ওযু ভঙ্গের কারণ কয়টি এবং এর মাসআলা

ওযু ভঙ্গের কারণ কয়টি এবং এর মাসআলা

ওযু ভঙ্গের কারণ কয়টি এবং এর মাসআলা >> আল হিদায়া ফিকহ এর মুল সুচিপত্র দেখুন

কিতাবঃ আল হিদায়া, পরিচ্ছেদঃ ওজু ভংগের কারণসমূহ

ওজু ভংগের কারণগুলো যথাক্রমেঃ

০১. পেশাব-পায়খানার রাস্তা দিয়ে যে কোন কিছু বের হওয়া। কেননা আল্লাহ বলিয়াছেন তোমাদের কেউ শৌচ স্থান থেকে আসে, রসূলুল্লাহ [সাঃআঃ]-জিঞ্জাসা করা হলো কি? তিনি বললেন, পেশাব ও পায়খানা দুদ্বারে যা রের হয়।
আলোচ্য হাদিসের যা কিছু শব্দটি ব্যাপকতা জ্ঞাপক। সুতরাং প্রকৃতিগত ও অপ্রকৃতিগত সবকিছুই এর অন্তর্ভূক্ত।

০২. দেহের কোন অংশ থেকে বা পুঁজ বের হয়ে যদি পাক করার বিধান প্রযোজ্য হয় এমন স্থান অতিক্রম করে।

০৩. মুখ ভর্তি বমি। ইমাম শাফিঈ [রঃআঃ] বলেন, পেশাব পায়খানার রাস্তা ছাড়া [দেহের অন্য কোন স্থান থেকে] কিছু বের হলে ওজু ভংগ হবে না। কেননা বর্ণিত আছে যে, নবী করিম [সাঃআঃ] বমি করে ওজু করে নি।
তাছাড়া যে স্থানে নাজাসাত স্পর্শ করেনি, তা ধৌত করা যুক্তি-ঊর্ধ্ব করণীয় বিধান।
সুতরাং শরীআতের নির্দেশিত স্থানে তা সীমিত থাকবে। আর তা হল প্রকৃতিগত পথ। আমাদের প্রমাণ হলো, রসূলুল্লাহ [সাঃআঃ] বলেছেনঃ সকল প্রবাহিত রক্তের জন্যই ওজু আবশ্যক। তিনি আরো বলেছেনঃ
নামাজ অবস্থায় কারো বমি হলে কিংবা নাকে রক্ত ঝরলে সে যেন ফিরে গিয়ে ওজু করে এবং পূর্ববর্তী সালাতের উপর বিনা করে যতক্ষণ না কথা বলবে।

আর যুক্তি হলো নাজাসাত নির্গত হওয়া তাহারাত ও পবিত্রতা ভংগের কারণ মূল আয়াতের এতটুকু তো যুক্তিসংগত।অবশ্য নির্দিষ্ট চার অংগ ধোয়ার নির্দেশ যুক্তির ঊর্ধ্বে। কিন্তু প্রথম বিষয়টি স্থানান্তরিত হলে দ্বিতীয় বিষয়টিও স্থানান্তরিত হওয়া অনিবার্য হবে। তবে নির্গত হওয়া তখনই সাব্যস্ত হবে, যখন তা তাহারাতের হুকুমভূক্ত কোন অংশ গড়িয়ে পৌঁছবে। আর বমির ক্ষেত্রে যখন তা মুখ ভরে হবে। কেননা, আবরণত্বক উঠে গেলে রক্ত বা পুঁজ স্বস্থানে প্রকাশ পায় মাত্র; নির্গত হয় না।
পক্ষান্তরে পেশাব-পায়খানার পথ দুটি ব্যতিক্রম [অর্থাত্ সেখানে নাজাসাত দেখা গেলে ওজু ভংগ হয়েছে বলে ধরা হবে] কেননা, তা নাজাসাতের প্রকৃত স্থান নয়। সুতরাং সেখানে নাজাসাতের প্রকাশ থেকেই তার স্থানচ্যুতি ও নির্গত হওয়া প্রমাণিত হবে।

মুখ ভরা বমির অর্থ হলো, অনায়াসে যা আটকানো সম্ভব নয়। কেননা, দৃশ্যতঃ তা নির্গত হতে বাধ্য। সুতরাং নির্গত হয়েছে বলেই গণ্য হবে।
ইমাম যুফার [রঃআঃ] বলেন, অল্প ও বিস্তর বমি সমপর্যায়ের। তদ্রূপ [রক্তের ক্ষেত্রেও তিনি] প্রবাহিত হওয়ার শর্ত আরোপ করেন না। পেশাব-পায়খানার স্বাভাবিক নির্গত হওয়ার স্থানের উপর কিয়াস করে।
তাছাড়া নবী করিম[সাঃআঃ]-নিম্নোক্ত বাণীঃ বমি ওজু ভংগের কারণ হচ্ছে শর্তমুক্ত।
আমাদের প্রমাণ হল নবী করিম [সাঃআঃ]-এর হাদীছঃ প্রবাহিত না হলে এক দুফোঁটা রক্ত বের হলে ওজু আবশ্যক নয়।
এবং হযরত আলী রাঃআঃ ওজু ভংগের সবকটি কারণ গণনা প্রসংগে বলিয়াছেন,[মুখ ভরা বমি] এখানে যখন হাদীসগুলো পরস্পর বিরোধী তখন [সমন্বয়ের জন্য] ইমাম শাফিঈ [রঃআঃ] বর্ণিত হাদীসকে অল্প বমির উপর এবং ইমাম যুফার বর্ণিত হাদীসকে বেশী বমির উপর ধরা হবে। পক্ষান্তরে পেশাব-পায়খানার রাস্তা এবং অন্যান্য স্থান থেকে নাজাসাতে নির্গত হওয়ার পার্থক্য ইতোপূর্বে আমরা বলে এসেছি।

যদি বিভিন্ন দফায় এত পরিমাণ বমি করে যে, একত্র করা হলে তা মুখ ভর্তি পরিমাণ হবে, তখন ইমাম আবূ ইউসূফ [রঃআঃ] এর মতে স্থানের অভিন্নতা বিবেচ্য হবে। এবং ইমাম মুহাম্মদ [রঃআঃ] এর মতে বমনোদ্রেককারী হেতু অর্থাত্ উদগারের অভিন্নতা বিবেচ্য।
ইমাম আবূ ইউসূফ হইতে বর্ণিত যে, পদার্থ ওজু ভংগের কারণ নয়, তা নাপাকও গণ্য নয়; ইমাম আবূ ইউসূফের যুক্তি এই যে, [উদারস্থ] শ্লেষ্মা নাজাসাতের সংস্পর্শহেতু নাজাসাত রূপে গণ্য।

আর যদি কেউ রক্তবমি করে এবং তা জমাট হয়, তবে এতে মুখ ভরতি বিবেচনা করা হবে। কেননা মূলতঃ তা পিত্ত-নিঃসৃত গাঢ় কাল পদার্থ। আর যদি তরল হয়, তবে ইমাম মুহম্মদ [রঃআঃ] এর মতে, অন্যান্য প্রকার বমির নিরিখে এক্ষেত্রেও অনুরূপ মুখ ভর্তি হওয়া বিবেচ্য।
অন্য দুই ইমামের মতে, যদি স্বতঃস্ফূর্ত বেগে প্রবাহিত হয় তাহলে অল্প হলেও ওজু ভেংগে যাবে। কেননা পাকস্থলী রক্তের স্থান নয়। সুতরাং তা উদরস্থ কোন ক্ষত থেকে নির্গত হয়েছে বলে গণ্য হবে।
[আর রক্ত] মাথার ভিতর থেকে গড়িয়ে নাকের নরম অংশ পর্যন্ত উপনীত হলে সর্বসম্মত মতে ওজু ভেংগে যাবে। কেননা তা তাহারাতের হুকুমভূক্ত অংশে চলে এসেছে। সুতরাং নির্গত হওয়া সাব্যস্ত।

[৪] ঘুমানো-কাত হয়ে কিংবা হেলান দিয়ে কিংবা এমন কিছুতে ঠেস দিয়ে য়ে, তা সরিয়ে দিলে সে পড়ে যাবে। কেননা, পার্শ্ব শয়ন শরীরের গ্রন্থিগুলোর শিথিলতার কারণ। ফলে এ অবস্থা স্বভাবতই কিছু [বায়ু] নির্গত হওয়া থেকে মুক্ত নয়। আর স্বভাবতঃ যা বিদ্যমান তা ইয়াকিনী বিষয় বলে গণ্য।

আর তা হেলান অবস্থায় ঘুম আসলে ভূমির সাথে নিতম্বের সংলগ্নতা না থাকার কারণে জাগ্রতাবস্থার নিয়ন্ত্রণ বিলুপ্ত হয়। আর কিছুতে উক্ত প্রকার ঠেস দিয়ে ঘুমালে অংগ শৈথিল্য চরমে পৌছে যায়। ঠেকনাটি তার পড়ে যাওয়া থেকে বাচিয়ে রাখে পক্ষান্তরে [সালাতে বা সালাতের বাইরে] দাড়ানো, বসা, রুকু ও সাজদা অবস্থার ঘুম তেমন নয়। এটাই বিশুদ্ধ মত। কেননা, আংশিক নিয়ন্ত্রণ তখনো বহাল থাকে, তা না হলে তো পড়েই যেতো। সুতরাং পুরোপুরি অঙ্গ শিথিল হয় না। এ বিষয়ে মূল ভিত্তি হলো নবী [সাঃআঃ] এর বাণীঃ
দাড়িয়ে, বসে,রুকুতে বা সাজদায় যে ঘুমায়, তার উপর ওজু আবশ্যক নয়। ওজু আবশ্যক হলো তার উপর, যে প্বার্শে ভর দিয়ে ঘুমায়, কেননা পার্শ্বের উপর ঘুমালে তার গ্রন্থি শিথিল হয়ে পড়ে।

[৫] এমন সংজ্ঞাহীনতা, যাতে বোধ-লোপ পায় এবং [৬] অপ্রকৃতিস্থতা। কেননা, এগুলো অংগ শৈথিল্যের ক্ষেত্রে পার্শ্ব শয়নের চাইতেও বেশী ক্রিয়াশীল। সংজ্ঞাহীনতা সর্বাবস্থায় ওজু ভংগের কারণ। ঘুমের ক্ষেত্রও কিয়াস ও যুক্তির দাবী এটাই ছিল। কিন্তু ঘুমের ক্ষেত্রে উক্ত পার্থক্য আমরা হাদীস থেকে পেয়েছি। সংজ্ঞাহীনতা কে আবার নিদ্রার উপর কিয়াস করার সুযোগ নেই। কেননা তা নিদ্রার চাইতে বেশী প্রবল।

[৭] রুকু-সাজদাবিশিষ্ট সালাতে অট্টহাসি। অবশ্য কিয়াস ও যুক্তির দাবী হল ওজু ভংগ না হওয়া। ইমাম শাফিঈ [রঃআঃ] এর মতও তাই। কেননা তা নির্গত নাজাসাত নয়। এ কারণে সালাতুল জানাযায়, তিলাওয়াতের সাজদায় এবং সালাতের বাইরে তা ওজু ভংগের কারণ নয়।


আমাদের দলীল হলো রসূলুল্লাহ [সাঃআঃ] এর বাণী, শুনো, তোমাদের কেউ অট্টহাসি করলে ওজু ও নামাজ উভয়ই পুনরায় আদায় করিবে।বলা বাহুল্য যে, এ ধরনের [মশহুর হাদীস] দ্বারা কিয়াস করা হয়ে থাকে। তবে হাদীসটি যেহেতু পূর্ণ আকারের নামাজ সম্পর্কিত, সেহেতু তার হুকুম তাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
অট্টহাসি হলো যা নিজে এবং পার্শ্ববর্তী শুনতে পায়। আর হাসি হলো যা নিজে শোনতে পায়, কিন্তু অন্যরা শুনতে পায় না। আর কেউ কেউ বলিয়াছেন যে, হাসি দ্বারা ওজু নষ্ট হয় না, কিন্তু নামাজ ফাসিদ হয়ে যায়।

[৮] পিছনের রাস্তা দিয়ে কোন কীট বের হলে তা ওজু ভংগকারী হবে। তবে ক্ষতস্থান থেকে কীট বের হলে বা মাংসখণ্ড খসে পড়লে ওজু ভংগ হবে না।
মূল পাঠে দাব্বা দ্বারা উদ্দেশ্য কীট কেননা [মূলতঃ কীট নাজাসাত নয় বরং] তার দেহ লেগে থাকা পদার্থ হলো নাজিস বা নাপাক এবং তা অতি অল্প। আর অল্প নাজাসাত পেশাব-পায়খানার রাস্তায় নির্গত হওয়া ওজু ভংগের কারণ। কিন্তু অন্য স্থান থেকে অল্প বের হওয়া ওজু ভংগের কারণ নয়। তাই [অন্য স্থান থেকে অল্প বের হওয়া] ঢেকুরের সঙ্গে তুলনীয় এবং [পেশাব-পায়খানার রাস্তা থেকে অল্প বের হওয়া] নিঃশব্দ বাতকর্মের সাথে তুলনীয়। পক্ষান্তরে নারী অথবা পুরুষের পেশাবের রাস্তা দিয়ে নির্গত বায়ু ওজু ভংগকারী নয়। কেননা তা নাজাসাতের স্থান থেকে সৃষ্ট নয়। তবে উভয় পথ সংযূক্ত এমন কোন নারীর বায়ু নির্গত হলে তার জন্য ওজু করে নেয়া মুসতাহাব।কেননা, সেটা পিছনের রাস্তা দিয়ে বের হওয়ার সম্ভাবনা বিদ্যমান।

কোন ফোড়া-ফোস্কার চামড়া তুলে ফেলার কারণে তা থেকে পানি-পুজ ইত্যাদি গড়িয়ে যদি ক্ষতস্থানের মুখ অতিক্রম করে তাহলে ওজু ভংগ হবে, আর পানি যদি অতিক্রম না করে তবে ওজু ভংগ হবে না।
ইমাম যুফার রাঃআঃ এর মতে উভয় অবস্থায় ওজু ভংগ হবে। ইমাম শাফিঈ [রঃআঃ] এর মতে উভয় অবস্থাতেই ওজু ভংগ হবে না। মূলতঃ এটা পেশাব-পায়খানার রাস্তা ছাড়া ভিন্ন পথে নাজাসাত নির্গত হওয়ার মাসআলার সাথে সম্পৃক্ত। এই সমস্ত পানি পুজ ইত্যাদি অবশ্যই নাজিস। কেননা এগুলো মূলতঃ রক্ত, পর্যায়ক্রমে পক্ক হয়ে নির্গত ক্লেদ এবং আরো বেশী পক্ক হওয়ার পর পুজ, এরপর এই পার্থক্য তখনই হবে যখন আবরণ-ত্বক সরিয়ে ফেলার কারণে তা আপনা আপনি বের হয়। পক্ষান্তরে চিপ দেওয়ার কারণে বের হলে ওজু ভংগ হবে না। কেননা [হাদীস] বা নির্গত শব্দ রয়েছে, অথচ] এটা নির্গত নয়, বরং নিঃসরণ করা হয়েছে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। ওযু ভঙ্গের কারণ কয়টি এবং এর মাসআলা

Leave a Reply