নতুন লেখা

কাসাসুল আম্বিয়া pdf তথা নাবীগণের ঘটনা এবং বর্ণনা

কাসাসুল আম্বিয়া pdf তথা নাবীগণের ঘটনা এবং বর্ণনা

কাসাসুল আম্বিয়া pdf তথা নাবীগণের ঘটনা এবং বর্ণনা << নবুওয়তের মুজিযা হাদীসের মুল সুচিপত্র দেখুন

ঊনচল্লিশতম পরিচ্ছেদ – কাসাসুল আম্বিয়া pdf তথা নাবীগণের ঘটনা

কাসাসুল আম্বিয়া pdf নবুওয়তের প্রমানের সাথে এজন্য সম্পৃক্ত যে, একজন উম্মী নাবী রাঃসাঃ তাদের সম্পর্কে সংবাদ দিতেন, তারা কেউ এর প্রতিবাদ বা প্রত্যাখ্যান করতে সক্ষম হয়নি।

কাসাসুল আম্বিয়া শুধু কুরআন ও হাদীসের থেকেই গ্রহণ করা হবে। হাদীসের তুলনায় কুরআনেই নাবীগণের ঘটনা বেশি ও অধিক স্পষ্ট।

আমি এখানে নাবীগণের ঘটনা সম্পৃক্ত কিছু আয়াত উল্লেখ করেছি যেগুলো দালায়েনুন নুবুওয়াহ এর সাথে সম্পৃক্ত, এগুলো আমাদের নাবী মুহাম্মদ রাঃসাঃ এর নবুওয়তের প্রমাণ বহন করে।

আল্লাহ তা`আলা বলিয়াছেন,

“আর যখন মারইয়াম পুত্র ঈসা বলেছিল, `হে বনী ইসরাঈল, নিশ্চয় আমি তোমাদের নিকট আল্লাহর রাসূল। আমার পূর্ববর্তী তাওরাতের সত্যায়নকারী এবং একজন রাসূলের সুসংবাদদাতা যিনি আমার পরে আসবেন, যার নাম আহমদ`। অতঃপর সে যখন সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ নিয়ে আগমন করল, তখন তারা বলল, `এটাতো স্পষ্ট জাদু”। [কোরআনের সুরা আস্-সাফ: ৬]

আদম ও হাওয়া আলাইহিমাস সালামের ঘটনা

আল্লাহ তা `আলা বলিয়াছেন,

“আর অবশ্যই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি শুকনো ঠনঠনে, কালচে কাদামাটি থেকে। আর ইতঃপূর্বে জিনকে সৃষ্টি করেছি উত্তপ্ত অগ্নিশিখা থেকে। আর স্মরণ কর, যখন তোমার রব ফেরেশতাদের বলিলেন, `আমি একজন মানুষ সৃষ্টি করতে যাচ্ছি শুকনো ঠনঠনে কালচে মাটি থেকে`। `অতএব যখন আমি তাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেব এবং তার মধ্যে আমার রূহ ফুঁকে দেব, তখন তোমরা তার জন্য সিজদাবনত হও`। অতঃপর, ফেরেশতারা সকলেই সিজদা করল। ইবলীস ছাড়া। সে সিজদাকারীদের সঙ্গী হতে অস্বীকার করল। তিনি বলিলেন, `হে ইবলীস, তোমার কী হল যে, তুমি সিজদাকারীদের সঙ্গী হলে না`? সে বলল, `আমি তো এমন নই যে, একজন মানুষকে আমি সিজদা করব, যাকে আপনি সৃষ্টি করেছেন শুকনো ঠনঠনে কালচে মাটি থেকে”। [কোরআনের সুরা: আল-হিজর: ২৬-৩৩]

তাই আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছি শুকনো ঠনঠনে, কালচে কাদামাটি থেকে। সুতরাং আমরা দারউইনের মতামত প্রত্যাখ্যান করি। যারা মানব জাতির আদি পিতা আদম আলাইহিস সালামের সৃষ্টির ব্যাপারে ভুল ব্যাখ্যা করে এবং কুরআনকে মিথ্যারোপ করে। অথচ অনেক মুসলিমই একথা জানে না।

আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, নাবী রাঃসাঃ বলেন, আল্লাহ তা`আলা আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করেছেন, তাহাঁর দৈর্ঘ্য ছিল ষাট হাত। এরপর তিনি [আল্লাহ্] তাঁকে [আদমকে] বলিলেন, যাও ঐ ফিরিশতা দলের প্রতি সালাম কর এবং তাঁরা তোমার সালামের উত্তর কিরূপে দেয় তা মনোযোগ দিয়ে শোন। কেননা এটাই হবে তোমার এবং তোমার সন্তানদের সালামের রীতি। তারপর আদম আদম আলাইহিস সালাম [ফিরিশতাদের] বলিলেন, “আস্‌সালামু আলাইকুম”। ফিরিশতাগণ তার উত্তরে “আস্‌সালামু আলাইকা ওয়া রাহামাতুল্লাহ” বলিলেন। ফিরিশতারা সালামের জওয়াবে “ওয়া রাহ্‌মাতুল্লাহ” শব্দটি বাড়িয়ে বলিলেন। যারা জান্নাতে প্রবেশ করবেন তারা আদম আদম আলাইহিস সালামের আকৃতি বিশিষ্ট হবেন। তবে আদম সন্তানদের দেহের দৈর্ঘ্য সর্বদা কমতে কমতে বর্তমান পরিমাপ পর্যন্ত পোঁছেছে।[1]

আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু সূত্রে নাবী রাঃসাঃ থেকে অনুরূপ বর্ণিত আছে। অর্থাৎ নাবী রাঃসাঃ বলিয়াছেন, বনী ইসরাঈল যদি না হত তবে গোশত দুর্গন্ধযুক্ত হতো না। আর যদি হাওয়া আলাইহাস সালাম না হতেন তবে কোনো নারীই তাহাঁর স্বামীর খেয়ানত করত না।[2]

আবু হুরাইরা রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত , একদা রাঃসাঃ  এর সামনে গোশত আনা হল এবং তাকে সামনের রান পরিবেশন করা হল। তিনি এটা পছন্দ করতেন। তিনি তার থেকে কামড় দিয়ে খেলেন। এরপর বলিলেন, আমি হব কিয়ামতের দিন মানবকুলের সরদার। তোমাদের কি জানা আছে তা কেন? কিয়ামতের দিন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সব মানুষ এমন এক ময়দানে সমবেত হবে, যেখানে একজন আহ্বানকারীর আহবান সকলে শুনতে পাবে এবং সকলেই একসঙ্গে দৃষ্টিগোচর হবে। সূর্য নিকটে এসে যাবে। মানুষ এমনি কষ্ট ক্লেশের সম্মুখিন হবে যা অসহনীয় ও অসহ্যকর হয়ে পড়বে। তখন লোকেরা বলবে, তোমরা কি বিপদের সম্মুখীন হয়েছ তা কি দেখতে পাচ্ছনা? তোমরা কি এমন কাউকে খুঁজে বের করবেনা যিনি তোমাদের রবের কাছে তোমাদের জন্য সুপারিশকারি হবেন? কেউ কেউ অন্যদের বলবে যে, আদম আলাইহিস সালামের কাছে চল। তখন সকলে তার কাছে এসে তাকে বলবে, আপনি আবুল বাশার [মানবজাতির পিতা]। আল্লাহ তা`আলা আপনাকে স্বীয় কুদরতি হাত দ্বারা সৃষ্টি করেছেন এবং তার রুহ আপনার মধ্যে ফুঁকে দিয়েছেন। ফেরেশতাদের নির্দেশ দিলে তারা আপনাকে সিজদা করেন। আপনি আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না যে, আমরা কিসের মধ্যে আছি? আপনি কি দেখছেন না যে আমরা কি অবস্থায় পৌঁছেছি? তখন আদম আলাইহিস সালাম বলবেন, আজ আমার রব এত রাগান্বিত হয়েছেন যার আগে কনদিন এরূপ রাগান্বিত হননি, আর পরেও এরূপ রাগান্বিত হবেন না। তিনি আমাকে একটি বৃক্ষের কাছে যেতে নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু আমি অমান্য করেছি। নফসি, নফসি, নফসি [আমি নিজেই সুপারিশ প্রার্থী], তোমরা অন্যের কাছে যাও। তোমরা নূহ আলাইহিস সালামের কাছে যাও। তখন সকলে নূহ আলাইহিস সালামের কাছে এসে বলবে, হে নূহ আলাইহিস সালাম! নিশ্চয়ই আপনি পৃথিবীর মানুষের জন্য প্রথম রাসুল। আর আল্লাহ তা`আলা আপনাকে পরম কৃতজ্ঞ বান্দা হিসেবে অভিহিত করেছেন। সুতরাং আপনি আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না যে আমরা কিসের মধ্যে আছি? তিনি বলবেন, আজ আমার রব এত রাগান্বিত হয়েছেন যার আগে কোনদিন এরূপ রাগান্বিত হন নি আর পরেও এরূপ রাগান্বিত হবেন না। আমার একটি গ্রহণীয় দো`আ ছিল যা আমি আমার কওমের ব্যপারে করে ফেলেছি। [এখন] নফসি, নফসি, নফসি। তোমরা অন্যের কাছে যাও। যাও তোমরা ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের কাছে। তখন তারা ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের কাছে এসে বলবে, হে ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম! আপনি আল্লাহর নাবী এবং পৃথিবীর মানুষের মধ্যে আপনি আল্লাহর বন্ধু। আপনি আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না যে আমরা কিসের মধ্যে আছি? তিনি বলবেন, আজ আমার রব এত রাগান্বিত হয়েছেন যার আগে কোনদিন এরূপ রাগান্বিত হননি আর পরেও এরূপ রাগান্বিত হবেন না। আর আমি তো তিনটি মিথ্যা বলে ফেলেছিলাম। রাবি আবু হাইয়ান তার বর্ণনায় এগুলোর উল্লেখ করেছেন। [এখন] নফসি, নফসি, নফসি। তোমরা অন্যের কাছে যাও। যাও তোমরা মূসা আলাইহিস সালামের কাছে। তারা মূসা আলাইহিস সালামের কাছে এসে বলবে, হে মুসা আলাইহিস সালাম! আপনি আল্লাহর রাসূল। আল্লাহ আপনাকে রিনামায এর সম্মান দান করেন এবং আপনার সাথে কথা বলে সমগ্র মানব জাতির উপর মর্যাদা দান করেছেন। আপনি আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না যে আমরা কিসের মধ্যে আছি? তিনি বলবেন, আজ আমার রব এত রাগান্বিত হয়েছেন যার আগে কনদিন এরূপ রাগান্বিত হননি আর পরেও এরূপ রাগান্বিত হবেন না। আর আমিতো এক ব্যক্তিকে হত্যা করে ফেলেছিলাম। যাকে হত্যা করার জন্য আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়নি। [এখন] নফসি, নফসি, নফসি। তোমরা অন্যের কাছে যাও। যাও তোমরা ঈসা আলাইহিস সালামের কাছে। তারা ঈসা আলাইহিস সালামের কাছে এসে বলবে, হে ঈসা আলাইহিস সালাম! আপনি আল্লাহর রাসুল এবং কালেমা, যা তিনি মরিয়ম আলাইহিস সালামের উপর ঢেলে দিয়েছিলেন। আপনি রূহ। আপনি দোলনায় থেকে মানুষের সাথে কথা বলিয়াছেন। আজ আপনি আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না যে আমরা কিসের মধ্যে আছি? তিনি বলবেন, আজ আমার রব এত রাগান্বিত হয়েছেন যার আগে কনদিন এরূপ রাগান্বিত হন নি আর পরেও এরূপ রাগান্বিত হবেন না। তিনি নিজের কন গুনাহের কথা বলবেন না। নফসি, নফসি, নফসি। তোমরা অন্যের কাছে যাও। যাও তোমরা মুহাম্মদ রাঃসাঃ এর কাছে। তারা মুহাম্মদ রাঃসাঃ এর কাছে এসে বলবে, হে মুহাম্মদ রাঃসাঃ! আপনি আল্লাহর রাসুল ও শেষ নাবী। আল্লাহ তা`আলা আপনার আগের, পরের সব গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। আপনি আমাদের জন্য আপনার রবের কাছে সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না আমরা কিসের মধ্যে আছি? তখন আমি আরশের নীচে এসে আমার রবের সামনে সিজদা দিয়ে পড়ব। তারপর আল্লাহ তা`আলা তার প্রশংসা এবং গুণগানের এমন সুন্দর পদ্ধতি আমার সামনে খুলে দিবেন যা এর আগে অন্য কারও জন্য খুলেন নি। এরপর বলা হবে, হে মুহাম্মদ! তোমার মাথা উঠাও। তুমি যা চাও তোমাকে দেওয়া হবে। তুমি সুপারিশ কর, তোমার সুপারিশ কবুল করা হবে। এরপর আমি মাথা উঠিয়ে বলব, “হে আমার রব! আমার উম্মত! হে আমার রব! আমার উম্মত! হে আমার রব! আমার উম্মত! তখন বলা হবে, হে মুহাম্মদ! আপনার উম্মতের মধ্যে যাদের কোনো হিসাব নিকাশ হবেনা, তাদেরকে জান্নাতের দরজাসমূহের ডান পাশের দরজা দিয়ে প্রবেশ করিয়ে দিন। এ দরজা ছাড়া অন্যদের সাথে অন্য দরজায় ও তাদের প্রবেশের অধিকার থাকবে। তারপর তিনি বলবেন, যার হাতে আমার প্রান সে সত্তার শপথ! বেহেশতের এক দরজার দুই পাশের মধ্যবর্তী প্রশস্ততা যেমন মক্কা ও হামিরের মধ্যবর্তী দূরত্ব, অথবা মক্কা ও বসরার মাঝখানের দূরত্ব। [3]

আব্দুল্লাহ রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাঃসাঃ  বলিয়াছেন, যদি কোন ব্যক্তি অত্যাচারিত হয়ে নিহত হয়, তবে সেই খুনের একাংশ [পাপ] আদম আলাইহিস সালামের প্রথম পূত্র [কাবিল] এর উপর বর্তায়। কেননা, সেই সর্বপ্রথম খুনের প্রথা প্রচলন করেছিল।[4]

আনাস ইবনু মালিক রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাঃসাঃ  বলিয়াছেন, আল্লাহ তা`আলা জান্নাতে যখন আদম আলাইহিস সালামের আকৃতি দান করেন তখন তিনি তাকে তাহাঁর ইচ্ছা ছেড়ে দিলেন। আর ইবলীস তার চতুর্দিকে ঘোরাফেরা করতে এবং দেখতে লাগল যে, জিনিসটি কি? সে যখন দেখতে পেল, তা শূন্য পাত্র তখন বুঝল যে, [আল্লাহ] তাকে এমন এক মাখলূক রূপে করেছেন, যে নিজেকে বশে রাখতে পারে না।[5]

নূহ আলাইহিস সালাম

আল্লাহ তা`আলা বলিয়াছেন,

“আমি তো নূহকে তার কওমের নিকট প্রেরণ করেছি। অতঃপর সে বলেছে, `হে আমার কওম, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো [সত্য] ইলাহ নেই। নিশ্চয় আমি তোমাদের মহাদিনের আযাবের ভয় করছি`। তার কওম থেকে নেতৃবর্গ বলল, `নিশ্চয় আমরা তোমাকে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে দেখতে পাচ্ছি`। সে বলল, `হে আমার কওম, আমার মধ্যে কোনো ভ্রান্তি নেই; কিন্তু আমি সকল সৃষ্টির রবের পক্ষ থেকে রাসূল`। আমি তোমাদের নিকট পৌঁছাচ্ছি আমার রবের রিনামাযসমূহ এবং তোমাদের কল্যাণ কামনা করছি। আর আমি আল্লাহর কাছ থেকে এমন কিছু জানি, যা তোমরা জান না`।`তোমরা কি আশ্চর্য হচ্ছো যে, তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তির নিকট উপদেশ এসেছে, যাতে সে তোমাদেরকে সতর্ক করে, আর যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর এবং যাতে তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হও`? অতঃপর তারা তাকে মিথ্যাবাদী বলল। ফলে আমি তাকে ও তার সাথে নৌকায় যারা ছিল তাদেরকে রক্ষা করলাম; আর যারা আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছিল তাদেরকে আমি ডুবিয়ে দিলাম। নিশ্চয় তারা ছিল অন্ধ কওম”। [কোরআনের সুরা আল-আ`রাফ: ৫৯-৬৪]

আল্লাহ তা`আলা আরো বলিয়াছেন,

“আর নূহের কাছে ওহী পাঠানো হল যে, `যারা ঈমান এনেছে, তারা ছাড়া তোমার কওমের আর কেউ ঈমান আনবে না। সুতরাং তারা যা করে সে জন্য তুমি দুঃখিত হয়ো না`।`আর তুমি আমার চোখের সামনে ও আমার ওহী অনুসারে নৌকা তৈরী কর। আর যারা যুলম করেছে, তাদের ব্যাপারে তুমি আমার কাছে কোনো আবেদন করো না। নিশ্চয় তাদেরকে ডুবানো হবে`।আর সে নৌকা তৈরী করতে লাগল এবং যখনই তার কওমের নেতৃস্থানীয় কোনো ব্যক্তি তার পাশ দিয়ে যেত, তাকে নিয়ে উপহাস করত। সে বলল, `যদি তোমরা আমাদের নিয়ে উপহাস কর, তবে আমরাও তোমাদের নিয়ে উপহাস করব, যেমন তোমরা উপহাস করছ`। অতএব, শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে, কার উপর সে আযাব আসবে যা তাকে লাঞ্ছিত করবে এবং কার উপর আপতিত হবে স্থায়ী আযাব।অবশেষে যখন আমার আদেশ আসল এবং চুলা উথলে উঠল[6], আমি বলিলাম, `তুমি তাতে তুলে নাও প্রত্যেক শ্রেণী থেকে জোড়া জোড়া[7] এবং যাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছে তাদের ছাড়া তোমার পরিবারকে এবং যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে। আর তার সাথে অল্পসংখ্যকই ঈমান এনেছিল। আর সে বলল, `তোমরা এতে আরোহণ কর। এর চলা ও থামা হবে আল্লাহর নামে। নিশ্চয় আমার রব অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আর তা পাহাড়সম ঢেউয়ের মধ্যে তাদেরকে নিয়ে চলছিল এবং নূহ তার পুত্রকে ডাক দিল, আর সে ছিল আলাদা স্থানে- `হে আমার পুত্র, আমাদের সাথে আরোহণ কর এবং কাফিরদের সাথে থেকো না`।সে বলল, `অচিরেই আমি একটি পাহাড়ে আশ্রয় নেব, যা আমাকে পানি থেকে রক্ষা করবে`। সে [নূহ] বলল, `যার প্রতি আল্লাহ দয়া করেছেন সে ছাড়া আজ আল্লাহর আদেশ থেকে কোনো রক্ষাকারী নেই`। এরপর তাদের উভয়ের মধ্যে ঢেউ অন্তরায় হয়ে গেল। অতঃপর সে নিমজ্জিতদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল । আর বলা হল, `হে যমীন, তুমি তোমার পানি চুষে নাও, আর হে আসমান, বিরত হও`। অতঃপর পানি কমে গেল এবং [আল্লাহর] সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হল, আর নৌকা জুদী পর্বতের উপর উঠল এবং ঘোষণা করা হল, `ধ্বংস যালিম কওমের জন্য`। আর নূহ তার রবকে ডাকল এবং বলল, `হে আমার রব, নিশ্চয় আমার সন্তান আমার পরিবারভুক্ত এবং আপনার ওয়াদা নিশ্চয় সত্য। আর আপনি বিচারকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিচারক`। তিনি বলিলেন, `হে নূহ, সে নিশ্চয় তোমার পরিবারভুক্ত নয়। সে অবশ্যই অসৎ কর্মপরায়ণ। সুতরাং যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, আমার কাছে তা চেয়ো না। আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি, যেন মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত না হও`। সে বলল, `হে আমার রব, যে বিষয়ে আমার জ্ঞান নেই তা চাওয়া থেকে আমি অবশ্যই আপনার আশ্রয় চাই। আর যদি আপনি আমাকে মাফ না করেন এবং আমার প্রতি দয়া না করেন, তবে আমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব`।বলা হল, `হে নূহ, তোমার ও তোমার সাথে যে উম্মত রয়েছে তাদের উপর আমার পক্ষ থেকে শান্তি ও বরকতসহ অবতরণ কর। আর আরো অনেক উম্মতকে আমি জীবন উপভোগ করতে দেব, তারপর আমার পক্ষ থেকে তাদেরকে স্পর্শ করবে যন্ত্রণাদায়ক আযাব`। এগুলো গায়েবের সংবাদ, আমি তোমাকে ওহীর মাধ্যমে তা জানাচ্ছি। ইতঃপূর্বে তা না তুমি জানতে এবং না তোমার কওম। সুতরাং তুমি সবর কর। নিশ্চয় শুভ পরিণাম কেবল মুত্তাকীদের জন্য”। [কোরআনের সুরা: হূদ: ৩৬-৪৯]

ইবনু উমর রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ একদা জনসমাবেশে দাঁড়ালেন এবং আল্লাহর যথোপযুক্ত প্রশংসা করিলেন, তারপর দাজ্জালের উল্লখ করে বলিলেন, আমি তোমাদেরকে তার থেকে সতর্ক করছি আর প্রত্যেক নাবীই নিজ নিজ সম্প্রদায়কে এ দাজ্জাল থেকে সতর্ক করে দিয়েছেন। নূহ আলাইহি সালাম ও নিজ সম্প্রদায়কে দাজ্জাল থেকে সতর্ক করেছেন। কিন্তু আমি তোমাদেরকে তার সম্বন্ধে এমন একটা কথা বলছি, যা কোনো নাবী তাহাঁর সম্প্রদায়কে বলেননি। তা হলো তোমরা জেনে রেখ, নিশ্চয়ই দাজ্জাল কানা, আর আল্লাহ কানা নন।[8]

আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাঃসাঃ বলিয়াছেন, আমি কি তোমাদেরকে দাজ্জাল সম্পর্কে এমন একটি কথা বলে দেব না, যা কোনো নাবীই তাহাঁর সম্প্রদায়কে বলেন নি? তা হলো, নিশ্চয়ই সে হবে কানা, সে সাথে করে জান্নাত এবং জাহান্নামের দু`টি কৃত্রিম ছবি নিয়ে আসবে। অতএব যাকে সে বলবে যে এটি জান্নাত প্রকৃতপক্ষে সেটি হবে জাহান্নাম। আর আমি তার সম্পর্কে তোমাদের ঠিক তেমনি সতর্ক করছি, যেমন নূহ আলাইহিস সালাম তার সম্প্রদায়কে সে সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।[9]

হূদ আলাইহিস সালাম ও তাহাঁর সম্প্রদায় `আদ

আল্লাহ তা`আলা বলিয়াছেন,

“আর [প্রেরণ করলাম] আদ জাতির নিকট তাদের ভাই হূদকে। সে বলল, `হে আমার কওম, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো [সত্য] ইলাহ নেই। তোমরা কি তাকওয়া অবলম্বন করবে না`? তার কওমের কাফির নেতৃবৃন্দ বলল, `নিশ্চয় আমরা তোমাকে নির্বুদ্ধিতায় দেখতে পাচ্ছি এবং আমরা অবশ্যই তোমাকে মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত মনে করি`। সে বলল, `হে আমার কওম, আমার মধ্যে কোনো নির্বুদ্ধিতা নেই; কিন্তু আমি সকল সৃষ্টির রবের পক্ষ থেকে রাসূল`।`আমি তোমাদের নিকট আমার রবের রিনামাযসমূহ পৌঁছাচ্ছি, আর আমি তোমাদের জন্য কল্যাণকামী বিশ্বস্ত`।`তোমরা কি আশ্চর্য হচ্ছো যে, তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তির নিকট উপদেশ এসেছে, যাতে সে তোমাদেরকে সতর্ক করে? আর তোমরা স্মরণ কর, যখন তিনি তোমাদেরকে নূহের কওমের পর স্থলাভিষিক্ত করেছিলেন এবং সৃষ্টিতে তোমাদেরকে দৈহিক গঠন ও শক্তিতে সমৃদ্ধ করেছেন। সুতরাং তোমরা স্মরণ কর আল্লাহর নিআমতসমূহকে, যাতে তোমরা সফলকাম হও`।তারা বলল, `তুমি কি আমাদের নিকট এজন্য এসেছ যে, আমরা এক আল্লাহর ইবাদাত করি এবং ত্যাগ করি আমাদের পিতৃপুরুষগণ যার ইবাদাত করত? সুতরাং তুমি আমাদেরকে যে ওয়াদা দিচ্ছ, তা আমাদের কাছে নিয়ে এসো, যদি তুমি সত্যবাদী হও`। সে বলল, `নিশ্চয় তোমাদের উপর তোমাদের রবের পক্ষ থেকে আযাব ও ক্রোধ পতিত হয়েছে। তোমরা কি এমন নামসমূহের ব্যাপারে আমার সাথে বিবাদ করছ, যার নামকরণ করেছ তোমরা ও তোমাদের পিতৃপুরুষরা, যার ব্যাপারে আল্লাহ কোনো প্রমাণ নাযিল করেননি? সুতরাং তোমরা অপেক্ষা কর। আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষা করছি`। অতঃপর আমি তাকে ও তার সাথে যারা ছিল, তাদেরকে আমার পক্ষ থেকে রহমত দ্বারা রক্ষা করেছি এবং তাদের মূল কেটে দিয়েছি, যারা আমার আয়াতসমূহ অস্বীকার করেছিল। আর তারা মুমিন ছিল না”। [কোরআনের সুরা আল-আ`রাফ: ৬৫-৭২]

আল্লাহ আরো বলিয়াছেন,

আর স্মরণ কর `আ`দ সম্প্রদায়ের ভাইয়ের কথা, যখন সে আহকাফের স্বীয় সম্প্রদায়কে সতর্ক করেছিল। আর এমন সতর্ককারীরা তার পূর্বে এবং তার পরেও গত হয়েছে যে, `তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদাত করো না। নিশ্চয় আমি তোমাদের উপর এক ভয়াবহ দিনের আযাবের আশঙ্কা করছি`। তারা বলল, `তুমি কি আমাদেরকে আমাদের উপাস্যদের থেকে নিবৃত্ত করতে আমাদের নিকট এসেছ? তুমি যদি সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও, তাহলে আমাদেরকে যার ভয় দেখাচ্ছ তা নিয়ে এসো`। সে বলল, `এ জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছে। আর যা দিয়ে আমাকে পাঠানো হয়েছে, আমি তোমাদের কাছে তা-ই প্রচার করি, কিন্তু আমি দেখছি, তোমরা এক মূর্খ সম্প্রদায়`। অতঃপর যখন তারা তাদের উপত্যকার দিকে মেঘমালা দেখল তখন তারা বলল, `এ মেঘমালা আমাদেরকে বৃষ্টি দেবে`। [হূদ বলল,] বরং এটি তা-ই যা তোমরা ত্বরান্বিত করতে চেয়েছিলে। এ এক ঝড়, যাতে যন্ত্রণাদায়ক আযাব রয়েছে`। এটা তার রবের নির্দেশে সব কিছু ধ্বংস করে দেবে`। ফলে তারা এমন [ধ্বংস] হয়ে গেল যে, তাদের আবাসস্থল ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। এভাবেই আমি অপরাধী কওমকে প্রতিফল দিয়ে থাকি। [কোরআনের সুরা আল্-আহকাফ: ২১-২৫]

ইবনু আব্বাস রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, নাবী রাঃসাঃ বলেন, আমাকে ভোরের বায়ু [পুবালি বাতাস] দ্বারা সাহায্য করা হয়েছে আর `আদ জাতিকে দাবুর বা পশ্চিমের [এক প্রকার মারাত্মক] বায়ু দ্বারা ধংস করা হয়েছে।[10]

নাবী রাঃসাঃ এর সহধর্মিনী আয়িশা রাদি. `আনহা হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে দিন ঝড়ো হাওয়া প্রবাহিত হত সে দিন নাবী রাঃসাঃ বলতেন, হে আল্লাহ! আমি মেঘের কল্যাণ কামনা করছি এবং এর মধ্যে যে সব কল্যাণ রয়েছে এবং যে কল্যাণের উদ্দেশ্যে প্রেরিত হয়েছে তাও এবং আশ্রয় প্রার্থনা করছি এর ক্ষতি, ধ্বংস থেকে এবং যে মন্দ কাজের জন্য পাঠান হয়েছে তা থেকে। আকাশে যখন বিজলী চমকায়, বজ্রের বিকট গর্জন হয়, তখন তাহাঁর চেহারা মুবারক বিবর্ণ হয়ে যেত, রং পরিবর্তন হয়ে যেত। তিনি পেরেশান হয়ে ঘরে প্রবেশ করতেন আবার বের হতেন এবং আগে বাড়তেন ও পিছনে হটে যেতেন। যখন বর্ষণ হয়ে যেত তখন তার চেহারায় আনন্দ ফূটে উঠত। আয়িশা রাদি. `আনহা তা অনুভব করতে পেরে তাঁকে জিজ্ঞাসা করিলেন, এতে তিনি উত্তর দিলেন হে আয়িশা! আমার আশংকা হয়, এমন হতে পারে যেমন হুদ আলাইহিস সালামের কাওম বলেছিল, যখন তারা মেঘমালাকে তাদের উপত্যকার দিকে আসতে দেখল, তখন তারা বলতে লাগল, এ প্রসারিত মেঘমালা, আমাদের উপর ভারি বর্ষণ করবে।[11]

নাবী রাঃসাঃ এর সহধর্মিনী আয়িশা রাদি. `আনহা বলেন, যে দিন আকাল মেঘাচ্ছন্ন থাকত, ঝড়ো হাওয়া প্রবাহিত হত তখন রাঃসাঃ  এর চেহারায় তা প্রকাশ পেত। তিনি পেরেশান হয়ে ঘরে আসতেন, বাহিরে যেতেন। যখন বর্ষণ হয়ে যেত তখন তার চেহরিায় আনন্দের আভা বয়ে যেত, চিন্তা ও পেরেশানী ভাব কেটে যেত। আয়িশা রাদি. `আনহা বলেন, আমি তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলাম, তিনি বলিলেন, আমার আশংকা হয়ে যেত, এতে আমার উম্মাতের উপর প্রেরিত কোনো আযাব রয়েছে এবং তিনি যখন বৃষ্টি দেখতেন তখন বলতেন, এত আল্লাহর রহমত।[12]

সালেহ আলাইহিস সালাম ও সামূদ জাতি

আল্লাহ তা`আলা বলিয়াছেন,

“আর সামূদের নিকট [প্রেরণ করেছি] তাদের ভাই সালিহকে। সে বলল, `হে আমার কওম, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো [সত্য] ইলাহ নেই। নিশ্চয় তোমাদের নিকট তোমাদের রবের পক্ষ থেকে স্পষ্ট প্রমাণ এসেছে। এটি আল্লাহর উষ্ট্রী, তোমাদের জন্য নিদর্শনস্বরূপ। সুতরাং তোমরা তাকে ছেড়ে দাও, সে আল্লাহর যমীনে আহার করুক। আর তোমরা তাকে মন্দ দ্বারা স্পর্শ করো না। তাহলে তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আযাব পাকড়াও করবে`।আর স্মরণ কর, যখন আদ জাতির পর তিনি তোমাদেরকে স্থলাভিষিক্ত করিলেন এবং তোমাদেরকে যমীনে আবাস দিলেন। তোমরা তার সমতল ভূমিতে প্রাসাদ নির্মাণ করছ এবং পাহাড় কেটে বাড়ি বানাচ্ছ। সুতরাং তোমরা আল্লাহর নিআমতসমূহকে স্মরণ কর এবং যমীনে ফাসাদকারীরূপে ঘুরে বেড়িয়ো না। তার কওমের অহঙ্কারী নেতৃবৃন্দ তাদের সেই মুমিনদেরকে বলল যাদেরকে দুর্বল মনে করা হত, `তোমরা কি জান যে, সালিহ তার রবের পক্ষ থেকে প্রেরিত`? তারা বলল, `নিশ্চয় সে যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছে, আমরা তাতে বিশ্বাসী`। যারা অহঙ্কার করেছিল তারা বলল, `নিশ্চয় তোমরা যার প্রতি ঈমান এনেছ, আমরা তার প্রতি অস্বীকারকারী`। অতঃপর তারা উষ্ট্রীকে যবেহ করল এবং তাদের রবের আদেশ অমান্য করল। আর তারা বলল, `হে সালিহ, তুমি আমাদেরকে যে ওয়াদা দিয়েছ, তা আমাদের কাছে নিয়ে এসো, যদি তুমি রাসূলদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাক`। ফলে তাদেরকে ভূমিকম্প পাকড়াও করল, তাই সকালে তারা তাদের গৃহে উপুড় হয়ে মরে রইল। অতঃপর সে তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল এবং বলল, `হে আমার কওম, আমি তো তোমাদের নিকট আমার রবের রিনামায পৌঁছে দিয়েছি এবং তোমাদের জন্য কল্যাণ কামনা করেছি; কিন্তু তোমরা কল্যাণকামীদেরকে পছন্দ কর না”। [কোরআনের সুরা আল-আ`রাফ: ৭৩-৭৯]

আল্লাহ তাহাঁর নাবী সালিহ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে আরো বলেন,

`আর হে আমার কওম, এটি আল্লাহর উট, তোমাদের জন্য নিদর্শনস্বরূপ। তাই তোমরা একে ছেড়ে দাও, সে আল্লাহর যমীনে [বিচরণ করে] খাবে এবং কোনরূপ মন্দভাবে তাকে স্পর্শ করো না, তাহলে তোমাদেরকে আশু আযাব পাকড়াও করবে`। অতঃপর তারা তাকে হত্যা করল। তাই সে বলল, `তোমরা তিন দিন নিজ নিজ গৃহে আনন্দে কাটাও। এ এমন এক ওয়াদা, যা মিথ্যা হবার নয়`। অতঃপর যখন আমার আদেশ এল, তখন সালিহ ও তার সাথে যারা ঈমান এনেছিল তাদেরকে আমার পক্ষ থেকে রহমত দ্বারা নাজাত দিলাম এবং [নাজাত দিলাম] সেই দিনের লাঞ্ছনা থেকে। নিশ্চয় তোমার রব, তিনি শক্তিশালী, পরাক্রমশালী। আর যারা যুলম করেছিল, বিকট আওয়াজ তাদেরকে পাকড়াও করল, ফলে তারা নিজদের গৃহে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকল। যেন তারা সেগুলোতে বসবাসই করেনি। জেনে রাখ, নিশ্চয় সামূদ জাতি তাদের রবের সাথে কুফরী করেছে। জেনে রাখ, সামূদ জাতির জন্য রয়েছে ধ্বংস। [কোরআনের সুরা: হূদ: ৬৪-৬৮]

আবদুল্লাহ ইবনু যাম`আ রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম থেকে শুনেছি এবং তিনি যে লোক [সালিহ আলাইহিস সালামের] উঠনী যখম করেছিল তাহাঁর উল্লেখ করেছেন। তিনি বলিয়াছেন, উটনীকে হত্যা করার জন্য এমন এক লোক তৈরি হয়েছিল যে তাহাঁর গোত্রের মধ্যে প্রবল ও শক্তিশালী ছিল, যেমন ছিল আবূ যাম`আ।[13]

আব্দুল্লাহ ইবনে যাম`আ রাদি. `আনহু হতে বর্ণিত, তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম কে খুতবা দিতে শুনেছেন, যেখানে তিনি সামূদ গোত্রের কাছে প্রেরিত উটনী ও তার পা কাটার কথা বলিলেন। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম আল্লাহর এ বানী বলেন, “অতএব তাদের মধ্যে যে সর্বাধিক হতভাগা, সে যখন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো” [কোরআনের সুরা শামস: আয়াত ১২] – এর ব্যাখ্যায় বলিলেন, ঐ উটনীটিকে হত্যা করার জন্য এক হতভাগা শক্তিশালী ব্যক্তি তৎপর হয়ে উঠলো যে সে সমাজের মধ্যে আবু যাম`আতের মত প্রভাবশালী ও অত্যন্ত শক্তিধর ছিল। এই খুতবায় তিনি মেয়েদের সম্পর্কেও আলোচনা করেছিলেন। তিনি বলিয়াছেন, তোমাদের মধ্যে এমন লোকও আছে যে তার স্ত্রীকে ক্রীতদাসের মত মারে, কিন্তু ঐ দিন শেষেই সে আবার তার সাথে একই বিছানায় মিলিত হয়। এরপর তিনি বায়ু নিঃসরণের পর হাসি দেওয়া সম্পর্কে উপদেশ দিলেন, কোনো ব্যক্তি সেই কাজটির জন্য কেন হাসে যে কাজটি সে নিজেও করে?[14]

আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের সংগে সামূদ জাতির আবাসস্থল `হিজর` নামক স্থানে অবতরণ করিলেন আর তখন তাঁরা এক কূপের পানি মশক ভরে রাখলেন এবং এ পানি দ্বারা আটা গুলে নিলেন। রাঃসাঃ তাদের হুকুম দিলেন, তারা ঐ কূপ থেকে যে পানি ভরে রেখেছে, তা জেন ফেলে দেয় আর পানিতে গোলা আটা যেন উঠগুলোকে খাওয়ায় আর তিনি তাদের হুকুম করিলেন তারা যেন ঐ কূপ থেকে মশক ভরে নেয় যেখান থেকে [সালিহ আলাইহিস সালামের উটনীটি পানি পান করত । উসামা [রহমাতুল্লাহি আলাইহি] নাফি [রহমাতুল্লাহি আলাইহি] থেকে হাদীস বর্ণনায় উবায়দুল্লাহ [রহমাতুল্লাহি আলাইহি]-এর অনুসরণ করেছেন।[15]   

আবদুল্লাহ রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম [তাবুকের পথে] যখন `হিজর` নামক স্থান অতিক্রম করিলেন, তখন তিনি বলিলেন, তোমরা এমন লোকদের আবাসস্থলে প্রবেশ করো না যারা নিজেরাই নিজেদের উপর যুল্ম করেছে। তবে প্রবেশ করতে হলে, ক্রন্দনরত অবস্থায়, যেন তাদের প্রতি যে বিপদ এসেছিল তোমাদের প্রতি অনুরূপ বিপদ না আসে। তারপর রাসূলুল্ললাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম বাহনের উপর বসা অবস্থায় নিজ চাদর দিয়ে চেহারা মোবারক ঢেকে নিলেন।[16] 

ইবনু উমর রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম [তাবুকের পথে সাহাবাদেরকে] নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা একমাত্র ক্রন্দনরত অবস্থায় এমন লোকদের আবাস্থালে প্রবেশ করবে যারা নিজেরাই নিজেদের উপর যুল্‌ম করেছে। তাদের উপর যে মুসিবত এসেছে তোমাদের উপরও যেন সে মুসীবত না আসে।[17] 

ইবরাহীম আলাহিস সালামের ঘটনা

আল্লাহ তা `আলা বলিয়াছেন,

“আর আমি তো ইতঃপূর্বে ইবরাহীমকে সঠিক পথের জ্ঞান দিয়েছিলাম এবং আমি তার সম্পর্কে ছিলাম সম্যক অবগত। যখন সে তার পিতা ও তার কওমকে বলল, `এ মূর্তিগুলো কী, যেগুলোর পূজায় তোমরা রত রয়েছ`? তারা বলল, `আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে এদের পূজা করতে দেখেছি`। সে বলল, `তোমরা নিজেরা এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরা সবাই রয়েছ স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে`। তারা বলল, `তুমি কি আমাদের নিকট সত্য নিয়ে এসেছ, নাকি তুমি খেল-তামাশা করছ`? সে বলল, `না, বরং তোমাদের রব তো আসমানসমূহ ও যমীনের রব; যিনি এ সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। আর এ বিষয়ে আমি অন্যতম সাক্ষী`। আর আল্লাহর কসম, তোমরা চলে যাওয়ার পর আমি তোমাদের মূর্তিগুলোর ব্যাপারে অবশ্যই কৌশল অবলম্বন করব`। অতঃপর সে মূর্তিগুলোকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল তাদের বড়টি ছাড়া, যাতে তারা তাহাঁর দিকে ফিরে আসে। তারা বলল, `আমাদের দেবদেবীগুলোর সাথে কে এমনটি করল? নিশ্চয় সে যালিম`। তাদের কেউ কেউ বলল, `আমরা শুনেছি এক যুবক এই মূর্তিগুলোর সমালোচনা করে। তাকে বলা হয় ইবরাহীম`। তারা বলল, `তাহলে তাকে লোকজনের সামনে নিয়ে এসো, যাতে তারা দেখতে পারে`। তারা বলল, `হে ইবরাহীম, তুমিই কি আমাদের দেবদেবীগুলোর সাথে এরূপ করেছ`? সে বলল, `বরং তাদের এ বড়টিই একাজ করেছে। তাই এদেরকেই জিজ্ঞাসা কর, যদি এরা কথা বলতে পারে`। তখন তারা নিজদের দিকে ফিরে গেল[18] এবং একে অন্যকে বলতে লাগল, `তোমরাই তো যালিম`। অতঃপর তাদের মাথা অবনত হয়ে গেল এবং বলল, `তুমি তো জানই যে, এরা কথা বলতে পারে না`। সে [ইবরাহীম] বলল, `তাহলে কি তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুর ইবাদাত কর, যা তোমাদের কোনো উপকার করতে পারে না এবং কোনো ক্ষতিও করতে পারে না`? `ধিক তোমাদেরকে এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ইবাদাত কর তাদেরকে! `তবুও কি তোমরা বুঝবে না`? তারা বলল, `তাকে আগুনে পুড়িয়ে দাও এবং তোমাদের দেবদেবীদেরকে সাহায্য কর, যদি তোমরা কিছু করতে চাও`। আমি বলিলাম, `হে আগুন, তুমি শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও ইবরাহীমের জন্য` । আর তারা তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেছিল, কিন্তু আমি তাদেরকে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত করে দিলাম”। [কোরআনের সুরা আল-আম্বিয়া: ৫১-৭০]

“আর নিশ্চয় ইবরাহীম তার দীনের অনুসারীদের অন্তর্ভুক্ত। যখন সে বিশুদ্ধচিত্তে তার রবের নিকট উপস্থিত হয়েছিল। যখন সে তার পিতা ও তার কওমকে বলেছিল, `তোমরা কিসের ইবাদত কর`? তোমরা কি আল্লাহর পরিবর্তে মিথ্যা উপাস্যগুলোকে চাও`? `তাহলে সকল সৃষ্টির রব সম্পর্কে তোমাদের ধারণা কী`? অতঃপর সে তারকারাজির মধ্যে একবার দৃষ্টি দিল। তারপর বলল, `আমি তো অসুস্থ`। অতঃপর তারা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে তার কাছ থেকে চলে গেল। তারপর চুপে চুপে সে তাদের দেবতাদের কাছে গেল এবং বলল, `তোমরা কি খাবে না?` তোমাদের কী হয়েছে যে, তোমরা কথা বলছ না`? অতঃপর সে তাদের উপর সজোরে আঘাত হানল। তখন লোকেরা তার দিকে ছুটে আসল। সে বলল, `তোমরা নিজেরা খোদাই করে যেগুলো বানাও, তোমরা কি সেগুলোর উপাসনা কর`, অথচ আল্লাহই তোমাদেরকে এবং তোমরা যা কর তা সৃষ্টি করেছেন`? তারা বলল, `তার জন্য একটি স্থাপনা তৈরী কর, তারপর তাকে জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষেপ কর`। আর তারা তার ব্যাপারে একটা ষড়যন্ত্র করতে চেয়েছিল, কিন্তু আমি তাদেরকে সম্পূর্ণ পরাভূত করে দিলাম। আর সে বলল, `আমি আমার রবের দিকে যাচ্ছি, তিনি অবশ্যই আমাকে হিদায়াত করবেন।`হে আমার রব, আমাকে সৎকর্মশীল সন্তান দান করুন`। অতঃপর তাকে আমি পরম ধৈর্যশীল একজন পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিলাম। অতঃপর যখন সে তার সাথে চলাফেরা করার বয়সে পৌঁছল, তখন সে বলল, `হে প্রিয় বৎস, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে যবেহ করছি, অতএব দেখ তোমার কী অভিমত`; সে বলল, `হে আমার পিতা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তাই করুন। আমাকে ইনশাআল্লাহ আপনি অবশ্যই ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন`। অতঃপর তারা উভয়ে যখন আত্মসমর্পণ করল এবং সে তাকে[19] কাত করে শুইয়ে দিল তখন আমি তাকে আহবান করে বলিলাম, `হে ইবরাহীম, তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ। নিশ্চয় আমি এভাবেই সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করে থাকি`।`নিশ্চয় এটা সুস্পষ্ট পরীক্ষা`। আর আমি এক মহান যবেহের[20] বিনিময়ে তাকে মুক্ত করলাম”। [কোরআনের সুরা আস্-সাফফাত: ৮৩-১০৭]

আল্লাহ আরো বলিয়াছেন,

“আর স্মরণ কর `যখন ইবরাহীম বলল, `হে আমার রব, আপনি এ শহরকে নিরাপদ করে দিন এবং আমাকে ও আমার সন্তানদেরকে মূর্তি পূজা থেকে দূরে রাখুন`। হে আমার রব, নিশ্চয় এসব মূর্তি অনেক মানুষকে পথভ্রষ্ট করেছে, সুতরাং যে আমার অনুসরণ করেছে, নিশ্চয় সে আমার দলভুক্ত, আর যে আমার অবাধ্য হয়েছে, তবে নিশ্চয় আপনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু`।হে আমাদের রব, নিশ্চয় আমি আমার কিছু বংশধরদেরকে ফসলহীন উপত্যকায় তোমার পবিত্র ঘরের নিকট বসতি স্থাপন করালাম, হে আমাদের রব, যাতে তারা নামায কায়েম করে। সুতরাং কিছু মানুষের হৃদয় আপনি তাদের দিকে ঝুঁকিয়ে দিন এবং তাদেরকে রিযিক প্রদান করুন ফল-ফলাদি থেকে, আশা করা যায় তারা শুকরিয়া আদায় করবে”। [কোরআনের সুরা: ইবরাহীম: ৩৫-৩৭]

আল্লাহ আরো বলিয়াছেন,

“আর যখন ইবরাহীম বলল `হে, আমার রব, আমাকে দেখান, কিভাবে আপনি মৃতদেরকে জীবিত করেন। তিনি বলিলেন, তুমি কি বিশ্বাস করনি`? সে বলল, `অবশ্যই হ্যাঁ, কিন্তু আমার অন্তর যাতে প্রশান্ত হয়`। তিনি বলিলেন, `তাহলে তুমি চারটি পাখি নাও। তারপর সেগুলোকে তোমার প্রতি পোষ মানাও। অতঃপর প্রতিটি পাহাড়ে সেগুলোর টুকরো অংশ রেখে আস। তারপর সেগুলোকে ডাক, সেগুলো দৌড়ে আসবে তোমার নিকট। আর জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়”। [কোরআনের সুরা আল-বাকারা: ২৬০]

আল্লাহ আরো বলিয়াছেন,

“আর অবশ্যই আমার ফেরেশতারা সুসংবাদ নিয়ে ইবরাহীমের কাছে আসল, তারা বলল, `সালাম`। সেও বলল, `সালাম`। বিলম্ব না করে সে একটি ভুনা গো বাছুর নিয়ে আসল। অতঃপর যখন সে দেখতে পেল, তাদের হাত এর প্রতি পৌঁছছে না, তখন তাদেরকে অস্বাভাবিক মনে করল এবং সে তাদের থেকে ভীতি অনুভব করল। তারা বলল, `ভয় করো না, নিশ্চয় আমরা লূতের কওমের কাছে প্রেরিত হয়েছি`। আর তার স্ত্রী দাঁড়ানো ছিল, সে হেসে উঠল। অতঃপর আমি তাকে সুসংবাদ দিলাম ইসহাকের ও ইসহাকের পরে ইয়া`কূবের। সে বলল, `হায়, কী আশ্চর্য! আমি সন্তান প্রসব করব, অথচ আমি বৃদ্ধা, আর এ আমার স্বামী, বৃদ্ধ? এটা তো অবশ্যই এক আশ্চর্যজনক ব্যাপার`! তারা বলল, `আল্লাহর সিদ্ধান্তে তুমি আশ্চর্য হচ্ছ? হে নাবী পরিবার, তোমাদের উপর আল্লাহর রহমত ও তাহাঁর বরকত। নিশ্চয় তিনি প্রশংসিত সম্মানিত`। অতঃপর যখন ইবরাহীম থেকে ভয় দূর হল এবং তার কাছে সুসংবাদ এল, তখন সে লূতের কওম সম্পর্কে আমার সাথে বাদানুবাদ করতে লাগল। নিশ্চয় ইবরাহীম অত্যন্ত সহনশীল, অধিক অনুনয় বিনয়কারী, আল্লাহমুখী। হে ইবরাহীম, তুমি এ থেকে বিরত হও। নিশ্চয় তোমার রবের সিদ্ধান্ত এসে গেছে এবং নিশ্চয় তাদের উপর আসবে আযাব, যা প্রতিহত হবার নয়”। [কোরআনের সুরা: হূদ: ৬৯-৭৬]

আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী রাঃসাঃ বলিয়াছেন, মিরাজ রজনীতি আমি মূসা আলাইহিস সালামের দেখা পেয়েছি। আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু বলেন, নাবী রাঃসাঃ মূসা আলাইহিস সালামের আকৃতি বর্ণনা করেছেন। মূসা আলাইহিস সালাম একজন দীর্ঘদেহী, মাথায় কোকড়ানো চুলবিশিষ্ট, যেন শানুআ গোত্রের একজন লোক। নাবী রাঃসাঃ বলেন, আমি ঈসা আলাইহিস সালামের দেখা পেয়েছি। এরপর তিনি তাহাঁর আকৃতি বর্ণনা করে বলিয়াছেন, তিনি হলেন মাঝারি গড়নের গৌর বর্ণবিশিষ্ট, যেন তিনি এই মাত্র হাম্মামখানা হত বেরিয়ে এসেছেন। আর আমি ইব্রাহীম আলাইহিস সালামকেও দেখেছি। তাহাঁর সন্তানদের মধ্যে আকৃতিতে আমিই তার বেশী সাদৃশ্যপূর্ণ। নাবী রাঃসাঃ বলেন, তারপর আমার সামনে দু`টি পেয়ালা আনা হল। একটিতে দুধ, অপরটিতে শরাব। আমাকে বলা হলো, আপনি যেটি ইচ্ছা গ্রহণ করতে পারেন। আমি দুধের পেয়ালাটি গ্রহণ করলাম এবং তা পান করলাম। তখন আমাকে বলা হলো, আপনি ফিত্রাত বা স্বাভাবিকেই গ্রহণ করে নিয়েছেন। দেখুন! আপনি যদি শরাব গ্রহণ করতেন, তাহলে আপনার উম্মত পথভ্রষ্ট হয়ে যেত। [21] 

ইবনু আব্বাস রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, নাবী রাঃসাঃ বলেন, নিশ্চয়ই তোমাদের হাশর ময়দানে খালি পা, বিবস্ত্র এবং খাতনাবিহীন অবস্তায় উপস্থিত করা হবে। এরপর তিনি [এ কথার সমর্থনে] পবিত্র কুরআনের আয়াতটি তিলাওয়াত করিলেন, “যে ভাবে আমি প্রথমে সৃষ্টির সুচনা করেছিলাম, সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করব। এটি আমার প্রতিশ্রুতি। এর বাস্তবায়ন আমি করবই”। [আম্বিয়া : ১০৪] আর কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যাকে কাপর পরানো হবে তিনি হবেন ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম। আর [সে দিন] আমার অনুসারীদের মধ্য হতে কয়েকজনকে পাকড়াও করে বাম দিকে অর্থাৎ জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে । তখন আমি বলব, এরা তো আমার অনুসারী, এরা তো আমার অনুসারী! এ সময় আল্লাহ্বলবেন, যখন আপনি এদের থেকে বিদায় নেন, তখন তারা পূর্ব ধর্মে ফিরে যায়। কাজেই তারা আপনার সাহাবী নয়। তখন আল্লাহ্‌র নেক বান্দা ঈসা আলাইহিস সালাম যেমন বলেছিলেন; তেমন আমি বলব, “হে আল্লাহ্! আমি যতদিন তাদের মাঝে ছিলাম, ততদিন আমি ছিলাম তাদের অবস্থার পর্যবেক্ষক। আপনি পরক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়”। [বাকারা: ১২৯][22]

আবু হুরাইরা রাদি. `আনহু সূত্রে বর্ণিত, রাসূলূল্লাহ্ রাঃসাঃ বলিয়াছেন হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাহাঁর স্ত্রী সারা`কে নিয়ে হিজরত করিলেন এবং এমন এক জনপদে প্রবেশ করিলেন, যেখানে এক বাদশাহ ছিল, অথবা বলিলেন, এক অত্যাচারী শাসক ছিল। তাকে বলা হলো যে, ইবরাহীম [নামক এক ব্যক্তি] এক পরমা সুন্দরী নারীকে নিয়ে [আমাদের এখানে] প্রবেশ করেছে। সে তখন তাহাঁর কাছে লোক পাঠিয়ে জিজ্ঞাসা করল, হে ইবরাহীম, তোমার সাথে এ নারী কে? তিনি বলিলেন, আমার বোন। তারপর তিনি সারা`র কাছে ফিরে এসে বলিলেন, তুমি আমার কথা মিথ্যা প্রতিপন্ন করোনা। আমি তাদেরকে বলেছি যে, তুমি আমার বোন। মহান আল্লাহ্ তা`আলার কসম. দুনিয়াতে [এখন] তুমি আর আমি ছাড়া আর কেউ মুমিন নেই। সুতরাং আমি ও তুমি দ্বীনী ভাই-বোন। এরপর ইবরাহীম আলাইহিস সালাম [বাদশাহর নির্দেশে] সারা`কে বাদশাহর কাছ পাঠিয়ে দিলেন। বাদশাহ তাহাঁর দিকে অগ্রসর হল। সারা উযু করে নামায আদায়ে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং এ দুআ করিলেন, হে মহান আল্লাহ্ তা`আলা, আমিও তোমার উপর এবং তোমার রাসূলের উপর ঈমান এনেছি এবং আমার স্বামী ছাড়া সকল থেকে আমার লজ্জাস্থানের সংরক্ষন করেছি। তুমি এই কাফিরকে আমার উপর ক্ষমতা দিওনা। তখন বাদশাহ বেহুঁশ হয়ে পড়ে মাটিতে পায়ের আঘাত করতে লাগল। তখন সারা বলিলেন, আয় আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন, এ যদি মারা যায়, তবে লোকে বলবে, স্ত্রীলোকটি একে হত্যা করেছে। তখন সে সংজ্ঞা ফিরে পেল। এভাবে দুইবার বা তিনবারের পর বাদশাহ বলল, মহান আল্লাহ্ তা`আলার কসম, তোমরা আমার নিকট এক শয়তানকে পাঠিয়েছ। একে ইবরাহীমের কাছে ফিরিয়ে দাও এবং তার জন্য হাজেরাকে হাদীয়া স্বরুপ দান কর। সারা ইবরাহীম আলাইহিস সালামের নিকট ফিরে এসে বলিলেন, আপনি জানেন কি, মহান আল্লাহ্ তা`আলা কাফিরকে লজ্জিত ও নিরাশ করেছেন এবং সে এক বাঁদি হাদীয়া হিসাবে দেয়।[23]

আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন নাবী রাঃসাঃ বলিয়াছেন, ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম তিনবার ব্যতীত কোনো মিথ্যা কথা বলেন নি। অত্যাচারী বাদশাহর দেশে তাকে যেতে হয়েছিল এবং তার সাথে `সারা` রাদি. `আনহা ছিলেন। এরপর রাবী পূর্ণ হাদীস বর্ণনা করেন। [সেই বাদশাহ] হাজেরাকে তাহাঁর সেবার জন্য তাঁকে দান করেন। তিনি ফিরে এসে বলিলেন, আলস্নাহ্ কাফের থেকে আমাকে নিরাপত্তা দান করেছেন এবং আমার খেদমতের জন্য আজেরা [হাজেরা]-কে দিয়েছেন। আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু বলেন, “হে আকাশের পানির সমত্মানগণ [কুরাইশ]! এ হাজেরাই তোমাদের মা।“[24]

ইবনু আব্বাস রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী রাঃসাঃ একদা কা`বা ঘরে প্রবেশ করিলেন। সেখানে তিনি ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম ও মারইয়ামের ছবি দেখতে পেলেন। তখন তিনি বলিলেন, তাদের [কুরাইশদের] কি হল? অথচ তারা তো শুনতে পেয়েছে, যে ঘরে প্রাণীর ছবি থাকবে, সে ঘরে ফিরিশতাগণ প্রবেশ করেন না। এ যে ইব্রাহীমের ছবি বানানো হয়েছে, [ভাগ্য নিরধারক জুয়ার তীর নিক্ষেপরত অবস্থায়] তিনি কেন ভাগ্য নির্ধারক তীর নিক্ষেপ করবেন![25]

ইবনু আব্বাস রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, নাবী রাঃসাঃ যখন কা`বা ঘরে ছবিসমূহ দেকতে পেলেন, তখন যে পর্যন্ত তাহাঁর নির্দেশ তা মিটিয়ে ফেলা না হলো, সে পর্যন্ত তিনি তাতে প্রবেশ করিলেন না। আর তিনি দেখতে পেলেন, ইব্রাহীম এবং ইসমাঈল আলাইহিস সালামের হাতে ভাগ্য নিরধারণের তীর। তখন তিনি বলিলেন, আল্লাহ তাদের [কুরাইশদের] অপর লানত বর্ষণ করুক। আল্লাহ্‌র কসম, তারা দু`জন কখনও ভাগ্য নির্ধারক তীর করেন নি।[26]

আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, নাবী রাঃসাঃ বলেন, কিয়ামতের দিন ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম তাহাঁর পিতা আযরের দেখা পাবেন। আযরের মুখমণ্ডল কালিমা এবং ধুলাবালি থাকবে। তখন ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম তাকে বলবেন, আমি কি পৃথিবীতে আপনাকে বলিনি যে, আমার অবাধ্যতা করবেন না? তখন তাহাঁর পিতা বলবে, আজ আর তোমার অবাধ্যতা করব না। এরপর ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম [আল্লাহ্‌র কাছে] আবেদন করবেন, হে আমার রব! আপনি আমার সাথে ওয়াদা করেছিলেন যে, হাশরের দিন আপনি আমাকে লজ্জিত করবেন না। আমার পিতা রহমর থকে বঞ্চিত হওয়ার থেকে অধিক অপমান আমার জন্য আর কি হতে পারে? তখন আল্লাহ বলবেন, আমি কাফিরদের জন্য জান্নাত হারাম করে দিয়েছি। পুনরায় বলা হবে, হে ইব্রাহীম! তোমার পদতলে কি? তখন তিনি নিচের দিকে তাকাবেন। হঠাৎ দেখতে পাবেন তাহাঁর পিতার স্থানে সরবশরীরে রক্তমাখা আক্তি জানোয়ার পড়ে রয়েছে। এর চার পা বেঁধে জাহান্নামে ছুঁড়ে ফেলা হবে।[27]

আবু সাঈদ, মাওলা মাহরী রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তারা মদীনায় কষ্ট ও দুঃখে পতিত হন। তিনি আবু সাঈদ খুদরী রাদি. `আনহুর নিকট উপস্হিত হয়ে তাঁকে বলিলেন, আমার পরিবারের সদস্য সংখ্যনা অনেক এবং আমরা দুঃখ দুর্দশার সমুঙ্খীন হয়েছি। তাই আমি আমার পবিবারকে কোনো শস্য শ্যামল এলাকায় স্থানান্তরের মনস্হ করেছি। আবু সাঈদ রাদি. `আনহু বলিলেন, তা করো না বরং মদীনাকে আকড়ে থাক। কারণ, একদা আমরা নাবী রাঃসাঃ এর সঙ্গে বের হলাম, আমার মনে হয়, তিনি এও বলিয়াছেন যে এবং উসফান পর্যন্ত পৌছলেন। এখানে তিনি কয়েক রাত অবস্থান করিলেন। লোকেরা বলল, আল্লাহর কসম! আমরা এখানে অযথা সময় নষ্ট করছি। অথচ আমাদের পরিবার পরিজন আমাদের পশ্চাতে নিরাপত্তাহীন অবস্থায় রয়েছে এবং আমরা তাদের [নিরাপত্তার] ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছি না। একথা নাবী রাঃসাঃ এর কাছে পৌছলে তিনি বলেন, কি ব্যাপার, তোমাদের একথা আমার নিকটে পৌঁছেছে। রাবী বলেন, আবু সাঈদ রাদি. `আনহু কথাটা কিভাবে পূর্বব্যক্ত করেছেন তা আমার মনে নেই। সেই সত্তার নামে শপথ অথবা সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! অবশ্য আমি মনস্হ করেছি, অথবা যদি তোমরা চাও রাবী বলেন, আবু সাঈদ রাদি. `আনহু কোনটি বলিয়াছেন, তা আমার সঠিক মনে নাই। তবে আমি নিশ্চিত আমার উষ্ট্রীকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিব এবং মদীনায় পৌছা পর্যন্ত তার একটি গিটও খুলব না। [যাত্রা বিরতি করব না]। তারপর তিনি বলিলেন, হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই ইবরাহীম আলাইহিস সালাম মক্কাকে হারাম ঘোষণা করেছেন এবং তা পবিত্র ও সন্মানিত হয়েছে। আর আমি মদীনাকে হারাম ঘোষণা করলাম যা দুই পাহাড়ের [আইর ও উহুদ] মধ্যস্হলে অবস্হিত। অতএব এখানে রক্তপাত করা যাবে না, এখানে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে অস্ত্রবহন করা যাবে না এবং পশু খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের উদ্দেশ্য ব্যতীত গাছপাথর পাতাও পাড়া যাবে না। হে আল্লাহ! আমাদের এই শহরে বরকত দান করুন হে আল্লাহ! আমাদের সা`- এ বকরত দান করুন। হে আল্লাহ! আমাদের মুদ্দ-এ বরকত দান করুন। হে আল্লাহ! বরকতের সাথে আমাদের আরো দুটি বরকত দান করুন। সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! মদীনার এমন কোনো প্রবেশ পথ বা গিরি সংকট নেই যেখানে তোমাদের মদীনায় ফিরে আসা পর্যন্ত দু-জন করে ফিরিশতা পাহারায় নিযুক্ত নেই। পুনরায় তিনি লোকদের উদ্দেশ্যে বলিলেন, “তোমরা রওনা হও।” অতএব আমরা রওনা হলাম এবং মদীনায় এসে পৌছলাম । সেই সত্তার শপথ যার নামে আমরা শপথ করি অথবা যার নামে শপথ করা হয়- হাম্মাদ তার উধর্বতন রাবী কোনটি বলিয়াছেন সে সমন্ধে সন্দেহে পড়েছেন। আমরা মদীনায় প্রবেশ করে বাহনের পিঠের হাওদা তখনও খুলিনি ইত্যাবসরে আবদুল্লাহ ইবনু গাতফান গোত্রের লোকেরা আমাদের উপর অতর্কিতে আক্রমণ করে, অথচ এরূপ কিছু করার দুঃসাহস তাদের হয় নি।[28]

জাবির রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী রাঃসাঃ বলিয়াছেন, নিশ্চয় ইবরাহীম আলাইহিস সালাম মক্কার হারাম নির্ধারণ করেছেন, আর আমি মদীনাকে হারাম বলে ঘোষণা করছি- এর দুই প্রান্তের কঙ্করময় মাঠের মধ্যবর্তী অংশকে। অতএব এখানকার কোনো কাটাযূক্ত গাছও কাটা যাবে না এবং এখানকার জীবজন্তুও শিকার করা যাবে না।[29]

আবু সাঈদ রাদি. `আনহু রাঃসাঃ কে বলতে শুনেছেন, মদীনার দুই প্রাস্তের প্রস্তরময় ভূমির মধ্যবর্তী স্থানকে আমি হারাম ঘোষণা করছি, যেমন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম মক্কাকে হারাম ঘোষণা করেছেন। [রাবী] আবদুর রহমান বলেন, অতঃপর আবু সাঈদ রাদি. `আনহু যদি আমাদের কারও হাতে পাখি দেখতে পেতেন তবে তিনি তার হাত থেকে পাখিকে মুক্ত করে ছেড়ে দিতেন।[30]

আল্লাহর নাবী শো`আইব আলাইহিস সালাম ও তাহাঁর জাতির ঘটনা

আল্লাহ তা`আলা বলিয়াছেন,

“আর মাদইয়ানে [প্রেরণ করেছিলাম] তাদের ভাই শু`আইবকে। সে বলল, `হে আমার কওম, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো [সত্য] ইলাহ নেই। তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট স্পষ্ট প্রমাণ এসেছে। সুতরাং তোমরা পরিমাণে ও ওজনে পরিপূর্ণ দাও এবং মানুষকে তাদের পণ্যে কম দেবে না; আর তোমরা যমীনে ফাসাদ করবে না তা সংশোধনের পর। এগুলো তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা মুমিন হও`।আর যারা তাহাঁর প্রতি ঈমান এনেছে তাদেরকে ভয় দেখাতে, আল্লাহর পথ থেকে বাধা দিতে এবং তাতে বক্রতা অনুসন্ধান করতে তোমরা প্রতিটি পথে বসে থেকো না`। আর স্মরণ কর, যখন তোমরা ছিলে কম, অতঃপর তিনি তোমাদেরকে অধিক করেছেন এবং দেখ, কিরূপ হয়েছে ফাসাদকারীদের পরিণতি। আমি যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছি, তার প্রতি যদি তোমাদের একটি দল ঈমান আনে আর অন্য দল ঈমান না আনে, তাহলে ধৈর্যধারণ কর, যতক্ষণ না আল্লাহ আমাদের মধ্যে ফয়সালা করেন। আর তিনি উত্তম ফয়সালাকারী। তার কওম থেকে যে নেতৃবৃন্দ অহঙ্কার করেছিল তারা বলল, `হে শু`আইব, আমরা তোমাকে ও তোমার সাথে যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে অবশ্যই আমাদের জনপদ থেকে বের করে দেব অথবা তোমরা আমাদের ধর্মে ফিরে আসবে।` সে বলল, `যদিও আমরা তা অপছন্দ করি তবুও?` আমরা তো আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করলাম যদি আমরা তোমাদের ধর্মে ফিরে যাই- সেই ধর্ম থেকে আল্লাহ আমাদেরকে নাজাত দেওয়ার পর। আর আমাদের জন্য উচিত হবে না তাতে ফিরে যাওয়া। তবে আমাদের রব আল্লাহ চাইলে [সেটা ভিন্ন কথা]। আমাদের রব জ্ঞান দ্বারা সব কিছু পরিব্যাপ্ত করে আছেন। আল্লাহরই উপর আমরা তাওয়াক্কুল করি। হে আমাদের রব, আমাদের ও আমাদের কওমের মধ্যে যথার্থ ফয়সালা করে দিন। আর আপনি শ্রেষ্ঠ ফয়সালাকারী। আর তার কওম থেকে যে নেতৃবৃন্দ কুফরী করেছিল তারা বলল, `যদি তোমরা শু`আইবকে অনুসরণ কর তাহলে নিশ্চয় তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।` অতঃপর ভূমিকম্প তাদের পাকড়াও করল। তারপর তারা তাদের গৃহে উপুড় হয়ে মরে রইল। যারা শু`আইবকে মিথ্যাবাদী বলেছিল, মনে হয় যেন তারা সেখানে বসবাসই করেনি। যারা শু`আইবকে মিথ্যাবাদী বলেছিল তারাই ছিল ক্ষতিগ্রস্ত। অতঃপর সে তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল এবং বলল, হে আমার কওম, আমি তো তোমাদের কাছে আমার রবের রিসালাতের দায়িত্ব পৌঁছে দিয়েছি এবং তোমাদের জন্য কল্যাণ কামনা করেছি। সুতরাং আমি কীভাবে কাফির জাতির ব্যাপারে দুঃখ করব”! [কোরআনের সুরা আল-আ`রাফ: ৮৫-৯৩]

আল্লাহ আরো বলিয়াছেন,

“আর মাদইয়ানে আমি [পাঠিয়েছিলাম] তাদের ভাই শু`আইবকে। সে বলল, `হে আমার কওম, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো [সত্য] ইলাহ নেই এবং মাপ ও ওযন কম করো না; আমি তো তোমাদের প্রাচুর্যশীল দেখছি, কিন্তু আমি তোমাদের উপর এক সর্বগ্রাসী দিনের আযাবের ভয় করছি`। আর হে আমার কওম, মাপ ও ওযন পূর্ণ কর ইনসাফের সাথে এবং মানুষকে তাদের পণ্য কম দিও না; আর যমীনে ফাসাদ সৃষ্টি করে বেড়িও না, `আল্লাহর দেওয়া উদ্বৃত্ত লাভ তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা মুমিন হও। আর আমি তো তোমাদের হিফাযতকারী নই`। তারা বলল, `হে শু`আইব, তোমার নামায কি তোমাকে এই নির্দেশ প্রদান করে যে, আমাদের পিতৃপুরুষগণ যাদের ইবাদাত করত, আমরা তাদের ত্যাগ করি? অথবা আমাদের সম্পদে আমরা ইচ্ছামত যা করি তাও [ত্যাগ করি?] তুমি তো বেশ সহনশীল সুবোধ`! সে বলল, `হে আমার কওম, তোমরা কী মনে কর, আমি যদি আমার রবের পক্ষ থেকে স্পষ্ট প্রমাণের উপর থাকি এবং তিনি আমাকে তাহাঁর পক্ষ থেকে উত্তম রিযিক দান করে থাকেন [তাহলে কী করে আমি আমার দায়িত্ব পরিত্যাগ করব]! যে কাজ থেকে আমি তোমাদেরকে নিষেধ করছি, তোমাদের বিরোধিতা করে সে কাজটি আমি করতে চাই না। আমি আমার সাধ্যমত সংশোধন চাই। আল্লাহর সহায়তা ছাড়া আমার কোনো তওফীক নেই। আমি তাহাঁরই উপর তাওয়াক্কুল করেছি এবং তাহাঁরই কাছে ফিরে যাই`।`আর হে আমার কওম, আমার সাথে বৈরিতা তোমাদেরকে যেন এমন কাজে প্ররোচিত না করে যার ফলে তোমাদের সেরূপ আযাব আসবে যেরূপ এসেছিল নূহের কওমের উপর অথবা হূদের কওমের উপর অথবা সালিহের কওমের উপর। আর লূতের কওম তো তোমাদের থেকে দূরে নয়`।`আর তোমরা তোমাদের রবের কাছে ইস্তিগফার কর অতঃপর তাহাঁরই কাছে তাওবা কর। নিশ্চয় আমার রব পরম দয়ালু, অতীব ভালবাসা পোষণকারী`।তারা বলল, `হে শু`আইব, তুমি যা বল, তার অনেক কিছুই আমরা বুঝি না। আর তোমাকে তো আমরা আমাদের মধ্যে দুর্বলই দেখতে পাচ্ছি। যদি তোমার আত্মীয়-স্বজন না থাকত, তবে আমরা তোমাকে অবশ্যই পাথর মেরে হত্যা করতাম। আর আমাদের উপর তুমি শক্তিশালী নও`। সে বলল, `হে আমার কওম! আমার স্বজনরা কি তোমাদের কাছে আল্লাহ অপেক্ষা অধিক সম্মানিত? আর তোমরা তাঁকে একেবারে পেছনে ঠেলে দিলে? তোমরা যা কর, নিশ্চয় আমার রব তা পরিবেষ্টন করে আছেন`।আর হে আমার কওম, তোমরা তোমাদের অবস্থানে কাজ করে যাও, আমিও কাজ করছি। অচিরেই তোমরা জানতে পারবে কার কাছে আসবে সে আযাব যা তাকে লাঞ্ছিত করবে এবং কে মিথ্যাবাদী। আর তোমরা অপেক্ষা কর, আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষমান।আর যখন আমার আদেশ আসল, তখন শু`আইব ও তার সাথে যারা ঈমান এনেছে, তাদেরকে আমার পক্ষ থেকে রহমত দ্বারা নাজাত দিলাম এবং যারা যুলম করেছিল তাদেরকে পাকড়াও করল বিকট আওয়াজ। ফলে তারা নিজ নিজ গৃহে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকল। যেন তারা সেখানে বসবাসই করেনি। জেনে রাখ, ধ্বংস মাদইয়ানের জন্য, যেরূপ ধ্বংস হয়েছে সামূদ জাতি”। [কোরআনের সুরা: হূদ: ৮৪-৯৫]

আল্লাহর নাবী লূত আলাইহিস সালাম ও তাহাঁর জাতির ঘটনা

আল্লাহ বলিয়াছেন,

“আর [প্রেরণ করেছি] লূতকে। যখন সে তার কওমকে বলল, `তোমরা কি এমন অশালীন কাজ করছ, যা তোমাদের পূর্বে সৃষ্টিকুলের কেউ করেনি`? তোমরা তো নারীদের ছাড়া পুরুষদের সাথে কামনা পূর্ণ করছ, বরং তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী কওম`। আর তার কওমের উত্তর কেবল এই ছিল যে, তারা বলল, `তাদেরকে তোমরা তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও। নিশ্চয় তারা এমন লোক, যারা অতি পবিত্র হতে চায়`। তাই আমি তাকে ও তার পরিবারকে রক্ষা করলাম তার স্ত্রী ছাড়া। সে ছিল পেছনে থেকে যাওয়া লোকদের অন্তর্ভুক্ত। আর আমি তাদের উপর বর্ষণ করেছিলাম বৃষ্টি। সুতরাং দেখ, অপরাধীদের পরিণতি কিরূপ ছিল”। [কোরআনের সুরা আল-আ`রাফ: ৮০-৮৪]

আল্লাহ আরো বলিয়াছেন,

“এরপর যখন ফেরেশতাগণ লূতের পরিবারের কাছে আসল, সে বলল, `তোমরা তো অপরিচিত লোক`। তারা বলল, `বরং আমরা তোমার কাছে এমন বিষয় নিয়ে এসেছি, যাতে তারা সন্দেহ করত`। আর আমরা তোমার নিকট সত্য নিয়ে এসেছি এবং আমরা অবশ্যই সত্যবাদী`। সুতরাং তুমি তোমার পরিবার নিয়ে বেরিয়ে পড় রাতের একাংশে, আর তুমি তাদের পেছনে চল, আর তোমাদের কেউ পেছনে ফিরে তাকাবে না এবং যেভাবে তোমাদের নির্দেশ করা হয়েছে সেভাবেই চলতে থাকবে`। আর আমি তাকে এ সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছিলাম যে, নিশ্চয় সকালে এদের শিকড় কেটে ফেলা হবে। আর শহরের অধিবাসীরা উৎফুল­ হয়ে হাযির হল। সে বলল, `নিশ্চয় এরা আমার মেহমান, সুতরাং আমাকে অপমানিত করো না`। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে লাঞ্ছিত করো না`। তারা বলল, `আমরা কি জগদ্বাসীর কারো মেহমানদারী করতে তোমাকে নিষেধ করিনি`? সে বলল, `ওরা আমার মেয়ে [31], যদি তোমরা করতেই চাও [তবে বিবাহের মাধ্যমে বৈধ উপায়ে কর]। তোমার জীবনের কসম, নিশ্চয় তারা তাদেরকে নেশায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। অতএব সূর্যোদয়কালে বিকট আওয়াজ তাদের পেয়ে বসল। অতঃপর আমি তার [নগরীর] উপরকে নিচে উলটে দিলাম এবং তাদের উপর বর্ষণ করলাম পোড়া মাটির পাথর। নিশ্চয় এতে পর্যবেক্ষণকারীদের জন্য রয়েছে নিদর্শনমালা। আর নিশ্চয় তা পথের পাশেই বিদ্যমান[32] । নিশ্চয় এতে মুমিনদের জন্য রয়েছে নিদর্শন”। [কোরআনের সুরা: আল-হিজর: ৬১-৭৭]

আল্লাহ তা`আলা আরো বলিয়াছেন,

“আর যখন লূতের কাছে আমার ফেরেশতা আসল, তখন তাদের [আগমনের] কারণে তার অস্বস্তিবোধ হল এবং তার অন্তর খুব সঙ্কুচিত হয়ে গেল। আর সে বলল, `এ তো কঠিন দিন`। আর তার কওম তার কাছে ছুটে আসল এবং ইতঃপূর্বে তারা মন্দ কাজ করত। সে বলল, `হে আমার কওম, এরা আমার মেয়ে, তারা তোমাদের জন্য পবিত্র। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার মেহমানদের ব্যাপারে তোমরা আমাকে অপমানিত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কোনো সুবোধ ব্যক্তি নেই`? তারা বলল, `তুমি অবশ্যই জান, তোমার মেয়েদের ব্যাপারে আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই। আর আমরা কী চাই, তা তুমি নিশ্চয় জান`। সে বলল, `তোমাদের প্রতিরোধে যদি আমার কোনো শক্তি থাকত অথবা আমি কোনো সুদৃঢ় স্তম্ভের আশ্রয় নিতে পারতাম`[33]! তারা বলল, `হে লূত, আমরা তোমার রবের প্রেরিত ফেরেশতা, তারা কখনো তোমার কাছে পৌঁছতে পারবে না। সুতরাং তুমি তোমার পরিবার নিয়ে রাতের কোনো এক অংশে রওয়ানা হও, আর তোমাদের কেউ পিছে তাকাবে না। তবে তোমার স্ত্রী [রওয়ানা হবে না], কেননা তাকে তা-ই আক্রান্ত করবে যা তাদেরকে আক্রান্ত করবে। নিশ্চয় তাদের [আযাবের] নির্ধারিত সময় হচ্ছে সকাল। সকাল কি নিকটে নয়`? অতঃপর যখন আমার আদেশ এসে গেল, তখন আমি জনপদের উপরকে নীচে উল্টে দিলাম এবং ক্রমাগত পোড়ামাটির পাথর বর্ষণ করলাম, যা চি‎‎হ্নত ছিল তোমার রবের কাছে। আর তা যালিমদের থেকে দূরে নয়”। [কোরআনের সুরা: হূদ: ৭৭-৮৩]

আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, নাবী রাঃসাঃ বলেন, আল্লাহ লূত আলাইহিস সালামকে ক্ষমা করুন। তিনি একদা সুদৃঢ় খুঁটির আশ্রয় চেয়েছিলেন।[34]

ইসমাঈল আলাইহিস সালাম ও তাহাঁর মাতা হাজির আলাইহাস সালামের ঘটনা

সাঈদ ইবনু জুবায়র রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত ইবনু আব্বাস রাদি. `আনহু বলেন, নারী জাতি সর্বপ্রথম কোমরবন্দ বানানো শিখেছে ইসমাঈল আলাইহিস সালামের মায়ের [হাযেরা] নিকট থেকে। হাযেরা আলাইহাস সালামের কোমরবন্দ লাগাতেন সারাহ আলাইহাস সালামের থেকে নিজের মর্যাদা গোপন রাখার জন্য। তারপর [আল্লাহর হুকুমে] ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের হাযেরা আলাইহাস সালামের এবং তাহাঁর শিশু ছেলে ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে সাথে নিয়ে বের হলেন, এ অবস্থায় যে, হাযেরা আলাইহাস সালাম শিশুকে দুধ পান করাতেন। অবশেষে যেখানে কা`বা ঘির অবস্থিত, ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের তাহাঁদের উভয়কে সেখানে নিয়ে এসে মসজিদের উঁচু অংশে যমযম কূপের উপরে অবস্থিত একটি বিরাট গাছের নীচে তাদেরকে রাখলেন। তখন মক্কায় না ছিল কোনো মানুষ না ছিল কোনরূপ পানির ব্যবস্থা। পরে তিনি তাদেরকে সেখানেই রেখে গেলেন। আর এছাড়া তিনি তাদের কাছে রেখে গেলেন একটি থলের মধ্যে কিছু খেজুর এবং একটি মশকে কিছু পরিমাণ পানি। এরপর ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম ফিরে চললেন। তখন ইসমাঈল আলাইহিস সালামের মা পিছু পিছু ছুটে আসলেন এবং বলতে লাগলেন, হে ইব্রাহীম! আপনি কোথায় চলে যাচ্ছেন? আমাদেরকে এমন এক ময়দানে রেখে যাচ্ছেন, যেখানে না আছে কোনো সাহায্যকারী আর না আছে [পানাহারের] ব্যবস্থা। তিনি একথা তাকে বারবার বলিলেন। কিন্তু ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম তাহাঁর দিকে তাকালেন না। তখন হাযেরা আলাইহাস সালাম তাঁকে বলিলেন, এ [নির্বাসনের] আদেশ কি আপনাকে আল্লাহ দিয়েছেন? তিনি বলিলেন, হ্যাঁ। হাযেরা আলাইহাস সালাম বলিলেন, তাহলে আল্লাহ্ আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না। তারপর তিনি ফিরে আসলেন। আর ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম ও সামনে চললেন। চলতে চলতে যখন তিনি গিরিপথের বাঁকে পৌছলেন, যেখানে স্ত্রী ও সন্তান তাঁকে আর দেখতে পাচ্চেন না, তখন কা`বা ঘরের দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন। তারপর তিনি দু`হাত তুলে এ দো`আ করিলেন, আর বলিলেন, “হে আমার প্রতিপালক! আমি আমার পরিবারকে কতকে আপনার সম্মানিত ঘরের নিকট এক অনুর্বর উপত্যকায় ………যাতে আপনার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে”। [কোরআনের সুরা ইবরাহীম: ৩৭] [এ দো`আ করে ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম চলে গেলেন] আর ইসমাঈল আলাইহিস সালামের মা ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে স্বীয় স্তন্যের দুধ পান করাতেন এবং নিজে ঐ মশক থেকে পানি পান করতেন। অবশেষে মশকে যা পানি ছিল তা ফুরিয়ে গেল। তিনি নিজে পিপাসিত হলেন, এবং তাহাঁর [বুকের দুধ শুখিয়ে যাওয়ায়] শিশু পুত্রটি পিপাসায় কাতর হয়ে পড়ল। তিনি শিশুটির প্রতি দেখতে লাগলেন। পিপাসায় তার বুক ধরফড় করেছে অথবা রাবী বলেন, সে মাটিতে পড়ে ছটফট করছে। শিশুপুত্রের এ করুন অবস্থার প্রতি তাকানো অসহনীয় হয়ে পড়ায় তিনি সরে গেলেন আর তাহাঁর অবস্থানের সংলগ্ন পর্বত `সাফা` কে একমাত্র তাহাঁর নিকটমত পর্বত হিসাবে পেলেন। এরপর তিনি তার উপর উঠে দাঁড়ালেন আর ময়দানের দিকে তাকালেন। এদিকে সেদিকে তাকিয়ে দেখলেন, কোথাও কাউকে দেখা যায় না? কিন্তু তিনি কাউকে দেখতে পেলেন না। তখন `সাফা` পর্বত থেকে নেমে পড়লেন। এমন কি যখন তিনি নিচু ময়দান পর্যন্ত পৌছলেন, তখন তিনি তাহাঁর কামিজের এক প্রান্ত তুলে ধরে একজন শ্রান্ত-ক্লান্ত মানুষের ন্যায় ছুটে চললেন। অবশেষে ময়দানে অতিক্রম করে `মারওয়া` পাহাড়ের নিকট এসে তার উপর উঠে দাঁড়ালেন। তারপর এদিকে সেদিকে তাকালেন, কাউকে দেখতে পান কিনা? কিন্তু কাউকেই দেখতে পেলেন না। এমনিভাবে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করিলেন। ইবনু আব্বাস রাদি. `আনহু বলেন, নাবী রাঃসাঃ বলিয়াছেন, এজন্যই মানুষ [হজ্জ বা উমরার সময়] এ পাহাড়দ্বয়ের মধ্যে সায়ী করে থাকে। এরপর এরপর তিনি যখন মারওয়া পাহাড়ে উঠলেন, তখন একটি শব্দ শুনতে পেলেন এবং তিনি নিজেকেই নিজে বলিলেন, একটু অপেক্ষা কর। [মনোযোগ দিয়ে শুনি]। তিনি একাগ্রচিত্তে শুনলেন। তখন তিনি বলিলেন, তুমি তো তোমার শব্দ শুনিয়েছ, আর আমিও শুনেছি]। যদি তোমার কাছে কোনো সাহায্যকারী থাকে [তাহলে আমাকে সাহায্য কর]। হঠাৎ যেখানে যমযম কূপ অবস্থিত সেখানে তিনি একজন ফিরিশ্তা দেখতে পেলেন। সেই ফিরিশতা আপন পায়ের গোড়ালি দ্বারা আঘাত করিলেন অথবা তিনি বলছেন, আপন ডানা দ্বারা আঘাত করিলেন। ফলে পানি বের হতে লাগল। তখন হাযেরা আলাইহাস সালামের চারপাশে নিজ হাতে বাঁধা দিয়ে এক হাউযের ন্যায় করে দিলেন এবং হাতের কোষভরে তাহাঁর মশকটিতে পানি ভরতে লাগলেন। তখনো পানি উপছে উঠতে থাকলো। ইবনু আব্বাস রাদি. `আনহু বলেন, নাবী রাঃসাঃ বলিয়াছেন, ইসমাঈলের মাকে আল্লাহ রহম করুন। যদি তিনি বাঁধ না দিয়ে যমযমকে এভাবে ছেড়ে দিতেন কিংবা বলিয়াছেন, যদি কোষে ভরে পানি মশকে জমা না করতেন, তাহলে যমযম একটি কূপ না হয়ে একটি প্রবাহমান ঝর্ণায় পরিণত হতো। রাবী বলেন, তারপর হাযেরা আলাইহাস সালাম পানি পান করিলেন, আর শিশু পুত্রকেও দুধ পান করালেন, তখন ফিরিশতা তাঁকে বলিলেন, আপনি ধ্বংসের কোনো আশংকা করবেন না। কেননা এখানেই আল্লাহর ঘর রয়েছে। এ শিশুটি এবং তাহাঁর পিতা দু`জনে এখানে ঘর নির্মাণ করবে এবং আল্লাহ তার আপনজনকে কখনও ধ্বংস করেন না। ঐ সময় আল্লাহর ঘরের স্থানটি যমীন থেকে টিলার ন্যায় উঁচু ছিল। বন্যা আসার ফলে তাহাঁর দানে বামে ভেঙ্গে যাচ্ছিল। এরপর হাযেরা আলাইহাস সালাম এভাবেই দিন যাপন করছিলেন। অবশেষে [ইয়ামান দেশীয়] জুরহুম গোত্রের একদল লোক তাদের কাছ দিয়ে অতিক্রম করছিল। অথবা রাবী বলেন, জুরহুম পরিবারের কিছু লোক কাদা নামক উঁচু ভুমির পথ ধরে এদিক আসছিল। তারা মক্কার নিচু ভুমিতে অবতরণ করল এবং তারা দেখতে পেল একঝাঁক পাখি চক্রাকারে উড়ছে। তখন তারা বলল, নিশ্চয় এ পাখিগুলো পানির উপর উড়ছে। আমরা এ ময়দানের পথ হয়ে বহুবার অতিক্রম করেছি। কিন্তু এখানে কোনো পানি ছিল না। তখন তারা একজন কি দু`জন লোক সেখানে পাঠালো। তারা সেখানে গিয়েই পানি দেখতে পেল। তারা সেখান থেকে ফিরে এসে পানির সকলকে পানির সংবাদ দিল। সনবাদ শুনে সবাই সেদিকে অগ্রসর হল। রাবী বলেন, ইসমাঈল আলাইহিস সালামের মা পানির নিকট ছিলেন। তারা তাঁকে বলল, আমরা আপনার নিকটবর্তী স্থানে বসবাস করতে চাই। আপনি আমাদেরকে অনুমতি দিবেন কি? তিনি জবাব দিলেন, হ্যাঁ। তবে, এ পানির উপর তোমাদের কোনো অধিকার থাকবে না। তারা হাঁ, বলে তাদের মত প্রকাশ করল। ইবনু আব্বাস রাদি. `আনহু বলেন, নাবী রাঃসাঃ বলিয়াছেন, এ ঘটনা ইসমাঈলের মাকে একটি সুযোগ এনে দিল। আর তিনিও মানুষের সাহচর্য চেয়েছিলেন। এরপর তারা সেখানে বসতি স্থাপন করল এবং তাদের পরিবার –পরিজনের নিকটও সংবাদ পাঠাল। তারপর তারাও এসে তাদের সাথে বসবাস করতে লাগল। পরিশেষে সেখানে তাদের কয়েকটি পরিবারের বসতি স্থাপিত হল। আর ইসমাঈল আলাইহিস সালাম ও যৌবন উপনীত হলেন এবং তাদের থেকে আরবী ভাষা শিখলেন। যৌবনে পৌছে তিনি তাদের কাছে অধিক আকর্ষণীয় ও প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলেন। এরপর যখন তিনি পূর্ণ যৌবন লাভ করিলেন, তখন তারা তাহাঁর সঙ্গে তাদেরই একটি মেয়েকে বিবাহ দিল। এরই মধ্যে ইসমাঈলের মা হাযেরা আলাইহাস সালাম ইন্তেকাল করেন। ইসমাঈলের বিবাহের পর ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম তাহাঁর পরিত্যক্ত পরিজনের অবস্থা দেখার জন্য এখানে আসলেন। কিন্তু তিনি ইসমাঈলকে পেলেন না। তিনি তাহাঁর স্ত্রীকে তাহাঁর সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করিলেন। স্ত্রী বলল, তিনি আমাদের জীবিকার খোঁজে বেরিয়ে গেছেন। এরপর তিনি পুত্রবধুকে তাদের জীবন যাত্রা এবং অবস্থা সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করিলেন। সে বলল, আমরা অতি দুরাবস্থায়, অতি টানাটানি ও খুব কষ্টে আছি। সে ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের নিকট তাদের দুর্দশার অভিযোগ করল। তিনি বলিলেন, তোমার স্বামী বাড়ী আসলে, তাঁকে আমার সালাম জানিয়ে বলবে, সে যেন তার ঘরের দরজায় চৌকাঠ বদলিয়ে নেয়। এরপর যখন ইসমাঈল বাড়ী আসলেন, তখন তিনি যেন [তাহাঁর পিতা ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের আগমনের] কিছুটা আভাস পেলেন। তখন তিনি তাহাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদেরকে কাছে কেউ কি এসেছিল? স্ত্রী বলল, হ্যাঁ। এমন এমন আকৃতির একজন বৃদ্ধ লোক এসেছিলেন এবং আমাকে আপনার সম্বন্ধে জজ্ঞাসা করছিলেন। আমি তাঁকে আপনার সংবাদ দিলাম। তিনি আমাকে আমাদের জীবন যাত্রা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলেন, আমি তাঁকে জানালাম, আমরা খুব কষ্ট ও অভাবে আছি। ইসমাঈল আলাইহিস সালাম জিজ্ঞাসা করিলেন, তিনি কি তোমাকে কোনো উপদেশ দিয়েছেন? স্ত্রী বলল, হ্যাঁ। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি যেন আপনাকে তাহাঁর সালাম পৌঁছাই এবং তিনি আরো বলিয়াছেন, আপনি যেন আপনার ঘরের দরজায় চৌকাঠ বদলিয়ে ফেলেন। ইসমাঈল আলাইহিস সালাম বলিলেন, ইনি আমার পিতা। এ কথা দ্বারা তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়ে গেছেন, আমি যেন তোমাকে পৃথক করে দেই। অতএব তুমি তোমার আপন জন্দের কাছে চলে যাও। এ কথা বলে, ইসমাঈল আলাইহিস সালাম তাকে তালাক দিয়ে দিলেন এবং ঐ লোকদের থেকে অপর একটি মেয়েকে বিবাহ করিলেন। এরপর ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম এদের থেকে দূরে রইলেন, আল্লাহ যতদিন চাইলেন। তারপর তিনি আবার এদের দেখতে আসলেন। কিন্তু এবারও তিনি ইসমাঈল আলাইহিস সালামের দেখা পেলেন না। তিনি ছেলের বউয়ের নিকট উপস্থিত হলেন এবং তাঁকে ইসমাঈল আলাইহিস সালাম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলেন। সে বললো, তিনি আমাদের খাবারের খোঁজে বেরিয়ে গেছেন। ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা কেমন আছ? তিনি তাদের জীবনযাত্রা ও অবস্থা জানতে চাইলেন। তখন সে বলল, আমরা ভাল এবং স্বচ্ছলতার মধ্যেই আছি। আর সে আল্লাহর প্রশংসাও করলো। ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদের প্রধান খাদ্য কি? সে বলল, গোশত। তিনি আবার জানতে চাইলেন, তোমাদের পানীয় কি? সে বলল, পানি। ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম দো`আ করিলেন, হে আল্লাহ্! তাদের গোশত ও পানিতে বরকত দিন। নাবী রাঃসাঃ বলেন, ঐ সময় তাদের সেখানে খাদ্যশস্য উৎপাদন হতো না। যদি হতো তাহলে ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম সে বিষয়েও তাদের জন্য দো`আ করতেন। বর্ণনাকারী বলেন, মক্কা ব্যতিত অন্য কোথাও কেউ শুধু গোসত ও পানি দ্বারা জীবন ধারণ করতে পারেনা। কেননা, শুধু গোসত ও পানি জীবনযাপনের অনুকূল হতে পারে না। ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম বলিলেন, যখন তোমার স্বামী ফিরে আসবে, তখন তাঁকে আমার সালাম বলবে, আর তাঁকে আমার পক্ষ থেকে হুকুম করবে যে, সে যেন তার ঘরের দরজায় চৌকাঠ ঠিক রাখে। এরপর ইসমাঈল আলাইহিস সালাম যখন ফিরে আসলেন, তখন তিনি বলিলেন, তোমাদের নিকট কেউ এসেছিলেন কি? সে বলল, হ্যাঁ। একজন সুন্দর আকৃতিকে বৃদ্ধ লোক এসেছিলেন এবং সে তাহাঁর প্রশংসা করলো, [তারপর বললো] তিনি আমাএক আপনার সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করেছেন। আমি তাঁকে আপনার সংবাদ জানিয়েছি। এরপর তিনি আমাকে আপনার সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করেছেন। আমি তাঁকে আপনার সংবাদ জানিয়েছি। এরপর তিনি আমার নিকট আমাদের জীবনযাপন সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। আমি তাঁকে জানিয়েছি যে, আমরা ভাল আছি। ইসমাঈল আলাইহিস সালাম বলিলেন, তিনি কি তোমাকে আর কোনো কিচুর জন্য আদেশ করেছেন? সে বললো, হ্যাঁ। তিনি আপনার প্রতি সালাম জানিয়ে আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আপনি যেন আপনার ঘরের দরজায় চৌকাঠ ঠিক রাখেন। ইসমাঈল আলাইহিস সালাম বলিলেন, ইনিই আমার পিতা। আর তুমি হলে আমার ঘরের দরজার চৌকাঠ। একথার দ্বারা তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি যেন তোমাকে স্ত্রী হিসাবে বহাল রাখি। এরপর ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম এদের থেকে দূরে রইলেন, যদ্দিন আল্লাহ চাইলেন। এরপর তিনি আবার আসলেন। [দেখতে পেলেন] যমযম কূপের নিকটস্থ একটি বৃক্ষের নীচে বসে ইসমাঈল আলাইহিস সালাম তাহাঁর একটি তীর মেরামত করেছেন। যখন তিনি তাহাঁর পিতাকে দেখতে পেলেন, তিনি দাঁড়িয়ে তাহাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন। এরপর একজন বাপ-বেটার সঙ্গে, একজন বেটা-বাপের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে যেরূপ করে থাকে তারা উভয়ে তাই করিলেন। এরপর ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম বলিলেন, হে ইসমাঈল। আল্লাহ্ আমাকে একটি কাজের নির্দেশ দিয়েছেন। ইসমাঈল আলাইহিস সালাম বলিলেন, আপনার রব ! আপনাকে যা আদেশ করেছেন, তা করুন। ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম বলিলেন, আল্লাহ্ আমাকে এখানে একটি ঘর বানাতে নির্দেশ দিয়েছেন। এই বলে তিনি উঁচু টিলাটির দিকে ইশারা করিলেন যে, এর চারপাশে ঘেরাও দিয়ে, তখনই তাঁরা উভয়ে কা`বা ঘরের দেওয়াল উঠাতে লেগে গেলেন। ইসমাঈল আলাইহিস সালাম পাথর আনতেন, আর ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম নির্মাণ করতেন। পরিশেষে যখন দেওয়াল উঁচু হয়ে গেল, তখন ইসমাঈল আলাইহিস সালাম [মাকামে ইব্রাহীম নামে খ্যাত] পাথরটি আনলেন এবং ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের জন্য তা যথাস্থানে রাখলেন। ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম তার উপর দাঁড়িয়ে নির্মাণ কাজ করতে লাগলেন। আর ইসমাঈল আলাইহিস সালাম তাঁকে পাথর যোগান দিতে থাকেন। তখন তারা উভয়ে দো`আ করতে থাকলেন, হে আমাদের রব। আমাদের থেকে [একাজ] কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সব কিছু শুনেন ও জানেন। তাঁরা উভয়ে আবার কা`বা ঘর তৈরি করতে থাকেন। এবং কা`বা ঘরের চার দিকে ঘুরে ঘুরে এ দো`আ করতে থাকেন। “হে আমাদের রব! আমাদের থেকে [এ শ্রমটুকু] কবুল করে নিন। নিশ্চয়ই আপনি সব কিছু শুনেন ও জানেন।“ [কোরআনের সুরা বাকারা : ১২৭][35]

ইবনু আব্বাস রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম ও তাহাঁর স্ত্রী [সারার] মাঝে যা হওয়ার হয়ে গেল, তখন ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম [শিশুপুত্র] ইসমাঈল আলাইহিস সালাম এবং তাহাঁর মাকে নিয়ে বের হলেন। তাদের সাথে একটি থলে ছিল, যাতে পানি ছিল। ইসমাঈল আলাইহিস সালামের মা মশক থেকে পানি পান করতেন। ফলে শিশুর জন্য তাহাঁর স্তন্যে দুধ বাড়তে থাকে। অবশেষে ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম মক্কায় পৌছে হাযেরকে [শিশুপুত্র ইসমাঈল আলাইহিস সালামসহ] একটি বিরাট বৃক্ষের নীচে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। এরপর ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম আপন পরিবার [সারার] নিকট ফিরে চললেন। তখন ইসমাঈল আলাইহিস সালামের মা কিছু দূর পর্যন্ত তাহাঁর অনুসরণ করিলেন। অবশেষে যখন কাদা নামক স্থানে পৌছলেন, তখন তিনি পিছনে থেকে ডেকে বলিলেন, হে ইব্রাহীম! আপনি আমাদেরকে কার কাছে রেখে যাচ্ছেন? ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম বলিলেন, আল্লাহর কাছে। হাযেরা আলাইহিস সালাম বলিলেন, আমি আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। রাবী [ইবনু আব্বাস রাদি. `আনহু বলেন, এরপর হাযেরা আলাইহিস সালাম ফিরে আসলেন, তিনি মশক থেকে পানি পান করতেন আর শিশুর জন্য [তাহাঁর স্তন্যের] দুধ বাড়ত। অবশেষে যখন পানি শেষ হয়ে গেল। তখন ইসমাঈল আলাইহিস সালামের মা বলিলেন, আমি যদি গিয়ে এদিকে সেদিকে তাকাতাম! তাহলে হয়ত কোনো মানুষ দেখতে পেতাম। রাবী [ইবনু আব্বাস রাদি. `আনহু] বলেন, এরপর ইসমাঈল আলাইহিস সালামের মা গেলেন এবং সাফা পাহাড়ে উঠলেন আর এদিকে ওদিকে তাকালেন এবং কাউকে দেখেন কিনা এজন্য বিশেষভাবে তাকিয়ে দেখলেন। কিন্তু কাউকেও দেখতে পেলেন না। [এরপর যখন নীচু ভূমিতে পৌছলেন] তখন দ্রুত বেগে মারওয়া পাহাড়ে এসে গেলেন। এবং এভাবে তিনি কয়েক চক্কর দিলেন। পুনরায় তিনি [মনে মনে] বলিলেন, যদি গিয়ে দেখতাম যে শিশুটি কি করছে। এরপর তিনি গেলেন এবং দেখতে পেলেন যে সে তার অবস্থায়ই আছে। সে যেন মরণাপন্ন হয়ে গেছে। এতে তাহাঁর মন স্বস্তি পাচ্ছিল না। তখন তিনি বলিলেন, যদি সেখানে [আবার] যেতাম এবং এদিকে সেদিকে তাকিয়ে দেখতাম। সম্ভবতঃ কাউকে দেখতে পেতাম। এরপর তিনি গেলেন, সাফা পাহাড়ের উপর উঠলেন এবং এদিক সেদিক দেখলেন এবং গভীরভাবে তাকিয়ে দেখলেন। কিন্তূ কাউকে দেখতে পেলেন না। এমনকি তিনি সাতটি চক্কর পূর্ণ করিলেন। এরপর তিনি মনে মনে বলিলেন, যদি যেতাম তখন দেখতাম যে সে কি করছে। হঠাৎ তিনি একটি শব্দ শুনতে পেলেন। তখন তিনি বলিলেন, যদি আপনার কোনো সাহায্য করার থাকে তবে আমাকে সাহায্য করুন। হঠাৎ তিনি জিবরীল আলাইহিস সালামকে দেখতে পেলেন। রাবী [ইবনু আব্বাস রাদি. `আনহু বলেন, তখন তিনি [জিবরীল] তাহাঁর পায়ের গোড়ালি দ্বারা এরূপ করিলেন অর্থাৎ গোড়ালি দ্বারা যমীনের উপর আঘাত করিলেন। রাবী [ইবনু আব্বাস রাদি. `আনহু বলেন, তখনই পানি বেরিয়ে আসল। এ দেখে ইসমাঈল আলাইহিস সালামের মা অস্থির হয়ে গেলেন এবং গর্ত খনন করতে লাগলেন। রাবী [ইবনু আব্বাস রাদি. `আনহু বলেন, এ প্রসঙ্গে আবুল কাসিম [রাঃসাঃ ] বলিয়াছেন, হাযেরা আলাইহাস সালাম যদি একে তার অবস্থায় উপর ছেড়ে দিতেন তাহলে পানি বিস্তৃত হয়ে যেত। রাবী [ইবনু আব্বাস রাদি. `আনহু বলেন, তখন হাযেরা আলাইহাস সালাম পানি পান করতে লাগলেন এবং তাহাঁর সন্তানের জন্য তাহাঁর দুধ বাড়তে থাকে। রাবী [ইবনু আব্বাস রাদি. `আনহু বলেন, এরপর জুরহুম গোত্রের [ইয়ামান দেশীয়] একদল লোক উপত্যকার নীচু ভূমি দিয়ে অতিক্রম করচিল। হঠাৎ তারা দেখল কিছু পাখি উড়ছে। তারা যেন তা বিশ্বাসই করতে পারছিল না আর তারা বলতে লাগল এসব পাখি তো পানি ছাড়া কোথাও থাকতে পারে না। তখন তারা সেখানে তাদের একজন দুত পাঠাল। সে সেখানে গিয়ে দেখল, সেখানে পানি মাওজুদ আছে। তখন সে তার দলের লোকদের কাছে ফিরে আসল এবং তাদেরকে সংবাদ দিল। এরপর তারা হাযেরা আলাইহাস সালামের কাছে এসে বলল, হে ইসমাঈলের মা। আপনি কি আমাদেরকে আপনার কাছে থাকা অথবা [রাবী বলিয়াছেন], আপনার কাছে বসবাস করার অনুমতি দিবেন? [হাযেরা আলাইহাস সালাম তাদেরকে বসবাসের অনুমতি দিলেন এবং এভাবে অনেক দিন কেতে গেল]। এরপর তাহাঁর ছেলে বয়ঃপ্রাপ্ত হল। তখন তিনি [ইসমাঈল আলাইহিস সালাম] জুরহুম গোত্রেরই একটি মেয়ে বিয়ে করিলেন। রাবী [ইবনু আব্বাস রাদি. `আনহু বলেন, পুনরায় ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের মনে জাগল [ইসমাঈল আলাইহিস সালাম এবং তাহাঁর মা হাযেরার কথা] তখন তিনি তাহাঁর স্ত্রীকে [সারা] বলিলেন, আমি আমার পরিত্যক্ত পরিজনের অবস্থা সম্পর্কে খবর নিতে চাই রাবী [ইবনু আব্বাস রাদি. `আনহু বলেন, এরপর তিনি [তাদের কাছে] আসলেন এবং সালাম দিলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, ইসমাঈল কোথায়? ইসমাঈল আলাইহিস সালামের স্ত্রী বলল, তিনি শিকারে গিয়েছেন। ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম বলিলেন, সে যখন আসবে তখন তুমি তাঁকে আমার এ নির্দেশের কথা বলবে, “তুমি ঘরের চৌকাঠখানা বদলিয়ে ফেলবে। ইসমাঈল আলাইহিস সালাম যখন আসলেন, তখন স্ত্রী তাঁকে খবরটি জানালেন, তখন তিনি স্ত্রীকে বলিলেন, তুমি সেই চৌকাঠ। অতএব তুমি তোমার পিতামাতার কাছে চলে যাও। রাবী [ইবনু আব্বাস রাদি. `আনহু বলেন, অতঃপর [তাদের কথা] ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের আবার মনে পড়ল। তখন তিনি তাহাঁর স্ত্রী [সারা] কে বলিলেন, আমি আমার নির্বাসিত পরিবারের খবর নিতে চাই। এরপর তিনি সেখানে আসলেন, এবং [পুত্রবধূকে] জিজ্ঞাসা করিলেন, ইসমাঈল কোথায়? ইসমাঈল আলাইহিস সালামের স্ত্রী বলল, তিনি শিকারে গিয়েছেন। পুত্রবধু তাঁকে বলিলেন, আপনি কি আমাদের এখানে অবস্থান করবেন না? কিছু পানাহার করবেন না? তখন ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম বলিলেন, তোমাদের খাদ্য এবং পানীয় কি? স্ত্রী বলল, আমাদের খাদ্য হল গোশত আর পানীয় হল পানি। তখন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম দো`আ করিলেন, “হে আল্লাহ্! তাদের খাদ্য হল গোশত আর পানীয় হল পানি। তখন ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম দো`আ করিলেন, “হে আল্লাহ্! তাদের খাদ্য এবং পানীয় দ্রব্যের মধ্যে বরকত দিন।“ রাবী [ইবনু আব্বাস রাদি. `আনহু বলেন, আবুল কাসিম রাঃসাঃ বলিয়াছেন, ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের দু`আর কারণেই [মক্কার খাদ্য ও পানীয় দ্রব্যের মধ্যে] বরকত রয়েছে। রাবী [ইবনু আব্বাস রাদি. `আনহু বলেন, আবার কিছুদিন পর ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের মনে তাহাঁর নির্বাসিত পরিজনের কথা জাগল। তখন তিনি তাহাঁর স্ত্রী [সারা]-কে বলিলেন, আমি আমার পরিত্যক্ত পরিজনের খবর নিতে চাই। এরপর তিনি আলেন এবং ইসমাঈলের দেখা পেলেন, তিনি যমযম কূপের পিছনে বসে তাহাঁর একটি তীর মেরামত করেছেন। তখন ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম ডেকে বলিলেন, হে ইসমাঈল! তোমার রব তাহাঁর জন্য একখানা ঘর নির্মাণ করতে আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন। ইসমাঈল আলাইহিস সালাম বলিলেন, আপনার রবের নির্দেশ পালন করুন। ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম বলিলেন, তাহলে আমি তা করব অথবা তিনি অনুরূপ কিছু বলেছিলেন। এরপর উভয়ে উঠে দাঁড়ালেন। ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম ইমারাত বানাতে লাগলেন আর ইসমাঈল আলাইহিস সালাম তাঁকে পাথর এনে দিতে লাগলেন আর তাঁরা উভয়ে এ দো`আ করছিলেন, হে আমাদের রব! আপনি আমাদের এ কাজ কবুল করুন। আপনি তো সব কিছু শুনেন এবং জানেন রাবী বলেন, এরই মধ্যে প্রাচীর উঁচু হয়ে গেল আর বৃদ্ধ ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম এতটা উঠতে দুর্বল হয়ে পড়লেন। তখন তিনি [মাকামে ইব্রাহীমের] পাথরের উপর দাঁড়ালেন। ইসমাঈল আলাইহিস সালাম তাঁকে পাতজর এগিয়ে দিতে লাগলেন আর উভয়ে এ দো`আ পড়তে লাগলেন, হে আমাদের রব! আপনি আমাদের এ কাজটুকু কবূল করুন। নিঃসন্দেহে আপনি সবকিছু শুনেন ও জানেন। [কোরআনের সুরা বাকারা: ১২৭][36]

ইবনু আব্বাস রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, নাবী রাঃসাঃ বলেন, ইসলামাঈলের মায়ের প্রতি আল্লাহ্ রহম করুন। যদি তিনি তাড়াতাড়ি না করতেন, তবে যমযম একটির প্রবহমান ঝরণায় পরিণত হত।[37]

সালামা ইবনু আকওয়া রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ [ইয়ামানের] আসলাম গোত্রের একদল লোকের কাছ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। এ সময় তাঁরা তীরন্দাজীর প্রতিযোগিতা করছিল। তখন রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ বলিলেন, হে বনী ইসমাঈল! তোমরা তীরন্দাজী করে যাও। কেননা তোমাদের পূর্বপুরুষ ইসমাঈল আলাইহিস সালাম তীরন্দাজ ছিলেন। সুতরাং তোমরাও তীরন্দাজী করে যাও আর আমি অমুক গোত্রের লোকদের সাথে আছি। রাবী বলন, [এ কথা শুনে] তাদের এক পক্ষ হাত চালনা থেকে বিরত হয়ে গেল। তখন রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ বলিলেন, তোমাদের কি হল, তোমরা যে তীরন্দাজী করছ না? তখন তারা বলল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমরা কিভাবে তীর ছুঁড়তে পারি, অথচ আপনি তো তাদের সাথে রয়েছেন। তখন তিনি বলিলেন, তোমরা তীর ছুঁড়তে থাক, আমি তোমাদের সবার সাথেই আছি।[38]  

আল্লাহর নাবী ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনা ( কাসাসুল আম্বিয়া pdf )

আল্লাহ বলিয়াছেন,

“যখন ইউসুফ তার পিতাকে বলল, `হে আমার পিতা, আমি দেখেছি এগারটি নক্ষত্র, সূর্য ও চাঁদকে, আমি দেখেছি তাদেরকে আমার প্রতি সিজদাবনত অবস্থায়`। সে বলল, `হে আমার পুত্র, তুমি তোমার ভাইদের নিকট তোমার স্বপ্নের বর্ণনা দিও না, তাহলে তারা তোমার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র করবে। নিশ্চয় শয়তান মানুষের প্রকাশ্য দুশমন`। আর এভাবে তোমার রব তোমাকে মনোনীত করবেন এবং তোমাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দেবেন। আর তোমার উপর ও ইয়াকূবের পরিবারের উপর তাহাঁর নিআমত পূর্ণ করবেন যেভাবে তিনি তা পূর্বে পূর্ণ করেছিলেন তোমার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম ও ইসহাকের উপর, নিশ্চয় তোমার রব সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়”। [কোরআনের সুরা: ইউসুফ: ৪-৬]

“আর সে মহিলা তার প্রতি আসক্ত হল, আর সেও তার প্রতি আসক্ত হত, যদি না তার রবের স্পষ্ট প্রমাণ[39] প্রত্যক্ষ করত। এভাবেই, যাতে আমি তার থেকে অনিষ্ট ও অশ্লীলতা দূর করে দেই। নিশ্চয় সে আমার খালেস বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত। আর তারা উভয়ে দরজার দিকে দৌড়ে গেল এবং মহিলা পেছন হতে তার জামা ছিঁড়ে ফেলল। আর তারা মহিলার স্বামীকে দরজার কাছে পেল। মহিলা বলল, `যে লোক তোমার পরিবারের সাথে মন্দকর্ম করতে চেয়েছে, তাকে কারাবন্দি করা বা যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি দেওয়া ছাড়া তার আর কী দন্ড হতে পারে`? সে বলল, `সে-ই আমাকে কুপ্ররোচনা দিয়েছে`। আর মহিলার পরিবার থেকে এক সাক্ষ্যদাতা সাক্ষ্য প্রদান করল, `যদি তার জামা সামনের দিক থেকে ছেঁড়া হয় তাহলে সে [মহিলা] সত্য বলেছে এবং সে [পুরুষ] মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত`। আর তার জামা যদি পেছন থেকে ছেঁড়া হয় তাহলে সে [মহিলা] মিথ্যা বলেছে এবং সে [পুরুষ] হচ্ছে সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত`। অতঃপর যখন সে দেখল, তার জামা পেছন থেকে ছেঁড়া তখন বলল, `নিশ্চয় এটি তোমাদের ষড়যন্ত্র। নিশ্চয় তোমাদের ষড়যন্ত্র ভয়ানক`।`ইউসুফ, তুমি এ প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাও, আর [হে নারী] তুমি তোমার পাপের জন্য ইস্তেগফার কর। নিশ্চয় তুমিই পাপীদের অন্তর্ভূক্ত`। আর নগরীতে মহিলারা বলাবলি করল, `আযীয পত্নী স্বীয় যুবককে কুপ্ররোচনা দিচ্ছে। [যুবকের প্রতি] গভীর প্রেম তাকে আসক্ত করে ফেলেছে, নিশ্চয় আমরা তাকে প্রকাশ্য ভ্রান্তিতে দেখতে পাচ্ছি`। অতঃপর যখন সে তাদের কূটকৌশলের কথা শুনতে পেল, তখন তাদেরকে ডেকে পাঠাল এবং তাদের জন্য আসন প্রস্তুত করল, আর তাদের প্রত্যেককে একটি করে ছুরি প্রদান করল এবং ইউসুফকে বলল, `তাদের সামনে বেরিয়ে আস`। অতঃপর তারা যখন তাকে দেখল, তখন তাকে বিশাল সৌন্দর্যের অধিকারী মনে করল এবং তারা নিজদের হাত কেটে ফেলল আর বলল, `মহিমা আল্লাহর, এতো মানুষ নয়। এ তো এক সম্মানিত ফেরেশতা`।সে বলল, `এ-ই সে, যার ব্যাপারে তোমরা আমাকে ভৎর্সনা করেছিলে। আর আমিই তাকে কুপ্ররোচনা দিয়েছি; কিন্তু সে বিরত থেকেছে এবং আমি তাকে যা আদেশ করছি সে যদি তা না করে তবে অবশ্যই সে কারারুদ্ধ হবে এবং নিশ্চয় সে অপদস্থদের অন্তর্ভুক্ত হবে”। [কোরআনের সুরা: ইউসুফ: ২৪-৩২]

“আর কারাগারে তার সাথে প্রবেশ করল দু`জন যুবক। তাদের একজন বলল, `আমি স্বপ্নে আমাকে দেখতে পেলাম যে, আমি মদ নিংড়াচ্ছি`। আর অপর জন বলল, `আমি স্বপ্নে আমাকে দেখেছি যে, আমি আমার মাথার উপর রুটি বহন করছি তা থেকে পাখি খাচ্ছে। আপনি আমাদেরকে এর ব্যাখ্যা অবহিত করুন। নিশ্চয় আমরা আপনাকে ইহসানকারীদের অন্তর্ভুক্ত দেখতে পাচ্ছি`। সে বলল, `তোমাদেরকে যে খাদ্য দেওয়া হয় তা তোমাদের কাছে আসার পূর্বেই আমি তোমাদেরকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানিয়ে দেব। সেটি এমন জ্ঞান থেকেই বলব যা আমার রব আমাকে শিক্ষা দিয়েছেন। নিশ্চয়ই আমি পরিত্যাগ করেছি সে কওমের ধর্ম যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে না এবং যারা আখিরাতকে অস্বীকারকারী`।`আর আমি অনুসরণ করেছি আমার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়াকূবের ধর্ম। আল্লাহর সাথে কোনো কিছুকে শরীক করা আমাদের জন্য সঙ্গত নয়। এটি আমাদের ও সকল মানুষের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না`। হে আমার কারা সঙ্গীদ্বয়, বহু সংখ্যক ভিন্ন ভিন্ন রব ভাল নাকি মহাপরাক্রমশালী এক আল্লাহ`? তোমরা তাঁকে বাদ দিয়ে নিছক কতগুলো নামের ইবাদাত করছ, যাদের নামকরণ তোমরা ও তোমাদের পিতৃপুরুষরা করেছ, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ প্রমাণ নাযিল করেননি। বিধান একমাত্র আল্লাহরই। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যে, `তাঁকে ছাড়া আর কারো ইবাদাত করো না`। এটিই সঠিক দীন, কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না`।`হে আমার কারা সঙ্গীদ্বয়, তোমাদের একজন স্বীয় মনিবকে মদপান করাবে। আর অন্যজনকে শূলে চড়ানো হবে, অতঃপর পাখি তার মাথা থেকে আহার করবে। যে বিষয়ে তোমরা জানতে চাচ্ছ তার সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছে”। [কোরআনের সুরা: ইউসুফ: ৩৬-৪১]

“আর বাদশাহ বলল, `আমি স্বপ্নে দেখছি, সাতটি মোটা তাজা গাভী, তাদের খেয়ে ফেলছে সাতটি ক্ষীণকায় গাভী এবং সাতটি সবুজ শীষ ও অপর সাতটি শুষ্ক। হে পারিষদবর্গ, তোমরা আমাকে আমার স্বপ্ন সম্বন্ধে ব্যাখ্যা দাও যদি তোমরা স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিয়ে থাক`। তারা বলল, `এটি এলোমেলো অলীক স্বপ্ন। আর আমরা এরূপ স্বপ্ন ব্যাখ্যায় জ্ঞানী নই`। আর সে দু`জনের মধ্যে যে মুক্তি পেয়েছিল, সে বলল এবং দীর্ঘ দিন পর তার স্মরণ হল, `আমি তোমাদেরকে এর ব্যাখ্যা জানিয়ে দিচ্ছি, অতএব তোমরা আমাকে পাঠিয়ে দাও`।হে ইউসুফ, হে সত্যবাদী, আপনি আমাদের ব্যাখ্যা দিন, সাতটি মোটা তাজা গাভী সম্বন্ধে, যাদের খাচ্ছে সাতটি ক্ষীণকায় গাভী এবং সাতটি সবুজ শীষ ও অপর সাতটি শুষ্ক শীষ সম্পর্কে, যাতে আমি লোকদের কাছে ফিরে যেতে পারি যেন তারা জানতে পারে`। সে বলল, `তোমরা সাত বছর একাধারে চাষাবাদ করবে অতঃপর যে শস্য কেটে ঘরে তুলবে তার মধ্য থেকে যে সামান্য পরিমাণ খাবে সেগুলো ছাড়া সব শীষের মধ্যে রেখে দেবে`। তারপর আসবে সাতটি কঠিন বছর। এর জন্য তোমরা পূর্বে যা সঞ্চয় করে রেখে দেবে এরা [ঐ সময়ের লোকেরা] সেগুলো খেয়ে ফেলবে, সামান্য কিছু ছাড়া যা তোমরা সংরক্ষণ করে রাখবে`।`এরপর আসবে এমন এক বছর যাতে মানুষ বৃষ্টি সিক্ত হবে এবং যাতে তারা [ফলের ও যয়তুনের] রস নিংড়াবে”। [কোরআনের সুরা: ইউসুফ: ৪৩-৪৯]

“তোমরা আমার এ জামাটি নিয়ে যাও, অতঃপর সেটি আমার পিতার চেহারায় ফেল। এতে তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবেন। আর তোমরা তোমাদের পরিবারের সকলকে নিয়ে আমার কাছে চলে আস`। আর যখন কাফেলা বের হল, তাদের পিতা বলল, `নিশ্চয় আমি ইউসুফের ঘ্রাণ পাচ্ছি, যদি তোমরা আমাকে নির্বোধবৃদ্ধ মনে না কর`। তারা বলল, `আল্লাহর কসম, আপনি তো সেই পুরোন ভ্রান্তিতেই আছেন`। অতঃপর যখন সুসংবাদদাতা এল, তখন সে জামাটি তার চেহারায় ফেলল। এতে সে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেল, বলল, `আমি কি তোমাদেরকে বলিনি, নিশ্চয় আমি আল্লাহ্র পক্ষ থেকে যা জানি তোমরা তা জান না`। তারা বলল, `হে আমাদের পিতা, আপনি আমাদের পাপ মোচনের জন্য ক্ষমা চান। নিশ্চয় আমরা ছিলাম অপরাধী`। সে বলল, `অচিরেই আমি তোমাদের জন্য আমার রবের নিকট ক্ষমা চাইব, নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু`। অতঃপর যখন তারা ইউসুফের নিকট প্রবেশ করল, তখন সে তার পিতামাতাকে নিজের কাছে স্থান করে দিল এবং বলল, `আল্লাহর ইচ্ছায় আপনারা নিরাপদে মিসরে প্রবেশ করুন`।আর সে তার পিতামাতাকে রাজাসনে উঠাল এবং তারা সকলে তার সামনে সেজদায় লুটিয়ে পড়ল এবং সে বলল, `হে আমার পিতা, এই হল আমার ইতঃপূর্বের স্বপ্নের ব্যাখ্যা, আমার রব তা বাস্তবে পরিণত করেছেন আর তিনি আমার উপর এহসান করেছেন, যখন আমাকে জেলখানা থেকে বের করেছেন এবং তোমাদেরকে গ্রাম থেকে নিয়ে এসেছেন, শয়তান আমার ও আমার ভাইদের মধ্যে সম্পর্ক নষ্ট করার পর। নিশ্চয় আমার রব যা ইচ্ছা করেন, তা বাস্তবায়নে তিনি সূক্ষ্মদর্শী। নিশ্চয় তিনি সম্যক জ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়`।`হে আমার রব, আপনি আমাকে কিছু রাজত্ব দান করেছেন এবং স্বপ্নের কিছু ব্যাখ্যা শিখিয়েছেন। হে আসমানসমূহ ও যমীনের স্রষ্টা, দুনিয়া ও আখিরাতে আপনিই আমার অভিভাবক, আমাকে মুসলিম অবস্থায় মৃত্যু দিন এবং নেককারদের সাথে আমাকে যুক্ত করুন`। এগুলো গায়েবের সংবাদ, যা আমি তোমার কাছে ওহী করছি। তুমি তো তাদের নিকট ছিলে না যখন তারা তাদের সিদ্ধান্তে একমত হয়েছিল অথচ তারা ষড়যন্ত্র করছিল”। [কোরআনের সুরা: ইউসুফ: ৯৩-১০২]

আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ্! মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যাক্তি কে? তিনি বলেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুত্তাকী। তখন তারা বলল, আমরা তো আপনাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করিনি। তিনি বলিলেন, তা হলে [সবচেয়ে সম্মানিত ব্যাক্তি] আল্লাহর নাবী ইউসুফ আলাইহিস সালাম, যিনি আল্লাহর নাবী [ইয়াকুব আলাইহিস সালাম]-এর পুত্র, আল্লাহ্‌র নাবী [ইসহাক আলাইহিস সালাম]-এর পৌত্র, এবং আল্লাহর খলিল [ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম]-এর প্রপৌত্র। তারা বলল, আমরা আপনাকে এ সম্বন্ধেও জিজ্ঞাসা করিনি। তিনি বলিলেন, তাহলে কি তোমরা আরবের মূল্যবান গোত্রসমুহ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করছ? জাহিলী জুগে তাদের মধ্যে যারা সর্বোত্তম ব্যাক্তি ছিলেন, ইসলামেও তাঁরা সর্বোত্তম ব্যাক্তি যদি তাঁরা ইসলামী জ্ঞানার্জন করেন। আবূ উসামা ও মু`তামির [রহমাতুল্লাহি আলাইহি] আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু সূত্রে নাবী রাঃসাঃ হইতে বর্ণিত।[40]

আল্লাহর নাবী আইয়ুব আলাইহিস সালাম

আল্লাহ তা`আলা বলিয়াছেন,

“আর স্মরণ কর আইউবের কথা, যখন সে তার রবকে আহবান করে বলেছিল, `আমি দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়েছি। আর আপনি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু`। তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম। আর তার যত দুঃখ-কষ্ট ছিল তা দূর করে দিলাম এবং তার পরিবার-পরিজন তাকে দিয়ে দিলাম। আর তাদের সাথে তাদের মত আরো দিলাম আমার পক্ষ থেকে রহমত এবং ইবাদাতকারীদের জন্য উপদেশস্বরূপ”। [কোরআনের সুরা আল-আম্বিয়া: ৮৩-৮৪]

“আর স্মরণ কর আমার বান্দা আইউবকে, যখন সে তার রবকে ডেকে বলেছিল, `শয়তান তো আমাকে কষ্ট ও আযাবের ছোঁয়া দিয়েছে`।[আমি বলিলাম], `তুমি তোমার পা দিয়ে [ভূমিতে] আঘাত কর, এ হচ্ছে গোসলের সুশীতল পানি আর পানীয়`। আর আমার পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ ও বুদ্ধিমানদের জন্য উপদেশস্বরূপ আমি তাকে দান করলাম তার পরিবার-পরিজন ও তাদের সাথে তাদের অনুরূপ অনেককে। আর তুমি তোমার হাতে এক মুঠো তৃণলতা নাও এবং তা দিয়ে আঘাত কর। আর কসম ভংগ করো না। নিশ্চয় আমি তাকে ধৈর্যশীল পেয়েছি। সে কতই না উত্তম বান্দা! নিশ্চয়ই সে ছিল আমার অভিমুখী”। [কোরআনের সুরা সোয়াদ: ৪১-৪৪]

আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, নাবী রাঃসাঃ বলেন, একদা আইয়্যুব আলাইহিস সালাম নগ্ন দেহে গোসল করেছিলেন। এমন সময় তাহাঁর উপর স্বর্ণের এক ঝাঁক পঙ্গপাল পতিত হল। তিনি সেগুলো দু`হাতে কাপড়ে রাখতে লাগলেন। তখন তাহাঁর রব তাঁকে ডেকে বলিলেন, হে আইয়্যুব! তুমি যা দেখতে পাচ্ছ, তা থেকে কি আমি তোমাকে মুখাপেক্ষীহীন করে দেই নি? তিনি উত্তর দিলেন, হ্যাঁ, হে রব! কিন্তু আমি আপনার বরকতের অমুখাপেক্ষী নই। [41]

আল্লাহর নাবী মূসা আলাইহিস সালাম ও তাহাঁর জাতি ( কাসাসুল আম্বিয়া pdf )

আল্লাহ তা`আলা বলিয়াছেন,

“আর আমি মূসার মায়ের প্রতি নির্দেশ পাঠালাম, `তুমি তাকে দুধ পান করাও। অতঃপর যখন তুমি তার ব্যাপারে আশঙ্কা করবে, তখন তাকে দরিয়ায় নিক্ষেপ করবে। আর তুমি ভয় করবে না এবং চিন্তা করবে না। নিশ্চয় আমি তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং তাকে রাসূলদের অন্তর্ভুক্ত করব`। অতঃপর ফির`আউন পরিবার তাকে উঠিয়ে নিল, পরিণামে সে তাদের শত্রু ও দুঃশ্চিন্তার কারণ হবে। নিশ্চয় ফির`আউন, হামান ও তাদের সৈন্যরা ছিল অপরাধী। আর ফির`আউনের স্ত্রী বলল, `এ শিশুটি আমার ও তোমার চক্ষু শীতলকারী, তাকে হত্যা করো না। আশা করা যায়, সে আমাদের কোনো উপকারে আসবে। অথবা আমরা তাকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ করতে পারি`। অথচ তারা উপলব্ধি করতে পারেনি। আর মূসার মায়ের অন্তর বিচলিত হয়ে উঠেছিল। সে তো তার পরিচয় প্রকাশ করেই দিত, যদি আমি তার অন্তরকে দৃঢ় করে না দিতাম, যাতে সে আস্থাশীলদের অন্তর্ভুক্ত হয়। আর সে মূসার বোনকে বলল, `এর পিছনে পিছনে যাও`। সে দূর থেকে তাকে দেখছিল, কিন্তু তারা টের পায়নি।আর আমি তার জন্য পূর্ব থেকেই ধাত্রী [স্তন্য পান] নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলাম। তারপর মূসার বোন এসে বলল, `আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি পরিবারের সন্ধান দেব, যারা এ শিশুটিকে তোমাদের পক্ষে লালন পালন করবে এবং তারা তার শুভাকাঙ্ক্ষী হবে`। অতঃপর আমি তাকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিলাম, যাতে তার চোখ জুড়ায় এবং সে যেন কোনো দুশ্চিন্তা না করে। আর সে যেন জানতে পারে যে, নিশ্চয় আল্লাহর ওয়াদা সত্য। কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা জানে না”। [কোরআনের সুরা আল্-কাসাস: ৭-১৩]

আল্লাহ আরো বলেন,

“অতঃপর তাদের পরে আমি মূসাকে আমার আয়াতসমূহ সহকারে ফির`আউন ও তার সভাসদদের কাছে পাঠিয়েছি। অতঃপর তারা এর সাথে যুলম করেছে। সুতরাং লক্ষ্য কর, ফাসাদকারীদের পরিণাম কীরূপ হয়েছিল। মূসা বলল, `হে ফির`আউন, আমি তো সকল সৃষ্টির রবের পক্ষ থেকে রাসূল।` সমীচীন যে, আমি আল্লাহ সম্পর্কে সত্য ছাড়া বলব না। আমি তোমাদের রবের নিকট থেকে স্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে তোমাদের কাছে এসেছি। সুতরাং তুমি বনী ইসরাঈলকে আমার সাথে পাঠিয়ে দাও।` সে বলল, `তুমি যদি কোনো আয়াত নিয়ে আস তবে তা পেশ কর, যদি তুমি সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও।` তখন সে ছেড়ে দিল তার লাঠি। তৎক্ষণাৎ তা এক স্পষ্ট অজগর হয়ে গেল। আর সে বের করল তার হাত, তৎক্ষণাৎ তা দর্শকদের কাছে ধবধবে সাদা [দেখাচ্ছিল]। ফির`আউনের কওমের সভাসদরা বলল, `নিশ্চয় এ হল বিজ্ঞ জাদুকর।“সে তোমাদেরকে তোমাদের দেশ থেকে বের করতে চায়, সুতরাং তোমরা কী নির্দেশ দেবে?` তারা বলল, `আপনি তাকে ও তার ভাইকে সুযোগ দিন এবং শহরগুলোতে সংগ্রহকারী পাঠিয়ে দিন।“তারা আপনার কাছে সকল বিজ্ঞ জাদুকরকে নিয়ে আসবে।` আর জাদুকররা ফির`আউনের কাছে আসল। তারা বলল, `নিশ্চয় আমাদের জন্য পারিশ্রমিক আছে, যদি আমরা বিজয়ী হই?` সে বলল, `হ্যাঁ, আর অবশ্যই তোমরা আমার ঘনিষ্ঠ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে।` তারা বলল, `হে মূসা, হয় তুমি নিক্ষেপ করবে, নয়তো আমরাই নিক্ষেপ করব।` সে বলল, `তোমরা নিক্ষেপ কর।` অতঃপর যখন তারা নিক্ষেপ করল তখন তারা লোকদের চোখে জাদু করল এবং তাদেরকে ভীত করে তুলল। তারা বড় জাদু প্রদর্শন করল। আর আমি মূসার প্রতি ওহী পাঠালাম যে, `তুমি তোমার লাঠি ছেড়ে দাও` তৎক্ষণাৎ সে গিলতে লাগল সেগুলিকে যে অলীক বস্তু তারা বানিয়েছিল। ফলে সত্য প্রকাশ হয়ে গেল এবং তারা যা কিছু করছিল তা বাতিল হয়ে গেল। তাই সেখানে তারা পরাজিত হল এবং লাঞ্ছিত হয়ে গেল। আর জাদুকররা সিজদায় পড়ে গেল। তারা বলল, `আমরা সকল সৃষ্টির রবের প্রতি ঈমান আনলাম, মূসা ও হারূনের রবের প্রতি।` ফির`আউন বলল, `আমি তোমাদেরকে অনুমতি দেওয়ার আগে তোমরা তার প্রতি ঈমান আনলে! নিশ্চয় এটা এমন এক চক্রান্ত যা তোমরা শহরে করেছ সেখান থেকে তার অধিবাসীদেরকে বের করার জন্য। সুতরাং তোমরা অচিরেই জানতে পারবে।` আমি অবশ্যই তোমাদের হাত ও পা বিপরীত দিক থেকে কেটে দেব। তারপর অবশ্যই তোমাদের সবাইকে শূলে চড়াব।` তারা বলল, `নিশ্চয় আমরা আমাদের রবের কাছে প্রত্যাবর্তন করব। আর তুমি আমাদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করছ শুধু এ কারণে যে, আমরা আমাদের রবের আয়াতসমূহের প্রতি ঈমান এনেছি, যখন তা আমাদের কাছে এসেছে। হে আমাদের রব, আমাদেরকে পরিপূর্ণ ধৈর্য দান করুন এবং মুসলিম হিসাবে আমাদেরকে মৃত্যু দান করুন”। [কোরআনের সুরা আল-আ`রাফ: ১০৩-১২৬]

আল্লাহ আরো বলিয়াছেন,

“আর তোমার কাছে কি মূসার কথা পৌঁছেছে? যখন সে আগুন দেখল, তখন নিজ পরিবারকে বলল, `তোমরা অপেক্ষা কর, আমি আগুন দেখতে পেয়েছি, আশা করি আমি তোমাদের জন্য তা থেকে কিছু জ্বলন্ত আঙ্গার নিয়ে আসতে পারব অথবা আগুনের নিকট পথনির্দেশ পাব।`  যখন সে আগুনের কাছে আসল তখন তাকে আহবান করা হল, `হে মূসা` নিশ্চয় আমি তোমার রব; সুতরাং তোমার জুতা জোড়া খুলে ফেল, নিশ্চয় তুমি পবিত্র `তুওয়া` উপত্যকায় রয়েছ`।`আর আমি তোমাকে মনোনীত করেছি, সুতরাং যা ওহীরূপে পাঠানো হচ্ছে তা মনোযোগ দিয়ে শুন`।`নিশ্চয় আমি আল্লাহ, আমি ছাড়া কোনো [সত্য] ইলাহ নেই; সুতরাং আমার ইবাদাত কর এবং আমার স্মরণার্থে নামায কায়েম কর`।`নিশ্চয় কিয়ামত আসবে; আমি তা গোপন রাখতে চাই যাতে প্রত্যেককে স্বীয় চেষ্টা-সাধনা অনুযায়ী প্রতিদান দেওয়া যায়`। অতএব যে ব্যক্তি তার প্রতি ঈমান রাখে না এবং স্বীয় প্রবৃত্তির অনুসরণ করে সে যেন কিছুতেই তাতে ঈমান আনয়নে তোমাকে বাধা দিতে না পারে; অন্যথায় তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে। আর `হে মূসা, তোমার ডান হাতে ওটা কি`? সে বলল, `এটি আমার লাঠি; আমি এর ওপর ভর করি, এটি দিয়ে আমি আমার মেষপালের জন্য গাছের পাতা পাড়ি এবং এটি আমার আরো অনেক কাজে লাগে।` তিনি বলিলেন, `হে মূসা! ওটা ফেলে দাও।` অতঃপর সে তা ফেলে দিল; অমনি তা সাপ হয়ে ছুটতে লাগল। তিনি বলিলেন, `ওটা ধর এবং ভয় করো না, আমি ওকে ওর পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দেব`।`আর তোমার হাত তোমার বগলের সাথে মিলাও, তাহলে তা উজ্জ্বল হয়ে বেরিয়ে আসবে কোনরূপ ত্রুটি ছাড়া; আরেকটি নিদর্শনরূপে`। এটা এজন্য যে, আমি তোমাকে আমার বড় বড় নিদর্শনসমূহের কিছু দেখাব।`ফির`আউনের কাছে যাও; নিশ্চয় সে সীমালঙ্ঘন করেছে`। সে বলল, `হে আমার রব, আমার বুক প্রশস্ত করে দিন“এবং আমার কাজ সহজ করে দিন, `আর আমার জিহবার জড়তা দূর করে দিন- যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে`।`আর আমার পরিবার থেকে আমার জন্য একজন সাহায্যকারী নির্ধারণ করে দিন। আমার ভাই হারূনকে“তার দ্বারা আমার শক্তি সুদৃঢ় করুন এবং তাকে আমার কাজে শরীক করুন`।`যাতে আমরা বেশী করে আপনার তাসবীহ পাঠ করতে পারি`, এবং অধিক পরিমাণে আপনাকে স্মরণ করতে পারি।`আপনিই তো আমাদের সম্যক দ্রষ্টা`। তিনি বলিলেন, `হে মূসা, তুমি যা চেয়েছ তা তোমাকে দেওয়া হল`।`আর আমি আরো একবার তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছিলাম`। `যখন আমি তোমার মাতাকে জানিয়ে দিয়েছিলাম যা জানাবার ছিল, `যে, তুমি তাঁকে সিন্ধুকের মধ্যে রেখে দাও। তারপর তা দরিয়ায় ভাসিয়ে দাও। যেন দরিয়া তাকে তীরে ঠেলে দেয়। ফলে তাকে আমার শত্রু ও তার শত্রু নিয়ে নেবে। আর আমি আমার পক্ষ থেকে তোমার প্রতি ভালবাসা ঢেলে দিয়েছিলাম, যাতে তুমি আমার চোখের সামনে প্রতিপালিত হও`। যখন তোমার বোন [সিন্দুকের সাথে সাথে] চলছিল। অতঃপর সে গিয়ে বলল, `আমি কি তোমাদেরকে এমন একজনের সন্ধান দেব, যে এর দায়িত্বভার নিতে পারবে`? অতঃপর আমি তোমাকে তোমার মায়ের নিকট ফিরিয়ে দিলাম; যাতে তার চোখ জুড়ায় এবং সে দুঃখ না পায়। আর তুমি এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলে। তখন আমি তোমাকে মানোবেদনা থেকে মুক্তি দিলাম এবং তোমাকে আমি বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করেছি। অতঃপর তুমি কয়েক বছর মাদইয়ানবাসীদের মধ্যে অবস্থান করেছ। হে মূসা, তারপর নির্ধারিত সময়ে তুমি এসে উপস্থিত হলে”। [কোরআনের সুরা তা-হা: ৯-৪০]

আল্লাহ আরো বলিয়াছেন,

“আমি তাকে আমার সকল নিদর্শন দেখিয়েছিলাম, কিন্তু সে মিথ্যা আরোপ করেছে এবং অমান্য করেছে। সে বলল, `হে মূসা, তুমি কি আমাদের কাছে এজন্য এসেছ যে, তোমার জাদুর দ্বারা আমাদেরকে আমাদের দেশ থেকে বের করে দেবে`? `তাহলে আমরা অবশ্যই তোমার নিকট অনুরূপ জাদু নিয়ে আসব। সুতরাং একটা মধ্যবর্তী স্থানে আমাদের ও তোমার মিলিত হওয়ার জন্য একটি সময় নির্ধারণ কর, যা আমরাও লঙ্ঘন করব না, তুমিও করবে না`। মূসা বলল, `তোমাদের নির্ধারিত সময় হল উৎসবের দিন। আর সেদিন পূর্বাহ্নেই যেন লোকজনকে সমবেত করা হয়`। অতঃপর ফির`আউন উঠে গেল। তারপর সে তার কৌশল একত্র করল, তারপর সে আসল। মূসা তাদেরকে বলল, `তোমাদের দুর্ভাগ্য! তোমরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করো না। করলে তিনি আযাব দ্বারা তোমাদেরকে সমূলে ধ্বংস করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি মিথ্যা আরোপ করে, সে-ই ব্যর্থ হয়। তখন তারা নিজদের মধ্যে তাদের কর্ম সম্বন্ধে বাক-বিতন্ডা করল এবং তারা গোপনে পরামর্শ করল। তারা বলল, `এ দু`জন অবশ্যই জাদুকর। তারা চায় তাদের জাদুর মাধ্যমে তোমাদেরকে তোমাদের দেশ থেকে বের করে দিতে এবং তোমাদের উৎকৃষ্ট জীবন পদ্ধতি ধ্বংস করে দিতে`।`কাজেই তোমরা তোমাদের কলা-কৌশল জমা কর। তারপর তোমরা সবাই সারিবদ্ধভাবে আস। আর আজ যে বিজয়ী হবে, সে-ই সফল হবে`। তারা বলল, হে মূসা, হয় তুমি নিক্ষেপ কর, না হয় আমরাই প্রথমে নিক্ষেপ করি। মূসা বলল, `বরং তোমরাই নিক্ষেপ কর। অতঃপর তাদের জাদুর প্রভাবে মূসার কাছে মনে হল যেন তাদের রশি ও লাঠিগুলো ছুটোছুটি করছে। তখন মূসা তার অন্তরে কিছুটা ভীতি অনুভব করল। আমি বলিলাম, `তুমি ভয় পেয়ো না, নিশ্চয় তুমিই বিজয়ী হবে`।`আর তোমার ডান হাতে যা আছে, তা ফেলে দাও। তারা যা করেছে, এটা সেগুলো গ্রাস করে ফেলবে। তারা যা করেছে, তাতো কেবল জাদুকরের কৌশল। আর জাদুকর যেখানেই আসুক না কেন, সে সফল হবে না`। অতঃপর জাদুকরেরা সিজদায় লুটিয়ে পড়ল। তারা বলল, `আমরা হারূন ও মূসার রবের প্রতি ঈমান আনলাম`।ফির`আউন বলল, `কী, আমি তোমাদেরকে অনুমতি দেওয়ার আগেই তোমরা তার প্রতি ঈমান আনলে? নিশ্চয় সে-ই তোমাদের প্রধান, যে তোমাদেরকে জাদু শিখিয়েছে। সুতরাং আমি অবশ্যই তোমাদের হাত ও পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলব এবং আমি তোমাদেরকে খেজুর গাছের কান্ডে শূলিবিদ্ধ করবই। আর তোমরা অবশ্যই জানতে পারবে, আমাদের মধ্যে কার আযাব বেশী কঠোর এবং বেশী স্থায়ী।তারা বলল, `আমাদের নিকট যে সকল স্পষ্ট নিদর্শন এসেছে এবং যিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তার উপর আমরা তোমাকে কিছুতেই প্রাধান্য দেব না। সুতরাং তুমি যা ফয়সালা করতে চাও, তাই করো। তুমিতো কেবল এ দুনিয়ার জীবনের উপর কর্তৃত্ব করতে পার`।`নিশ্চয় আমরা আমাদের রবের প্রতি ঈমান এনেছি, যাতে তিনি আমাদের অপরাধসমূহ এবং যে জাদু তুমি আমাদেরকে করতে বাধ্য করেছ, তা ক্ষমা করে দেন। আর আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ ও চিরস্থায়ী”। [কোরআনের সুরা তা-হা: ৫৬-৭৩]

“আর আমি অবশ্যই মূসার কাছে ওহী প্রেরণ করেছিলাম যে, `আমার বান্দাদেরকে নিয়ে রাতের বেলায় রওয়ানা হও। অতঃপর সজোরে আঘাত করে তাদের জন্য শুকনো রাস্তা বানাও। পেছন থেকে ধরে ফেলার আশংকা করো না এবং ভয়ও করো না`। তারপর ফির`আউন তার সেনাবাহিনী সহ তাদের পিছু নিল। অতঃপর সমুদ্র তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে নিমজ্জিত করল। আর ফির`আউন তার কওমকে পথভ্রষ্ট করেছিল এবং সে সঠিক পথ দেখায়নি। হে বনী ইসরাঈল, আমিই তোমাদেরকে তোমাদের শত্রু থেকে নাজাত দিয়েছি। আর তোমাদেরকে ওয়াদা দিয়েছিলাম তূর পাহাড়ের ডান পাশের[42] এবং আমি তোমাদের জন্য অবতরণ করেছিলাম `মান্না` ও `সালওয়া`। আমি তোমাদেরকে যে রিযিক দান করেছি তা থেকে ভালগুলো খাও এবং এতে সীমালঙ্ঘন করো না। করলে তোমাদের উপর আমার গযব পতিত হবে। আর যার উপর আমার গযব পতিত হয় সে অবশ্যই ধ্বংস হয়”।[কোরআনের সুরা তা-হা: ৭৭-৮১]

“আর আমি পাকড়াও করেছি ফির`আউনের অনুসারীদেরকে দুর্ভিক্ষ ও ফল- ফলাদির ক্ষয়-ক্ষতির মাধ্যমে, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।অতঃপর যখন তাদের কাছে কল্যাণ আসত, তখন তারা বলত, `এটা আমাদের জন্য।` আর যখন তাদের কাছে অকল্যাণ পৌঁছত তখন তারা মূসা ও তার সঙ্গীদেরকে অশুভলক্ষুণে মনে করত। তাদের কল্যাণ-অকল্যাণ তো আল্লাহর কাছে। কিন্তু তাদের অধিকাংশ জানে না। আর তারা বলল, `তুমি আমাদেরকে জাদু করার জন্য যে কোনো নিদর্শন আমাদের কাছে নিয়ে আস না কেন আমরা তো তোমার প্রতি ঈমান আনব না।` সুতরাং আমি তাদের বিরুদ্ধে বিস্তারিত নিদর্শনাবলী হিসাবে পাঠালাম তুফান, পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ ও রক্ত। তার পরেও তারা অহঙ্কার করল। আর তারা ছিল এক অপরাধী কওম। আর যখন তাদের উপর আযাব পতিত হল তখন তারা বলল, `হে মূসা আমাদের জন্য তুমি তোমার রবের কাছে দুআ কর তিনি যে ওয়াদা তোমার সাথে করেছেন সে অনুযায়ী। যদি তুমি আমাদের উপর থেকে আযাব সরিয়ে দাও তাহলে অবশ্যই আমরা তোমার প্রতি ঈমান আনব এবং অবশ্যই তোমার সাথে বনী ইসরাঈলকে পাঠিয়ে দেব।` অতঃপর যখনই আমি তাদের থেকে আযাব সরিয়ে নিতাম কিছু কালের জন্য যা তাদের জন্য নির্ধারিত ছিল, তখনই তারা অঙ্গীকার ভঙ্গ করত। অতঃপর আমি তাদের থেকে প্রতিশোধ নিলাম, ফলে তাদেরকে সমুদ্রে ডুবিয়ে দিলাম। কারণ তারা আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে এবং এ সম্পর্কে তারা ছিল গাফেল ।আর যে জাতিকে দুর্বল মনে করা হত আমি তাদেরকে যমীনের পূর্ব ও তার পশ্চিমের উত্তরাধিকারী বানালাম, যেখানে আমি বরকত দিয়েছি এবং বনী ইসরাঈলের উপর তোমার রবের উত্তম বাণী পরিপূর্ণ হল। কারণ তারা ধৈর্য ধারণ করেছে। আর ধ্বংস করে দিলাম যা কিছু তৈরি করেছিল ফির`আউন ও তার কওম এবং তারা যা নির্মাণ করেছিল”। [কোরআনের সুরা আল-আ`রাফ: ১৩০-১৩৭]

“আর স্মরণ কর, যখন মূসা তার কওমর জন্য পানি চাইল, তখন আমি বলিলাম, `তুমি তোমার লাঠি দ্বারা পাথরকে আঘাত কর`। ফলে তা থেকে উৎসারিত হল বারটি ঝরনা। প্রতিটি দল তাদের পানি পানের স্থান জেনে নিল। তোমরা আল্লাহর রিযিক থেকে আহার কর ও পান কর এবং ফাসাদকারী হয়ে যমীনে ঘুরে বেড়িয়ো না”। [কোরআনের সুরা বাকারা: ৬০]

“আর স্মরণ কর, যখন তোমরা একজনকে হত্যা করলে অতঃপর সে ব্যাপারে একে অপরকে দোষারোপ করলে। আর আল্লাহ প্রকাশ করে দিলেন তোমরা যা গোপন করছিলে। অতঃপর আমি বলিলাম, `তোমরা তাকে আঘাত কর গাভীটির [গোশ্তের] কিছু অংশ দিয়ে। এভাবে আল্লাহ জীবিত করেন মৃতদেরকে। আর তিনি তোমাদেরকে তাহাঁর নিদর্শনসমূহ দেখান, যাতে তোমরা বুঝ”। [কোরআনের সুরা বাকারা: ৭২-৭৩]

“আর যখন তোমরা বললে, `হে মূসা, আমরা তোমার প্রতি ঈমান আনব না, যতক্ষণ না আমরা প্রকাশ্যে আল্লাহকে দেখি`। ফলে বজ্র তোমাদেরকে পাকড়াও করল আর তোমরা তা দেখছিলে। অতঃপর আমি তোমাদের মৃত্যুর পর তোমাদেরকে পুনঃজীবন দান করলাম, যাতে তোমরা শোকর আদায় কর।আর আমি তোমাদের উপর মেঘের ছায়া দিলাম এবং তোমাদের প্রতি নাযিল করলাম `মান্না`[43] ও `সালওয়া`[44]। তোমরা সে পবিত্র বস্তু থেকে আহার কর, যা আমি তোমাদেরকে রিযিক দিয়েছি। আর তারা আমার প্রতি যুলম করেনি, বরং তারা নিজদেরকেই যুলম করত”। [কোরআনের সুরা বাকারা: ৫৫-৫৭]

“আর মূসা বলল, `হে আমাদের রব, আপনি ফির`আউন ও তার পারিষদবর্গকে দুনিয়াবী জীবনে সৌন্দর্য ও ধন-সম্পদ দান করেছেন। হে আমাদের রব, যাতে তারা আপনার পথ থেকে গোমরাহ করতে পারে। হে আমাদের রব, তাদের ধন-সম্পদ নিশ্চি‎হ্ন করে দিন, তাদের অন্তরসমূহকে কঠোর করে দিন। ফলে তারা ঈমান আনবে না, যতক্ষণ না যন্ত্রণাদায়ক আযাব দেখে`। তিনি বলিলেন, `তোমাদের দো`আ কবূল করা হয়েছে। সুতরাং তোমরা দৃঢ় থাক এবং যারা জানে না তাদের পথ অনুসরণ করো না”। [কোরআনের সুরা ইউনুস: ৮৮-৮৯]

সা`ঈদ ইবনু জুবায়র রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ইবনু `আব্বাস রাদি. `আনহুকে বলিলাম, নাওফ আল-বাকালী দাবী করে যে, মূসা আলাইহিস সালাম [যিনি খাযির আলাইহিস সালামের সাক্ষাৎ লাভ করেছিলেন] বনী ইসরাঈলের মূসা নন বরং তিনি অন্য এক মূসা। [একথা শুনে তিনি] তিনি বলিলেন, আল্লাহর দুশমন মিথ্যা বলেছে। উবাঈ ইবনু কা`ব রাদি. `আনহু রাসূলুল্লাহ্‌ রাঃসাঃ থেকে আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলিয়াছেন, মূসা আলাইহিস সালাম একবার বনী ইসরাঈলদের মধ্য বক্তৃতা দিতে দাঁড়ালেন। তখন তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, সবচাইতে জ্ঞানী কে? তিনি বলিলেন, `আমি সবচাইতে জ্ঞানী।` মহান আল্লাহ তাঁকে সতর্ক করে দিলেন। কেননা তিনি ইলমকে আল্লাহর উপর ন্যস্ত করেন নি। তারপর আল্লাহ তাহাঁর নিকট এ ওহী পাঠালেন, দুই সমুদ্রের সংগমস্থলে আমার বান্দাদের মধ্য এক বান্দা রয়েছে, যে তোমার চাইতে বেশী জ্ঞানী। তিনি বলেন, `ইয়া রব! কিভাবে তাহাঁর সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে?` তখন তাঁকে বলা হল, থলের মধ্য একটি মাছ নিয়ে নাও। এরপর যেখানে সেটি হারিয়ে ফেলবে সেখানেই তাঁকে পাবে। তারপর তিনি রওয়ানা হলেন এবং ইউশা` ইবনু নূন নামক তাহাঁর একজন খাদিমও তাহাঁর সাথে চলল। তাঁরা থলের মধ্য একটি মাছ নিলেন। চলার পথে তাঁরা একটি বড় পাথরের কাছে এসে, সেখানে মাথা রেখে শুয়ে পড়লেন। তারপর মাছটি [জীবিত হয়ে] থলে থেকে বেরিয়ে গেল এবং সুড়ঙ্গের মত পথ করে সমুদ্রে চলে গেল। এ ব্যাপারটি মূসা আলাইহিস সালাম ও তাহাঁর খাদিম-এর জন্য ছিল আশ্চর্যের বিষয়। এরপর তাঁরা তাহাঁদের বাকী রাতটুকু এবং পরের দিনভর চলতে থাকলেন। পরে ভোরবেলা মূসা আলাইহিস সালাম তাহাঁর খাদিমকে বলিলেন, `আমাদের নাশতা নিয়ে এস, আমরা আমাদের এ সফরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি, আর মূসা আলাইহিস সালাম কে যে স্থানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, সে স্থান অতিক্রম করার পূর্বে তিনি ক্লান্ত অনুভব করেন নি। তারপর তাহাঁর খাদিম তাঁকে বলল, `আপনি কি লক্ষ্য করেছন, আমরা যখন পাথরের পাশে বিশ্রাম করছিলাম, তখন আমি মাছের কথা ভুলে গিয়েছি? মূসা আলাইহিস সালাম বলিলেন, `আমরা তো সেই স্থানটিই খুঁজছিলাম। তারপর তাঁরা তাহাঁদের পদচিহ্ন ধরে ফিরে চলল। তাঁরা সেই পাথরের কাছে পোঁছে, কাপড়ে আবৃত [বর্ণনাকারী বলেন] কাপড় মুড়ি দেওয়া এক ব্যক্তিকে দেখতে পেলেন। মূসা আলাইহিস সালাম তাঁকে সালাম দিলেন। তখন খাযির বলিলেন, এ দেশে সালাম কোথা থেকে এল! তিনি বলিলেন, `আমি মূসা।` খাযির জিজ্ঞাসা করিলেন, `বনী ইসরাইলের মূসা আলাইহিস সালাম?` তিনি বলিলেন, হ্যাঁ। তিনি আরো বলিলেন, “আমি কি আপনাকে অনুসরণ করতে পারি এ শর্তে যে, সত্য পথের যে জ্ঞান আপনাকে দান করা হয়েছে, তা থেকে আমাকে শিক্ষা দিবেন? খাযির বলিলেন, “তুমি কিছুতেই আমার সঙ্গে ধৈর্য ধারণ করতে পারবে না।” `মূসা আলাইহিস সালাম বলিলেন, “আল্লাহ চাইলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন এবং আমি আপনার আদেশ অমান্য করব না। তারপর তাঁরা দুজন সমুদ্র তীর দিয়ে চলতে লাগলেন, তাহাঁদের কোনো নৌকা ছিল না। ইতিমধ্যে তাহাঁদের কাছ দিয়ে একটি নৌকা যচ্ছিল। তাঁরা নৌকাওয়ালাদের সঙ্গে তাহাঁদের আরোহণ করিয়ে নেওয়ার কথা বলিলেন। তারা খাযিরকে চিনতে পারল এবং ভাড়া ব্যতিরেকে তাহাঁদের নৌকায় তুলে নিল। তখন একটি চড়ুই পাখি এসে নৌকার এক প্রান্তে বসে দুই-একবার সমুদ্রে তার ঠোঁট মারল। খাযির বলিলেন, `হে মূসা আলাইহিস সালাম! আমার ইল্‌ম এবং তোমার ইল্‌ম [সব মিলেও] আল্লাহর ইল্‌ম থেকে সমুদ্র থেকে চড়ুই পাখি্র ঠোঁটে যতটুকু পানি এসেছে ততটুকু পরিমাণও কমাতে পারবে না।` এরপর খাযির নৌকার তক্তাগুলির মধ্য থেকে একটি খুলে ফেললেন। মূসা আলাইহিস সালাম বলিলেন, এরা আমাদের ভাড়া ছড়া আরোহণ করিয়েছে, আর আপনি আরোহীদের ডুবিয়ে দেওয়ার জন্য নৌকায় ফাটল সৃষ্টি করিলেন?` খাযির বলিলেন, “আমি কি বলিনি যে, তুমি কিছুতেই আমার সঙ্গে ধৈর্য ধারণ করতে পারবে না।” মূসা আলাইহিস সালাম বলিলেন, `আমার ভুলের জন্য আমাকে অপরাধী করবেন না এবং আমার ব্যাপারে অধির কঠোরতা অবলম্বন করবেন না।` বর্ণনাকারী বলেন, ইহা মূসা আলাইহিস সালাম এর প্রথম ভুল। তারপর তাঁরা উভয়ে [নৌকা থেকে নেমে] চলতে লাগলেন। [পথে] একটি বালক অন্যান্য বালকের সাথে খেলছিল। খাযির তার মাথার উপর দিক দিয়ে ধরলেন এবং হাত দিয়ে তার মাথা ছিদ্র করে ফেললেন। মূসা আলাইহিস সালাম বলিলেন, `আপনি কি একটি নিষ্পাপ জীবন নাশ করিলেন কোনো হত্যার অপরাধ ছাড়াই?` খাযির বলিলেন, “আমি তোমাকে বলিনি যে, তুমি কিছুতেই আমার সঙ্গে ধৈর্য ধারণ করতে পারবে না?” ইবনু `উয়ায়না [রহমাতুল্লাহি আলাইহি] বলেন, এটা ছিল পূর্বের চেয়ে বেশী জোরালো। তারপর আবারো চলতে লাগলেন; চলতে চলতে তাঁরা এক গ্রামের অধিবাসীদের কাছে পৌঁছে তাদের কাছে খাবার চাইলেন, কিন্তু তারা তাহাঁদের মেহমানদারী করতে অস্বীকার করল। তারপর সেখানে তাঁরা এক পতনোন্মুখ প্রাচীর দেখতে পেলেন। খাযির তাহাঁর হাত দিয়ে সেটি খাড়া করে দিলেন। মূসা আলাইহিস সালাম বলিলেন, `আপনি ইচ্ছে করলে এর জন্য পারিশ্রমিক গ্রগন করতে পারতেন।` তিনি বলিলেন, `এখানেই তোমার আর আমার সম্পর্কের অবসান।` রাসূলুল্লাহ্‌ রাঃসাঃ বলেন, আল্লাহ তা`আলা মূসা আলাইহিস সালামের ওপর রহম করুন। আমাদের কতই না মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হতো যদি তিনি সবর করতেন, তাহলে আমাদের কাছে তাহাঁদের আরো ঘটনাবলী বর্ণনা করা হতো।[45]

ইবনু আব্বাস রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি এবং হুর ইবনু কায়স ইবনু হিসন আল ফাযারী মূসা আলাইহিস সালামের সঙ্গী সম্পর্কে বাদানুবাদ করেছিলেন। ইবনু আব্বাস রাদি. `আনহু বলিলেন, তিনি ছিলেন খিযর। ঘটনাক্রমে তখন তাদের পাশ দিয়ে উবাঈ ইবনু কা`ব রাদি. `আনহু যাচ্ছিলেন। ইবনু `আব্বাস রাদি. `আনহু তাঁকে ডেকে বলিলেন, আমি ও আমার এ ভাই মতবিরোধ পোষণ করছি মূসা আলাইহিস সালামের সেই সঙ্গীর ব্যাপারে যাঁর সাথে সাক্ষাত করার জন্য মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহ্‌র কাছে পথের সন্ধান চেয়েছিলেন—আপনি কি রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃকে তাহাঁর সম্পর্কে কিছু বলতে শুনেছেন? তিনি বলিলেন, হ্যাঁ। আমি রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃকে বলতে শুনেছি, একবার মূসা আলাইহিস সালাম বনী ইসরাঈলের কোনো এক মজলিসে হাজির ছিলেন। তখন তাহাঁর কাছে এক ব্যক্তি এসে বলল, `আপনি কাউকে আপনার চেয়ে অধিক জ্ঞানী বলে জানেন কি?` মূসা আলাইহিস সালাম বলিলেন, `না।` তখন আল্লাহ্ তা`আলা মূসা আলাইহিস সালামের কাছে অহী পাঠালেন, হ্যাঁ, আমার বান্দা খিযর।` অতঃপর মূসা আলাইহিস সালাম তাহাঁর সাথে সাক্ষাত করার রাস্তা জানতে চাইলেন। আল্লাহ্ তা`আলা মাছকে তার জ্ন্য নিশানা বানিয়ে দিলেন এবং তাঁকে বলা হল, তুমি যখন মাছটি হারিয়ে ফেলবে তখন ফিরে আসবে। কারণ, কিছুক্ষনের মধ্যেই তুমি তাহাঁর সাক্ষাত পাবে। তখন তিনি সমুদ্রে সে মাছের অনুসরন করতে লাগলেন। মূসা আলাইহিস সালামকে তাহাঁর সঙ্গী যুবক বলিলেন, [কুরআনে এসেছে] “আপনি কি লক্ষ্য করেছেন আমরা যখন পাথরের কাছে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম তখন আমি মাছের কথা ভুলে গিয়েছিলাম? শয়তান তার কথা আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল। ……..মূসা বলিলেন, আমরা তো সে স্থানটিরই অনুসন্ধান করছিলাম। এরপর তারা নিজেদের পদচিহ্ন ধরে ফিরে চলল”। [কোরআনের সুরা আল-কাহফ: ৬৪] তাঁরা খিযরকে পেলেন। তাদের ঘটনা তা-ই, যা আল্লাহ্ তা`আলা তাহাঁর কিতাবে বর্ণনা করেছেন।[46]

আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্‌ রাঃসাঃ বলিয়াছেন, বনী ইসরাঈলের লোকেরা নগ্ন হয়ে একে অপরকে দেখা অবস্থায় গোসল করত। কিন্তু মূসা আলাইহিস সালাম একাকী গোসল করতেন। এতে বনী ইসরাঈলের লোকেরা বলাবলি করছিল, আল্লাহর কসম! মূসা আলাইহিস সালাম `কোষবৃদ্ধি` রোগের কারনেই আমাদের সাথে গোসল করে না। একবার মূসা আলাইহিস সালাম একটা পাথরের উপর কাপড় রেখে গোসল করছিলেন। পাথরটা তাহাঁর কাপড় নিয়ে পালাতে লাগল। তখন মূসা আলাইহিস সালাম “পাথর! আমার কাপড় দাও, পাথর! আমার কাপড় দাও” বলে পেছন পেছন ছুটলেন। এদিকে বনী ইসরাঈল মূসার দিকে তাকাল। তখন তারা বলল, আল্লাহ্‌র কসম! মূসার কোনো রোগ নেই। মূসা আলাইহিস সালাম পাথর থেকে কাপড় নিয়ে পরলেন এবং পাথরটাকে পিটাতে লাগলেন। আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু বলেন, আল্লাহ্‌র কসম! পাথরটিতে ছয় কিংবা সাতটি পিটুনির দাগ পড়ে গেল।[47]

আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু আরো বলেন যে, রাসূলুল্লাহ্‌ রাঃসাঃ বলিয়াছেন, এক সময় আইয়ূব আলাইহিস সালাম বিবস্ত্রাবস্থায় গোসল করছিলেন। তখন তাহাঁর উপর সোনার পঙ্গপাল বর্ষিত হচ্ছিল। আইয়ূব আলাইহিস সালাম তাহাঁর কাপড়ে সেগুলো কুড়িয়ে নিচ্ছিলেন। তখন তাহাঁর রব তাঁকে বলিলেন, হে আইয়ূব! আমি কি তোমাকে এগুলো থেকে অমুখাপেক্ষী করিনি? উত্তরে তিনি বলিলেন, হ্যাঁ, আপনার ইজ্জতের কসম! অবশ্যই করেছেন। তবে আমি আপনার বরকত থেকে বেনিয়ায নেই। এভাবে বর্ণনা করেছেন ইব্রাহীম [রহমাতুল্লাহি আলাইহি] আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু থেকে যে, রাসূলুল্লাহ্‌ রাঃসাঃ বলিয়াছেন, একবার আইয়ূব আলাইহিস সালাম বিবস্ত্রাবস্থায় গোসল করেছিলেন।[48]

আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাঃসাঃ বলিয়াছেন, মূসা আলাইহিস সালাম অত্যন্ত লজ্জাশীল ছিলেন, সব সময় শরীর আবৃত রাখতেন। তাহাঁর দেহের কোনো অংশ খোলা দেখা যেতনা তা থেকে তিনি লজ্জাবোধ করতেন। বনী ইসরাঈলের কিছু সংখ্যক লোক তাঁকে খুব কষ্ট দিত। তারা বলত, তিনি যে শরীরকে এত বেশী ঢেকে রাখেন, তাহাঁর একমাত্র কারণ হলো, তাহাঁর শরীরে কোনো দোষ আছে। হয়ত শ্বেত রোগ অথবা একশিরা বা অন্য কোনো রোগ আছে। আল্লাহ্তা`আলা ইচ্ছা করিলেন মূসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে তারা যে অপবাদ রটিয়েছি তা থেকে তাঁকে মুক্ত করবেন। এরপর একদিন নির্জন স্থানে গিয়ে তিনি একাকী হলেন এবং তাহাঁর পরণের কাপর খুলে একটি পাথরের উপর রাখলেন, তারপর গোসল করিলেন, গোসল সেরে যখনই তিনি কাপর নেওয়ার জন্য সেদিকে এগিয়ে গেলেন তাহাঁর কাপড়সহ পাথরটি ছুটে চলল। এরপর মূসা আলাইহিস সালাম লাঠিটি হাতে নিয়ে পাথরটি পেছনে পেছনে ছুটলেন। তিনি বলতে লাগলেন, আমার কাপড় হে পাথর! হে পাথর! পরিশেষে পাথরটি বনী ইসরাঈলের একটি জন সমাবেশে গিয়ে পৌছল। তখন তারা মূসা আলাইহিস সালামকে বিবস্ত্র অবস্থায় দেখল যে তিনি আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে সৌন্দর্যের পরিপূর্ণ এবং তারা তাঁকে যে অপবাদ দিয়েছিল সে সব দোষ থেকে তিনি সম্পূর্ণ মুক্ত। আর পাথরটি থামল, তখন মূসা আলাইহিস সালাম তাহাঁর কাপড় নিয়ে পরিধান করিলেন এবং তাহাঁর হাতের লাঠি দিয়ে পাথরটিকে জোরে জোরে আঘাত করতে লাগলেন। আল্লাহর কসম! এতে পাথরটিতে তিন, চার, কিংবা পাঁচটি আঘাতের দাগ পড়ে গেল। আর এটিই হলো আল্লাহর এ বাণীর মর্ম, “হে মুমিনগণ! তোমরা তাদের ন্যায় হয়োনা যারা মূসা আলাইহিস সালামকে কষ্ট দিয়েছিল। এরপর আল্লাহ তাকে নির্দোষ প্রমাণিত করেন তা থেকে যা তারা রটনা করেছিল। আর তিনি ছিলেন আল্লাহর কাছে মর্যাদাবান”। [কোরআনের সুরা আল-আহযাব : ৬৯][49]

ইবনু আব্বাস রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, নাবী রাঃসাঃ যখন [হিজরত করে] মদীনায় আগমন করেন, তখন তিনি মদিনাবাসীকে এমনভাবে পেলেন যে, তারা একদিন সাওম পালন করে অর্থাৎ সে দিনটি হল আশুরার দিন। [জিজ্ঞাসা করার পর] তারা বলল, এটি একটি মহান দিবস। এ এমন দিন যে দিনে আল্লাহ্‌ মুসা আলাইহিস সালামকে নাজাত দিয়েছেন এবং ফিরাউনের সম্প্রদায়কে ডুবিয়ে দিয়েছেন। এরপর মূ্সা আলাইহিস সালামশুকরিয়া হিসাবে আদিন সাওম পালন করেছেন। তখন নাবী রাঃসাঃ বলিলেন, তাদের তুলনায় আমি হলাম মূসা আলাইহিস সালা্মের অধিক ঘনিষ্ঠ। কাজেই তিনি নিজেও এদিন সাওম পালন করেছেন এবং [সবাইকে] এদিন সাওম পালনের আদেশ দিয়েছেন।[50]

আবূ সাঈদ রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, নাবী রাঃসাঃ বলেন, কিয়ামতের দিন সব মানুষ বেহুশ হয়ে যাবে। এরপর সর্বপ্রথম আমারই হুশ ফিরে আসবে। তখন আমি মূসা আলাইহিস সালামকে দেখতে পাব যে, তিনি আরশের খুঁটিগুলোর একটি খুঁটি ধরে রেখেছেন। আমি জানিনা, আমার আগেই কি তাহাঁর হুশ আসল, না-কি তূর পাহাড়ে বেহুশ হওয়ার প্রতিদানে তাঁকে দেওয়া হল।[51]

আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একজন মুসলিম আর একজন ইয়াহূদী পরস্পরকে গালি দিল। মুসলিম ব্যাক্তি বলিলেন, সেই সত্তার কসম! যিনি মুহাম্মদ রাঃসাঃকে সমগ্র জগতের উপর মনোনীত করেছেন। কসম করার তিনি একথাটি বলিয়াছেন। তখন ইয়াহূদী লোকটিও বলল, ঐ সত্তার কসম! যিনি মূসা আলাইহিস সালামকে সমগ্র জাগতের উপর মনোনীত করেছেন। তখন সেই মুসলিম সাহাবী সে সময় তার হাত উঠিয়ে ইয়াহূদী লোকটিকে একটি চড় মারলেন। তখন সে ইয়াহূদী নাবী রাঃসাঃ এর নিকট গেল এবং ঐ ঘটনাটি অবহিত করলো যা তার ও মুসলিম সাহাবীর মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল। তখন নাবী রাঃসাঃ বলিলেন, তোমরা আমাকে মূসা আলাইহিস সালামের উপর উপর মর্যাদা দেখাতে যেওনা [কেননা কিয়ামতের দিন] সকল মানুষ বেহুশ হয়ে যাবে। আর আমিই সর্বপ্রথম হুশ ফিরে পাব। তখনই আমি মূসা আলাইহিস সালামকে দেখব, তিনি আরশের একপাশ ধরে রয়েছেন। আমি জানিনা, যারা বেহুশ হয়েছিল, তিনিও কি তাদের মধ্যে ছিলেন? তারপর আমার আগে তাহাঁর হুশ এসে গেসে? অথবা তিনি তাদেরই একজন, যাদেরকে আল্লাহ বেহুশ হওয়া থেকে বাদ দিয়েছিলেন।[52]

আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ বলিয়াছেন, আদম আলাইহিস সালাম ও মূসা আলাইহিস সালাম [রূহানী জগতে] তর্ক-বিতর্ক করছিলেন। তখন মূসা আলাইহিস সালাম তাঁকে বলছিলেন, আপনি সেই আদম যে, আপনার ভুল আপনাকে বেহেশত থেকে বের করে দিয়েছিল। আদম আলাইহিস সালাম তাঁকে বলিলেন, আপনি সেই মূসা আলাইহিস সালাম যে, আপনাকে আল্লাহ তাহাঁর রিনামায দান এবং বাক্যালাপ দ্বারা সম্মানিত করেছিলেন। তারপরও আপনি আমাকে এমন একটি বিষয়ে দোষারোপ করছেন, যা আমার সৃষ্টির আগেই আমার তাকদীরে নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ দু`বার বলিয়াছেন, এ বিতর্কে আদম আলাইহিস সালাম মূসা আলাইহিস সালামের উপর জয়ী হন।[53]

আবদুল্লাহ্ ইবনু উমর রাদি. আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইহুদীগণ রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ এর নিকট এসে জানাল তাদের একজন পুরুষ ও একজন নারী যিনা করেছে। তখন রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ তাদেরকে জিজ্ঞাসা করিলেন যে, তোমরা তাওরাতে রজম সম্পর্কে কি পাচ্ছ? তারা বলল, তাদেরকে অপমান ও কশাঘাত করা হয়। আবদুল্লাহ্ ইবনু সালাম রাদি. আনহু বলিলেন, তোমার মিথ্যে বলেছ। তাওরাতে অবশ্যই রজমের উল্লেখ রয়েছে। তারা তাওরাত নিয়ে এল এবং তা খুলল। আর তাদের একজন রজমের আয়াতের ওপর হাত রেখে দিয়ে তার আগপিছ পাঠ করল। তখন আবদুল্লাহ্ ইবনু সালাম রাদি. আনহু বলিলেন, তোমার হাত উঠাও। সে তার হাত উঠালে দেখা গেল যে, তাতে রজমের আয়াত বিদ্যমান রয়েছে। তারা বলল, আবদুল্লাহ্ ইবনু সালাম সত্যই বলিয়াছেন। হে মুহাম্মদ! তাতে রজমের আয়াত সত্যই বিদ্যমান রয়েছে। তখন রাঃসাঃ তাদের উভয় সম্বন্ধে নির্দেশ করিলেন এবং তাদের উভয়কে রজম করা হল। আমি দেখলাম, পুরুষটি নারীটির ওপর উপুড় হয়ে আছে। সে তাকে পাথরের আঘাত থেকে রক্ষা করছে।[54]

ইবনু আব্বাস রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, রাঃসাঃ  যখন আযরাক উপত্যকা অতিক্রম করে যাচ্ছিলেন, তখন বলিলেন, এটি কোনো উপত্যকা? সঙ্গীগণ উত্তর দিলেন, আযরাক উপত্যকা। রাঃসাঃ  বলেন, আমি যেন মূসা আলাইহিস সালামকে গিরিপথ থেকে অবতরণ করতে দেখছি, তিনি উচ্চম্বরে তালবিয়া পাঠ করছিলেন। তারপর রাঃসাঃ  হারশা গিরিপথে আসলেন। তিনি বলিলেন, এটি কোনো গিরিপথ? সঙ্গীগণ বলিলেন, হারশা গিরিপথ। রাঃসাঃ  বলিলেন, আমি যেন ইউনূস ইবনু মাত্তা আলাইহিস সালামকে দেখছি। তিনি সুঠামদেহী লাল বর্নের উষ্ট্রের পিঠে আরোহিত; গায়ে একটি পশমী জোব্বা, আর তাহাঁর উষ্টের রশিটি খেজুরের ছাল দিয়ে তৈরি, তিনি তালবিয়া পাঠ করছিলেন। ইবনু হানবাল তার হাদীসে বলেন, হুশায়ম বলিয়াছেন, আরবি এর অর্থ আরবি খেজুর বৃক্ষের ছাল।[55]

ইবনু আব্বাস রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, রাঃসাঃ  এর সাথে আমরা মক্কা ও মদীনার মধ্যকার এক স্থানে সফর করছিলাম। আমরা একটি উপত্যকা অতিক্রম করছি, রাঃসাঃ  জিজ্ঞেস করিলেন, এটি কোনো উপত্যকা? সঙ্গীগণ উত্তর করিলেন, আযরাক উপত্যকা। রাঃসাঃ  বলিলেন, আমি যেন এখনও মূসা আলাইহিস সালামকে দেখতে পাচ্ছি, তিনি তাহাঁর কর্ণদ্বয়ের ছিদ্রে আঙ্গূল স্থাপন পূর্বক উচ্চঃস্বরে তালবিয়া পাঠ করে এ উপত্যকা অতিক্রম করে যাচ্ছেন। বর্ণনাকারী বলেন, এখানে রাঃসাঃ  মূসা আলাইহিস সালা্মের দেহের বর্ণ ও চুলের আকৃতি সম্পর্কে উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু রাবী দাউদ তা স্বরণ রাখতে পারেন নি। ইবনু আব্বাস রাদি. `আনহু বলেন, তারপর আমরা সামনে আরো অগ্রসর হলাম এবং একটি গিরিপথে এসে পৌছলাম। রাঃসাঃ  জিজ্ঞেস করিলেন, এটি কোনো গিরিপথ? সঙ্গীগণ বলিলেন, হারশা কিংবা লিফত। রাঃসাঃ  বলিলেন, আমি যেন এখনও ইউনূস আলাইহিস সালামকে দেখতে পাচ্ছি তালবিয়া পাঠ করা অবস্থায় তিনি গিরিপথ অতিক্রম করে যাচ্ছেন। তাহাঁর গায়ে একটি পশমী জোব্বা আর তিনি একটি লাল বর্ণের উষ্ট্রির পিঠে আরোহিত। তাহাঁর উষ্টির রশিটি খেজুর বৃক্ষের ছাল দ্বারা তৈরি।[56]

আল্লাহর নাবী মূসা আলাইহিস সালাম তাহাঁর রবের কাছে সর্বোচ্চ জান্নাতীর মর্যারা আর সর্বনিম্ন জান্নাতীর মর্যাদা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা।

সুফিয়ান রহ. মারফু সূত্রে বর্ণনা করেন, তাদের একজন মনে হয় ইবনু আবজার রাদি. `আনহু, তিনি বলেন, রাঃসাঃ বলিলেন, মূসা আলাইহিস সালাম তাহাঁর রবকে জিজ্ঞেস করিলেন, একজন নিম্ন শ্রেণীর বেহেশতীর কিরূপ মযার্দা হবে? আল্লাহ তা`আলা বলিলেন, সমস্ত জান্নাতবাসীকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর পর এক ব্যক্তিকে উপস্থিত করা হবে। তাকে বলা হবে, যাও, জান্নাতে প্রবেশ করো। সে বলবে, হে প্রভু, এখন ওখানে গিয়ে কি করবো? প্রত্যেক ব্যক্তিই তো স্ব স্ব স্থান ও যা যা নেওয়ার তা নিয়ে ফেলেছে। আমি ওখানে গিয়ে কিছুই তো পাবো না। তখন আল্লাহ বলবেন, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট হবে যে, দুনিয়ার যেকোন বাদশার রাজ্যের সম পরিমাণ এক রাজত্ব তোমাকে দেওয়া হবে? সে বলবে, আমি সন্তুষ্ট, হে আমার প্রভু, তখন আল্লাহ তা`আলা বলবেন, তোমাকে তা দেওয়া হল এবং তার দ্বিগুণ, তার দ্বিগুণ, তার দ্বিগুণ দেওয়া হল। পঞ্চম বারে সে ব্যক্তি বলবে, আমি সন্তুষ্ট হয়েছি, হে আমার পরওয়ারদিগার। অতঃপর তিনি বলবেন, তোমাকে তা দেওয়া হলো এবং তার দশগুণ পরিমাণ দেওয়া হলো। আর তোমাকে তাও দেওয়া হলো, যা তোমার মন চায় ও চোখে ভাল লাগে। সে ব্যক্তি বলবে, আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। মূসা আলাইহিস সালাম বলিলেন, সবোর্চ্চ শ্রেণী বেহেশতীর মযার্দা কিরূপ হবে? মহান আল্লাহ বলিলেন, এরা সেই সমস্ত লোক যাদেরকে আমি নিজের হাতে মযার্দার স্থানে উন্নীত করেছি এবং এর ওপর মোহর করে দিয়েছে। তাদেরকে এমন কিছু প্রদান করা হবে যা কোনো চোখে কখনো দেখেনি, কোনো কান কখনো শুনেনি, এমনকি কোনো অন্তর তা কল্পনাও করতে পারেনি। বণর্নাকারী বলেন, এর প্রমাণে মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর কিতাবে রয়েছে, “তাদের কাজের প্রতিদানস্বরুপ তাদের জন্য চক্ষুশীতলকারী যে সমগ্রী গোপন রাখা হয়েছে, কোনো প্রাণীরই তার খবর নেই” [কোরআনের সুরা সাজদা: ১৭][57]

মূসা আলাইহিস সালাম কর্তৃক মালাকুল মাউতকে প্রহার

আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মালাকুল মউত ফিরিশতাকে মূসা আলাইহিস সালামের নিকট তাহাঁর [জান কবযের] জন্য পাঠান হয়েছিল। ফিরিশতা যখন তাহাঁর নিকট আসলেন, তিনি তাহাঁর চোখে থাপ্পর মারলেন। রখন ফিরিশতা তাহাঁর রবের নিকট ফিরে গেলেন এবং বলিলেন, আপনি এমন এক বান্দার নিকট পাঠিয়েছেন যে মরতে চায় না। আল্লাহ্ বলিলেন, তুমি তার কাছে ফিরে যাও এবং তাকে বল সে যেন তার একটি হাত একটি গরুর পিঠে রাখে, তার হাত যতগুলো পশম দাকবে তার প্রতিটি পশমের পরিবরতে তাকে এক বছর করে হায়াত দেওয়া হবে। মূসা আলাইহিস সালাম বলিলেন, হে রব! তারপর কি হবে? আল্লাহ বলিলেন, তারপর মৃত্যু। মূসা আলাইহিস সালাম বলিলেন, এখনই হউক। [রাবী] আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু বলেন, তখন তিনি আল্লাহর নিকট আরয করিলেন, তাঁকে যেন `আরদে মুকাদ্দাস` বা পবিত্র ভুমি থেকে পাথর নিক্ষেপের দূরত্বের সমান স্থানে পৌছে দেওয়া হয়। আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন, আমি যদি সেখানে থাকতাম তাহলে অবশ্যই আমি তোমাদেরকে রাস্তার পার্শ্বে লাল টিলার নীচে কবরটি দেখিয়ে দিতাম। রাবী আব্দুর রায্যাক বলেন, মা`মর [র] আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিস ওয়াসাল্লাম থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। [58]

আল্লাহর নাবী হারুন আলাইহিস সালামের ঘটনা ( কাসাসুল আম্বিয়া pdf )

মালিক ইবনু সা`সা`আ রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিস ওয়াসাল্লাম মিরাজ রাত্রির ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে তাহাঁদের কাছে এও বলেন, তিনি যখন পঞ্চম আকাশে এসে পৌছলেন, তখন হঠাৎ সেখানে হারূন আলাইহিস সালামের সাথে সাক্ষাৎ হল। জিবরীল আলাইহিস সালাম বলিলেন, ইনি হলেন, হারূন আলাইহিস সালাম তাঁকে সালাম করুন। তখন আমি তাঁকে সালাম করলাম। তিনি সালামের জবাব দিয়ে বলিলেন, মারহাবা পুণ্যবান ভাই ও পুণ্যবান নাবী। সাবিত এবং আব্বাদ ইবনু আবূ আলী [রহমাতুল্লাহি আলাইহি] আনাস রাদি. `আনহু সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিস ওয়াসাল্লাম থেকে হাদীস বর্ণনায় কাতাদা [রহমাতুল্লাহি আলাইহি]-এর অনুসরণ করেছেন।[59]

আল্লাহর নাবী দাউদ ও সুলাইমান আলাইহিমাস সালাম

আল্লাহ তা`আলা বলিয়াছেন,

“আর অবশ্যই আমি আমার পক্ষ থেকে দাঊদের প্রতি অনুগ্রহ করেছিলাম। [আমি আদেশ করলাম] `হে পর্বতমালা, তোমরা তার সাথে আমার পবিত্রতা ঘোষণা কর` এবং পাখিদেরকেও [এ আদেশ দিয়েছিলাম]। আর আমি তার জন্য লোহাকেও নরম করে দিয়েছিলাম, [এ নির্দেশ দিয়ে যে,] `তুমি পরিপূর্ণ বর্ম তৈরী কর এবং যথার্থ পরিমাণে প্রস্তুত কর`। আর তোমরা সৎকর্ম কর। তোমরা যা কিছু কর নিশ্চয় আমি তার সম্যক দ্রষ্টা।আর সুলাইমানের জন্য আমি বাতাসকে অনুগত করে দিয়েছিলাম, যা সকালে এক মাসের পথ এবং সন্ধ্যায় এক মাসের পথ অতিক্রম করত। আর আমি তার জন্য গলিত তামার প্রস্রবণ প্রবাহিত করেছিলাম। আর কতিপয় জিন তার রবের অনুমতিক্রমে তার সামনে কাজ করত। তাদের মধ্যে যে আমার নির্দেশ থেকে বিচ্যুত হয় তাকে আমি জ্বলন্ত আগুনের আযাব আস্বাদন করাব। তারা তৈরী করত সুলাইমানের ইচ্ছানুযায়ী তার জন্য প্রাসাদ, ভাস্কর্য, সুবিশাল হাউযের মত বড় পাত্র ও স্থির হাড়ি। `হে দাঊদ পরিবার, তোমরা কৃতজ্ঞতাস্বরূপ আমল করে যাও এবং আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পই কৃতজ্ঞ”। [কোরআনের সুরা সাবা` : ১০-১৩]

“আর অবশ্যই আমি দাঊদ ও সুলাইমানকে জ্ঞান দান করেছি এবং তারা উভয়ে বলল, `সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্যই, যিনি তাহাঁর অনেক মুমিন বান্দাদের উপর আমাদেরকে মর্যাদা দান করেছেন`। আর সুলাইমান দাঊদের ওয়ারিস হল এবং সে বলল, `হে মানুষ, আমাদেরকে পাখির ভাষা শেখানো হয়েছে এবং আমাদেরকে সকল কিছু দেওয়া হয়েছে। নিশ্চয় এটা সুস্পষ্ট অনুগ্রহ`। আর সুলাইমানের জন্য তার সেনাবাহিনী থেকে জিন, মানুষ ও পাখিদের সমবেত করা হল। তারপর এদেরকে বিন্যস্ত করা হল। অবশেষে যখন তারা পিপড়ার উপত্যকায় পৌঁছল তখন এক পিপড়া বলল, `ওহে পিপড়ার দল, তোমরা তোমাদের বাসস্থানে প্রবেশ কর। সুলাইমান ও তার বাহিনী তোমাদেরকে যেন অজ্ঞাতসারে পিষ্ট করে মারতে না পারে`।তারপর সুলাইমান তার কথায় মুচকি হাসল এবং বলল, `হে আমার রব, তুমি আমার প্রতি ও আমার পিতা-মাতার প্রতি যে অনুগ্রহ করেছ তার জন্য আমাকে তোমার শুকরিয়া আদায় করার তাওফীক দাও। আর আমি যাতে এমন সৎকাজ করতে পারি যা তুমি পছন্দ কর। আর তোমার অনুগ্রহে তুমি আমাকে তোমার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত কর`। আর সুলাইমান পাখিদের খোঁজ খবর নিল। তারপর সে বলল, `কী ব্যাপার, আমি হুদহুদকে দেখছি না; নাকি সে অনুপস্থিতদের অন্তর্ভুক্ত`? অবশ্যই আমি তাকে কঠিন আযাব দেব অথবা তাকে যবেহ করব। অথবা সে আমার কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে আসবে`। তারপর অনতিবিলম্বে হুদহুদ এসে বলল, `আমি যা অবগত হয়েছি আপনি তা অবগত নন, আমি সাবা থেকে আপনার জন্য নিশ্চিত খবর নিয়ে এসেছি`। আমি এক নারীকে দেখতে পেলাম, সে তাদের উপর রাজত্ব করছে। তাকে দেওয়া হয়েছে সব কিছু। আর তার আছে এক বিশাল সিংহাসন`।`আমি তাকে ও তার কওমকে দেখতে পেলাম তারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সিজদা করছে। আর শয়তান তাদের কার্যাবলীকে তাদের জন্য সৌন্দর্যমন্ডিত করে দিয়েছে এবং তাদেরকে সৎপথ থেকে নিবৃত করেছে, ফলে তারা হিদায়াত পায় না`। যাতে তারা আল্লাহকে সিজদা না করে, যিনি আসমান ও যমীনের লুকায়িত বস্তুকে বের করেন। আর তোমরা যা গোপন কর এবং তোমরা যা প্রকাশ কর তিনি সবই জানেন। আল্লাহ ছাড়া সত্যিকারের কোনো ইলাহ নেই। তিনি মহা আরশের রব। সুলাইমান বলল, আমরা দেখব, `তুমি কি সত্য বলেছ, নাকি তুমি মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত`।`তুমি আমার এ পত্র নিয়ে যাও। অতঃপর এটা তাদের কাছে নিক্ষেপ কর, তারপর তাদের কাছ থেকে সরে থাক এবং দেখ, তারা কী জবাব দেয়`? সে [রাণী] বলল, `হে পারিষদবর্গ! নিশ্চয় আমাকে এক সম্মানজনক পত্র দেওয়া হয়েছে`।`নিশ্চয় এটা সুলাইমানের পক্ষ থেকে। আর নিশ্চয় এটা পরম করুণাময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে`।`যাতে তোমরা আমার প্রতি উদ্ধত না হও এবং অনুগত হয়ে আমার কাছে আস`। সে [রাণী] বলল, `হে পারিষদবর্গ, তোমরা আমার ব্যাপারে আমাকে অভিমত দাও। তোমাদের উপস্থিতি ছাড়া আমি কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি না। তারা বলল, `আমরা শক্তিশালী ও কঠোর যোদ্ধা, আর সিদ্ধান্ত আপনার কাছেই। অতএব চিন্তা করে দেখুন, আপনি কী নির্দেশ দেবেন`। সে বলল, `নিশ্চয় রাজা-বাদশাহরা যখন কোনো জনপদে প্রবেশ করে তখন তাকে বিপর্যস্ত করে এবং সেখানকার সম্মানিত অধিবাসীদেরকে অপদস্থ করে। আর তা-ই তারা করবে`।`আর নিশ্চয় আমি তাদের কাছে উপঢৌকন পাঠাচ্ছি, তারপর দেখি দূতেরা কী নিয়ে ফিরে আসে`।অতঃপর দূত যখন সুলাইমানের কাছে আসল, তখন সে বলল, `তোমরা কি আমাকে সম্পদ দ্বারা সাহায্য করতে চাচ্ছ? সুতরাং আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন তা তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা থেকে উত্তম। বরং তোমরা তোমাদের উপঢৌকন নিয়ে খুশি হও`।`তোমরা তাদের কাছে ফিরে যাও। তারপর আমি অবশ্যই তাদের কাছে এমন সৈন্যবাহিনী নিয়ে আসব যার মুকাবিলা করার শক্তি তাদের নেই। আর আমি অবশ্যই তাদেরকে সেখান থেকে লাঞ্ছিত অবস্থায় বের করে দেব আর তারা অপমানিত।` সুলাইমান বলল, `হে পারিষদবর্গ, তারা আমার কাছে আত্মসমর্পণ করে আসার পূর্বে তোমাদের মধ্যে কে তার [রাণীর] সিংহাসন আমার কাছে নিয়ে আসতে পারবে`? এক শক্তিশালী জিন বলল, `আপনি আপনার স্থান থেকে উঠার পূর্বেই আমি তা এনে দেব। আমি নিশ্চয়ই এই ব্যাপারে শক্তিমান, বিশ্বস্ত।যার কাছে কিতাবের এক বিশেষ জ্ঞান ছিল সে বলল, `আমি চোখের পলক পড়ার পূর্বেই তা আপনার কাছে নিয়ে আসব`। অতঃপর যখন সুলাইমান তা তার সামনে স্থির দেখতে পেল, তখন বলল, `এটি আমার রবের অনুগ্রহ, যাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করেন যে, আমি কি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি না কি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। আর যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সে তো তার নিজের কল্যাণেই তা করে, আর যে কেউ অকৃতজ্ঞ হবে, তবে নিশ্চয় আমার রব অভাবমুক্ত, অধিক দাতা`। সুলাইমান বলল, `তোমরা তার জন্য তার সিংহাসনের আকার-আকৃতি পরিবর্তন করে দাও। দেখব সে সঠিক দিশা পায় নাকি তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে, যারা সঠিক দিশা পায় না`। অতঃপর যখন সে আসল, তখন তাকে বলা হল; `এরূপই কি তোমার সিংহাসন`? সে বলল, `এটি যেন সেটিই`। আর বলল, `আমাদেরকে তার পূর্বেই জ্ঞান দান করা হয়েছিল এবং আমরা আত্মসমর্পণ করেছিলাম`। আর আল্লাহকে বাদ দিয়ে যার পূজা সে করত তা তাকে ঈমান থেকে নিবৃত্ত করেছিল। নিশ্চয় সে ছিল কাফির সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত।তাকে বলা হল, `প্রাসাদটিতে প্রবেশ কর`। অতঃপর যখন সে তা দেখল, সে তাকে এক গভীর জলাশয় ধারণা করল, এবং তার পায়ের গোছাদ্বয় অনাবৃত করল। সুলাইমান বলল, `এটি আসলে স্বচ্ছ কাঁচ-নির্মিত প্রাসাদ`। সে বলল, `হে আমার রব, নিশ্চয় আমি আমার নিজের প্রতি যুলম করেছি। আমি সুলাইমানের সাথে সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করলাম”। [কোরআনের সুরা আন্-নামাল: ১৫-৪৪]

“আর স্মরণ কর দাঊদ ও সুলায়মানের কথা, যখন তারা শস্যক্ষেত সম্পর্কে বিচার করছিল। যাতে রাতের বেলায় কোনো কওমের মেষ ঢুকে পড়েছিল। আর আমি তাদের বিচার কাজ দেখছিলাম।অতঃপর আমি এ বিষয়ের ফয়সালা সুলায়মানকে বুঝিয়ে দিয়েছিলাম। আর আমি তাদের প্রত্যেককেই দিয়েছিলাম প্রজ্ঞা ও জ্ঞান। আর আমি পর্বতমালা ও পাখীদেরকে দাঊদের অধীন করে দিয়েছিলাম, তারা দাঊদের সাথে আমার তাসবীহ পাঠ করত। আর এসবকিছু আমিই করছিলাম। আর আমিই তাকে তোমাদের জন্য বর্ম বানানো শিক্ষা দিয়েছিলাম। যাতে তা যুদ্ধে তোমাদেরকে রক্ষা করতে পারে। সুতরাং তোমরা কি কৃতজ্ঞ হবে? আর আমি সুলায়মানের জন্য অনুগত করে দিয়েছিলাম প্রবল হাওয়াকে, যা তার নির্দেশে প্রবাহিত হত সেই দেশের দিকে, যেখানে আমি বরকত রেখেছি। আর আমি প্রত্যেক বিষয় সম্পর্কেই অবগত ছিলাম। আর শয়তানদের মধ্যে কতক তার জন্য ডুবুরীর কাজ করত, এছাড়া অন্যান্য কাজও করত। আর আমিই তাদের জন্য হিফাযতকারী ছিলাম”। [কোরআনের সুরা আল-আম্বিয়া: ৭৮-৮২]

আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী রাঃসাঃ বলিয়াছেন, দাউদ আলাইহিস সালামের পক্ষে কুরআন [যাবুর] তিলাওয়াত সহজ করে দেওয়া হয়েছিল। তিনি তাহাঁর যানবাহনের পশুর উপর গদি বাঁধার আদেশ করতেন, তখন তার উপর গদি বাধা হতো। তারপর তাহাঁর যানবাহনের পশুটির উপর গদি বাঁধার পূর্বেই তিনি যাবুর তিলাওয়াত করে শেষ করে ফেলতেন। তিনি নিজ হাতে উপার্জন করেই খেতেন। মূসা ইবনু উকবা [রহমাতুল্লাহি আলাইহি] আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু সূত্রে নাবী রাঃসাঃ থেকে হাদীসটি রেওয়াত করেছেন।[60]

আবদুল্লাহ ইবনু আমর রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাঃসাঃ কে জানান হলো যে, আমি বলছি, আল্লাহ্‌র কসম! আমি যতদিন বেঁচে থাকব ততদিন অবশ্যই আমি বিরামহীনভাবে দিনে সাওম পালন করবো এবং রাতে ইবাদতে রত থাকবো। তখন রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমিই কি বলছো, `আল্লাহর কসম, আমি যতদিন বাঁচবো, ততদিন দিনে সাওম পালন করবো এবং রাতে ইবাদাত রত থাকবো। আমি আরয করলাম, আমিই তা বলছি। তিনি বলিলেন, সেই শক্তি তোমার নেই। কাজেই সাওমও পালন কর, ইফ্তারও কর অর্থাৎ বিরতি দাও। রাতে ইবাদাতও কর এবং ঘুম যাও। আর প্রতি মাসে তিন দিন সাওম পালন কর। কেননা প্রতিটি নেক কাজের কমপক্ষে দশগুণ সাওয়াব পাওয়া যায় আর এটা সারা বছর সাওম পালন করার সমান। তখন আরয করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ! আমি এর চেয়েও বেশী সাওম পালন করার ক্ষমতা রাখি। তখন তিনি বলিলেন, তাহলে তুমি একদিন সাওম পালন কর আর দু`দিন ইফতার কর অর্থাৎ বিরতি দাও। তখন আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ্! আমি এর চেয়েও অধিক পালন করার শক্তি রাখি। তখন তিনি বলিলেন, তাহলে একদিন সাওম পালন কর আর একদিন বিরতি দাও। এটা দাউদ আলাইহিস সালামের সাওম পালনের পদ্ধতি। আর এটাই সাওম পালনের উত্তম পদ্ধতি। আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি এর চেয়েও বেশী শক্তি রাখি। তিনি বলিলেন, এর চেয়ে অধিক কিছু নেই।[61]

আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনু `আস রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী রাঃসাঃ আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আমি কি অবহিত হইনি যে, তুমি রাত ভর ইবাদাত কর এবং দিন ভর সাওম পালন কর! আমি বল্ললাম, হ্যাঁ। [খবর সত্য] তিনি বলিলেন, যদি তুমি এরূপ কর; তবে তোমার দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে যাবে এবং দেহ অবসন্ন হয়ে যাবে। কাজেই প্রতি মাসে তিন দিন সাওম পালন কর। তাহলে তা সারা বছরের সাওমের সমতুল্য হয়ে যাবে। আমি বলিলাম, আমি আমার মধ্যে আরো বেশী পাই। মিসআর [রহমাতুল্লাহি আলাইহি] বলেন, এখানে শক্তি বুঝানো হয়েছে। তখন রাঃসাঃ বলিলেন, তাহলে তুমি দাউদ আলাইহিস সালামের পদ্ধতিতে সাওম পালন কর। তিনি একদিন সাওম পালন করতেন আর একদিন বিরত থাকতেন। আর শত্রুর সম্মুখীন হলে তিনি কখনও পলায়ন করতেন না।[62]

আল্লাহর নাবী সুলাইমান আলাইহিস সালাম

আল্লাহ তা`আলা বলিয়াছেন,

“আর আমি তো সুলাইমানকে পরীক্ষা করেছিলাম এবং তার সিংহাসনের উপর রেখেছিলাম একটি দেহ[63], অতঃপর সে আমার অভিমুখী হল। সুলাইমান বলল, `হে আমার রব, আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমাকে এমন এক রাজত্ব দান করুন যা আমার পর আর কারও জন্যই প্রযোজ্য হবে না। নিশ্চয়ই আপনি বড়ই দানশীল। ফলে আমি বায়ুকে তার অনুগত করে দিলাম যা তার আদেশে মৃদুমন্দভাবে প্রবাহিত হত, যেখানে সে পৌঁছতে চাইত। আর [অনুগত করে দিলাম] প্রত্যেক প্রাসাদ নির্মাণকারী ও ডুবুরী শয়তান [জিন]সমূহকেও আর শেকলে আবদ্ধ আরও অনেককে। এটি আমার অনুগ্রহ। অতএব তুমি এটি অন্যের জন্য খরচ কর অথবা নিজের জন্য রেখে দাও, এর কোনো হিসাব দিতে হবে না। আর আমার নিকট রয়েছে তার জন্য নৈকট্য ও শুভ পরিণাম”। [কোরআনের সুরা সোয়াদ: ৩৪-৪০]

আবদুল্লাহ ইবনু `আমর রাদি. `আনহু রাঃসাঃ থেকে বর্ণনা করেন যে, সুলায়মান ইবনু দাঊদ আলাইহিস সালাম যখন বায়তুল মুকাদ্দাস নির্মাণ করিলেন, তখন তিনি আল্লাহ তা`আলার কাছে তিনটি বস্তু চাইলেন: তিনি আল্লাহ তা`আলার নিকট প্রার্থনা করিলেন এমন ফয়সালা যা তাহাঁর ফয়সালার মত হয়। তা তাঁকে প্রদান করা হল। আর তিনি আল্লাহ তা`আলার নিকট চাইলেন এমন রাজ্য, যার অধিকারী তারপর আর কেউ হবে না। তাও তাঁকে দেওয়া হল। আর যখন তিনি মসজিদ নির্মাণের কাজ সমাপ্ত করিলেন তখন তিনি আল্লাহ তা`আলার নিকট প্রার্থনা করিলেন, যে ব্যক্তি তাতে সালাতের জন্য আগমন করবে, তাকে যেন পাপ থেকে ঐদিনের মত মু্ক্ত করে দেন যেদিন সে তার মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়েছিল।[64]

আবু দারদা রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাঃসাঃ  [একবার] সালাতে দাঁড়ালে আমরা তাকে বলতে শুনলাম, আমি তোর [ইবলীস] থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাই। তারপর বলিলেন, আমি আল্লাহর লানত দ্বারা তোকে লানত দিচ্ছি। [এ বাক্যটি তিনি] তিনবার [বলিলেন] এবং হাত প্রসারিত করিলেন যেন কোন কিছু ধরতে চাচ্ছেন। যখন তিনি নামায শেষ করিলেন, আমরা বলিলাম, ইয়া রাসুলল্লাহ রাঃসাঃ! [আজ] আমরা সালাতে আপনাকে এমন কিছু বলতে শুনেছি যা ইতোপূর্বে আর কখনো বলতে শুনিনি, আর [আজ] আপনাকে হাত প্রসারিত করতে দেখেছি। তিনি বলিলেন, আল্লাহর দুশমন ইবলীস অগ্নিস্ফুলিংগ নিয়ে এসেছিল আমার চেহারায় নিক্ষেপ করার জন্য, তখন আমি তিনবার বলিলাম, আমি তোর থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাই। এরপর আমি তিনবার বলিলাম, আল্লাহর লানত দ্বারা আমি তোকে লানত দিচ্ছি। এতেও সে যখন পেছনে সরে গেল না তখন আমি তাকে ধরতে ইচ্ছা করেছিলাম। আল্লাহর শপথ! যদি আমার ভাই সুলায়মান আলাইহিস সালামের দো`আ না থাকতো তা হলে সে ভোর পর্যন্ত খৃঁটির সাথে বাঁধা থাকতো। তার সাথে মদীনার শিশু?-কিশোররা খেলা করত।[65]

আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, নাবী রাঃসাঃ বলিয়াছেন, একটি অবাধ্য জ্বিন এক রাতে আমার সালাতে বিঘ্ন সৃষ্টির উদ্দেশ্যে আমার নিকট আসল। আল্লাহ্ আমাকে তাহাঁর উপর ক্ষমতা প্রদান করিলেন। আমি তাঁকে পাকড়াও করলাম এবং মসজিদের একটি খুটির সঙ্গে বেঁধে রাখার মনস্থ করলাম, যাতে তোমরা সবাই সচক্ষে তাঁকে দেখতে পাও। তখনই আমার ভাই সুলায়মান আলাইহিস সালামের দু`আটি আমার মনে পড়লো। “হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুণ এবং আমাকে দান করুন এবং আমাকে দান করুন এমন এক রাজ্য যার অধিকারী আমার পরে আমি ছাড়া কেউ না হয়”। [কোরআনের সুরা নামল : ৩৯] এরপর আমি জ্বিনটিকে ব্যর্থ এবং অপমানিত করে ছেড়ে দিলাম। জিন অথবা ইনসানের অত্যন্ত পিশাচ ব্যক্তিকে ইফ্রীত বলা হয়। ইফ্রীত ও ইফ্রীয়াতুন যিব্নীয়াতুন-এর ন্যায় এক বচন, যার বহু বচন যাবানিয়াতুন।[66]

আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, নাবী রাঃসাঃ বলেন, সুলায়মান ইবনু দাউদ আলাইহিস সালাম বলিয়াছেন, আজ রাতে আমি আমার সত্তর জন্য স্ত্রীর নিকট যাব। প্রত্যেক স্ত্রী একজন করে আশারোহী যোদ্ধা গর্ভধারণ করবে। এরা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করবে। তখন তাহাঁর সাথী বলিলেন, ইনশাআল্লাহ্ [বলুন]। কিন্তু তিনি মুখে তা বলেন নি। এরপর একজন স্ত্রী ব্যতীত কেউ গর্ভধারণ করিলেন, না। সে যাও এক [পুত্র] সন্তান প্রসব করিলেন। তাও তার এক অঙ্গ ছিল না। নাবী রাঃসাঃ বলিলেন, তিনি যদি `ইনশাআল্লাহ্` মুখে বলতেন, তা হলে [সবগুলো সন্তানই জন্ম নিত এবং] আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করতো। শু`আয়ব এবং আবূ যিনাদ [রহমাতুল্লাহি আলাইহি] এখানে নব্বই জন্য স্ত্রীর কথা উল্লেখ করেছেন আর এটাই সঠিক বর্ণনা।[67]

আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃকে বলতে শুনেছেন যে, আমার ও অন্যান্য মানুষের উপমা হলো এমন যেমন কোনো এক ব্যক্তি আগুন জ্বালাল এবং তাতে পতঙ্গ এবং কীটগুলো ঝাঁকে ঝাঁকে পড়তে লাগল। রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ বলিলেন, দু`জন মহিলা ছিল। তাদের সঙ্গে দু`টি সন্তানও ছিল। হঠাৎ একটি বাঘ এসে তাদের একজনের ছেলে নিয়ে গেল। সাথের একজন মহিলা বললো, “না, বাঘে তোমার ছেলেটি নিয়ে গেছে।“ তারপর উভয় মহিলাই দাউদ আলাইহিস সালামের নিকট এ বিরোধ মীমাংসার জন্য বিচারপ্রার্থী হলো। তখন তিনি ছেলেটির বিষয়ে বয়স্কা মহিলাটির পক্ষে রায় দিলেন। তারপর তারা উভয়ে [বিচারালয় থেকে] বেরিয়ে দাউদ আলাইহিস সালামের পুত্র সুলায়মান আলাইহিস সালামের কাছ দিয়ে যেতে লাগল এবং তারা উভয়ে তাঁকে ঘটনাটি জানালেন। তখন তিনি লোকদেরকে বলিলেন, তোমরা আমার কাছে ছোরা আনয়ন কর। আমি ছেলেটিকে দু` টুক্রা করে তাদের উভয়ের মধ্যে ভাগ করে দেই। এ কথা শুনে অল্প বয়স্কা মহিলাটি বলে উঠলো, তা করবেন না, আল্লাহ্ আপনার উপর রহম করুন। ছেলেটি তারই। [এটা আমি মেনে নিচ্ছি] তখন তিনি ছেলেটির ব্যাপারে অল্প বয়স্কা মহিলাটির পক্ষেই রায় দিলেন। আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু বলেন, আল্লাহর কসম! ছোরা অর্থে শব্দটি আমি ঐ দিনই শুনেছি। আর না হয় আমরা তো ছোরাকেই বলতাম।[68]

আল্লাহর নাবী ইউনূস আলাইহিস সালাম

“আর স্মরণ কর যুন-নূন এর কথা, যখন সে রাগান্বিত অবস্থায় চলে গিয়েছিল এবং মনে করেছিল যে, আমি তার উপর ক্ষমতা প্রয়োগ করব না। তারপর সে অন্ধকার থেকে ডেকে বলেছিল, `আপনি ছাড়া কোনো [সত্য] ইলাহ নেই`। আপনি পবিত্র মহান। নিশ্চয় আমি ছিলাম যালিম` । অতঃপর আমি তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম এবং দুশ্চিন্তা থেকে তাকে উদ্ধার করেছিলাম। আর এভাবেই আমি মুমিনদেরকে উদ্ধার করে থাকি”। [কোরআনের সুরা আল-আম্বিয়া: ৮৭-৮৮]

عَنِ ابْن عَبَّاسٍ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: ” لاَ يَنْبَغِي لِعَبْدٍ أَنْ يَقُولَ: أَنَا خَيْرٌ مِنْ يُونُسَ بْنِ مَتَّى “. وَنَسَبَهُ إِلَى أَبِيهِ،

ইবনু আব্বাস রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, নাবী রাঃসাঃ বলেন, কোনো ব্যাক্তির একথা বলা উচিৎ হবেনা যে, আমি [নাবী] ইউনুস ইবনু মাত্তার চেয়ে উত্তম। নাবী রাঃসাঃ একথা বলতে গিয়ে ইউনুস আলাইহিস সালামের পিতার নাম উল্লেখ করেছেন। আর নাবী রাঃসাঃ মিরাজের রজনীর কথাও উল্লেখ করেছেন এবং বলিয়াছেন মূসা আলাইহিস সালাম বাদামী রং বিশিষ্ট দীর্ঘদেহী ছিলেন। যেন তিনি শানুআ গোত্রের একজন লোক। তিনি আরো বলিয়াছেন যে, ঈসা আলাইহিস সালাম ছিলেন মধ্যমদেহী, কোঁকড়ানো চুলওয়ালা ব্যক্তি। আর তিনি দোযখের দারোগা মালিক এবং দাজ্জালের কথাও উল্লেখ করেছেন।[69]

আল্লাহর নাবী যাকারিয়া ও ইয়াহইয়া আলাইহিমাস সালাম ( কাসাসুল আম্বিয়া pdf )

আল্লাহ বলিয়াছেন,

“কাফ-হা-ইয়া-`আঈন-সোয়াদ। এটা তোমার রবের রহমতের বিবরণ তাহাঁর বান্দা যাকারিয়্যার প্রতি। যখন সে তার রবকে গোপনে ডেকেছিল। সে বলেছিল, `হে আমার রব! আমার হাড়গুলো দুর্বল হয়ে গেছে এবং বার্ধক্যবশতঃ আমার মাথার চুলগুলো সাদা হয়ে গেছে। হে আমার রব, আপনার নিকট দো`আ করে আমি কখনো ব্যর্থ হইনি`।`আর আমার পরে স্বগোত্রীয়দের সম্পর্কে আমি আশংকাবোধ করছি। আমার স্ত্রী তো বন্ধ্যা, অতএব আপনি আমাকে আপনার পক্ষ থেকে একজন উত্তরাধিকারী দান করুন`।`যে আমার উত্তরাধিকারী হবে এবং ইয়াকূবের বংশের উত্তরাধিকারী হবে। হে আমার রব, আপনি তাকে পছন্দনীয় বানিয়ে দিন`।[আল্লাহ বলিলেন] `হে যাকারিয়্যা, আমি তোমাকে একটি পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিচ্ছি, তার নাম ইয়াহইয়া। ইতোপূর্বে কাউকে আমি এ নাম দেইনি`। সে বলল, `হে আমার রব, কিভাবে আমার পুত্র সন্তান হবে, আমার স্ত্রী তো বন্ধ্যা, আর আমিও তো বার্ধক্যের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছি`। সে [ফেরেশতা] বলল, `এভাবেই`। তোমার রব বলিয়াছেন, `এটা আমার জন্য সহজ। আমি তো ইতঃপূর্বে তোমাকে সৃষ্টি করেছি, তখন তুমি কিছুই ছিলে না`। সে বলল, `হে আমার রব, আমার জন্য একটি নিদর্শন ঠিক করে দিন`। তিনি বলিলেন, `তোমার জন্য এটাই নিদর্শন যে, তুমি সুস্থ থেকেও তিন রাত কারো সাথে কথা বলবে না`। অতঃপর সে মিহরাব হতে বেরিয়ে তার লোকদের সামনে আসল এবং ইশারায় তাদেরকে বলল যে, `তোমরা সকাল ও সন্ধ্যায় তাসবীহ পাঠ কর”। [কোরআনের সুরা মারইয়াম: ১-১১]

“সেখানে যাকারিয়্যা তার রবের কাছে প্রার্থনা করেছিল, সে বলল, `হে আমর রব, আমাকে আপনার পক্ষ থেকে উত্তম সন্তান দান করুন। নিশ্চয় আপনি প্রার্থনা শ্রবণকারী`।অতঃপর ফেরেশতারা তাকে ডেকে বলল, সে যখন কক্ষে দাঁড়িয়ে নামায আদায় করছিল, `নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে ইয়াহইয়া সম্পর্কে সুসংবাদ দিচ্ছেন, যে হবে আল্লাহর পক্ষ থেকে বাণীর সত্যায়নকারী, নেতা ও নারী সম্ভোগমুক্ত এবং নেককারদের মধ্য থেকে একজন নাবী`। সে বলল, `হে আমার রব, কীভাবে আমার পুত্র হবে? অথচ আমার তো বার্ধক্য এসে গিয়েছে, আর আমার স্ত্রী বন্ধা`। তিনি বলিলেন, `এভাবেই আল্লাহ যা ইচ্ছা তা করেন`। সে বলল, `হে আমার রব, আমাকে দেন একটি নিদর্শন`। তিনি বলিলেন, `তোমার নিদর্শন হল, তুমি তিন দিন পর্যন্ত মানুষের সাথে ইশারা ছাড়া কথা বলবে না। আর তোমার রবকে অধিক স্মরণ কর এবং সকাল-সন্ধ্যা তার তাসবীহ পাঠ কর”। [আলে ইমরান: ৩৮-৪১]

মালিক ইবনু সা`সা`আ রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, নাবী রাঃসাঃ সাহাবাগণের কাছে মিরাজের রাত্রি সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে বলিয়াছেন, অনন্তর তিনি [জিবরীল আলাইহিস সালাম] আমাকে নিয়ে উপরে বলিলেন, এমনকি দ্বিতীয় আকাশে এসে পৌছলেন এবং দরজা খুলতে বলিলেন, জিজ্ঞাসা করা হলো কে? উত্তর দিলেন, আমি জিবরীল আলাইহিস সালাম। প্রশ্ন করা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বলিলেন, মুহাম্মদ রাঃসাঃ পৌছলাম তখন সেখানে ইয়াহ্ইয়া আলাইহিস সালাম এবং ঈসা আলাইহিস সালাম। তাদেরকে সালাম করুন। তখন আমি সালাম করলাম। তাঁরাও সালামের জবাব দিলেন। তারপর তাঁরা বলিলেন, নেক ভাই এবং নেক নাবীর প্রতি মারহাবা।[70]

হারিস আল-আশ`আরী রাদি. আনহু হইতে বর্ণিত যে, নাবী রাঃসাঃ বলিয়াছেন, আল্লাহু তা`আলা ইয়াহ্ইয়া ইবনু যাকারিয়া আলাইহিস সালামকে নিজে আমল করতে এবং বনূ ইসরাঈলকেও আমল করার জন্য বলতে পাঁচটি বিষয়ের নির্দেশ আল্লাহ তা`আলা আপনাকে দিয়েছিলেন। হয় আপনি লোকদের এগুলো করতে নির্দেশ দিন, না হয় আমিই তাদের সেগুলো করতে নির্দেশ দিব। ইয়াহ্ইয়া আলাইহিস সালাম বলিলেন, আপনি যদি এই বিষয়ে আমার অগ্রগামী হয়ে যান তবে আমার আশংকা হয় যে আমাকে ভূমিতে ধসিয়ে দেওয়া হবে বা অন্য কোনো আযাব দেওয়া হবে। অনন্তর তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসে লোকদের একত্রিত করিলেন। মসজিদ লোকে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। এমন কি বারান্দাগুলোতে গিয়েও তারা বসল। তিনি বলিলেন: আল্লাহ তা`আলা আমাকে পাঁচ বিষয়ের নির্দেশ দিয়েছেন, যেন আমি নিজেও সেগুলোর উপর আমল করি এবং তোমাদেরকেও সেগুলোর উপর আমলের নির্দেশ দিই। প্রথম হল, আল্লাহর ইবাদত করবে তাহাঁর সঙ্গে কিছুর শরীক করবে না। যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে শরীক করে তার উদাহরণ হল, সেই ব্যক্তির মত যে তার সোনা বা রূপা নির্ভেজাল সম্পদ দিয়ে একটি দাস ক্রয় করল। তাকে বলল, এ হল আমার বাড়ি আর এ হল আমার কাজ। তুমি কাজ কর এবং আমাকে আমার হক দিবে। অনন্তর সে কাজ করতে থাকল কিন্তু তার মালিক ভিন্ন অন্যের হক আদায় করল। তোমাদের মধ্যে কেউ কি এই কথার উপর রাযী আছে যে, তার দাস এ ধরনের হোক? আল্লাহ তা`আলা তোমাদেরকে সালাতের নির্দেশ দিয়েছেন, সুতরাং তোমরা যখন নামায আদায় করবে তখন এদিক-সেদিক তাকাবে না। কেননা যতক্ষণ বান্দা এদিক-সেদিক না তাকায় ততক্ষণ সারাতে আল্লাহ তা`আলা তাহাঁর নেক দৃষ্টি তাহাঁর বান্দার চেহারার দিকে নিবিষ্ট করে রাখেন। তোমাদের আমি সিয়ামের নির্দেশ দিচ্ছি। এর উদাহরণ হল সেই ব্যক্তির মত, যে ব্যক্তি একটি দলে অবস্থান করছে। তার সঙ্গে আছে মিশক ভর্তি একটি থলে। দলের প্রত্যেকের কাছেই এ সুগন্ধি ভাল লাগে। আল্লাহ তা`আলার কাছে মিশকের সুগন্ধি অপেক্ষা সিয়াম পালনকারীর [মুখের] গন্ধ অনেক বেশী সুগন্ধময়। তোমাদের আমি সাদাকা-এর নির্দেশ দিচ্ছি। এর উদাহরণ হল সে ব্যক্তির মত যাকে শক্ররা বন্দী করে তার ঘাড় পেঁচিয়ে তার হাত বেঁধে ফেলেছে এবং গর্দান উড়িয়ে দেওয়ার জন্য বধ্যভূমিতে নিয়ে চলেছে। তখন সে ব্যক্তি বলল: আমার কম বেশী যা কিছু আছে সব কিছু মুক্তিপণ হিসাবে তোমাদের দিচ্ছি। অনন্তর সে এভাবে তাদের থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিল। [সাদাকার মাধ্যমেও মানূষ নিজেকে আযাব থেকে মুক্ত করে নেয়।] তোমাদের আমি আল্লাহর যিকরের নির্দেশ দিচ্ছি। এর উদাহরণ হল সে ব্যক্তির মত যাকে তার দুশমণ দ্রম্নত পশ্চাদ্ধাবণ করছে। শেষে সে একটি সুন্দর কেল্লার ভিতরে এসে নিজেকে শক্রদের থেকে হেফাজত করে নিল। এমনি ভাবে বান্দা আল্লাহর যিকরের কেল্লা ছাড়া নিজেকে হেফাযত করতে পারে না। নাবী রাঃসাঃ বলিলেন: আমিও তোমাদের পাঁচটি বিষয়ের নির্দেশ দিচ্ছি যেগুলোর নির্দেশ তিনি আমাকে দিয়েছেন: কথা শুনবে ও ফরমাবরদারী করবে। জিহাদ, হিজরত এবং মুসলিমদের জামা`আত অবলম্বন করবে। কেননা, যে ব্যক্তি এক বিঘত পরিমাণও জামা`আত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল সে তার গলা থেকে ইসলামের বেড়ী খুলে ফেলে দিল- যতক্ষণ না সে আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে এসেছে। যে ব্যক্তি জাহেলী যুগের ডাকে ডাকবে সে হল জাহান্নামীদের দলভুক্ত। জনৈক ব্যক্তি তখন বলল: ইয়া রাসূলুল্লাহ! সে যদি নামায ও সিয়াম পালন করে তবুও? তিনি বলিলেন: যদিও সে নামায আদায় করে এবং সিয়াম পালন করে। সুতরাং মুসলিম, মুমিন, আল্লাহর বান্দা রূপে যে নামে আল্লাহ তা`আলা তোমাদের নামকরণ করেছেন সেই আল্লাহর ডাকেই তোমরা নিজেদের ডাকবে।[71]

আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, রাঃসাঃ বলিয়াছেন, যাকারিয়া আলাইহিস সালাম কাঠমিস্ত্রি ছিলেন।[72]

আল্লাহর নাবী ঈসা আলাইহিস সালাম ও তাহাঁর মাতা মারইয়াম আলাইহাস সালাম ( কাসাসুল আম্বিয়া pdf )

আল্লাহ তাদের সম্পর্কে বলিয়াছেন,

“আর স্মরণ কর এই কিতাবে মারইয়ামকে যখন সে তার পরিবারবর্গ থেকে পৃথক হয়ে পূর্ব দিকের কোনো এক স্থানে চলে গেল। আর সে তাদের নিকট থেকে [নিজকে] আড়াল করল। তখন আমি তার নিকট আমার রূহ [জিবরীল] কে প্রেরণ করলাম। অতঃপর সে তার সামনে পূর্ণ মানবের রূপ ধারণ করল। মারইয়াম বলল, `আমি তোমার থেকে পরম করুণাময়ের আশ্রয় চাচ্ছি, যদি তুমি মুত্তাকী হও`। সে বলল, `আমি তো কেবল তোমার রবের বার্তাবাহক, তোমাকে একজন পবিত্র পুত্রসন্তান দান করার জন্য এসেছি`। মারইয়াম বলল, `কিভাবে আমার পুত্র সন্তান হবে? অথচ কোনো মানুষ আমাকে স্পর্শ করেনি। আর আমি তো ব্যভিচারিণীও নই`। সে বলল, `এভাবেই। তোমার রব বলিয়াছেন, এটা আমার জন্য সহজ। আর যেন আমি তাকে করে দেই মানুষের জন্য নিদর্শন এবং আমার পক্ষ থেকে রহমত। আর এটি একটি সিদ্ধান্তকৃত বিষয়`। তারপর সে তাকে গর্ভে ধারণ করল এবং তা নিয়ে দূরবর্তী একটি স্থানে চলে গেল। অতঃপর প্রসব-বেদনা তাকে খেজুর গাছের কান্ডের কাছে নিয়ে এলো। সে বলল, `হায়! এর আগেই যদি আমি মরে যেতাম এবং সম্পূর্ণরূপে বিস্মৃত হতাম`! তখন তার নিচ থেকে সে তাকে ডেকে বলল যে, `তুমি চিন্তা করো না। তোমার রব তোমার নিচে একটি ঝর্ণা সৃষ্টি করেছেন`।`আর তুমি খেজুর গাছের কান্ড ধরে তোমার দিকে নাড়া দাও, তাহলে তা তোমার উপর তাজা-পাকা খেজুর ফেলবে`।`অতঃপর তুমি খাও, পান কর এবং চোখ জুড়াও। আর যদি তুমি কোনো লোককে দেখতে পাও তাহলে বলে দিও, `আমি পরম করুণাময়ের জন্য চুপ থাকার মানত করেছি। অতএব আজ আমি কোনো মানুষের সাথে কিছুতেই কথা বলব না`। তারপর সে তাকে কোলে নিয়ে নিজ কওমের নিকট আসল। তারা বলল, `হে মারইয়াম! তুমি তো এক অদ্ভূত বিষয় নিয়ে এসেছ`! `হে হারূনের বোন! তোমার পিতা তো খারাপ লোক ছিল না। আর তোমার মা-ও ছিল না ব্যভিচারিণী`। তখন সে শিশুটির দিকে ইশারা করল। তারা বলল, `যে কোলের শিশু আমরা কিভাবে তার সাথে কথা বলব`? শিশুটি বলল, `আমি তো আল্লাহর বান্দা; তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নাবী বানিয়েছেন`।`আর যেখানেই আমি থাকি না কেন তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন এবং যতদিন আমি জীবিত থাকি তিনি আমাকে নামায ও যাকাত আদায় করতে আদেশ করেছেন`।`আর আমাকে মায়ের প্রতি অনুগত করেছেন এবং তিনি আমাকে অহঙ্কারী, অবাধ্য করেননি`।`আর আমার উপর শান্তি, যেদিন আমি জন্মেছি এবং যেদিন আমি মারা যাব আর যেদিন আমাকে জীবিত অবস্থায় উঠানো হবে`। এই হচ্ছে মারইয়াম পুত্র ঈসা। এটাই সঠিক বক্তব্য, যে বিষয়ে লোকেরা সন্দেহ পোষণ করছে। সন্তান গ্রহণ করা আল্লাহর কাজ নয়। তিনি পবিত্র-মহান। তিনি যখন কোনো বিষয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তখন তদুদ্দেশ্যে শুধু বলেন, `হও`, অমনি তা হয়ে যায়”। [কোরআনের সুরা মারইয়াম: ১৬-৩৫]

“অতঃপর তার রব তাকে উত্তমভাবে কবুল করিলেন এবং তাকে উত্তমভাবে গড়ে তুললেন। আর তাকে যাকারিয়্যার দায়িত্বে দিলেন। যখনই যাকারিয়্যা তার কাছে তার কক্ষে প্রবেশ করত, তখনই তার নিকট খাদ্যসামগ্রী পেত। সে বলত, `হে মারইয়াম, কোথা থেকে তোমার জন্য এটি`? সে বলত, `এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে। নিশ্চয় আল্লাহ যাকে চান বিনা হিসাবে রিযিক দান করেন”। [আলে ইমরান: ৩৭]

“স্মরণ কর, যখন ফেরেশতারা বলল, `হে মারইয়াম, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে তাহাঁর পক্ষ থেকে একটি কালেমার সুসংবাদ দিচ্ছেন, যার নাম মসীহ ঈসা ইবনে মারইয়াম, যে দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মানিত এবং নৈকট্যপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত`। আর সে মানুষের সাথে কথা বলবে দোলনায় ও পরিণত বয়সে এবং সে নেককারদের অন্তর্ভুক্ত।মারইয়াম বলল, `হে আমার রব, কিভাবে আমার সন্তান হবে? অথচ কোনো মানুষ আমাকে স্পর্শ করেনি`! আল্লাহ বলিলেন, `এভাবেই` আল্লাহ যা চান সৃষ্টি করেন। তিনি যখন কোনো বিষয়ের সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাকে শুধু বলেন, `হও`। ফলে তা হয়ে যায়।`আর তিনি তাকে কিতাব, হিকমাত, তাওরাত ও ইনজীল শিক্ষা দেবেন`।আর বনী ইসরাঈলদের রাসূল বানাবেন [সে বলবে] `নিশ্চয় আমি তোমাদের নিকট তোমাদের রবের পক্ষ থেকে নিদর্শন নিয়ে এসেছি যে, অবশ্যই আমি তোমাদের জন্য কাদামাটি দিয়ে পাখির আকৃতি বানাব, অতঃপর আমি তাতে ফুঁক দেব। ফলে আল্লাহর হুকুমে সেটি পাখি হয়ে যাবে। আর আমি আল্লাহর হুকুমে জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ রুগীকে সুস্থ করব এবং মৃতকে জীবিত করব। আর তোমরা যা আহার কর এবং তোমাদের ঘরে যা জমা করে রাখ তা আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেব। নিশ্চয় এতে তোমাদের জন্য নিদর্শন রয়েছে, যদি তোমরা মুমিন হও”। [আলে ইমরান: ৪৫-৪৯]

“যখন আল্লাহ বলবেন, `হে মারইয়ামের পুত্র ঈসা, তোমার উপর ও তোমার মাতার উপর আমার নি`আমত স্মরণ কর, যখন আমি তোমাকে শক্তিশালী করেছিলাম পবিত্র আত্মা[73] দিয়ে, তুমি মানুষের সাথে কথা বলতে দোলনায় ও পরিণত বয়সে। আর যখন আমি তোমাকে শিক্ষা দিয়েছিলাম কিতাব, হিকমাত, তাওরাত ও ইনজীল; আর যখন আমার আদেশে কাদামাটি থেকে পাখির আকৃতির মত গঠন করতে এবং তাতে ফুঁক দিতে, ফলে আমার আদেশে তা পাখি হয়ে যেত। আর তুমি আমার আদেশে জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ রোগীকে সুস্থ করতে এবং যখন আমার আদেশে তুমি মৃতকে জীবিত বের করতে। আর যখন তুমি স্পষ্ট প্রমাণাদি নিয়ে এসেছিলে তখন আমি বনী ইসরাঈলকে তোমার থেকে ফিরিয়ে রেখেছিলাম। অতঃপর তাদের মধ্যে যারা কুফরী করেছিল তারা বলেছিল, এতো স্পষ্ট জাদু”। [আল-মায়েদা: ১১০]

“যখন হাওয়ারীগণ বলেছিল, `হে মারইয়ামের পুত্র ঈসা, তোমার রব কি পারে আমাদের উপর আসমান থেকে খাবারপূর্ণ দস্তরখান নাযিল করতে?` সে বলেছিল, `আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর, যদি তোমরা মুমিন হও`। তারা বলল, `আমরা তা থেকে খেতে চাই। আর আমাদের হৃদয় প্রশান্ত হবে এবং আমরা জানব যে, তুমি আমাদেরকে সত্যই বলেছ, আর আমরা এ ব্যাপারে সাক্ষীদের অন্তর্ভুক্ত হব।`মারইয়ামের পুত্র ঈসা বলল, `হে আল্লাহ, হে আমাদের রব, আসমান থেকে আমাদের প্রতি খাবারপূর্ণ দস্তরখান নাযিল করুন; এটা আমাদের জন্য ঈদ হবে। আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের জন্য। আর আপনার পক্ষ থেকে এক নিদর্শন হবে। আর আমাদেরকে রিযিক দান করুন, আপনিই শ্রেষ্ঠ রিযিকদাতা`। আল্লাহ বলিলেন, `নিশ্চয় আমি তোমাদের প্রতি তা নাযিল করব; কিন্তু এরপর তোমাদের মধ্যে যে কুফরী করবে তাকে নিশ্চয় আমি এমন আযাব দেব, যে আযাব সৃষ্টিকুলের কাউকে দেব না”। [আল-মায়েদা: ১১২-১১৫]

“আর তাদের কুফরীর কারণে এবং মারইয়ামের বিরুদ্ধে মারাত্মক অপবাদ দেওয়ার কারণে।এবং তাদের এ কথার কারণে যে, `আমরা আল্লাহর রাসূল মারইয়াম পুত্র ঈসা মাসীহকে হত্যা করেছি`। অথচ তারা তাকে হত্যা করেনি এবং তাকে শূলেও চড়ায়নি। বরং তাদেরকে ধাঁধায় ফেলা হয়েছিল। আর নিশ্চয় যারা তাতে মতবিরোধ করেছিল, অবশ্যই তারা তার ব্যাপারে সন্দেহের মধ্যে ছিল। ধারণার অনুসরণ ছাড়া এ ব্যাপারে তাদের কোনো জ্ঞান নেই। আর এটা নিশ্চিত যে, তারা তাকে হত্যা করেনি। বরং আল্লাহ তাহাঁর কাছে তাকে তুলে নিয়েছেন এবং আল্লাহ মহা পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়”। [কোরআনের সুরা আন্-নিসা: ১৫৬-১৫৮]

আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃকে বলতে শুনেছি, এমন কোনো আদম সন্তান নেই, যাকে জন্মের সময় শয়তান স্পর্শ করে না। জন্মের সময় শয়তানের স্পর্শের কারণেই সে চিৎকার করে কাঁদে। তবে মারিয়াম এবং তাহাঁর ছেলে [ঈসা] আলাইহিস সালামের ব্যতিক্রম। তারপর আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু বলেন, [এর কারণ হলো মারিয়ামের মায়ের এ নামায “হে আল্লাহ্! নিশ্চয় আমি আপনার নিকট তাহাঁর এবং তাহাঁর বংশধরদের জন্য বিতাড়িত শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি” [কোরআনের সুরা আলে ইমরান: ৩৬]।[74]

আলী রাদি. `আনহু বলেন, আমি নাবী রাঃসাঃকে এ কথা বলতে শুনেছি যে, [ঐ সময়ের] সমগ্র নারীদের মধ্যে ইমরানের কন্যা মারিয়াম আলাইহাস সালাম হলেন সর্বোত্তম আর [এ সময়ে] নারীদের সেরা হলেন খাদীজা রাদি. `আনহা।[75]

আবূ মূসা আশ`আরী রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী রাঃসাঃ বলিয়াছেন, সকল নারীর উপর আয়েশার মর্যাদা এমন, যেমন সকল খাদ্য সামগ্রির উপর সারীদের মর্যাদা। পুরুষদের মধ্যে অনেকেই কামালিয়াত অরজন করেছেন। [অতিত যুগে] কিন্তূ নারীদের মধ্যে ইমরানের কন্যা মারিয়াম এবং ফিরাউনের স্ত্রী আছিয়া ব্যতিত কেউ কামালিয়াত অর্জন করতে পারেনি।[76]

উবাদা রাদি. `আনহু সূত্রে নাবী রাঃসাঃ হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দিল, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, তিনি একক, তাহাঁর কোনো শরীক নেই আর মুহাম্মদ রাঃসাঃ তাহাঁর বান্দা ও রাসূল আর নিশ্চয়ই ঈসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর বান্দা ও তাহাঁর রাসূল তাহাঁর সেই কালিমা যা তিনি মারিয়ামকে পৌছিয়েছেন এবং তাহাঁর পক্ষ থেকে একটি রূহ মাত্র, আর জান্নাত সত্য ও জাহান্নাম সত্য আল্লাহ্তাকে জান্নাত প্রবেশ করাবেন, তার আমল যাই হোক না কেন।[77]

আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, নাবী রাঃসাঃ বলেন, তিন জন শিশু ব্যতিত আর কেউ দোলনায় থেকে কথা বলেনি। বনী ইসরাঈলের এক ব্যক্তি যাকে `জুরাইজ` বলে ডাকা হতো। একদা ইবাদাতে রত থাকা অবস্থায় তার মা এসে তাকে ডাকল। সে ভাবল আমি কি তার ডাকে সারা দেব, না নামায আদায় করতে থাকব। [জবাব না পেয়ে] তার মা বলল, ইয়া আল্লাহ্! ব্যভিচারিণীর চেহারা না দেখা পর্যন্ত তুমি তাকে মৃত্যু দিও না। জুরায়জ তার ইবাদাত খানায় থাকত । একবার তার কাছে একটি মহিলা আসল। সে [অসৎ উদ্দেশ্যে সাধনের জন্য] তার সাথে কথা বলল। কিন্তু জুরায়জ তা অস্বীকার করল। তারপর মহিলাটি একজন রাখালের নিকট গেল এবং তাকে দিয়ে মনোবাসনা পূরণ করল। পরে সে একটি পুত্র সন্তান প্রসব করল। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো।এটি কার থেকে? স্ত্রী লোকটি বলল, জুরাইজ থেকে। লোকেরা তার কাছে আসল এবং তার ইবাদাত খানা ভেঙ্গে দিল। আর তাকে নীচে নামিয়ে আনল ও তাকে গালি গালাজ করল। তখন জুরাইজ অযু সেরে ইবাদাত করল। এরপর নবজাত শিশুটির নিকট এসে তাকে জিজ্ঞাসা করল। হে শিশু! তোমার পিতা কে? সে জবাব দিল সেই রাখাল। তারা [বনী ইসরাঈলেরা] বলল, আমরা আপনার ইবাদতখানাটি সোনা দিয়ে তৈরি করে দিচ্ছি। সে বুলল, না। তবে মাটি দিয়ে [করতে পার]। বনী ইসরাঈলের একজন মহিলা তার শিশুকে দুধ পান করাচ্ছিল। তার কাছ দিয়ে দিয়ে একজন সুদর্শন পুরুষ আরোহী চলে গেল। মহিলাটি দো`আ করল, ইয়া আল্লাহ্! আমার ছেলেটিকে তার মত বানাও। শিশুটি তখনই তার মায়ের স্তন ছেড়ে দিল। এবং আরোহীটির দিকে মুখ ফিরালো। আর বলল, ইয়া আল্লাহ্! আমাকে তার মত করনা। এরপর মুখ ফিরিয়ে দুধ পান করতে লাগল। আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু বলিলেন, নাবী রাঃসাঃকে দেখতে পাচ্ছি তিনি আঙ্গুল চুষছেন। এরপর সেই মহিলাটির পাশ দিয়ে একটি দাসী চলে গেল। মহিলাটি বলল, ইয়া আল্লাহ্! আমার শিশুকে এর মত করো না। শিশুটি তৎক্ষনাৎ তার মায়ের দুধ ছেড়ে দিল। আর বলল, ইয়া আল্লাহ্! আমাকে তার মত কর। তার মা জিজ্ঞাসা করল, তা কেন? শিশুটি জবাব দিল, সেই আরোহীটি ছিল যালিমদের একজন । আর এ দাসীটি লোকে বলছে তুমি চুরি করেছ, যিনা করেছ। অথচ সে কিছুই করেনি।[78]

ইবনু উমর রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী রাঃসাঃ বলিয়াছেন, [মিরাজের রাতে] আমি ঈসা আলাইহিস সালাম, মূসা আলাইহিস সালাম ও ইব্রাহীম আলাইহিস সালামকে দেখেছি। ঈসা আলাইহিস সালাম গৌর বর্ণ, সোজা চুল এবং প্রশস্ত বক্ষবিশিষ্ট লোক ছিলেন, মূসা আলাইহিস সালাম বাদামি রং বিশিষ্ট ছিলেন, তাহাঁর দেহ ছিল সুঠাম এবং মাথার চুল ছিল কোকড়ানো যেন `যুত` গোত্রের একজন লোক।[79]

আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা নাবী রাঃসাঃ লোকজনের সামনে মাসীহ দাজ্জালের কথা উল্লেখ করিলেন। তিনি বলিলেন, আল্লাহ্ টেঁড়া নন। সাবধান! মাসীহ দাজ্জালের ডান চোখ টেঁড়া। তার চোখ যেন ফুলে যাওয়া আঙ্গুরের মত। আমি এক রাতে স্বপ্নে নিজেকে কা`বার কাছে দেখলাম। হঠাৎ সেখানে বাদামী রং এর এক ব্যক্তিকে দেখলাম। তোমরা যেমন সুন্দর বাদামী রঙের লোক দেখে থাক তার থেকেও বেশী সুন্দর ছিলেন তিনি। তাহাঁর মাথার সোজা চুল, তার দু`কাঁধ পর্যন্ত ঝূলছিল। তার মাথা থেকে পানি ফোটা ফোটা করে পরছিল। তিনি দু`জন লোকের কাঁধে হাত রেখে কা`বা শরীফ তাওয়াফ করছিলেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম ইনি কে? তারা জবাব দিলেন, ইনি হলেন, মসীহ ইবনু মারিয়াম। তারপর তাহাঁর পিছনে আর একজন লোককে দেখলাম। তাহাঁর মাথার চুল ছিল বেশ কোঁকড়ানো, ডান চোখ টেঁড়া, আকৃতিতে সে আমার দেখা মত ইবনু কাতানের অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ। সে একজন লোকের দু`কাঁধে ভর করে কা`বার চারদিকে ঘুরছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এ লোকটি কে? তারা বলিলেন, এ হল মাসীহ দাজ্জাল।[80]

সালিম রাদি. `আনহুর পিতা হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর কসম! নাবী রাঃসাঃ এ কথা বলেননি যে ঈসা আলাইহিস সালাম রক্তিম বর্ণের ছিলেন। বরং বলিয়াছেন, একদা আমি স্বপ্নে কা`বা ঘর তাইয়াফ করছিলাম। হঠাৎ সোজা চুল ও বাদামী রং বিশিষ্ট একজন লোক দেখলাম। তিনি দু`জন লোকের মাঝখানে চলছেন। তাহাঁর মাথার পানি ঝরে পড়ছে অথবা বলিয়াছেন, তার মাথা থেকে পানি বেয়ে পড়ছে। আমি বলিলাম, ইনি কে? তারা বলিলেন, ইনি মারিয়ামের পুত্র। তখন আমি এদিক সেদিক তাকালাম। হঠাৎ দেখলাম, এক ব্যক্তি তার গায়ের রং লালবর্ণ, খুব মোটা, মাথার চুল কোকড়ানো এবং তার ডান চোখ টেঁড়া। তার চোখ যেন ফুলা আঙ্গুরের ন্যায়। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এ লোকটি কে? তারা বলিলেন, এ হলো মানুষের মধ্যে ইবনু কাতানের সাথে তার অধিক সাদৃশ্য রয়েছ। যুহরী [রহমাতুল্লাহি আলাইহি] তার বর্ণনায় বলেন, ইবনু কাতান খুযা`আ গোত্রের লোক, সে জাহেলী যুগেই মারা গেছে।[81]

আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃকে বলতে শুনেছি, আমি মারিয়ামের পুত্র ঈসার বেশী নিকটতম। আর নাবীগণ পরস্পর আল্লাতী ভাই অর্থাৎ দীনের মূল বিষয়ে এক এবং বিধানে বিভিন্ন। আমার ও তার [ঈসার] মাঝখানে কোনো নাবী নেই।[82]

আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, নাবী রাঃসাঃ বলেন, ঈসা আলাইহিস সালাম এক ব্যাক্তিকে চুরি করতে দেখলেন, তখন তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কি চুরি করেছ? সে বলল, কখনও নয়। সেই সত্তার কসম। যিনি ব্যাতীত আর কোনো ইলাহ নেই। তখন ঈসা আলাইহিস সালাম বলিলেন, আমি আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমান এনেছি আর আমি আমার দু`নয়নকে বাহ্যত সমর্থন করলাম না।[83]

আবূ মূসা মাশ`আরী রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ বলিয়াছেন, যদি কোনো লোক তার দাসীকে আদব-কায়দা শিখায় এবং তা ভালভাবে শিখায় এবং তাকে দীন শিখায় আর তা উত্তমভাবে শিখায় তারপর তাদের আযাদ করে দেয় অতঃপর তাকে বিয়ে করে তবে সে দু`টি করে সওয়াব পাবে। আর যদি কেউ ঈসা আলাইহিস সালামের প্রতি ঈমান আনয়ন করে তারপর আমার প্রতিও ঈমান আনে, তার জন্যও দু`টি করে সওয়াব রয়েছে। আর গোলাম যদি তার প্রতিপালককে ভয় করে এবং তার মনিবদেরকে মেনে চলে তার জন্যও দু`টি করে সওয়াব রয়েছে।[84]

আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ রাঃসাঃ বলিয়াছেন, কসম সেই সত্তার, যার হাতে আমার প্রান, অচিরেই তোমাদের মাঝে মারিয়ামের পুত্র ঈসা আলাইহিস সালাম শাসক ও ন্যায় বিচারক হিসেবে অবতরণ করবেন। তিনি `ক্রুশ` ভেঙ্গে ফেলবেন, শূকর মেরে ফেলবেন এবং তিনি যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটাবেন। তখন সম্পদের স্রোত বয়ে চলবে। এমনকি কেউ তা গ্রহন করতে চাইবে না। তখন আল্লাহকে একটি সিজ্দা করা সমগ্র দুনিয়া এবং তার মধ্যকার সমস্ত সম্পদ থেকে বেশী মূল্যবান বলে গণ্য হবে। এরপর আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু বলেন, তোমরা ইচ্ছা করলে এর সমর্থনে এ আয়াতটি পড়তে পার, “কিতাবীদের মধ্যে প্রত্যেকে তাহাঁর [ঈসা আলাইহিস সালামের] মৃত্যুর পূর্বে তাঁকে বিশ্বাস করবেই এবং কিয়ামতের দীন তিনি তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবেন” [কোরআনের সুরা নিসা: ১৫৯]।[85]

কুরআনের অস্পষ্টভাবে উল্লেখিত নাবীগণের আলোচনা (কাসাসুল আম্বিয়া pdf)

আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাঃসাঃ কে বলতে শুনেছি যেকোন একজন নাবীকে পিপিলীকা কামড় দেয়। তিনি পিপিলীকা সহবাসাটি জ্বালিয়ে দেওয়ার আদেশ করেন এবং তা জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। আল্লাহ তা`আলা তার প্রতি অহী অবতীর্ণ করেন, তোমাকে একটি পিপিলীকা কামড় দিয়েছে আর তুমি আল্লাহর তাসবীহ পাঠকারী জাতিকে জ্বালিয়ে দিয়েছ।[86]

আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, রাঃসাঃ বলিয়াছেন, নাবীগণের মধ্যে কোনো এক নাবী গাছের নীচে অবতরণ করেন। এরপর তাঁকে একটি পিপড়ায় কামড় দেয়। তিনি তাহাঁর প্রয়োজনীয় আসবাবসম্বন্ধে নির্দেশ দিলেন। এগুলো গাছের নীচ হতে বের করে দেওয়া হল। তারপর তিনি নির্দেশ দিলে পিপড়ার বাসা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হল। তখন আল্লাহ তাহাঁর প্রতি অহী নাযিল করিলেন, `তুমি একটি মাত্র পিপড়াকে কে সাজা দিলে না?।[87]

আবূ হুরাইরা রাদি. `আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী রাঃসাঃ বলিয়াছেন, `কোন একজন নাবী জিহাদ করেছিলেন। তিনি তাহাঁর সম্প্রদায়কে বলিলেন, এমন কোনো ব্যক্তি আমার অনুসরণ করবে না, যে কোনো মহিলাকে বিবাহ করেছে এবং তার সঙ্গে মিলিত হওয়ার ইচ্ছা রাখে, কিন্তু সে এখনো মিলিত হয়নি। এমন ব্যক্তিও না যে ঘর তৈরী করেছে কিন্তু তার ছাদ তোলেনি। আর এমন ব্যক্তিও না যে গর্ভবতী ছাগল বা উটনী কিনেছে এবং সে তার প্রসবের অপেক্ষা করছে। তারপর তিনি জিহাদে গেলেন এবং আসরের সালাতের সময় কিংবা এর কাছাকাছি সময়ের একটি জনপথের নিকটবর্তী হলেন। তখন তিনি সূর্যকে বলিলেন, তুমিও আদিষ্ট আর আমিও আদিষ্ট। ইয়া আল্লাহ! সূর্যকে থামিয়ে দিন। তখন তাকে থামিয়ে দেওয়া হল। অবশেষে আল্লাহ তাঁকে বিজয় দান করেন। এরপর তিনি গনীমত একত্রিত করিলেন। তখন সেগুলি জ্বালিয়ে দিতে আগুন এল কিন্তু আগুন তা জ্বালালো না। নাবী রাঃসাঃ তখন বলিলেন, তোমাদের মধ্যে [গনীমতের] আত্মসাৎকারী রয়েছে। প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন যেন আমার কাছে বাইয়াত করে। সে সময় একজনের হাত নাবীর হাতের সঙ্গে আটকে গেল। তখন তিনি বলিলেন, তোমাদের মধ্যে আত্মসাৎ রয়েছে। কাজেই তোমার গোত্রের লোকেরা যেন আমার কাছে বাইয়অত করে। এ সময় দু`ব্যক্তির বা তিন ব্যক্তির হাত তাহাঁর হাতের সঙ্গে আটকে গেল। তখন তিনি বলিলেন, তোমাদের মধ্যেই আত্মসাৎ রয়েছে। অবশেষে তারা একটি গাভীর সমতুল্য স্বর্ণ উপস্থিত করল এবং তা রেখে দিল। তারপর আগুন এসে তা জ্বালিয়ে ফেলল। এরপর আল্লাহ আমাদর জন্য গনীমত হালাল করে দিলেন এবং আমাদের দুর্বলতা ও অক্ষমতা লক্ষ্য করে তা আমাদের জন্য তা হালাল করে দিলেন।[88]


[1] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৩২৬।

[2] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৩৩০।

[3] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৪৭১২।

[4] সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর ১৬৭৭।

[5] সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর ২৬১১।

[6] التنور এর আরেকটি অর্থ হল ভূপৃষ্ঠ। প্লাবন শুরু হওয়ার আগে ভূপৃষ্ঠের সবখান দিয়ে পানি উৎসারিত হতে লাগল।

[7] অর্থাৎ প্রত্যেক শ্রেণী থেকে একটি নর ও একটি মাদী।

[8] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৩৩৭।

[9] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৩৩৮।

[10] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৩৪৩।

[11] সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর ৮৯৯।

[12] সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর ৮৯৯।

[13] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৩৭৭।

[14] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৪৯৪২।

[15] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৩৭৯।

[16] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৩৮০।

[17] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৩৮১।

[18]. এ বাক্যের অর্থ ‘তারা মনে মনে চিন্তা করল তারা বিবেক বুদ্ধি খাটাল’ ও হতে পারে।

[19] ইসমাঈলকে

[20] তা ছিল একটি জান্নাতী দুম্বা।

[21] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৪৩৭।

[22] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৩৪৯।

[23] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ২২১৭।

[24] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৫০৮৪।

[25] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৩৫১।

[26] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৩৫২।

[27] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৩৫০।

[28] সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর ১৩৭৪।

[29] সহিহ মুসলিম, ১৩৬২।

[30] সহিহ মুসলিম, ১৩৭৪।

[31] ‘আমার মেয়ে’ দ্বারা উদ্দেশ্য কওমের মেয়েরা। কারণ, যে কোন কওমের নবী তাদের পিতাতুল্য।

[32] মক্কা থেকে সিরিয়া অভিমুখে যাত্রাপথের পাশেই তা বিদ্যমান।

[33] ‘সুদৃঢ় স্তম্ভ’ বলতে শক্তিশালী সৈন্যসামন্ত কিংবা কওম অথবা গোত্র বুঝানো হয়েছে।

[34] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৩৭৫।

[35] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৩৬৪।

[36] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৩৬৪।

[37] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৩৬২।

[38] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৩৭৩।

[39] برهان অর্থ উজ্জ্বল প্রমাণ এখানে নিদর্শন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। সে নিদর্শনটি কী ছিল এ সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত পাওয়া যায় । তাফসীরে ইবনে কাছীরে এর বিশদ বর্ণনা এসেছে। কেউ কেউ বলেন, তিনি নিজ পিতা ইয়াকূবের মুখচ্ছবি এবং তাঁর পক্ষ থেকে সতর্ক ইঙ্গিত পেয়েছিলেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন, আযীয মিসরের মুখচ্ছবি দেখেছিলেন। আর কারো কারো মতে সেই বুরহান হচ্ছে আল্লাহ প্রদত্ত বিবেকের নির্দেশ।

[40] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৩৫৩।

[41] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৩৯১।

[42] তারা তূর পাহাড়ের ডানপার্শ্বে উপস্থিত হলে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে তাওরাত কিতাব প্রদান করবেন বলে ওয়াদা করেছিলেন।

[43] ‘মান্না’ এক ধরনের সুস্বাদু খাবার, যা শিশিরের মত গাছের পাতায় ও ঘাসের উপর জমে থাকত। আল্লাহ বিশেষভাবে তা বনী ইসরাঈলের জন্য প্রেরণ করেছিলেন।

[44] ‘সালওয়া’ পাখীর গোশ্ত জাতীয় এক প্রকার খাদ্য, যা আল্লাহ বনী ইসরাঈলের জন্য বিশেষভাবে প্রেরণ করেছিলেন।

[45] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ১২২, সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর ২৩৮০।

[46] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৭৪।

[47] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ২৭৮।

[48] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ২৭৯।

[49] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৪০৩।

[50] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৩৯৭।

[51] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৩৯৮।

[52] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৪০৮।

[53] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৪০৯।

[54] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৬৮৪১।

[55] সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর ১৬৬।

[56] সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর ১৬৬।

[57] সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর ১৮৯।

[58] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৪০৭। সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর ২৩৭২।

[59] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৩৯৩।

[60] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৪১৭।

[61] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৪১৮।

[62] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৪১৯।

[63] আবু হুরাইরা সূত্রে বুখারী শরীফের বর্ণনা মতে হযরত সুলাইমান একদা তাঁর সকল স্ত্রীর সাথে সহবাস করার দীপ্ত কামনা ব্যক্ত করে বলেন যে, এর ফলে তাদের গর্ভে যেসব সন্তান আসবে তারা সব আল্লাহর পথে লড়াকু মুজাহিদ হবে। তবে তিনি ইনশাআল্লাহ বলতে ভুলে যান। ফলে একমাত্র এক স্ত্রীর গর্ভেই একটি সন্তান হয়, যে ছিল বিকলাঙ্গ নিষ্প্রাণ প্রায়। ভূমিষ্ট হবার পর এ সন্তানকে সুলাইমানের দরবারে তার সিংহাসনে এনে রাখা হলে তিনি স্বীয় ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হন এবং তওবা করেন।

[64] নাসায়ী, হাদিস নম্বর ৬৯৩।

[65] নাসায়ী, হাদিস নম্বর ১২১৫। হাদীসটি মুসলিমের শর্তে সহিহ।

[66] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৪২৩।

[67] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৪২৪।

[68] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৪২৬-৩৪২৭।

[69] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৩৯৫-৩৩৯৬, সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর ১৬৫।

[70] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৪৩০।

[71] তিরমিযী, হাদিস নম্বর ২৮৬৩। হাদীসটি হাসান সহিহ গরীব।

[72] সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর ২৩৭৯।

[73] ‘পবিত্র আত্মা’ বলে জিবরীল (আঃ) কে বুঝানো হয়েছে।

[74] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৪৩১।

[75] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৪৩২।

[76] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৪৩৩।

[77] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৪৩৫।

[78] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৪৩৬।

[79] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৪৩৮।

[80] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৪৩৯-৩৪৪০।

[81] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৪৪১।

[82] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৪৪২।

[83] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৪৪৪।

[84] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৪৪৬।

[85] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৪৪৮।

[86] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩০১৯।

[87] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩৩১৯।

[88] সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৩১২৪।

About halalbajar.com

এখানে কুরআন শরীফ, তাফসীর, প্রায় ৫০,০০০ হাদীস, প্রাচীন ফিকাহ কিতাব ও এর সুচিপত্র প্রচার করা হয়েছে। প্রশ্ন/পরামর্শ/ ভুল সংশোধন/বই ক্রয় করতে চাইলে আপনার পছন্দের লেখার নিচে মন্তব্য (Comments) করুন। “আমার কথা পৌঁছিয়ে দাও, তা যদি এক আয়াতও হয়” -বুখারি ৩৪৬১। তাই এই পোস্ট টি উপরের Facebook বাটনে এ ক্লিক করে শেয়ার করুন অশেষ সাওয়াব হাসিল করুন

Check Also

সালফে সালেহীন তথা নেকবান্দাহদের স্বপ্ন

সালফে সালেহীন তথা নেকবান্দাহদের স্বপ্ন সালফে সালেহীন তথা নেকবান্দাহদের স্বপ্ন  << নবুওয়তের মুজিযা হাদীসের মুল সুচিপত্র দেখুন …

Leave a Reply

%d bloggers like this: