাহীম আ.কে খলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আর আমি যদি আমার উম্মত হতে কাউকে খলীল হিসেবে গ্রহণ করতাম তাহলে অবশ্যই আবু বকরকে খলীল হিসেবে গ্রহণ করতাম।”

“সাবধান, তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো তাদের নবীদের কবরকে মসজিদে পরিণত করেছে। সাবধান, তোমরা কবরকে মসজিদে পরিণত করো না। আমি তোমাদেরকে এ কাজ করতে নিষেধ করছি।”

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জীবনের শেষ মুহুর্তেও এ কাজ [কবরকে মসজিদে পরিণত] করতে নিষেধ করেছেন। আর এ কাজ যারা করেছে (তাঁর কথার ধরন দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে) তাদেরকে তিনি লানত করেছেন। কবরের পাশে মসজিদ নির্মিত না হলেও সেখানে নামায পড়া রাসূল এর এ লানতের অন্তর্ভূক্ত।

خشي أن يتخذ مسجدا

এ বাণীর দ্বারা এ মর্মার্থই বুঝানো হয়েছে। সাহাবায়ে কেরাম নবীর কবরের পাশে মসজিদ বানানোর মত লোক ছিলেন না। যে স্থানকে নামাজ পড়ার উদ্দেশ্যে গ্রহণ করা হয়েছে সে স্থানকেই মসজিদ হিসেবে গণ্য করা হয়। বরং এমন প্রতিটি স্থানের নামই মসজিদ যেখানে নামায আদায় হয়। যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

جعلت لي الأرض مسجدا وطهورا

“পৃথিবার সব স্থানকেই আমার জন্য মসজিদ বানিয়ে দেয়া হয়েছে এবং পবিত্র করে দেয়া হয়েছে।” (মুসলিম)

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে ‘মারফু’ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, “জীবন্ত অবস্থায় যাদের উপর দিয়ে কিয়ামত সংঘটিত হবে, আর যারা কবরকে মসজিদে পরিণত করে তারাই হচ্ছে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট। (মুসনাদে আহমাদ, আবু হাতিম এ হাদীসটি তাঁর সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছে।)

এ অধ্যায় থেকে নিম্নে বর্ণিত বিষয়গুলো জানা যায় ঃ

১। যে ব্যক্তি নেককার ও বুজুর্গ লোকের কবরের পাশে আল্লাহর ইবাদত করার জন্য মসজিদ বানায় নিয়ত সহীহ হওয়া সত্বেও তার ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উক্তি।

২। মূর্তির ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং কঠোরতা অবলম্বন।

৩। কবরকে মসজিদ না বানানোর বিষয়টি তিনি প্রথমে কিভাবে বর্ণনা করেছেন। অতঃপর মৃত্যুর পাঁচদিন পূর্বে তিনি তা বারবার বলেছেন। তারপর কবর পূজা সম্পর্কিত কথাকে তিনি যথেষ্ট মনে করেননি। [যার ফলে মৃত্যুর পূর্বেও এ ব্যাপারে উম্মতকে সাবধান করে দিয়েছেন] অতএব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক এ ব্যাপারে অত্যাধিক গুরুত্ব প্রদানের মধ্যেই শিক্ষা ও উপদেশ নিহিত রয়েছে।

৪। নিজ কবরের অস্তিত্ব লাভের পূর্বেই তাঁর কবরের পাশে এসব কাজ অর্থাৎ কবর পূজাকে নিষেধ করেছেন।

৫। নবীদের কবর পূজা করা বা কবরকে ইবাদত খানায় পরিণত করা ইহুদী নাসারাদের রীতি-নীতি।

৬। এ জাতীয় কাজ যারা করে তাদের উপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অভিসম্পাত।

৭। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কবরের ব্যাপারে আমাদেরকে সাবধান করে দেয়া।

৮। তাঁর কবরকে উন্মুক্ত না রাখার কারণ এ হাদীসে সুস্পষ্ট।

৯। কবরকে মসজিদ বানানোর মর্মার্থ।

১০। যারা কবরকে মসজিদে পরিণত করে এবং যাদের উপর দিয়ে কিয়ামত সংঘটিত হবে এ দু’ধরনের লোকের কথা একই সাথে উল্লেখ করেছেন। অতঃপর একজন মানুষ কোন পথ অবলম্বনে শিরকের দিকে ধাবিত হয় এবং এর পরিণতি কি সেটাও উল্লেখ করেছেন।

১১। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ইন্তেকালের পাঁচ দিন পূর্বে স্বীয় খুতবায় বিদআতী লোকদের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট দু’টি দলের জবাব দিয়েছেন। কিছু সংখ্যক জ্ঞানী ব্যক্তিরা এ বিদআতীদেরকে ৭২ দলের বহির্ভূত বলে মনে করেন। এসব বিদআতীরা হচ্ছে “রাফেজী” ও জাহমিয়্যা”। এ রাফেজী দলের কারণেই শিরক এবং কবর পূজা শুরু হয়েছে। সর্বপ্রথম কবরের উপর তারাই মসজিদ নির্মাণ করেছে।

১২। মৃত্যু যন্ত্রণার মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে পরীক্ষা করা হয়েছে তা জানা যায়।

১৩। ‘খুল্লাত’ বা বন্ধুত্বের মর্যাদা ও সম্মান রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেয়া হয়েছে।

১৪। খুল্লাতই হচ্ছে মুহাব্বত ও ভালবাসার সর্বোচ্চ স্থান।

১৫। আবু বকর ছিদ্দিক রা. সর্ব শ্রেষ্ঠ সাহাবী হওয়ার ঘোষণা।

১৬। তাঁর [আবুবকর রা.] খিলাফতের প্রতি ইঙ্গিত প্রদান।

২১তম অধ্যায়ঃ

নেককার ও বুজুর্গ ব্যক্তিদের কবরের

ব্যাপারে সীমা লংঘন করলে তা তাকে

মূর্তি পূজা তথা গাইরুল্লাহর ইবাদতে

পরিণত করে

১। ইমাম মালেক র. মুয়াত্তায় বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দোয়া করেছেন।

“হে আল্লাহ আমার কবরকে এমন মূর্তিতে পরিণত করো না যার ইবাদত করা হয়। সেই জাতির উপর আল্লাহর কঠিন গজব নাযিল হয়েছে যারা নবীদের কবরগুলোকে মসজিদে পরিণত করেছে।”

২। ইবনে জারীর সুফিয়ান হতে, তিনি মানসূর হতে এবং তিনি মুজাহিদ হতে أفرأيتم اللات والعزى এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, “লাত” এমন একজন নেককার লোক ছেলেন, যিনি হজ্জ যাত্রীদেরকে “ছাতু” খাওয়াতেন। তরপর যখন তিনি মৃত্যু বরণ করলেন, তখন লোকেরা তার কবরে ইতেকাফ করতে লাগলো।

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে আবুল জাওযা একই কথা বর্ণনা করে বলেন, “লাত” হাজীদেরকে “ছাতু” খাওয়াতেন। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে,

“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবর যিয়ারত কারিনী (মহিলা) দেরকে এবং যারা কবরকে মসজিদে পরিণত করে আর (কবরে) বাতি জ্বালায় তাদেরকে অভিসম্পাত করেছেন। [আহলুস সুনান’ এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন]

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়,

১। أوثان (মূর্তি ও প্রতিমা) এর তাফসীর।

২। “ইবাদত” এর তাফসীর।

৩। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা সংঘটিত হওয়ার আশংকা করেছেন একমাত্র তা থেকেই আল্লাহর কাছে পানাহ চেয়েছেন।

৪। নবীদের কবরকে মসজিদ বানানোর বিষয়টিকে মূর্তি পূজার সাথে সম্পৃক্ত করেছেন।

৫। আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কঠিন গযব নাযিলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

৬। এটি এ অধ্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সর্ববৃহৎ মূর্তি “লাতের” ইবাদতের সূচনা কিভাবে হয়েছে তা জানা গেলো।

৭। “লাত” নামক মূর্তির স্থানটি মূলতঃ একজন নেককার লোকের কবর।

৮। “লাত” প্রকৃতপক্ষে কবরস্থ ব্যক্তির নাম। মূর্তির নামকরণের রহস্য ও উল্লেখ করা হয়েছে।

৯। কবর জিয়ারত কারিনী (মহিলা) দের প্রতি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অভিসম্পাত।

১০। যারা কবরে বাতি জ্বালায় তাদের প্রতি ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অভিসাপ।

২২ তম অধ্যায় ঃ

তাওহীদের হেফাযত ও শিরকের

সকল পথ বন্ধ করার ক্ষেত্রে নবী

মুস্তাফা (স:) এর অবদান

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“নিশ্চয়ই তোমাদের কাছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল আগমন করেছেন।” (তাওবা: ২৮)

২। সাহাবী আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

“তোমাদের ঘরগুলোকে তোমরা কবর বানিও না, আর আমার কবরকে ঈদে পরিণত করো না। আমার উপর তোমরা দরূদ পড়ো। কারণ তোমরা যেখানেই থাকোনা কেন, তোমাদের দরূদ আমার কাছে পৌঁছে যায়। (আবু দাউদ)

৩। আলী ইবনুল হুসাইন রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি একজন লোককে দেখতে পেলেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কবরের পাশে

একটি ছিদ্র পথে প্রবেশ করে সেখানে কিছু দোয়া-খায়ের করে চলে যায়। তখন তিনি ঐ লোকটিকে এধরনের কাজ নিষেধ করে দিলেন। তাকে আরো বললেন, “আমি কি তোমার কাছে সে হাদীসটি বর্ণনা করবো না, যা আমি আমর পিতার কাছ থেকে শুনেছি এবং তিনি শুনেছেন আমার দাদার কাছ থেকে, আর আমার দাদা শুনেছেন রাসূল (স:) এর কাছ থেকে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

“তোমরা আমার কবরকে ঈদে [মেলায়] পরিণত করোনা আর তোমাদের ঘরগুলোকে কবরে পরিণত করোনা। তোমরা যেখানেই থাকোনা কেন তোমাদের সালাম আমার কাছে পৌছে যায়”

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ

১। সূরা তাওবার لقد جاءكم رسول من أنفسكم আয়াতের তাফসীর।

২। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় উম্মতকে কবর পূজা তথা শিরকী গুনাহর সীমারেখা থেকে বহুদূরে রাখতে চেয়েছেন।

৩। আমাদের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মমত্ববোধ, দয়া, করুণা এবং আমদের ব্যাপারে তার তীব্র আগ্রহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

৪। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যিয়ারত সর্বোত্তম নেক কাজ হওয়া সত্বেও বিশেষ উদ্দেশ্যে তাঁর কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছেন।

৫। অধিক যিয়ারত নিষিদ্ধ করেছেন।

৬। ঘরে নফল ইবাদত করার জন্য উৎসাহিত করেছেন।

৭। “কবরস্থানে নামাজ পড়া যাবে না” এটাই সালাফে-সালেহীনের অভিমত।

৮। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কবরস্থানে নামায কিংবা দরূদ না পড়ার কারণ হচ্ছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর পঠিত দরূদ ও সালাম দূরে অবস্থান করে পড়লেও তাঁর কাছে পৌঁছানো হয়। তাই নৈকট্য লাভের আশায় কবরস্থানে দরূদ পড়ার কোন প্রয়োজন নেই।

৯। ‘আলমে বরযখে’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে তাঁর উম্মাতের আমল দরূদ ও সালামের মধ্যে পেশ করা হয়।

২৩তম অধ্যায়ঃ

মুসলিম উম্মাহর কিছু সংখ্যক লোক

মূর্তি পুজা করবে

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“আপনি কি তাদেরকে দেখেননি যাদেরকে কিতাবের কিছু অংশ দেয়া হয়েছে? তারা ‘জিবত’ এবং ‘তাগুত্কে বিশ্বাস করে। (নিসাঃ৫১)

২। আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করেছেন,

“বলো, [হে মুহাম্মদ] আমি কি সে সব লোকদের কথা জানিয়ে দেবো? যাদের পরিণতি আল্লাহর কাছে [ফাসেক লোকদের পরিণতি] এর চেয়ে খারাপ। তারা এমন লোক যাদেরকে আল্লাহ লানত করেছেন এবং যাদের উপর আল্লাহর গযব নিপতিত হয়েছে। যাদের মধ্য থেকে কিছু লোককে তিনি বানর ও শুকর বানিয়ে দিয়েছেন। তারা তাগুতের পূজা করেছে। (মায়েদাঃ ৬০)

৩। আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে এরশাদ করেছেন,

“যারা তাঁদের ব্যাপারে বিজয়ী হলো তারা বললো, আমরা অবশ্যই তাদের উপর [অর্থাৎ কবরস্থানে] মসজিদ তৈরী করবো” (কাহাফ: ২১)

৪। সাহাবী আবু সাঈদ রা. থেকে বর্ণিত আছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন,

“আমি আশংকা করছি “তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের রীতি-নীতি অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করবে [যা আদৌ করা উচিৎ নয়] এমনকি তারা যদি গুঁই সাপের গর্তেও ঢুকে যায়, তোমরাও তাতে ঢুকবে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ, তারা কি ইহুদী ও খৃষ্টান?’ জবাবে তিনি বললেন, তারা ছাড়া আর কে? (বুখারি ও মুসলিম)

৫। মুসলিম শরীফে সাহাবী ছাওবান রা. থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন,

“আল্লাহ তাআলা গোটা যমীনকে একত্রিত করে আমার সামনে পেশ করলেন। তখন আমি যমীনের পূর্ব ও পশ্চিম দিগন্ত পর্যন্ত দেখে নিলাম। পৃথিবীর ততটুকু স্থান আমাকে দেখানো হয়েছে আমার উম্মতের শাসন বা রাজত্ব যতটুকু স্থান পর্যন্ত বিস্তার লাভ করবে। লাল ও সাদা দুটি ধন ভান্ডার আমাকে দেয়া হলো আমি আমার রবের কাছে আমার উম্মতের জন্য এ আরজ করলাম, তিনি যেন আমার উম্মতকে গণ দুর্ভিক্ষের মাধ্যমে ধ্বংস না করেন এবং তাদের নিজেদেরকে ব্যতীত অন্য কোন শত্র“কে তাদের উপর বিজয়ী বা ক্ষমতাসীন করে না দেন যার ফলে সে (শত্র“) তাদের সম্পদকে হালাল মনে করবে [লুটে নিবে]। আমার রব আমাকে বললেন, হে মুহাম্মদ আমি যখন কোন বিষয়ে ফয়সালা নিয়ে ফেলি, তখন তার কোন ব্যতিক্রম হয় না। আমি তোমাকে তোমার উম্মতের জন্য এ অনুগ্রহের প্রতিশ্র“তি দিচ্ছি যে, আমি তাদের গণ দুর্ভিক্ষের মাধ্যমে ধ্বংস করবো না এবং তাদের নিজেদেরকে ছাড়া যদি সারা বিশ্ব ও তাদের বিরুদ্ধে একত্রিত হয় তবুও এমন কোন শত্র“কে তাদের উপর ক্ষমতাবান করবো না যা তাদের সম্পদকে বৈধ মনে করে লুন্ঠন করে নিয়ে যাবে যে পর্যন্ত না তারা একে অপরকে ধ্বংস করবে আর একে অপরকে বন্দী করবে।

বারকানী তাঁর সহীহ হাদীস গ্রন্থে এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তবে উক্ত বর্ণনায় নিম্নোক্ত কথাগুলো অতিরিক্ত এসেছে,

“আমি আমার উম্মতের জন্য পথভ্রষ্ট শাসকদের ব্যাপারে বেশী আশংকা বোধ করছি। একবার যদি তাদের উপর তলোয়ার উঠে তবে সে তলোয়ার কেয়ামত পর্যন্ত আর নামবে না। আর ততক্ষণ পর্যন্ত কেয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না আমার একদল উম্মত মুশরিকদের সাথে মিলিত হবে এবং যতক্ষণ না আমার উম্মতের একটি শ্রেণী মূর্তি পূজা করবে। আমার উম্মতের মধ্যে ত্রিশজন মিথ্যাবাদী অর্থাৎ ভন্ড নবীর আবির্ভাব হবে। প্রত্যেকেই নিজেকে নবী বলে দাবী করবে। অথচ আমিই হচ্ছি সর্বশেষ নবী। আমার পর কোন নবীর আগমন ঘটবে না। কেয়ামত পর্যন্ত আমার উম্মতের মধ্যে এমন একটি সাহায্য প্রাপ্ত দলের অস্তিত্ব থাকবে যাদেরকে কোন অপমানকারীর অপমান ক্ষতি করতে পারবে না। [অর্থাৎ সত্য পথ থেকে বিরত রাখতে পারবে না]

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ

১। সূরা নিসার ৫১নং আয়াতের তাফসীর।

২। সূরা মায়েদার ৬০ নং আয়াতের তাফসীর।

৩। সূরা কাহাফের ২১ নং আয়াতের তাফসীর।

৪। এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। [আর তা হচ্ছে] এখানে ‘জিবত] এবং ‘তাগুতের] প্রতি ঈমানের অর্থ কি? এটা কি শুধু অন্তরের বিশ্বাসের নাম? নাকি জিবত ও তাগুতের প্রতি ঘৃণা, ক্ষোভ এবং বাতিল বলে জানা সত্বেও এর পূজারীদের সাথে ঐকমত্য পোষণ করা বুঝায়?

৫। তাগুত পূজারীদের কথা হচ্ছে, কাফেররা তাদের কুফরী সম্পর্কে অবগত হওয়া সত্ত্বেও তারা মোমিনদের চেয়ে অধিক সত্য পথের অধিকারী।

৬। আবু সাঈদ রা. থেকে বর্ণিত হাদীসে যে ধরনের লোকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে সে ধরনের বহু সংখ্যক লোক এ উম্মতের মধ্যে অবশ্যই পাওয়া যাবে। [যারা ইহুদী খৃষ্টানদের হুবহু অনুসারী]।

৭। এ রকম সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুস্পষ্ট ঘোষণা। অর্থাৎ এ উম্মতে মুসলিমার মধ্যে বহু মূর্তি পূজারী লোক পাওয়া যাবে।

৮। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, “মুখতারের” মত মিথ্যা এবং ভন্ড নবীর আবির্ভাব। মুখতার নামক এ ভন্ডনবী আল্লাহর একত্ববাদ ও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর রিসালতকে স্বীকার করতো। সে নিজেকে উম্মতে মুহাম্মদীর অন্তর্ভূক্ত বলেও ঘোষণা করতো সে আরো ঘোষণা দিতো, রাসূল সত্য, কুরআন সত্য এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বশেষ নবী হিসেবে স্বীকৃত। এগুলোর স্বীকৃতি প্রদান সত্বেও তার মধ্যে উপরোক্ত স্বীকৃতির সুস্পষ্ট বিপরীত ও পরিপন্থী কার্যকলাপ পরিলক্ষিত হয়েছে। এ ভন্ড মুর্খও সাহাবায়ে কেরামের শেষ যুগে আবির্ভূত হয়েছিল এবং বেশ কিছু লোক তার অনুসারীও হয়েছিল।

৯। সু-সংবাদত হচ্ছে এই যে, অতীতের মতো হক সম্পূর্ণরূপে কখনো বিলুপ্ত হবে না বরং একটি দল হকের উপর চিরদিনই প্রতিষ্ঠিত থাকবে।

১০। এর সবচেয়ে বড় নিদর্শন হচ্ছে, তারা [হক পন্থীরা] সংখ্যায় কম হলেও কোন অপমানকারী ও বিরোধীতাকারী তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না।

১১। কেয়ামত পর্যন্ত উক্ত শর্ত কার্যকর থাকবে।

১২। এ অধ্যায়ে কতগুলো বড় নিদর্শনের উল্লেখ রয়েছে।

যথাঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক সংবাদ পরিবেশন যে, ‘আল্লাহ তাআলা তাঁকে বিশ্বের পূর্ব ও পশ্চিম দিগন্তের সবকিছুই একত্রিত করে দেখিয়েছেন। এ সংবাদ দ্বারা যে অর্থ বুঝিয়েছেন বাস্তবে ঠিক তাই সংঘটিত হয়েছে, যা উত্তর ও দক্ষিণের ব্যাপারে ঘটেনি। তাঁকে দু’টি ধন-ভান্ডার প্রদান করা হয়েছে এ সংবাদও তিনি দিয়েছেন।

তাঁর উম্মতের ব্যাপারে মাত্র দুটি দোয়া কবুল হওয়ার সংবাদ তিনি দিয়েছেন এবং তৃতীয় দোয়া কবুল না হওয়ার খবরও তিনি জানিয়েছেন।

তিনি এ খবরও জানিয়েছেন যে, এ উম্মতের উপরে একবার তলোয়ার উঠলে তা আর খাপে প্রবেশ করবে না। [অর্থাৎ সংঘাত শুরু হলে তা আর থামবে না]।

তিনি আরো জানিয়েছেন যে, উম্মতের লোকেরা একে অপরকে ধ্বংস করবে, একে অপরকে বন্দী করবে। উম্মতের জন্য তিনি ভ্রান্ত শাসকদের ব্যাপারে শতর্কবাণী উচ্ছারণ করেছেন।

এ উম্মতের মধ্য থেকে মিথ্যা ও ভন্ড নবী আবির্ভাবের কথা তিনি জানিয়েছেন। সাহায্য প্রাপ্ত একটি হক পন্থীদল সব সময়ই বিদ্যমান থাকার সংবাদ জানিয়েছেন।

উল্লেখিত সব বিষয়ই পরিবেশিত খবর অনুযায়ী হুবহু সংঘটিত হয়েছে। অথচ এমনটি ভবিষ্যতে সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারটি যুক্তি ও বুদ্ধির আওতাধীন নয়।

১৩। একমাত্র পথভ্রষ্ট নেতাদের ব্যাপারেই তিনি শংকিত ছিলেন।

১৪। মূর্তি পূজার মর্মার্থের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শতর্কবাণী।

২৪ তম অধ্যায় ঃ

যাদু

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“তারা অবশ্যই অবগত আছে, যে ব্যক্তি তা [যাদু] ক্রয় করে নিয়েছে, পরকালে তার কোন সুফল পাওনা নেই।” (বাকারা: ১০২)

২। আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করেছেন,

তারা ‘জিবত’ এবং ‘তাগুত’ কে বিশ্বাস করে। (নিসাঃ ৫১)

ওমর রা. বলেছেন, ‘জিবত’ হচ্ছে যাদু, আর ‘তাগুত’ হচ্ছে শয়তান।

জাবির রা. বলেছেন, ‘তাগুত’ হচ্ছে গণক। তাদের উপর শয়তান অবতীর্ণ হতো প্রত্যেক গোত্রের জন্যই একজন করে গণক নির্ধারিত ছিল।

৩। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

“তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক জিনিস থেকে বেঁচে থাকো। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন ইয়া রাসুলাল্লাহ ঐ ধবংসাত্মক জিনিসগুলো কি? তিনি জবাবে বললেন,

১। আল্লাহর সাথে শিরক করা। ২। যাদু করা। ৩। অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা যা আল্লাহ তাআলা হারাম করে দিয়েছেন। ৪। সুদ খাওয়া। ৫। এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা। ৬। যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করা। ৭। সতী সাধ্বী মোমিন মহিলাকে অপবাদ দেয়া।

৪। যুনদুব রা. থেকে ‘মারফু’ হাদীসে বর্ণিত আছে,

“যাদু করের শাস্তি হচ্ছে তলোয়ারের আঘাতে গর্দান উড়িয়ে দেয়া” [মৃত্যু দন্ড]। (তিরমিজি)

৫। সহীহ বুখারীতে বাজালা বিন আবাদাহ থেকে বর্ণিত আছে, ওমর রা. মুসলিম গভর্ণরদের কাছে পাঠানো নির্দেশনামায় লিখেছেন,

“তোমরা প্রত্যেক যাদুকর পুরুষ এবং যাদুকর নারীকে হত্যা করো।”

বাজালা বলেন, এ নির্দেশের পর আমরা তিনজন যাদুকরকে হত্যা করেছি।

৬। হাফসা রা. থেকে বর্ণিত সহীহ হাদীসে আছে, তিনি তাঁর অধীনস্ত একজন বান্দী (ক্রীতদাসী) কে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, যে দাসী তাঁকে যাদু করেছিলো। অতঃপর উক্ত নির্দেশে তাকে হত্যা করা হয়েছে। একই রকম হাদীস জুনদাব থেকে সহীহভাবে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম আহমাদ রহ. বলেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর তিনজন সাহাবী থেকে একথা সহীহ ভাবে বর্ণিত হয়েছে।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় ঃ

১। সূরা বাকারার ১০২ নং আয়াতের তাফসীর।

২। সূরা নিসার ৫১ নং আয়াতের তাফসীর।

৩। ‘জিবত’ এবং ‘তাগুত’ এর ব্যাখ্যা এবং উভয়ের মধ্যে পার্থক্য।

৪। ‘তাগুত’ কখনো জিন আবার কখনো মানুষ হতে পারে।

৫। ধ্বংসাত্মক সাতটি এমন বিশেষ বিষয়ের জ্ঞান যে ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে।

৬। যাদুকরকে কাফের ঘোষণা দিতে হবে।   

৭। তাওবার সুযোগ ছাড়াই যাদুকরকে হত্যা করতে হবে।

যদি ওমর রা. এর যুগে যাদু বিদ্যার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়, তাহলে তাঁর পরবর্তী যুগের অবস্থা কি দাঁড়াবে? [অর্থাৎ তাঁর পরবর্তী যুগে যাদু বিদ্যার প্রচলন অবশ্যই আছে।]

২৫ তম অধ্যায় ঃ

যাদু এবং যাদুর শ্রেণীভূক্ত বিষয়

১। কুতুন বিন কুবাইসা তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে এ কথা বলতে শুনেছেন,

“নিশ্চয়ই ‘ইয়াফা’, ‘তারক’ এবং ‘তিয়ারাহ’ হচ্ছে ‘জিবত’ এর অন্তর্ভূক্ত।

আউফ বলেছেন, ‘ইয়াফা’ হচ্ছে পাখি উড়িয়ে ভাগ্য গণনা করা। ‘তারক’ হচ্ছে মাটিতে রেখা টেনে ভাগ্য গণনা করা। হাসান বলেছেন, ‘জিবত’ হচ্ছে শয়তানের মন্ত্র। এ বর্ণনার সনদ সহীহ (আবু দাউদ, নাসায়ী, ইবনু হিব্বান)

২। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

“যে ব্যক্তি জ্যোতির্বিদ্যার কিছু অংশ শিখলো সে মূলতঃ যাদুবিদ্যারই কিছু অংশ শিখলো। এ [জ্যোতির্বিদ্যা] যত বাড়বে যাদু বিদ্যাও তত বাড়বে।” (আবু দাউদ)

৩। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে একটি হাদীসে বর্ণিত আছে

“যে ব্যক্তি গিরা লাগায় অতঃপর তাতে ফুঁক দেয় সে মূলতঃ যাদু করে। আর যে ব্যক্তি যাদু করে সে মূলতঃ শিরক করে আর যে ব্যক্তি কোন জিনিস [তাবিজ-কবজ] লটকায় তাকে ঐ জিনিেিসর দিকেই সোপর্দ করা হয়। (নাসায়ী)

৪। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

“আমি কি তোমাদেরকে যাদু কি-এ সম্পর্কে সংবাদ দেব না? তা হচ্ছে চোগোলখুরী বা কুৎসা রটনা করা অর্থাৎ মানুষের মধ্যে কথা-লাগানো বা বদনাম ছড়ানো।” (মুসলিম)

যাদুর শ্রেণীভূক্ত আরেকটি বিষয় অনেক মানুষের মধ্যেই পাওয়া যায়, তা হচ্ছে চোগলখুরী বা কুৎসা রটনা করা। মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি, প্রিয়জনদের অন্তরে শক্রতা সৃষ্টি।

৫। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, إن من البيان لسحرا

নিশ্চয় কোন কোন কথার মধ্যে যাদু আছে। (বুখারি ও মুসলিম)

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ

১। ‘ইয়াফা’, ‘তারক’ এবং ‘তিয়ারাহ’ জিবতের অন্তর্ভূক্ত।

২। ‘ইয়াফা’, ‘তারক’, এবং ‘তিয়ারাহ’ এর তাফসীর।

৩। জ্যোতির্বিদ্যা যাদুর অন্তর্ভুক্ত।

৪। ফুঁক সহ গিরা লাগানো যাদুর অন্তর্ভুক্ত।

৫। কুৎসা রটনা করা যাদুর শামিল।

৬। কিছু কিছু বাগ্মীতাও যাদুর অন্তর্ভূক্ত ।

২৬তম অধ্যায় ঃ

গনক

১। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এক স্ত্রী থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

“যে ব্যক্তি কোন গণকের কাছে আসল, তারপর তাকে [ভাগ্য সম্পর্কে] কিছু জিজ্ঞাসা করলো, অতঃপর গণকের কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করল, তাহলে চল্লিশ দিন পর্যন্ত তার নামাজ কবুল হবে না। (মুসলিম)

২। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

“যে ব্যাক্তি গণকের কাছে আসলো, অতঃপর গণক যা বললো তা সত্য বলে বিশ্বাস করলো, সে মূলতঃ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর যা নাযিল করা হয়েছে তা অস্বীকার করলো। (সহীহ বুখারি ও মুসলিমের শর্ত মোতাবেক হাদীসটি সহীহ। আবু দাউদ, তিরমিজি, নাসায়ী ইবনে মাজা ও হাকিম এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)।

আবু ইয়ালা ইবনে মাসউদ থেকে অনুরূপ মাউকুফ হাদীস বর্ণনা করেছেন।

৩। ইমরান বিন হুসাইন থেকে মারফু’ হাদীসে বর্ণিত আছে,

“যে ব্যক্তি পাখি উড়িয়ে ভাগ্যের ভাল-মন্দ যাচাই করলো, অথবা যার ভাগ্যের ভাল-মন্দ যাচাই করার জন্য পাখি উড়ানো হল, অথবা যে ব্যক্তি ভাগ্য গণনা করলো, অথবা যার ভাগ্য গণনা করা হলো, অথবা যে ব্যক্তি যাদু করলো অথবা যার জন্য যাদু করা হলো অথবা যে ব্যক্তি কোন গণকের কাছে আসলো অতঃপর সে [গণক] যা বললো তা বিশ্বাস করলো সে ব্যক্তি মূলতঃ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর যা নাযিল করা হয়েছে তা [কুরআন] অস্বীকার করল। (বায্যার)

[ইমাম তাবারানীও এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তবে ومن أتى থেকে হাদিসের শেষ পর্যন্ত ইমাম তাবারানী কর্তৃক বর্ণিত ইবনে আব্বাসের হাদীসে উল্লেখ নেই।

ইমাম বাগাবী (রহ:) বলেন عراف [গণক] ঐ ব্যক্তিকে বলা হয় যে ব্যক্তি চুরি যাওয়া জিনিস এবং কোন জিনিস হারিয়ে যাওয়ার স্থান ইত্যাদি বিষয় অবগত আছে বলে দাবী করে। এক বর্ণনায় আছে যে, এ ধরনের লোককেই গণক বলা হয়। মূলতঃ গণক বলা হয় এমন ব্যক্তিকে যে ভবিষ্যতের গায়েবী বিষয় সম্পর্কে সংবাদ দেয় [অর্থাৎ যে ভবিষ্যদ্বানী করে]। আবার কারো মতে যে ব্যক্তি ভবিষ্যতের গোপন খবর বলে দেয়ার দাবী করে তাকেই গণক বলা হয়।

কারো মতে যে ব্যক্তি দিলের (গোপন) খবর দেয়ার দাবী করে, সেই গণক।

আবুল আব্বাস ইবনে তাইমিয়া (রহ:) বলেছেন كاهن [গণক], منجم [জ্যোতির্বিদ], এবং رمال [বালির উপর রেখা টেনে ভাগ্য গণনাকারী] এবং এ জাতীয় পদ্ধতিতে যারাই গায়েব সম্পর্কে কিছু জানার দাবী করে তাদেরকেই আররাফ [عراف] বলে। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন, এক কওমের কিছু লোক আরবী أباجاد লিখে নক্ষত্রের দিকে দৃষ্টি দেয় এবং তা দ্বারা ভাগ্যের ভাল-মন্দ যাচাই করে। পরকালে তাদের জন্য আল্লাহর কাছে কোন ভাল ফল আছে বলে আমি মনে করি না।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় ঃ

১। গণনাকারীকে সত্য বলে বিশ্বাস করা এবং কুরআনের প্রতি ঈমান রাখা, এ দুটি বিষয় একই ব্যক্তির অন্তরে এক সাথে অবস্থান করতে পারে না।

২। ভাগ্য গণনা করা কুফরী হওয়ার ব্যাপারে সুস্পষ্ট ঘোষণা।

৩। যার জন্য গণনা করা হয়, তার উল্লেখ।

৪। পাখি উড়িয়ে ভাগ্য পরীক্ষাকারীর উল্লেখ।

৫। যার জন্য যাদু করা হয়, তার উল্লেখ।

৬। ভাগ্য গণনা করার ব্যাপারে যে ব্যক্তি “আবাজাদ” শিক্ষা করেছে তার উল্লেখ্য।

৭। ‘কাহেন, [كاهن] এবং ‘আররাফ’ [عراف] এ মধ্যে পার্থক্য।

২৭ তম অধ্যায়ঃ

নাশরাহ বা প্রতিরোধমূলক যাদু

১। সাহাবী জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নাশরাহ বা প্রতিরোধমূলক যাদু সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো। জবাবে তিনি বললেন,

“এটা হচ্ছে শয়তানের কাজ” (আহমাদ, আবু দাউদ)

আবু দাউদ বলেন, ইমাম আহমাদ (রহ:)-কে নাশরাহ [প্রতিরোধমূলক যাদু] সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো। জবাবে তিনি বলেছেন, “ইবনে মাসউদ (রাঃ) এর [নাশরাহর] সব কিছুই অপছন্দ করতেন।”

সহীহ বুখারীতে কাতাদাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত আছে, আমি ইবনুল মুসাইয়্যিবকে বললাম, “একজন মানুষের অসুখ হয়েছে অথবা তাকে তার স্ত্রীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে, এমতাবস্থায় তার এ সমস্যার সমধান করা কিংবা প্রতিরোধমূলক যাদু [নাশরাহ] এর মাধ্যমে চিকিৎসা করা যাবে কি? তিনি বললেন, ‘এতে কোন দোষ নেই।’ কারণ তারা এর [নাশরাহ] দ্বারা সংশোধন ও কল্যাণ সাধন করতে চায়। যা দ্বারা মানুষের কল্যাণ ও উপকার সাধিত হয় তা নিষিদ্ধ নয়।”

হাসান (রাঃ) থেকে বর্নিত আছে তিনি বলেন,

لا يحل السحر إلا الساحر “একমাত্র যাদুকর ছাড়া অন্য কেউ যাদুকে হালাল মনে করে না।”

ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, النشرة حل السحر عن المسحور

‘নাশারাহ’ হচ্ছে যাদুকৃত ব্যক্তি বা বস্তুর উপর থেকে যাদুর প্রভাব দূর করা।

নাশরাহ দু’ধরনের :

প্রথমটি হচ্ছে, যাদুকৃত ব্যক্তি বা বস্তুর উপর হতে যাদুর ক্রিয়া নষ্ট করার জন্য অনুরূপ যাদু দ্বারা চিকিৎসা করা। আর এটাই হচ্ছে শয়তানের কাজ। হাসান বসরী (রহ:) এর বক্তব্য দ্বারা এ কথাই বুঝানো হয়েছে। এক্ষেত্রে নাশের [যাদুর চিকিৎসক] ও মুনতাশার [যাদুকৃত রোগী] উভয়ই শয়তানের পছন্দনীয় কাজের মাধ্যমে শয়তানের নিকটবর্তী হয়। যার ফলে শয়তান যাদুকৃত রোগীর উপর থেকে তার প্রভাব মিটিয়ে দেয়।

দ্বিতীয়টি হচ্ছে, ঝাড়-ফুঁক, বিভিন্ন ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ,ঔষধ-পত্র প্রয়োগ ও শরীয়ত সম্মত দোয়া ইত্যাদির মাধ্যমে চিকিৎসা করা এ ধরনের চিকিৎসা জায়েয।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ

১। নাশরাহ (প্রতিরোধমূলক যাদু) এর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ।

২। নিষিদ্ধ বস্তু ও অনুমতি প্রাপ্ত বস্তুর মধ্যে পার্থক্য করণ, যাতে সন্দেহ মুক্ত হওয়া যায়।

২৮ তম অধ্যায়ঃ

কুলক্ষণ সম্পর্কীয় বিবরণ

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“মনে রেখো, আল্লাহর কাছেই রয়েছে তাদের কুলক্ষণসমূহের চাবিকাঠি। কিন্তু তাদের অধিকাংশ লোকই তা বুঝে না। (আরাফ: ১৩১)

২। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন .

“তারা বললো, তোমাদের দুর্ভাগ্য তোমাদের সাথেই রয়েছে।” (ইয়াসিন : ১৯)

৩। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্নিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

لا عدوى ولا طيرة، ولا هامة ولا صفر، (أخرحاه)

“দ্বীন ইসলামে সংক্রামক ব্যাধি, কুলক্ষণ বা দুর্ভাগ্য, কথার কুলক্ষণ বলতে কিছুই নেই।” (বুখারি ও মুসলিম)

[মুসলিমের হাদীসে ‘নক্ষত্রের প্রভাবে বৃষ্টিপাত, রাক্ষস বা দৈত্য বলতে কিছুই নেই’ এ কথাটুকু অতিরিক্ত আছে]

বুখারি ও মুসলিমে আনাস (রাঃ) থেকে আরো বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

“ইসলামে সংক্রামক ব্যাধি আর কুলক্ষণ বলতে কিছুই নেই। তবে ‘ফাল’ আমাকে অবাক করে [অর্থাৎ আমার কাছে ভাল লাগে।] সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘ফাল’ কি জিনিস? জবাবে তিনি বললেন, ‘উত্তম কথা’। [যে কথা শিরকমুক্ত]

৫। উকবা বিন আমের (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, কুলক্ষণ বা দূর্ভাগ্যের বিষয়টি রাসূল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দরবারে উল্লেখ করা হলো। জবাবে তিনি বললেন,

এগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছে ‘ফাল’। কুলক্ষণ কোন মুসলমানকে স্বীয় কর্তব্য পালনে বাধাগ্রস্ত করতে পারে না। তোমাদের কেউ যদি অপছন্দনীয় কোন কিছু প্রত্যক্ষ করে তখন সে যেন বলে,

“হে আল্লাহ তুমি ছাড়া কেউ কল্যাণ দিতে পারে না। তুমি ছাড়া কেউ অকল্যাণ ও দূরাবস্থা দূর করতে পারে না। ক্ষমতা ও শক্তির আধার একমাত্র তুমিই।” (আবু দাউদ)

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে ‘মারফু’ হাদীসে বর্ণিত আছে, পাখি উড়িয়ে ভাগ্য গণনা করা শেরেকী কাজ, পাখি উড়িয়ে লক্ষণ নির্ধারণ করা শেরেকী কাজ, একাজ আমাদের নয়। আল্লাহ তাআলা তাওয়াক্কুলের মাধ্যমে মুসলিমের দুশ্চিন্তাকে দূর করে দেন। (আবু দাউদ, তিরমিজী)

৭। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, ‘কুলক্ষণ বা দুর্ভাগ্যের ধারণা যে ব্যক্তিকে তার স্বীয় প্রয়োজন, দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে দূরে রাখলো, সে মূলতঃ শিরক করলো। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, এর কাফ্ফারা কি? উত্তরে তিনি বললেন, তোমরা এ দোয়া পড়বে,

“হে আল্লাহ, তোমার মঙ্গল ব্যতীত কোন মঙ্গল নেই। তোমার অকল্যাণ ছাড়া কোন অকল্যাণ নেই। আর তুমি ছাড়া কোন ইলাহ নেই। (আহমদ)

৮। ফজল বিন আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে طيرة [তিয়ারাহ] অর্থাৎ কুলক্ষণ হচ্ছে এমন জিনিস যা তোমাকে কোন অন্যায় কাজের দিকে ধাবিত করে অথবা কোন ন্যায় কাজ থেকে তোমাকে বিরত রাখে।” (আহমাদ)

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় ঃ

১। ألا إنما طائرهم عند الله [জেনে রেখো তাদের দুর্ভাগ্য আল্লাহর কাছে নিহিত] এবং طائركم معكم [তোমাদের দুর্ভাগ্য তোমাদের সাথেই রয়েছে] এ আয়াত দু’টির ব্যাপারে সতর্কীকরণ।

২। সংক্রামক রোগের অস্বীকৃতি।

৩। কুলক্ষণের অস্বীকৃতি।

৪। দুর্ভাগ্যের ব্যাপারে অস্বীকৃতি [অর্থাৎ দুর্ভাগ্য বলতে ইসলামে কোন কিছু নেই]       

৫। কুলক্ষণ ‘সফর’ এর অস্বীকৃতি জ্ঞাপন [অর্থাৎ কুলক্ষণে ‘সফর মাস’ বলতে কিছুই নেই। জাহেলী যুগে সফর মাসকে কুলক্ষুণ মনে করা হতো, ইসলাম এ ধারণাকে বাতিল ঘোষণা করেছে।]

৬। ‘ফাল’ উপরোক্ত নিষিদ্ধ বা অপছন্দনীয় জিনিসের অন্তর্ভূক্ত নয়। বরং এটা মোস্তাহাব।

৭। ‘ফাল’ এর ব্যাখ্যা।

২৯ তম অধ্যায়ঃ

জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কীয়

শরিয়তের বিধান

ইমাম বুখারি (রহ:) তাঁর সহীহ গ্রন্থে বলেছেন, কাতাদাহ (রাঃ) বলেছেন, “আল্লাহ তাআলা এসব নক্ষত্ররাজিকে তিনটি উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন, আকাশের সৌন্দর্যের জন্য, আঘাতের মাধ্যমে শয়তান বিতাড়নের জন্য এবং [দিক ভ্রান্ত পথিকদের] নিদর্শন হিসেবে পথের দিশা পাওয়ার জন্য। যে ব্যক্তি এ উদ্দেশ্য ছাড়া এর ভিন্ন ব্যাখ্যা দিবে সে ভুল করবে এবং তার ভাগ্য নষ্ট করবে। আর এমন জটিল কাজ তার ঘাড়ে নিবে যে সম্পর্কে তার কোন জ্ঞানই থাকবে না।”

কাতাদাহ (রাঃ) চাঁদের কক্ষ সংক্রান্ত বিদ্যার্জন অর্থাৎ জ্যোতির্বিদ্যা অপছন্দ করতেন। আর উ’য়াইনা এ বিদ্যার্জনের অনুমতি দেননি। উভয়ের কাছ থেকে হারব (রহ:) একথা বর্ণনা করেছেন।

ইমাম আহমদ এবং ইসহাক (রহ:) [চাদের] কক্ষপথ জানার অনুমতি দিয়েছেন।

আবু মূসা আশআরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

তিন শ্রেণীর লোক জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না,

১। মাদকাসক্ত ব্যক্তি ২। আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী এবং ৩। যাদুর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী। (আহমাদ, ইবনু হিব্বান)

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ

১। নক্ষত্র সৃষ্টির রহস্য।

২। নক্ষত্র সৃষ্টির ভিন্ন উদ্দেশ্য বর্ণনাকারীর সমুচিত জবাব প্রদান।

৩। কক্ষ সংক্রান্ত বিদ্যার্জনের ব্যাপারে মতভেদের উল্লেখ।

৪। যাদু বাতিল জানা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি যাদুর অন্তর্ভুক্ত সামান্য জিনিসেও বিশ্বাস করবে, তার প্রতি কঠোর হুশিয়ারী।

৩০ তম অধ্যায় ঃ

নক্ষত্রের ওসীলায় বৃষ্টি

কামনা করা

১। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন,

“তোমরা [নক্ষত্রের মধ্যে তোমাদের] রিজিক নিহত আছে মনে করে আল্লাহর নেয়ামতকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছো।” (ওয়াকেয়া . ৮২)

২। আবু মালেক আশআ’রী (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

‘জাহেলী যুগের চারটি কুস্বভাব আমার উম্মতের মধ্যে বিদ্যমান থাকবে, যা তারা পুরোপুরি পরিত্যাগ করতে পারবেনা। এক : আভিজাত্যের অহংকার করা। দুই : বংশের বদনাম গাওয়া। তিন : নক্ষত্রের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি কামনা করা এবং চার : মৃত ব্যাক্তির জন্য বিলাপ করা।

তিনি আরো বলেন, ‘মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপ কারিনী তার মৃত্যুর পূর্বে যদি তাওবা না করে, তবে কেয়ামতের দিন তেল চিট-চিটে জামা আর মরিচা ধরা বর্ম পরিধান করে উঠবে।’ (মুসলিম)

৩। ইমাম বুখারি ও মুসলিম যায়েদ বিন খালেদ (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, ‘তিনি বলেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হুদাইবিয়াতে আমাদেরকে নিয়ে ফজরের নামাজ পড়লেন। সে রাতে আকাশটা মেঘাচ্ছন্ন ছিলো।’ নামাজান্তে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকদের দিকে ফিরে বললেন,

“তোমরা কি জানো তোমাদের প্রভু কি বলেছেন? লোকেরা বললো, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন।’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহ বলেছেন, আমার বান্দাদের মধ্যে কেউ আমার প্রতি ঈমানদার হিসেবে আবার কেউ কাফের হিসেবে সকাল অতিবাহিত করলো। যে ব্যক্তি বলেছে, ‘আল্লাহর ফজল ও রহমতে বৃষ্টি হয়েছে, সে আমার প্রতি ঈমান এনেছে আর নক্ষত্রকে অস্বীকার করেছে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি বলেছে, ‘অমুক অমুক নক্ষত্রের ‘ওসীলায়’ বৃষ্টিপাত হয়েছে, সে আমাকে অস্বীকার করেছে আর নক্ষত্রের প্রতি ঈমান এনেছে।”

ইমাম বুখারি ও মুসলিম আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এ অর্থেই হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাতে এ কথা আছে যে, কেউ কেউ বলেছেন, ‘অমুক অমুক নক্ষত্র সত্য প্রমাণিত হয়েছে।’ তখন আল্লাহ তাআলা আয়াত নাযিল করেন,

“আমি নক্ষত্র রাজির [অস্তমিত হওয়ার] স্থানসমূহের কসম করে বলছি, …. তোমরা মিথ্যাচারিতায় মগ্ন রয়েছো।” (ওয়াকিয়া : ৭৫-৮২)

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় ঃ

১। সূরা ওয়াকেয়ার উল্লেখিত আয়াতের তাফসীর।

২। জাহেলী যুগের চারটি স্বভাবের উল্লেখ।

৩। উল্লেখিত স্বভাবগুলোর কোন কোনটির কুফরী হওয়া উল্লেখ।

৪। এমন কিছু কুফরী আছে যা মুসলিম মিল্লাত থেকে একে বারে নিঃশ্চি‎হ্ন হবে না।

৫। ‘বান্দাদের মধ্যে কেউ আমার প্রতি বিশ্বাসী আবার কেউ অবিশ্বাসী হয়েছে’ এ বাণীর উপলক্ষ হচ্ছে আল্লাহ তাআলার নেয়ামত [বৃষ্টি] নাযিল হওয়া।

৬। এ ব্যাপারে ঈমানের জন্য মেধা ও বিচক্ষণতা প্রয়োজন।

৭। এ ক্ষেত্রে কুফরী থেকে বাঁচার জন্য বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার প্রয়োজন।

৮। لقد صدق نوء كذا وكذا [অমুক অমুক নক্ষত্রের প্রভাব সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে] এর মর্মার্থ বুঝতে হলে জ্ঞান-বুদ্ধি প্রয়োজন।

৯। তোমরা জানো কি ‘তোমাদের রব কি বলেছেন?’ এ কথা দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় যে, কোন বিষয় শিক্ষাদানের জন্য শিক্ষক ছাত্রকে প্রশ্ন করতে পারেন।

১০। মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপকারিণীর জন্য কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারণ।

৩১ তম অধ্যায় ঃ

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“মানুষের মধ্যে এমন মানুষও রয়েছে যারা আল্লাহ ব্যতীত অপরকে সদৃশ স্থির করে, আল্লাহকে ভালবাসার ন্যায় তাদেরকে ভালবাসে।”। (বাকারা : ১৬৫)

২। আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করেছেন,

“হে রাসূল, আপনি বলে দিন, ‘যদি তোমাদের মাতা-পিতা, সন্তান-সন্ততি, ভাই-বোন, তোমাদের স্ত্রী, আত্মীয়-স্বজন, তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ঐ ব্যবসা যার লোকসান হওয়াকে তোমরা অপছন্দ করো, তোমাদের পছন্দনীয় বাড়ী-ঘর, তোমাদের নিকট আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং তাঁরই পথে জিহাদ করার চেয়ে বেশী প্রিয় হয়, তাহলে তোমরা আল্লাহর চূড়ান্ত ফায়সালা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো।” (তাওবা : ২৪)

৩। সাহাবী আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

“তোমাদের মথ্যে ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার সন্তান-সন্ততি, পিতা-মাতা এবং সমস্ত মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হই।” (বুখারি ও মুসলিম)

৪। আনাস (রাঃ) থেকে আরো বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

“যার মধ্যে তিনটি জিনিস বিদ্যমান আছে সে ব্যক্তি এগুলো দ্বারা

ঈমানের স্বাদ অনুভব করতে পেরেছে। এক : তার কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সর্বাধিক প্রিয় হওয়া। দুই : একমাত্র আল্লাহ তাআলার [সন্তুষ্টি লাভের] জন্য কোন ব্যক্তিকে ভালবাসা। তিন : আল্লাহ তাআলা তাকে কুফরী থেকে উদ্ধার করার পর পূনরায় কুফরীর দিকে প্রত্যাবর্তন করা তার কাছে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতই অপছন্দনীয় হওয়া।

অন্য একটি বর্ণনায় আছে لا يجد أحد حلاوة الإيمان حتى

অর্থাৎ কেউ ঈমানের স্বাদ পাবে না যতক্ষণ না …. (হাদিসের শেষ পর্যন্ত।]

৬। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসে, আল্লাহর উদ্দেশ্যেই ঘৃণা করে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে বন্ধুত্ব স্থাপন করে, আল্লাহর জন্যই শত্র“তা পোষণ করে; সে ব্যক্তি এ বৈশিষ্ট্যের দ্বারা নিশ্চয়ই আল্লাহর বন্ধুত্ব লাভ করবে। আর এ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হওয়া ব্যতীত নামায রোজার পরিমাণ যত বেশীই হোক না কেন, কোন বান্দাই ঈমানের স্বাদ অনুভব করতে পারবে না।

সাধারণতঃ মানুষের মধ্যে পরস্পারিক ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে পার্থিব স্বার্থ। এ জাতীয় ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের দ্বারা কোন উপকার সাধিত হয় না। (ইবনে জারীর)

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন وتقطعت بهم الأسباب

অর্থাৎ তাদের সম্পর্ক বিছিন্ন হয়ে যাবে। এ সম্পর্ক হচ্ছে বন্ধুত্ব ও ভালবাসার সম্পর্ক।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় ঃ

১। সূরা বাকারার ১৬ নং আয়াতের তাফসীর।

২। সূরা তাওবার ২৪ নং আয়াতের তাফসীর।

৩। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি ভালবাসাকে জীবন, পরিবার ও ধন-সম্পদের উপর অগ্রাধিকার দেয়া ওয়াজিব।

৪। কোন কোন বিষয় এমন আছে যা ঈমানের পরিপন্থী হলেও এর দ্বারা ইসলামের গন্ডি থেকে বের হয়ে যাওয়া বুঝায় না। [এমতাবস্থায় তাকে অপূর্ণাঙ্গ মোমিন বলা যেতে পারে]।

৫। ঈমানের একটা স্বাদ আছে। মানুষ কখনো এ স্বাদ অনুভব করতেও পারে, আবার কখনো অনুভব নাও করতে পারে।

৬। অন্তরের এমন চারটি আমল আছে যা ছাড়া আল্লাহর বন্ধুত্ব ও নৈকট্য লাভ করা যায় না, ঈমানের স্বাদ ও অনুভব করা যায় না।

৭। একজন প্রখ্যাত সাহাবী দুনিয়ার এ বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পেরেছিল যে, পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব সাধারণত গড়ে উঠে পার্থিব বিষয়ের ভিত্তিতে।

৮। وتقطعت بهم الأسباب এর তাফসীর।

৯। মুশরিকদের মধ্যেও এমন লোক রয়েছে যারা আল্লাহকে খুব ভালবাসে [কিন্তু শিরকের কারণে এ ভালবাসা অর্থহীন।]

১০। যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করে এবং ঐ শরীককে আল্লাহকে ভালবাসার মতই ভালবাসে সে শিরকে আকবার অর্থাৎ বড় ধরনের শিরক করলো।

৩২ তম অধ্যায় ঃ

আল্লাহর ভয়

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“এরা হলো শয়তান, যারা তোমাদেরকে তার বন্ধুদের (কাফের বেঈমান) দ্বারা ভয় দেখায়। তোমরা যদি প্রকৃত মোমেন হয়ে থাকো। তাহলে তাদেরকে [শয়তানের সহচারদেরকে] ভয় করো না বরং আমাকে ভয় করো।” (আল ইমরান . ১৭৫)

২। আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করেছেন,

“আল্লাহর মসজিদগুলোকে একমাত্র তারাই আবাদ করতে পারে যারা আল্লাহ এবং আখেরাতের প্রতি ঈমান রাখে, নামাজ কায়েম করে, যাকাত

আদায় করে এবং একমাত্র আল্লাহকে ছাড়া আর কাউকে ভয় করে না।” (তাওবা : ১৮)

৩। আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে এরশাদ করেছেন,

“মানুষের মধ্যে এমন কিছু মানুষ আছে যারা বলে, আমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি। এরপর যখন আল্লাহর পথে তারা দুঃখ কষ্ট পায় তখন মানুষের চাপানো দুঃখ কষ্টের পরীক্ষাকে তারা আল্লাহর আযাবের সমতূল্য মনে করে।” (আনকাবূত : ১০)

৪। আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে ‘মারফু’ হাদীসে বর্ণিত আছে, ঈমানের দুর্বলতা হচ্ছে আল্লাহ তাআলাকে অসন্তুষ্ট করে মানুষকে সন্তুষ্ট করা, আল্লাহর রিযিক ভোগ করে মানুষের গুণগান করা, তোমাকে আল্লাহ যা দান করেননি তার ব্যাপারে মানুষের বদনাম করা। কোন লোভীর লোভ আল্লাহর রিযিক টেনে আনতে পারে না। আবার কোন ঘৃণা কারীর ঘৃণা আল্লাহর রিযিক বন্ধ করতে পারে না।

৫। আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

            “যে ব্যক্তি মানুষকে নারাজ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি চায়, তার উপর আল্লাহর সন্তুষ্ট থাকেন, আর মানুষকেও তার প্রতি সন্তুষ্ট করে দেন।

 পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহকে নারাজ করে মানুষের সন্তুষ্টি চায়, তার উপর আল্লাহও অসন্তুষ্ট হন এবং মানুষকেও তার প্রতি অসন্তুষ্ট করে দেন। (ইবনে হিব্বান)

এ অধ্যায় থেকে নিম্ন বর্ণিত বিষয়গুলো জানা যায় :

১। সূরা আল-ইমরানের ১৭৫ নং আয়াতের তাফসীর।

২। সূরা তাওবার ১৮ নং আয়াতের তাফসীর।

৩। সূরা আনকাবুতের ১০ নং আয়াতের তাফসীর।

৪। ঈমান শক্তিশালী হওয়া আবার দূর্বল হওয়া সংক্রান্ত কথা।

৩৩তম অধ্যায় .

তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর

উপর ভরসা

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“তোমরা যদি মুমিন হয়ে থাকো, তাহলে একমাত্র আল্লাহর উপরই ভরসা করো।” (মায়েদা : ২৩)

২। আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করেছেন,

“একমাত্র তারাই মোমিন যাদের সামনে আল্লাহর কথা স্মরণ করা হলে তাদের অন্তরে ভয়ের সঞ্চার হয়।” (আনফাল . ২)

“ যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে তার জন্য আল্লাহ তাআলাই যথেষ্ট।” (সূরা তালাক . ৩)

৪। ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,

حسبنا الله ونعم الوكيل এ কথা ইবরাহীম (আঃ) তখন বলেছিলেন, যখন তাঁকে অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করা হয়েছিলো। আর মুহাম্মদ (স:) একথা বলেছিলেন তখন, যখন তাঁকে বলা হলো,

“লোকেরা আপনাদের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী বাহিনী জড়ো করেছে। অতএব তাদেরকে ভয় করুন। তখন তাঁদের ঈমান আরো বৃদ্ধি গেলো”। (আল-ইমরান: ১৭৩)।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় .

১। আল্লাহর উপর ভরসা ফরজ।

২। আল্লাহর উপর ভরসা করা ঈমানের শর্ত।

৩। সূরা আনফালের ২নং আয়াতের ব্যাখ্যা।

৪। আয়াতটির তাফসীর, শেষাংশেই রয়েছে।

৫। সূরা তালাকের ৩ নং আয়াতের তাফসীর।

৬। حسبنا لله نعم الوكيل কথাটি ইবরাহীম (আঃ) ও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল¬াম বিপদের সময় বলার কারণে এর গুরুত্ব ও মর্যাদা।

৩৪ তম অধ্যায় .

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“তারা কি আল্লাহর পাকড়াও থেকে বাঁচার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত [নির্ভয়] হয়ে গেছে? বস্তুতঃ আল্ল¬াহর পাকড়াও থেকে বাঁচার ব্যাপারে একমাত্র

হতভাগ্য ক্ষতিগ্রস্ত ছাড়া অন্য কেউ ভয়-হীন হতে পারে না।” (আরাফঃ ৯৯)।

২। আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করেছেন,

“একমাত্র পথভ্রষ্ট লোকেরা ছাড়া স্বীয় রবের রহমত থেকে আর কে নিরাশ হতে পারে? (সূরা হিজর : ৫৬)

৩। ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্নিত আছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল¬ামকে কবীরা গুনাহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জবাবে বলেছেন, ‘কবীরা গুনাহ হচ্ছে .

“আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা, আল্ল¬াহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া এবং আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিজেকে নিরাপদ মনে করা।”

৪। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেছেন,

“সবচেয় বড় গুনাহ হচ্ছে : আল্লাহর শাস্তি হতে নিজেকে নিরাপদ মনে করা, আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হওয়া এবং আল্লাহর করুণা থেকে নিজেকে বঞ্চিত মনে করা।”

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় .

১। সূরা আ’রাফের ৯৯নং আয়াতের তাফসীর।

২। সূরা হিজরের ৫৬ নং আয়াতের তাফসীর।

৩। আল্ল¬াহর পাকড়াও থেকে ভয়হীন ব্যক্তির জন্য কঠোর শাস্তির ভয় প্রদর্শন।

৩৫তম অধ্যায় .

তাকদীরের [ফায়সালার] উপর ধৈর্য

ধারণ করা ঈমানের অঙ্গ

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ঈমান আনে, তার অন্তরকে তিনি হেদায়াত দান করেন।” (তাগাবুনঃ ১১)

২। আলকামা (রাঃ) বলেছেন, ঐ ব্যক্তিই মোমিন, যে ব্যক্তি বিপদ আসলে মনে করে তা আল্ল¬াহর পক্ষ থেকে এসেছে। এর ফলে সে বিপদগ্রস্থ হয়েও সন্তুষ্ট থাকে এবং বিপদকে খুব সহজেই স্বীকার করে নেয়।

৩। সহীহ মুসলিমে আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্নিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল¬াম এরশাদ করেছেন,

“মানুষের মধ্যে এমন দু’টি [খারাপ] স্বভাব রয়েছে যার দ্বারা তাদের কুফরী প্রকাশ পায়। একটি হচ্ছে, বংশ উলে¬খ করে খোটা দেয়া, আর একটি হচ্ছে মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপ করা।”

৪। ইমাম বুখারি ও মুসলিম ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে মারফু হাদীসে বর্ণনা করেন,

“আল্লাহ তা’আলা যখন তাঁর কোন বান্দার মঙ্গল করতে চান, তখন তাড়াতাড়িকরে দুনিয়াতেই তার [অপরাধের] শাস্তি দিয়ে থাকেন। পক্ষান্তরে তিনি যখন তাঁর কোন বান্দার অমঙ্গল করতে চান, তখন দুনিয়াতে তার পাপের শাস্তি দেয়া থেকে বিরত থাকনে, যেন কেয়ামতের দিন তাকে পুরো শাস্তি দিতে পারেন।

৫। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল¬াম এরশাদ করেছেন,

“পরীক্ষা যত কঠিন হয়, পুরস্কার তত বড় হয।” আল্লাহ তা’আলা যখন কোন জাতিকে ভালবাসেন, তখন সে জাতিকে তিনি পরীক্ষা করেন। এতে যে ব্যক্তি সন্তুষ্টি থাকে, তার উপর আল্লাহ ও সন্তুষ্ট থাকেন। আর যে ব্যক্তি অসন্তুষ্ট হয়, তার প্রতি আল্লাহও অসন্তুষ্ট থাকেন। (তিরমিজি)

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় .

১। সূরা তাগাবুন এর ১১ নং আয়াতের তাফসীর।

২। বিপদে ধৈর্য ধারণ ও আল্ল¬াহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকা ঈমানের অঙ্গ।

৩। কারো বংশের প্রতি অপবাদ দেয়া বা দুর্নাম করা কুফরীর শামিল।

৪। যে ব্যক্তি মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপ করে, গাল- চাপড়ায়, জামার আস্তিন ছিঁড়ে ফেলে এবং জাহেলী যুগের কোন রীতি নীতির প্রতি আহবান জানায়, তার প্রতি কঠোর শাস্তির ভয় প্রদর্শন।

৫। বান্দার মঙ্গলের প্রতি আল্লাহর ইচ্ছার নিদর্শন।

৬। বান্দার প্রতি আল্ল¬াহর অমঙ্গলেচ্ছার নিদর্শন।

৭। বান্দার প্রতি আল্ল¬াহর ভালবাসার নিদর্শন।

৮। আল্লাহর প্রতি অসন্তুষ্ট হওয়া হারাম।

৯। বিপদে আল্ল¬াহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকার সওয়াব।

৩৬তম অধ্যায় .

রিয়া (প্রদর্শনেচ্ছা) প্রসংগে

শরিয়তের বিধান

আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“[ হে মুহাম্মদ], আপনি বলে দিন, আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ। আমার নিকট এ মর্মে অহী পাঠানো হয় যে, তোমাদের ইলাহই একক ইলাহ।” (কাহাফ: ১১০)

২। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে ‘মারফু’ হাদীসে বর্ণিত আছে, আল্লাহ তাআলা বলেন,

“আমি অংশীদারদের শিরক (অর্থাৎ অংশিদারিত্ব) থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। যে ব্যক্তি কোন কাজ করে ঐ কাজে আমার সাথে অন্য কাউকে শরিক করে, আমি [ঐ] ব্যক্তিকে এবং শিরককে [অংশীদারকে ও অংশিদারিত্বকে] প্রত্যাখ্যান কির।” (মুসলিম)

৩। আবু সাঈদ (রাঃ) থেকে অন্য এক ‘মারফু’ হাদীসে বর্ণিত আছে,

“আমি কি তোমাদের এমন বিষয়ে সংবাদ দেব না? যে বিষয়টি আমার কাছে ‘মসীহ দাজ্জালের’ চেয়েও ভয়ঙ্কর?” সাহাবায়ে কেরাম বললেন, হাঁ। তিনি বললেন, ‘তা হচ্ছে ‘শিরকে খফী’ বা গুপ্ত শিরক। । [আর এর উদাহরণ হচ্ছে] একজন মানুষ দাঁড়িয়ে শুধু এ জন্যই তার নামাজকে খুব সুন্দরভাবে আদায় করে যে, কোন মানুষ তার নামাজ দেখছে [বলে সে মনে করছে]। (আহমাদ)

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় .

১। সূরা কাহাফের ১১০ নং আয়াতের তাফসীর।

২। নেক আমল প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে মারাত্মক ত্র“টি হচ্ছে উক্ত নেক কাজ করতে গিয়ে আল্লাহ ছাড়ও অন্যকে খুশী করার নিয়ত।

৩। এর [অর্থাৎ শিরক মিশ্রিত নেক আমল প্রত্যাখ্যাত হওয়ার] অনিবার্য কারণ হচ্ছে, আল্লাহর কারো মুখাপেক্ষী না হওয়া। [এ জন্য গাইরুল¬াহ মিশ্রিত কোন আমল তাঁর প্রয়োজন নেই।]

৪। আরো একটি কারণ হচ্ছে, আল্লাহ তাআলার সাথে যাদেরকে শরিক করা হয়, তাদের সকলের চেয়ে আল্লাহ বহুগুণে উত্তম।

৫। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল¬াম এর অন্তরে রিয়ার ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামের উপর ভয় ও আশংকা।

৬। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল¬াম রিয়ার ব্যাখ্যা এভাবে দিয়েছেন যে, একজন মানুষ মূলত নামাজ আদায় করবে আল্ল¬াহরই জন্যে। তবে নামাজকে সুন্দরভাবে আদায় করবে শুধু এজন্য যে, সে মনে করে কোন মানুষ তার নামাজ দেখছে।

৩৭তম অধ্যায় .

নিছক পার্থিব স্বার্থে কোন

কাজ করা শিরক

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“যারা শুধু দুনিয়ার জীবন এবং এর চাকচিক্য কামনা করে, আমি তাদের সব কাজের প্রতিদান দুনিয়াতেই দিয়ে থাকি।” (হুদ : ১৫-১৬)

২। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে রাসূল (স:) এরশাদ করেছেন,

“দীনার ও দেরহাম অর্থাৎ টাকা-পয়সার পূজারীরা ধ্বংস হোক। রেশম পূজারী [পোষাক- বিলাসী] ধ্বংস হোক। তাকে দিতে পারলেই খুশী হয়, না দিতে পারলে রাগান্বিত হয়। সে ধ্বংস হোক, তার আরো খারাপ হোক, কাঁটা-ফুটলে সে তা খুলতে সক্ষম না হয় [অর্থাৎ সে বিপদ থেকে উদ্ধার না পাক।] সে বান্দা সৌভাগ্যের অধিকারী যে আল্লাহর রাস্তায় তার ঘোড়ার লাগাম ধরে রেখেছে, মাথার চুলগুলোকে এলো-মেলো করেছে আর পদযুগলকে করেছে ধূলিমলিন। তাকে পাহারার দায়িত্ব দিলে সে পাহারাতেই লেগে থাকে। সেনাদলের শেষ ভাগে তাকে নিয়োজিত করলে সে শেষ ভাগেই লেগে থাকে। সে অনুমতি চাইলে তাকে অনুমতি দেয়া হয় না। তার ব্যাপারে সুপারিশ করলে তার সুপারিশ গৃহীত হয় না।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ

১। আখেরাতের আমল দ্বারা মানুষের দুনিয়া হাসিলের ইচ্ছা।

২। সূরা হুদের ১৫ ও ১৬ নং আয়াতের তাফসীর।

৩। একজন মুসিলমকে দিনার- দেরহাম ও পোষাকের বিলাসী হিসেবে আখ্যায়িত করা।

৪। উপরোক্ত বক্তব্যের ব্যাখ্যা হচ্ছে, বান্দাহকে দিতে পারলেই খুশী হয়, না দিতে পারলে অসন্তুষ্ট হয়। এ ধরনের লোক দুনিয়াদার।

৫। দুনিয়াদারকে আল্ল¬াহর নবী এ বদদোয়া করেছেন, “সে ধ্বংস হোক, সে অপমানিত হোক বা অপদস্ত হোক।”

৬। দুনিয়াদারকে এ বলেও বদদোয়া করেছেন, “তার গায়ে কাঁটা ফুটুক এবং তা সে খুলতে না পারুক।”

৭। হাদীসে বর্ণিত গুণাবলীতে গুণান্বিত মুজাহিদের প্রশংসা করা হয়েছে। সে সৌভাগ্যের অধিকারী বলে জানান হয়েছে।

৩৮তম অধ্যায় .

যে ব্যাক্তি আল্লাহর হালালকৃত জিনিস

হারাম এবং হারামকৃত জিনিসকে

হালাল করার ব্যাপারে [অন্ধভাবে],

আলেম, বজুর্গ ও নেতাদের আনুগত্য

করলো, সে মূলত তাদেরকে রব

হিসেবে গ্রহণ করলো

১। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন,

“তোমাদের উপর আকাশ থেকে পাথর বর্ষিত হওয়ার সময় প্রায় ঘনিয়ে এসেছে। কারণ, আমি বলছি, “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল¬াম বলেছেন।” অথচ তোমরা বলছো, “আবুবকর এবং ওমর (রাঃ) বলেছেন।”

২। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রাঃ) বলেছেন, “ঐ সব লোকদের ব্যাপারে আমার কাছে খুবই অবাক লাগে, যারা হাদিসের সনদ ও ‘সিহহাত’ [বিশুদ্ধতা] অর্থাৎ হাদিসের পরস্পরা ও সহীহ হওয়ার বিষয়টি জানার পরও সুফইয়ান সওরীর মতামতকে গ্রহণ করে। অথচ আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“যারা তাঁর নির্দেশের বিরোধিতা করে, তাদের এ ভয় করা উচিৎ যে, তাদের উপর কোন কঠিন পরীক্ষা কিংবা কোন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি এসে পড়ে।” (নূর . ৮৩)

তুমি কি জানো ফিতনা কি? ফিতনা হচ্ছে শিরক। সম্ভবত তাঁর কোন কথা অন্তরে বক্রতার সৃষ্টি করলে এর ফলে সে ধ্বংস হয়ে যাবে।

৩। আদী বিন হাতেম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি রাসূল

اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ (التوبة: ৩১)

“তারা [ইয়াহুদী ও খৃষ্টান জাতির লোকেরা] আল্লাহর পরিবর্তে তাদের ধর্মীয় নেতা ও পুরোহিতদেরকে রব হিসেবে বরণ করে নিয়েছিল।” (তাওবা . ৩১) তখন আমি নবীজিকে বললাম, ‘আমরাতো তাদের ইবাদত করি না।’ তিন বললেন, ‘আচ্ছা আল্লাহর হালাল ঘোষিত জিনিসকে তারা হারাম বললে, তোমরা কি তা হারাম হিসেবে গ্রহণ করো না? আবার আল্লাহর হারাম ঘোষিত জিনিসকে তারা হালাল বললেন, তোমরা কি তা হালাল হিসেবে গ্রহণ করো না? তখন আমি বললাম, হ্যা, তিনি তখন বললেন, ‘এটাই তাদের ইবাদত (করার মধ্যে গণ্য।)’ (আহমাদ ও তিরমিজী)

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়

১। সূরা নূরের ৬৩ নং আয়াতের তাফসীর।

২। সূরা তাওবার ৩১ নং আয়াতের তাফসীর।

৩। আদী বিন হাতেম ইবাদতের যে অর্থ অস্বীকার করেছেন, সে ব্যাপারে সতর্কীকরণ।

৪। ইবনে আব্বাস (রাঃ) কর্তৃক আবু বকর এবং ওমর (রাঃ) এর দৃষ্টান্ত আর ইমাম আহমাদ (রাঃ) কর্তৃক সুফইয়ান সওরীর দৃষ্টান্ত পেশ করা।

৫। অবস্থার পরিবর্তন মানুষকে এমন [গোমরাহীর] পর্যায়ে উপনীত করে, যার ফলে পন্ডিত ও পীর বুজুর্গের পূজা করাটাই তাদের কাছে সর্বোত্তম ইবাদতে পরিণত হয়। আর এরই নাম দেয়া হয় “বেলায়াত।” ‘আহবার’ তথা পন্ডিত ব্যক্তিদের ইবাদত হচ্ছে, তাদের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা। অতঃপর অবস্থার পরিবর্তন সাধিত হয়ে এমন পর্যায়ে এসে উপনীত হয়েছে যে, যে ব্যক্তি গাইরুল¬াহর ইবাদত করলো, সে সালেহ বা পূণ্যবান হিসেবে গণ্য হচ্ছে। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় অর্থে যে ইবাদত করলো অর্থাৎ আল্লাহর জন্য ইবাদত করলো, সেই জাহেল বা মূর্খ হিসেবে গণ্য হচ্ছে।

৩৯ তম অধ্যায় .

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“আপনি কি তাদেরকে দেখেননি যারা আপনার উপর যে কিতাব নাযিল হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা নাযিল হয়েছে তার প্রতি ঈমান এনেছে বলে দাবী করে? তারা বিচার ফয়সালার জন্য তাগুত [খোদাদ্রোহী শক্তি] এর কাছে যায়, অথচ তা অস্বীকার করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে আর শয়তান তাদেরকে চরম গোমরাহীতে নিমজ্জিত করতে চায়।” (নিসা . ৬০)

            “তাদেরকে যখন বলা হয়, তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না, তখন তারা বলে, আমরাইতে শান্তিকামী।” (বাকারা . ১১)

৩। আল্লাহ তাআলা অন্যত্র এরশাদ করেছেন,

“পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তোমর বিপর্যয় সৃষ্টি করো না।” (আ’রাফ . ৫৬)

৪। আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করেছেন,

“তারা কি বর্বর যুগের আইন চায়?” (মায়েদা . ৫০)

৫। আব্দুল¬াহ বিন ওমর থেকে বর্ণিত আছে, ‘রাসূল সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল¬াম এরশাদ করেছেন,

“তোমাদের কেউ ঈমানাদর হতে পারবে না, যতক্ষণ না তার প্রবৃত্তি আমার আনীত আদর্শের অধীন হয়।” (ইমাম নববী হাদীসটিকে সহী বলেছেন)

৬। ইমাম শা’বী (রহ:) বলেছেন, একজন মুনাফিক এবং একজন ইহুদীর মধ্যে (একটি ব্যাপারে) ঝগড়া ছিলো। ইহুদী বললো, ‘আমরা এর বিচার- ফয়সালার জন্য মুহাম্মদ (স:) এর কাছে যাবো, কেননা মুহাম্মদ (স:) ঘুষ গ্রহণ করেন না, এটা তার জানা ছিলো। আর মুনাফিক বললো, ‘ফায়সালার জন্য আমরা ইহুদী বিচারকের কাছে যাবো, কেননা ইয়াহুদীরা ঘুষ খায়, এ কথা তার জানা ছিলো। পরিশেষে তারা উভয়েই এ সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে, তারা এর বিচার ও ফয়সালার জন্য জোহাইনা গোত্রের এক গণকের কাছে যাবে। তখন এ আয়াত নাযিল হয় .

আরেকটি বর্ণনা মতে জানা যায়, ঝগড়া- বিবাদে লিপ্ত দু’জন লোকের ব্যাপারে এ আয়াত নাযিল হয়েছে। তাদের একজন বলেছিলো, মীমাংসার জন্য আমরা নবী (স:) এর কাছে যাবো, অপরজন বলেছিলো, কা’ব বিন আশরাফের কাছে যাবো।’ পরিশেষে তারা উভয়ে বিষয়টি মীমাংসার জন্য ওমর রা. এর কাছে সোপর্দ করলো। তারপর তাদের একজন ঘটনাটি তাঁর কাছে উলে¬খ করলো। সে ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল¬াম এর বিচার ফয়সালার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হতে পারলো না, তাকে লক্ষ্য করে ওমর রা. বললেন, ঘটনাটি কি সত্যিই এরকম? সে বললো, হ্যা, তখন তিনি তরবারির আঘাতে তাকে হত্যা করে ফেললেন।”

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়.

১। সূরা নিসার ৬০ নং আয়াতের তাফসীর এবং তাগুতের মর্মার্থ বুঝার ক্ষেত্রে সহযোগিতা।

২। সূরা বাকারার ১১ নং আয়াতের ব্যাখ্যা।

৩। সূরা আরাফের ৫৬ নং আয়াতের তাফসীর।

৪। সূরা মায়েদার أفحلكم الجاهلية يبغون এর তাফসীর।

৫। এ অধ্যায়ের প্রথম আয়াত

নাযিল হওয়ার সম্পর্কে শা’বী রহ. এর বক্তব্য।

৬। সত্যিকারের ঈমান এবং মিথ্যা ঈমানের ব্যাখ্যা।

৭। মুনাফিকের সাথে ওমর রা. এর ব্যবহার সংক্রান্ত ঘটনা।

৮। প্রবৃত্তি যতক্ষণ পর্যন্ত রাসূল স. এর আনীত আদর্শের অনুগত হবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত কারো ঈমান পূর্ণাঙ্গ না হওয়ার বিষয়।

৪০ তম অধ্যায় .

আল্লাহর ‘আসমা ও সিফাত’ [নাম ও গুণাবলী]

অস্বীকারকারীর পরিণাম

১। আল্ল¬াহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“এবং তারা রহমান [আল্লাহর গুণবাচক নাম] কে অস্বীকার করে।” (রা’দ: ৩০)

২। সহীহ বুখারীতে বর্ণিত একটি হাদীসে আলী রা. বলেন,

“লোকদেরকে এমন কথা বলো, যা দ্বারা তারা [আল্ল¬াহ ও রাসূল সম্পর্কে সঠিক কথা জানতে পারে। তোমরা কি চাও যে, আল্ল¬াহ এবং তাঁর রাসূলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হোক?”

৩। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত আছে, আল্ল¬াহর গুণাবলী সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল¬াম থেকে একটি হাদীস শুনে এক ব্যক্তি আল্ল¬াহর গুণকে অস্বীকার করার জন্য একদম ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলো তখন

তিনি বললেন, এরা এ উভয়ের মধ্যে পার্থক্য কি করে করলো? তারা মুহকামের [বা সুস্পষ্ট] আয়াত ও হাদিসের ক্ষেত্রে নমনীয়তা দেখালো, আর মুতাশাবাহ [অস্পষ্ট আয়াত ও হাদিসের ক্ষেত্রে ] ধ্বংসাত্মক পথ অবলম্বন করলো?”

কুরাইশরা যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল¬াম এর কাছে [আল্ল¬াহর গুণবাচক নাম] ‘রাহমানের] উল্যে¬খ করতে শুনতে পেলো, তখন তারা ‘রাহমান’ গুণটিকে অস্বীকার করলো এ প্রসঙ্গেই وهم يكفرون بالرحمن আয়াতটি নাযিল হয়েছে।

এ অধ্যায় থেকেনিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় .

১্ আল্ল¬াহর কোন নাম ও গুণ অস্বীকার করার অর্থ হচ্ছে ঈমান না থাকা।

২। সূরা রাদের وهم يكفرون بالرحمن এর তাফসীর।

৩। যে কথা শ্রোতার বোধগম্য নয়, তা পরিহার করা।

৪। অস্বীকারকারীর অনিচ্ছা সত্তেও যেসব কথা আল্ল¬াহ ও তাঁর রাসূলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার দিকে নিয়ে যায়, এর কারণ কি? তার উল্লেখ।

৫। ইবনে আব্বাস (রা.) এর বক্তব্য হচ্ছে, আল্ল¬াহর নাম ও গুণাবলীর কোন একটি অস্বীকারকারীর ধ্বংস অনিবার্য।

৪১ তম অধ্যায় .

আল্লাহর নেয়ামত অস্বীকার

করার পরিণাম

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন

“তারা আল্ল¬াহর নেয়ামত চিনে, অতঃপর তা অস্বীকার করে।” (নাহল : ৮৩)

এর মর্মার্থ বুঝাতে মুজাহিদ বলেন, এর অর্থ হচ্ছে, কোন মানুষের এ কথা বলা ‘এ সম্পদ আমার, যা আমার পূর্ব পুরুষ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি।’ আ’উন ইবনে আবদিল্ল¬াহ বলেন, ‘এর অর্থ হচ্ছে, কোন ব্যক্তির এ কথা বলা, ‘অমুক ব্যক্তি না হলে এমনটি হতোনা।’ ইবনে কুতাইবা এর ব্যাখ্যায় বলেন, ‘মুশরিকরা বলে, “এটা হয়েছে আমাদের ইলাহদের সুপারিশের বদৌলতে।”

আবু আব্বাস যায়েদ ইবনে খালেদের হাদীসে- যাতে একথা আছে, ‘আল্ল¬াহ তা’আলা বলেন,

“আমার কোন বান্দার ভোরে নিদ্রা ভঙ্গ হয় মোমিন অবস্থায়, আবার কারো ভোর হয় কাফির অবস্থায়”Ñ উল্লেখ করে বলেন, এ ধরনের অনেক বক্তব্য কুরআন ও সুন্নায় উলে¬খ করা হয়েছে। যে ব্যক্তি নেয়ামত দানের বিষয়টি গাইরুল¬াহর সাথে সম্পৃক্ত করে এবং আল্ল¬াহর সাথে কাউকে শরিক করে, আল্ল¬াহ তার নিন্দা করেন।

উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় কোন কোন সালাফে- সালেহীন বলেন, বিষয়টি মুশরিকদের এ কথার মতোই, ‘অঘটন থেকে বাঁচার কারণ হচ্ছে অনুকুল বাতাস, আর মাঝির বিচক্ষণতা’ এ ধরনের আরো অনেক কথা রয়েছে যা সাধারণ মানুষেরমুখে বহুল প্রচলিত।

এ অধ্যায় থেকে নিম্ন বর্ণিত বিষয়গুলো জানা যায় ঃ

১। নেয়ামত সংক্রান্ত জ্ঞান এবং তা অস্বীকার করার ব্যাখ্যা।

২। জেনে- শুনে আল্ল¬াহর নেয়ামত অস্বীকারের বিষয়টি মানুষের মুখে বহুল প্রচলিত।

৩। মানুষের মুখে বহুল পরিচলিত এসব কথা আল্লাহর নেয়ামত অস্বীকার করারই শামিল।

৪। অন্তরে দুটি বিপরীতধর্মী বিষয়ের সমাবেশ।

৪২তম অধ্যায় .

আল্ল¬াহ তাআলার সাথে কাউকে

শরিক না করা

১। আল্ল¬াহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“অতএব জেনে শুনে তোমরা আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করো না।”

২। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস রা. বলেন أنداد [আন্দাদ] হচ্ছে এমন শিরক যা অন্ধকার রাত্রে নির্মল কাল পাথরের উপর পিপিলিকার পদচারণার চেয়েও সুক্ষ্ম। এর উদাহরণ হচ্ছে, তোমার এ কথা বলা, ‘আল্লাহর কসম এবং হে অমুক, তোমার জীবনের কসম, আমার জীবনের কসম।’ ‘যদি ছোট্ট কুকুরটি না থাকতো, তাহলে অবশ্যই আমাদের ঘরে চোর প্রবেশ করতো।’ ‘হাঁসটি যদি ঘরে না থাকতো, তাহলে অবশ্যই চোর আসতো।’ কোন ব্যক্তি তার সাথীকে এ কথা বলা,

‘আল্ল¬াহ তাআলা এবং তুমি যা ইচ্ছা করেছো।’ কোন ব্যক্তির এ কথা বলা, ‘আল্ল¬াহ এবং অমুক ব্যক্তি যদি না থাকে, তাহলে অমুক ব্যক্তিকে এ কাজে রেখো না।’ এগুলো সবই শিরক। (ইবনে আবি হাতেম)

৩। ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল¬াম এরশাদ করেছেন,

“যে ব্যক্তি গাইরুল¬াহর নামে শপথ করলো, সে কুফরী অথবা শিরক করলো।” (তিরমিজি)

৪। ইবনে মাসউদ রা. বলেছেন,

“ আল্ল¬াহর নামে মিথ্যা কসম করা আমার কাছে গাইরুল¬াহর নামে সত্য কসম করার চেয়ে বেশী পছন্দনীয়। হুযাইফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল¬াম এরশাদ করেছেন,

‘আল্ল¬াহ এবং অমুক ব্যক্তি যা চেয়েছেন’ এ কথা তোমরা বলো না। বরং এ কথা বলো, ‘আল্ল¬াহ যা চেয়েছেন অতঃপর অমুক ব্যক্তি যা চেয়েছে’ (আবু দাউদ)

ইবরাহীম নখয়ী থেকে এ কথা বর্নিত আছে যে, أعوذبالله وبك অর্থাৎ ‘আমি আল্ল¬াহ এবং আপনার কাছে আশ্রয় চাই’ এ কথা বলা তিনি অপছন্দ করতেন। আর أعوذ بالله ثم بك অর্থাৎ ‘আমি আল্ল¬াহর কাছে আশ্রয় চাই অতঃপর আপনার কাছে আশ্রয় চাই।’ এ কথা বলা তিনি জায়েম মনে করতেন। তিনি আরো বলেন, لولا الله ثم فلان ‘যদি আল্ল¬াহ অতঃপর অমুক না হয়’ একথা বলে, কিন্তু لولا الله وفلان অর্থাৎ ‘যদি আল্ল¬াহ এবং অমুক না হয়’ এ কথা বলো না।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় .

১। আল্ল¬াহর সাথে শরিক করা সংক্রান্ত সূরা বাকারার উল্লেখিত আয়াতের তাফসীর।

২। শিরকে আকবার অর্থাৎ বড় শিরকের ব্যাপারে নাযিলকৃত আয়াতকে সাহাবায়ে কেরাম ছোট শিরকের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বলে তাফসীর করেছেন।

৩। গাইরুল¬াহর নামে কসম করা শিরক।

৪। গাইরুল¬াহর নামে সত্য কসম করা, আল্লাহর নামে মিথ্যা কসম করার চেয়েও জঘন্য গুনাহ।

৫। বাক্যস্থিত و এবং ثم এর মধ্যে পার্থক্য।

৪৩তম অধ্যায় .

আল্লাহর নামে কসম করে সন্তুষ্ট না

থাকার পরিণাম

১। ইবনে ওমর রা. থেকে বর্নিত আছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল¬াম এরশাদ করেছেন,

“তোমরা তোমাদের বাপ- দাদার নামে কসম করো না, যে ব্যক্তি আল্লাহর নামে কসম করে, তার উচিৎ কসমকে বাস্তবায়িত করা। আর যে ব্যক্তির উদ্দেশ্যে আল্ল¬াহর নামে কসম করা হলো, তার উচিৎ উক্ত কসমে সন্তুষ্ট থাকা। আল্ল¬াহর কসমে যে ব্যক্তি সন্তুষ্ট হলো না, আল্লাহর পক্ষ থেকে তার কল্যাণের কোন আশা নেই।” (ইবনে মাজা)

১। বাপ-দাদার নামে কসম করার উপর নিষেধাজ্ঞা।

২। যার জন্য আল্ল¬াহর নামে কসম করা হলো, তার প্রতি [কসমের বিষয়ে] সন্তুষ্ট থাকার নির্দেশ।

৩। আল্ল¬াহর নামে কসম করার পর, যে উহাতে সন্তুষ্ট থাকে না, তার প্রতি ভয় প্রদর্শন ও হুশিয়ারি উচ্চারণ।

৪৪ তম অধ্যায় .

‘আল্ল¬াহ এবং আপনি যা

চেয়েছেন’ বলা

১- কুতাইলা হতে বর্ণিত আছে, একজন ইহুদী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল¬াম এর কাছে এসে বললো, ‘আপনারাও আল্ল¬াহর সাথে শিরক করে থাকেন।’ কারণ আপনারা বলে থাকেন, ماشاءالله وشئت আল্ল¬াহ এবং আপনি যা চেয়েছেন। আপনারা আরো বলে থাকেন والكعبة অর্থাৎ কাবার কসম। এরপর রাসূল সাল্ল¬াল্ল¬াহু আলাইহি ওয়াসাল¬াম বললেন, মুসলমানদের মধ্যে যারা কসম বা হলফ করতে চায়, তারা যেন বলে ورب الكعبة ‘কাবার রবের কসম আর যেন ماشاء الله ثم شئت আল্ল¬াহ যা চেয়েছেন অতঃপর আপনি যা চেয়েছেন’ একথা বলে। (নাসায়ী)

২। ইবনে আব্বাস রা. হতে আরো একটি হাদীসে বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি রাসূল সাল্ল¬াল্ল¬াহু আলাইহি ওয়াসাল¬াম এর উদ্দেশ্যে বললো, ماشاء الله وشئت [আপনি এবং আল্ল¬াহ যা ইচ্ছা করেছেন] তখন রাসূল সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম বললেন, أجعلتنى لله ندا “তুমি কি আল্লাহর সাথে আমাকে শরিক করে ফেলেছো?” আসলে আল্ল¬াহ যা ইচ্ছা করেছেন, তা একক ভাবেই করেছেন।

৩। আয়েশা রা. এর মায়ের দিক দিয়ে ভাই, তোফায়েল থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি স্বপ্নে দেখতে পেলাম, আমি কয়েকজন ইয়াহুদীর কাছে এসেছি। আমি তাদেরকে বললাম,

তোমরা অবশ্যই একটা ভাল জাতি, যদি তোমরা ওযাইরকে আল্ল¬াহর পুত্র না বলতে। তারা বললো, ‘তোমরাও অবশ্যই একটি ভাল জাতি যদি তোমরা ماشاء الله وشاء محمد [আল্ল¬াহ যা ইচ্ছা করেছেন এবং মুহাম্মদ যা ইচ্ছা করেছেন] এ কথা না বলতে! অতঃপর নাসারাদের কিছু লোকের কাছে আমি গেলাম এবং বললাম, ‘ঈসা আ. আল্ল¬াহর পুত্র’ এ কথা না বললে তোমরা একটি উত্তম জাতি হতে। তারা বললো, ‘তোমরাও ভাল জাতি হতে, যদি তোমরা এ কথা না বলতে, ‘আল্লাহ যা ইচ্ছা করেছেন এবং মুহাম্মদ যা ইচ্ছা করেছেন।’ সকালে এ (স্বপ্নের) খবর যাকে পেলাম তাকে দিলাম। তারপর রাসূল সাল্ল¬াল্লা¬হু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম এর কাছে এলাম এবং তাকে আমার স্বপ্নের কথা বললাম। তিনি বললেন, ‘এ স্বপ্নের কথা কি আর কাউকে বলেছো?” বললাম, হ্যাঁ। তখন তিনি আল্ল¬াহর প্রশংসা করলেন এবং গুণ বর্ণনা করলেন। তারপর বললেন, “তোফায়েল একটা স্বপ্ন দেখেছে, যার খবর তোমাদের মধ্যে যাকে বলার বলেছে। তোমরা এমন কথাই বলেছো, যা বলতে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে। আর আমিও তোমাদেরকে এভাবে বলতে নিষেধ করছি। অতএব তোমরা ماشاء الله وشاء محمد অর্থাৎ ‘আল্লাহ যা ইচ্ছা করেছেন এবং মুহাম্মদ স. যা ইচ্ছা করেছেন’ একথা বলো না বরং তোমরা বলো, ماشاء الله وحده অর্থাৎ ‘একক আল্লাহ যা ইচ্ছা করেছেন।”

এ অধ্যায় থেকে নিম্ন বর্ণিত বিষয়গুলো জানা যায় .

১। ছোট শিরক সম্পর্কে ইহুদীরাও অবগত আছে।

২। কুপ্রবৃত্তি সম্পর্কে মানুষের উপলব্ধি থাকা।

৩। রাসূল সাল্ল¬াল্ল¬াহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম এর উক্তি أجعلتنى لله ندا ‘তুমি কি আমাকে আল্ল¬াহর শরিক বানিয়েছো?’ [অর্থাৎ ماشاء الله وشئت এ কথা বললেই যদি শিরক হয়] তাহলে সে ব্যক্তি অবস্থা কি দাঁড়ায়, যে ব্যক্তি বলে, يا أكرم الخلق ما لي من ألوذبه سواك হে সৃষ্টির সেরা, আপনি ছাড়া আমার আশ্রয়দাতা কেউ নেই এবং [ এ কবিতাংশের] পরবর্তী দুটি লাইন। [অর্থাৎ উপরোক্ত কথা বললে অবশ্যই বড় ধরনের শিরকী গুনাহ হবে।]

৪। নবী সাল্ল¬াল¬াহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম এর বাণী يمتعنى كذا وكذا দ্বারা বুঝা যায় যে, এটা শিরকে আকবার [বড় শিরক] এর অন্তর্ভূক্ত নয়।

৫। নেক স্বপ্ন অহীর শ্রেণীর্ভূক্ত।

৬। স্বপ্ন শরিয়তের কোন কোন বিধান জারির কারণ হতে পারে।

৪৫তম অধ্যায় .

যে ব্যক্তি যমানাকে গালি দেয় সে

আল্লাহকে কষ্ট দেয়

১। আল্ল¬াহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“অবিশ্বাসীরা বলে, ‘শুধু দুনিয়ার জীবনই আমাদের জীবন। আমরা এখানেই মরি ও বাঁচি। যমানা ব্যতীত অন্য কিছুই আমাদেরকে ধ্বংস করতে পারে না।” (জাসিয়া : ২৪)

২। সহীহ হাদীসে আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল¬াম বলেছেন, আল্ল¬াহ তাআলা এরশাদ করেন,

لا تسبوا الدهر فإن الله هو الدهر

“তোমরা যমানাকে গালি দিওনা। কারণ, আল্ল¬াহই হচ্ছেন যমানা।”

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়.

১। কাল বা যমানাকে গালি দেয়া নিষেধ।

২। যমানাকে গালি দেয়া আল্ল¬াহকে কষ্ট দেয়ারই নামান্তর।

৩। فإن الله هو الدهر ‘আল্ল¬াহই হচ্ছেন যমানা’ রাসূল সাল্লাল্ল¬াহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এর বাণীর মধ্যে গভীর চিন্তার বিষয় নিহিত আছে।

৪। বান্দার অন্তরে আল্ল¬াহকে গালি দেয়ার ইচ্ছা না থাকলেও অসাবধনতা বশতঃ মনের অগোচরে তাঁকে গালি দিয়ে ফেলতে পারে।

৪৬তম অধ্যায় .

কাযীউল কুযাত [মহা বিচারক]

প্রভৃতি নামকরণ প্রসংগে

১। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত সহীহ হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

“আল্ল¬াহ তাআলার কাছে ঐ ব্যক্তির নাম সবচেয়ে নিকৃষ্ট, যার নামকরণ করা হয় ‘রাজাধিরাজ’ বা ‘প্রভূর প্রভূ’। আল্ল¬াহ ব্যতীত কোন প্রভূ নেই”। (বুখারি)

সুফিয়ান সওরী বলেছেন, ‘রাজাধিরাজ’ কথাটি ‘শাহানশাহ’ এর মতই একটি নাম। আরো একটি বর্ণনা মতে রাসূল সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম এরশাদ করেছন-

“কেয়ামতের দিন আল্ল¬াহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট এবং খারাপ ব্যক্তি হচ্ছে [যার নামকরণ করা হচ্ছে রাজাধিরাজ]’। উল্লেখিত হাদীসে أخنع শব্দের অর্থ হচ্ছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়.

১। ‘রাজাধিরাজ’ নামকরণের প্রতি নিষেধাজ্ঞা।

২। ‘রাজাধিরাজ’ এর অর্থ সুফিয়ান সওরী কর্তৃক বর্ণিত ‘শাহানশাহ’ এর অর্থের অনুরূপ।

৩। বর্ণিত ব্যাপারে এবং এ জাতীয় বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন করা। এক্ষেত্রে অন্তরে কি নিয়ত আছে তা বিবেচ্য নয়।

৪। বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতা সবই আল্ল¬াহর উদ্দেশ্যে হওয়া বাঞ্ছনীয়।

৪৭তম অধ্যায়

আল্লাহর সম্মানার্থে [শিরকী]

নামের পরিবর্তন

১। আবু শুরাইহ হতে বর্ণিত আছে এক সময় তার কুনিয়াত ছিল আবুল হাকাম [জ্ঞানের পিতা] রাসূল সাল্ল¬াল্ল¬াহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“আল্লাহ তাআলাই হচ্ছে জ্ঞান সত্তা এবং তিনিই জ্ঞানের আধার” তখন আবু শুরাইহ বললেন, ‘আমার কওমের লোকেরা যখন কোন বিষয়ে মতবিরোধ করে, তখন ফয়সালার জন্য আমার কাছে চলে আসে। তারপর আমি তাদের মধ্যে ফয়সালা করে দেই। এতে উভয় পক্ষই সন্তুষ্ট হয়ে যায়।’ রাসুল সাল্ল¬াল্ল¬াহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম একথা শুনে বললেন, এটা কতইনা ভাল! তোমার কি সন্তানাদি আছে? আমি বললাম, ‘শুরাইহ’ ‘মুসলিম’ এবং ‘আবদুল্লাহ’ নামের তিনটি ছেলে আছে।’ তিনি বললেন, ‘তাদের মধ্যে সবার বড় কে?’ আমি বললাম,‘শুরাইহ’। তিনি বললেন, “অতএব তুমি আবু শুরাইহ” [শুরাইহের পিতা] (আবু দাউদ)।

এ অধ্যায় থেকে নিম্ন বর্ণিত বিষয়গুলো জানা যায় .

১। আল্ল¬াহর আসমা ও সিফাত অর্থাৎ নাম ও গুণাবলীর সম্মান করা; যদিও এর অর্থ বান্দার উদ্দেশ্য না হয়।          

২। আল্ল¬াহর নাম ও সিফাতের সম্মানার্থে নাম পরিবর্তন করা।

৩। কুনিয়াতের জন্য বড় সন্তানের নাম পছন্দ করা।

৪৮ তম অধ্যায় .

আল্লাহর যিকির, কুরআন এবং রাসূল

সম্পর্কিত কোন বিষয় নিয়ে

খেল- তামাশা করা প্রসংগে

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, তবে তারা অবশ্যই বলবে, আমরা খেল- তামাশা করছিলাম।” (ফুসসিলাত . ৫০)

২। ইবনে ওমর, মুহাম্মদ বিন কা’ব, যায়েদ বিন আসলাম এবং কাতাদাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, [তাদের একের কথা অপরের কথার মধ্যে সামঞ্জস্য আছে] তাবুক যুদ্ধে একজন লোক বললো, এ ক্বারীদের [কুরআন পাঠকারীর] মত এত অধিক পেটুক, কথায় এত অধিক মিথ্যুক এবং যুদ্ধের ময়দানে শত্র“র সাক্ষাতে এত অধিক ভীরু আর কোন লোক দেখিনি। অর্থাৎ লোকটি তার কথা দ্বারা মুহাম্মদ সাল্ল¬াল্ল¬াহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম এবং তাঁর ক্বারী সাহাবায়ে কেরামের দিকে ইঙ্গিত করেছিলো। আওফ বিন মালেক লোকটিকে বললেন, ‘তুমি মিথ্যা কথা বলেছো। কারণ, তুমি মুনাফিক।’

আমি অবশ্যই রাসূল সাল্ল¬াল্ল¬াহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬ামকে এ খবর জানাবো। আওফ তখন এ খবর জানানোর জন্য রাসূল সাল্ল¬াল্ল¬াহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম এর কাছে চলে গেলেন। গিয়ে দেখলেন কুরআন তাঁর চেয়েও অগ্রগামী [অর্থাৎ আওফ পৌছার পূর্বেই অহীর মাধ্যমে রাসূল সাল্ল¬াল্ল¬াহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম ব্যাপারটি জেনে ফেলেছেন] এ ফাঁকে মুনাফিক লোকটি তার উটে চড়ে রাসূল সাল্ল¬াল্ল¬াহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম এর কাছে চলে আসলো। তারপর সে বললো, ‘হে আল্ল¬াহর রাসূল, চলার পথে আমরা অন্যান্য পথচারীদের মত পরস্পরের হাসি, রং- তামাশা করছিলাম’ যাতে করে আমাদের পথ চলার কষ্ট লাঘব হয়। ইবনে ওমর (রাঃ) বলেন, এর উটের গদির রশির সাথে লেগে আমি যেন তার দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম। পাথর তার পায়ের উপর পড়ছিলো, আর সে বলছিলো, ‘আমরা হাসি ঠাট্টা করছিলাম।’ তখন রাসূল সাল্ল¬াল্ল¬াহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“তোমরা কি আল্ল¬াহ, তাঁর আয়াত [কুরআন] এবং তাঁর রাসূলের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রƒপ করছিলে?

তিনি তার দিকে [মুনাফিকের দিকে] দৃষ্টিও দেননি। এর অতিরিক্ত কোন কথাও বলেননি।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় :

১। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে একথা অনুধাবন করা যে, আল্লাহ, কুরআন ও রাসূলের সাথে যারা ঠাট্টা বিদ্রুপ করে তারা কাফের।

২। এ ঘটনা সংশি¬ষ্ট আয়াতের তাফসীর ঐ ব্যক্তির জন্য যে, এ ধরনের কাজ করে অর্থাৎ আল্ল¬াহ, কুরআন ও রাসূলের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে।

৩। চোগলখুরী এবং আল্ল¬াহ ও তাঁর রাসূলের উদ্দেশ্যে নসীহতের মধ্যে পার্থক্য।

৪। এমন ওযরও রয়েছে যা গ্রহণ করা উচিৎ নয়।

৪৯তম অধ্যায় .

১। আল্ল¬াহ তাআলার বাণী .

“দুঃখ- দুর্দশার পর যদি আমি মানুষকে আমার রহমতের আস্বাদ গ্রহণ করাই, তাহলে সে অবশ্যই বলে, এ নেয়ামত আমারই জন্য হয়েছে।” (ফুসসিলাত . ৫০) বিখ্যাত মুফাসসির মুজাহিদ বলেন, ‘ইহা আমরই জন্য’ এর অর্থ হচ্ছে, ‘আমার নেক আমলের বদৌলতেই এ নেয়ামত দান করা হয়েছে, আমিই এর হকদার।’ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, সে এ কথা বলতে চায়, ‘নেয়ামত আমার আমলের কারণেই’ এসেছে অর্থাৎ এর প্রকৃত হকদার আমিই।

আল্ল¬াহ তাআলা আরো বলেছেন,

“সে বলে, ‘নিশ্চয়ই এ নেয়ামত আমার ইলম ও জ্ঞানের জন্য আমাকে দেয়া হয়েছে।” (কাসাস ঃ৭৮)

কাতাদাহ (রাঃ) বলেন, ‘উপার্জনের রকমারী পন্থা সম্পর্কিত জ্ঞান থাকার কারণে আমি এ নেয়ামত প্রাপ্ত হয়েছি।’ অন্যান্য মুফাসসিরগণ বলেন ‘আল্লাহ তাআলার ইলম মোতাবেক আমি এর [নেয়ামতের] হকদার। আমার মর্যাদার বদৌলতেই এ নেয়ামত প্রাপ্ত হয়েছি।’

মুজাহিদের এ কথার অর্থই উপরোক্ত বক্তব্য দ্বারা বুঝানো হয়েছে।

২। আবু হুরাইয়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূল সাল্ল¬াল্ল¬াহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬ামকে এ কথা বলতে শুনেছেন,

“বর্ণিত ইসরাইল বংশে তিনজন লোক ছিল . যাদের একজন ছিল কুষ্টরোগী, আরেকজন টাক পড়া, অপরজন ছিল অন্ধ। এমতাবস্থায় আল্ল¬াহ তাআলা তাদেরকে পরীক্ষা করতে চাইলেন। তখন তাদের কাছে তিনি ফেরেস্তা পাঠালেন। কুষ্টরোগীর কাছে ফেরেস্তা এসে জিজ্ঞেস করলো, ‘তোমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস কি? সে বললো, ‘সুন্দর চেহারা এবং সুন্দর ত্বক [শরীরের চামড়া]। আর যে রোগের কারণে মানুষ আমাকে ঘৃণা করে তা থেকে মুক্তি আমার কাম্য। তখন ফেরেস্তা তার শরীরে হাত বুলিয়ে দিলো। এতে তার রোগ দূর হয়ে গেলো তাকে সুন্দর রং আর

সুন্দর ত্বক দেয়া হলো। তারপর ফেরেস্তা তাকে জিজ্ঞেস করলো, “তোমার প্রিয় সম্পদ কি? সে বললো, “উট অথবা গরু”। [ইসহাক অর্থাৎ হাদীস বর্ণনাকারী উট কিংবা গরু এ দু’য়ের মধ্যে সন্দেহ করছেন] তখন তাকে দশটি গর্ভবতী উট দেয়া হলো। ফিরিস্তা তার জন্য দোয়া করে বললো, “আল্ল¬াহ এ সম্পদে তোমাকে বরকত দান করুন।”

তারপর ফেরেস্তা টাক পড়া লোকটির কাছে গিয়ে বললো, “তোমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় জিনিস কি?” লোকটি বললো, “আমার প্রিয় জিনিস হচ্ছে সুন্দর চুল। আর লোকজন আমাকে যার জন্য ঘৃণা করে তা থেকে মুক্ত হতে চাই।” ফেরেস্তা তখন তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। এতে তার মাথার টাক দূর হয়ে গেলো। তাকে সুন্দর চুল দেয়া হলো। অতঃপর ফেরেস্তা তাকে জিজ্ঞেস করলো, “কোন সম্পদ তোমার কাছে সবচেয়ে বেশী প্রিয়? সে বললো, “উট অথবা গরু।” তখন তাকে গর্ভবতী গাভী দেয়া হলো। ফেরেস্তা তার জন্য দোয়া করে বললো, “আল্ল¬াহ এ সম্পদে তোমাকে বরকত দান করুন। ”

তারপর ফেরেস্তা অন্ধ লোকটির কাছে এসে বললো, “তোমার কাছে সবচেয় প্রিয় বস্তু কি?” লোকটি বললো, “আল্ল¬াহ যেন আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেন। যার ফলে আমি লোকজনকে দেখতে পাবো, এটাই আমার প্রিয় জিনিস।” ফেরেস্তা তখন তার চোখে হাত বুলিয়ে দিলো। এতে লোকটির দৃষ্টিশক্তি আল্ল¬াহ তাআলা ফিরেয়ে দিলেন। ফেরেস্তা তাকে বললো, “কি সম্পদ তোমার কাছে প্রিয়? সে বললো, “ছাগল আমার বেশী প্রিয়।” তখন তাকে একটি গর্ভবতী ছাগল দেয়া হলো। তারপর ছাগল বংশ বৃদ্ধি করতে লাগলো। এমনিভাবে উট ও গরু বংশ বৃদ্ধি করতে লাগলো। অবশেষে অবস্থা এই দাঁড়ালো যে, একজনের উট দ্বারা মাঠ ভরে গেলো, আরেকজনের গরু দ্বারা মাঠ পূর্ণ হয়ে গেলো এবং আরেকজনের ছাগল দ্বারা মাঠ ভর্তি হয়ে গেলো।

এমতাবস্থায় একদিন ফেরেস্তা তার স্বীয় বিশেষ আকৃতিতে কুষ্ঠ রোগীর কাছে উপস্থিত হয়ে বললো, “আমি একজন মিসকিন।” আমার সফরের সম্বল শেষ হয়ে গেছে [আমি খুবই বিপদগ্রস্ত] আমার গন্তব্যে পৌছার জন্য প্রথমে আল্ল¬াহর তারপর আপনার সাহায্য দরকার। যে আল্ল¬াহ আপনাকে এত সুন্দর রং এবং সুন্দর ত্বক দান করেছেন, তাঁর নামে আমি আপনার কাছে একটা উট সাহায্য চাই, যাতে আমি নিজ গন্তব্যস্থানে পৌঁছতে পারি। তখন লোকটি বললো, ‘দেখুন, আমার অনেক দায়-দায়িত্ব আছে, হকদার আছে।’ ফেরেস্তা বললো, ‘আমার মনে হয়, আমি আপনাকে চিনি।’ আপনি কি কুষ্ঠ রোগী ছিলেন না? আপনি খুব গরীব ছিলেন? লোকজন আপনাকে খুব ঘৃণা করতো। তারপর আল্লাহ আপনাকে এ সম্পদ দান করেছেন। তখন লোকটি বললো, ‘এ সম্পদ আমার পূর্ব পুরুষ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। ফেরেস্তা তখন বললো, “তুমি যদি মিথ্যাবাদী হয়ে থাকো তাহলে আল্ল¬াহ যেন তোমাকে পূর্বের অবস্থা ফিরিয়ে দেন।”

তারপর ফেরেস্তা মাথায় টাক- পড়া লোকটির কাছে গেল এবং ইতিপূর্বে কুষ্ঠরোগীর সাথে যে ধরনের কথা বলেছিলো, তার [টাক পড়া লোকটির] সাথেও সে ধরনের কথা বললো। প্রতি উত্তরে কুষ্ঠরোগী যে ধরনের জবাব দিযেছিলে, এ লোকটিও সেই একই ধরনের জবাব দিলো। তখন ফেরেস্তাও আগের মতই বললো, ‘যদি তুমি মিথ্যাবাদী হও তাহলে আল্ল¬াহ তাআলা যেন তোমাকে তোমার পূর্বের অবস্থা ফিরিয়ে দেন।’ অতঃপর ফেরেস্তা স্বীয় আকৃতিতে অন্ধ লোকটির কাছে গিয়ে বললো, ‘আমি এক গরীব মুসাফির। আমার পথের সম্বল নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে। প্রথম আল্ল¬াহর তারপর আপনার সাহায্য কামনা করছি। যিনি আপনার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন, তাঁর নামে একটি ‘ছাগল’ আপনার কাছে সাহায্য চাই, যাতে আমার সফরে নিজ গন্তব্যস্থানে পৌছতে পারি।’ তখন লোকটি বললো, ‘আমি অন্ধ ছিলাম। আল্ল¬াহ তাআলা আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। আপনার যা খুশি নিয়ে যান, আর যা খুশি রেখে যান। আল্ল¬াহর কসম, আল্ল¬াহর নামে আপনি আজ যা নিয়ে যাবেন, তার বিন্দুমাত্র আমি বাধা দেব না।’ তখন ফেরেস্তা বললো, ‘আপনার মাল আপনি রাখুন। আপনাদেরকে শুধুমাত্র পরীক্ষা করা হলো। আপনার আচরণে আল্ল¬াহ সন্তুষ্ট হয়েছেন, আপনার সঙ্গীদ্বয়ের আচরণে অসন্তুষ্ট হয়েছেন।” (বুখারি ও মুসলিম)

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় .

            ১। সূরা ফুসসিলাতের ৫০ নং আয়াতের তাফসীর।

২। ليقولن هذا لى এর অর্থ।

৩। أوتيته على علم عندى এর অর্থ।

৪। আশ্চর্য ধরনের কিসসা এবং তাতে নিহিত উপদেশাবলী।

৫০তম অধ্যায় .

১। আল্ল¬াহ তাআলার বাণী .

“অতঃপর আল্লাহ যখন উভয়কে একটি সুস্থ ও নিখূঁত সন্তান দান করলেন, তখন তারা তাঁর দানের ব্যাপারে অন্যকে তাঁর শরিক গণ্য করতে শুরু করলো।” (আ’রাফ . ১৯০)

ইবনে হযম (রহ:) বলেন, ঊলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন যে, এমন প্রত্যেক নামই হারাম, যা দ্বারা গাইরুল্লাহর ইবাদত করার অর্থ বুঝায়। যেমন, আবদু ওমর, আবদুল কা’বা এবং এ জাতীয় অন্যান্য নাম। তবে আবদুল মোত্তালিব এর ব্যতিক্রম। ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘আদম আ. যখন বিবি হাওয়ার সাথে মিলিত হলেন, তখন হাওয়া গর্ভবতী হলেন। এমতাবস্থায় শয়তান আদম ও হাওয়ার কাছে এসে বললো, ‘আমি তোমাদের সেই বন্ধু ও সাথী, যে নাকী তোমাদের জান্নাত থেকে বের

করেছে। তোমরা অবশ্যই আমার আনুগত্য করো, নতুবা গর্ভস্থ সন্তানের মাথায় উটের শিং গজিয়ে দিবো, তখন সন্তান তোমার পেট কেটে বের করতে হবে। আমি অবশ্যই একাজ করে ছাড়বো।”

শয়তান এভাবে তাদেরকে ভয় দেখাচ্ছিল। শয়তান বললো, তোমরা তোমাদের সন্তানের নাম ‘আব্দুল হারিছ’ রেখো। তখন তাঁরা শয়তানের আনুগত্য করতে অস্বীকার করলেন। অতঃপর তাদের একটি মৃত সন্তান ভূমিষ্ট হলো। আবারো বিবি হাওয়া গর্ভবতী হলেন। শয়তানও পুনরায় তাঁদের কাছে এসে পূর্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিলো। এর ফলে তাঁদের অন্তরে সন্তানের প্রতি ভালবাসা তীব্র হয়ে দেখা দিলো। তখন তাঁরা সন্তানের নাম ‘আবদুল হারিস’ রাখলেন। এভাবেই তাঁরা আল্ল¬াহ প্রদত্ত নেয়ামতের মধ্যে তাঁর সাথে শরিক করে ফেললেন। এটাই হচ্ছে جعلا له شركاء فيما أتاهما এ আয়াতের তাৎপর্য (ইবনে আবি হাতিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)

কাতাদাহ থেকে সহীহ সনদে অপর একটি হাদীসে বর্নিত আছে, তিনি বলেন, তাঁরা আল্ল¬াহর সাথে শরিক করেছিলেন আনুগত্যের ক্ষেত্রে ইবাদতের ক্ষেত্রে নয়।’

মুজাহিদ থেকে সহীহ সনদে لئن أتينا صالحا এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্নিত আছে, তিনি বলেন, সন্তানটি মানুষ না হওয়ার আশংকা তাঁরা [পিতা-মাতা] করেছিলেন। ’

[হাসান, সাঈদ প্রমুখের কাছ থেকে এর অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে।]

এ অধ্যায় থেকে নিম্ন বর্ণিত বিষয়গুলো জানা যায় ঃ

১। যেসব নামের মধ্যে গাইরুল¬াহর ইবাদতের অর্থ নিহিত রয়েছে সে নাম রাখা হারাম।

২। সূরা আ’রাফের ১৯০ নং আয়াতের তাফসীর।      

৩। আলোচিত অধ্যায়ে বর্ণিত শিরক হচ্ছে শুধুমাত্র নাম রাখার জন্য। এর দ্বারা হাকীকত [অর্থাৎ শিরক করা] উদ্দেশ্য ছিল না।

৪। আল্ল¬াহর পক্ষ থেকে একটি নিখূঁত ও পূর্ণাঙ্গ কন্যা সন্তান লাভ করা একজন মানুষের জন্য নেয়ামতের বিষয়।

৫। আল্ল¬াহর আনুগত্যের মধ্যে শিরক এবং ইবাদতের মধ্যে শিরকের ব্যাপারে সালাফে-সালেহীন পার্থক্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

৫১তম অধ্যায় .

আল্ল¬াহ তাআলার আসমায়ে

হুসনা [বা সুন্দরতম নামসমূহ]

১। আল্ল¬াহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“আল্ল¬াহর সুন্দর সুন্দর অনেক নাম রয়েছে। তোমরা এসব নামে তাঁকে

ডাকো। আর যারা তাঁর নামগুলোকে বিকৃত করে তাদেরকে পরিহার করে চলো।” (আ’রাফ . ১৮০)

২। ইবনে আবি হাতিম ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, يلحدون فى أسمائه [তারা তাঁর নামগুলো বিকৃত করে] এর অর্থ হচ্ছে তারা শিরক কর্ ে

৩। ইবনে আব্বাস রা. থেকে আরো বর্ণিত আছে, মুশরিকরা ‘ইলাহ’ থেকে ‘লাত’ আর ‘আজীজ’ থেকে ‘উযযা’ নামকরণ করছে।

৪। আ’মাস থেকে বর্ণিত আছে, মুশরিকরা আল্ল¬াহর

নামসমূহের মধ্যে এমন কিছু [শিরকী বিষয়] ঢুকিয়েছে যার অস্তিত্ব আদৌ তাতে নেই।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় .

১। আল্লাহর নামসমূহ যথাযথ স্বীকৃতি

২। আল্ল¬াহর নামসমূহ সুন্দরতম হওয়া।

৩। সুন্দর ও পবিত্র নামে আল্ল¬াহকে ডাকার নির্দেশ।

৪। যেসব মূর্খ ও বেইমান লোকেরা আল্ল¬াহর পবিত্র নামের বিরুদ্ধাচারণ করে তাদেরকে পরিহার করে চলা।

৫। আল্লাহর নামে বিকৃতি ঘটানোর ব্যাখ্যা।

৫২তম অধ্যায় .

“আসসালামু আলাল্ল¬াহ” [আল্লাহর ]

উপর শান্তি বর্ষিত হোক] বলা যাবে না

১। সহীহ বুখারীতে ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম এর সাথে নামাযে মগ্ন ছিলাম। তখন আমরা বললাম,

“আল্লাহর উপর তাঁর বান্দাদের পক্ষ থেকে শান্তি হোক, অমুক অমুকের উপর শান্তি বর্ষিত হোক।” তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম বললেন,

“আল্লাহর উপর শান্তি হোক, এমন কথা তোমরা বলো না। কেননা আল্লাহ নিজেই ‘সালাম’ [শান্তি]”

অ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় .

১। ‘সালাম’ এর ব্যাখ্যা।

২। ‘সালাম’ হচ্ছে সম্মানজনক সম্ভাষণ।

৩। এ [‘সালাম’] সম্ভাষণ আল্লাহর ব্যাপারে প্রযোজ্য নয়।

৪। আল্লাহর ব্যাপারে ‘সালাম’ প্রযোজ্য না হওয়ার কারণ।

৫। বান্দাহগণকে এমন সম্ভাষণ শিক্ষা দেয়া হয়েছে যা আল্লাহর জন্য সমীচীন ও শোভনীয়।

৫৩তম অধ্যায় .

‘হে আল্লাহ তোমার মর্জি হলে

আমাকে মাফ করো’ প্রসঙ্গে

১। সহীহ হাদীসে আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম এরশাদ করেছেন ,

“তোমাদের মধ্যে কেউ যেন একথা না বলে, ‘হে আল্লাহ, তোমার ইচ্ছা হলে আমাকে মাফ করে দাও, ‘হে আল্লাহ, তোমার ইচ্ছা হলে আমাকে করুণা করো’। বরং দৃঢ়তার সাথে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করবে। কেননা আল্লাহর উপর জবরদস্তী করার মত কেউ নেই।” (বুখারি)

২। সহী মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে,

“আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার উৎসাহ উদ্দীপনাকে বৃদ্ধি করা উচিৎ। কেননা আল্লাহ বান্দাকে যাই দান করেন না কেন তার কোনটাই তাঁর কাছে বড় কিংবা কঠিন কিছুই নয়।”

৫৪তম অধ্যায় .

            ১। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে রাসূল (স:) এরশাদ করেছেন,

“ তোমাদের কেউ যেন না বলে, ‘তোমার প্রভুকে খাইয়ে দাও’ ‘তোমার প্রভুকে অজু করাও’। বরং সে যেন বলে, ‘্আমার নেতা’ ‘আমার মনিব’। তোমাদের কেউ যেন না বলে ‘আমার দাস’ ‘আমার দাসী’। বরং সে যেন বলে, ‘আমার ছেলে, আমার মেয়ে, আমার চাকর।”

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় .

১। আমার দাস- দাসী বলা নিষিদ্ধ।

২। কোন গোলাম যেন তার মনিবকে না বলে, ‘আমার প্রভু’। এ

কথাও যেন না বলে, ‘তোমার রবকে আহার করাও’।

৩। প্রথম শিক্ষণীয় বিষয় হলো, ‘আমার ছেলে’ ‘আমার মেয়ে’ ‘আমার চাকর’ বলতে হবে।

৪। দ্বিতীয় শিক্ষণীয় বিষয় হলো, ‘আমার নেতা,’ ‘আমার মনিব’ বলতে হবে।

৫। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের প্রতি শতর্কতা অবলম্বন। আর তা হচ্ছে, শব্দ ব্যবহার ও প্রয়োগের মধ্যেও তাওহীদের শিক্ষা বাস্তবায়ন করা।

৫৫ তম অধ্যায় .

আল্লাহর ওয়াস্তে সাহায্য চাইলে বিমুখ না করা

১। ইবনে ওমর রা. থেকে বর্নিত আছে, রাসূল সাল্লাল্ল¬াহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম এরশাদ করেছে,

“যে ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে চায় তাকে দান করো। যে ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তাকে আশ্রয় দাও। যে ব্যক্তি আল্লাহর নামে ডাকে, তার ডাকে সাড়া দাও। যে ব্যক্তি তোমাদের জন্য ভাল কাজ করে, তার যথোপযুক্ত প্রতিদান দাও। তার প্রতিদানের জন্য যদি তোমরা কিছুই না পাও, তাহলে তার জন্য এমন দোয়া করো, যার ফলে এটাই প্রমাণিত হয় যে, তোমরা তার প্রতিদান দিতে পেরেছো। ” (আবু দাউদ, নাসায়ী)

এ অধ্যায় থেকে নিম্ন বর্ণিত বিষয়গুলো জানা যায় .

১। আল্লাহর ওয়াস্তে আশ্রয় প্রার্থনাকারীকে আশ্রয় দান।

২। আল্লাহর ওয়াস্তে সাহায্য প্রার্থনাকারীকে সাহায্য প্রদান।

৩। [নেক কাজের] আহ্বানে সাড়া দেয়া।

৪। ভাল কাজের প্রতিদান দেয়া।

৫। ভাল কাজের প্রতিদানে অক্ষম হলে উপকার সাধনকারীর জন্য দোয়া করা।

৬। এমন খালেসভাবে উপকার সাধনকারীর জন্য দোয়া করা, যাতে মনে হয়, যথোপযুক্ত প্রতিদান দেয়া হয়েছে। রাসূল সাল্ল¬াল্ল¬াহু আলাইহি ওয়া সাল্ল-াম এর বাণী حتى تروا أنكم قد كافأتموه দ্বারা এটাই বুঝানো হয়েছে।

৫৬তম অধ্যায়

“বি ওয়াজহিল্ল¬াহ’ বলে একমাত্র

জান্নাত ব্যতীত আর কিছুই প্রার্থনা

করা যায় না।

১। জাবের রা. থেকে বর্নিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল-াম এরশাদ করেছেন,

“বিওয়াজহিল¬াহ [আল্লাহর চেহারার ওসীলা] দ্বারা একমাত্র জান্নাত ছাড়া অন্য কিছুই চাওয়া যায় না।” (আবু দাউদ)

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় .

১। চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্থাৎ জান্নাত ব্যতীত ‘বিওয়াজহিল¬াহ” দ্বারা অন্য কিছু চাওয়া যায় না।

২। আল্লাহর ‘চেহারা’ নামক সিফাত বা গুনের স্বীকৃতি।

৫৭তম অধ্যায় .

[বাক্যের মধ্যে ‘যদি’ ব্যবহার সংক্রান্ত আলোচনা]

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“তারা বলে, ‘যদি’ এ ব্যাপারে আমাদের করণীয় কিছু থাকতো, তাহলে আমরা এখানে নিহত হতাম না” (আল ইমরান . ১৫৪)

২। আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করেছেন,

“যারা ঘরে বসে থেকে [যুদ্ধে না গিয়ে তারেদ [যোদ্ধা] ভাইদেরকে বলে, আমাদের কথা মতো যদি তারা চলতো। তবে তারা নিহত হতো না। (আল-ইমরান . ১৬৮)

৩। সহীহ বুখারীতে আয়েশা রা. হবে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

“যে জিনিস তোমার উপকার সাধন করবে, তার ব্যাপারে আগ্রহী হও এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও, আর কখনো অক্ষমতা প্রকাশ করো না। যদি তোমার উপর কোন বিপদ এসে পড়ে, তবে এ কথা বলো না, ‘যদি

আমি এরকম করতাম, তাহলে অবশ্যই এমন হতো’। বরং তুমি এ কথা বলো, ‘আল্লাহ যা তাকদীরে রেখেছেন এবং যা ইচ্ছা করেছেন তাই হয়েছে। কেননা ‘যদি’ কথাটি শয়তানের জন্য কুমন্ত্রণার পথ খুলে দেয়।” (বুখারি)

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় .

১। সূরা আল- ইমরানের ১৫৪ নং আয়াত এবং ৬৮ নং আয়াতের উল্লে-খিত অংশের তাফসীর।

২। কোন বিপদাপদ হলে ‘যদি’ প্রয়োগ করে কথা বলার উপর সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা।

৩। শয়তানের [কুমন্ত্রণামূলক] কাজের সুযোগ তৈরীর কারণ।

৪। উত্তম কথার প্রতি দিক নির্দেশনা।]

৫। উপকারী ও কল্যাণজনক বিষয়ে আগ্রহী হওয়ার সাথে সাথে আল্লাহর কাছে সাহায্য কামনা করা।

৬। এর বিপরীত অর্থাৎ ভাল কাজে অপারগতা ও অক্ষমতা প্রদর্শণের উপর নিষেধাজ্ঞা।

৫৮তম অধ্যায় .

বাতাসকে গালি দেয়া নিষেধ

১। উবাই ইবনে কা’ব রা. থেকে বর্ণিত আছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম এরশাদ করেছেন,

“তোমরা বাতাসকে গালি দিও না। তোমরা যদি বাতাসের মধ্যে তোমাদের অপছন্দনীয় কিছু প্রত্যক্ষ করো তখন তোমরা বলো,

“হে আল্লাহ এ বাতাসের যা কল্যাণকর, এতে যে মঙ্গল নিহিত আছে এবং যতটুকু কল্যাণ করার জন্য সে অদিষ্ট হয়েছে ততটুকু কল্যাণ ও মঙ্গল আমরা তোমার কাছে প্রার্থনা করি। আর এ বাতাসের যা অনিষ্টকর, তাতে যে অমঙ্গল লুকায়িত আছে, এবং যতটুকু অনিষ্ট সাধনের ব্যাপারে সে

আদিষ্ট হয়েছে তা [অমঙ্গল ও অনিষ্ঠতা] থেকে আমরা তোমার কাছে আশ্রয় চাই। [তিরমিজি হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন]

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় .

১। বাতাসকে গালি দেয়া নিষেধ।

২। মানুষ যখন কোন অপছন্দনীয় জিনিস দেখবে তখন কল্যাণকর কথার মাধ্যমে দিক নির্দেশনা দান করবে।

৩। বাতাস আল্লাহর পক্ষ থেকে আদিষ্ট, একথার দিক নির্দেশনা।

৪। বাতাস কখনো কল্যাণ সাধনের জন্য আবার কখনো অকল্যাণ করার জন্য আদিষ্ট হয়।

৫৯তম অধ্যায় .

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“তারা জাহেলী যুগের ধারণার মত আল্লাহ সম্পর্কে অবাস্তব ধারণা পোষণ করে। তারা বলে, ‘আমাদের জন্য কি কিছু করণীয় আছে? [হে রাসূল ] আপনি বলে দিন, ‘সব বিষয়ই আল্লাহর ইখতিয়ারভূক্ত।” [আল-ইমরান . ১৫৪]

২। আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করেছেন,

“তারা [মুনাফিকরা] আল্লাহ সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ করে, তারা নিজেরাই খারাপ ও দোষের আবর্তে নিপতিত।” (আল-ফাতাহ . ৬]

প্রথম আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনুল কাইয়্যিম বলেছেন, ظن এর ব্যাখ্যা এটাই করা হয়েছে যে, মুনাফিকদের ধারণা হচ্ছে আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলকে সাহায্য করেন না। তাঁর বিষয়টি অচিরেই নিঃশেষ হয়ে যাবে। ব্যাখ্যায় আরো বলা হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম এর উপর যে সব বিপদাপদ এসেছে তা আদৌ আল্লাহর ফয়সালা, তাকদীর এবং হিকমত মোতাবেক হয়নি।

উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় আরও বলা হয়েছে যে, মানুফিকরা আল্লাহর হিকমত, তাকদীর, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পূর্ণাঙ্গ রিসালত এবং সকল দ্বীনের উপর আল্লাহর দীন তথা ইসলামের বিজয়কে অস্বীকার করেছে। আর এটাই হচ্ছে সেই খারাপ ধারণা যা সূরা ‘ফাতহে’ উলে¬খিত মুনাফিক ও মুশরিকরা পোষণ করতো। এ ধারণা খারাপ হওয়ার কারণ এটাই যে, আল্লাহ তাআলার সুমহান মর্যাদার জন্য ইহা শোভনীয় ছিল না। তাঁর হিকমত প্রশংসা এবং সত্য ওয়াদার জন্যও উক্ত ধারণা ছিল বেমানান, অসৌজন্যমুলক।

যে ব্যক্তি মনে করে যে, আল্লাহ তাআলা বাতিলকে হকের উপর এতটুকু বিজয় দান করেন, যাতে হক অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে, অথবা যে ব্যক্তি আল্লাহর ফয়সালা, তাকদীরের নিয়মকে অস্বীকার করে, অথবা তাকদীর যে আল্লাহর হক মহা কৌশল এবং প্রশংসার দাবীদার এ কথা অস্বীকার করে, সাথে সাথে এ দাবীও করে যে, এসব আল্লাহ তাআলার নিছক অর্থহীন ইচ্ছামাত্র; তার এ ধারণা কাফেরদের ধারণা বৈ কিছু নয়। তাই জাহান্নামের কঠিন শাস্তি এ সব কাফেরদের জন্যই নির্ধারিত রয়েছে।

অধিকাংশ লোকই নিজেদের [সাথে সংশি¬ষ্ট] বিষয়ে এবং অন্যান্য লোকদের বেলায় আল্লাহ তাআলার ফয়সালার ব্যাপারে খারাপ ধারণা পোষণ করে। যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলা তাঁর আসমা ও সিফাত [নাম ও গুণাবলী] এবং তাঁর হিকমত ও প্রশংসা সম্পর্কে অবগত রয়েছে, কেবলমাত্র সেই আল্লাহর প্রতি এ খারাপ ধারণা থেকে মুক্ত থাকতে পারে।

যে ব্যক্তি প্রজ্ঞা সম্পন্ন, বুদ্ধিমান এবং নিজের জন্য কল্যাণকামী, তার উচিৎ এ আলোচনা দ্বারা বিষয়টির অপরিসীম গুরুত্ব অনুধাবন করা। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি স্বীয় রব সম্পর্কে খারাপ ধারণা করে, তার উচিৎ নিজ বদ-ধারণার জন্য আল্লাহর নিকট তওবা করা।

আল্লাহর প্রতি খারাপ ধারণা পোষণকারী কোন ব্যক্তিকে যদি তুমি পরীক্ষা করো, তাহলে দেখতে পাবে তার মধ্যে রয়েছে তাকদীরের প্রতি হিংসাত্মক বিরোধীতা এবং দোষারোপ করার মানসিকতা। তারা বলে, বিষয়টি এমন হওয়া উচিৎ ছিলো। এ ব্যাপারে কেউ বেশী, কেউ কম বলে থাকে তুমি তোমার নিজেকে পরীক্ষা করে দেখো, তুমি কি এ খারাপ ধারণা থেকে মুক্ত? কবির ভাষায় .

মুক্ত যদি থাকো তুমি এ খারাবী থেকে,

বেঁচে গেলে তুমি এক মহা বিপদ থেকে।

আর যদি নাহি পারো ত্যাগিতে এ রীতি,

বাঁচার তরে তোমার লাগি নাইকো কোন গতি।

এধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় .

১। সূরা আল- ইমরানের ১৫৪ নং আয়াতের তাফসীর।

২। সূরা “ফাতাহ” এর ৬ নং আয়াতের তাফসীর।

৩। আলোচিত বিষয়ের প্রকার সীমাবদ্ধ নয়।

৪। যে ব্যক্তি আল্লাহর আসমা ও সিফাত, [নাম ও গুণাবলী] এবং নিজের জ্ঞান সম্পর্কে অবহিত রয়েছে, কেবলমাত্র সেই আল্লাহর প্রতি কু-ধারণা পোষণ করা থেকে বাঁচতে পারে।

৬০তম অধ্যায়

তাকদীর অস্বীকারকারীদের পরিণতি

১। ইবনে ওমর রা. বলেছেন,

“সেই সত্তার কসম, যার হাতে ইবনে ওমরের জীবন, তাদের (তাকদীর অস্বীকারীদের) কারো কাছে যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও থাকে, অতঃপর তা আল্লাহর রাস্তায় দান করে দেয়, ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা উক্ত দান কবুল করবেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তাকদীরের প্রতি ঈমান আনে”। অতঃপর তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণী দ্বারা নিজ বক্তব্যের পক্ষে দলীল পেশ করেন,

“ঈমান হচ্ছে এই যে, তুমি আল্লাহ তাআলা, তাঁর সমুদয় ফিরিস্তা, তাঁর যাবতীয় [আসমানী] কিতাব, তাঁর সমস্ত রাসূল এবং আখেরাতের প্রতি

ঈমান আনয়ন করবে সাথে সাথে তাকদীর এবং এর ভাল-মন্দের প্রতি ঈমান আনয়ন করবে।” (মুসলিম)

২। উবাদা বিন সামেত রা. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি তার ছেলেকে বললেন, “হে বৎস, তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানের স্বাদ অনুভব করতে পারবে না, যতক্ষণ না তুমি এ কথা বিশ্বাস করবে, ‘তোমার জীবনে যা ঘটেছে তা ঘটারই ছিল। আর তোমার জীবনে যা ঘটেনি তা কোনদিন তোমার জীবনে ঘটার ছিলোনা।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬ামকে আমি এ কথা বলতে শুনেছি,

“সর্বপ্রথম আল্লাহ তাআলা যা সৃষ্টি কলেন তা হচ্ছে ‘কলম’। সৃষ্টির পরই তিনি কলমকে বললেন, “লিখ”। কলম বললো, ‘হে আমার রব, ‘আমি কি লিখবো?’ তিনি বললেন, ‘কেয়ামত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত সব জিনিসের তাকদীর লিপিবদ্ধ করো।” হে বৎস রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আমি বলতে শুনেছি,

“যে ব্যক্তি [তাকদীরের উপর] বিশ্বাস ব্যতীত মৃত্যু বরণ করলো, সে আমার উম্মতের মধ্যে গণ্য নয়।”

অন্য একটি রেওয়ায়েত বর্ণিত আছে,

“আল্লাহ তাআলা সর্ব প্রথম যা সৃষ্টি করলেন তা হচ্ছে ‘কলম’। এরপরই তিনি কলমকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘লিখ’। কেয়ামত পর্যন্ত যা সংঘটিত হবে, সে মুহুর্তে থেকে কলম তা লিখতে শুরু করে দিল। (আহমদ)

৩। ইবনে ওয়াহাবের একটি বর্ণনা মতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম এরশাদ করেছেন,

“যে ব্যক্তি তাকদীর এবং তাকদীরের ভাল- মন্দ বিশ্বাস করে না, তাকে আল্লাহ তাআলা জাহান্নামের আগুনে জ্বালাবেন করবেন।”

ইবনুদ্দাইলামী থেকে বর্ণিত আছে, কাতাদাহ রা. বলেন, ‘আমি ইবনে কা’ব এর কাছে আসলাম। তারপর বললাম, ‘তাকদীরের ব্যাপারে আমার মনে কিছু কথা আছে। আপনি আমাকে তাকদীর সম্পর্কে কিছু উপদেশমূলক কথা বলুন। এর ফলে হয়তো আল্লাহ তাআলা আমার অন্তর থেকে উক্ত জমাট বাধা কাদা দূর করে দিবেন। তখন তিনি বললেন, ‘তুমি যদি উহুদ [পাহাড়] পরিমাণ স্বর্ণও আল্লাহর রাস্তায় দান করো, আল্লাহ তোমার এ দান ততক্ষণ পর্যন্ত কবুল করবেন না, যতক্ষণ না তুমি তাকদীরকে বিশ্বাস করবে। আর এ কথা জেনে রাখো, তোমার জীবনে যা ঘটেছে তা ঘটতে কখনো ব্যতিক্রম হতো না। আর তোমার জীবনে যা সম্পর্কিত এ বিশ্বাস পোষণ না করে মৃত্যু বরণ করো, তা হলে অবশ্যই জাহান্নামী হবে’। তিনি বলেন, অতঃপর আমি আবদুল¬াহ ইবনে মাসউদ, হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান এবং যায়েদ বিন ছাবিত রা. এর নিকট গেলাম। তাঁদের প্রত্যেকেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এরকম হাদীসই বর্ণনা করেছেন।” ( হাকিম)

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয় গুলো জানা যায় .

১। তাকদীরের প্রতি ঈমান আনা ফরজ এর বর্ণনা।

২। তাকদীরের প্রতি কিভাবে ঈমান আনতে হবে, এর বর্ণনা।

৩। তাকদীরের প্রতি যার ঈমান নেই তার আমল বাতিল।

৪। যে ব্যক্তি তাকদীরের প্রতি ঈমান আনেনা সে ঈমানের স্বাদ অনুধাবন করতে অক্ষম।

৫। সর্বাগ্রে যা সৃষ্টি হয়েছে তার উল্লেখ।

৬। কেয়ামত পর্যন্ত যা সংঘটিত হবে, সৃষ্টির পর থেকেই কলম তা লিখতে শুরু করেছে।

৭। যে ব্যক্তি তাকদীর বিশ্বাস করে না তার ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম দায়িত্বমুক্ত।

৮। সালাফে সালেহীনের রীতি ছিল, কোন বিষয়ের সংশয় নিরসনের জন্য জ্ঞানী ও বিজ্ঞজনকে প্রশ্ন করা।

৯। ঊলামায়ে কেরাম এমন ভাবে প্রশ্ন কারীকে জবাব দিতেন যা দ্বারা সুন্দেহ দূর হয়ে যেতো। জবাবের নিয়ম এই যে, তাঁরা নিজেদের কথাকে শুধুমাত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম এর [কথা ও কাজের] দিকে সম্পৃক্ত করতেন।

৬১তম অধ্যায় .

ছবি অঙ্কনকারী বা চিত্র

শিল্পীদের পরিণাম

১। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম এরশাদ করেছেন,

“আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তার চেয়ে বড় জালেম আর কে হতে পারে, যে ব্যক্তি আমার সৃষ্টির মতো সৃষ্টি করতে চায়। তাদের শক্তি থাকলে তারা একটা অনু সৃষ্টি করুক অথবা একটি খাদ্যের দানা সৃষ্টি করুক অথবা একটি গমের দানা তৈরী করুক।” (বুখারি ও মুসলিম)

২। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম এরশাদ করেছেন,

“কেয়ামতের দিন সবচেয়ে শাস্তি পাবে তারাই যারা আল্লাহ তাআলার সৃষ্টির মতো ছবি বা চিত্র অঙ্কন করে।” (বুখারি ও মুসলিম)

৩। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬ামকে বলতে শুনেছি,

“প্রত্যেক চিত্র অঙ্কনকারীই জাহান্নামী। চিত্রকর যতটি [প্রাণীর] চিত্র এঁকেছে ততটি প্রাণ তাকে দেয়া হবে। এর মাধ্যমে তাকে জাহান্নামে শাস্তি দেয়া হবে।” (মুসলিম)

৪। ইবনে আব্বাস রা. থেকে ‘মারফু’ হাদীসে বর্ণিত আছে,

“যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কোন [প্রাণীর] চিত্র অঙ্কন করবে, কিয়ামতের দিন তাকে ঐ চিত্রে আত্মা দেয়ার জন্য বাধ্য করা হবে। অথচ সে আত্মা দিতে সক্ষম হবে না।” (বুখারি ও মুসলিম)

৫। আবুল হাইয়াজ থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আলী রা. আমাকে বললেন, ‘আমি কি তোমাকে এমন কাজে পাঠাবোনা, যে কাজে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম আমাকে পাঠিয়েছিলেন? সে কাজটি হচ্ছে, ‘তুমি কোন চিত্রকে ধ্বংস না করে ছাড়বে না। আর কোন উচু কবরকে [মাটির] সমান না করে ছাড়বে না।, (মুসলিম)

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় .

১। চিত্রকরদের ব্যাপারে খুব কঠোরতা অবলম্বন।

২। কঠোরতা অবলম্বনের কারণ সম্পর্কে মানুষকে সাবধান করে দেয়া। এখানে কঠোরতা অবলম্বনের কারণ হচ্ছে, আল্লাহর সাথে আদব রক্ষা না করা। এর প্রমাণ আল্লাহ বাণী ঃ

৩। সৃষ্টি করার ব্যাপারে আল্লাহর কুদরত বা সৃজনশীল ক্ষমতা। অপরদিকে সৃষ্টির ব্যাপারে বান্দার অক্ষমতা। তাই আল্লাহ চিত্রকরদেরকে বলেছেন, ‘তোমাদের ক্ষমতা থাকলে তোমরা একটা অনু অথবা একটা দানা কিং গমের দানা তৈরী করে নিয়ে এসো।’

৪। চিত্রকরের সবচেয়ে কঠিন শাস্তি হওয়ার সু¯পষ্ট ঘোষণা।

৫। চিত্রকর যতটা [প্রাণীর] ছবি আকবে, শাস্তি ভোগ করার জন্য ততটা প্রাণ তাকে দেয়া হবে। এবং এর দ্বারাই জাহান্নামে তাঁকে শাস্তি দেয়া হবে।

৬। অঙ্কিত ছবিতে রূহ বা আত্মা দেয়ার জন্য চিত্রকরকে বাধ্য করা হবে।

৭। [প্রাণীর] ছবি পাওয়া গেলেই তা ধ্বংস করার নির্দেশ।

৬২তম অধ্যায়

অধিক কসম সম্পর্কে

শরিয়তের বিধান

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“তোমাদের শপথসমূহকে তোমরা হেফাজত করো”। (মায়েদা : ৮৯)

২। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত আছে তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬ামকে একথা বলতে শুনেছি,

“[অধিক] শপথ, সম্পদ বিনষ্ট কারী এবং উর্পন ধ্বংশ কারী।” (বুখারি ও মুসলিম)

৩। সালমান রা. থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম এরশাদ করেছেন,

“তিন শ্রেণীর লোকদের সাথে আল্লাহ তাআলা [কেয়ামতের দিন] কথা বলবেন না, তাদেরকে [গুনাহ মাফের মাধ্যমে] পবিত্র করবেন না, বরং তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। তারা হচ্ছে, বৃদ্ধ জিনাকারী, অহংকারী গরীব, আর যে ব্যক্তি তার ব্যবসায়ী পণ্যকে খোদা বানিয়েছে অর্থাৎ কসম করা ব্যতী সে পণ্য ক্রয়ও করে না, কসম করা ব্যতীত পণ্য বিক্রয়ও করেনা।” (তাবরানী)

৩। ইমরান বিন হুসাইন রা. থেকে বর্ণিত আছে তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম এরশাদ করেছেন,

“আমার উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছে আমার যুগ, তারপর উত্তম হচ্ছে তাদের পরবর্তীতে যারা আসবে তারা। তারপর উত্তম হচ্ছে তাদের পরবর্তীতে যারা আসবে তারা”। ইমরান বলেন, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম তাঁর পরে দু’যুগের কথা বলেছেন নাকি তিন যুগের কথা বলেছেন তা আমি বলতে পারছিনা। অতঃপর তিনি [রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম] বলেন, ‘তোমাদের পরে এমন কওম আসবে যারা সাক্ষ্য দিবে, কিন্তু তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ যোগ্য হবে না। তারা বিশ্বাসঘাতকতা করবে, আমানত রক্ষা করবে না। তারা মান্নত করবে, কিন্তু তা পূর্ণ করবে না। আর তাদের শরীরে চর্বি দেখা দিবে।” (বুখারি)

৪। ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্নিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল¬াম এরশাদ করেছেন,

“সর্বোত্তম মানুষ হচ্ছে আমার যুগের মানুষ। এরপর উত্তম হলো এর পরবর্তীতে আগমনকারী লোকেরা। তারপর উত্তম হলো যারা তাদের পরবর্তীতে আসবে তারা। অতঃপর এমন এক জাতির আগমন ঘটবে যাদের কারো সাক্ষ্য কসমের আগেই হয়ে যাবে, আবার কসম সাক্ষ্যের আগেই হয়ে যাবে।” [অর্থাৎ কসম ও সাক্ষের মধ্যে কোন মিল থাকবে না। কসম ও সাক্ষ্য উভয়টাই মিথ্যা হবে।]

ইবরাহীম নখয়ী বলেন, আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন মিথ্যা সাক্ষ্যের জন্য আমাদের অভিভাবকগণ শাস্তি দিতেন।

            এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় .

১। ঈমান রক্ষা করার জন্য উপদেশ দান।

২। মিথ্যা কসম বানিজ্যিক পণ্যের ক্ষতি টেনে আনে, কামাই রোজগারের বরকত নষ্ট করে।

৩। যে ব্যক্তি মিথ্যা কসম ছাড়া ক্রয় বিক্রয় করেনা তার প্রতি কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারণ।

৪। স্বল্প কারণেও গুনাহ বিরাট আকার ধারণ করতে পারে, এ ব্যাপারে হুশিয়ারী উচ্চারণ।

            ৫। বিনা প্রয়োজনে কসম কারীদের প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন।

৬। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম কর্তৃক তিন অথবা চার যুগ বা কালের লোকদের প্রশংসা জ্ঞাপন এবং এর পরবর্তীতে যা ঘটবে তার উল্লেখ।

৭। মিথ্যা সাক্ষ্য ও ওয়াদার জন্য সালাফে সালেহীন কর্তৃক ছোটদেরকে শাস্তি প্রদান।

৬৩তম অধ্যায় .

আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জিম্মাদারী

সম্পর্কিত বিবরণ

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

            “আল্লাহর নামে যখন তোমরা কোন শক্ত ওয়াদা করো তখন তা পুরা করো এবং দৃঢ়তার সাথে কোন কসম করলে তা ভঙ্গ করোনা। (নাহর: ৯১)

২। বুরাইদাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম ছোট হোক, বড়হোক [কোন যুদ্ধে] যখন সেনাবাহিনীতে কাউকে আমীর বা সেনাপতি নিযুক্ত করতেন, তখন তাকে ‘তাকওয়ার’ উপদেশ দিতেন এবং তার সাথে যে সব মুসলমান থাকতো তাদেরকেও উত্তম উপদেশ দিতেন। তিনি বলতেন,

“তোমরা আল্লাহর নামে যুদ্ধ করো। যারা আল্লাহকে অস্বীকার করে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করো। তোমরা যুদ্ধ করো, কিন্তু বাড়াবাড়ি করোনা, বিশ্বাস ঘাতকতা করোনা। তোমরা শত্র“র নাক-কান কেটোনা বা অঙ্গ বিকৃত করোনা। তুমি যখন তোমার মুশরিক শত্র“দের মোকাবেলা করবে, তখন তিনিটি বিষয়ের দিকে তাদেরকে আহ্বান জানাবে। যে কোন একটি বিষয়ে তারা তোমার আহ্বানে সাড়া দিলে তা গ্রহণ করে নিও, আর তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করে দিও। অতঃপর তাদেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান করো। যদি তারা তোমার আহ্বানে সাড়া দেয়, তাহলে তাদেরকে গ্রহণ করে নিও। এরপর তাদেরকে তাদের বাড়ী-ঘর ছেড়ে দারুল মুহাজিরীনে স্থানান্তরিত হওয়ার জন্য হিজরত করার জন্য আহ্বান জানাও। হিজরত করলে তাদেরকে একথা জানিয়ে দাও, ‘মুহাজিরদের জন্য যে অধিকার রয়েছে, তাদেরও সে অধিকার আছে, সাথে সাথে মোহাজিরদের যা করণীয় তাদেরও তাই করণীয়। আর যদি তারা হিজরতের মাধ্যমে স্থান পরিবর্তন করতে অস্বীকার করে, তাহলে তাদেরকে বলে দিও যে, তারা গ্রাম্য সাধারণ মুসলিম বেদুঈনদের মর্যাদা পাবে। তাদের উপর আল্লাহর হুকুম আহকাম [বিধি- নিষেধ] জারি হবে। তবে ‘গনিমত’ বা যুদ্ধ-লব্ধ অতিরিক্ত সম্পদের ভাগ তারা মুসলমানদের সাথে জিহাদে অংশ গ্রহণ ব্যতীত পাবে না। এটাও যদি তারা অস্বীকার করে তবে তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, ‘তারা কর দিতে সম্মত কিনা। যদি কর দিতে সম্মত হয়, তবে তা গ্রহণ করো, আর তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করো। কিন্তু যদি কর দিতে তারা অস্বীকার করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো।

তুমি যদি কোন দুর্গের লোকদেরকে অবরোধ করো, আর দূর্গের লোকেরা যদি তখন চায় যে, তুমি তাদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জিম্মায় রেখে দাও, তবে তুমি কিন্তু তাদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জিম্মায় রেখোনা বরং তোমার এবং তোমার সঙ্গী সাথীদের জিম্মায় রেখে দিও। কারণ, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জিম্মাদারী রক্ষা করার চেয়ে তোমার এবং তোমার- সাথীদের জিম্মাদারী রক্ষা করা অনেক সহজ। তুমি যদি কোন দূর্গের অধিবাসীদেরকে অবরোধ করো। আর তুমি আল্লাহর ফয়সালার ব্যাপারে তাদের কথায় সম্মতি দিওনা। বরং তোমার নিজের ফয়সালাতে দিও। কারণ তুমি জাননা তাদের ব্যাপারে আল্লাহর ফায়সালার ক্ষেত্রে তুমি সঠিক ভূমিকা নিতে পারবে কিনা।” (মুসলিম)

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় ঃ

১। আল্লাহর জিম্মা, নবীর জিম্মা এবং মোমিনদের জিম্মার মধ্যে পার্থক্য।

২। দু’টি বিষয়ের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম বিপদজনক বিষয়টি গ্রহণ করার প্রতি দিক নির্দেশনা।

৩। আল্লাহর নামে আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করা।

৪। আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া এবং কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা।

৬। আল্লাহর হুকুম এবং আলেমদের হুকুমের মধ্যে পার্থক্য।

৭। সাহাবী কর্তৃক প্রয়োজনের সময় এমন বিচার ফয়সালা হয়ে যাওয়া যা আল্লাহর সাথে সংগতিপূর্ণ কিনা তাও তিনি জানেন না।

৬৪ তম অধ্যায় .

আল্লাহর ইচ্ছাধীন বিষয়ে

কসম করার পরিণতি

১। জুনদুব বিন আব্দুল¬াহ রা. থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম এরশাদ করেছেন,

“এক ব্যক্তি বললো, “আল্লাহর কসম, অমুক ব্যক্তিকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। তখন আল্লাহর তাআলা বললেন, ‘আমি অমুককে ক্ষমা করবোনা’ একথা বলে দেয়ার আস্পর্ধা কার আছে? আমি তাকেই ক্ষমা করে দিলাম। আর তোমার [কসম কারীর] আমল বাতিল করে দিলাম।” (মুসলিম)

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত হাদীসে আছে, “যে ব্যক্তি কসম করে উল্লে¬খিত কথা বলেছিলো, সে ছিলো একজন আবেদ। আবু হুরায়রা বলেন ঐ ব্যক্তি একটি মাত্র কথার মাধ্যমে তাঁর দুনিয়া এবং আখেরাত উভয়টাই বরবাদ করে ফেলেছে।

আলোচিত অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় ঃ

১। আল্লাহর ইচ্ছাধীন বিষয়ে মাতব্বরী করার ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করা। [অর্থাৎ মাতব্বরী না করা]

২। আমাদের কারো জাহান্নাম তার জুতায় ফিতার চেয়েও অধিক নিকটবর্তী।

৩। জান্নাতও অনুরূপ নিকটবর্তী।

৪। এ অধ্যায়ে এ কথার প্রমাণ রয়েছে যে, একজন লোক মাত্র একটি কথার মাধ্যমে তার দুনিয়া ও আখেরাত বরবাদ করে ফেলেছে।

৫। কোন কোন সময় মানুষকে এমন সামান্য কারণেও মাফ করে দেয়া হয়, যা তার কাছে সবচেয়ে অপছন্দের বিষয়।

৬৫তম অধ্যায় .

সৃষ্টির কাছে আল্লাহর

সুপারিশ করা যায় না

১। জুবাইর বিন মুতয়িম রা. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম এর কাছে আরব বেদুঈন এসে বললো, ‘ হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের জীবন ওষ্ঠাগত, পরিবার পরিজন ক্ষুধার্ত, সম্পদ ধ্বংস প্রাপ্ত। অতএব আপনি আপনার রবের কাছে বৃষ্টির প্রার্থনা করুন। আমরা আপনার কাছে আল্লাহর সুপারিশ করছি, আর আল্লাহর কাছে আপনার সুপারিশ করছি’। এভাবে তিনি আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করতে লাগলেন যে তাঁর এবং সাহাবায়ে কেরামের চেহারায় রাগতবাব প্রতিভাত হচ্ছিল। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল¬াম বললেন,

“তোমার ধ্বংস হোক, আল্লাহর মর্যাদা কত বড়, তা কি তুমি জানো? তুমি যা মনে করছো আল্লাহর মর্যাদা ও শান এর চেয়ে অনেক বেশী। কোন সৃষ্টির কাছেই আল্লাহর সুপারিশ করা যায় না।” (আবু দাউদ)

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়

১। ‘আপনার কাছে আল্লাহর সুপারিশ করছি’نستشفع بالله عليك

এ কথা যে ব্যক্তি বলেছিল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম কর্তৃক সে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল।

২। সৃষ্টির কাছে আল্লাহর সুপারিশের কথায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম এবং সাহাবায়ে কেরামের চেহারায় লক্ষণীয় পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়েছিল।

 ৩। نستشفع بك على الله [ আমরা আল্লাহর কাছে আপনার সুপারিশ কামনা করছি] এ কথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম প্রথ্যাখ্যান করেননি।

৪। “সুবহানাল¬াহ’ এর তাফসীরের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন।

৫। মুসলমানগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬ামকে আল্লাহর কাছে বৃষ্টি চাওয়ার জন্য আবেদন করতেন।

৬৬তম অধ্যায় .

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম কর্তৃক

তাওহীদ সংরক্ষণ এবং শিরকের মূলোৎপাটন

১। আবদুল¬াহ বিন আশশিখখির রা. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি বনী আমেরের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম এর নিকট গেলাম। আমরা তাকে উদ্দেশ্য করে বললাম, أنت سيدنا [আপনি আমাদের প্রভু] তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম বললেন, ألسيد الله [আল্লাহ তাআলাই হচ্ছেন প্রভু]। আমরা বললাম, ‘আমাদের মধ্যে মর্যাদার দিক থেকে আপনি সর্বশ্রেষ্ঠ এবং আমাদের মধ্যে সর্বাধিক দানশীল ও ধৈর্যশীল।’ এরপর তিনি বললেন,

“তোমরা তোমাদের বলে যাও। শয়তান যেন তোমাদের উপর সওয়ার না হতে পারে।” (আবু দাওদ)

২। আনাস রা. থেকে বর্ণিত্ াছে, কতিপয় লোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬ামকে লক্ষ্য করে বললো, “হে আল্লাহর রাসূল, কে আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি, এবং আমাদের প্রভূ তনয়” তখন তিনি বললেন,

 হে লোক সকল, তোমরা তোমাদের কথা বলে যাও। শয়তান যেন তোমাদেরকে বিভ্রান্ত ও প্রতারিত করতে না পারে। আমি হচ্ছি মুহাম্মদ, আল্লাহর বান্দা এবং তার রাসূল। আল্লাহ তাআলা আমাকে যে মর্যাদার স্থানে অধিষ্টিত করেছেন, তোমরা এর উর্ধ্বে আমাকে স্থান দিবে এটা আমি পছন্দ করি না। (নাসায়ী)

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় .

১। দ্বীনের ব্যাপারে সীমা লংঘন না করার জন্য মানুষের প্রতি হুশিয়ারী উচ্চারণ।

২। ‘আপনি আমাদের প্রভূ বা মনিব’ বলে সম্বোধন করা হলে জবাবে তার কি বলা উচিৎ, এ ব্যাপারে জ্ঞান লাভ।

৩। লোকেরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম এর প্রতি সম্মান ও মর্যাদার ব্যাপারে কিছু কথা বলার পর তিনি বলেছিলেন, “শয়তান যে তোমাদের উপর চড়াও না হয়।” অথচ তারা তাঁর ব্যাপারে হক কথাই বলেছিল। এর তাৎপর্য অনুধান করা।

৪। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল¬াম এর বাণী ما أحب أن ترفعونى فوق منـزلتى অর্থাৎ তোমরা আমাকে স্বীয় মর্যাদার উপরে স্থান দাও এটা আমি পছন্দ করিনা। একথার তাৎপর্য উপলব্ধি করা।

৬৭তম অধ্যায় .

মানুষ আল্লাহ তাআলার পূর্ণাঙ্গ মর্যাদা

নিরুপনে অক্ষম

১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

“তারা আল্লাহর যথার্থ মর্যাদা নিরুপন করতে পারেনি। কেয়ামতের দিন সমগ্র পৃথিবী তাঁর হাতের মুঠোতে থাকবে।” (ঝুমার : ৬৭)

২। ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, একজন ইহুদী পন্ডিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম এর নিকট এসে বললো, ‘হে মুহাম্মদ, আমরা [তাওরাত কিতাবে] দেখতে পাই যে, আল্লাহ তাআলা সমস্ত আকাশ মন্ডলীকে এক আঙ্গুলে, সমস্ত যমীনকে এক আঙ্গুলে, বৃক্ষরাজিকে এক আঙ্গুলে, পানি এক আঙ্গুলে ভূতলের সমস্ত জিনিসকে এক আঙ্গুলে এবং সমস্ত সৃষ্টি জগতকে এক আঙ্গুলে রেখে বলবেন, আমিই সম্রাট।’

এ কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম ইহুদী পন্ডিতের কথার সমর্থনে এমন ভাবে হেসে দিলেন যে তাঁর দন্ত মোবারক দেখা যাচ্ছিল। অতপর তিনি

এ আয়াতটুকু পড়লেন।

সহীহ মুসলিমের হাদীসে বর্ণিত আছে, পাহাড়- পর্বত এবং বৃক্ষরাজি এক হাতে থাকবে তারপর এগুলোকে ঝাকুনি দিয়ে তিনি বলবেন, ‘আমি রাজাধিরাজ, আমিই আল্লাহ।’

সহীহ বুখারীর এক বর্ণনায় আছে, সমস্ত আকাশ মন্ডলীকে এক আঙ্গুলে রাখবেন। পানি এবং ভূতলে যা কিছু আছে তা এক আঙ্গুলে রাখবেন। আরেক আঙ্গুলে রাখবেন সমস্ত সৃষ্টি। (বুখারী ও মুসলিম)

 ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত মারফু হাদীসে আছে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা সমস্ত আকাশমন্ডলীকে ভাঁজ করবেন। অতঃপর সাত তবক যমীনকে ভাঁজ করবেন এবং এগুলোকে বাম হাতে নিবেন। তারপর বলবেন, “আমি হচ্ছি রাজাধিরাজ। অত্যাচারীরা কোথায়? অংহকারীরা কোথায়? (মুসলিম)

৩। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, সাত তবক আসমান ও যমীন আল্লাহ তাআলার হাতের তালুতে ঠিক যেন তোমাদের কারো হাতে এটা সরিষার দানার মত।

৪। ইবনে যায়েদ বলেন, “আমার পিতা আমাকে বলেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম এরশাদ করেছেন,

“কুরসীর মধ্যে সপ্তাকাশের অবস্থান ঠিক যেন, একটি ঢালের মধ্যে নিক্ষিপ্ত সাতটি দিরহামের [মুদ্রার] মত।” তিনি বলেন, ‘আবুযর রা. বলেছেন, ‘আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল¬ামকে এ কথা বলতে শুনেছি,

            “আরশের মধ্যে কুরসীর অবস্থান হচ্ছে ঠিক ভূপৃষ্ঠের কোন উন্মুক্ত স্থানে পড়ে থাকা একটি আংটির মত।

৫। ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ‘দুনিয়ার আকাশ এবং এর পরবর্তী আকামের মধ্যে দূরত্ব হচ্ছে পাঁচশ’ বছরের পথ। আর এক আকাশ থেকে অন্য আকাশের দূরত্ব হচ্ছে পাঁচশ বছরের। এমনিভাবে সপ্তমাকাশের মধ্যে দূরত্ব হচ্ছে পাঁচশ বছরের পথ। একই ভাবে কুরসী এবং পানির মাঝখানে দূরত্ব হচ্ছে পাঁচশ বছরের। আরশ হচ্ছে পানির উপরে। আর আল্লাহ তাআলা সমাসীন রয়েছেন আরশের উপর। তোমাদের আমলের কোন কিছুই তাঁর কাছে গোপন নেই। (ইবনে মাহদী হাম্মাদ বিন সালামা হতে তিনি আসেম হতে, তিনি যিরর হ’তে, এবং যিরর আবদুল¬াহ হতে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।

(অনুরূপ হাদীস মাসউদী আসেম হতে তিনি আবি ওয়ায়েল হতে, এবং তিনি আবদুল¬াহ হতে বর্ণনা করেছেন।)

            ৬। আব্বাস বিন আবদুল মোত্তালিব রা. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম এরশাদ করেছেন,

“তোমরা কি জানো, আসমান ও যমীনের মধ্যে দূরত্ব কত?” আমরা বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই সবচেয়ে ভাল জানেন। তিনি বললেন, “আসমান ও যমীনের মাঝে দূরত্ব হচ্ছে পাঁচশ বছরের পথ। এক আকাশ থেকে অন্য আকাশের দূরত্ব হচ্ছে পাঁচশ’ বছরের পথ। প্রতিটি আকাশের ঘনত্বও (পুরু ও মোটা) পাঁচশ’ বছরের পথ। সপ্তমাকাশ ও আরশের মধ্যখানে রয়েছে একটি সাগর। যার উপরিভাগ ও তলদেশের মাঝে দূরত্ব হচ্ছে আকাশ ও যমীনের মধ্যকার দূরত্বের সমান। আল্লাহ তাআলা এর উপরে সমাসীন রয়েছেন। আদম সন্তানের কোন কর্মকাণ্ডই তাঁর অজানা নয়।” (আবু দাউদ)

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় .

১। والارض جميعا قبضته এর তাফসীর

২। এ অধ্যায়ে আলোচিত জ্ঞান ও এতদসংশি¬ষ্ট জ্ঞানের চর্চা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম এর যুগের ইহুদীদের মধ্যেও বিদ্যমান ছিলো। তারা এ জ্ঞানকে অস্বীকার ও করতোনা।

৩। ইহুদী পন্ডিত ব্যক্তি যখন কেয়ামতের দিনে আল্লাহর ক্ষমতা সংক্রান্ত কথা বললো, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম তার কথাকে সত্যায়িত করলেন এবং এর সমর্থনে কোরআনের আয়াতও নাযিল হলো।

৪। ইহুদী পন্ডিত কর্তৃক আল্লাহর ক্ষমতা সম্পর্কিত মহাজ্ঞানের কথা উল্লেখ করা হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম এর হাসির উদ্রেক হওয়ার রহস্য।

৫। আল্লাহ তাআলার দু’হস্ত মোবারকের সুস্পষ্ট উল্লেখ্য। আকাশ মন্ডলী তাঁর ডান হাতে, আর সমগ্র যমীন তাঁর অপর হাতে নিবদ্ধ থাকবে।

৬। অপর হাতকে বাম হাত বলে নাম করণ করার সুস্পষ্ট ঘোষণা।

৭। কেয়ামতের দিন অত্যাচারী এবং অহংকারীদের প্রতি আল্লাহর শাস্তির উল্লেখ।

৮। আকাশের তুলনায় আরশের বিশালতার উল্লে¬খ।

৯। “তোমাদের কারো হাতে একটা সরিষা দানার মত” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম এর এ কথার তাৎপর্য।

১০। কুরসীর তুলনায় আরশের বিশালতার উল্লেখ।

১১। কুরসী এবং পানি থেকে আরশ সম্পূর্ণ আলাদা।

১২। প্রতিটি আকাশের মধ্যে দূরত্ব ও ব্যবধানের উল্লে¬খ।

১৩। সপ্তমাকাশ ও কুরসীর মধ্যে ব্যবধান।

১৪। কুরসী এবং পানির মধ্যে দূরত্ব।

১৫। আরশের অবস্থান পানির উপর।

১৬। আল্লাহ তাআলা আরশের উপরে সমাসীন।

১৭। আকাশ ও যমীনের দূরত্বের উল্লে¬খ।

১৮। প্রতিটি আকাশের ঘনত্ব (পুরো) পাঁচশ বছরের পথ।

১৯। আকাশ মন্ডলীর উপরে যে সমুদ্র রয়েছে তার উর্ধ্ব দেশ ও তলদেশের মধ্যে দূরত্ব হচ্ছে পাঁচশ’ বছরের পথ।

والحمد لله رب العلمين وصلى الله على سيدنا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين.

৫। উপরোল্লিখিত তিনটি বিষয় ঈমানের দুর্বলতার আলামত।

৬। এখলাসের সাথে একমাত্র আল্লাহকে ভয় করা ফরজের অন্তর্ভুক্ত।

৭। অন্তর থেকে আল্লাহর ভয় পরিত্যাগকারীর জন্য শাস্তির উল্লেখ।

৮। আল্লাহকে যে ভয় করে তার জন্য সওয়াবের উল্লেখ।

Leave a Reply